শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০১৫

দীপেন ভট্টাচার্য-এর বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী : কাপ্রির নীল আকাশ

আমাদের সন্ধ্যেগুলো আরো রঙ্গীন হয়ে উঠছিল। ঘন লাল-কমলা মেঘ সূর্যের ছটাকে এমন ভাবে প্রসারিত করত মনে হত যেন দেবদূতরা সেই আলোচ্ছটা ধরে নেমে আসবে মর্ত্যে। শুধু মর্ত্য বলতে আমরা যা বুঝি তা বদলে যাচ্ছিল। বদলে যাচ্ছিল খুব দ্রুত।

আমাদের শহরের নাম ছিল কাপ্রি। আমি যে রাস্তায় ছিলাম সেই রাস্তার বাড়িগুলো খুব ছিমছাম ছিল। আমাদের শহর, যে শহরে জন্ম নিয়েছিল নামকরা আর্টিস্ট, কারিগর আর বিজ্ঞানীরা, সেই শহর একটা নীল সমুদ্রের পাড়ে গড়ে উঠেছিল।
সমুদ্রের সাদা ফেনা আর স্বচ্ছ নীল-সবুজ জল পেরিয়ে ধূসর দ্বীপ ভেসে থাকত দিগন্তে। গ্রীষ্মের সময় দিগন্ত ঘেঁষে উঠত যে সূর্য সারাদিন দিগন্ত ঘেঁষেই থাকত সে। আমরা সেজন্য কৃতজ্ঞ ছিলাম। আর আমার প্রতিবেশী মেয়েটির নাম ছিল উরাকা।

আমি ছোটবেলা থেকেই তাকে চিনতাম। আমাদের প্রায় একই বয়েস ছিল। ওদের বাড়ি ছিল আমাদের উলটো দিকে, আমাদের তিনতলা ফ্ল্যাট থেকে ওদের ফ্ল্যাট দেখা যেত। ওদের বাড়ির নিচে ছিল একটা ফুলের দোকান, আমাদের নিচে ছিল একটা আসবাবপত্রের দোকান। আর আমাদের সরু রাস্তাটা চলে গিয়েছিল সমুদ্রের দিকে, কিছুটা হেঁটে গেলেই অনেক নিচে, প্রায় একশো মিটার নিচে দেখা যেত সমুদ্রের জল, আছড়ে পড়ছে ধূসর সবুজ পাথরের ওপর।

তার সঙ্গে আমার কথা-বার্তাও হত, অন্ততঃ আমাদের যখন আট বছর বয়েস তখন পর্যন্ত। তারপর কি জন্য যেন আমাদের কথা বন্ধ হয়ে গেল। ও অন্য একটা স্কুলে পড়ত। কিন্তু উরাকার অনেক বন্ধুকে আমি চিনতাম, আমার অনেক বন্ধুকেও উরাকা চিনত। এদের মাধ্যমেই আমরা একে অপরের সব খবর রাখতাম।

কোন ভুল থেকে বোঝাবুঝি আমরা কথা বন্ধ করি নি। এটা যেন ছিল একটা খেলা, একটা অদৃশ্য চুক্তি। একটা চুক্তি যা কিনা কাগজে লেখা হয় নি। আমরা কোন একটা অব্যক্ত বোঝাপড়ার মাধ্যমে সেই চুক্তির শর্তগুলো ঠিক করেছিলাম। একটা শর্ত ছিল আমাদের মধ্যে সরাসরি কোন কথা হতে পারবে না। এখন ভাবলে হাসিই পায়, কি ছেলেমানুষী কাজই না করেছি। অতগুলো বছর চলে গেল!

উরাকা খুব মেধাবী মেয়ে ছিল। স্কুল শেষ করে কোন একটা বড় কারিগরী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেল। খুব নাম ছিল সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের। আমি একটা কারখানায় কাজ করতে গেলাম। রোবট বানানোর কারখানা। এই ধরনের রোবট খাটা-খাটনির কাজ করত, রাস্তা, বাড়ি, সেতু তৈরির কাজ, রাস্তা, অফিস, বাড়ি পরিষ্কার করার কাজ। সেই রোবটগুলো বানানোর জন্য অন্য ধরনের বড় রোবট ব্যবহার করা হত। সেগুলো আবার আমরা আমদানি করতাম সমুদ্রের ওপার থেকে। আমার কাজ ছিল সেই আমদানি করা রোবটগুলো পরীক্ষা করা। এমন কোন ব্যাপার নয়, একটা নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রে কিছু নির্দিষ্ট আদেশ দিলে রোবটগুলো সেই ভাবেই নিজেদের গুছিয়ে নিত। এর পরে তাদের আর কিছু বলে দিতে হত না।

