শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০১৫

অব্যর্থ ব্যোমকেশ

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়

ব্যোমকেশ বক্সী ডিটেকটিভ নন। তিনি সত্যান্বেষী। ইংরেজি ১৯৩৩ সনের জানুয়ারি মাসে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় ‘সত্যান্বেষী’ নাম দিয়ে রহস্যভেদের এমনই একটি গল্প বা কাহিনি লিখলেন, যার ভাষা সাহিত্যের, বুদ্ধির বুনোট মানবিক। পড়লে মনে হয় সাহিত্য পড়ছি। এবং অজান্তে রহস্য কাহিনিতে ঢুকে পড়ছি। যিনি রহস্যভেদ  করে অপরাধীকে জালে গুটিয়ে আনছেন, সেই বোমকেশ বক্সীর বয়স ২৩/২৪।
শিক্ষিত, মেধাবী, সংযতবাক্‌, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন তিরিশের দশকের সহৃদয় এই বাঙালি যুবক নিজেকে; ডিটেকটিভ বলতে ভালোবাসে না। হ্যারিসন রোডে তার মেসের ঘরে ঢুকতে পেতলের নেমপ্লেটে লেখা থাকে—
ব্যোমকেশ বক্সী
সত্যান্বেষী
সেই শুরু। ১৯৩৩ সনে শরদিন্দুর বয়স ৩৪ বছর। তিনি নিজেও ছাত্রজীবনে কলকাতায় হ্যারিসনে রোডের মেসে থাকতেন। সত্যান্বেষী কমবেশি ৯০০০ শব্দের কাহিনি। সেখানেই শরদিন্দু তাঁর ব্যোমকেশ বক্সীকে সত্যান্বেষী হিসেবে বাঙালি পাঠকের হৃদয়ে খোদাই করে দিলেন। অবশ্য তার আগের বছর সনের জুলাইয়ে ব্যোমকেশকে নিয়ে তিনি পথের কাঁটা, ডিসেম্বরে সীমন্ত-হীরা নামে আরও দুটি কাহিনি লেখেন। বলা যায় বড়ো গল্প। কিন্তু বাঙালি হৃদয়ে ব্যোমকেশ বক্সীর সত্যান্বেষী হিসেবে অভিষেক সেই ১৯৩৩ সনের জানুয়ারিতে— বাং‌লা ১৩৩৯ সনের মাঘ মাসে।
১৯৩২ থেকে ১৯৩৭ সনের ভেতর (বাংলা ১৩৩৯ থেকে ১৩৪৩) শরদিন্দু ব্যোমকেশকে নিয়ে দশটি কাহিনি লেখেন। কোনওটি গল্প, কোনওটি বড়ো গল্প, কোনওটি আবার সুদীর্ঘ গল্প। এরপর ১৫ বছর তিনি আর ব্যোমকেশকে নিয়ে কিছু লেখেননি। ব্যোমকেশে হাতই দেননি। বিদ্যাসাগর কলেজে পড়ার সময় সহপাঠী ছিলেন পরিমল গোস্বামী মহাশয়। তখন ওঁদের ভেতর পরিচয় ছিল না। ১৯৫০/৫২ সনে কলকাতায় পরিমলবাবুর বাড়িতে বেড়াতে এলে তাঁর ছেলেমেয়েরা—তাদের ভেতর আমাদের বন্ধু সাহিত্যিক হিমানীশ গোস্বামীও ছিলেন—দাবি করে—আপনি আর ব্যোমকেশকে নিয়ে লিখছেন না কেন? লিখুন। বোমকেশকে নিয়ে ফের কলম ধরলেন শরদিন্দু ১৯৫১/৫২ সনে। ১৯৭০ সনের সেপ্টেম্বরে শরদিন্দুবন্দ্যোপাধ্যায় প্রয়াত হন। সব মিলিয়ে ৩২টি ব্যোমকেশ কাহিনি তিনি লিখে গেছেন। একেবারে শেষের লেখাটি ‘বিশুপাল বধ’ তিনি শেষ করে যেতে পারেননি।
সত্যান্বেষী গল্পের শুরুটা এইরকম, “সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সীর সহিত আমার প্রথম পরিচয় হইয়াছিল সন তেরশ’ একত্রিশ সালে। তখন মেসে খোরাকি বাবদ মাসে দিতে হয় ২৫ টাকা।” আর লেখাটি ছাপা হয়েছিল ১৩৩৯ সনের মাঘ মাসে—ইংরেজি ১৯৩৩ সনের  জানুয়ারিতে। তার মানে সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সীর রহস্যাভেদী বুদ্ধির খেলাধুলোর শুরু ১৯২৫ সনে কলকাতার এক মেসবাড়িতে। তখনও স্বাধীনতা আসতে বাকি ২২ বছর। সত্যান্বেষী গল্পটিতে ব্যোমকেশের বয়স বলা হয়েছে ২৩/২৪। তার মানে এই শতাব্দীর গোড়ায় ব্যোমকেশের জন্ম। শরদিন্দু নিজেও জন্মেছেন ১৮৯৯ সনে। ১৩৭৫ সনের ৪ কার্তিক আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে শরদিন্দু বলেছিলেন, ব্যোমকেশ বক্সী আমার self-projection—  ১৬/১৭ বছর বয়স থেকে ডিটেকটিভ গল্প পড়ি। গুলিগোলায় বিশ্বাস করি না। ব্যোমকেশকে আমি ইন্টেলেকচুয়াল লেভেলে রাখতে চাই। পাঠক সামাজিক কাহিনি হিসেবেও ব্যোমকেশের কাহিনি পড়তে পারেন। কোনান ডয়েল, জ্যাক লন্ডন পড়ে জাতিস্মর, অতীত নিয়ে লেখার ইচ্ছা জাগে। এডগার অ্যালান পো, কোনান ডয়েল, চেস্টারটন যা লিখাতে পারেন, তা লিখতে আমার লজ্জা নেই। ডায়েরিতে শরদিন্দু লিখছেন – ‘এডগার ওয়ালেস, আগাথা ক্রিস্টির সাহিত্য অন্ত্যজ সাহিত্য নহে।’
১৯৩২/৩৩ সন থেকে ১৯৭০ সনে প্রয়াত হওয়া অবধি শরদিন্দু ব্যোমকেশ কাহিনি লিখেছেন। ওই ৩২টি কাহিনিতে ব্যোমকেশের বয়সও বেড়েছে। তার সহকর্মী অজিত তার বয়সি। তারও বয়স বেড়েছে। শার্লক হোমস কোনও মেয়ের জন্যে পাগল হননি। কিন্তু ব্যোমকেশ প্রেমে পড়ে সত্যবতীকে বিয়ে করেছে। ব্যোমকেশ শখের খেয়ালে সত্যান্বেষী। বিদেশি গোয়েন্দাদের মতো তার টাকা পয়সা হয়নি। সে শার্লক হোমসের মতো দারুণ বেহালাদার, নেশাখোর, বিজ্ঞান দক্ষ নয়। তবে চটিয়ে দিলে ব্যোমকেশের শানিত বুদ্ধি বেরিয়ে পড়ে। শার্লক হোমসের সঙ্গী ডক্টর ওয়াটসন। তাদের ভেতর বয়সের বেশ ফারাক। ব্যোমকেশের সঙ্গী অজিতের সমবয়সি। তার বাবা যা টাকা রেখে গিয়েছেন, তার সুদে অজিতের ভালোই চলে যায়।
জৌনপুরে দাদামশায়ের বাড়িতে ১৮৯৯ সনের ৩০শে মার্চ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম। আদি বাড়ি বরানগরে কুঠিঘাঠে। ঠাকুর্দা পূর্ণিয়াতে সেরেস্তাদার ছিলেন। বাবা তারাভূষণ জোড়াসাঁকোয় সরলা দেবীর সঙ্গে একসঙ্গে গান শিখেছেন। তারাভূষণ মুঙ্গেরে ওকালতি করতেন। মায়ের কাছ থেকে শরদিন্দু সাহিত্যের স্বাদ পান। মুঙ্গের জেলা স্কুল থেকে পাস করে ১৯১৫ সনে কলকাতায় বিদ্যাসাগর কলেজে ভর্তি হন। নেশা ছিল হকি, ফুটবল, থিয়েটার, হারমোনিয়াম বাজানো। পাটনা থেকে ১৯২৬ সনে আইন পাস করেন। সন থেকে লিখতে শুরু করেন। কবিতা। ১৯৩০ সনে প্রথম গল্প—রক্তসন্ধ্যা। ১৯৩৩ সনে প্রথম গল্পের বই জাতিস্মর। তারপর বিষের ধোঁয়া।
বম্বে টকিজের হিমাংশু রায়, দেবীকারানী লেখক খুঁজছিলেন। হিমাংশু রায়ের ভগ্নীপতি দার্শনিক সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত তারাশঙ্করকে মনোনীত করেন। তারাশঙ্কর যাননি। বম্বে  (মুম্বই) গেলেন শরদিন্দু। ১৯৩৮ সনে। ওঁদের সঙ্গে ছিলেন ১৯৪২ অবধি। তারপর থেকে পর্যন্ত শরদিন্দু স্বাধীনভাবে চিত্রনাট্য লিখতে লাগলেন।  ১৯৫২ সনে সিনেমার সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়ে তিনি চলে এলেন পুনায়। সেখানে বাড়ি করলেন ১৯৫৩ সনে। তখন তিনি পুরোদস্তুর সাহিত্যচর্চায় ডুব দেন। ১৯৭০ সনে প্রয়াত হওয়ার আগে শেষবার ওই বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চে কলকাতায় এসে মাসখানেক ছিলেন।
ততদিনে তাঁর কলমে তৈরি ব্যোমকেশ বক্সীর বয়স হয়েছে। সঙ্গী অজিতেরও বয়স হয়েছে। বয়স হয়েছেব্যোমকেশসঙ্গিনী সত্যবতীর। কাহিনির চালও বাঙালি মনকে জয় করে নিয়েছে। তাঁর বিখ্যাত কয়েকজন ভক্তের ভেতর ছিলেন তুষারকান্তি ঘোষ, অশোককুমার সরকারের মতো বিখ্যাত দুই সম্পাদক, অধ্যাপক সুকুমার সেন, অধ্যাপক প্রতুল গুপ্ত— কে নন? ব্যোমকেশ কাহিনি আলাদা আলাদা ছোটো ছোটো বই হয়ে বেরিয়েছে। ফুরিয়ে গেলে ১৯৭০/৭১ সনে দুই খণ্ডে শুধু ব্যোমকেশকে নিয়ে শরদিন্দু অমনিবাস বেরোয়। প্রথম খণ্ডটির ৩৩টি সংস্করণ হয়। দ্বিতীয়টির হয় ২২টি সংস্করণ। তারপর বছর তিনেক হল একটি খণ্ডে ব্যোমকেশ সমগ্র বেরিয়েছে। তারও মুদ্রণ ১৫০০০ কপি। মনে হয় ফুরিয়ে আসার পথে।
বাংলায় আদিযুগে প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় লিখতেন ‘দারোগার দফতর’। সে বই আমি বারাসতে শিশিরকুঞ্জে তুষারকান্তি ঘোষের ব্যক্তিগত সংগ্রহে দেখেছি। হলুদ হয়ে আসা পাতা। বড়ো বড়ো কাঠের টাইপে বইয়ের নাম। আমাদের  ছোটোবেলাতেও দীনেন্দ্রকুমার রায়ের গোয়েন্দা রবার্ট ব্লেক হাতে এসেছে। তাঁর ভালো লেখা পল্লীচিত্র রবার্ট ব্লেকের ভারে তলিয়ে গেছে। শোনা কথা, তিনি অরবিন্দের গৃহশিক্ষক ছিলেন। সত্যি কিনা জানি না।
একসময় হেমেন্দ্রকুমার রায়ের অভিযান ঘেঁষা যখের ধন, আবার যখের ধন গপ গপ করে গিলেছি। সেখানে সব্যসাচীর মতো দক্ষ বিমল ও কুমার। দারোগা সুন্দরবাবু প্রায়ই এই বলে হুংকার দেন— হুম। একটি কুকুরও ছিল। নামটি মনে নেই।
পাঁচকড়ি দে-র 'নীলবসনা সুন্দরী' কে না পড়েছে একসময়। তাঁর গোয়েন্দার নাম অরিন্দম বসু অরিন্দমের সঙ্গী তার নাতজামাই দেবেন্দ্রবিজয় মিত্র, যিনি কিনা ধুতির ওপর কোট গায়ে ডার্বি শু পরে বেরোন। চড়েন ছ্যাকরা গাড়ি। পায়ে থাকে সিল্কের মোজা। প্রেমেন্দ্র মিত্র ঘনাদাকে আনার আগে এনেছিলেন পরাশর বর্মাকে। যিনি কবিতা লেখেন এবং মনে করেন তিনি একজন গোয়েন্দা। এই সব গল্প উড়ে গেল ডা. নীহাররঞ্জন রায়ের কালো ভ্রমর, কিরীটি রায়ের ধাক্কায়। কিন্তু সে সব কাহিনি বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার আর তত স্বাদু মনে হয়নি। এ সব কাহিনিতে খুন, কেমিকেল অস্ত্র, শুধুই ডিটেকশন ক্লান্ত করে দিল। নিরন্ধ্র গল্প সামাজিক জীবনের মানবিক দিক থেকে দূরে সরিয়ে শুধুই বুদ্ধির প্যাঁচ দেখায়। তাতে আরাম পাই না। ক্লান্তি আসে। আকর্ষণ কমে যায়। অনেক লেখক ভুলে যান, খুনিও একজন মানুষ।
বৃটিশ শাসন পত্তন হওয়ার পর জন কোম্পানির বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির ভেতর বিহার ছিল দীর্ঘকাল। এই শতাব্দীর প্রথম দশকের পরেই বিহার আলাদা হয়ে যায়। তার অনেক আগেই অনেক বাঙালি বিহার, এখনকার উত্তরপ্রদেশ, ওড়িশা, আসামে যান। খনিতে, আদালতে, কলেজে, হাসপাতালে, ব্যবসায়। সেটা ছিল যেন ভাগ্য ফেরাতে যাওয়ার অভিযান। কেউ গিয়েছিলেন ব্রাহ্মধর্ম প্রচারে। কেউ গিয়োছলৈন ব্রিটিশ আর্মির মিলিটারি কমিসারিয়েটে। রবীন্দ্রনাথের ছোটোগল্পে কমিসাবিয়েটে বাঙালি চাকুরের দেখা পাই। এই সব পরিবারকে নিয়ে এই শতকের গোড়ার দিকে দুই খণ্ডে একটি বই প্রকাশিত হয়েছিল। দিকপাল ডাক্তার, সাহিত্যিক, ব্যবসায়ী, ব্যবহারজীবী, রাজনীতিক— এই সব অভিযাত্রী বাঙালি পরিবার থেকে বরিয়ে এসেছেন। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় তেমনই এক পরিবার থেকে এসেছেন। নানা দিকে তাঁর আগ্রহ এবং অভিনিবেশ ছিল।
সংস্কৃতসাহিত্য ভালোবাসতেন। প্রিয় কবি কালিদাস। একবার পা ভেঙে নার্সিংহোমের খাটে শুয়ে শুয়ে শরদিন্দুর ‘কালের মন্দিরা’ পড়ি। পড়তে পড়তে বাববার ভবেছি, সংস্কৃতে কতটা দখল থাকলে এমন বাংলা লেখা যায়। বিভূতিভূষণের আরণ্যক পড়েও একই কথা ভাবতে হয়েছে। শরদিন্দু বৌদ্ধযুগ নিয়ে মাথা ঘামাতেন। মাথা ঘামাতেন এ দশে পর্তুগিজদের আগমন নিয়ে। আসলে গল্পে ইতিহাসকে রিমেক করে তিনি আনন্দ পেতেন। আবার ভূতের গল্পেও তিনি অনায়াস বোধ করতেন। সেরকমই বরদার সঙ্গে তাঁর ব্যোমকেশ এসেছে। স্পষ্টই বলেছেন, বঙ্কিমচন্দ্র আমার আদর্শ। শিল্পে ব্রেভিটি’ প্রধান কথা। তাঁর প্রিয় লেখক ছিলেন রাজশেখর বসু। অসম্ভব আগ্রহী ছিলেন প্রত্নবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যায়। জেমস জিনস থেকে মর্টিমার হুইলারে ছিল তাঁর যাতায়াত। স্বচ্ছ, পরিমিত, অনায়াস সুন্দর ভাষার মতোই তাঁর পরিচিত হাসিমুখ ছবিটি বলে দেয়, এই মানুষটি প্রসন্ন মনে কঠিন কঠিন জট ব্যোমকেশ বক্সীকে দিয়ে খোলাতে পারেন— সহজেই সমাধান খুঁজে বের করিয়ে আনতে পারেন।
বাংলা গোয়েন্দা কাহিনির গোড়ার দিককার অনেক গল্পই ছিল ইংরেজি গোয়েন্দা গল্প থেকে নেওয়া। নাম পালটে, দেশি পোশাক পরিয়ে, দেশি কাণ্ডকারখানার ভেতর সাহেব গোয়েন্দাকে নামিয়ে দেওয়া হত। তার ভেতর থেকে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের গন্ধ পাওয়া যেত। যেমন ধরা যাক গোয়েন্দা দেবেন্দ্রবিজয় মিত্রকে। তিনি ধুতির সঙ্গে শক্ত কলারের শার্ট পরে তার ওপর কোট চাপিয়েছেন। সিল্কের মোজা পরে তবে ডার্বি শু পায়ে দিয়েছেন। নীহাররঞ্জন রায়েব ‘কালো ভ্রমর’ একদা খুব জনপ্রিয় ছিল। বলছি ৫০/৬০ বছর আগের কথা। তখন স্কুলে পড়তাম। কালো ভ্রমর নদীপথে স্টিমারে বসে বেহালা বাজাচ্ছেন। খুব মুগ্ধ হয়েছি সেই বয়সে। পরে দেখেছি ইংরেজি গোয়েন্দা গল্পে কোনও কোনও বড়ো কালপ্রিট বেহালা বাজায়। চাঁদমারি করে। এ কথা বলে নীহাররঞ্জনের গল্প বলার টানকে ছোটো করতে চাই না। কিন্তু কেন যেন অন্য দেশের, অন্য জায়গার আদল পাই। কালো ভ্রমর কিংবা হেমেন্দ্রকুমারের যখের ধনের ভেতর গা ছমছম করানোর আয়োজন টের পাওয়া যায়। সেখানে ব্যোমেকেশ বক্সী আর পাঁচজনের মতোই জীবনযাপন করে। জীবনযাপনের ফাঁকে -ফোঁকরে তার তীক্ষ্ণ মেধা তাকে অনুসন্ধানের পথে ঠেলে দেয়।
হাসিঠাট্টা, বেড়াতে যাওয়া, প্রেম, বিয়ের ভেতর দিয়ে বয়স বাড়তে বাড়তে ব্যোমকেশের ডিটেকশন শক্তি তীক্ষ থেকে তীক্ষতর হয়েছে। ধরাই যাক সত্যান্বেষীর হোমিওপ্যাথ অনুকূলবাবুকে। তিনি অল্প পয়সার হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করেন। বই পড়ে পড়ে তিনি ডাক্তার। আবার নিজের বাড়িতেই পরিপাটি করে মেস চালান ও গোপনে কোকেন বিক্রি করেন। যে তা জেনে ফেলে তাকে তিনি খুন করবেনই। বাইরে থেকে নিপাট ভালো মানুষ অনুকূলবাবুকে সন্দেহ করার কোনও রাস্তাই নেই। কাছাকাছি কেউ খুন হলে তিনিই অনুসন্ধানীর মতো বিজ্ঞভাবে বলেন, হয়তো কোকেন বিক্রির ব্যাপারটা জেনে ফেলেছিল, তাই লোকটাকে খুন হতে হল। কাছেই কোথাও নিশ্চয় কোকেন বিক্রি হয়।
এমন অনুকূলবাবু ধরা পড়ে যান, যখন তিনি নিজেই বলে ওঠেন— তাই তো! অশ্বিনীবাবুর ঘরের দরজায় তো ইয়েল তালা লাগানো। বাইরে থেকে টেনে দিলে দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তখন ঘরের ভেতর থেকে না খুললে দরজা খোলে না।
অনুকূল ডাক্তার বুঝতে পেরেছেন— ব্যোমকেশ বক্সী তাকে সন্দেহ করেছে। তাই ব্যোমকেশ মাথা ধরার ওষুধ চাইলে তাকে ঘুম পাড়ানোর জন্যে হোমিওপ্যাথির ওষুধ হিসেবে মরফিয়ার গুঁড়ো দেন এবং ব্যোমকেশকে খুন করতে এসে ধরাও পড়ে যান। কারণ, ব্যোমকেশ সে ওষুধ খায়ইনি। সে আন্দাজ করে তৈরি হয়েই ছিল।
কিন্তু এ তো গেল শিকার ধরা। সেখানে শরদিন্দু পাহাড়ি চিতার মতো ক্ষিপ্রগতি। কিন্তু যেখানে ডিটেকশন, যেখানে পরিবেশ কিংবা গল্পের বুনোন, সেখানে তো খাঁটি সাহিত্যরসের স্বাদ। দুর্গরহস্য কাহিনিতে বেদেদের প্রতিশোধ নেওয়ার একটি বিবরণ পাই। বনভোজনে গিয়ে একটি মেয়ে সাপের কামড়ে জঙ্গলের ঘাসের ওপর পড়ে আছে। গাছপালার আড়ালে। প্রতিশোধ ও আচমকা বিপর্যয়ের সে কী স্তব্ধ করে দেওয়া ডিটেলের কাজ। যেন ছবির মতোই সব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। সবই ঘটে গেল এক ঝলকে। পড়তে পড়তে এক ঝটকায় চুপ করে যেতে হয়। এই বত্রিশ কাহিনির অনেকণ্ডলোই পড়া ছিল। ফের হাতে নিয়ে অনেকদিন পরে মনে হল— ব্যোমকেশ বক্সী তো বাসি হয়ে যায়নি। দিন যায়। বয়স বাড়ে। ব্যোমকেশের ওয়াটসন— অজিতেরও বয়স বাড়ে। সে যে ব্যোমকেশের সুবল সখা। বন্ধুর কীর্তি লিখে লিখে অজিত তার শার্লক হোমসকে বিখ্যাত করে তুলেছে। গদ্যে কোথাও বাড়তি মেদ নেই। অভিনব কল্পনাশক্তি— সেই সঙ্গে বিচিত্র পড়াশুনো শরদিন্দুর। নইলে আজ থেকে ৬৫ বছর আগে লেখা ‘মাকড়সার রস’ কাহিনিতে Tarantula Dance-এর প্রসঙ্গ তুলে লাটিন আমেরিকায় একরকমের মাকড়সার বিষ খেয়ে অবিরাম নাচের নেশার কখা তোলেন কী করে? পড়াশুনো, সেই সঙ্গে কল্পনাশক্তি, তারপর ভাষা— এ সবের সঙ্গে  মিশেছে স্থিতধী রসিক এক মন। অকালবৃদ্ধ, ধনী, লম্পট নন্দদুলালবাবুর চরিত্রটি যেন ছাপার কালো অক্ষর দিয়ে সাদা পাতায় খোদাই করা ছবি। একটি লাইন তো ভোলা যায় না— তুলা শুনিতে নরম কিন্তু ধুনিতে লবেজান।
অব্যর্থ, অমোঘ কথা ছাড়া তিনি এমন আর কিছুই লিখতে চাননি।
প্রথম মহাযুদ্ধ শেষ হলে শরদিন্দুর বয়স হয়েছিল প্রায় কুড়ি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় তিনি চল্লিশ। এই সময়কার বাঙালির মাথার পিছনে ফেলে আসা উনিশ শতক। কলকাতা আর ভারতের রাজধানী নয়। তীক্ষ্ণবাঙালি যুবকের কাছে যা যা আশা করা যায়, সেই আদলে তিনি ব্যোমকেশ বক্সীকে কাহিনির পর কাহিনিতে গড়ে তুলেছেন। তার সামনে পড়ে আছে আধখানারও বেশি আস্ত একটি শতাব্দী। যার ভেতর অনেক আশা। সম্ভাবনা। এবং সংশয়ও বটে। এ সব কিছুর দিকে যেন পেছন ফিরেই তিনি নিরন্ধ্র কাহিনি লিখে গেছেন। নিরন্ধ্র হলেও ব্যোমকেশ কাহিনির পরতে পরতে বাঙালি জীবনের নানান খুঁটিনাটি উঠে এসেছে। যেসব খুঁটিনাটি এখন পড়তে বসে দেখছি হারিয়ে গেছে। তাই যেন ব্যোমকেশকে বাঙালির আজ আরও নিজের মনে হচ্ছে। মেসবাড়ি, সন্ধে হলে রাস্তায় গ্যাসের আলো, বড়ো ফটকওয়ালা বাড়ির গেটে দারোয়ান, সস্পন্ন বাড়িতে হাউস ফিজিসিয়ান— সেসব গেল কোথায়? ব্যোমকেশের যত কাছে যাই, ফিরে ফিরে পড়ি, আর ওদের দেখা পাই।
আকাশে উড়তে উড়তে পাখি নীচের পৃথিবীর অনেকটা একসঙ্গে দেখতে পায়। কাহিনি লিখতে বসে শরদিন্দু এমন নিশ্চিন্ত, কোনও তাড়াহুড়ো নেই— যেন গোড়াতেই কাহিনির সবটা তিনি দেখতে পাচ্ছেন, যেনবা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন।
উৎসঃ বর্তমান প্রবন্ধটি সমীর চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ও পরম্পরা প্রকাশিত ‘জীবনরেণুর কারিগর’ নামক গ্রন্থ থেকে শ্রী সমীর চট্টোপাধ্যায়ের অনুমতিক্রমে গৃহীত।

লেখক পরিচিতি - শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়- (১৯৩৩ – ২০০১) প্রখ্যাত বাংলা সাহিত্যিক। বহু উপন্যাস ও ছোট গল্পের স্রষ্টা। সাহিত্য আকাদেমী পুরস্কার পান ১৯৯৩ সালে ‘শাহজাদা দারাশুকো’ উপন্যাসের জন্য। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখার ভূগোল কখনো একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে থেমে থাকেনি। আকাশ চাটা বাড়ির হাই এক্সিকিটিভ থেকে শুরু করে ইঁদুরের গর্তের ধান চুরি করা মানুষও তাঁর বিষয় হয়েছে। প্রেমে এবং প্রেমহীনতায়, বিষাদে এবং আনন্দে তিনি সব্যসাচী। জীবনের নানা বাঁকে লুকিয়ে থাকা মজা, বিপন্নতা, আলো-অন্ধকারে তিনি সমান সাহসী, একই রকম বেপরোয়া – এসবই তাঁর লেখায় উঠে এসেছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন