শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০১৫

কথাসাহিত্যিক অমর মিত্রের সঙ্গে আলাপ



বরেণ্য কথাসাহিত্যিক অমর মিত্র থাকেন ইন্দ্র বিশ্বাস রোডে, কলকাতায়।  বাংলাদেশের সাতক্ষীরায়, ১৯৫১ সালের ৩০ আগস্ট তাঁর জন্ম। অসংখ্য দ্যুতিময় ছোটোগল্প আর উপন্যাসের লেখক তিনি। 'মেলার দিকে ঘর' নামক গল্প দিয়ে তার লেখক জীবনের শুরু। প্রথম গল্পের বিষয় 'ক্ষুধা'। ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয়। সমাজের নিম্নবর্গীয় লোকেরা দিনে দিনে আরও পতনের দিকে যাচ্ছে, আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে বিত্তশালী ব্যক্তিরা। এরকম সমাজ বাস্তবতা নিয়েই তিনি লিখতে শুরু করলেন। তাঁর মতে, 'আমার মত করে এই পৃথিবীটাকে দেখতে পাচ্ছে কে?
আমি বরং লিখেই যাই। আমি বরং আমার ক্ষুদ্র ক্ষমতাটুকু ব্যবহার করে চাষিবাসী বিপন্ন মানুষের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করি।' লিখেছেন দু'হাত ভরে। গল্প। উপন্যাস। প্রথম উপন্যাস 'নদীর মানুষ'। রচনাকাল- ১৯৭৮। এই বছরই বের হয় 'মাঠ ভাঙে কালপুরুষ'। প্রথম গল্প সংকলন। 'স্বদেশযাত্রা' নামক ছোটোগল্পের জন্য ১৯৯৮ সালে পেয়েছেন সর্বভারতীয় 'কথা' পুরষ্কার। তাঁর অনেক গল্পই মঞ্চে অভিনীত হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা হল- পিঙ্কি বুলি, দামিনী হে। 'পাসিং শো' নামের আরও একটি প্রযোজনা মঞ্চস্থ হবে ২০১৫ সালের নভেম্বরে। ১৯৯৯ সালে লেখেন 'অশ্বচরিত'। এই উপন্যাসখানি ২০০১ সালে বঙ্কিম পুরস্কার লাভ করে। ২০০৬ সালে পেয়েছেন সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার, ধ্রুবপুত্র উপন্যাসের জন্য। ২০১৪ সালে দেশভাগ আর কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবন নিয়ে লিখেছেন উপন্যাস 'দশমী দিবসে'। আর এখন লিখছেন ছিটমহলের বেদনা নিয়ে উপন্যাস 'কুমারী মেঘের দেশ চাই'।
এই সময়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই লেখকের সঙ্গে কথা বলেছেন জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা, মেহেরুন্নেসা মৌ এবং এমদাদ রহমান। 






এমদাদ রহমান : আপনার জন্ম বাংলাদেশের এক গ্রামে, সেই গ্রামের নাম ধূলিহর। আমি মনে মনে বেশ কয়েকবার এই শব্দটি উচ্চারণ করলাম। ধূলিহর। ধূলিহর। আপনার মুখে এই গ্রাম সম্পর্কে জানতে চাইছি। কেমন ছিল এই গ্রামটি? 
অমর মিত্র : আমার জন্ম ১৯৫১ সালের ৩০ শে আগস্ট, ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি ধূলিহর গ্রামে। ধূলিহর গ্রামকে আমরা ডাকতাম ধুরোল বলে।  ধূলি গ্রাম তখন পূর্ব পাকিস্তানের খুলনা জেলায়, অধুনা বাংলাদেশের সাতক্ষীরে উপজেলায়। সাতক্ষীরে শহর থেকে দু-আড়াই কিলোমিটারের বেশি হবে না। দেশ তখন ভাগ হয়ে গেছে। যতটা শুনেছি বা আমার অগ্রজ মনোজ মিত্রর লেখায় পড়েছি-- বাবা ছিলেন ওই গ্রামের প্রথম বি. এ. পাশ। ডিস্টিংশন ছিল তাঁর। অংক বাদ দিয়ে সাহিত্যের বিষয়, ইংরেজি, বাংলা, সংস্কৃত আর ইতিহাস দর্শন-এ প্রবেশিকা পরীক্ষায় লেটার মার্কস পেয়েছিলেন। তাঁর সেই মার্কশিট আমি দেখেছি। সেই ধূলি হরে একটি প্রাইমারি স্কুল স্থাপন করেন বাবা। সেই ইস্কুলে আমি ২০০০ সালে গিয়েছি। পরিচয় পেয়ে ইস্কুলের হেড মাস্টার মোজাহার শানা ইস্কুল ঘরে বসিয়ে আলমারি খুলে ১৯৩৮ সালের রেজিস্টার বের করে আমার বাবার স্বাক্ষর দেখিয়েছিলেন। ১৯৪৪-এ আমার বড়দা (মনোজ) এবং মেজদা (মেজকাকুর বড় ছেলে রণজিৎ) যে ওই ইস্কুলে ভর্তি হয়েছিল এডমিশন রেজিস্টার খুলে তা দেখিয়েছিলেন। দেখতে দেখতে আমি আমার জন্মের আগের পৃথিবীতে পৌঁছে গিয়েছিলাম যেন! 
ধূলিহরের ডাকনাম ধুরোল। আমরা ছিলাম সাধারণ রায়ত। খুব বেশি জমি ছিল না মনে হয়, চলে যায়, অভাব ছিল না মনে হয়। জমিজমার কিছুটা গিয়েছিল আমার ঠাকুরদা অন্নদাচরণ মিত্রের চিকিৎসায়। তিনি ছিলেন অসুস্থ মানুষ। অল্প অল্প মনে আছে ভোরে ঘুম থেকে উঠে হাতনেতে রাখা নির্দিষ্ট চেয়ারে এসে তিনি বসতেন। বসেই থাকতেন। মাঝে মধ্যে মাছের খারা হাতে বাজারে যেতেন। বাজারটা কাছে পিঠেই ছিল। আমার তেমন কিছু মনে নেই। মনে আছে অনেকগুলি পুকুরের কথা, বাড়ির সামনে একটা বড় পুকুর, সেই পুকুরে জল ছিল না বেশি, পুকুরের ওপারে আমার ছোট কাকিমার মামার বাড়ি, ধর বাড়ি। মনে আছে, একবার ওই বাড়ির কেউ একজন বৃদ্ধ মারা গিয়েছিলেন। মায়ের সঙ্গে আমি দেখতে গিয়েছিলাম। বাঁশের চালিতে শোয়ান রয়েছে মৃত দেহ। আর রোখ ছেড়ে কাঁদছে নানা বয়সের নারী। সেই কান্নার কথা মনে গেঁথে আছে আমার। ওই বোধ হয় প্রথম মৃত্যু দর্শন। কোন সাল হবে তা? চুয়ান্ন-পঞ্চান্ন বোধ হয়। আর একটি কথা মনে আছে, সেই বয়সের কথা। একটি চার পাঁচ মাসের নষ্ট হয়ে যাওয়া ভ্রূণ আমি কার কার সঙ্গে গিয়ে যেন বাড়ির পিছনের বাগানে পুতে দিয়ে এসেছিলাম। আমি সঙ্গে ছিলাম। সে ছিল মেঘময় দিন। বাগানে বা বাদাড়ে ছিল বড় বড় মানকচু গাছ। মানকচুর পাতা হয় মস্ত। বর্ষায় এই পাতা মাথায় দিয়ে গরিব চাষাকে আত্মরক্ষা করতে দেখেছি। হ্যাঁ, ওই ভ্রূণ মাতৃগর্ভের আশ্রয়ে ন'মাস কাটাতে পারলে আমার একটি ভাই হত। কতকালের কথা, মনে আছে।
আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম সেই মানুষের আকৃতি পাওয়া ভ্রূণটিকে। তখন ভ্রূণ নষ্ট হয়ে যাওয়া আর শিশু মৃত্যু ছিল সাধারণ ঘটনা যেন। মায়েরা ছিলেন সর্বংসহা। আমার একটি দিদি ছিল, তাকে আমি দেখিনি। তার জন্য মাকে কাঁদতে দেখেছি। নাম ছিল ডিলডিল। আমার মা, আমার মেজদা উদয়ন বলতেন সে ছিল খুব সুন্দর। এপারে কলকাতার বেলেঘাটার বাসায় সে মারা গিয়েছিল ক'দিনের জ্বরে। আমার কেন তার কথা মনে নেই, আমি জানি না। আসলে পার্টিশন হওয়ার পর আমাদের পরিবার ঠিক করতে পারছিল না কোথায় থাকবে। ধূলি হরের সাতপুরুষের ভিটে ছিল, সাতক্ষীরে পার হয়ে সীমান্তের এপারে বশিরহাট শহরের লাগোয়া দণ্ডীরহাট গ্রামে জমি কেনা হয়েছিল কবে তা আমি জানি না। ধূলিহর খুব সাধারণ গ্রাম। কপোতাক্ষ ছিল কাছেই। কিন্তু আমি দেখিনি। দেখেছি সাতক্ষীরের নদী বেতনা। খালও হতে পারে তা। কিন্তু ঠাকুমা আর তাঁর বোনের সঙ্গে আমি গিয়েছিলাম কুকরুলি গ্রামে। সেখান থেকে ফিংড়ি। আমি ছোটবেলায় যে গ্রাম দেখেছি, ২০০০ সালে তা দেখিনি। সম্ভব নয়। যা কিছু বড় মনে হতো, সব আমার খুব ছোট লেগেছিল। সেই মাঠ, পুকুর। ছেলেবেলাকে দেখতে যাওয়া ঠিক না। ছেলেবেলার মানুষ, ছেলেবেলার গ্রাম। আমাদের সেই গ্রাম ছিল নানা কাহিনিতে ভরা। তার একটি হলো ভূত। কতরকম ভূতের গল্প যে শুনেছি! আমার ঠাকুমা বানিয়ে বানিয়ে বলতেন। আমার মা হু-বহু বলতেন তাঁর ছেলেবেলার কথা। স্টিমারের ভোঁ আর কপোতাক্ষ নদের কথা।      
     
এমদাদ রহমান : আপনার একটি স্মৃতিমূলক গদ্যে আছে, আপনি বলছেন-- 'আমার ছেলেবেলার সেই শান্ত কলকাতা অশান্ত হয়ে উঠতে লাগল। খাদ্য আন্দোলন। নকশাল আন্দোলনের ভিতর আমি বড় হয়েছি ভয়ে ভয়ে। আতঙ্কের ভিতর। কলেজজীবন, লিটল ম্যাগাজিন করা, করতে করতে চাকরি নিয়ে গ্রামে চলে যাওয়া, ভারতবর্ষকে দেখতে পাওয়া, জীবনের অন্য এক সঞ্চয়। লেখার ভিতরে ডুবে থেকে কখন যে এই বয়সে পৌঁছে গেছি জানি না। কিন্তু এখনো জীবন যে আরো কিছু দেবে তা আমি জানি। চার অধ্যায়, শৈশব কৈশোর যৌবন আর প্রবীনতা---এর বাইরে কত যে অধ্যায়, তার ঠিকানা নেই।'
এই যে সময়কে জন্ম নিতে দেখেলেন, কিংবা দেখলেন আমূল বদলে যেতে, যা একটি বিশাল অর্থে 'ভারতবর্ষকে দেখতে পাওয়া'... এ সম্পর্কে জানতে চাইছি। কী সেই পরিবর্তন? 
অমর মিত্র : কলকাতা আমার নিজের শহর। বেলগাছিয়া-পাইকপাড়া আমার নিজের পল্লী। আমরা ওপার থেকে আসা ছিন্নমূল মানুষ। কলকাতা আমাদের আশ্রয় দিয়েছিল। এই পাইক পাড়া বেলগাছিয়া অঞ্চল হল কলকাতার সেরা জায়গার একটি। এমন অবারিত সবুজ মাঠ, গাছগাছালি, মস্ত জলাশয়, এমন নির্জন পথ আর ভাল মানুষের বাস আর কোথায় আছে? এমন বড় বড় মানুষ কলকাতার কোথায় বাস করতেন?  তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, সজনীকান্ত দাস, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য... আমি কতজনের কথা বলব। কাজি নজরুল ইসলামের পায়ের ধূলিতে ধন্য হয়েছে এই এলাকা। আমি তাঁকে দেখিনি কিন্তু তাঁর পাশের মস্ত ফ্ল্যাট বাড়িটিতে পরম শ্রদ্ধেয় শিল্পী অন্নদা মুন্সি মশায়ের বাড়ির দরজায় এক সকালে কড়া নেড়েছি। বালকদের দেখে তিনি অবাক। হাসি মুখে ডেকে নিলেন ভিতরে। সেই প্রথম চিত্রকরের ঘরে প্রবেশ। রঙের ভিতরে প্রবেশ। তাঁর সেই ঘরখানিতে ছিল যেন রঙিন বাতাস। আমাদের বন্ধুর দাদা শ্যামল বরণ বালক লান্টু ওই ঝিলের জলে ডুবে গিয়েছিল ক'বছর আগে। তার নামে একটি পাঠাগার করব, শুধু ছোটদের বই থাকবে সেখানে, তিনি যদি একটি ছবি এঁকে দেন বা পোস্টার। তিনি তো এঁকে দিলেন, পয়লা বৈশাখের সকালে এসে উদ্বোধন করলেন সেই পাঠাগার। 
আমাদের সঙ্গে মিশে গেলেন বালকের মত। সেই আমার প্রথম আড্ডা বড় মানুষের সঙ্গে। হ্যাঁ, আমি এঁদের দেখতে দেখতে বড় হয়েছি আমার ছেলেবেলার এই কলকাতায় এই বেলগাছিয়ায়। ইস্কুলের বন্ধুরা গিয়েছিলাম অরবিন্দর সঙ্গে তার দাদা অনুপকুমারকে দেখতে। জানালা দিয়ে দেখছি তিনি বসে আছেন ভিতরে। এ হল মহার্ঘ স্মৃতি। সিনেমার মানুষ পর্দা আর পোস্টার থেকে ঘরের ভিতর। বিস্ময় যে যায় না। হ্যাঁ, সুখ্যাত নট প্রেমাংশু বসুকে দেখতাম ফোলিও ব্যাগ হাতে মাঠ পার হয়ে যাচ্ছেন এক নির্দিষ্ট সময়ে। তিনি হাতিবাগানের স্টার থিয়েটারে নিয়মিত অভিনয় করতেন। তাঁকেও তো সিনেমায় দেখেছি কত। আর একজনকে দেখতাম, আমাদের বাসাবাড়ি থেকে একটু ওপাশে থাকতেন। মস্ত দেহের অমর বিশ্বাস মশায়। তিনি উত্তম-সুচিত্রার সব ছবিতে থাকতেন ছোট একটি দৃশ্যে। 
ইন্দ্র বিশ্বাস রোডে আমাদের বাসা বাড়ি, সেখানে মস্ত টালা পার্ক। আগে যার নাম ছিল জিমখানা গ্রাউন্ড। একটা সময়ে বেঙ্গল জিমখানা নামের একটি ক্লাব কলকাতার ক্রিকেট ও ফুটবলে যে কোনও একটি ডিভিশনে খেলত। আমি ক্লাস ওয়ান-টু পড়িনি, একেবারে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হয়েছিলাম বেলগাছিয়ার মনোহর একাদেমিতে। তখন কলকাতার পাড়ার ইস্কুলগুলো ভাল ছিল। আমাদের ইস্কুলে ধনী দরিদ্র একসঙ্গে পড়ত। আমার এক সহপাঠীর বাবা ছিলেন ছুতোর মিস্ত্রি, তাদের পদবী ছিল সূত্রধর। এক মেধাবী সহপাঠীর বাবা আইসক্রিম গাড়ি ঠেলতেন। সেই সহপাঠী পরে অনেক বড় চাকরিতে ঢোকে। ইংরেজিতে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেত সে। নকশাল বাড়ির আন্দোলনে জড়িয়ে গিয়েছিল, জেল খেটেছিল। সে খুব সম্ভবত ফিজিক্স নিয়ে পড়েছিল। যখন আমি দেশ পত্রিকায় প্রথম লিখি সেই ১৯৮৩ তে, সেই গল্প পড়ে সে আমার বাড়ি এসেছিল একদিন সকালে। সে ছিল এক অমলিন শ্যামলা বালক, আমি ইস্কুলের কথা বলছি। আমাদের আর দুই সহপাঠীর বাবার মিষ্টির দোকান ছিল বাজারে। কিন্তু এখন বুঝি সেই দোকানটি ছিল বিষণ্ণতায় ভরা। পুঁজিপাটা ছিল না তেমন। এপাড়ার জলধর মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের কাছে দাঁড়াতেই পারত না। কিন্তু সেই দোকানের নিমকি আর হালুয়াতেই ছিল আমার অমোঘ আকর্ষণ। সেই মিষ্টির দোকান কবে উঠে যায় মনে নেই। মনে পড়ে তার শো-কেসে কিছুই নেই, শুধু শূন্য গামলা আর পুরোন রসের তলানি। আমাদের সেই দুই সহপাঠীর একজন হয়েছিল ট্রাম কোম্পানির ড্রাইভার। আর একজনকে দেখতাম বাজারে সবজি নিয়ে বসত। ক্লাসের এক সহপাঠীর ছিল জাহাজ। তাদের মস্ত চারতলা বাড়ি। সেই বাড়ির গায়ে ধবধবে শাদা রঙ। সে আমার পাশে বসত। এক সহপাঠীর বাবা স্টেটসম্যান পত্রিকার সাংবাদিক। একজনের বাড়ি পাইক পাড়া যেতে মন্মথ দত্ত রোডে মস্ত জাহাজের মত। বাড়িটার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। এই সব বন্ধুদের কথা বলা মানে কতরকম ছেলেরা আমরা বড় হতাম একসঙ্গে তা বলা। আমি যখন বড় হচ্ছি, তখন উত্তাল কলকাতা। ১৯৬৫ থেকে ৬৮ খাদ্যের দাবীতে আন্দোলন, নকশালবাড়ির কৃষক বিদ্রোহ। ঘরের ছেলেরা ঘর ছাড়ে। পুলিশি সন্ত্রাসে যে কতজন হারিয়ে যায়! কতজনকে পুলিশ নিয়ে গিয়ে মেরেই ফেলেছিল। নকশালবাড়ির আন্দোলন আমার জীবনকে প্রভাবিত করেছিল। আমি যখন লিখতে আরম্ভ করি, আমাদের সামনে ছিল রাজনৈতিক আন্দোলনে রাষ্ট্রযন্ত্র ভাঙার ডাক, শাস্ত্র বিরোধী লেখকদের গল্পের ফর্ম ভাঙার আন্দোলন, ক্ষুধার্ত পত্রিকার লেখকদের সব ঐতিহ্য অস্বীকারের অঙ্গীকার-- আমাকে সব কিছুই প্রভাবিত করেছিল। কিন্তু মনে হয়েছিল নিজের মত করে নিজেকে তৈরি করতে হবে। 
আমি গ্রামে গিয়েছি চাকরি নিয়ে উনিশ শো চুয়াত্তরে। এপ্রিল মাসে আমাকে যেতে হল মুল ভারতবর্ষে। ক-বছর আগে নকশাল আন্দোলনে আলোড়িত ডেবরা থানার এক গণ্ড গ্রামে। বাস থেকে নেমে কংসাবতী নদী পার হয়ে এক গ্রীষ্মের বিকেলে আমি বেডিঙ আর সুটকেস নিয়ে আমার হল্কা ক্যাম্পে পৌঁছলাম এক ঘণ্টা পনের মিনিট হেঁটে। চাকরিটা জরিপের কানুনগোর। সে ছিল প্রায় জনবিরল একটি আধ-পাকা বাড়ি। কাদামাটি আর ইটে গাঁথা দেওয়াল আর টালির চাল। ওইটি আসলে তহসিলদারের খাজনা আদায়ের কাছারি। দুটি ঘর আমার অফিসের জন্য। আমার সেই অফিস, সেই নির্জনতা, অধীনস্ত কর্মচারীদের সঙ্গে মেস করে থাকা, সকাল আর সন্ধ্যেয় অফুরন্ত অবসর নিয়ে আমি করব কী? গ্রামের মানুষের সঙ্গে আমার বন্ধুতা হচ্ছে। খুব গরিব গ্রাম। আর খুব সাধারণভাবে বেঁচে থাকা সেই সব মানুষের। আমি এই জীবনের সঙ্গে পরিচিত নই। বিস্ময় আর বিস্ময়। কৌতূহলে কতকিছু জেনেছি। ধান আর মানুষ। আকাশের মেঘ আর মানুষ। ভয়ঙ্কর গ্রীষ্ম আর মানুষ। বর্গা চাষি, খেতমজুর, ভূমিহীন চাষি, খাজনা আদায়ের ত'সিলদার। জমির প্রতি মায়া আর ভূমি-লিপ্সা, ভূমিক্ষুধা। আর নানা রকম বিপন্নতা। ১৯৭৪-এর সেই গ্রীষ্মে আমি একটি গল্প লিখি, মেলার দিকে ঘর। তা ছিল সেই করন্ডা বা ওই রকম কোনও গ্রাম থেকে কংসাবতী নদীর দিকে গ্রীষ্মদিনে যাত্রা। বাবা ও মেয়ে চলেছে সেই যাত্রায়। বালিকা কন্যাকে মেলা দেখানর নাম করে বেচতে নিয়ে যাচ্ছে বাবা সহদেব। সেই গল্প প্রকাশিত হল একাল পত্রিকায়। সেই গল্প প্রকাশের পর বিশিষ্ট নানাজনের কথা শুনে মনে হয়েছিল লিখতে পারব। আত্মবিশ্বাস জন্মাল। একাল পত্রিকা ছাপা হয়েছিল ৩০০ কপি। তা আর ক-জনের হাতে যাবে? মেলার দিকে ঘর গল্প পড়ে আমাকে কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায় কবিপত্রে লিখতে বলেন। মূলত কবিতার পত্র, কবিপত্রে তখন গল্প লেখকদের একটা জায়গা ছিল। আমি কবিপত্রে পুজোয় লিখি পার্বতীর বোশেখ মাস। সেই সময়ে পরিচয়ে একটি গল্প লিখি, শকুন্তলার জন্ম। ১৯৭৫-এ কবিপত্র একটি গল্প সংখ্যা করে, সেখানে মেলার দিকে ঘর আবার ছাপা হয়। মেলার দিকে ঘর গল্পেই প্রকৃত অর্থে ভারতবর্ষের দিকে আমার হাঁটা শুরু হল। হাঁটছি এখনও।                  

এমদাদ রহমান : মনে পড়ছে আপনার 'দশমী দিবসে' উপন্যাসটির কথা। উপন্যাসের শুরুর দিকের সেই কথাগুলি, সেই প্রস্তাবনা-- 'ঘুম থেকে উঠে দেখবে সব বদলে গেছে। খারাপ মানুষগুলোও ভালো হয়ে গেছে। মন থেকে উবে গেছে সমস্ত অন্ধকার। হ্যাঁ, ঘুম থেকে উঠে দ্যাখো মানুষ ভুলে গেছে ধর্মাধর্ম। সমস্ত সীমান্তের রেখা গেছে মুছে। ব্যাধ ভুলে গেছে নিপুন লক্ষ্য। মানুষ পেয়েছে পাখির স্বাধীনতা। ঘুম থেকে উঠে একদিন দেখো এমন হয়ে গেছে। এমন এমন...উপন্যাস লিখতে গিয়েই কি এই ব্যাপারটা মাথায় এল, এই যে মানুষ ভুলে গেছে ধর্মাধর্ম, সীমান্তরেখাগুলি মুছে গেছে... 
আমরা আসলে এখানে আপনার লেখক মনের বিশ্বাস অবিশ্বাসের বা বলতে পারি হয়ত এখানেই আপনি আপনার জীবনদর্শনকে পাঠকের কাছে উপস্থাপন করেছেন। এ ব্যাপারে কি আমাকে একটু বিস্তারিত বলবেন? 
অমর মিত্র : দশমী দিবসের ঐ অংশটিতে আবেগ কাজ করেছে। আর আবেগ না থাকলে কি লেখা হয়? তবে তা যেন আবেগ সর্বস্ব না হয়। দেশভাগ এক বেদনাদায়ক সত্য। এর পিছনে অনেক কারণ আছে। সবচেয়ে বড় বেদনা-- আমি বরিশাল, পটুয়াখালী, চট্টগ্রাম, হাতিয়া দেখতে পারব না ইচ্ছা মতো।  আমি যদি পেশোয়ার, করাচি, খাইবার গিরিপথ দেখতে পেতাম আমার উপন্যাস ধ্রুবপুত্র হয়তো আরও অন্যরকম হতো। দেশে দেশে সীমান্ত মানুষকে বন্দী করেছে এক অদ্ভুত ন্যাশানালিজমে। জাতীয়তা আমাদের পৃথিবীকে নষ্ট করেছে। বাংলাদেশ অন্যদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান অন্যদেশ। আমি স্বপ্ন দেখি বাহ্লিক দেশের। কোথায় আকশু নদী, আমুদরিয়া সিরদরিয়া, আমি তা এ জীবনে দেখব না। সে তো আফগানিস্তান পেরিয়ে। প্রাচীন পৃথিবীতে সীমান্ত ছিল না। পাসপোর্ট ভিসা ছিল না। তা থাকলে, ভাস্কো-দা-গামা, মারকো পোলোর পৃথিবীর কথা আমরা জানতে পারতাম না। ইতালো কালভিনোর ইনভিজিবল সিটিজ আমার প্রিয় উপন্যাস। কত নগর পরিভ্রমণ করেছেন মারকো, তা বিবৃত করছেন কুবলাই খানের নিকট। মহৎ লেখা। আর সেই উপন্যাসের নগরও কাল্পনিক সত্য। অন্তর্গত সত্য। আমার মনে হয় দেশ আলাদা না হলে, আমাদের অখণ্ডতা অনেক আশ্চর্য শিল্পের জন্ম দিতে পারত হয়ত। তবে এই বিষয়ে নিশ্চয়তা কিছু নেই। আমি যেখানে যেতে পারি না, তা আমার কল্পনায় আছে। দশমী দিবসে, ধনপতির চর, ধ্রুবপুত্র সেইভাবেই লেখা হয়েছে। আমার যে বেদনা দেশভাগে, তা আমার নয়। আমার মায়ের, বাবার, ঠাকুমা, ঠাকুরদার। তাঁদের বেদনাকে ধারণ করেছি আমি। আমি দেশভাগের পরে, ১৯৫১-য় জন্মেছি। আমার মা আমাকে তাঁর বাপের বাড়ি আর কপোতাক্ষ নদের কথা বলতেন। আমি তিন-চার বছর বয়সে কবে কপোতাক্ষ দেখেছি মনে নেই। তবে গ্রাম ধূলিহরের বাড়ি, উঠোন, পুকুর, সাতক্ষীরে শহরে বাবার মেজমামার বাড়ি-- সব আবছা মনে করতে পারি। মনে হয় দেশটা একসঙ্গে থাকলে বেশ হতো। প্রকৃত ভূমি সংস্কারে ভূমধ্যাকারী হিন্দুর ক্ষমতা কমে আসত। ভূমিহীনে ভূমি পেত। যাই হোক, যা হয়েছে তা সত্য। সত্যকে অস্বীকার করা যায় না। তবে হিন্দুরা চলে আসায় কি গরিবে জমি পেয়েছে? মূল কারণ তো সিংহভাগ জমি হিন্দু জমিদারের আধীনে থাকা। ভূমি সংস্কারই ছিল এই অসমতা দূর করার উপায়। আমার মনে হয় সীমান্ত মানুষের পায়ে বেড়ি পরিয়ে দিয়েছে।        

এমদাদ রহমান : আপনার স্মৃতি থেকে দেশভাগের কথা, বেদনার কথা শুনতে চাইছি। 'দশমী দিবসে' উপন্যাসের প্রস্তাবনায় আপনি যেমন বলেছেন-- 'দেশভাগে সমস্ত দেশই হয়ে ওঠে বিদায়ঘাট'। 
অমর মিত্র : সাগরদাঁড়িতে কবি মধুসূদনের বাড়ির সামনে কপোতাক্ষ। সেই কপোতাক্ষতীরে একটি জায়গা বিদায়ঘাট নামে চিহ্নিত। গ্রামবাসীরাই হয়তো ওই নাম দিয়েছেন।  মধু হিন্দু বংশদ্ভূত, নিয়েছিলেন খ্রিস্ট ধর্ম। তাঁকে নিয়ে গর্বিত মুসলমান, হিন্দু, দুই ধর্মের মানুষই। তাঁরা বললেন, বিলেত যাওয়ার আগে খ্রিস্টান মধু এসেছিলেন মায়ের সঙ্গে দেখা করতে। সে ই শেষ আসা। শেষ দেখা। যে ঘাট থেকে বিদায় নিয়েছিলেন তিনি, সেই ঘাটকে ওঁরা বিদায় ঘাট বলেন। কিন্তু এই কাহিনী সত্য নয় হয়তো। বিলেত যাওয়ার সময় মা জাহ্নবী বেঁচে নেই। তবে এই ঘটনা মাদ্রাজ যাওয়ার আগে হতে পারে। সেও তো কালাপানি পার। তখন জাহ্নবী মা জীবিত। মধুসূদন ফরাসি দেশে বসে কপোতাক্ষকে স্মরণ করেছেন। সেই অসামান্য কবিতা পড়তে গিয়ে আমার নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে। মা-ও তো কলকাতার বাসাবাড়িতে বসে কপোতাক্ষকে স্মরণ করতেন। অনেক রাতে বুকের ভিতরে নিয়ে আমাকে চিনিয়েছিলেন বাপের বাড়ির সেই নদীকে। সব মিলিয়ে দশমী দিবসে। ওই দিনই তো মাতৃ বিসর্জন। দেশমাতৃকা বিসর্জন দেশভাগে।  তবে এই উপন্যাসে মা তেমন নেই। আছেন যিনি তিনি মধুসূদনের নাতনি। কপোতাক্ষর প্রতি আমার ভালবাসা আসলে আমার মায়ের, বাবার। আমার হারানো নদীর স্রোত গল্পে তা আছে। 

এমদাদ রহমান : উপন্যাসের চারণ কবি বীরাঙ্গনা দাসীকে কোথায় পেয়েছিলেন? নাকি আপনার কল্পনার সৃষ্টি?
অমর মিত্র : বীরাঙ্গনা আমাদের আত্মীয়া। তিনি মধুসূদনের দূরের কোনও সম্পর্কের নাতনি ছিলেন। মানকুমারী বসু তাঁর পিসিমা। ওপারে সব ফেলে রেখে এপারে মধুর কথা নিয়ে এসেছিলেন। তিনিই আমাকে মধুর কথা বলতেন আমার যখন সাত-আট। মেঘনাদ বধ কাব্য থেকে আবৃত্তি করতেন। অনেক সর্গ তাঁর স্মরণে ছিল। তাঁকে নিয়েই এই উপন্যাস। লিখতে হলে কল্পনা করতেই হয়। বীরাঙ্গনাকে আমি অনেকটা নির্মাণও করেছি।   

এমদাদ রহমান : বার বার নদীর কথা বলছেন! হ্যাঁ, নদী। যেন, জীবন! আপনার নিজের কোনও নদী আছে, চোখ বন্ধ করলেই যে নদীর জলতরঙ্গ শুনতে পান? বুকের ভিতর যে নদী উজান ভাটিতে বইছে? বলবেন, আমাদেরকে?
অমর মিত্র : নদীর কথা কোনও নতুন কথা কি? নদীর কূলেই তো সভ্যতা গড়ে উঠেছিল? কথিত আছে-- সরস্বতী নদীর তীরে বৈদিক সভ্যতা। ছোট বড় কত নদী। নদী শুকোলে সভ্যতার পতন হয়। তিতাশ একটি নদীর নাম-এ আছে তা, কাঁদো নদী কাঁদো (সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌) উপন্যাসে আছে তা। নদী নিয়ে কত মহৎ উপন্যাস লেখা হয়েছে। ধীরে বহে দন, তিতাশ... পদ্মা নদীর মাঝি, তিস্তা পারের বৃত্তান্ত, তিস্তা পুরাণ, গঙ্গা একটি নদীর নাম (শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়)- এমনি অনেক। আমার নদী বলতে প্রায় না দেখা কপোতাক্ষ, তাকে আমি ফেলে এসেছি, কিন্তু আন্দাজ করতে পারি। 'দশমী দিবসে' উপন্যাসের বীজ সাগরদাঁড়িতে কপোতাক্ষ তীরে বসেই পেয়েছিলাম। আমার মা আমাকে কলকাতায় বসে চিনিয়েছিলেন এই নদী।  

এমদাদ রহমান : আপনার গল্প কি প্রধানত লিটল ম্যাগাজিনেই প্রকাশিত হত? এখনকার লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের কী অবস্থা? 
অমর মিত্র : আমি লিটল ম্যাগাজিন থেকে বিগ ম্যাগাজিন সব জায়গায় লিখেছি। এবং তাইই লিখি। এখনও বারোমাস, অনুষ্টুপ, পরিচয় পত্রিকার আমি লেখক। নিজের ভাল লাগা লেখাটিই সেখানে লিখি। এইসব পত্রিকায় আমার ভাল গল্পগুলিই ছাপা হয়েছে। কিন্তু বড় পত্রিকা যে বলেছেন, আমি লিখেছি। আমি আমার লেখাটি লিখতে চাই, সুতরাং লিখেছি। লিটল ম্যাগাজিনের আন্দোলন তেমন কই? ভাল ম্যাগাজিন আছে অনেক। লিখে সম্মানিত বোধ করি, এইটুক। আর শুধু লিটল ম্যাগাজিনে লিখবই বা কেন, বড় পত্রিকায় লিখে অনেক দূর পৌঁছন যায় তো। অনেকেই বলেন এইসব (শুধু ব্যতিক্রম সুবিমল মিশ্র), কিন্তু লিখতে বললেই লেখেন। কমলকুমার মজুমদারও দেশ পত্রিকায় লিখেছেন, দেবেশ রায়, শ্যামল-- সবাই। আমিও। লিখতে বললে লিখেছি। তবে আমাদের লেখালেখির যত পরীক্ষা নিরীক্ষা লিটল ম্যাগাজিনে। আর প্রতিক্ষণ নামের যে পত্রিকাটি গত শতকের আশির দশকে প্রকাশিত হত, সেই পত্রিকার আনুকল্যই বেশি পেয়েছি আমি। উপন্যাস এবং গল্প লিখেছি। তা ছাড়া প্রতিক্ষণে দীর্ঘদিন আড্ডা মেরেছি দেবেশ রায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, কখনও শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে। সবই কাজে লেগেছে। 

এমদাদ রহমান : লিখতে গিয়ে কি পাঠকের কথা ভাবেন? আমার খুব প্রিয় একজন লেখক আবুল বাশার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তিনি যখন লেখেন, পাঠকের কথা ভেবেই লেখেন আর তিনি এই কথাও বলেন যে, এভাবেই লেখা উচিৎ। 
অমর মিত্র : আমি নিজের কথা ভেবে লিখি। নিজের ভাল লাগার উপরে অনেক কিছুই নির্ভরশীল। পাঠকের কথা ভেবে লেখা হয় না। কিন্তু নিজের তৃপ্তি হলে, পাঠকের কাছে পৌঁছন যায়, তা আমি দেখেছি। 

এমদাদ রহমান : এই যে আপনি আমি এই যে আমরা যারা কথা বলি বাংলায়, তারা কি ভাষাকে কেন্দ্র করে একটি জাতি হিসাবে গড়ে উঠেছি? নাকি ধর্মকে কেন্দ্র করে? দেখুন, এই যে আজকের বাংলাদেশ, আজকের ভারত, এখানে কি হচ্ছে, মানুষের মনের ভিতর কোথায় যেন ঘুমিয়ে থাকা সাম্প্রদায়িকতা... দেশভাগ হয়েছে। সে তো ভয়াবহ বিশাদজনিত রাজনৈতিক ঘটনা, কিন্তু ধর্মের কারণে যে মানুষ দেশ ছেড়ে যাচ্ছে! এই যে দেশভাগ, এই দেশত্যাগ... এ সম্পর্কে আপনার ধারণা কী? আপনার দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে জানতে চাইছি এই ব্যাপারে...
অমর মিত্র : দেশভাগ, দেশত্যাগ নিয়ে আমি তো বলেছি। আমি তো চাই সীমান্তরেখা উঠে যাক। এই কথা দশমী দিবসে উপন্যাসে আর অনেক গল্পে আছে। নতুন করে কী বলব! 

এমদাদ রহমান : সেদিন পশ্চিমবঙ্গের লেখক আবুল বাশারের একটি সাক্ষাৎকার পড়ছিলাম। সেখানে ভয়ানক কিছু তথ্য পাওয়া গেল। যেমন, আবুল বাশার বলছেন-- 
ভারতে বাঙালির ওপরে ভারতীয় সংস্কৃতি দুইভাবে আক্রমণ করছে- একটা হচ্ছে ইংরেজি ভাষা সংস্কৃতি দিয়ে আক্রমণ। এটা তবুও লড়াই করা যায়, কিন্তু তার সঙ্গে হিন্দি ভাষার যে আগ্রাসন বাংলার ওপরে সেটা ভয়াবহ, যেখানে যেখানে হিন্দি প্রবেশ করছে, সেখানে সেখানে বাংলা লুপ্ত হয়ে গেছে, যেমন ভাগলপুরে বাঙালি নেই। শরৎচন্দ্রের সময়ে বাঙালিটোলায় ছিল ৯৮ শতাংশ বাঙালি। এখন সেখানে ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, অচিরেই ১ শতাংশ হয়ে যাবে। ভাগলপুরকে বলা হতো বাংলা সাহিত্যের তীর্থক্ষেত্র- সেখানে শরৎচন্দ্র, বনফুল, বিভূতিভূষণ, সতীনাথ ভাদুরী কে নয় ! সতিনাথ ভাদুরীরর যে অসামান্য উপন্যাস জাগরী সেটা তো ভাগলপুরে যখন জেলে ছিলেন তখন লেখা। সেদিন হিন্দি বাংলা একটা সখ্য ছিল, আজকে হিন্দির আগ্রাসন চলছে। লালুপ্রসাদ বাংলাকে মুছে দিতেই চায় এবং তার লক্ষণ সবখানেই আছে। কোথাও বাংলা শব্দের কোনো সাইনবোর্ড হোর্ডিং চোখে পড়ে না। সমস্তই হিন্দি। ওই হিন্দি চাপের ভিতর কোথাও লুকিয়ে ১ বা ২ শতাংশ বাঙালি, এবং সেখান থেকে বাংলা ভাষা সাহিত্য লুপ্ত হয়ে গেছে। যেমন আসামে বাঙালি বিপন্ন। কয়েকদিন আগে আসামের ওই দিকে গিয়েছিলাম পূর্ব শ্রীহট্ট, ওপারেরটা পশ্চিম শ্রীহট্ট, কুশিয়ারা নদীটা দেখছিলাম। দুই পারের মানুষকে মিলতে দিচ্ছে না। তো ধর্ম যে কি করে, ধর্মই ভাষার মৃত্যুর কারণ, সেটাই যদি হয়, তাহলে রবীন্দ্রনাথের মতো হতভাগ্য মহৎ কবি পৃথিবীতে আর কোথাও নেই, আসাম বিহার উড়িষ্যা মিলে একটি বৃহৎ বাংলাদেশ হতে হয়তো ধর্ম একটা বাধা, ধর্ম ব্যক্তির কাছে থাকুক অসুবিধা নেই। রাষ্ট্রে তার উপদ্রব না থাকতো বাঙালি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি হতে পারতো। যদিও সেটাই স্বপ্ন। কখনো সম্ভব হবে কিনা জানি না।
এই যে এক বিপন্নতা, আপনিও তো এখানেই থাকছেন, এখানেই লিখছেন। আপনার কী মনে হচ্ছে? 
অমর মিত্র : ভাগলপুর, পূরণিয়া, মুঙ্গের এইসব জেলা শহরে বাঙালির উপনিবেশ ছিল। শহরে, গ্রামে নয়। এখান থেকে বাঙালিরা প্রায় মুছে গেছেন। কারণ ওটাতো অন্য প্রদেশ। হিন্দিভাষী অঞ্চল। তারা তাদের অধিকার বুঝে নিয়েছে। কিছুই করার নেই। অসমে অবস্থা ছিল অন্যরকম। স্বাধীনতার সময়, ১৯৪৭-এ, বাংলা ভাষাভাষী আর অসমিয়া ভাষাভাষীর সংখ্যা একই ছিল। বাঙালি বেশিই ছিল। তাই একেবারে তাড়াতে পারেনি। কাছাড়, হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জ-- এই তিন জেলায় অর্থাৎ বরাক উপত্যকায় বাঙালি আছে লড়াই করে। সেখানে অসমিয়া আধিপত্য মেনে নেয়নি সাবেক শ্রীহট্টের মানুষ। আর তাঁরা ১৯৬১-র ১৯ শে মে তারিখে ১১ জন শহীদ হয়েছিলেন ভাষার জন্য। ওই বরাক উপত্যকা বাঙালির বাসভূমি। বহুপুরুষ ধরে আছে তারা। দেখুন, আসাম-ওড়িশা-বিহার আর বাংলা নিয়ে বৃহত্তর বাংলা কেন হবে? ওড়িশা, বিহার, অসমের নিজস্ব ভাষা সংস্কৃতি আছে। তা নিয়ে তারা কেন বাংলায় ঢুকবে? তা অন্যায়। এই কল্পনা আমি করিনা। তবে বরাক উপত্যকার জন্য আলাদা কোনও স্ট্যাটাস তারা পেতেই পারেন। আর এক বঙ্গভূমি হবে আমাদের। ধর্ম কখনোই ধর্ম থাকে না, তা ক্রমাগত হিংস্রতার দিকে যাচ্ছে। আমাদের দেশে যেমন, তেমন আপনাদের বাংলাদেশেও। তাহলে অখণ্ড বাংলা হবে কী ভাবে? কল্পনায় ভাল, বাস্তবে নয়।    

এমদাদ রহমান : আমরা জানি আপনি একজন প্রখ্যাত গল্পকার আবার একজন উল্লেখযোগ্য উপন্যাসিকও। কোন পরিচয়টা আপনার কাছে বেশি গুরুত্ব পায়, একজন গল্পকারের, নাকি উপন্যাসিকের? 
অমর মিত্র : দু'টিই আমি মন দিয়ে লিখতে চেষ্টা করি।  

মেহেরুন্নেসা মৌ : আপনি ছোটোগল্পের জন্য ১৯৯৮ সালে পেয়েছেন সর্বভারতীয় কথা পুরস্কার। এটাই কি আপনার লেখক জীবনের প্রথম পুরষ্কার? 
অমর মিত্র : এর আগে সমরেশ বসু পুরষ্কার ও সমতট পুরষ্কার পেয়েছিলাম।

এমদাদ রহমান : পুরস্কার একজন লেখককে কী দেয়? তাগিদ, প্রেরণা ইত্যাদি? আপনি তো সাহিত্য আকাদেমি পেয়েছেন, বঙ্কিম পেয়েছেন। আকাদেমি এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়। তো আপনার কাছে আমার জিজ্ঞাসা, একজন লেখকের জীবনে পুরস্কারের কী ভূমিকা থাকে? পুরস্কার আসলে লেখককে কী করে, কী দেয়? 
অমর মিত্র : কিছুই না আবার অনেক কিছু। আত্মবিশ্বাস দেয়। সমস্ত অপমান ধুয়ে দেয়। 

এমদাদ রহমান : আপনার কাছে আমাদের জানার খুব আগ্রহ, 'কেন লেখেন'?- এই ব্যাপারটি।  
অমর মিত্র : কেন লিখি জানি না। এইটা পারি বলে লিখি। না পারলে লিখতাম না। আবার এও মনে হয় না লিখে পারি না তাই লিখি। প্রতিদিন একই সময়ে লিখতে বসা আমার অভ্যাসের অন্তর্গত হয়ে গেছে এতটাই যে না লিখে ঐ সময়ে আমি করবই বা কী ? আমার ঘুম ভাঙে অতি প্রত্যুষে। এই অভ্যাস আমার বহুদিনের। তখন থাকে অন্ধকার। একটা বুড়ো কাক জাগে, তার সঙ্গে জাগি আমি। বহুদিন আগে তখনই মুখ হাত ধুয়ে স্টোভে চা করে লিখতে বসা হত। শীতের সময় আলো ফুটত না। গরমে ফর্শা হয়ে যায়। এখনো সেই সময়ে উঠি, গান শুনি একা বসে। ভৈরবী কিংবা টোড়ী, উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, বড়ে গুলাম আলি থেকে কিশোরী আমনকর, রসিদ খান, যাঁর হোক। বিলায়েত খাঁ সায়েব বা আমজাদ আলি খঁ সায়েবের সেতার কিংবা সরোদ, বা চৌরাশিয়ার বাঁশি, যাই হোক। তারপর একটু প্রাতঃভ্রমণ। ফিরে এসে লিখতে বসা। সকালের এই যে শিডিউল, এর অন্যথা হবার উপায় নেই। এর ভিতরে এক অদ্ভুত সুখ আছে। সেই সুখ আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। সকালের গান শোনা, চৌরাশিয়ার বাঁশিতে নদীর ছলচ্ছল শোনা ( সঙ অফ দি রিভার), তারপর উষাকালে পৃথিবীর ফুটে ওঠা প্রত্যক্ষ করে বাড়ি ফিরে আমার লেখার টেবিলে, এখন কম্পিউটারের সামনে এসে বসা, লিখতে আরম্ভ করা, এর কোনো বিকল্প আমার সামনে তৈরি হয়নি। তাই লিখি। আমার সকাল, আমার দিনারম্ভ আরো আরো মধুর করে তোলার জন্য আমার লেখা। সেই লেখাটা সাড়ে ছ’টা থেকে সাড়ে বারো একটা অবধি চলে। মাঝে ঘন্টা দেড় বাদ যায় নানা কাজে। তার ভিতরে বাজার ও আছে প্রত্যহ। না লিখলে আমি করতাম কী ? ভাবতেও পারি না। না লিখলে হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়ার ভূপালী কি আমার শোনা হত ? লেখার টানেই তো ভোরবেলা কিংবা শেষরাতে ওঠা। লেখাই আমার ঘুম ভাঙায়। যে উপন্যাস লিখছি বা যে গল্পের কথা ভাবছি, কিছুটা লিখেছি, তা আমাকে টানতে থাকে ঘুমের ভিতরে। সুতরাং না লিখে উপায় নেই। আমার আর কিছু করার নেই। থাকি পুরনো ফ্ল্যাট বাড়িতে, আমার নিজস্ব কোনো বাগান নেই যে সকালে উঠে বাগান পরিচর্যা করব। দেখব কোন গাছে ফুল ফুটল কোন গাছে ফুটল না, আম গাছটিতে বোল এল কিনা। আমার কোনো পোষ্য নেই যে তার পরিচর্যা করব। লেখা ব্যতীত আমার আর কিছু নেই তাই লিখি। বাড়ি নেই গাড়ি নেই অপরিমেয় অর্থ নেই, আছে শুধু লেখার অপরিসর টেবিলখানি আর বই। তাই লিখতেই হয় আমাকে। না লিখলে আমার আর কিছু করার নেই। লিখতে বসে আমি নিজের কথা বলতে পারি, তা অন্য সময় বলা যায় না। লিখতে বসেই লেখক অনন্ত স্বাধীনতা ভোগ করতে পারেন। কোনো সমঝোতা নয়। যতদিন তেমন, ততদিন লেখা। লিখে আনন্দ।
সেই আরম্ভের দিনেও হয়তো এইটি একটি কারণ ছিল। একা থেকেছি অন্তঃগ্রামে, বন্ধু স্বজন বর্জিত সেই জীবন ছিল খুব মন খারাপের। আর বিস্ময়েরও। নিঃসঙ্গতা কাটাতে লেখা ছাড়া অন্য কোনো অভ্যাস গড়ে ওঠেনি। অতি প্রত্যুষে ওঠার অভ্যাস সে গ্রাম বাস থেকে। কত সময় ছিল হাতে। সময় ব্যয় করতে কাগজ কলম নিয়ে বসা। সেই অভ্যাস চলছে। বিস্মিত হওয়ার নানা অনুষঙ্গ এখনো আছে। তাই লেখা থামেনি। জীবনের নানা বিস্ময় আমাকে লিখিয়ে নেয়। তাই লিখি। লিখতে ভাল লাগে তাই লিখি। লিখলে জীবনকে সতেজ মনে হয় তাই লিখি। লিখতে বসে ভবিষ্যত নিয়ে নানা রকম ভাবতে পারি, তাই লিখি। আবার লিখতে বসলে বয়স কমে যায় তাই লিখি। লিখতে বসলে শৈশব ফিরে আসে, মা বাবা ভাই বোন, ঠাকুমা ঠাকুদ্দা নিয়ে গোটা একটা সংসার, তাই লিখি। ফিরে আসে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার (তখন শুধুই মেদিনীপুর) ডেবরা থানার লোয়াদা বলে একটি জনপদ। সেখানে কংসাবতী নদী পার হয়ে ঘন্টা দেড় হেঁটে করন্ডা নামের এক গ্রামে পৌঁছন। চাষাদের গ্রাম। খুব গরিব মানুষজন। আমি ভালবাসা পেয়েছি তাদের অনেকের। ভালবাসতে চেয়েছিও গাঁয়ের মানুষকে। আবার এই কারণে অপছন্দের মানুষও হয়েছিলাম চাষাভুসোর সঙ্গে বেশি মেলামেশার জন্য। সেই ভালবাসা থেকে তাদের কথা লিখতে চাওয়া। ১৯৭৪ সাল। একমাসে, এপ্রিলে দুটি গল্প লিখেছিলাম, মেলার দিকে ঘর ও পার্বতীর বোশেখ মাস। মনে হয়েছিল লিখতে পেরে যে আনন্দ তা আর কিছুতে নেই। তাই লেখা। এখন সব মনে পড়ে। জানি না কেন প্রথম দিন লিখতে শুরু করেছিলাম। না লিখে কেন তাসুড়েদের তাসের আড্ডায় গিয়ে বসিনি। সন্ধে থেকে জোর তাস খেলা সেই করন্ডা গ্রামে। আমি কেরোসিন ল্যাম্প নিয়ে ঘরের ভিতর। কাগজ কলম নিয়ে বসেছি। কেন তা জানি না, জানি না।

জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা : আর কিছু কি বলবেন?  
অমর মিত্র : আর কী... না, আমার আর কিছুই বলার নেই। 

এমদাদ রহমান : এবার জননীসমুদ্র নামে আপনার উপন্যাস বের হয়েছে, কলকাতার দে'জ থেকে। এখনও পড়া হয়নি। পত্রপত্রিকা থেকে, বইয়ের ফ্ল্যাপ থেকে এই উপন্যাস পাঠ করবার আহ্বান শুনেছি। জানতে চাই এই উপন্যাস বিষয়ে। জননী এখানে সমুদ্র হলেন কেন? মাতৃগর্ভই কি তাহলে সমুদ্র? জীবন? 
অমর মিত্র : উপন্যাস নিয়ে কী বলব? তবে এর ভিতরে সমকালীন বাংলাদেশ আছে। নদী আছে। সমুদ্র আছে। নাইওর আছে। মাতৃগর্ভই সমুদ্র। 

এমদাদ রহমান : কিছুদিন আগে ফেইসবুকে আপনি লিখেছেন এই কথাগুলি--'ছিটমহল হলো রাষ্ট্রের ভিতরে রাষ্ট্রহীনতা। দেশহীন রাষ্ট্রহীন মানুষ ছিটমহলের বাসিন্দা। ভারতের ভিতরে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের ভিতরে ভারত। প্রায় আত্মপরিচয়হীন হয়ে বেঁচে থাকা মানুষের কথাই ছিটমহলের কথা। আমি তা বুঝতে চাইছি। দেশহীন দেশের মানুষের কথা।' এ সম্পর্কে আরও কিছু আপনার কাছে জানতে চাই।
অমর মিত্র : আর বিশদে বলা যায় না। লিখছি উপন্যাসটি। কোথায় যাবে জানি না। 

এমদাদ রহমান : 'জাহ্নবী দেখছিল পদ্মপুকুর চলে গেল। দেখছিল তার বকুলফুল সই ভদ্রা মিলিয়ে গেল। সব মিলিয়ে যাচ্ছে তার কাছ থেকে। ঠাকুরতলা, বটতলা, অশথতলা, হলদিডাঙা, মধুগুলগুলি আম গাছটি---সব। বাবার মুখও আবছা হয়ে গেল। জাহ্নবী যেন নদীর মতো বয়ে যেতে লাগল। বুঝতে পারছিল যা ফেলে যাচ্ছে তা চিরকালের মতোই ফেলে যাচ্ছে। যা চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছে, তা চিরকালের মতো চলে যাচ্ছে। যেমন যায় নদী। নদী কি পিছনে ফিরতে পারে ? বিকেল বিকেল সে পৌঁছল মহাজনের বাড়ি।'
আপনার কন্যাডিহির কথা। কে এই জাহ্নবী? এই উপন্যাস সম্পর্কেও আপনার পাঠকদের বলুন। 
অমর মিত্র : এমদাদ, উপন্যাস নিয়ে কি বিশদে বলা যায়? কন্যাডিহি ইতিহাস, কল্পনা আর এই সময়ের এক নারীকে জুড়ে দিয়েছে এক সঙ্গে। পুত্রার্থে পাঁচ কন্যাকে ত্যাগ করে গুরুসেবায় পাঠিয়ে দিয়েছিল এক মহাজন। জাহ্নবী সেই মেয়েদের একজন। পরে সে গৌড়ের রানি হয় (ইতিহাস নয়, কল্পনা)। কিন্তু তার কাছেও পুত্রের দাবি আসে রাজার কাছ থেকে... সমকালে পৌঁছয় জাহ্নবী। 

এমদাদ রহমান : আপনার একটা লেখায় এভাবে বলেছেন- আমার যাত্রা শেষ হয়নি। কাঁসাই নদীর কূল থেকে আমি হেঁটে চলেছি। পথে নিউ জার্সি, বরিশাল, সিলেট, সাও-পাওলো, টরন্টো... আর টরন্টো ক্যানবেরা থেকে ছিটমহল, ভারত বাংলাদেশ সীমান্ত... 
লেখকের যাত্রা কোথায় গিয়ে শেষ হয়? এই যে যাত্রার কথা বল্লেন... 
অমর মিত্র : লেখকের যাত্রা শেষ হয় না। তিনি চলিষ্ণু। 

এমদাদ রহমান : আপনার ধ্রুবপুত্র উপন্যাসখানি এখন আমার সঙ্গে নেই। দেশে আমার গ্রামের বাড়ির আলমারিতে আমার বোনের তত্বাবধানে আছে। সিলেট থেকে কিনেছিলাম। কবি মোস্তাক আহমাদ দীনের বইপত্র থেকে, সেখানে আপনার অশ্বচরিতও ছিল। প্রতিক্ষণ সিরিজের গল্পগুলিও ছিল আর, হাঁসপাহাড়ি। হ্যাঁ, যা বলতে চাইছিলাম, আপনি ২০০৬ সালের সাহিত্য আকাদেমি পেয়েছেন ধ্রুবপুত্র উপন্যাসের জন্য। এই উপন্যাসের পটভূমি দুই'হাজার বছর আগের ভারতবর্ষ। মানে, বহু পুরোনো আখ্যান। মাটির নিচে চাপা পড়া অবন্তী নগরীর কিংবা উজ্জয়িনীর। এখানে এই ধ্রুবপুত্রটি কে? কালিদাসের মেঘদূত কাব্যে তো বর্ষা আছে। ধ্রুবপুত্র তার উলটো। খরার কথা আছে... লোকজন অপেক্ষা করছে। বৃষ্টির। কবি কালিদাস বৃষ্টি আনতে গেছেন। যেন সবাই বৃষ্টির প্রার্থনা করছেন। আসলে এখানে এই উপন্যাস লেখবার ভাবনাটি জানতে চাইছি। 
অমর মিত্র  : এই উপন্যাসের কাহিনী আমার কল্পনা। মনে হয়েছিল বাস্তবের উজ্জয়িনী আর কালিদাসের মেঘদূতমের উজ্জয়িনী আলাদা। ওই অঞ্চল খরা প্রবণ। বছরে ১৪ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হয়। আমি আত্মীয়তার সূত্রে বেশ কয়েকবার গিয়েছি ওখানে। আর তা বিভিন্ন সিজনে। আচমকাই মনে হয়েছিল ধ্রুবপুত্র লেখার কথা। অনেক বড় হয়ে এসেছিল বিষয়টি আমার কাছে। কেউ ধারাবাহিক ছাপেনি। সরাসরি বই হয়েছিল বলা যায়। প্রকাশিত হওয়ার পর পাঠক এবং বিশিষ্টজনদের কাছ থেকে ভাল মন্তব্য পাই। আলোচিত হয়েছিল খুব। এখানে ধ্রুবপুত্র চরিত্রে কালিদাস কল্পনা আছে। আর আছে আমার সমকাল। অ্যালিগরি হয়েই সেই সময় এসেছিল এই উপন্যাসে। একটি শূদ্রকে জীয়ন্ত পুড়িয়ে মারা আছে এখানে। আমার দেশে তখন এই ঘটনা ঘটেছিল। সাম্প্রদায়িকতাই অন্যভাবে এসেছে। শূদ্রের জাগরণে এই উপন্যাসে মেঘ আসে বৃষ্টি নিয়ে। 

এমদাদ রহমান : কমলকুমার মজুমদার বলেছেন গল্পে একটি কাহিনী থাকে, ঘটনা থাকে, কিন্তু সেটাই গল্প নয়। আপনার কাছে এই কথাটি ব্যাখ্যা কী? 
অমর মিত্র  : কাহিনী তো আধার মাত্র। গল্প তো কাহিনী কথন নয়। গল্প আলাদা। 

এমদাদ রহমান : তাহলে দাঁড়াচ্ছে যে গল্পের আধার হল কাহিনী। শুধু একটি কাহিনীর কথনকেই আমরা সাহিত্যে গল্প হিসেবে মানছি না। তাহলে, আমাদের এখন জানতে হবে, গল্প কী? আর ঠিক কীভাবেই বা কাহিনী থেকে গল্প আলাদা করা যায়? 
অমর মিত্র : কাহিনীর আয়ু সাময়িক। কাহিনী এমন কোনও মাত্রায় নিয়ে যায় না, যা আপনাকে স্তব্ধ করবে। বিষাদে নিমজ্জিত করবে। বহুদিন পরেও তার মূল্য ফুরোবে না সমাজ ও জীবনের প্রতি তার বিশ্বস্ততার জন্য। মনে করুন গোগোলের ওভারকোট, চেখভের কেরানির মৃত্যু বা রবীন্দ্রনাথের গুপ্তধন... গল্প নিটোল কাহিনী ব্যতীত হয়, কিন্তু কাহিনীর ভেতরে তাই থাকে, আর কিছু না। তা গল্প হয়ে ওঠে যখন তার ভেতরে একটি দর্শন প্রতিভাত হয়।

এমদাদ রহমান : ব্যাপারটা আমরা খুব ভাল করে সিনেমাতে লক্ষ্য করি। ধরা যাক-- দ্য মিরর... আমি আন্দ্রেই তারকভস্কির কথা বলছি। তিনি তার চিন্তা ভাবনা নিয়ে একটি বই লিখেছেন। টাইম উইদিন টাইম। সময়কে তিনি সময়ের ভিতর মিশিয়ে দিয়েছেন। গুলিয়ে দিয়েছেন... টাইম উইদিন টাইম... তিনি সিনেমাতে টাইম ফ্রেমকে ভেঙে দিয়েছেন। এ কথা আপনার বেলাতেও সত্য। আপনিও ভেঙেছেন। আমি অশ্বচরিতের কথা বলছি। এই যে সময় কে তার কালানুক্রম থেকে এগিয়ে পিছিয়ে ফ্রেম ভেঙে দিয়ে উপন্যাসের আখ্যান নির্মাণ করলেন... ব্যাপারটি কীভাবে পেলেন? মিথ এবং ইতিহাসকে আশ্রয় করে সময়কে নির্মাণ করবার এই কৌশলটিইবা গ্রহণ করলেন কেন?
অমর মিত্র : লিখতে লিখতে হয়ে হয়ে গিয়েছিল। এই উপন্যাসের একটি খসড়া করি ১৯৮১-৮২-তে, তখন আমি আমার সমুদ্রতীরের এক বছরের বসবাস ছেড়ে কলকাতায় ফিরে এসেছি। একটি ঘোড়া, তার পলায়ন এবং বিভ্রম ছিল সেই লেখার বিষয়। ১৯৯৮-এ সেই লেখা পুনর্লিখিত হয় রাজস্থানের মরুভূমিতে পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের পর। এতদিন পড়ে ছিল লেখাটি। হ্যাঁ, ১৯৮৮ সাল নাগাদ নতুন করে লিখে একটি পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করে এক প্রকাশককে দিয়েছিলাম ছাপতে। তিনি ভাগ্যিস হারিয়ে ফেলেছিলেন। মিথ, ইতিহাস ইত্যাদি স্নাত হয়ে উঠেছিলাম তখন (১৯৯৮-এ) আমি, ধ্রুবপুত্র লিখছি সেই সময়। সেই লেখা থামিয়ে এই লেখা (অশ্বচরিত) লিখেছিলাম। আমি এইরকম লিখতে অভ্যস্ত। সময় থেকে সময়ান্তর যাত্রা আমার গল্পেও আছে। ছিটমহল নিয়ে এখন যে উপন্যাস আমি লিখছি, 'কুমারী মেঘের দেশ চাই', তার ভিতরেও আছে। কীভাবে কী হয়, সবটা বলা যায় না।     

জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা : এখানে যখন আপনার উপন্যাসের প্রসঙ্গ এসেছে, তো এটাও আমাদেরকে বলুন, গল্প থেকে উপন্যাসে গেলেন কীভাবে? গল্পের ক্যানভাস আর উপন্যাসের বিপুলতা... এতো বিস্তৃত পরিসরে একজন গদ্যলেখককে উপন্যাস লিখতে কাজ করতে হয়। তো প্রস্তুতিটা কেমন ছিল? 
অমর মিত্র : পড়তে পড়তে লিখতে লিখতে শেখা হয়। উপন্যাস লিখতে ধৈর্যশীল হতে হয়। উপন্যাসের আঙ্গিক ধরা যায় উপন্যাস পড়লে। এই কালের দেবেশ রায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় পড়েছি, পড়েছি আরও কত বাংলা ও বিদেশি নভেল, বিশেষত রুশ উপন্যাস। রুশ উপন্যাসের ব্যাপ্তি আমাকে টানে। তলস্তয়, দস্তয়েভস্কি, শলোখভ ইত্যাদি। বলা যায় রুশ উপন্যাস আমাকে উপন্যাস চিনিয়েছে, গল্পও চিনেছি রুশীদের কাছে। আর উপন্যাস রচনায় আমাদের তিন বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীনাথ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌..., পড়তে পড়তে শেখা। 

এমদাদ রহমান : একটি গল্প কি একবারেই লেখেন? নাকি লিখতে থাকার একটা প্রক্রিয়া চলতে থাকে কিন্তু হয়ত অপেক্ষা করছেন গল্পটি মাথায় পুরাপুরি চলে আসার? 
অমর মিত্র : গল্প মাথায় কখনও পুরোটা আসে না। একটি বিন্দুই সিন্ধু হয়। আমি আন্দাজ করে করে লিখে যাই। আমি প্রায় শূন্য থেকে শুরু করি গল্প লিখতে বসে। 

মেহেরুন্নেসা মৌ : লিখিত হয়ে যাবার পর, যখন ফিরে দেখতে যান পুর গল্পটিকে, তখন কীভাবে আপনার মনে হয় যে যা বলতে চেয়েছিলেন, তা বলতে পেরেছেন? সংশোধন বা কাটাকাটি কখন করেন? মানে সম্পাদনার কাজটি... 
অমর মিত্র : গল্প লিখতে লিখতেই টের পাই হবে কি হবে না। সংশোধন সঙ্গে সঙ্গেই চলে। আগে কত পাতা ফেলেছি যে! পুরো পাতাই ফেলে দিয়েছি কত, নতুন করে লিখেছি। এখন কমপিউটারে সংশোধন, কাটাকুটি অনেক সহজ।  

মেহেরুন্নেসা মৌ : আপনাকে বলতে শুনেছি, গল্পকে আপনি বলছেন জীবনের এক ক্ষুদ্র মুহূর্ত, উপন্যাস সেখানে সমুদ্র। গল্প হল জীবনের অনুভূতিগুলোর কোলাজ। এখানে কীভাবে গল্প আর উপন্যাসের পার্থক্যটুকু করলেন? এই যে ক্ষুদ্র মুহূর্ত থেকে সমুদ্রের বিশালতা...
অমর মিত্র : যে-কথাটা বলছেন, হয়তো তার সমস্তটা অমন নয়। আসলে শিল্পকে কোনও বিশেষ সূত্রে বাঁধা কঠিন। আসলে কী থেকে কী হয় ধরা যায় না। একটি গল্পই হয়ে উঠেছে উপন্যাস। অশ্বচরিতের ঘোড়াটিকে নিয়ে ১৯৮০ সালে আমি একটি গল্পও লিখেছিলাম। তাই হয়ে যায় মহাব্যপ্ত, হ্যাঁ, অনেক পরে। 

এমদাদ রহমান : একজন বিজ্ঞানীর কাছেও এই জীবন রহস্যময়, লেখকের কাছেও সমান রহস্যময়। সেই রহস্যময়তা ঠিক কীভাবে সাহিত্য হয়ে উঠবে?
অমর মিত্র : জীবন তো রহস্যময় নিশ্চয়। না হলে কে জানত আমি লিখব? লেখক যা লেখেন, তা কি বাস্তবতায় ঘটে থাকে? সাহিত্যের বাস্তবতা লেখকের নির্মাণ। সেই বাস্তবতা, যা কি না লেখক নিজে কল্পনা করেছেন, তা বহু মানুষের জীবনের উপলব্ধির সঙ্গে মিলে যায়। কী করে হয় কে জানে? 
জীবন আমাদের কোথায় নিয়ে যায় জানি না। কিন্তু সেই অনিশ্চয়তাকে যদি স্পর্শ করতে পারি, হয়ে যায়। অনিশ্চয়তা রহস্যময় নিশ্চয়। 

এমদাদ রহমান : একটি গল্প লেখার পর সেটা ফিরে পড়তে গিয়ে ভাল না লাগলে কিংবা অসম্পূর্ণ মনে হলে, তখন কী করেন? 
অমর মিত্র : রেখে দিই। ছ'মাস বাদেও অসম্পূর্ণ গল্প সম্পূর্ণ হয়েছে। এইভাবে 'হারানো নদীর স্রোত' গল্পটি লিখেছিলাম। এখনও এক-দু'মাস ফেলে রেখে হয়।  

এমদাদ রহমান : আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সংশয় প্রকাশ করেছিলেন যে বাংলা ছোটগল্প মরে যাচ্ছে। তিনি এই সময়ের গল্পে জীবনের নানামাত্রিক জটিলতাকে ধরবার ক্ষেত্রে বাংলা ছোটোগল্পের ব্যর্থতাকে দেখেছিলেন। গল্পগুলোকে ব্যর্থ হয়ে যেতে দেখেছিলেন। আপনি কী বলবেন? 
অমর মিত্র : আমি এক মত নই। একদমই এক মত নই। বাংলাদেশেই হাসান আজিজুল হক, শহীদুল জহির, নাসরিন জাহান আরও কেউ কি সেই ব্যর্থতাকে প্রমাণ করেছেন?   

এমদাদ রহমান :  ফর্ম এবং কাঠামো-- গল্প লিখতে গিয়ে কোনটিকে গুরুত্ব দেন? 
অমর মিত্র : দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফর্ম না এলে গল্প বলা যায় না। আর গল্প না এলে ফর্ম তো ভানাই যায় না। 

এমদাদ রহমান : এখানে আপনার গল্প লেখার রসায়ন অর্থাৎ গল্প কি আগে থেকে ভেবে নিয়ে লেখেন, নাকি লিখতে শুরু করে শেষের দিকে এগিয়ে যান? 
অমর মিত্র : না, আমি একটি বিন্দু থেকে শুরু করি। সম্পূর্ণ অজানা পথেই শুরু হয় এই যাত্রা। 

এমদাদ রহমান : এই বিন্দু কী? এটা কি কোন শব্দ? বাক্য?  কোনো ভাব-বিন্দু? চরিত্রবিন্দু? দ্বন্দ্ব-বিন্দু? পরিণতিবিন্দু? 
এই বিন্দুকে আশ্রয় করে যে গল্প বা উপন্যাসটি লেখেন--তা লিখতে লিখতে কিভাবে চরিত্রগুলো আসে, উপাখ্যানগুলো আসে? লিখতে লিখতে কিভাবে এই নানাবিধ চরিত্রকে, উপাখ্যানগুলিকে, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, পরিণতি এবং দার্শনিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করেন? এবং ভাষাভঙ্গিকে নির্বাচন করেন?
অমর মিত্র : উপন্যাসে অনেকটা মাথায় থাকে। কিন্তু লিখতে বসলে তা বদলে যায় ক্রমাগত। আর গল্পে সামান্য কিছু থাকে চেনা। জানা। তা থেকে অনেকটা গড়ে ওঠে। এর ভাষা, কথন-ভঙ্গি, পরিণতি- সবই লিখতে লিখতে হয়। ভাবনা আর লেখা এক সঙ্গে চলতে থাকে। 

এমদাদ রহমান : আপনার ধনপতির চর এবং ধ্রুবপুত্রকে যদি ধরি তাহলে দুটো দুধরনের আখ্যান নিয়ে লেখা। ধনপতির চরের কাহিনী ভূমি দখলের কাহিনী। নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার আখ্যান। নানা মানুষ এসেছে। নানা সময় এসেছে। ইতিহাস, কিংবদন্তি এসেছে। আবার সমকাল এসেছে। কিন্তু ধ্রুবপুত্র পুরোটাই পুরাণভিত্তিক আখ্যান। তার চরিত্র, স্থান-কাল, সেটিং সবই কালিদাসের কালে পাঠককে নিয়ে যায়। ফলে দুটোর ভাষাভঙ্গীও আলাদা। ধ্রুবপুত্রের ভাষাভঙ্গী মহাকাব্যিক, সৌকর্যময়।
সুবোধ ঘোষ যখন মহাভারতের উপাখ্যান থেকে ভারত প্রেমকথা লেখেন তখন তার ভাষা অতি গুরুগম্ভীর। দীর্ঘবাক্য। সংস্কৃত-বহুল শব্দ। এই ভাষাভঙ্গীর জন্য আলাদা প্রস্তুতি থাকা দরকার। এই ভাষাভঙ্গীই বলে দেয়--আপ্নাকে বিশেষ আখ্যান, সময়, চরিত্রের কাছে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আবার বাণী বসু যখন বুদ্ধকে নিয়ে লেখেন মৈত্রেয় জাতক সেখানেও ভাষাভঙ্গি তিনি নির্মাণ করে দীর্ঘবাক্য, পালিভাষাবহুল শব্দ ব্যবহার করেছেন।
এই যে ভাষাভঙ্গি আপনি নির্মাণ করলেন, সেটা কেন করলেন? কিভাবে করলেন? 
এই ধ্রুবপুত্রের যে স্থান, চরিত্রগুলোর নামগুলোর আমাদের মনে চরিত্রগুলো সত্যি। সবগুলো চরিত্রই ঐতিহাসিক। এই চরিত্র, স্থান কিভাবে এনেছেন আপনি? এর জন্য কি বিশেষ ধরনের পড়াশুনা করতে হয়েছে? পড়া হয়ে থাকে সেই বইগুলোর নাম কি? 
অমর মিত্র : ধ্রুবপুত্র কোনো ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক বিষয় নয়। এর সমস্তটাই আমার নির্মাণ। এর বীজ কোথাও নেই, ছিল না। আমি উজ্জয়িনীতে বেশ কয়েকবার গিয়ে দেখেছিলাম, খরাপ্রবণ এলাকা। বৃষ্টিপাত খুব কম। আমি মেঘদূত কাব্যে যে উজ্জয়িনীর ছবি দেখেছি, সেই বর্ষার অপরূপ বর্ণনা, তার সঙ্গে এখনকার বাস্তবের মিল নেই। সেই দেখা থেকেই মেঘদূত কাব্যের বিপরীত এক আখ্যান রচনার কথা ভাবি। আমার মনে হয়েছে, বৃষ্টিহীন উজ্জয়িনীর কথা না লিখে বর্ষার যে কথা লিখেছিলেন সেই প্রাচীন কবি, সমস্তটাই ছিল তাঁর ইচ্ছা পূরণ। মনে হয়েছিল মেঘদূত কাব্য লিখে বর্ষার মেঘকে ডেকে এনেছেন কবি। ওই কাব্যই যেন বৃষ্টির মন্ত্র। আমি কল্পনা করতে ভালবাসি। এই কাহিনি, খরা পীড়িত উজ্জয়িনীর কাহিনি আমি ভেবেছি। সমস্ত চরিত্রই আমার। ইতিহাস বা পুরাণে নেই। লিখতে গিয়ে আমি সংস্কৃত সাহিত্য পড়েছি, কৌটিল্যের অর্থ শাস্ত্র পড়েছি, বিক্রমাদিত্যের উপর বই পড়েছি, বাৎস্যায়ন পড়েছি, পুরাণও। প্রাচীন ভারতের নারীদের কথা সুকুমারী ভট্টাচাযের বইয়ে পড়েছি...এই সব পাঠ শুধু সময় আর সমাজকে জানতে। বাকিটা আমার মতো করে লিখে গিয়েছি। কে ছাপবে জানতাম না। কোনো পত্রিকা বলেনি লিখতে। কেউ ধারাবাহিক করেনি। রমাপদ চৌধুরী এই উপন্যাসের কথা শুনে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কে ছাপবে, কোন পত্রিকা?  আমি বলেছিলাম, কেউ না। কেউ বলেনি। রমাপদবাবু তখন জিজ্ঞেস করেছিলেন, তাহলে যে লিখছেন? বলেছিলাম, ভিতরের তাড়না থেকে। উনি বলেছিলেন, লিখুন, উপন্যাসটি হবে। সরাসরি বই হয়েছিল বলা যায় এই উপন্যাস। আমার আত্মবিশ্বাস আমাকে দিয়ে লিখিয়েছে। বই হওয়ার পর উদ্বেগে ছিলাম, তা অচিরেই দূর হয়েছিল। এই উপন্যাসে প্রাচীন কাল, উজ্জয়িনী নগর, কবির নিরুদ্দেশ যাত্রা এবং অশেষ বৃষ্টিহীন দিনের আরম্ভ, কবির সঙ্গে জ্ঞানের নিবার্সন, জ্ঞানই হলো মেঘ এবং মেঘের নিবার্সন, মানুষের জন্মকাল বিলম্বিত হয়ে ওঠা... রূপকে আমার দেশকে নির্মাণই যেন করেছে। ক্ষমতার অন্ধকারকে দেখিয়েছে। উপন্যাস যখন লেখা শেষ হয়, ২০০২-সালে, আমার ভারতবর্ষ তখন ক্ষমতার দম্ভ দেখেছিল, হননকাল দেখেছিল, তার ছায়া কি পড়েনি? পরে আমি শুনেছি, সেই ছায়া আছে, কিন্তু আমি সজ্ঞানে তো করিনি। সময় ছায়া ফেলেই যদি আপনি সময় সচেতন হন। প্রাচীনেও বর্তমান মিলে মিশে যায়।  

এমদাদ রহমান : ১৯৪৭ সালে দেশভাগের ফলে পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশ নামে যে আলাদা ভূখণ্ডের জন্ম হল তাদের মধ্যে ধীরে ধীরে সে সাহিত্য নির্মাণ হল তার মধ্যে--কালপরিক্রমায় আখ্যানগত ও ভাষাগত পার্থক্য দেখা যায়। পশ্চিমবঙ্গের লেখায় সেই পুরনো ফোর্ট উইলিয়াম উদ্ভুত সংস্কৃত-জাত শব্দ, বাক্য ব্যবহৃত হচ্ছে যাকে প্রমিত নামেও বলা যেতে পারে।। বিশাল ভারতের অংশ হিসেবে বহুমানুষ-বহুভাষা-সংস্কৃ্তির মধ্যে দিয়ে যেতে হলেও সাহিত্যের ক্ষেত্রে আপনারা সেই প্রমিত ভাষাকে অবলম্বনই করে লিখছেন। কিন্তু বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গের মত মাল্টি-লিঙ্গুয়াল, মাল্টি-কালচারাল মিশ্রণের সুযোগ না থাকলেও সংস্কৃতনুসারী শব্দ-ভাষাভঙ্গি থেকে ধীর ধীরে সরে যাচ্ছে। বা সরে যাওয়ার একটি আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। প্রমিত বাংলার বদলে নানাবিধ আঞ্চলিক ভাষা বা ডায়ালেক্টকে ব্যবহার করার চেষ্টা হচ্ছে। এই বিষয়গুলোকে কীভাবে দেখেন আপনি?
অমর মিত্র : আপনাদের বাংলায় মুসলমানি শব্দ, অরথ্যাত আরবি শব্দ, এবং উর্দু শব্দের আধিক্য আছে। তাতে ক্ষতি কী? শব্দভাণ্ডার বাড়ছে। আমাদের এদিকে তেমন মিশ্রণ ঘটছে কি? হিন্দি ঢুকছে। ইংরিজি তো ঢুকেছে বহুদিন আগে থেকে। ভিন্ন ভাষার শব্দ প্রবেশ করলে ক্ষতি নেই। আমাদের এদিকে উপভাষাও প্রবেশ করছে আপনাদের মতো। পুরুলিয়া, মেদিনীপুরের উপভাষা,  কোচবিহার, জলপাইগুড়ির রাজবংশী ভাষা ঢুকছে গল্পে উপন্যাসে।  

এমদাদ রহমান : আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়-- পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যের মধ্যে মুসলমানদের ইতিহাস, ঐতিহ্য-পুরাণ নিয়ে লেখা পাওয়া যায় না। আবার বাংলাদেশের লেখকদের মধ্যে ভারতীয় পুরাণ, ইতিহাস, ঐতিহ্যকে এড়ানোর একটা চেষ্টা লক্ষ্যণীয়। এভাবে দুদেশের সাহিত্যের মধ্যে সুস্পষ্ট বিভাজন রেখা দেখা যাচ্ছে। এ ঘটনাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান লেখকরা লিখছেন মুসলমানদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, পুরাণ নিয়ে। হিন্দু লেখকরাও চেষ্টা করছেন না যে তা নয়। আসলে ইসলাম নিয়ে অজ্ঞতাই না লেখার কারণ, আর কিছু না। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের শাহজাদা দারাশুকো পড়ুন, তার ভিতরে আছে আশ্চয অভীপ্সা। বাংলাদেশের লেখকরা যদি ভারতীয় পুরাণ, ইতিহাস, ঐতিহ্যকে এড়িয়ে যান, ভুল করবেন কেন না ওটা ভারতের নয়, এই উপমহাদেশের। রামায়ন মহাভারত, পুরাণ সকলের। ও সব ধর্ম গ্রন্থ বলে আমি মনে করি না। কিন্তু বাংলাদেশের উপন্যাসেই দেখেছি পঞ্চ পান্ডবকে হিন্দু দেবতা বানিয়ে জারজ বলে নিন্দা করেছে উপন্যাসের চরিত্র। এই দেখাটাই ভুল। বোঝাটাও ভুল। বুঝতে হবে রামায়ন মহাভারতের উপর হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ এবং এই উপমহাদেশের খ্রিস্টানদের সমান অধিকার। রাম মন্দির-টন্দির ফালতু রাজনীতি। রাম দেবতা নন। খ্রিস্টান মধুসূদন কি মেঘনাদ বধ কাব্য লেখেননি?   
অমর মিত্র : আমি তো বললাম। আর কি বলব। রামায়ণ মহাভারত- হিন্দু মুসলিম সকলের। 

এমদাদ রহমান : গল্প দিয়ে কি কোনও বিশেষ বক্তব্য বা মেসেজ দিতে চান পাঠককে? 
অমর মিত্র : আমি আমার কথাই বলতে চাই। নিজে এই পৃথিবী, এই সমাজকে কেমনভাবে অনুভব করছি, তা। এইটাই আমার কথা। 

এমদাদ রহমান : কখনও একটি গল্প পাঠকের মনে আজীবন গেঁথে থাকে। আমরা হাসান আজিজুল হকের আত্মজা ও একটি করবী গাছ গল্পটির কথা ভুলতে পারি না। লেখকই তাকে ভুলতে দেন না। এমন কেন হয়? মানে, একটি গল্পে এমন কী থাকে, যে মানুষ তাকে ভুলতে পারে না?    
অমর মিত্র : আমি যদি কোনোভাবে নিজেকে শনাক্ত করতে পারি গল্পের ভিতর, তবে তা মনে গেঁথে যায়। আমার ভাবনার সঙ্গে মিলে গেলেই আমি তা ভুলতে পারি না মনে হয়। 

এমদাদ রহমান : শুধু আধুনিককালেই নয়, সব সময়ই লেখকজীবনের অনুষঙ্গ হয়ে থাকে নিঃসঙ্গতা। সলিচিউড। ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অব সলিচিউড! অতীতেও ব্যাপারটা ছিল। এখনও আছে। আগামীর লেখকজীবনেও থাকবে। জানতে চাই, একজন লেখক কি নিঃসঙ্গ? 
অমর মিত্র : নিঃসঙ্গ তো নিশ্চয়ই। হাটের মধ্যে তো তিনি বাস করেন না। নিজেকে আলাদা করে নিয়েই নিজের ভিতরে তাঁর প্রবেশ। 

মেহেরুন্নেসা মৌ :  প্রিয় লেখক নিয়ে বলেন। কেন তাঁকে পড়েন। কী তাঁর ভাল লাগে। কোন ব্যাপারটা আপনাকে টেনেছে? 
অমর মিত্র  : অনেক লেখকই আমার প্রিয়। ভাল লেখা পড়তে ভাল লাগে। গল্পগুচ্ছ যেমন, প্রেমেন্দ্র মিত্র তেমন। তিন বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শ্যামল, হাসান আজিজুল হক, ইলিয়াস, ওয়ালীউল্লাহ্‌, মহাশ্বেতা, সিরাজ এবং ঔপন্যাসিক দেবেশ রায়... সকলেই আমার প্রিয়। আলাদা করে একজন তেমন নেই। 

জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা : নিজের লেখা গল্পে আপনার সবচে প্রিয় লেখকের প্রভাব কি পড়েছে?
অমর মিত্র : আমি শিখেছি প্রিয় লেখকদের পড়ে। কিন্তু আমার উপর কোনও লেখকই কো নো প্রভাব ফেলেছেন বলে মনে হয় না। 

এমদাদ রহমান : সমকালীন বাংলাসাহিত্য এবং বিশ্বসাহিত্যের মূল প্রবণতাটিকে লক্ষ্য করলে, সেখানে ঠিক কোন পার্থক্যটি আপনার কাছে বিশেষভাবে ধরা পড়ছে?  
অমর মিত্র : কী জানি, আমার মনে হয় বাংলাভাষায় অনেক ভাল লেখা হয়। বিশ্বসাহিত্যের তেমন খবর আমি রাখতে পারি না। আমার তো মনে হয়, গল্পে হাসান আজিজুল হক, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় আর উপন্যাসে দেবেশ রায়, বিশ্বের যে কোনও ভাষাকে গর্বিত করতে পারেন। এঁদের তো অনুবাদ হয়নি তেমন। 

এমদাদ রহমান : এই প্রশ্নটি বেশ আগে হাসান আজিজুল হককেও করা হয়েছিল। এখন আমি আপনার কাছে জানতে চাইছি, মানুষ আপনার লেখা কেন পড়বে? আসলে জানতে চাইছি, মানুষ সাহিত্য পড়বে কেন? কী সেই প্রয়োজন? 
অমর মিত্র  : সুন্দরের প্রতি তৃষ্ণা থেকেই পড়বে। অসুন্দকে বুঝে নিতেও পড়বে। 

এমদাদ রহমান :  মানুষ কি খুব দ্রুত বই বিষয়টি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে?
অমর মিত্র : জানি না। বই থাকবে। 

এমদাদ রহমান : একটি চিরকালীন প্রসঙ্গে আসছি। উম্‌বের্তো একো'কে বইয়ের ভবিষ্যৎ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, দ্য বুক উইল নেভার ডাই। আপনি কী বলবেন?
অমর মিত্র : বলছি তো, বই থাকবে। 

এমদাদ রহমান :  বাংলাভাষার পাঠক কি কমছে? বাংলা সাহিত্যের পাঠক? আপনার পশ্চিমবঙ্গে?
অমর মিত্র : সিরিয়াস লেখা চিরকালই কম পাঠক পড়েন। তাঁরা আছেন। আর অন্য বানিজ্য সফল লেখক কি নেই। আছেন। পাঠক কমছে না বাড়ছে জানা নেই। ভাবি না। আমাকে কেউ, কোনও বড় প্রতিষ্ঠান ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে পাঠক উপহার দেননি, যা এপারে হয়ে থাকে। তাঁদের কথাই আপনারা জানেন। আমার অর্জন নিজের অর্জন। আমি তা হারাব না। আমার নিজস্ব পাঠক বাড়ছে বলে আমার মনে হয়।

এমদাদ রহমান : ঠিক কী কারণে, কোন অমোঘ টানে কিংবা কী সেই রহস্য যে একদিন আপনার মনে হয়েছিল লিখতে হবে? 
অমর মিত্র : আমাকে কেউ, কোনও বড় প্রতিষ্ঠান ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে পাঠক উপহার দেননি, যা এপারে হয়ে থাকে। তাঁদের কথাই আপনারা জানেন। আমার অর্জন নিজের অর্জন। আমি তা হারাব না। আমার নিজস্ব পাঠক বাড়ছে বলে আমার মনে হয়। 

মেহেরুন্নেসা মৌ : প্রিয় অমর'দা, মানুষ তো কতকিছু হয়। এই যে এত কিছুর বদলে লেখক হলেন, আকাশে বিমান চালালেন না, ট্রাক ড্রাইভার হলেন না, ব্যাংকে বসে টাকা গুনলেন না, অশ্ব চরিত লিখলেন, ধ্রুবপুত্র লিখলেন, এতগুলি প্রাণস্পর্শী গল্প লিখলেন, মানুষের কাছে পৌঁছালেন...
ব্যাপারটা আপনার কাছে কেমন লাগে? কেন একটি কলমকে জীবনসঙ্গী করে নিলেন আপনি? 
অমর মিত্র : ভিতরের টান থেকে। একটা গল্প লেখা, উপন্যাস লিখে উঠতে পারার আনন্দ কি আমি অন্য কাজে পেতাম? এখানে পেয়েছি। নিজের কথা বলছি নিজের মত করে। আমি স্রোতের বিপরীতে যেতে পেরেছিলাম বলেই জীবনটাকে এমন আনন্দময় দেখতে পেলাম। 

এমদাদ রহমান : লিখে কি সমাজ পরিবর্তন করা যায়? আসলে, আমার জিজ্ঞাসা লেখালেখির কী উদ্দেশ্য থাকে? কী করতে চেয়ে একজন লেখকের হাত দিয়ে লেখা বের হয়?  
অমর মিত্র : না না, লেখা মানুষকে সুন্দরের কাছে নিয়ে যায়। অসুন্দরকে চিহ্নিত করে দেয়। সমাজ পরিবর্তন অন্যভাবে হয়। 

এমদাদ রহমান : লেখা যদি মানুষকে সুন্দরের কাছেই নিয়ে যায়, তবে কি বিশাল কোনও পরিবর্তনে সাহিত্যের ভূমিকাটি গৌণ? 
অমর মিত্র :  সুন্দরকে স্পর্শ করা কি বড় কিছু নয়? 

এমদাদ রহমান : এই যে আমাদের দেশে একজন লেখককে রাতের ঢাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হল... কী বলবেন? কোনও আলো দেখতে পান, লেখক হিসাবে? 
অমর মিত্র : ভয় পেয়েছে ওরা, তাই হত্যা করেছে। এ হল গুপ্তহত্যা। আসলে এ কিন্তু মুক্তচিন্তারই বিপক্ষে যারা আছে, সেই হিংস্রতাবাদীদেরই আতঙ্কের প্রকাশ। আরও লিখতে হবে সত্য কথা।   

জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা :  আপনার লেখালেখিতে দেশভাগ রয়েছে বিশাল একটি অংশজুড়ে। দেশভাগকে কেন্দ্র করে রচিত আপনার সেইসব গল্প-উপন্যাসের পাত্র-পাত্রীদের মাঝে কখনো কখনো হাহাকার দেখা যায়। আবার সুগভীর এক আকুতি দেখা যায়। সীমান্তরেখা বিলীন করে মানুষে-মানুষে একাকার হওয়ার অসাধারণ এই আকুতি বোঝা যায়। কিন্তু এই সময়ে এসে ইতিহাসের পাঠ থেকে বোঝা যায় সেই একাকার হওয়ার হওয়া সম্ভব নয়। তাহলে কেনো এই হাহাকার? কেনো এই একাকারের আকুতি?
অমর মিত্র : কিছুই না। দেশ ভাগের বিপক্ষে আমার মত রেখে যাওয়া। নোট অফ ডিসেন্ট। 

এমদাদ রহমান : আমি এখানে দেশভাগ নিয়ে, বিশেষ করে দেশভাগের সাহিত্য প্রসঙ্গে দেবেশ রায়ের একটি মন্তব্য উল্লেখ করছি যা তিনি ১৯৯৯ সালে সাহিত্য একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত দেশভাগ-বিষয়ক গল্প সংকলন 'রক্তমণির হার'-এর ভূমিকায় করেছিলেন। তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও সতীনাথ ভাদুরীর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন-- 'এই চারজনের কেউই, বা প্রথম মহাযুদ্ধের কাছাকাছি সময় থেকে '৩০ সাল নাগাদ যাঁদের জন্ম, যাঁরা এই '৪৭ সালেরই কিছু আগে গল্প-উপন্যাস লেখা নিজেদের মতো শুরু করেছিলেন সেই নবীনরাও কেউই দেশভাগ-স্বাধীনতাকে একটা পরিণতিবিন্দু বা আরম্ভবিন্দু হিসেবে আবিষ্কার করেননি। করেননি যাঁরা বিশের দশকে আধুনিকতার একটা ধারণা থেকে গল্প-উপন্যাস লিখছিলেন। অথচ এই তিন-বয়সী লেখকরা প্রায় প্রত্যেকেই মাত্র এক বছর আগের (১৯৪৬) দাঙ্গা নিয়ে, মাত্র চার বছর আগের দুর্ভিক্ষ (১৯৪৩) নিয়ে, এমনকি '৪৫ থেকে '৪৭ পর্যন্ত নানা রকমের তুঙ্গ রাজনৈতিক আন্দোলন (রশিদ আলি দিবস, নৌবিদ্রোহ, সরকারি কর্মী ধর্মঘট) নিয়ে গল্প-উপন্যাস লিখছিলেন। অথচ তাঁরা কেউই দেশভাগের মতো ঘটনার যে অচিন্ত্যপূর্বতা, লাখ লাখ মানুষের যে উদ্বাসন, পশ্চিমবঙ্গের জনবিন্যাসে যে অভাবিত আলোড়ন সেই আঁকাড়া বাস্তবকে গল্পকার-ঔপন্যাসিকের দাপটে আঁকড়ে ধরলেন না। বিবেচ্য এই অভিজ্ঞতাটুকু যে যুদ্ধ-দুর্ভিক্ষ-দাঙ্গায় বাংলা গল্প-উপন্যাস যে নৈতিক জিজ্ঞাসায় কাতর হয়ে আধেয় কল্পনার মৌলিক বদল ঘটিয়েছিল, দেশভাগ-স্বাধীনতা তা ঘটাল না। এ নীরবতার কারণ নানাজন নানাভাবে খুঁজতে পারেন। সত্য হয়তো ছড়িয়ে আছে সেইসব সন্ধানের মধ্যে। আমাদের শুধু এই সত্যটুকু স্বীকার করে নেওয়া- সেই মুহূর্তে বাংলা গল্প-উপন্যাস বস্তুত নীরবই ছিল।'
আপনি বলুন, এই নীরবতার কারণটি কী?  
অমর মিত্র : আমি জানি না। প্রধান তিন লেখক দেশভাগকে অনুভব করেননি। সতীনাথও না। পরে অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু অসামান্য লিখেছেন। মহৎ লেখা নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে। 

জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা : আপনি আপনার গল্পে পাঠককে খুব আড়ম্বরে কোন মেসেজ দেন না।  তারপরও ছোট্ট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কোন মেসেজ সেখানে থাকেই।  আপনার গল্পে চরিত্রের তেমন বর্ণনা না দিয়েও চরিত্রগুলোকে জীবন্ত করে তোলেন, শুধুই তাদের বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন অনুভূতিকে এঁকে।  আপনার গল্পকে আপনার নিজের জীবন থেকে বলা কোন ঘটনা মনে হয়; আর স্বাভাবিকভাবেই পাঠকের কাছে তা তখন সত্যি গল্প হয়ে যায়। পাঠক 'গল্প' শুনতে চান কিন্তু গল্পটাকে নিছক 'গল্প' ভাবতে চান না; মনের অজান্তেই সত্যি ভেবে নিতে চান। ... আচ্ছা, অমর'দা আপনার মতে, এই গুণাবলীগুলোর ঠিক কোনটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, গল্পটি পাঠকের মনে গেঁথে যেতে? 
অমর মিত্র : গল্প যদি কাহিনি থেকে বেরিয়ে এমন কোনো স্পর্শ দেয় আপনাকে... আপনি যদি মনে করেন যা পড়লেন তা আপনার জীবনেও হতে পারত। ঘটেনি কিন্তু ঘটতে পারত..., তবে তা পাঠক নিজের কাছে রেখে দেন। 

জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা : লেখক মাত্রেরই কল্পনার বিশাল এক জগত থাকে।  কল্পনার সে জগতে লেখক বাস করেন, আবার ফিরে আসেন।  লেখক লেখেন; সেই জগতে অবস্থান করেই কিংবা ফিরে এসে ঐ জগতের উপাদান গুলোকে সঙ্গী করে।  এই জগত তৈরি হতে পারে খুব ছোটবেলা থেকেই, বিশেষ পারিবারিক আবহে  কিংবা প্রচুর পড়াশোনার সাথে নিজস্ব দেখার বিচিত্রতা মিলে মিশে কিংবা আরও অন্য কোন ভাবে।  আপনার একজন পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়, ছেলেবেলাতেই ‘লেখক অমর মিত্র’ এর সেই জগতটি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। পরে একনিষ্ঠ জ্ঞানচর্চায় তা আরো পরিণত হয়েছিল।  হ্যাঁ, পাঁচ/ছ’বছর বয়সে দেশভাগের ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হওয়া বিশাল সে গল্পঝুলির কথাই বলছি।  ক্রমশ শুনে চলা 'দুঃখ-শোকের' কিংবা 'ভাললাগা-হতাশা'র সমৃদ্ধ সে পারিবারিক স্মৃতিবয়ান কি আসলেই কোন ভূমিকা রেখেছিল আপনার এমন 'গুণী সাহিত্যিক' হয়ে ওঠায়?  'লেখকের কল্পলোক'টি তৈরি করে দেয়ায়? বলবেন একটু আপনার মতো করে, 'আপনার মনে হওয়া' দিয়ে?
অমর মিত্র : আমার জন্ম ১৯৫১। দেশভাগের পরে। আমি কিন্তু আমাদের সেই গ্রাম ধূলিহরে থেকেছি ৪-৫ বছর। বাকিটা আমার মায়ের কাছ থেকে পাওয়া। শিকড়ের টান সাঙ্ঘাতিক। মায়ের দেওয়া গল্পই আমার গল্প। 

জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা : আপনার অনেক লেখায় পৈত্রিক নিবাস সাতক্ষীরা'র কথা এসেছে;  বেতনা পারের 'বড়দল গ্রাম', গল্পের পাত্র-পাত্রীদের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়েছে। এই যে বারবার 'সাতক্ষীরা'কে লেখেন; যেমন জেমস জয়েসের কাছে ডাবলিন।  একি শুধুই লেখার প্রয়োজনে অধুনা পূর্ববঙ্গের একটি জেলার নাম লেখেন? নাকি সাতক্ষীরা আপনার কাছে প্রতীক হয়ে উঠেছে? প্রতীক হয়ে উঠলে তার কারণ কী বলে মনে করেন?
অমর মিত্র :  সাতক্ষীরে গ্রেট। কিছুই চিনি না সেই শহরকে কিন্তু মনে হয় সমস্তটা জানি। সাতক্ষীরের কাঁচাগোল্লার মতোই সাতক্ষীরে আমার কাছে মধুর। আমি আমার ভিতরে সাতক্ষীরেকে নিজের মতো করে নির্মাণ করে নিয়েছি। 

জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা : লেখকের কাছে তাঁর নিজের লেখাগুলো ঠিক সন্তানের মতো।  তবু যদি জানতে চাই, আপনার প্রিয় লেখা কোনটি (নিজের সব লেখার মাঝে), বলবেন কি? ... আচ্ছা অমর'দা আপনি কি আপনার স্বপ্নের লেখাটি লিখে ফেলেছেন, নাকি আজও অপেক্ষা করছেন সেই বিশেষ লেখাটির জন্য? 
অমর মিত্র :  লিখতে চাই তো যা লিখেছি তার চেয়ে বেশি কিছু। একেবারে আলাদা কিছু। ধ্রুবপুত্র, অশ্বচরিত, ধনপতির চর, দশমী দিবসে ছাড়িয়ে কিছু। দেখা যাক। প্রিয় উপন্যাস, আমি তো পড়ব না। আপনারা বলুন। 

জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা : আগে বই-পত্রে লেখালেখির সময়ে লেখক ছিলেন দূরের মানুষ। কোনো কৌতুহলী পাঠক পত্রিকার সম্পাদক বা বইয়ের প্রকাশকের মাধ্যমে লেখকের কাছে চিঠি লিখে তাদের প্রতিক্রিয়া জানাতেন। সেটা ছিল সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। টেকনোলজির অভূতপূর্ব অগ্রগতিতে আজকের পাঠকের কাছে 'লেখক' আর তেমন দূরের কেউ নন। লেখক যেকোনো লেখার পরপরই সরাসরি জানতে পারছেন তাঁর পাঠকের প্রতিক্রিয়াটি। আপনার ক্ষেত্রেও ঘটে নিশ্চয়ই তেমনই। এটি কি লেখকের পরবর্তী কোন 'লেখার চিন্তাভাবনা'কে বদলে দেয়? জানাবেন অমর'দা, আপনি এটি কিভাবে দেখেন, আপনার লেখায়?
অমর মিত্র : প্রতিক্রিয়ার জন্য বসে থাকি। 

জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা : এপার বাংলা-ওপার বাংলা মিলিয়ে অনেক পাঠক রয়েছে আপনার।  আপনি কি সন্তুষ্ট এখনকার পাঠকের পাঠকীয় গুণাবলী বা রুচির উপর?  আপনি তো অনেক ঘুরে বেড়ান, পাঠককে খুব কাছ থেকেও দেখেন;  দুই বাংলার পাঠকের পাঠরুচিতে উল্লেখযোগ্য কোন পার্থক্য কি আপনি দেখেছেন?
অমর মিত্র : পাঠক তাঁর মতো করে পড়েন। আমি বলব কেন? দুই বাংলার পাঠকে তফাৎ হবে কেন? 

জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা : গল্প নাকি উপন্যাস কোনটি আপনার মতে অধিক শক্তিশালী, পাঠকের মনোজগত পজিটিভলি বদলে দিতে?  
অমর মিত্র : দুটিই। চেখবের কেরানির মৃত্যু গল্পের কথা ভাবুন। দস্তয়েভস্কির
ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট...। 

জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা : আপনার প্রিয় কোন লেখক বা প্রিয় কোন মানুষের আইডোলজি কি আপনার লেখায় কোথাও না কোথাও ছায়া ফেলে? 
অমর মিত্র : মাকে খুব পাই। বাবাকেও। তাঁরা সরল ও ভাল মানুষ ছিলেন। উদার হৃদয় ছিল তাঁদের। 

জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা : নতুন গল্পকারকে ভাল গল্প লিখতে বা উৎসাহ দিতে, আপনার কোন উপদেশ যদি জানাতেন?
অমর মিত্র : লেখা সাধনার মতো। একে সেই ভাবে নিতে হবে। 

এমদাদ রহমান : কাল বা সময়কে কীভাবে দেখেন? এই যে হকিং বলছেন, সময়ের একমুখী তীরের কথা। সময় ছুঁড়ে মারা তীরের মত, আর ফিরে না, শুধু সামনে এগিয়ে যায়। সময় বহিয়া যায়! শ্যামল যে বলেন- সময় বড় বলবান। এই যে সময়, এই যে মুহূর্ত, মুহূর্তই মুহূর্তের শেষ... এই যে অতীত, বর্তমান, অনাগত কাল...মহাকাল... কী বলবেন, সময় সম্পর্কে?
অমর মিত্র : সময় আমার কাছে থেমে আছে। কিন্তু এর বিস্তার অনেক অনেক। পেছনে, সামনে তাকিয়ে দেখুন, আমার পিতৃপুরুষ এবং আমার অনাগত উত্তরপুরুষ দাঁড়িয়ে আছে। 

এমদাদ রহমান : আগামী দিনের পৃথিবীকে কেমন দেখতে চান? একজন লেখকের কাছে তাঁর স্বপ্নের পৃথিবীটা কেমন? কী থাকবে আর কী বাতিল করতে হবে?
অমর মিত্র :  সভ্যতা যেন ধ্বংস না হয়। 

মেহেরুন্নেসা মৌ : আপনার লেখার ঘর সম্পর্কে বলুন। দিনের ঠিক কোন সময়টাতে লেখেন? লেখালেখির ক্ষেত্রে বিশেষ কোনও নিয়ম মেনে চলেন কি? 
অমর মিত্র :  আমি সকালে লিখি ঘন্টা ৫। কোনোদিন বিকেলেও। রাত জাগি না। আমার ঘর সামান্য। বইয়ে ভরা। কাজের বইটিকে খুঁজে পাই না। দক্ষিণ খোলা। শব্দের উৎপাত নেই তেমন।  

মেহেরুন্নেসা মৌ : আপনাকে এমন কথা বলতে শুনেছি, আপনি বলছেন- আমার নিজের কোনও সেরা গল্প নেই। সেরা গল্প আমি এই জীবনে লিখতে পারব কিনা জানি না। নিজেকে আমি এখনও খনন করে চলেছি... এই কথা কি আজও বলবেন? লেখালেখির এত বছর পরও?
অমর মিত্র : সেরা লেখা হয়ে গেলে আর কী লিখব, কেনই বা লিখব? 

মেহেরুন্নেসা মৌ : কীভাবে একটি গল্প লেখার ভাবনা মাথায় আসে?
অমর মিত্র :  আগেই তো বলেছি, একটি বিন্দু থেকে সিন্ধুর জন্ম হয়। গল্প এক অনিশ্চিত যাত্রা। ভেতরের টান থেকে লেখা আরম্ভ হয়। 

মেহেরুন্নেসা মৌ : গল্পের সমাপ্তি কি আগে থেকেই ভেবে রাখেন?
অমর মিত্র : সমাপ্তি ভাবলে লেখাই হয় না। অনিশ্চয়তাই শিল্পের মূল চাবিকাঠি। 

জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা : আপনি বলেন যে আপনি গদ্য লিখতে তাড়িত হন বলেই লিখেন। কী আপনাকে লিখতে তাড়িত করে?
অমর মিত্র : কোনো ঘটনা, কোনো দৃশ্য, একটি বাক্য...সব কিছুই তাড়িত করতে পারে। 

এমদাদ রহমান : লিখতে বসেই লেখক অনন্ত স্বাধীনতা ভোগ করতে পারেন-- এমন কথা আপনি বলেছেন। কী সেই অনন্ত স্বাধীনতা? 
অমর মিত্র : নিজের মতো করে নির্মাণ। সেখানে তো সীমান্ত, ধর্ম, সংবিধান...কিছুই নেই। আমি আমার মতো করে সাতক্ষীরেকে বর্ণনা করব। না মিললে বলব আমি তো ভুগোল বই লিখিনি। আমার সাতক্ষীরে এমনি। 

এমদাদ রহমান : আমরা যারা আপনার গল্প বা উপন্যাসের কাছাকাছি হয়েছি, তারা সবাই দেখেছি যে আপনার গল্পের একটি বিশাল অংশ জুড়ে এই ব্যাপারটা আছে। মানুষ কীভাবে সমস্ত কিছু হারাতে থাকে। এই ব্যাপারটি। তো, কোন সেই বিশেষ ভাবনা আপনাকে আপনার পাঠকের ভিতর মানুষের নিঃস্ব হয়ে পড়ার বোধটি সঞ্চারিত করে দেয়? পাঠক কি সব হারাবার গল্প পড়ার জন্য প্রস্তুত থাকে?
অমর মিত্র : মানুষের জীবন তো নিঃস্ব হওয়ারই জীবন। যা আমরা প্রকৃতি থেকে পাই, স্বাস্থ্য, সৌন্দয, যৌবন, সবই তো হারাই। আমি নিঃস্ব মানুষের সঙ্গ করেছি অনেক। সে ভূমিহীন চাষা থেকে কাজ হারানো শ্রমিক। এ থেকে এক বোধ, এক দর্শন আমার ভিতরে কাজ করে। আমি জানি না পাঠক কী পড়তে চায়। আমি যা লিখতে চাই, তাই লিখি।






সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীদের পরিচিতি 
জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা 
গল্পকার। প্রবন্ধকার। অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী।



মেহেরুন্নেসা মৌ
বাংলাদেশের নেত্রকোনা জেলার মেয়ে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করছেন। 


এমদাদ রহমান
বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলার কমল্গঞ্জে জন্ম, ১৯৭৯ সালে। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। গল্প লেখেন। ২০১৪-তে বের হয়েছে তাঁর প্রথম গল্প-সংকলন 'পাতালভূমি ও অন্যান্য গল্প'। অনুবাদ করেন। কবিতা, স্মৃতিকথা, চিঠি, নোটবুক আর ডাইরি পাঠ অনুবাদে আগ্রহী। 

1 টি মন্তব্য:

  1. পড়লাম। খুবই ভালো লাগল। অনেক না-জানা কথা জানলাম। একজন তরুণ যাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করবেন তাঁদেরই একজন কথাসাহিত্যিক অমর মিত্র।

    উত্তরমুছুন