শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০১৫

অমিয়ভূষণ মজুমদারের গল্প : দীপিতার ঘরে রাত্রি

দীপিতার সঙ্গে পরিচয় হবার আগেই ইন্দু তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াল। ব্যাপারটা বোধ করি ঠিক এ-শব্দটা দিয়ে বোঝানো যায় না। সাধারণত ভিন্নমুখী দুটি শক্তিকে এনে পাশাপাশি দাঁড় করানো গেলে বলা যায় এ-কথাটা। কিন্তু কতগুলি অসাধারণ ক্ষেত্রও আছে যখন বৈপরীত্য বোধটা পাশাপাশি অবস্থানের উপর নির্ভর করে না, যখন তুলনার বিষয় দুটিও সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির, যেমন গোমড়ামুখো মন আর শরৎকালের প্রারম্ভিক রোদ, পলিটিক্যাল পরাজয়ের অনুশোচনা ও যে-কোনো একটা জেঠামেয়ের হাসির মাঝখানে স্যান্ডউইচ করা তার নরম কাঁধের শ্রাগ।


শান দেওয়া শহরের মেয়ে দীপিতা; কথা যখন সে বলে চশমার সোনার ফ্রেম সেগুলিতে পালিশ লাগিয়ে দেয়, কানের অদ্ভুত-গড়ন দুলজোড়া দুলে, ডিগবাজি খেয়ে কাঁধের আনতিতে ফুটে ওঠা যতি কমা, কোলোন, জিজ্ঞাসাচিহ্নের প্রকাশগুলি স্পষ্ট করে তোলে।

দীপিতা খদ্দরেই অভ্যস্ত; শুধু শাড়িতে নয়, তার বসবার ধরন, বুকের কাছে বইগুলি কুড়িয়ে নেবার পদ্ধতিটাতেই শুধু খদ্দর নয়, উঁচু করে কথা সে বলে না, উঁচু গলায় হাসে না।

কিন্তু এ সত্ত্বেও লোকে বলে : হঠাৎ কিছুদিন ধরে আঁচলের একপ্রান্ত একটু তুলে খোঁপাটাকে আড়াল করার যে-রেওয়াজ উঠেছিল কলেজে তার পেছনে দীপিতার শুধু প্রশ্রয়ই ছিল না। তেমনি ডাক-পিওনদের মতো চামড়ার অর্ধচন্দ্রাকার ব্যাগ কাঁধে ঝোলানোর ব্যাপারটাতেও দীপিতার নাম জুড়ে গেছে।

কিন্তু লোকে প্রকাশ্যে বলে না। পাছাপেড়ে শাড়ি কলকাতায় কী করে জুটল, এর চাইতেও বড় সমস্যা হলো একদিন সেটা পরে কলেজে আসবার কথা দীপিতা কী করে ভাবতে পারল! শুধু পরা নয় যেখানে যে-রকম টানটোন দেয়া দরকার তেমনি করে দেহকে ফুটিয়ে তুলে! সারা দিন তাকে কেন্দ্র করে কলেজে একটা বাতাস খেলে গেল। প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলেনি, হয়তো হাস্যকর ব্যাপারও অভিভূত করে দেবার মতো ভালো লেগে যায় কখনো।

দীপিতা নিজেও জানে এগুলি তার একসেন্ট্রিসিটি, আগে টের পায় না, পায় ঘটে যাবার পর। কলেজে নতুন পাশ-করা কোনো অধ্যাপককে বিব্রত করে, লেডি চ্যাটারলির লালসার সমালোচনা তাঁর মৌনতা থেকে টেনে বার করে-করে, শেষ পর্যন্ত উপন্যাসের প্রথম একশো-তিরাশি পাতা স্রেফ গ্রন্থের কলেবর বাড়ানোর জন্যে লেখা বলিয়ে নিয়ে, লরেন্সের প্রশংসা নিন্দায় পরিণত করে দীপিতা যখন তার বেঞ্চটাতে বসে তখন সে ভাবে এটাও একসেন্ট্রিসিটি হল।

ডিবেটিং-ক্লাবের দীপিতা, ভারতীয় ফেবিয়ান-ক্লাবের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ‘এমাজন’ নয়। কেউ তাকে দেখেনি হেদোর উঁচু ব্রিজ থেকে কালো পোশাকে ঝাঁপ দিয়ে পড়তে জলে। কল্পনাও করা যায় না।

কিন্তু যখন সে বাড়ি ফিরে যায় কেউ কি দেখেছে তাকে? একটা ব্লাউজ থেকে আর-একটায় যাবার ক্ষণটুকু দীর্ঘায়িত হয়ে আয়নায় যখন প্রতিবিম্বিত হয় তখন ক্লান্তির স্বেদমালা নাভির কাছে জন্ম নিয়ে বিপন্ন স্তনযুগলের মাঝখান দিয়ে কাঁধের দুদিকে ছড়িয়ে পড়ে ঘাড়ের পেছনে আবার একত্রিত হয়ে মাথাটাকে সামনের দিকে নত করে দেয় যেন। দীপিতা ‘আঃ’ বলে পাশের চেয়ারটায় গা ঢেলে দেয়। সে শুধু উনিশ বছরের একটি মেয়ে।

পরেশ মিত্তির বেড়িয়ে ফিরে আদ্দির পাঞ্জাবি খুলল, চুনট-করা কোঁচাটা এক অদ্ভুত কায়দায় জড়িয়ে আলনায় ঝুলিয়ে রাখল। পাম্পশুটা খুলে ব্রাশ দিয়ে ঝেড়ে গুছিয়ে রাখল, পাঞ্জাবির তলে যে মোটা গেঞ্জিটা পরা ছিল সেটা পালটে মসলিনের মতো হালকা একটা পরল। হালকা রঙের সিল্কের লুঙ্গিটার বাঁধন আলগা করে পায়ের দুপাশে মাথা হেলিয়ে-হেলিয়ে লুঙ্গির ঘের মাটি স্পর্শ করেছে দেখে নিশ্চিন্ত হলো। আলনা থেকে বিলিতি তোয়ালেটা কাঁধে ফেলে বাথরুমের দিকে যেতে-যেতে ফিরে দাঁড়াল, আলনাটার পায়ের কাছে বসে জুতো চটিগুলি সোজা করে রাখল।

কাঁধ থেকে চুলের গোড়া, আঙুলের ডগা থেকে কনুই অবধি সাবান দিয়ে ধুয়ে পরেশ যখন ঘরে ফিরে সরু ধাতব ফ্রেমের চশমা খাপে পুরে কালো ফ্রেমের পুরু কাচের বই-পড়বার চশমা বার করে বসেছে টেবিলের সম্মুখে, তখন ইন্দুর ফিরবার সময় হলো

ইন্দুর বর্ণনা করা বেশ একটু কঠিন। যতই গম্ভীর হয়ে বিচার করতে বসা যাক, বর্ণনা খানিকটা হাস্যকর হবেই। নস্য রঙের সিল্কের পাঞ্জাবিটা আধো-অন্ধকারেও দৃশ্য হচ্ছে। হাতে একগোছা গোলাপ ফুল। তার গলার সাড়া পেয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় বার্ষিক শ্রেণীর দু-তিনটে ছেলে তার কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল। ঘরের তালায় চাবি পরাতে-পরাতে ইন্দু তাদের দেখে ফিরে ঘরগুলির সম্মুখে বারান্দায় রেলিঙের কাছে দুটো থামের মাঝখানে যে-কোণটুকু আছে তার কাছে ফিরে দাঁড়াল—ভাবখানা এই, এস হল্লা করি খানিকটা।

একটা ছেলে কচি গলায় বললে, ‘গোলাপের উঠনো বন্দোবস্ত আছে নাকি, ইন্দুদা?’ আর-একজন রসিকতা করবার চেষ্টা করে বললে, ‘প্রেমের ব্যাপার নাকি, ইন্দুদা, শুনেছি তিনি বন্ধুপত্নী।’

ইন্দু খক-খক করে হেসে উঠে বললে, ‘তা প্রেম বইকি। দাদাকে অজস্র মুঠি-মুঠি বিলোবার পরও বউদির ভাড়ার কিছু কিঞ্চিৎ থাকে, আমাকে ডুবিয়ে দিতে সেইটুকুই যথেষ্ট।’

দীপিতা স্বীকার করে ইন্দুর বর্ণনাটা আগাগোড়াই কল্পনা, হয়তো-বা খানিকটা পক্ষপাতদুষ্ট। সে হয়তো নস্য রঙের সিল্কের ভক্ত নয়, কিন্তু ইন্দুর কথা মনে হলেই এ-রকম দৃশ্যই তার মনে পড়ে। অনেক অজুহাতেই পরেশ মিত্তিরের ঘরখানা সে দেখেছে। সেটা কল্পনা নয়, ঘর গুছিয়ে রাখে পরেশ। কিছু বললে বলে—নিজের হাতে সাতদিনের জঞ্জাল এক রবিবারে সাফ করবার চাইতে জঞ্জাল জমতে না দেওয়াই ভালো। কিন্তু ইন্দু?

দীপিতা না-দেখেও বলে দিতে পারে ইন্দুর ঘরের দুর্দশার কথা। সিগারেটের দগ্ধাবশেষ, টিনের খাবারের খালি আধার, ময়লা কাপড়-জামা, ধুলোয় ঢাকা টেবিল এসবই থাকবে—যেন শরৎবাবুর কোনো নায়ক; কোনো নায়িকা এসে ঘর গুছিয়ে দেবে, গুছিয়ে দেবার মধ্যে ফুটে উঠবে—নিশ্চিন্তে আরাম এনে দেবার মতো স্ত্রী হতে পারি তোমার। মানুষকে চেনা গেলে তার সম্বন্ধের খুঁটিনাটি বিষয়গুলি কল্পনা করা কঠিন নয়।

ইন্দুর কথায় পরেশের মনে হয় : মানুষের জীবন কেন বাহুল্য-বর্জিতের একটা তরঙ্গে গঠিত হয় না।

দুজনে একসঙ্গে ঝরনা কলম কিনতে গিয়েছিল দোকানে; পরেশ কিনল ধূসর রঙের স্ট্রিমলাইন্ড একটা-কিছু আর ইন্দু নিল কলরব-করে-ওঠা ফিরোজারঙের দামি পার্কার সোনার খাপে মোড়া। এইখানেই রুচির তফাত, এই পার্থক্যই দুজনের সর্বত্র।

পরেশের বন্ধু হিসাবে ইন্দু চলতে পারে না। বহুদিন পরে, ম্যাট্রিক পাশ করবার পর চতুর্থ বার্ষিক শ্রেণীতে এসে, দেখা; পরেশও খুশি হয়েছিল বইকি; হাত জোড় করে স্মিত হাসিতে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছিল—ইন্দুবাবু! ভালোই হলো, পুরনো দিনের অনেক কথা বলা যাবে। প্রত্যুত্তরে ইন্দু—আরে বাঁটলো যে রে, বলে লাফিয়ে এসে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল পরেশকে।

ইন্দুর সঙ্গে পরেশের বিচ্ছেদের যা কারণ সেটাকে এই রকম বলা যায়; রবিবারের পাগল ইন্দু; প্রতি রবিবারে সকাল থেকে বেলা বারোটা অবধি কলকাতার পথে-পথে হৈ-হৈ করে হা-হা করে হেসে, কেবল সিগারেট ফুঁকে রেস্তোঁরা-কাফেতে চা খেয়ে ঘুরে বেড়াবে। এই বোহেমিয়ানা যে এক শতাব্দীর পুরোনো হয়ে গেছে এ ইন্দু বোঝেও না, জানে না।

কিন্তু এ-কথাগুলি ভাবলেও, কী শোভন প্রকাশ করেছিল তার পরেশ, এতটুকু ক্ষোভ নেই, এতটুকু বিচলন নেই, শান্ত মৃদুস্বরে বলেছিল, ‘ওর স্বাস্থ্য ভালো, ও পারে, পিছিয়ে পড়লুম আমি।... এইসব দিয়ে ইন্দু গড়া, পরেশও।

মাঝে মাঝে কিন্তু ইন্দুর রুচি মোহগ্রস্ত করতে পারে চারিপাশের লোককে। দীপিতার গত জন্মদিনে এ রকমের একটা ব্যাপার ঘটেছিল; অন্য অনেকের মতো ইন্দুও উপহার দিয়েছিল। সত্যিকারের কাজ যাতে আছে এমন একটি রুপোর রেকাবিতে একটা কালচে-লাল রঙের দগদগে গোলাপ। টাকার দেমাক না-দেখিয়ে যতটা ব্যয় করা ছাত্রের পক্ষে সম্ভব ততটা নিশ্চয় হয়েছিল রেকাবিখানা কিনতে, কিন্তু তার চাইতে প্রাধান্য পেয়েছিল ক্ষণস্থায়ী গোলাপটি। এমনকী দীপিতার গালেও ব্রীড়ার রং লেগেছিল।

তেমনি হয়তো ভালো লাগার উপাদান তাকে তার হঠাৎ বলা কোনো কথায়। পরেশ বলেছিল—এখনও অর্ধেক কল্পনায় ঘিরে রাখতে চাই নারীকে। হর্ষে, দুঃখে, উদারতায়, হিংসার সার্টের আড়ালের মানুষটির সঙ্গে বডিসের অন্তর্বর্তিনীর কোনো প্রভেদ নেই, এ বুঝব আমরা কবে? এখনও এই বিংশ শতকের মাঝামাঝি এসেও বলব, তুমি হেঁটে গেলে পদ্ম ফুটে ওঠে। এসব কথা, ছেলে ভুলানো ছড়া আর-কতদিন চলবে।

দীপিতা বলতে যাচ্ছিল—ছেলে ভুলানো ছড়া যাদের জন্য সেই শিশুমনগুলিতে এখনও আছে, এমনি সব লাল রং দেখে হাত-বাড়ানো শিশু।

প্রথম দিকে ইন্দু চুপ করেছিল, হঠাৎ বলে উঠল—বিংশ শতকের কাচের বাঙ্ েরাখা জীবন আমাদের; শো-কেসে রাখা প্রজাপতির ডানার পরাগের মতো খসে গেছে আমাদের কল্পনা; অনেক গালভরা টানা টানা লাতিন নাম সুস্পষ্ট পাইকায় লিখে দিয়েছি বাঙ্রে গায়ে-গায়ে; তবু পরাগ-উঠে-যাওয়া জীবন। তারপর সে দীর্ঘনিঃশ্বাসও ফেলেছিল।

মাঝে-মাঝে মনে হয় লোকটি কথা বলছে না যেন স্ফটিক নিয়ে খেলা করছে। কিন্তু এ-ব্যাপারটা তার পিছিয়ে থাকবার নজিরও বটে; কথার এই সুবিবেচিত প্রয়োগ, লক্ষ্যে পড়ে যাবার মতো প্যাঁচের প্রাচুর্য। বস্তুত ইন্দুর লক্ষ্যের মাঝখানে গিয়ে পড়বেই, তার সুগৌর প্রকাণ্ড দেহের মতো প্রাধান্য-কাঙাল যেন তার রুচি, ফলে গোলাপের মতন বর্ণচ্ছটায় ও আবেগের উত্তাপে ভরে ওঠে সে।

ইন্দু নিজেও জানে তার পদ্ধতিতে সেকেলেমি ছাড়া আর কিছু নেই, সেও ধীরে-ধীরে বিকাশের প্রভাব মেনে নিচ্ছে। বিকাশ দীপিতার দাদা, তার সংস্পর্শে এসে ইন্দুর বলবার ভাষার পরিবর্তন সূচিত হয়েছে, অনাড়ম্বর, প্রজ্ঞাদীপ্ত, উৎপ্রেক্ষাহীন হয়ে উঠবার লক্ষণ দিয়েছে ইতিমধ্যে।

এ-বাড়ির কথা বলতে গেলে বিকাশের কথা বলতে হয়। খদ্দর পরেন না তিনি, সাধারণ বাঙালির মতো দোকানের কাপড় কিনে পরেন। জেল তাঁকে বারংবার খাটতে হয়েছে গান্ধী-মহারাজের ডাকে। কোনোদিন কেউ মাথায় দেখেনি গান্ধীটুপি, খুব বিরক্ত করলে মধুর পরিহাস করে বলেন : বাঙালির ছেলে, হঠাৎ নগ্নমাথায় খাপ উঠলে বেখাপ্পা দেখাবে। জেল থেকে বেরিয়ে কেউ দেখেনি তাঁকে ফুলের মালা গলায় পরতে, জেলে ঢুকবার সময়ে কেউ শোনেনি বন্দে মাতরম বলতে বুকভরে। দেশ আমার, আমার দেশকে আমার বলতে শ্লোকে গান গেয়ে উঠতে হবে কেন স্বর্গাদপি গরীয়সী বলে? আমার মা আমার ছেলে বলে কেউ কি কোনোদিন গান গেয়ে ওঠে।

এ-বাড়ির আবহাওয়া বিকাশের জ্যামিতির প্রতিজ্ঞার মতো স্বল্পবাক, বাহুল্যবর্জিত জীবনের তৈরি!

কোথা থেকে কী হলো কলেজে, কী কেলেঙ্কারি ঘটে গেল। দরজার পাল্লায় হাত ছেঁচে রক্তারক্তি। দরজার পাল্লায় মানুষের দু-তিনটে আঙুল অমন বীভৎসভাবে জখম হতে পারে এ না-দেখলে বিশ্বাস হয় না। অতটা বাড়াবাড়ি যেন ইন্দুর ক্ষেত্রে ছাড়া ঘটতও না। স্যোসালিস্ট এক নেতার সংবর্ধনা ব্যাপারকে উপলক্ষ্য করে ঘটল ব্যাপার। দীপিতা ও পরেশ ঝগড়া করতে নয়, ইন্দু ও তার পেছনে কয়েকটি ছেলের একটি দল তৈরি হচ্ছিল, তাদের বোঝাতে গিয়েছিল; কেলেঙ্কারিটা ঘটে গেল। কেউ কেউ বলে পরেশ ইচ্ছা করে দরজাটা চেপে দিয়েছিল, কেউ বলে ইচ্ছা করে দিলেও ইন্দুকে জখম করবার জন্য নয়, দিয়েছিল নিজের বিরক্তির নাটকীয় প্রতীক সৃষ্টি করতে। কিন্তু আর্তচিৎকার করে হাত চেপে ধরে ইন্দু যখন বসে পড়ল, এতসব ভাববার অবকাশ কারো ছিল না। দীপিতা স্তব্ধ হয়ে দেখল, ছ-ফিট উঁচু পুরুষটির দেহটা একেবারে তার পায়ের কাছে নুয়ে পড়েছে; বেদনায় এমন হাহাকার করতে কাউকে সে শোনেনি, দেখেনি এমন করে পুরুষকে কান্না চাপবার বৃথা চেষ্টা করতে। অ্যাম্বুলেন্স, প্রফেসাররা, ছাত্ররা যখন এল তখন দীপিতা ইন্দুর অনতিদূরে চৌকাঠে মাথা রেখে বসে আছে, তার চোখ বন্ধ, হাত মুঠো করা, চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে, ইন্দুর রক্ত গড়িয়ে এসে তার শাড়ির খানিকটা ভিজে গেছে।

সম্ভবত রক্ত সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা কম বলেই কথাটা তার মনে দাগ কেটেছিল। পরেশ মিত্তির সম্বন্ধে কেউ-কেউ সন্দেহ আরোপ করেছিল। সহসা একটা আবেগের মতো বোধ করতে প্যাড টেনে নিয়ে দীপিতা খসখস করে একদিন লিখল : পরেশবাবু, আজকের ব্যাপারের জন্য তোমার লজ্জিত হওয়া উচিত; সুরেন্দ্র তোমার ইকোনমিঙ্রে নোট চুরি করে পড়েছে এই অজুহাতে কলেজে যে-রোল উঠেছিল তার পেছনে তুমি ছিলে এ রকম সন্দেহ হচ্ছে আমার।

এই পর্যন্ত লিখে চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলেছিল সে, ডাকে দেয়া যেত, চাকরের হাতেও পৌঁছে দেয়া যেত, বাধা সেটা নয়; চিঠি লিখবার কোনো যুক্তিই নেই বরং ভাবাতিশয্য প্রকাশ পাবে; নাটকের মতো হবে ব্যাপারটা।

রাত্রিতে সে খেল না, ইন্দুর রক্তাক্ত হাতের কথা মনে হতে গা ঘেঁটে উঠতে লাগল। পরের দিন কলেজে যেতে কুণ্ঠা হচ্ছিল তার, কিন্তু না-গেলে বাড়বে হৈ-চৈ, গেল সে, পরেশও এল; অন্যান্য দশদিনের মতো স্বাভাবিক হয়ে চলল তারা। তিনদিনের মাথায় ব্যাপারটা থিতিয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু কলেজ থেকে ফিরে দীপিতা চিঠি পেল, ভেবেছিল পরিচিত কারো, তলে নাম দেখে অবাক হলো। ইন্দু চিঠি লিখেছে! লিখেছে :

শ-দেড়েক টাকার আজই প্রয়োজন; হাতের অবস্থা ভালো নয়। হাসপাতালের ব্যবচ্ছেদে কেটে বাদ দিতে হবে দুটি আঙুল। আমার অমন সুন্দর আঙুলগুলি হারাতে চাই না, বাইরে বড় কাউকে দেখাব। টাকাটা আজই পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করবেন।

ইন্দু চিঠি লিখেছে, তাকে লিখেছে, লিখে টাকা চেয়েছে! পোস্টকার্ডখানা উল্টেপাল্টে দেখে তার শুধু মনে হলো হিং টিং ছট। উপন্যাসের নায়িকা যেন সে, জোর করে মন কেড়ে নেবার পার্ট যেন তার সম্মুখে। দেড়শোটা টাকা এমন কিছু নয়, এর আগে চাঁদা হিসাবে সে দিয়েছে, বড় জোর মা একটু হুঁশিয়ার করে দেবেন, কিন্তু ইন্দুর টাকা চাইবার কী যুক্তি এত লোকের মধ্যে বেছে-বেছে তার কাছে। টাকা পাঠাবার কথা ভাবতে গিয়ে তার মনে হতে লাগল উপন্যাসের পূর্বরাগের কথা।

রাত্রিতে শুতে গিয়ে একলা অন্ধকারে তার মনে হলো চিঠিটার কথা, হাসিও পেল। কিন্তু চিন্তাগুলিকে যখন ঘুমের গহ্বর থেকে টেনে বার করতে হচ্ছে দীপিতার মনে হয়েছিল : নন্তুটা (তার ছোট ভাই) এমন করে মাঝে মাঝে পয়সা চায় বটে, কিন্তু ক্লাস সিঙ্রে ছেলে নন্তু আর ইন্দু একই অর্থে পুরুষ নয়।

প্রায় এক সপ্তাহ পরে বৈকালে, অধ্যাপক দু-তিনদিন আসেননি, তাঁর অসুখ করেছে কিনা এ খোঁজ করতে গিয়ে দীপিতা আটকে পড়ল অধ্যাপক যখন বললেন—গাড়ি রাখো, শম্ভু পণ্ডিতের হাসপাতালে ইন্দুকে দেখে যাব তোমাদের বাড়িতে, চা খাওয়া হয়নি, তোমাদের ওখানেই খাব।

এরপরে অজুহাত দেখানো চলে, না-যাওয়া চলে না। বাড়াবাড়ি হয়, জেদের মতো ুএকটা-কিছু প্রকাশ হয়ে পড়ে।

ইন্দু বিছানায় উঠে বসেছিল। ক্লান্ত নিষ্প্রভ দৃষ্টি, গভীর শোক ছাড়া এমন চেহারা হয় না কারো। অধ্যাপকের প্রশ্নের উত্তরে ব্যান্ডেজ বাঁধা হাত তুলে দেখাল ইন্দু, ব্যান্ডেজের ফের দেখেই বোঝা গেল কঠিন সত্যটুকু, দুটি আঙুলই কেটে বাদ দিতে হয়েছে। অধ্যাপক ধীরতা সম্বন্ধে কী-একটা উপদেশ দিতে ইন্দু টেনে-টেনে হেসে উঠেছিল, কিন্তু দীপিতার দিকে চোখ পড়তেই ওর হাসি থেমে গেল; গভীর অভিমানে মুখের চেহারা যেমন হয় তেমনি হলো, চোখেও জল এল।

একদিন মুখ নিচু করে বই গোছাতে-গোছাতে দীপিতা শুনছিল ইন্দুর অসুখের কথা অধ্যাপকের মুখে। তিনি একসময়ে বলেছিলেন, বেচারার আঙুলগুলির জন্য দুঃখ হয়। বাইরের কাউকে দেখাতে চেয়েছিল শুধু কিছু টাকার জন্যই হলো না।

‘আপনি দিলেন না কেন,’ দীপিতা বলেছিল, চিঠির কথা মনে পড়েছিল তার।

‘দিয়েছি, কিন্তু বাইরের ডাক্তার এসে বললেন, অপকারটুকু হয়ে গেছে।’ অতঃপর অধ্যাপক বললেন, ‘কে একজন ওর আছে, তার কাছে টাকা চেয়ে পাঠিয়েছে, বলেছে তিনি টাকা পাঠালে আমার ধার শোধ করে দেবে। আমি ভেবেই পেলুম না কলকাতায় থেকে এত বড় বিপদের কথা শুনেও টাকা পাঠাতে দেরি করলেন কেন তিনি। অমন বন্ধু থেকে লাভ কী? ধার হিসাবেও তো টাকাটা দেয়া যায়।’

দীপিতা সোজাসুজি একটু তীক্ষ্ন করে অধ্যাপকের দিকে চাইল, সন্দেহ হয়েছে তিনি চিঠির কথা জানেন, বিঁধবার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তা নয়। অধ্যাপককে এমন একটি বৃত্তি আরোপ করার জন্যই দীপিতা কুণ্ঠাবোধ করল।

অধ্যাপক চলে গেলে দীপিতা ভাবল—পাঠালেও হতো টাকাটা, ইন্দুকে যা ভেবেছিল তা হয়তো নয় সে। টাকার প্রয়োজনে লিখেছিল, দীপিতাদের দেবার ক্ষমতা আছে জেনে। হৃদয়ের অনুসন্ধান সে করেনি উপন্যাসের নায়কের মতো। টাকাটা দিতে হবে, অধ্যাপকের ধার যখন ইন্দু শোধ করতে চায় তখন টাকার প্রয়োজন ফুরায়নি, ইন্দুকে অঋণী করতে অগ্রহ হলো তার।

পরদিন টাকাটা পাঠাতে গিয়ে আগ্রহটা তাকে সংকুচিত করেছিল, ইন্দু যদি তার আগ্রহে কোনো গভীরতর বৃত্তি আরোপ করে বসে। কিন্তু একটা ভালো লাগার বোধও ছিল এ-কুণ্ঠার মধ্যে। মনি-অর্ডারের কুপনে সে লিখল : পাঠাতে দেরি হলো বলে আমি দুঃখিত।

তার লিখতে ইচ্ছা হলো : আপনি নিতান্ত ছেলেমানুষ, এত অল্পদিনের পরিচয়, যাকে পরিচয়ই বলা যায় না, তাতেই আপনি টাকা চেয়ে পাঠিয়েছেন, আপনার আত্মপ্রত্যয়ের মূল অনুসন্ধান করতে ইচ্ছা হয়।

কিন্তু দীপিতার মতো মেয়ে এ-কথা কাউকে লিখতে পারে না, বরং ভালো লাগার বোধটাকে আড়াল করবার জন্য কুপনে লিখল—যখন সম্ভব হয় শোধ করে দেবেন।

টাকাটা পাঠিয়ে রাত্রির অন্ধকার অপূর্ব বোধ হতে লাগল। ইন্দু কি তাকে ভালোবাসে?

দীপিতা বালিশে মুখ গুঁজে হেসে ফেলেছিল। কিন্তু একজন পুরুষ তাকে ভালোবাসে এ-বোধটা হাস্যকর হলেও, পুরাতন হলেও প্রত্যেকটি মেয়ে প্রথম যখন অনুভব করে তখন বোধ হয় কৌতুক ও কৌতূহলে উন্মনা হয়ে ওঠে—ভাবল দীপিতা।

পরের দিন সকালে টাকা পাঠানোর ব্যাপারটায় নিজেকে খুবই বোকা বললে দীপিতা। ইন্দুকে অঋণী করবার জন্য টাকাটাও পাঠাতে হবে এতটা আগ্রহ হওয়া উচিত ছিল। দু-পাঁচদিন ডাকের দেরি হলেও ইন্দুর বাড়ি থেকেই নিশ্চয় এসেছিল টাকাটা।

কিন্তু খুব খারাপ লাগছে না, কুণ্ঠার মধ্যে ভালো লাগার বোধ একটা থাকেই, বিশেষ করে আজকের রাত্রিটায় যেন ভালো লাগছে চিন্তা করতে।

একদিন সশরীরে ইন্দু এসেছিল দীপিতাদের বাড়িতে, অন্য অনেকবারের মতো দীপিতা অবাক হয়ে শুনেছিল ইন্দুর রঙদারি ভাষা।

কিন্তু বিকাশ চলে গেলে, দীপিতার সম্মুখে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ঘামতে লাগল ইন্দু। ব্যথা নেই আর—দীপিতা বলেছিল।

অস্ফুট একটি—না।

একটু পরে আবার দীপিতা বললে—হোস্টেলে না-ফিরলে যদি চলে, খুব বৃষ্টি হচ্ছে না?

ইন্দু বললে—হোস্টেলে না-ফিরলে চলে।

আসলে ব্যাপারটা এই, পরে একদিন ভাবল দীপিতা—রোজকার ঘটনার বাইরে যা সেটাই রোমান্স, আর সব ব্যাপারটার মূলে আছে ইন্দুর রোমান্সপ্রিয়তা। টাকা ধার করার ব্যাপারটা হয় কুসীদজীবীর সঙ্গে বা কুসীদজীবীর বিলেতি প্রতিরূপ ব্যাংক ও ব্যাংকারের কাছে থেকে। আমাদের দেশের মেয়েদের অর্থ সম্বন্ধে কোনো স্বাধীনতা নেই, দিতে হলে কাউকে কিছু তাদের অভিভাবকস্থানীয় পুরুষরা দেন। ঠিক এজন্যই হঠাৎ কোনো মেয়ের যদি অর্থনীতিগত স্বাধীনতা থাকে তার আবহাওয়া অনেক পুরুষের কাছে রোমান্টিক বোধ হয়। এমনকি অনেক মেয়েরও হয়, যেমন হয়েছিল স্বাগতার। স্বাগতা বুদ্ধিশাণিতা মেয়ে, কলেজে সে রোমান্স কল্পনা করতে পারত না। কিন্তু কলেজ থেকে বেরিয়ে অধ্যাপিকা হিসাবে অর্থ উপার্জন করে সে রোমান্টিক হয়ে উঠল। তার চাইতে বয়েসে ছোট (লোকে বলে) একটি রোগা ফ্যাকাশে খদ্দর-পরা ছেলেকে এখন-তখন অর্থসাহায্য করতে করতে একসময়ে সে তার মোহে কলেজ ছাড়ল, গ্রামে চলে গেল ছোট একটি রোমান্টিক কুটির গড়বার লোভে।

বিশ বছর আগে কলেজে পড়ার ব্যাপারটাই এমন রোমান্সের উপাদান হতো, মেয়েরা কলেজে পড়ছে এই নতুনত্ব। নতুন শাড়ি পরলে পুরনো বউকে যেমন ভালো লাগে, তেমনি স্ত্রীজাতি-বিমুখ অনেক কলেজের ছাত্রের চোখে এই নতুন রূপটি, বুকের কাছে বই কুড়িয়ে নিয়ে, ছাতা হাতে করে চলা মেয়েদের, ভালো লেগে উঠল। সাহিত্যিকদের উপরেও এসব পরিবর্তন প্রভাব বিস্তার করে।

দীপিতা সকালের ডাকে আসা কলম্বিয়া য়ুনিভার্সিটি থেকে প্রকাশিত বর্তমান ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসের ধারা খুলে বসল। কিন্তু ঘুম পাচ্ছিল তার। মনে হলো ঘুম পেলে ছেলে-ছাত্ররা নস্যি নেয়। হাই তুলে সে ভাবল একদিন নিয়ে দেখলে হয় ঘুম যায় কিনা, কিন্তু বড্ড নোংরা।

তাহলেও, ভাবলে দীপিতা—একদিন যদি দেখা যায় মেয়েরা নস্যি নিতে আরম্ভ করেছে, হয়তো সেটাই রোমান্সের উপকরণ হয়ে উঠবে।

এটা হাস্যকর কথা হলেও এর চাইতে বড়-বড় ঘটনার মূলেও এ-অভিনয়ের নেশা দেখা যায় বইকি। বস্তুত আজই দেখেছে সে, বিকাশের ঘরের পাশ দিয়ে আসতে-আসতে গানের মৃদুশব্দে অর্ধোন্মুক্ত দরজা দিয়ে চোখ পড়েছিল ঘরের মধ্যে, ভামিনী বউদিকে দেখা দিয়েছিল প্রসাধন করতে। একটু অবাক লেগেছিল বইকি দীপিতার। সবজে সাটিনের পায়জামা পরা, পিঠের চওড়া চ্যাপ্টা বেণী এসে পড়েছে নিতম্বে। আর্দ্র দৃষ্টি বেষ্টন করে যেন কাজলের রেখাও ছিল।

দুগাছি সরু সোনার চুড়িতে, একগাছা সরু সোনার হারে, লাল পেড়ে সাদা শাড়িতে দেখা ভামিনী বউদির সঙ্গে মেলে না। তার দাদা বিকাশ স্কুলের হেডমাস্টার, কিন্তু তাই বলে অর্ধ-সন্ন্যাসের আদর্শে খাড়া হবেন ছাত্রদের সম্মুখে এ মত নয় দীপিতার। রাত্রির প্রভাব, আদিম সূর্যোদয়ের চাইতেও প্রাচীন তমিস্রার রক্তে সঞ্চারিত স্মৃতি।

একবার একটা কবিতার কথা মনে হয়েছিল তার। পুরুষ বলছে নারীকে : ‘এইটুকু আমার কামনা, শুধু এইটুকু—তোমার পাশে দাঁড়িয়ে আমার মন যখন করুণায় টলমল করে উঠেছে, সেই কারুণ্যের কাঁপন লাগুক তোমার মর্মমূলে, পরম সহ-অনুভবের প্রতিতরঙ্গ।’ মিথ্যা নয় কবির আশা, আরো দু’এক শতক পরে হয়তো মানুষের জীবনে সত্য হয়ে উঠবে।

কিন্তু তা না হলেও ক্ষতি নেই। ইংরেজি সাহিত্য ও বিজ্ঞান দীপিতার পাথেয়। যদিও সে এখনও ইংরেজি ‘লাভ’ কথাটাকে অপ্রচুর মনে করে মানুষের পারস্পরিক সবগুলি আকর্ষণ নির্দেশের পক্ষে, এবং যদিও সে স্নেহ ও শ্রদ্ধা কথা দুটিকে ইংরেজি চালানোর চেষ্টা করছে তাদের আদিম বাঙালি অর্থে, সে সব সময়েই স্বীকার করে ভারতবর্ষের লোক আমরা শত চেষ্টা করলেও দাম্পত্য ভালোবাসাকে স্নেহ ও শ্রদ্ধার স্তরে উন্নীত করতে পারব না, বাৎসায়নের এক্তিয়ারের বাইরে এনে।

কাল ভোর হতে-না-হতে দীপিতা প্রাত্যহিক ভোরাই চায়ের আসরে যোগ দিতে বিকাশের ঘরে যাবে। বাইরে চড়ুই পাখিটা সরু ঠোঁট দিয়ে ঠুকছে ঠুক-ঠুক করে কাচের শার্সি, কার্নিশের টবে একটি নিশাগন্ধার কলি আগামী রাত্রির তপস্যায় সংহত ও ঋজু হয়ে উঠবে। মিতভাষিণী ভামিনী বউদির মৃদু পরিহাসে ভোরের হাওয়ার মতো অনির্দেশ্য সুখের আমেজ আনবে।

কিন্তু কাল সকালে যদি মনে পড়ে যায় রাত্রির এই বেলোয়াড়ি আড়ম্বর, এই রং ও রেখার সপ্রচুরতা? ইন্দুর পক্ষে যা স্বাভাবিক তাই যেন ঘটে গেছে। যেন সে প্রভাবিত করছে। মিলিয়ে নেয়া কষ্টকর, আট পহুরে দুপুরের বিশদ বস্ত্রের বিকাশের কথা ছেড়ে দিলেও, বোরাই চায়ের আসরের অস্নাত অবিন্যস্ত কেশ বিকাশের সঙ্গেও মেলে না। দীপিতার প্রশ্ন হচ্ছে : বিকাশ কি সহ্য করতে পারে ভামিনী বউদির এই ভাবালুতা, রাত্রির রোমান্স গড়বার প্রয়াস। হয়তো করে, অপ্রিয় হবার জন্য কেউ প্রয়াস করে না, প্রসাধন করে না।

ইলেকট্রিকের বাল্বে মধ্যরাত্রির শব্দ হয় না। টেবিলের সম্মুখে বসে থাকতে-থাকতে দীপিতার মনে হলো সে যেন বাল্বের অভ্যন্তরে কম্পমান শিখা দেখতে পাচ্ছে। অনেক দিন পূর্বের এক বিয়েবাড়িতে চোখ-জ্বালা করা মধ্যরাত্রিতে শোনা গ্যাসের সাঁ-সাঁ শব্দটার কথা মন পড়ে গেল তার। সেই আলোটার চারিদিকে অসংখ্য সবুজ রঙের পোকা গিজ গিজ করছিল। দীপিতা এবার লক্ষ্য করলে ঘেরাটোপের গায়ে কতগুলি বাদলা পোকা লেগে আছে, স্ট্যান্ডের পক্ষাকৃতি গোড়াটাতেও। আঙুল দিয়ে গোড়াটা সাফ করতে গিয়ে সে আশা করেছিল আলোর গা চোয়ানো খানিকটা ময়লা আর্দ্রতা লাগবে আঙুলে, কিন্তু তাদের শুষ্কতা মনকে আকৃষ্ট করবার মতো।

আকাশের প্রান্তে মেঘ আছে। অজস্র কালো চুলের সীমার মধ্যে চকচকে অবিশ্বাস্য টাকের মতো আকাশে গুটিকয়েক তারাও চকচক করছে। দূরের মেঘগুলির গতি দেখে সেগুলিকে কালো বর্ণের ফুটন্ত দ্রব্য বলে মনে হচ্ছে, যা-কিছু বাতাস মেঘের বীচিভঙ্গে সৃষ্টি হচ্ছে, বাধা পাচ্ছে, মেঘমুক্ত আকাশের অংশটুকু যেন আতপ্ত সৈকত মেঘের ঢেউগুলির স্নিগ্ধতা বহন করে যে-বাতাসটুকু আসছে সেটুকু আতপ্ত তটভূমির স্পর্শে তপ্ত হয়ে উঠছে। রুক্ষতার একটা অনুভূতি অন্যান্য বোধগুলির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে, পরিবর্তিত করেছে সেগুলিকে, দুটি শ্রাবণের ঘণ্টার মধ্যে একখণ্ড ফাল্গুনের সময় এসে পড়েছে যেন।

গর্হিত অন্যায় কিছু নয়, অবাক করবার মতো, ধাক্কা দিয়ে জাগ্রত করে দেবার মতো বিষয়—ভাবলে দীপিতা। হয়তো কৌতুকের জন্যই এই বেশভূষা, তবু এক-একটি ব্যাপার এমন সন্দিহান করে তোলে মনকে। মনেপ্রাণে কি আমরা উপচার-প্রয়াসী? আমাদের রিয়ালিস্টিক দৃষ্টির গভীরে, শন্যাল জীবনপদ্ধতির আড়ালে ইন্দুর মতো একজন লুকিয়ে আছে। সেই জন্যই কি দিনমানের উচ্ছ্বাসবৃত্তি রাত্রির অবসরে এমন প্রগল্ভ হয়ে ওঠে। এতটুকু ফিকে হতে দেবে না, উপচার-বাহুল্যে আস্বাদনকে পীড়িত না-করে ছাড়বে না? কীটস্ভক্ত ইন্দুর মতো।

এত স্বাভাবিক ছিল এসব ব্যাপার যে কেউ বিচার করার কথা চিন্তাও করেনি। আজ বিচার করতে হচ্ছে : মালা গেঁথেছিল, ভামিনী বউ শাদা বেলফুলের মালা, বিকাশের গলায় পরিয়ে দেননি ভামিনী বউদি, লজ্জার বাধা নয়, দীপিতা গেঁথেছিল, সেও পরাতো। বিকাশ ফিরে এসে মালা দেখে খুশি হয়েছিল, প’রে নয়। এটা খুব বড় কথা নয়, জীবনদর্শনও নয়, তবু যেন রুচি ও চিন্তাধারার প্রতীক।

দীপিতা প্রশ্ন করল, অভ্যাসের ফলেই কি এমন হয়েছিল, নতুবা ভামিনীর কি সাধ ছিল বেলফুলের মালাটা প্রিয়জনের গলায় তুলে দিয়ে প্রতীক্ষায় ঊর্ধ্বমুখী হয়ে দাঁড়াতে পারেনি অভ্যস্ত নয় বলে।

দীপিতা জানালার কাছে উঠে গিয়ে গরাদে দেহভার রেখে দাঁড়াল। অভ্যাসের ফলে হয়েছে, ভাবতে একটু কষ্ট হলো, কারণ অভ্যাসের ফল মানে অনেক দিন অভিনয় করার ফল।

বিকাশের ছেলেটি, যে শুধু ভালোবাসা কেড়ে নেবার জন্য আঙুল বাড়াতে শিখেছিল, একদিন অব্যক্ত ব্যথায় মায়ের মুখের দিকে চেয়ে থাকতে-থাকতে নীল হয়ে কেঁদে উঠে বিদায় নিয়েছিল। সেদিন দীপিতা হাহাকার করে কেঁদে উঠতে গিয়ে বিকাশের মুখের দিকে চেয়ে শঙ্কিত হয়েছিল, শোককে ছাপিয়ে উঠেছিল মানুষের মননশীলতার প্রতি শ্রদ্ধা। বিকাশ ম্লান হেসে বলেছিল—ওকে ফুল দিয়ে সাজাবি, বরং মসলিনের নিষ্পাপ কিছু একটা পরিয়ে দে। ভামিনী শিশুমুখের দিকে চেয়ে থেকে একটা-বা অশ্রুর ধারা মুছে রোজকার মতো সাজিয়ে দিলেন।

শুধু কি অভ্যস্ততা, এত বড় বেদনার মুহূর্তেও কি অভ্যাস বড় হয়ে ওঠে? দীপিতার সন্দেহ হলো, সব আলো নিভিয়ে দিয়ে এলে সন্দেহ, বোধ হয় অনুভব ছিল না, হাহাকার করে কেঁদে উঠবার মতো প্রাণের সাড়া।

কিন্তু দীপিতা হাসল, হেসে বলতে পারল নিজেকে : দীপিতা তুমি একটি উনিশ বছরের মেয়ে মাত্র। এখনও সুস্থ সবল চিন্তাধারা তোমার নিজস্বত্বের কাঠিন্য অর্জন করতে পারেনি, অন্যান্য কারো চিন্তার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। এখন হাতে-মুখে জল দিয়ে বিছানায় যাও। কপালের রগ দুটিকে মাসাজ করে দিয়ো, ঘুমিয়ে পড়বে। কাল সকালে যখন সকালের খটখটে রোদে উঠে দাঁড়াবে তখন এপস্টাইনের মর্মরের মতো বাহুল্যবর্জিতের পরিপূর্ণতায় প্রকাশ পাবে তুমি।

তবু ভাবল দীপিতা : এখন মনে পড়ে না ঘুমাবার আগে অর্গল খোলা ছিল কিম্বা ঘুমের মাঝখানে উঠে দাঁড়িয়ে দরজাটার দিকে চেয়ে তার মনে হয়েছিল ওপারে ইন্দু হয়তো হাত-দুখানা প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে আছে তার মতো, দরজার অর্গল খুলে দিয়েছিল সে।

বর্ষণক্ষান্ত আকাশের দিকে চেয়ে দীপিতা দাঁড়িয়েছিল, তখন ইন্দু এল ঘরে, তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল বাইরের দৃশ্যের অংশ নিয়ে।

ইন্দু বলেছিল—আপনার পড়বার ঘরে ব্রাউনিং খুঁজে পেলাম না।

ব্রাউনিং খুঁজে দিয়ে ফিরে আসবার অনুভূতি এখনও লেগে আছে গায়ে, কিন্তু আরো অদ্ভুত বোধ হয় ভাবতে গেলে। ইন্দু শুধু বলেছিল—শুনুন, দীপিতা ঘরের প্রায় আধখানা হেঁটে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ইন্দুর পাশে।

ইন্দু বলেছিল তোমার চুলগুলি খুলে দাও বাইরের ঐ অন্ধকারকে আরো স্নিগ্ধ করে, কথা বোলো না। প্রজাপতি-ডানার নিচের অন্ধকারের মতো কোমল নীরবতায় ডুবে যাও। কথা বোলো না, পাতার আড়ালে একটি ডানার ছায়ায় আর-এক জোড়া ডানা স্বপন দেখছে চ্যুতমঞ্জরীর।

ইন্দু কথা না-বললে কী হতো কে জানে, ইন্দুর কথায় দীপিতার সন্মোহন টুটে গিয়েছিল, হেসে সে বলেছিল—পিলিয়াস মেলিসান্ডার কথা বলছেন? মেটারলিংক তাহলে ভালো লাগে আপনার?

না, আঘাত দেয়নি দীপিতা। অধ্যাপকের উপস্থিতিতে সাহিত্য আলোচনা করবার মতো লঘু হাসি ছিল তার ঠোঁটে।

টিনের ঘরে ফিরে এসে মনে হয়েছিল, সিনক্রিয়েট করা হলো যেন। যেন প্রেমনিবেদনভীতা ত্রস্তা কিশোরীর পলায়ন।

অতঃপর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সে স্বচ্ছ গলায় বলেছিল—ও ইন্দুবাবু, আসুন। ঘুম হচ্ছে না, হয়ও না এ-অবস্থায়, পোকার খেলি বরং।

দীপিতার সলিলকি করা অভ্যাস নয়, তবু মনে হলো আবার : তুমি কি চেষ্টা করে আজ ঘুমাতে পারো না। ইতিমধ্যে তুমি যা নয় তা চিন্তা করতে শুরু করেছ, আরো কিছুক্ষণ জেগে থাকলে নেশা মাথায় উঠবার মতো অবস্থা হবে তোমার। কাল সকালে থাকবে তা নয়, ঘুম ভালো না-হলে কাল সারাদিনই মস্তিষ্ক ভালো কাজ করবে না। নেশার পরে ভোঁতা বিস্বাদ জিহ্বার মতো হয়ে থাকবে মন। কাজেই বুঝলে... কাজেই উনিশ বছরের মেয়েটির মতো বিছানায় তালগোল পাকিয়ে রৌদ্রতৃপ্ত পুষির মতো ঘুমিয়ে পড়বে।

তথাপি প্রায় কেঁদে ফেলার মতো মুখ নিয়ে চেয়ারে ফিরে এল দীপিতা, ইন্দুর সেই মেটারলিংক প্রভাবিত রাত্রির কথা মনে পড়ে গেল। ইন্দুর ঘর তারই নিজেরই পড়বার ঘর, সেই দিন রাত্রির জন্য ইন্দুর ঘর হয়েছিল, ব্রাউনিং খুঁজে দিতে সবার মতো পুরুষের স্পর্শ-উদ্বেল অন্ধকার আজও ঘরে।

মনে হলো : যে-আগ্রহে ইন্দু কবি হয়ে ওঠে সেটা কি ভাব?

ইন্দুর উপপাদ্য একটা বিষয় মনে পড়ল—বিংশ শতকে এসে দেখছি আমরা রুক্ষ হয়ে উঠেছি, যে-কূপ থেকে উদ্বেল হয়ে ওঠে প্রাণরস, শুকিয়ে গেছে সেটা। বিশ্বাস নেই কিছুতেই থাকলেও স্বীকার করি না, কারণ বিশ্বাস জিনিসটা মধ্যযুগের ব্যাপার, সেই জন্যই তাকে বর্জন করেছি।

খুব অন্যায় করেছি? মধ্যযুগের পোশাকটা বর্জন করবার সময়ে ন্যায় ও অন্যায়ের কোনো প্রশ্ন যেমন ওঠে না, এটার বেলাতে হলে ক্ষতি কী?

ইন্দু এ রকম পরিস্থিতিতে ঠোঁট দুটি আলগা করে রাখে, বোকামির চিহ্ন নয়, কথা বলবার, তর্কের কোণ চেপে ধরবার আগ্রহাতিশয্যে সে টপ করে বলে বসল, ‘দেখুন এই সাহিত্যিক অমিয়বাবুর কথাই ধরুন, আপনার প্রিয়জনস্থানীয় অমিয়বাবুর, যখন ভাবের প্রসারতায় সহানুভূতিতে যখন তাঁর চোখ দুটি করুণায় ভরে উঠবার লক্ষণ দেখাচ্ছে, কলমকে অব্যাহত ছেড়ে দিলে যখন গ্রীক ক্লাসিকের স্বল্প পরিমিত গভীর বেদনার দু-চারটে কথা লিখে ফেলবেন মনে হচ্ছে, ঠিক তখনই টপিকাল কোনো কথা উত্থাপন করে বাজে কথার অবতারণা করে নিজের ভাবাবেগকে ব্যঙ্গ করে নিজের লেখাটাকে থার্ড ক্লাস করে তুলবেন। এটা হচ্ছে একটা পোজ, যুগের ভঙ্গি। ডেমোক্রাসির রিঅ্যাকশন।’

বক্তৃতা দেবার সময়ে ইন্দুর মাংসল চোয়াল দুটি স্থূলভাবে নড়ে-নড়ে ওঠে।

দীপিতা জ্বালাময় চোখের সম্মুখে ভার্জিনিয়া উল্ফই খুলে বসল। হাতের কাছে পেয়ে এমন স্পস্ট ভাষায় নিজেদের কথা কে বলেছে, কোথায় এমন বর্তমানের আলোকসম্পাত?

কিন্তু চোখে পড়ে গেল—না-না, আমরা পারছি না, প্রাচীনদের মতো কোনো মহৎ সৃষ্টি। সেই সুর, পরাজয়ের অবিশ্বাসের আজকের রাত্রির সুর। মনে হলো : বিশ্বাস ত্যাগ করাটা উচিত হয়নি। বিশ্বাস জিনিসটা অবিভাজ্য, প্রাচীনের প্রতি সব বিশ্বাস ত্যাগ করতে গিয়ে বর্তমানে বিশ্বাস রাখা আর সম্ভব নয়।

মনে হলো আশ্রয় চাই কিছু। সহসা সিগারেটের অনাস্বাদিতপূর্ব ধোঁয়ার অদম্য পিপাসা বোধ করল সে। ছেলেমানুষি করে কেনা ডাকপিওনের মতো চামড়ার কাঁধব্যাগ হাঁটকে বেরোল কয়েকদিন পূর্বে ব্রাভাডো দেখানোর জন্য সীতার কেনা বিবর্ণ এক প্যাকেট সিগারেট, যেটা দীপিতা শাসনের ভঙ্গিতে কেড়ে নিয়েছিল।

মুখে একটা তোবড়ানো সিগারেট গুঁজে পুরুষের ভঙ্গিতে টেবিলের উপরে পা তুলে বসল। নেই নেই কিছু নেই, মহৎ কোনো সম্পদ প্রাণরসের কোনো চিহ্ন—এমনি হাহাকারে শেষ হয়েছিল ভার্জিনিয়া উল্ফের জীবন, এ-কথাটাও মনে পড়ে গেল।

চেয়ারের পিঠে মাথা হেলিয়ে দীপিতা, মুখে তোবড়ানো সিগারেট ঝুলে আছে। হঠাৎ ঘুম এলো দুর্নিবার মোহের মতো বাইরের আকাশে গুরু-গুরু বর্ষণ নামামাত্র। বাঁ-দিকের বুকটায় গরাদের চাপে ব্যথা হয়ে আছে, ঘুমের ঘোরে একখানা হাত সে-ব্যথাটাকে স্পর্শ করে রইল।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন