শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০১৫

মাহমুদা মায়ার টুকরো লেখা : মে, ২০১৫


৪ মে, ২০১৫
সকালটা আজ সেজেছে বেশ মেঘলায়,
আমায় সে টেনে নিয়ে যায় খোলা জানলায় ।
বোগেনভিলিয়া কথা জুড়ে দেয় খাঁটি বাংলায়---
খুন্তি নাড়ার শব্দ, আর উচ্ছে ভাজার গন্ধ পায়
শচিন-কত্তার গানও নাকি তা'র কানে যায় !!

-------------------------------------------
দুই গৃহে বাস আমার । এক গৃহে দেহের বাস, আরেক গৃহে মনের । দুই গৃহেই অশান্তি । ধর্ম নিয়ে । যে ধর্মের উদ্দেশ্যই ছিল শান্তি ।
ধর্ম, তোকে থুড়ি না দিলে যে অধর্ম হয় !

৫ মে, ২০১৫
সকাল আমার ভরিয়ে দেবে বুঝিনি তো,
রবি ঠাকুর আর দেবব্রত !
শুধু একটিবার শোনার বাসনা হয়েছিল, "পথে চলে যেতে যেতে ..." । তারপর আর থামা যায়নি । এখন চলছে, "আমার সয় না, সয় না, সয় না প্রাণে, কিছুতে সয় না যে" । আহা, মরি মরি !


৭ মে, ২০১৫
ধুত্তরি, সময় আছে মুডে আধাঘন্টা !
অহন কি খাইয়া না'ই, না নাইয়া খাই !?!
কখনই-বা চা বানাই !?!
এখানে 'না'ই' মানে 'গোসল করি' । 'নাওয়া' মানে গোসল করা, bathe, bathing . ফরিদপুরের ভাষা ।


৮ মে, ২০১৫
রাতে বৃষ্টি হয়েছে । বারান্দায় জল জমে আছে । আনএক্সপেক্টেড বৃষ্টি । ক্যালিফোর্নিয়ায় কোনও বৃষ্টির চ্যান্স নেই, সবাই বলাবলি করছিল কাল, যদিও আকাশভরা মেঘ ছিল, তুফান-বাতাস ছিল । নারী আর প্রকৃতি---আন্‌প্রেডিক্ট্যাব্‌ল্‌। 'রমণীর মন, সহস্র বর্ষেরই সখা সাধনার ধন', প্রকৃতিও তেমনি ।


৯ মে, ২০১৫
সহাল একটা বাইজ্জা হারছে !!
ঘুম আসুক, না-আসুক -- হুইত্তা থাহি গা !


১১ মে, ২০১৫
কিছুক্ষণ ধরে শুনছি -- দু'টো বেড়াল রাগে গরগরাচ্ছে । ওরা কারও পোষা নয় । বনবেড়াল । বব্‌ক্যাট্‌স্‌ । ওরা যখন মারামারির মুডে থাকে, তখন খুব বেশি কথা বলে । এমনিতে তো সাত চড়ে রা কাড়ে না । আর রাগের মাথায় 'মিউ-মিউ' কথা চলে না, তখন হালুম-হুলুম করে কী-কী সব বলে । কখনওবা মানুষের ভাষা বেরিয়ে আসে । আমি স্পষ্ট শুনলাম, একটা বেড়াল বললো, "your mama's fat !!", ব্যস্‌, আর যায় কোথায় ? ঝাপিয়ে পড়ল ওর ওপর অন্যটি । তারপর "মাইরা হুতায়ালবাম"-কায়দায় এমন ধোলাই -- আনন্দে গায়ে কাঁটা দেয় আমার ।
এদেশে রাস্তাঘাটে ছেলেপুলেরা ইনষ্ট্যান্ট মারামারি বাধাতে চাইলে এরকম বলে, "your mama's fat",অথবা "your mama's ugly" । ফাইটিং শুরুর জন্য অব্যর্থ এই সব উক্তি । মা'কে নিয়ে বিদ্রুপ কেউ সইতে পারে, নাকি পারা উচিত?


১২ মে, ২০১৫
আৎকা মাইরা ভূমিকম্প ! ভালা আছুইন ব্যাকতে ? কে কে বাঁইচ্চা আছুইন, হাত তুলুইন যে !


১৪ মে, ২০১৫
আমার রান্নাঘরের ছোট্ট জানলাটা একান্তই আমার । সিঙ্কের পিঠেই জানলাটা । সিঙ্কের লাগোয়া গ্রানাইট কাউন্টারে থাকে আমার কাটিং-বোর্ড । তার নীচেই ডিশ-ওয়াশার । তাই ওখানে আমার যাতায়াত অহরহ । জানলার বাইরে চোখ পড়বেই । বাঁধাধরা একই দৃশ্য । বাউন্ডারি ওয়াল । লতাপাতার জড়াজড়ি । একপাশে বোগেনভিলিয়ার ঝোপ । অন্য বাড়ির ছাদ । এ্যাভোকাডো গাছ । পাখিদের লেজ নাচানো । কিছুদূরে একটা ক্রিসমাস-ট্রি । কখনও বাড়ির ছাদে বেড়াল, বা এ্যাভোকাডো গাছে কাঠবেড়ালী চোখে পড়ে । এর বেশি তো নয় !

তাই বাইরে চোখ মেলে এটাসেটা ভাবতে বসি । বাউন্ডারি-ওয়ালটা জানলা থেকে হাত-দুয়েক দূরে । আজ ওখানে একটা কাঠবেড়ালী । উঠেছে কীভাবে কে জানে ! ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে নামতে ভয় পাচ্ছে । ওর পেছনটা আমার দিকে, মুখটা পাশের বাড়ির দিকে । লেজটা অনবরত ঝাপটা মারছে । কাছে থেকে দেখে বুঝলাম বেশ শক্তিশালী লেজখানা । ন্যাচারাল ওয়েপ্‌ন্‌ । পেছন থেকে আক্রমন করতে এলে আঘাত করবে । এমুহূর্তে কেউ ওর পিছে লাগেনি । শুধুমাত্র একটা লতা আছে, যার পাতাগুলো একেবারে ফুরফুরে, ওর পেছনটাতে সুড়সুড়ি দিচ্ছে । আর তাই সেকী দাপুটে ঝাপটা মেরে যাচ্ছে । লেজের গঠনের মধ্যে একটা অন্যরকম ব্যাপার আছে । সাপের ফনার মতো । আগে কখনও লক্ষ্য করিনি। বিধাতাপুরুষ(আমি নিশ্চিত তিনি পুরুষই) আত্মরক্ষার জন্য প্রাণীদের বেলায় নানান টেকনিক জুড়ে দিয়েছেন। মানুষের বেলায় কি ? হাত-পা ।
মানুষ কয়, "উস্তাদ, হাত-পা দা মাইরা জুইত পাই না !"
উস্তাদে কয়, "কী করবার চাস, কইয়ালা ! "
মানুষ কয়, "চাপাতি বানায়াম ! কুপ মাইরা শান্তি ফাইবাম । অক্করে ঘিলু নামায়ালবাম ।"

অতএব, মানুষ ধারালো চাপাতি বানাতে শুরু করল । অন্য কোনও প্রাণীর আক্রমণ সামলাতে মানুষের বুদ্ধিই যথেষ্ট । কিন্তু তাদের নিজের প্রজাতিকে আক্রমনের মনোবাসনা হয় । কি কারণে ? হিংসা যে রয়েছে ভেতরে! যে কোন অজুহাতে । ধর্ম একটা অজুহাত ।


১৫ মে, ২০১৫
হঠাৎ একটা তীব্র খুশী বোধ করলাম । দেশের সাথে এখানকার ওয়েদারের মিল দেখে ।
দেশে ভূমিকম্প, এখানে ভূমিকম্প ! দেশে বৃষ্টি । এখানেও । দয়াল, তোমার লীলা বোঝা দায় !


১৮ মে, ২০১৫
"দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া
কেবল শুনি রাতের কড়া নাড়া
অবনী বাড়ি আছো ?

বৃষ্টি পড়ে এখানে বারো মাস
এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে
পরান্মুখ সবুজ নালিঘাস
দুয়ার চেপে ধরে -
অবনী বাড়ি আছো ?


আধেকলীন হৃদয়ে দূরগামী
ব্যথার মাঝে ঘুমিয়ে পড়ি আমি
সহসা শুনি রাতের কড়া নাড়া
অবনী বাড়ি আছো ?"
-------------------------
কেমন যেন থমথমে ঠেকছে, দেশে কি খারাপ-কিছু ঘটলো !?! খারাপ ঘটে, ঘটেই চলেছে অহোরাত্র । চিন্তায় থাকি বাংলাদেশের জন্য ।
আমি কি বাংলাদেশের মা ?
নাকি, বাংলাদেশ আমার মা ?


২০ মে, ২০১৫
আজকাল কোনও বিষয়ের বা জিনিষের অনুষঙ্গে আমি সুদূর অতীতে, বাংলাদেশের স্মৃতিতে ফিরে যাই । 'আজকাল' বলাটা বোধহয় ঠিক হলো না, এটা এদেশে আসার পর থেকেই হয়ে আসছে । সেদিন এক পার্টিতে 'ফনডু' ছিল । মানে একটা চকোলেট-ফাউন্টেন থেকে চকোলেট সিরাপ পড়তে থাকবে, লোকজনেরা টুথপিক দিয়ে অথবা একটা টং দিয়ে ষ্ট্রবেরী উঠিয়ে চকোলেটের নায়েগ্রা-ফলে ধরবে । ব্যস্‌, চকোলেট-কভার্ড-স্ট্রবেরী মুখে চালান করে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত! আমার যদিও ফলের প্রতি বরাবরের অনীহা, কিন্তু আমি ওই ব্যাপারটিতে একরকম ছেলেমানুষী আনন্দ পাই । স্ট্রবেরীটা ধরে আছি ফাউন্টেনে, তখুনি মাথার ভেতর একটা দৃশ্যের ঝলক । তারপর হাতে স্ট্রবেরী, আর মনে মনে স্মৃতি রোমন্থন ।


আমরা তখন এক মফস্বল শহরে থাকি । আমার মা'র চার মেয়ে । ছেলে নেই বলে মা অসুখী । অবশ্য আরও দু'টি মেয়ে হওয়ার পরে মা'র সে দুঃখ ঘুচেছিল ।
সেই শহরেই আমার স্কুল শুরু । কিন্তু তার আগেই শহরময় প্রাকৃতিক স্কুলে আমি নিত্যনতুন জ্ঞান অর্জন করছিলাম । কত কী শিখেছি, এসব আনাচ-কানাচের স্কুল থেকে । সে স্কুলের এমনি ধারা, মাইনে ছাড়া পড়ায় তা'রা । আমাদের সেখানকার বাসস্থানটি বিরাট একটা জায়গা নিয়ে বাউন্ডারি দিয়ে ঘেরা ছিল । বাউন্ডারি ঘেঁষে বড় বড় গাছ । চারটা আমগাছ ছিল । একটা বিরাট শিমুল গাছও ছিল । এই শিমুল গাছের তলায়, বাউন্ডারির বাইরে একটা জলাশয় মতো । নাকি ডোবা বলবো ? বছরের কোন এক সময়ে ওটা একটা ছোটখাটো পুকুর হয়ে যায় । আবার কোনও এক সময়ে পানি থাকে না মোটে । শুধু কাদা আর কাদা । সেসময়ে কতগুলো ছেলেপেলে ওখানে মাছ ধরতে আসত । গায়ে কোনও কাপড়চোপড়ের বালাই নেই, ল্যাংটা ছেলেপেলের দল । এই ডোবাটা বাড়ির এক পাশে । আর বাড়ির পেছনে বাউন্ডারির পরে ক্ষেতের পর ক্ষেত, সবুজ ফসলে ভরা । ফসলের ক্ষেত পেরলে যে গ্রাম দেখা যায়, সেখান থেকে এই ছেলেপেলেরা আসত । ওরা মাছ ধরছে । মাছে কিলবিল । ডোবার পানি শুকিয়ে গেছে, তাই হাত দিয়েই মাছ ধরা যায়। কাদায় মাখামাখি । যেন মাটির তৈরি পুতুল ওরা, এক্ষুণি বানানো হয়েছে, তাই ধ্যাধধ্যারা । অথবা, 'ফনডু' ---চকোলেট আবৃত । এখানেও বিস্ময়ের পসরা । কীকরে মাছ ধরে, কীকরে ছোট একটা ঘটিতে মাছগুলো রাখে । মাছেরা যা'তে লাফিয়ে লাফিয়ে পড়ে না যায়, তাই ঘটির মুখে কচুরিপানা গুজে দেয় । সবচে বড় বিস্ময় ছেলেদের দৈহিক ব্যবধান । সেসময়ে আমাদের সব ব্যাপারে প্রশ্ন করার সুবিধে দেয়া হতো না । তাই কাউকে এ ব্যাপার নিয়ে কিছু বলি না । শুধু বিস্ময়ের ঘোরে অস্ফুটে বলেছিলাম, "ওহ্‌, দ্যাট'স হোয়াই দে আর বয়জ !!" না, তখনকার ভাবনাটা এখনকার উচ্চারণে এরকম হতো । তখন হয়তো বলেছি, "ওহ্‌, এজন্যেই ওরা ছেলে !" এর আগে জানা ছিল না, কারণ আমাদের বাড়িতে সব মেয়ে, কোন ছেলে কাছেধারে ছিল না ।


২১ মে, ২০১৫
উফফ -- ভুলেই গেছিলাম, সকালে উঠেই একটা জরুরী ই-মেইল করতে হবে একজনকে !
তা' না করে, ফেসবুকে বসে গেছি ! অলরেডি সাড়ে ন'টা ! তুই কবে মানুষ হবি রে, মায়া ?

feeling অক্করে মাতাডা ফাডায়ালবাম !


২২ মে, ২০১৫
কীরকম লক্ষ্ণিমেয়ে আমি ! ফেসবুকের পাশাপাশি সাতসকালে রান্নাবান্নাও শুরু করে দিয়েছি । ছেলেমেয়ে আসছে লং উইকএন্ডে । মেমোরিয়াল ডে'র ছুটি সোমবারে । মেয়ে দুপুরেই চলে আসবে । ছেলে সন্ধ্যায় । মেয়ে বরাবর আসার আগে, ফোনে আমাকে কি-কি রাঁধতে হবে তা'র চুলচেরা বিবরণ দেয় । ছেলেটা এব্যাপারে মাথা ঘামায় না একেবারে । তবে আমি জানি ... তা'র জন্য একটা কোনও মাংস থাকতে হবে । মাছ খেতে পারে না । ওহ্‌ না, চিংড়ি্র দু-একটা পদ চলে । সেটাও ক্বচিৎ কদাচিৎ । বিধাতা-পুরুষ আমাকে আর আমার মেয়েকে একই ছাঁচে তৈরী করেছেন । আমরা দু'জন কেবলই 'খাই-খাই' করি । ছেলে আমাদের 'খাই-খাই' নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে । বোনের সাথে ওর খুচরো খুনসুটির আমি গোপন ভক্ত । আমার কান এখন থেকেই শুনতে পাচ্ছে, মেয়েটা দরজা খুলেই বলছে, "উমম -- আই অ্যাম সো হাংরি" !


২৫ মে, ২০১৫
কী আশ্চর্য !! সবার, সবার ষ্ট্যাটাসে বৃষ্টির ছবি আর বৃষ্টির কথা । খুব মন খারাপ হলো আমার । চোখে বৃষ্টি নামল বলে !

২৬ মে, ২০১৫
"পৃথিবীর সব ঘুঘু ডাকিতেছে হিজলের বনে ;
পৃথিবীর সব রূপ লেগে আছে ঘাসে ;
পৃথিবীর সব প্রেম আমাদের দু'জনার মনে ;
আকাশ ছড়ায়ে আছে শান্তি হয়ে আকাশে আকাশে ।"

২৮ মে, ২০১৫
সকাল ছ'টার আগেই পাখিদের কোলাহলে ঘুম ভেঙে গেল । এমনিতে আমি খুব ভালোবাসি ওদের কিচিরমিচির । কিন্তু আজ মনে হলো একটু বেশিই উল্লসিত ওরা । গাছগুলো মনে হল -- পাখিতে পাখিতে ঠাসা । বিরাট জনসভা । সবাই বক্তা । সুর-টুর কিছু না । রীতিমতো চেঁচাচ্ছিল । আমি যে দু'টোয় ঘুমুতে গেছি, সে কারণে কি চেঁচামেচি একটু দেরিতে শুরু করা যেত না ! এখন ঝিমিয়ে-ঝিমিয়ে হলেও, জুতো সেলাই থেকে চন্ডিপাঠ, আমাকেই করতে হবে ।

1 টি মন্তব্য:

  1. অনবদ্য ! অনেকগুলো লেখাই আগেই পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে এবং এখানে চমৎকার লেখাগুলো একসাথে পেয়ে নিতান্তই আহ্লাদিত :)

    উত্তরমুছুন