কিন্তু আমরা জানতাম, আমরা যাই করি না কেন - কারিগরী উৎকর্ষতা, বৈজ্ঞানিক মৌলিক জ্ঞান, হৃদয়ের কোমলতা, দার্শনিক প্রজ্ঞা, কোনকিছুই, কোনকিছুই আমাদের আর সাহায্য করবে না। কারণ আমাদের সূর্য, যার ওপর আমরা আমাদের প্রায় সমস্ত কিছুর জন্য নির্ভর করি, যে কিনা আমাদের অন্নদাতা, আমাদের জীবনের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস যার আলোর ওপর নির্ভর, সেই সূর্য বদলে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে খুব দ্রুত। কারণ সূর্য সৃষ্টির পরে এখন সাত বিলিয়ন বছর পার হয়ে গেছে। সূর্য তার গভীর অভ্যন্তরের সব হাইড্রোজেন পুড়িয়ে ফেলছে। যত হাইড্রোজেন কমছে তত দ্রুত সূর্য বাদবাকি হাইড্রোজেন পুড়িয়ে শক্তি সৃষ্টি করছে যাতে সূর্য তার সাম্যাবস্থা রাখতে পারে, সে ধীরে ধীরে আরো আলোকময় হয়ে উঠছে। যত দিন যাচ্ছে তার গোলক আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। গত কয়েক হাজার বছর ধরে আমরা সেই তাপের বৃদ্ধিকে অনুধাবন করেছি। আমরা শীতলতার খোঁজে বাসস্থান পাল্টিয়েছি। পৃথিবীর সমস্ত বরফ গলে গিয়েছে। সমুদ্র দখল করে নিয়েছে পূর্বতন স্থল। শুধু দুটি মহাদেশ, একটি উত্তর মেরুর কাছে, আর একটি দক্ষিণ মেরুতে জেগে আছে। এক বিশাল সমুদ্র দুই মেরুর মহাদেশের মাঝে পৃথিবীকে ঘিরে রেখেছে। গত দু’ হাজার বছর ধরে বিষুবরেখার কাছে দ্বীপগুলোয় যারা থাকত তারা সবাই উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি স্থলে উঠে এসেছে। কিন্তু এখন সূর্যের প্রখর তাপে সমুদ্রের জল উবে যাচ্ছে। আমাদের গ্রহ শুক্রগ্রহ হয়ে উঠছিল।

ইতিমধ্যে পৃথিবীর সমুদ্রের অনেক জীবই লুপ্ত হয়ে গেছে। শুধুমাত্র মানুষের প্রকৌশল কৃত্রিম আবহাওয়ায় বাঁচিয়ে রেখেছে জীববৈচিত্র্য। কিন্তু এসবই এখন সময়ের ব্যাপার। মহাকালের ঘর্ষণে এখন পৃথিবীর যাবার সময় হয়েছে।

আমরা কি তার জন্য প্রস্তুত? না, শেষ ঘন্টা বাজার জন্য কে প্রস্তুত থাকে? তবু বলব আমাদের সভ্যতা, যার বয়েস এখন এক লক্ষ বছরের কাছাকাছি, এর জন্য ধীরে ধীরে আমাদের প্রস্তুত করেছে। আমরা আবিষ্কার করেছি আমাদের সৌরজগতের বাইরে লক্ষ লক্ষ গ্রহ। কিন্তু সেই গ্রহগুলো থেকে আমরা প্রাণের কোন সাড়া পাই নি। মহাবিশ্বের গভীর অন্ধকার থেকে ভিনগ্রহের কোন বেতার সংকেত পাই নি। কিন্তু আমাদের স্পৃহা তার জন্য থেমে থাকে নি। আমাদের বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও মহাকাশচারীরা চাঁদ ও মঙ্গল গ্রহে স্থায়ী স্টেশন স্থাপন করেছে, বৃহস্পতির চাঁদ ইউরোপায়, ইউরেনাসের চাঁদ টাইটানিয়ায়, সুদূর বামন গ্রহ এরিসে অস্থায়ী স্টেশন বসিয়েছে।

হাজার হাজার বছর ধরে এই সভ্যতা জেনে এসেছে যে একদিন আমাদের এই গ্রহ ছেড়ে যেতে হবে। আমাদের জনসংখ্যা এক বিলিয়ন থেকে কমে তিনশো মিলিয়ন হয়েছে। সেটা অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবেই করা হয়েছে। তিনশো মিলিয়ন লোক এই গ্রহ ছেড়ে যেতে পারবে না, সেটা আমরা সবাই জানতাম। নিতান্ত টোকেন হিসেবে, সভ্যতার গতিধারাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, আমরা মুষ্টিমেয় কয়েকজনকে সৌর জগতের বাইরে ভিন কোন গ্রহে পাঠানোর চেষ্টা করছিলাম।

অনেক দিন ধরেই আমাদের জ্যোতির্বিদরা দুটি লাল বামন তারাকে পর্যবেক্ষণ করছিল। আকাশের দুই প্রান্তে, একটির দূরত্ব ছিল পাঁচ আলোকবর্ষ, অপরটির ছয়। এই দুটি তারার অনেক ক’টা গ্রহ আমাদের বাসস্থান হলেও হতে পারে। প্রায় দুশো বছর আগে আমাদের পূর্ববর্তী মানুষেরা সেই দুটি লাল বামনের উদ্দেশ্যে দুটি স্বয়ংক্রিয় যান পাঠায়। প্রায় একশো বছর পরে দুটি যানই নক্ষত্র দুটিতে পৌঁছায়। আমার মনে পড়ে আমার বয়েস তখন আট হবে, যখন আমি সেই যানদুটি থেকে পাঠানো আর সৌর জগতের ছবি দেখেছিলাম। ছয় আলোকবর্ষ দূরের তারাটির একটি গ্রহের পৃথিবীর সঙ্গে অনেক মিল ছিল। সেই গ্রহের পাশ দিয়ে উড়ে গিয়েছিল আমাদের স্বয়ংক্রিয় নভোযান। সেটার একটা বায়ুমণ্ডলও ছিল যদিও তার মাঝে অক্সিজেন ছিল না। ততদিনে আমরা পাঁচটি বড় নভোযান প্রায় প্রস্তুত করে এনেছিলাম। কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিল মানুষ ঐ লাল বামনটির দিকেই যাত্রা করবে। সেখানে পৌঁছে নভোচারীরা চেষ্টা করবে ঐ গ্রহকে পৃথিবীর মত করে গড়ে তুলতে, কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে বায়ুমণ্ডল থেকে অপসারণ করে কৃত্রিমভাবে নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন সৃষ্টি করবে।

মানুষ তার শেষ যাত্রার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। আমাদের কারখানা রোবট তৈরি বাদ দিয়ে মহাকাশযানের অংশ বানাচ্ছিল। তারপর সেই যন্ত্রাংশগুলো জাহাজে করে দূরে একটা দ্বীপে নেয়া হচ্ছিল। সেই দ্বীপ থেকে কয়েক দিন অন্তর একটা করে রকেট যন্ত্রগুলোকে পৃথিবীর কক্ষপথে নিয়ে যাচ্ছিল। সেখানে পাঁচটা বিশাল আন্তর্নাক্ষত্রিক যানকে পৃথিবী থেকে পাঠানো যন্ত্র, মাল ও কাঠামো দিয়ে জোড়া লাগানো হচ্ছিল। প্রতিটি নভোযানে এক হাজারের মত যাত্রী থাকবে। সেই যানে থাকবে পৃথিবীর মত বায়ুমণ্ডল ও বায়ুচাপ, ঘূর্ণনের মাধ্যমে সেই যান সৃষ্টি করবে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ।

পাঁচ হাজার মানুষের মধ্যে নানা ধরনের লোক আছে, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কারিগর, বিজ্ঞানী, সংগীত শিল্পী, ব্যবস্থাপক, দার্শনিক। এর মধ্যে তিন হাজার লোককে পৃথিবীর সব প্রাপ্তবয়স্ক লোক ভোট দিয়ে বাছাই করেছিল। কেউ এই নির্বাচনে তার প্রার্থীপদ ঘোষণা করে নি। লোকেরা তাদের ইচ্ছেমত মানুষের নাম দিয়েছিল। তারপরে কিছু সাধারণ লোক সুযোগ পেয়েছে লটারির মাধ্যমে। দু’হাজার মানুষ লটারির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে। আমি, আমার পিতা-মাতা, বা আমার বোন এর মধ্যে পড়ে নি। আমার পরিচিত অন্য কোন আত্মীয় বা বন্ধুও মহাকাশে যাচ্ছে না। কিন্তু মহাকাশে যাওয়া মানে বেঁচে যাওয়া নয়, বরং উল্টোটাই সত্যি। মহাকাশের কঠিন অন্ধকার পরিবেশে একশো বছর যাত্রার পর অচেনা অজানা বৈরী গ্রহে কি করে নতুন করে জীবন সৃষ্টি সম্ভব?

সে দিনটা ছিল ছুটির দিন। সকালে বৃষ্টি পড়ছিল। বৃষ্টিটা থেমে আসলে আমি হেঁটে সমুদ্রের দিকে যাই, উঁচু খাড়াই থেকে নিচে ঢেউয়ের ফেনা দেখি। নিচে এক ধরনের ধূসর হলুদ ছোট ঘাস দিয়ে পাহাড়ের ধারটা ঢাকা। দিগন্ত কুয়াশায় আচ্ছাদিত থাকে। উত্তর মেরুর খুব কাছাকাছি আমাদের শহর। বছরে ছ’টা মাস একেবারে অন্ধকার, আর গ্রীষ্মের সময় সূর্যের আলোর পুরোটা তাপ সহ্য করতে হয় না। কিছু দূরে বন্দর থেকে একটা জাহাজ সবে বের হচ্ছিল। আমি জানি সেটা যাচ্ছিল রকেট-উৎক্ষপণ দ্বীপে, আমাদের কারখানার মাল নিয়ে।

বাড়ির দিকে ফেরার পথে একটা কফি হাউজে ঢুকি। ছোট দোকান চার-পাঁচটা মাত্র টেবিল। একটা কফি নিয়ে একটা গল্পের বই পড়ি। সেই সময়ই উরাকা দোকানটায় ঢোকে। ঢুকে আমার সামনে বসে। এরকমটি গত দশ বছর হয় নি। আমার বুক ধকধক করে ওঠে। ভাবলাম, উরাকা এবার আমাদের চুক্তি ভাঙ্গছে। কি সুন্দর হয়েছে দেখতে ও। উজ্জ্বল বাদামি চোখের নিচে বুদ্ধিদীপ্ত চিবুক সমস্ত মুখটাকে আকর্ষনীয় করে রেখেছে।

টেবিলে বসে উরাকা বলল, ‘কেমন আছ? আমাদের কতদিন কথা হয় না?’
‘চৌদ্দ বছর হবে।’

‘আমরা কেন কথা বলা বন্ধ করেছিলাম?’

‘আমি মনে করতে পারছি না,’ বললাম আমি।

ম্লান হাসি হাসে উরাকা। সে আমাকে এখনও ভালবাসে, ভাবি আমি। দুঃখের হাসির সাথে চোখের উজ্জ্বলতা কমে যায়, মাথাটা একদিকে হেলে, ঠোঁট কাঁপে, এর অর্থ আর কি হতে পারে? সে যখন আমার দিকে তাকায় আমার প্রশ্নবোধক চোখের উত্তর দেয় মাথাটা নাড়িয়ে, যেন বলে হ্যাঁ। চৌদ্দ বছর পরেও আমরা হেঁয়ালীর মধ্যে কথোপকথন করতে থাকি। পৃথিবীর শেষ সময়ের প্রেম দ্ব্যর্থবোধক হতে বাধ্য।

‘আমি মহাকাশে যাচ্ছি, অমিক।’ আমাকে সে আমার নাম দিয়ে সম্বোধন করে চৌদ্দ বছর পরে। এই শহর থেকে আর কে মহাকাশে যেতে পারে? এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। তবু আমি আশ্চর্য হই।

‘আমি আমাদের মহাকাশযানগুলো কোন পথে লাল বামনটায় যাবে সেটা ঠিক করতে সাহায্য করেছি। আমি তিনটে টিকিট পেয়েছি, আমার মা, আমার বাবা ও আমি এই তিন জন যাচ্ছি।’

‘খুব ভাল খবর,’ আমি তার নামটা উচ্চারণ করতে পারি না, ‘তুমি না গেলে আর কে যাবে? তোমার ওপর আমাদের অনেক ভরসা। এই শহরের স্মৃতি তোমার মাঝে থাকবে।’

কফি হাউজের অন্য চার-পাঁচজন খদ্দের আমাদের দিকে তাকায়। ছোট শহরে সবাই সবাইকে চেনে, কিন্তু কেউ কাউকে বিরক্ত করে না। উরাকা যে মহাকাশে যেতে পারে সেটা অনেকেই আন্দাজ করতে পেরেছিল। আমিই হয়ত পারি নি।

‘অমিক। তোমাকে একটা কথা বলার জন্য আজ আমি এসেছি। তুমি খুব মনোযোগ দিয়ে শোন।’

চৌদ্দ বছরের মৌনতা ভাঙ্গাতে পারে যে কথা তা আমি মন দিয়ে শুনব না, তা কি হয়?

‘আমি কর্তৃপক্ষকে বলে আর একটা টিকিটের ব্যবস্থা করেছি। তোমার জন্য। তুমি কি আমার সঙ্গে যাবে?’

আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই। সারা পৃথিবীর মাত্র কয়েকটি লোকের যাবার ব্যবস্থা হয়েছে। তার মধ্যে কি করে উরাকা এটা করতে পারল। আমি একটা নগণ্য কারখানার শ্রমিক, কয়েকটা মাত্র আদেশ রোবট নিয়ন্ত্রণ করি, আমার জন্য ঐ মহাকাশযানগুলোতে কোন সিটের ব্যবস্থা থাকার কথা নয়।

‘তুমি ভেবে দেখ, অমিক। তোমার পরিবারের সবার জন্য আমি চেষ্টা করেছি, পারি নি। একটা টিকিট মাত্র বার করতে পারলাম। আমি জানি এটা একটা কঠিন সিদ্ধান্তের ব্যপার। ভেব দেখ। আমি কাল তোমার সাথে এই সময়ে এখানেই দেখা করব।’

এই বলে উরাকা উঠে চলে গেল। তার সাথে যে মিষ্টি গন্ধটা এসেছিলে কিছুক্ষণের জন্য ঘুরঘুর করে সেটাও চলে গেল। আমার আশেপাশে যারা বসেছিল তারা শুনতে পেয়েছিল উরাকা কি বলেছে আমাকে। কিন্তু আমি আগেই বলেছি আমাদের শহরে অন্যের ব্যক্তিগত ব্যাপারে কেউ হস্তক্ষেপ করে না। তারা আমাকে বিরক্ত করল না।

বাড়ি ফিরে পিতা, মাতা ও বোনকে উরাকার প্রস্তাব জানালাম। তারা সবাই বলল, ‘অমিক, তুমি যাও।’ আমি আমার বোনকে যেতে বললাম। সে হাসল, আমার থেকে তিন বছর ছোট এই বোনটি আমার থেকে বুদ্ধিমান, শহরেই একটা কাপড়ের দোকানে কাজ করে। সে বলল, ‘টিকিট তোমার জন্য। সেই টিকিটে আমার যাবার কোন অধিকার নেই। পৃথিবীতে আমার থেকে যোগ্য অনেকে আছে যারা যেতে পারে। তোমার যাবার যোগ্যতা আছে কারণ উরাকা তোমাকে ভালবাসে।’

উরাকার ভালবাসা আমাকে যোগ্য করেছে মহাকাশে যাবার জন্য? আমি এটা যেন মেনে নিলাম। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিলাম উরাকার টিকিট আমি নিতে পারব না।

পরদিন উরাকার সঙ্গে দেখা হল, সে জানত আমি কি সিদ্ধান্ত নেব। উরাকা চলে যাবার আগে আমাদের বাড়ির সামনে বন্ধুরা সমুদ্রের পাশে বসে তাকে বিদায় জানাল। অনেকে গিটার বাজাল। গাইল -

কাপ্রির ঘন নীল আকাশ
পাবে না পাবে না তুমি
যেখানেই যাও নাকো
পাবে না
পায়ের নিচে কাপ্রির নরম ভূমি

রইব চেয়ে আকাশ পানে
রাতের উল্কা-রেখা ধরে
যেখানেই যাও নাকো
রইবে তুমি এই অন্তরে

কিন্তু
কাপ্রির ঘন নীল আকাশ
পাবে না পাবে না তুমি
যেখানেই যাও নাকো

আমি চুপ করে ওদের গান শুনলাম। উরাকাও কিছু বলল না। কোন বিদায় ভাষণ ছিল না। আমি অন্যদের সাথে হাসি-ঠাট্টা করলাম, উরাকাও করল। আমাদের নিজেদের মধ্যে কথা সেদিনও অন্যদের মাধ্যমেই হল।

এক বছর পরে এক রাতের আকাশে উরাকার মহাকাশযান একটা তারার বিন্দু হয়ে আকাশের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে ভেসে গিয়েছিল। পরপর পাঁচ দিন পাঁচটা জাহাজ উড়ে গেল। পৃথিবী যেন দম বন্ধ করে রেখেছিল এই মহাকাশযানগুলোর প্রস্থানের জন্য। এক মাসের মধ্যে তারা সৌরজগতের বাইরে বেরিয়ে গেলে সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। একশো বছর লাগবে তাদের সেই লাল বামনের সৌর জগতে পৌঁছাতে। এর মধ্যে পঞ্চাশ বছর তারা ঘুমাবে। হয়ত উরাকার সঙ্গে পরিচয় হবে এক মহাকাশচারী ছেলের। লাল বামনে পৌঁছাবে নতুন প্রজন্ম। সেটার এক ঊষর গ্রহকে তারা পৃথিবীর মত করে গড়ে তুলবে। হয়তো। এই আমাদের ইচ্ছা। মরণোন্মুখ এক প্রজাতির ইচ্ছা।

পৃথিবীতে যারা রয়ে গেল তারা মহাকাশযাত্রীদের ভাগ্য নিয়ে ঈর্ষান্বিত ছিল না। অন্ধকার আকাশে, একশো বছর যাত্রার বিপদকে যে মহাকাশচারীরা মেনে নিয়েছিল, তাদের প্রতি পৃথিবী কৃতজ্ঞ ছিল। নতুন গ্রহকে যে তারা পৃথিবীর মত করে গড়ে তুলতে পারবে তারো তো কোন নিশ্চয়তা ছিল না। কিন্তু মানুষ চিরায়ত আশাবাদী।

আমাদের রোবটের কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। পৃথিবীতে কারিগর রোবটের দিন ফুরাল, কারুর জন্য আর নতুন রাস্তা বানাতে হবে না, নতুন বাড়ি তৈরি করতে হবে না। এর মধ্যেই একদিন সকালে খবর পেলাম চাঁদে আমাদের স্থায়ী স্টেশনের লোকজন একটা নতুন জিনিস আবিষ্কার করেছে। তার দু’দিন বাদে টেলিভিশনের সামনে বাড়িতে আমরা চারজন পৃথিবীর সাধারণ সম্পাদকের কথা শুনতে বসি। দক্ষিণ মেরুর অধিবাসী আমাদের সবার সম্পাদক। খুব বেশি বয়েস হবে না মহিলার। চল্লিশ? তাঁর নাম এস্কা।

এস্কা বলল, ‘আপনারা জানেন চাঁদে আমাদের স্থায়ী স্টেশন গত তিনশো বছর ধরে আছে। চাঁদ থেকে আমরা অনেক খনিজ পদার্থ পৃথিবীর জন্য আহরণ করেছি। এর মধ্যে চাঁদের উপরিভাগের পুরোটাই আমরা লিপিবদ্ধ করেছি, তবুও পৃথিবীর এই উপগ্রহের অনেক কিছুই রয়ে গেছে আমাদের কাছে অজানা। তার গহ্বরগুলোতে রয়ে গেছে অনেক অতীত রহস্য। দু’মাস আগে আমাদের হাতে এসেছে এমনই এক রহস্য। এই দু’মাস সময় গেছে আমাদের তার অর্থোদ্ধার করতে।’

এস্কাকে আমরা সবাই চিনি। বছরে দুবার সে কাপ্রিতে আসত, মূলতঃ মহাকাশযানের কার্যক্রম দেখতে।

‘পৃথিবীর নাগরিকেরা, আমাদের এই গ্রহের বয়স এখন ৬ বিলিয়ন বছর, আমরা সব সময়ই ভেবেছি পৃথিবীর স্তন্যপায়ী প্রাণীরা গত এক বিলিয়ন বছর ধরে বিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু আসলে তা নয়। পৃথিবীর প্রাণের ইতিহাস আরো প্রাচীন।’

এই কথাগুলো বলতে এস্কার কথা যেন আটকে যায়। আমরা চারজন একে অপরের মুখের দিকে তাকাই।

এস্কা বলে, ‘পৃথিবীতে আমরাই প্রথম বুদ্ধিমান প্রাণী নই। পৃথিবীতে আমাদের মত প্রাণী আগেও এসেছিল, তারাও একটা খুবই উন্নত কারিগরি সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। সেই সভ্যতা কালের গ্রাসে ধ্বংস হয়ে গেছে। কিভাবে তারা ধ্বংস হয়েছে আমরা জানি না, কিন্তু ধ্বংস হবার আগে তারা তাদের কীর্তির ইতিহাস চাঁদের এক গহবরে রেখে গিয়েছিল।’

আমরা বিহ্ববল হয়ে বসে রইলাম। এক অসীম মহাবিশ্বের মাঝে আমরা অবোধ প্রাণী।

এস্কা বলতে থাকে, ‘সেই প্রাণীরা বুঝতে পেরেছিল পৃথিবীর টেকটনিক সঞ্চালন পৃথিবীর বুকে কোন কিছুই চিরদিনের জন্য টিঁকিয়ে রাখবে না। কয়েকশো মিলিয়ন বছরের মধ্যেই সমস্ত কিছু পৃথিবীর ত্বকের নিচে গলিত লাভায় পরিণত হবে। কিন্তু চাঁদে কোন টেকটনিক গতি নেই, আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ নেই, বাতাস নেই, বৃষ্টি নেই। তাই চাঁদের এক গহ্বরে তারা তাদের ইতিহাসকে স্থাপন করেছিল। তারা এমন ভাবে তাদের ইতিহাসকে ছবিবদ্ধ করে গেছে যা বোঝা খুবই সহজ। এই মানুষেরা এক আশ্চর্য উপায়ে তাদের তথ্য সংরক্ষণ করার পদ্ধতির উদ্ভাবন করেছিল, যার ফলে প্রায় দেড় বিলিয়ন বছর পরেও সেই তথ্যের অর্থ উদ্ধার করা আমাদের পক্ষে কঠিন হয় নি। সেই সভ্যতা মহাবিশ্বের প্রাকৃতিক নিয়মগুলো বুঝতে পেরেছিল, তারা সৌর জগতের সর্বত্র মহাকাশযান পাঠিয়েছিল, দূর তারামণ্ডলীর সৌর জগতে যান পাঠানোর জন্য উন্নত ইঞ্জিন আবিষ্কার করেছিল। আমরা তাদের সম্বন্ধে যা যা জানতে পেরেছি সেটা বিশ্বলাইব্রেরীতে স্থাপন করেছি। সেখান থেকে আপনারা দেখে নিতে পারেন।’

এস্কা আবার চুপ করে থাকে। সে আমাদের সময় দেয় যাতে আমরা একটু সামলে উঠতে পারি।

এরপর এস্কা অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে। তার আরো কিছু বলার আছে, কিন্তু সে জানে না সেটা ঠিক কি ভাবে বলবে। ‘বন্ধুরা, দেড় বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর মানুষ আমাদের মতই একটা বিপর্যয়ের সম্মুখীণ হয়। প্রথমে তারা তাদের অবিমৃষ্যকারিতার ফলে আমাদের এই ছোট পৃথিবীটাকে ধ্বংস করে ফেলে। বাতাস থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড আহরণ করে সমুদ্রে এসিডের পরিমাণ বেড়ে যায়। তাতে অনেক সামুদ্রিক প্রজাতি মারা যায়। আমরা যা বুঝেছি পৃথিবী তখন নানা দেশে বিভক্ত ছিল, এক দেশ থেকে আর এক দেশে যেতে অনেক ধরনের বাধা ছিল। কিন্তু মানুষ তাদের জীবন যাত্রা সংশোধন করে পৃথিবীকে বাঁচায়। কিন্তু পৃথিবী ক্রমাগত বিভিন্ন বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতেই থাকে।’

‘কোন কোন সময় শৈত্যযুগের তুষারে সারা পৃথিবী ঢেকে যায়, সমুদ্রে জাহাজ চলে না, সভ্যতা ধ্বসে পড়ে। কোন কোন সময় অন্য নক্ষত্ররা সৌর জগতের কাছাকাছি আসে। তাদের মহাকর্ষের চাপে সৌরজগতের বহির্সীমার ধূমকেতু ও গ্রহাণুপুঞ্জ সৌরজগতের ভেতর দিকে ধেয়ে আসে। সেগুলোর অনেক ক’টা পৃথিবীতে আঘাত হানে। আবার দু-একবার তারা অজানা মারাত্মক ভাইরাসের সংক্রামণে পর্যুদস্ত হয়ে যায়। কোন সময়ে কয়েকটি আগ্নেয়গিরির যুগপৎ বিস্ফোরণে মাটি ও আকাশ ছাইয়ে ঢেকে যায়। এমনি করে শতাব্দীর পর শতাব্দী চলে যায়। মানুষ যখনি ভেবেছে তারা তারার হাতছানির উত্তর দিতে পারবে তখনই কোন চরম প্রতিকূলতা তাদের আবার অন্ধকারে ঠেলে দেয়। প্রতিটি ঘটনাতে সভ্যতা প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু মানুষ আবার সভ্যতা গড়ে তোলে।

‘এর মধ্যেই মানুষ মহাকাশে যাত্রা করেছে। আমাদের মত তারাও চাঁদে বা মঙ্গলে গিয়েছে। তারা আমাদের মত চাঁদে ও মঙ্গলে স্টেশন স্থাপন করেছিল। প্রশ্ন উঠতে পারে সেই স্টেশন কোথায় গেল। চাঁদের পৃষ্ঠে বায়ু বা বৃষ্টি নেই যে মানুষ নির্মিত গঠনগুলো দ্রুত মাটির সাথে মিলিয়ে দেবে। কিন্তু চাঁদের পিঠে ক্রমাগত মহাজাগতিক রশ্মির আঘাতে যে কোন জিনিস ধীরে ধীরে ভেঙ্গে পড়তে বাধ্য। গত দেড় বিলিয়ন বছরের চাঁদের পৃষ্ঠে মানুষের যা কিছু সৃষ্টি সব ক্ষয় হয়ে গেছে তাপে, ছোট ছোট ভূমিকম্পে, মাটির জোয়ার-ভাটায় এবং ছোট, বড় উল্কাপিণ্ডের ও মহাজাগতিক রশ্মির আঘাতে। তাই আমরা যখন চাঁদে গিয়েছি সেই মানুষদের স্টেশনের কোন অবশিষ্টই আমাদের চোখে পড়ে নি।’

‘এই মানুষেরা যখন চাঁদে স্টেশন স্থাপন করেছিল চাঁদ পৃথিবীর আরো কাছে ছিল, ২৮ দিনে চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে একবার ঘুরত। পৃথিবীর মানুষেরা তখন পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখতে পেত।’

আমি প্রায় দম বন্ধ করে এস্কার কথাগুলো শুনি। পৃথিবীর চারদিকে ঘুরতে চাঁদের এখন ৪০ দিন সময় লাগে, এখন আমরা মাত্র সৌরীয় বলয় গ্রহণ দেখতে পাই। চাঁদ দূরে সরে গেছে, সূর্যের কৌণিক ব্যাস এখন চাঁদের কৌণিক ব্যাসের থেকে বেশী। পৃথিবীর ওপর চাঁদের প্রভাব এখন আগের থেকে কম, তাই পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষ অস্থিত হচ্ছে।

এস্কা একটু থেমে আবার বলে, ‘পৃথিবী থেকে দূরে কোন একটা তারার গ্রহে নতুন করে বাসা বাঁধবার কথা সেই মানুষেরা ভেবেছে, আমাদের মতই। আমাদের মতই তারা বাছাই করা কয়েকজনকে আকাশে পাঠায়। আমি জানি না এই সংখ্যাটা কত হতে পারে, হয়ত কয়েক হাজার, হয়ত কয়েক মিলিয়ন। আমি জানি না। এ সম্পর্কে বিস্তারিত পাওয়া যাবে তাদের তথ্য আরো ভাল ভাবে দেখলে। কিন্তু..’

‘কিন্তু’ বলে এস্কা থেমে যায়। ইতস্তত করে। যেন পরের কথাটা কি ভাবে বলবে বুঝতে পারে না। তারপর যেন সাহস জোগাড় করে বলে, ‘সেই মানুষেরা ঠিক আমাদের মত ছিল না। তাদের মধ্যে নানাবিধ বিশ্বাস ছিল যা আমরা -যে কয়জন তাদের তথ্য দেখেছি – ঠিক বুঝতে পারছি না। হয়ত পরবর্তীকালে আরো একটু মনোযোগ সহকারে সেটা দেখলে সেই সমাজকে হয়তো আরো একটু ভাল বোঝা যাবে। আমাদের মনে হয়েছে যখন এই মানুষেরা মহাশূন্যে গিয়েছে, চাঁদে বা মঙ্গলে স্টেশন স্থাপন করেছে, পৃথিবীতে তখনও তারা নিজেদের মধ্যে বিবাদ হিংসার মাধ্যমে সমাধান করতে চেয়েছে। এটা আমাদের কাছে একটা পরম বিস্ময়ের ব্যাপার। যাইহোক যতদিনে তারা নক্ষত্রের উদ্দেশ্যে মহাকাশযান প্রেরণ করতে পেরেছে ততদিনে তারা মনে হয় মারণাস্ত্র দিয়ে সমস্যা সমাধানের পথ থেকে সরে এসেছিল।

‘কি ধরনের মহাকাশযান তারা ব্যবহার করে সেই সম্বন্ধে আমরা নিশ্চিত নই। কিন্তু তারা আমাদের মতই শূন্যস্থান থেকে শক্তি আহরণের চেষ্টা করে বিফল হয়। শেষ পর্যন্ত তারা চিরায়ত নিউক্লিয়ার ফিউশন পদ্ধতিই ব্যবহার করে, যদিও ফিউশন বিক্রিয়াকে ঠিকভাবে করায়ত্ত করতে তাদের অনেক সময় লাগে। দশ মিলিয়ন কেলভিন তাপমাত্রার প্লাজমা যাতে ইঞ্জিনের দেয়ালে না লাগে তার জন্য চুম্বক ক্ষেত্র দিয়ে সেই প্লাজমাকে শূন্যে ধরে রেখে তার মধ্যে হাইড্রোজেনকে হিলিয়ামে পরিণত করা হয়। আপনারা জানেন আমাদের মহাকাশযানের ইঞ্জিন একই পদ্ধতিতে কাজ করে। এটা একটা আশ্চর্যের ব্যাপার যে দেড় বিলিয়ন বছর পরে আমরা প্রায় একই পথ ধরে চলেছি।

‘দেড় বিলিয়ন বছর আগে মানুষ যে লাল বামনে তাদের যান পাঠিয়েছিল তার নাম তারা দিয়েছিল প্রক্সিমা সেন্টাউরি। সেই তারা এখন গ্যালাক্সির কোথায় আছে সেটা বলা মুশকিল। কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে আমরা এখন চেষ্টা করছি সেই তারাটির সম্ভাব্য অবস্থান বের করতে। তবে এই দেড় বিলিয়ন বছরে পৃথিবী সাত বার গ্যালাক্সির কেন্দ্রের চারদিকে ঘুরেছে, যদিও প্রক্সিমা সেন্টাউরি তার প্রতিবেশী ছিল, সেটির স্থানীয় গতি ভেক্টর পৃথিবী থেকে ভিন্ন ছিল। এত বছর পরে সে হয়ত গ্যালাক্সির অপর প্রান্তে রয়েছে।’

‘কিন্তু পৃথিবীতে কোন এক চরম বিপর্যয়ে শুধু সেই মানুষেরাই ধ্বংস হয়ে যায় না সমস্ত প্রাণী প্রজাতির প্রায় শতকরা ৯৫ ভাগ বিলুপ্ত হয়ে যায়। বাকিদের মধ্যে যে দু-একটি স্তন্যপায়ী ছোট প্রাণী ছিল সেগুলো থেকেই আমাদের মত চিন্তাশীল প্রাণীর উদ্ভব হয়।

এস্কা বলে, ‘কিন্তু সেই দেড়শো কোটি বছর আগের মানুষেরা আমাদের জন্য পথ দেখিয়ে গেছে। আমরা তাদের মতই এই পৃথিবীর কথা লিপিবদ্ধ করে যাব। যেহেতু সূর্য আরো বাড়বে এবং বিশাল ব্যাস পৃথিবী পর্যন্ত বিস্তৃত হবে, চাঁদও সূর্যের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা পাবে না, তাই চাঁদে আমরা কিছু রেখে যেতে পারব না। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি প্লুটো পার হয়ে সৌর জগতের ধার ঘেঁষে এরিস নামের যে গ্রহ ভ্রমণ করে তাতে আমাদের সভ্যতার কথা রেখে যাব। আমরা তার সাথে একটা বেতার তরঙ্গ প্রেরক যন্ত্র রেখে যাব যা কিনা আগামি দশ মিলিয়ন বছর কাজ করতে পারে। গ্যালাক্সির এই প্রান্তে যদি কোন উন্নত সভ্যতা ভ্রমণ করে তারা আমাদের কথা এরিস থেকে জানবে। মহাকালের হাতে আমরা বন্দী। সেই মহাকালের বুকে আমাদের যে অস্তিত্ব ছিল সেটা ভবিষ্যতকে জানাতে পারলে হয়তো সময়কে পার হয়ে আমরা বেঁচে থাকব।

‘বন্ধুরা, আপনাদের এখন দেখাব তাদের সভ্যতা কেমন দেখতে ছিল। এই হল তাদের শহরের ছবি।’

টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে ওঠে এক বিশাল শহরের ছবি, আকাশ্চুম্বী অট্টালিকায় ভরা। তার রাস্তা গাড়িতে ভর্তি। রাস্তা দিয়ে ত্রস্ত হেঁটে যাচ্ছে দ্বিপদ মানুষ। আমরা সবাই আশ্চর্য হয়ে চিৎকার করে উঠলাম। তারপর আমরা স্তম্ভিত হয়ে বসে থাকি। আমাদের থেকে লম্বায় অনেক ছোট মনে হল সেই মানুষেরা, কিন্তু তাদের হাত ছিল আমাদের থেকে অনেক বড়, তাদের হাতে ছিল পাঁচটা আঙ্গুল। আমি আমার হাতের চারটা আঙ্গুলের দিকে তাকাই - কনিষ্ঠা, মধ্যমা, তর্জনী ও বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠি। আমি আমার মাথায় হাত বোলাই, সেখানে চুলের চিহ্নমাত্র নেই। আমরা চারজন একে অপরের দিকে তাকাই। আমি দেখি পৃথিবীর প্রাচীন মানুষদের মাথায় চুল, কারুর গালে চুল। আর তাছাড়া তাদের কারুরই লেজ ছিল না।

আমি ভাবি, আর কতবার বুদ্ধিমান প্রাণী এই পৃথিবীতে আসবে? আর আসবে না। প্রকৃতির শেষ খেলায় পৃথিবীতে মানুষ হেরে যাচ্ছে। হয়তো বিশাল গ্যালাক্সির অন্য প্রান্তে সে বাসা বাঁধতে পেরেছে। হয়তো।

কয়েক মাস পরে আমাদের শেষ রকেট এরিসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। এরিসে আমাদের সভ্যতার ইতিহাস রেখে আসা হবে। চাঁদ, মঙ্গল ও সৌর জগতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্টেশনের সব নভোচারীরা পৃথিবীতে ফিরে আসে।

সূর্য আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তার রঙ বদলায়।

পৃথিবীরে মানুষ এখন রাতের আকাশের দিকে অনেকটা সময়ই চেয়ে থাকি। আমি যখন তাকাই তখনই ভাবি বহুদূরে উরাকা উড়ে চলেছে গভীর মহাশূন্যে। মহাকাশযানের জানালা দিয়ে গভীর অন্ধকারের দিকে চেয়ে সে কি ভাবছে আমার কথা?

শেষ জাহাজ আমাদের মহাকাশযানের সরঞ্জাম নিয়ে বন্দর ছেড়ে চলে গেছে। সাগরের বুকে আর কোন ভেলা নেই। শেষ রকেট আকাশে উঠে গেছে। আমাদের এখন ভবিষ্যত নিয়ে আর চিন্তা নেই। এখন শুধু ঘাম-ঝরা রাতে গান করার পালা।

কাপ্রির ঘন নীল আকাশ
পাবে না পাবে না তুমি
যেখানেই যাও নাকো
পাবে না
পায়ের নিচে কাপ্রির নরম ভূমি

রইব চেয়ে আকাশ পানে
রাতের উল্কা-রেখা ধরে
যেখানেই যাও নাকো
রইবে তুমি এই অন্তরে

কিন্তু
কাপ্রির ঘন নীল আকাশ
পাবে না পাবে না তুমি

যেখানেই যাও নাকো

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন