শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০১৫

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্প : মেয়ে

বিয়ের চার বছর পর বাচ্চার দেখা মিলছে—এই সংবাদে যতটা খুশি হওয়ার কথা লিপির, তার থেকে বেশি হচ্ছে দুশ্চিন্তা। স্বামী গফুর জানিয়ে দিয়েছে, বাচ্চাটাকে ছেলে হতে হবে। মেয়ে হলে লিপির পক্ষ নিয়ে দাঁড়ানো তার জন্য আর সম্ভব হবে না। গফুর নির্মাণশ্রমিক, থাকে মধ্যপ্রাচ্যে, বছরে একবারের বেশি বাড়ি আসা হয় না। যে তিনবার এসেছে সে বিয়ের পর, সন্তান উৎপাদনের নিরন্তর চেষ্টা করেছে। সফল হয়নি।
কিন্তু এই অসফলতার কথা কাউকে জানায়নি। মাকে বলেছে এখন সন্তান নেওয়ার ইচ্ছা নেই, পরে দেখা যাবে। সেই পরে অবশ্য বেশ আগেভাগেই এসে পড়েছে, যখন বিশ্বমন্দা শারজাতে হানা দিল, তখন সে চাকরি খুইয়েছে। এখন লিপিকে বলেছে, এত দিন ঠেকা দিলাম, এবার একটা পুলা দিয়া তুমি ঠেকাও।

ঠেকাও, মানে বাবা দুলাল মিয়াকে। বিয়ের পর থেকে লিপিকে খুব কড়া চোখে দেখেন দুলাল মিয়া। বলেন, মেয়েটার খাসলত খারাপ। পরপুরুষের দিকে ওর তেরচা নজর। লিপিকে সারা দিন চোখে চোখে রাখা হচ্ছে দুলাল মিয়ার বড় কাজ। সারা রাতও, এক অর্থে। রাতে লিপিকে প্রকৃতি ডাকলে নিঃশব্দে সেই ডাকে যে সে সাড়া দেবে, সে উপায় নেই। জানান দিয়ে উঠতে হবে, যাতে দুলাল মিয়াও ওঠেন। এবং টর্চ হাতে পাহারায় দাঁড়িয়ে থাকেন। ফলে লিপির অনেক যুদ্ধের সঙ্গে প্রকৃতির সঙ্গে রাতের যুদ্ধটাও যোগ হয়েছিল। লিপির যুদ্ধগুলো কী, সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন না। লিপি যে সাহস অথবা অসাহস এবং ধৈর্য অথবা অধৈর্য নিয়ে যুদ্ধগুলো লড়ে গেছে—যাচ্ছে—তার ভগ্নাংশ দিয়েও আমরা সেগুলো বর্ণনা করতে অক্ষম।

মাফ চাই।

পেটে বাচ্চা আসায় দুলাল মিয়া কিছুটা তফাৎ হয়েছে; গফুর ফিরে আসার পর থেকেই বস্তুত তার দূরবাস। কিন্তু সমস্যা হয়েছে গফুরের ফিরে আসার ধরন নিয়ে। চাকরি থেকে ছুটি নিয়ে আসা আর চাকরি হারিয়ে ফিরে আসা দুই জিনিস। দুলাল মিয়া সে কথাটি ভালোভাবেই জানিয়ে দিয়েছেন গফুরকে। মাইয়া হলে বাপের পয়সায় খেতে হবে লিপিকে, দুলাল মিয়ার স্পষ্ট কথা। মা-মেয়ে মিলে তাঁর অন্ন ধ্বংস করবে, তা হবে না। হাঃ হাঃ। বিষয়টা যেন মনে থাকে। লিপিকে শুনিয়ে শুনিয়ে কথাগুলো বলেছেন দুলাল মিয়া। শুনে গফুর শুধু দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছে। লিপিকে বলেছে, একটা পুলা দেও, লিপি বেগম।

লিপি বেগম একদিন গফুরের হাত রেখেছে তার পেটের ওপর। পেটের ভেতর বাচ্চাটা নড়ছে, যেন এখনই বেরোতে চায়। এ কেমন বাচ্চাগো, লিপি ভেবেছে। লাথি মারছে, যেন জুতমতো মারতে পারলে মায়ের পেটের চামড়া দুভাগ হবে, আর সে লাফিয়ে নামবে দুনিয়ায়। গোঁৎ গোঁৎ করতে করতে বেরিয়ে আসবে যেন সে ডায়নোসরের বাচ্চা, বড়সড় একটা ডিমের মতো মায়ের পেট ফাটিয়ে।

তুলনাটা লিপির না, এটি আমাদের। আমরা আবার ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেল দেখি কিনা!

গফুর লিপির পেটে হাত রাখতেই একটা লাথির মতো খেল। সে আনন্দে চিৎকার দিয়ে উঠল। ও লিপি বেগম, এ তো পুলা, পুলা ছাড়া এমন লাথি কে মারে?

গফুরের উত্তর শুনে লিপির দুশ্চিন্তাগুলো উবে গেল। ও আল্লা। তুমি আমার দুয়া হুনছ। লিপি বাষ্পঠেসা গলায় কৃতজ্ঞতা জানাল। গফুর বাচ্চার লাথি খেয়ে একটা লাফ দিল। তার লাফ দেওয়া দেখে দুলাল মিয়া হাজির হলেন। কী অইছে, কী অইছে? দুলাল মিয়া চোখ দুটো সাপের মতো গোল করে জিজ্ঞেস করলেন।

পুলা। বাষ্পঠেসা গলায় এবার গফুরের অর্ধোক্তি।

দুলাল মিয়া দেখলেন, লিপির পেটটা উদলা। প্রদীপ ঢালির ঢোলের মতো, তবে আরও মসৃণ। তিনি একটা হাত রাখলেন লিপির পেটে। লিপির চোখ অন্ধকার হয়ে এল। কিন্তু অন্ধকারটা জমার সময় পেল না। দুলাল মিয়া বাপরে বলে একটা চিৎকার দিয়ে উঠলেন।

কী অইল বাবা? উদ্বেগ নিয়ে প্রশ্ন করল গফুর।

কী অইব আবার? হাতটা ভাইঙ্গাই দিল বদমাশটা।

বদমাশটা মানে লিপির পেটের মধ্যে লাথির কসরত করতে থাকা সন্তানটা। সে দাদাকে একটা কঠিন লাথি মেরেছে। দুলাল মিয়ার হাড্ডি তো আর গফুরের মতো শক্ত না।

স্বামীর চিৎকার শুনে এখন দৃশ্যে ঢুকলেন গফুরের মা, লুৎফা বেগম। লুৎফা বেগমের সঙ্গে এতক্ষণ আপনাদের পরিচয় হয়নি, সেজন্য দুঃখিত। কিন্তু না হলেও ক্ষতি নেই। আপনারা সনি আর জিটিভির কল্যাণে অসংখ্য লুৎফা বেগমের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। আপনাদের দু-একজন নিজেরাও তো লুৎফা বেগম। অথবা হতে যাওয়া লুৎফা বেগম। নাকি?

লিপি তার পেট ঢেকে ফেলেছে ততক্ষণে। তার গা ঘিন ঘিন করছে। পেটটা গুলাচ্ছে। কিন্তু সেই গুলাতে থাকা পেটে হাত রেখে লুৎফা বেগম চিৎকার করে বললেন, কে কইল পুলা? আমি তো ঠেরি মাইয়া। এই বেতমিজে কি পুলা বিয়াইতে পারে?

পুলা অথবা মাইয়া—সে এ কথা শুনে আরও কঠিন এক লাথি মারল লুৎফা বেগমের হাতে। হাতটা যেন ভেঙেই গেল। নির্মাণশ্রমিকের মা হলেই যে তাঁর হাত শক্ত-সমর্থ হবে, তেমন তো কথা নেই।

হাতটা ছিল বাঁ হাত। লিপির মতো বেতমিজ মাইয়াদের জন্য ডান হাত এস্তেমাল করা যায় না। এখন ডান হাতে ভাঙা বাঁ হাতটা ধরে চিৎকার করতে করতে বেরিয়ে গেলেন লুৎফা বেগম।

লিপির মনে একটু আগের আনন্দটা এবার জোরেশোরে ফিরে এল। চোখে আবেশ নিয়ে সে বিছানায় পড়ে থাকল। অনেকক্ষণ। অনেক বছরে এই প্রথম তাকে একা ছেড়ে দিয়েছেন দুলাল মিয়া, লুৎফা বেগম, এমনকি গফুরও।

পেটে একটা হাত রেখে সে ছেলেকে বলল, বাপজান রে! আমার ধন। তার স্বরটা শোনাল রাতের চালে পৌষের শিশির পড়ার শব্দ থেকেও কোমল।

লাথি খেয়ে লুৎফা বেগম ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন। বেতমিজ মেয়ের পেটে আরেক বেতমিজ। তিনি ভেতরে ভেতরে জানেন, এমন বড় লাথি কোনো মেয়ে দিতে পারে না। তিনি নিজেও জীবনে বহু লাথি খেয়েছেন, একটা লাথিও কাউকে দিতে পারেননি, এই বেতমিজ লিপি বেগম ছাড়া। কিন্তু সে কথা স্বীকার করে নেওয়া আর লিপি বেগমের লাথি খেতে থাকা একই জিনিস। তিনি জানেন, আর কয়েকটা মাস। তারপর যখন রানুবালা দাই পুলাটারে কাঁথায় জড়িয়ে ফিসফিস করে বলবে, নাতি অইছে গো, লুৎফা দিদি, আজানের ব্যবস্থা করেন, এবং গফুর দ্রুত উঠানে নেমে কৃতজ্ঞ গলায় আজান দিতে থাকবেন, তখন থেকে তার লাথি দেওয়ার দিন মোটামুটি শেষ। সেজন্য তিনি গলা উঁচু করে স্বামীকে ছেলেকে ক্রমাগত বলতে থাকলেন, বেতমিজটার পেটের মাইয়াটাও বেতমিজ। দুইটারে বাড়ি থেকে বের করে দিতে হবে। কিন্তু তাঁর এ কথায় সোৎসাহ সায় আসে না স্বামী থেকে; বেকার গফুর থেকেও বরং আসে করুণার হাসি। গফুর বেকার, তবে ব্যাংকে ওর টাকা আছে। তাতেই সে রক্ষা পেয়েছে। লিপির ছেলে হবে—এই প্রত্যয়ে সে এখন বাজার থেকে এটা-সেটা এনে লুকিয়ে লিপিকে খাওয়ায়। লুৎফা বেগমের শকুনদৃষ্টিতে অবশ্য তা আড়াল থাকে না। ক্রমেই ক্রুদ্ধ হচ্ছেন লুৎফা বেগম। লিপির জন্য কাজের বায়না বাড়ে। তিনি ভাবেন, প্রাণপণে বেতমিজটাকে খাটাতে হবে। এত খাটনি যে তাতে যদি হঠাৎ একদিন পেট নেমে যায় লিপির...আল্লা না করুন...তাতেও সে কষ্টে মারা যাবে না।

বেতমিজটার দেমাক বাড়ছে। দেমাকের দাওয়াই হচ্ছে খাটনি। হাঃ হাঃ। তিনি হাসেন।

লিপির একটা সমস্যা—এবং সমস্যাটা বিরাট—সে কোনো কিছুর প্রতিবাদ করতে জানে না। লুৎফা বেগম তাকে বকেন, সুযোগ পেলেই দু-এক ঘা লাগান, কাজের চাপে তার জানের হাঁসফাঁস বাড়ান—সবকিছুই মাথা নিচু করে মেনে নেয় লিপি। পেটে বাচ্চা আসায় এবং গফুর চাকরি হারিয়ে দেশে ফেরায় সাময়িক ছেদ পড়েছে প্রহার এবং অমানুষিক কাজে। বকাটা মোটামুটি আছে। এখন, হঠাৎ করে কাজ গেল বেড়ে। লুৎফা বেগমের পেটে বিদ্যা নেই, কিন্তু ঘটে বুদ্ধি আছে। তিনি হঠাৎ একদিন পা হড়কে উঠানে পড়ে গেলেন। পায়ে এমন টান পড়ল, হাঁটতেই পারেন না। ফলে বিছানা হলো তাঁর সাময়িক ঠিকানা। কিন্তু ঘরের কাজ কি পড়ে থাকে? কিন্তু ভাই, ঘরের কাজ করবেটা কে? কেন, লিপি! কিন্তু লিপি না সন্তানসম্ভবা? তাতে কী! লুৎফা বেগমের মা, নানি, তিনি নিজে কি পেটে বাচ্চা নিয়ে এর থেকেও কঠিন কাজ করেননি? এই বেতমিজ একটুখানি কাজ দেখেই কি পোয়ানোর দোহাই নিয়ে পড়ল? স্বামীকে পেয়ে আহ্লাদ বেড়েছে?

গফুরও কিছু বলতে পারে না। তার অবস্থাটা এমনিতেই একটু নড়বড়ে। তা ছাড়া লিপির রান্না না করা, উঠান ঝাড়ু না দেওয়ার মানে হচ্ছে ভাঙা পা নিয়ে মার এসব করা। সে নিজে যে লিপিকে সাহায্য করবে, দুলাল মিয়ার সামনে সেটা কী করে সম্ভব? সারা দিন লোকটা ঘরে বসে লিপিকে পাহারা দেয়।

ও, আপনাদের বলা হয়নি, দুলাল মিয়ারও পায়ে সমস্যা। সেটা বহুদিনের। গঞ্জে তার তিনখানা দোকান। তা থেকেই আয় উপার্জন। খুব যে সচ্ছল অথবা অভাবী, তা নয়। মাঝামাঝি।

পা হড়কে পড়লেন লুৎফা বেগম আর লিপিরও সংক্ষিপ্ত সুখের দিন শেষ হলো। এখন কাজ। এবং কাজ।

এবং কাজ করতে করতে চোখে অন্ধকার দেখা। এবং হঠাৎ হঠাৎ শক্তি হারিয়ে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হওয়া। লিপি পেটে হাত রেখে একদিন বলল, বাপধন, আর তো পারি না।

এরপর সে মাটিতে শুয়ে পড়ল। তার চোখ ভেঙে ঘুম এল। ক্লান্তির ঘুম।

মায়াময় সন্ধ্যা। লুৎফা বেগম বিছানায় বসে নামাজ পড়ছেন, দুলাল মিয়া পা টেনে টেনে গেছেন মসজিদে। গফুর যথারীতি গঞ্জের আড্ডায়।

লিপি মাটিতে শুয়ে। অন্ধকার আর মশা বিছিয়ে আছে তার চারপাশে। কোথায় যেন চাঁপা ফুটেছে—কোন সে চাঁপা গাছে। পাখি ডাকে, সে ডাকে করুণ ভাব নেই। দুই দিন আগেও যা ছিল। পাখির ডাকটা আনন্দের। যেন লিপির ঘুম ভাঙাচ্ছে।

একটা আস্ত চাঁদ ভাসতে ভাসতে এসে নোঙর ফেলেছে লিপির উঠানের ওপর। চাঁদের আলো সাদা, আর যেন শিশির দিয়ে ধোয়া। সেই আলোয় টিনের চাল, গাছপালা, খড়ের গাদা, পুঁইমাচা—সব যেন ঝকঝক করে। লিপির চোখে সেই আলো ঢুকে পড়ে। লিপি আস্তে চোখ মেলে। তার একটা হাত পেটের ওপর মেলা। সেই হাতটায় একটা দোলা যেন লাগল এবার। কেউ যেন আস্তে সেটি সরাল। তারপর তার পেটের ওপর উঠে এল ছোট্ট একটি হাত। তারপর ছোট্ট একটা শরীর। তারপর সেটি নামল মাটিতে। টলমল পায়ে একটুখানি সামনে গেল। তারপর যেন পায়ে অনেক শক্তি এল। একটা লাথি মারল উঠানে। তারপর পা-টা চিকন লম্বা হয়ে হঠাৎ বড় হতে লাগল। তারপর সেই পায়ের পাতায় একটা শাড়ির লাল পাড় এসে ঠেকল। সেই শাড়িটা ধরে লিপির অবাক চোখ আস্তে আস্তে ওপরে উঠল। শাড়ি, ব্লাউজের নিচের প্রান্ত। ছোট্ট সুন্দর দুটি স্তনের ডৌল, আঁচলের নিচে। তারপর সাদা হাসিতে উদ্ভাসিত একটা মুখ। কপালে লাল টিপ। বাতাসে উড়তে থাকা চুল। একটা হাত উড়তে থাকা চুলগুলো সমান করতে লাগল, আর লিপি দেখল, কী অসম্ভব সুন্দর চাঁপার মতো ওই হাতের আঙুল। লিপি নিশ্চিত হলো, মেয়েটি একটি পরি। কিন্তু পরি তাকে ইশারায় শুয়ে থাকতে বলে কোমরে আঁচল জড়াল। তারপর একটা ঝাড়ু নিয়ে নিমেষে উঠানটাকে সাফসুতরা করে ফেলল। তারপর সে রান্নাঘরে ঢুকল। বেরোল। দুটো কলসি নিয়ে পশ্চিমে চলে গেল। সেদিকেই চাপকল। ফিরল মাথায় ও কাঁখে কলসি দুটি নিয়ে। লিপির চোখ বুঁজে এল। নাহ্। এ রকম স্বপ্নের কোনো অর্থ হয় না। স্বপ্নটা তাকে জানিয়ে দিচ্ছে, এই কাজগুলো তার এখনো করা হয়নি। কিন্তু স্বপ্ন ভেঙে জেগে ওঠার আগে সে শুনল, মেয়েটি বলছে, মা তোমাকে উঠতে হবে না। কাজ যা করার সব করে ফেলেছি। আরও কিছুক্ষণ ঘুমাও। আমি ধুনা জ্বেলে গেলাম। মশা থাকবে না।

ধুনার গন্ধে চিৎকার শুরু করলেন লুৎফা বেগম। ওই বেতমিজ, ধুনা জ্বালাস ক্যান? চিৎকারটা এমনই, লিপিকে উঠতে হলো।

ধুনার চমৎকার গন্ধ। কেমন যেন আবেশ জাগায়। কখন ধুনা জ্বালল সে? আশ্চর্য। শাশুড়িকে কিছু একটা বলে বোঝাতে হয়। সে শাশুড়ির ঘরে ঢুকল। ঘর পরিপাটি। সেই পরিপাটি ঘরের দিকে চোখ পিটপিট করে তাকাচ্ছেন লুৎফা বেগম। কখন এসব করলা? তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

শাশুড়ির চা খাওয়ার বড়লোকি অভ্যাস। লিপি রান্নাঘরে গেল। রান্নাঘর-ভর্তি খাওয়ার গন্ধ। খিঁচুড়ি, মাছভাজা, লাল শাক। সর্বনাশ! এ রান্না কখন সে করেছে?

রাতের খাবার খেতে খেতে দুলাল মিয়া বললেন, রান্না তো উত্তম, কিন্তু বাজার করল কে?

লিপি বলল, শাক খেতের আব্বা। মাছটা পুকুরের।

কোন পুকুরের?

মিয়াবাড়ির।

মিয়াবাড়ির পুকুরে তুমি গেছ?

আমি যাই নাই আব্বা। পইন্নার মা আনছে।

দুলাল খুশি হলেন। ছেলে তাহলে খাওয়ার পয়সাটা দিচ্ছে।

অনেকগুলো দিন গেল। লুৎফা বেগমের পা ভালো হয়েছে। তার পরও লিপির কাজ কমে না। কিন্তু দিনে-রাতের একটা সময়, সে সময়টায় লিপি হয়তো একটা অপার্থিব ঘুমে যায়, চাঁদটা ঘন হয়ে আসে, অথবা ভোরের বাতাসে ফিসফিসানি ওঠে, অথবা দুপুরের বাতাসে ঝিম ধরে আলস্য ছাড়িয়ে পড়ে চারদিকে, তার ঘরের কাজগুলো সব সারা হয়ে যায়। এবং প্রতিবারই সেই পরির মতো মেয়েটি অমলিন হেসে তাকে বলে, তুমি বিশ্রাম নাও, মা। আমি আছি।

লুৎফা বেগমকে বাধ্য হয়ে তারিফ করতে হয় লিপির কাজের, যেহেতু দুলাল মিয়া তারিফ করেন, কিন্তু তাতে ভয় আর দুশ্চিন্তা বাড়ে লিপির। সে নিশ্চিত, পেটের বাচ্চাটি মেয়ে। সেই মেয়েই করে দিচ্ছে তার কাজগুলো। কিন্তু আসলেই কি নিশ্চিত সে? কাজগুলো কে করে? কার আছে এমন দ্রুত কাজ করার ক্ষমতা? এমন নিপাট কাজ করার দক্ষতা?

না, প্রশ্নটা আপনাদের জন্য না, আমাদের জন্যও না। আমরা জানি, এসব প্রশ্নের উত্তরে সাধারণ জ্ঞান বলবে, লিপি। অসাধারণ জ্ঞান বলবে, গফুর। যেহেতু মধ্যপ্রাচ্যে তাকে রান্না থেকে নিয়ে জুতা সেলাই—সবই করতে হয়েছে। কিন্তু সাধারণ-অসাধারণের বাইরে যদি কিছু থাকে, যেমন ধরুন পরাসাধারণ, তাহলে?

এসব প্রশ্নে না গিয়ে বরং লিপিকে দেখি। সে হঠাৎ পেটে হাত চেপে বসে পড়েছে। তার চোখ দিয়ে নামছে বর্ষার ঢল। এত কাঁদছে কেন লিপি?

কাঁদছে, কারণ, তার বিশ্বাস জন্মেছে, তার বাচ্চাটি মেয়ে। এবং এই মেয়ে যতই সুন্দরী হোক, যতই পরির মতো হোক, তার শরীর, তার চোখ যতই হরিণের চোখের মতো হোক, আঙুলগুলো যতই চাঁপাকলির মতো হোক, তার জীবন তো বাঁধা থাকবে সেই উঠান আর ঘর, রান্নাঘর আর চাপকল, শ্বশুর আর স্বামী, অমানুষিক কাজ আর শাশুড়ির বকাঝকার চৌহদ্দিতে। জীবনটা তাহলে কি একটা পাতকুয়া? পরিত্রাণহীন, উত্থানহীন এক অন্ধকার?

লিপির কান্না তার শরীরটাকে দুমড়ে দিচ্ছে। তার দুটি পা শরীরের ভার সইছে না। সে বারান্দায় পাতা মাদুরে শুয়ে পড়ল। তার হাঁসফাঁস লাগছে। বুকের কাছটা খুব ভার ভার মনে হচ্ছে। সে চিৎ হয়ে শুয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে থাকল। তার পেট থেকে শাড়িটা সরে পড়েছে। বিকেলের আলোয় পেটটা সাদা হয়ে ভেসে উঠেছে। তার সামনে দাঁড়িয়ে লুৎফা বেগমের মনে কোথাও যেন একটা গোপন পুলক জাগল। নিচু হয়ে তিনি দেখলেন, লিপির চোখ দুটি ঘোলাটে, সেগুলো যেন বুঁজে যাচ্ছে। হাত-পা অসাড়। শুধু ঘরঘর শব্দে নিঃশ্বাস পড়ছে। একটু যত্ন নিয়ে তাকালে কি মুখের পাশ দিয়ে ফেনা দেখা যাবে না? লুৎফা বেগম জানেন, এবার একটু খিঁচুনি শুরু হতে পারলে আর নিস্তার নেই।

দুলাল মিয়া লিপির পাশে বসলেন। তিনিও লিপির চোখ দেখছেন, ফেনা দেখছেন, কিন্তু তিনি প্রধানত দেখছেন লিপির উদলা পেট। সেখানে তিনি একটা হাত রাখলেন। ও মাইয়া, কী অইল? তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

কথাটা তিনি নিজেকেই বললে পারতেন। কারণ, তাঁর হাতটা একটা বিকট শব্দ করে যেন ভেঙেই গেল। তিনি ‘ওরে বাবারে’ বলে হাতটা অন্য হাত দিয়ে চেপে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর লুৎফা বেগমের কাঁধে নিজের ঘাড় ফেলে বললেন, আমার হাত ভাইঙ্গা গেছে। গফুররে ডাকো। ডাক্তারের কাছে চলো।

লুৎফা বেগম স্বামীকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তার চোখেমুখে অপার্থিব ভয়।

সুনসান উঠানে মাদুর পেতে বসে পেটে হাত রেখে অনেক দিন পর উচ্চ স্বরে হাসল লিপি। তার ভয়টা চলে গেছে। দুশ্চিন্তাও। সে নিশ্চিত, বাচ্চাটা মেয়ে। কিন্তু তাতে কোনো সমস্যা নেই। আসুক সে। আসুক; তার ভয় অথবা অভয়, সাহস অথবা অসাহস—সবকিছু নিয়েই আসুক। তাকে নিয়ে অত ভাবাভাবি সে করবে না। এমনকি, সে যে লাথি মেরে দাদার হাতটা ভেঙে দিল, তাতেও তার চিন্তার কোনো উনিশ-বিশ হবে না। কে লাথি খেল, কে লাথি দিল, এসব নিয়েও সে ভাববে না। এখন শুধু সে মেয়ের সঙ্গে গল্প করে বাকি সময়টা কাটাবে। বাকিটা মেয়েই দেখবে।

হাসতে হাসতেই পেটে হাত রেখে সে বলল, আমার মা রে, মা-ধন আমার।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন