শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০১৫

বই নিয়ে আলাপ : মেঘ অদিতি'র গল্পের বই 'সময় শূন্যতার বায়োস্কোপ' নিয়ে আলোচনা

অদ্বয় চৌধুরী
বিষণ্ণ মুগ্ধতার বায়োস্কোপ


সময় শূন্যতার বায়োস্কোপ, মেঘ অদিতি
প্রকাশক: ঐহিক প্রকাশনী, কলকাতা।
প্রচ্ছদ: অর্ঘ্য বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রাপ্তিস্থান: কলকাতা- ধ্যান বিন্দু, বুক মার্ক (কলেজ স্ট্রিট), বইঘর (যাদবপুর), কল্যাণদা'র দোকান (রাসবিহারী); ঢাকা- রকমারি ডট কম, বিদিত, পাঠক সমাবেশ, তক্ষশীলা (আজিজ মার্কেট), বাতিঘর (চট্টগ্রাম)।

মূল্য: রুপি ১৮০/- (ভারত); ২২৫/- বিডিটি (বাংলাদেশ)
ISBN: 978-81-920076-4-9



ধরা যাক, একটা চলমান ছবির ফ্রেম। লং শটে ধরা। সেখানে শীত আসে, বসন্ত আসে, আসে বর্ষা। ঋতু পালটায়। পালটায় সময়, বিষয়; পালটায় ঘটনাও। পালটায় না শুধু জীবন যাকে এক বৃহত্তর প্রক্রিয়া হিসাবেই গণ্য করা যায়। লং শটে ধরা দৈনন্দিন যাপনচিত্রে ফুটে ওঠে জীবনের খুঁটিনাটি- প্রেম, রাগ, অনুরাগ, বিরহ, চাহিদা, ব্যর্থতা, সুখ, কান্না। এগোতে থাকে জীবন, গল্প। পালটে যায় পাতা। ক্যামেরাটা কিন্তু স্থির থাকে। আর তার পিছনে নিরলস সজাগ চোখদুটিও।
উপরের এই দৃশ্যকল্পে লেখিকার অবস্থান ক্রমশ স্পষ্টতর হয়। তিনি এই সমগ্র প্রক্রিয়াটি দেখছেন ফ্রেমের বাইরে থেকে, ক্যামেরার পিছন থেকে- দূর থেকে, এক সুচারু বিচ্ছিন্নতা নিয়ে অবলোকন করছেন সমগ্র দৃশ্যকল্প। তবে, তাঁর অবস্থান কখনোই সম্পূর্ণ দায়বদ্ধতাহীন নয়। কারণ তিনি হলেন বায়োস্কোপের চিত্রগ্রাহক; পরিচালকও। এই সমগ্র দৃশ্যকল্পে তাঁর এক আপাতমরমী উপস্থিতি আছে যা সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিকে করে তুলেছে অকৃত্রিম, সমস্ত নির্মাণশৈলীকে করে তুলেছে কাব্যময়। লেখিকার এই আপাতমগ্ন, আপাতমরমী উপস্থিতি অনুভূত হয় যখন পাঠক হিসাবে সমগ্র দৃশ্যকল্পটিকে আরও পিছন থেকে দেখা হয়। সেখানে লেখিকা নিজেও দৃশ্যকল্পের এক বিষয় হয়ে ওঠেন ধীরে ধীরে। গল্পের চরিত্র ও গল্পের লেখিকা স্থান পরিবর্তন করে চলেন ক্রমাগত। আবার সমালোচক হিসাবে যদি আরও, আরও
পিছন থেকে দেখা হয় সমগ্র প্রক্রিয়াটি, তাহলে পাঠকও হয়ে ওঠেন সেই প্রক্রিয়ার অংশ, গল্পের চরিত্র। গল্পগুলি হয়ে ওঠে পাঠকের, আমাদের, সবার। এখানেই গল্পগুলি ছুঁয়ে যায় সর্বজনীনতা; স্পর্শ করে এক নান্দনিক বিস্ময়।
লেখিকার নাম মেঘ অদিতি। নিবাস ঢাকা, বাংলাদেশ। পেশায় চিত্রশিল্পী। বইয়ের নাম 'সময় শূন্যতার বায়োস্কোপ'। তেইশটি অণুগল্প, পাঁচটি গল্প ও ন'টি গদ্যের মাধ্যমে এখানে, এই বায়োস্কোপে, লেখিকা বৃহত্তর জীবনের আঙ্গিকে বিবিধ চাওয়া-পাওয়ার নিক্তিতে পরিমাপ করেছেন অপূর্ণতার পরিমাণ। বইয়ের প্রচ্ছদে সুরাপাত্র থেকে ছলকে ওঠা সুরার মাধ্যমে সেই অপূর্ণতাকে অপরূপ প্রতীকীর মাধ্যমে তুলে ধরেছেন প্রচ্ছদ শিল্পী অর্ঘ্য বন্দ্যোপাধ্যায়। সুরা তো জীবনেরই এক প্রতীক। সুরার রক্তিম আভাও তো জীবনকেই প্রকাশ করে। এখানে ছলকে ওঠার মাধ্যমে পূর্ণতা হারাতে চলেছে জীবন।
তবে অতি সমান্তরাল এক সরলরৈখিক জীবনচিত্র অঙ্কনেই থেমে থাকেন নি মেঘ অদিতি। তাঁর এই বায়োস্কোপে ধরা পড়েছে সময়, ধরা পড়েছে শূন্যতা। ধরা পড়েছে সময়ের শূন্যতা। 'পরের বসন্ত', 'একা রাই আর তার সন্ধ্যা', 'ইছামতীর কাছে', 'কালো প্রজাপতি অথবা ধ্বংসস্তূপ', 'ভ্রমণে সৃজন, বোধে অলৌকিক', 'সময় শূন্যতার বায়োস্কোপ' হয়ে 'জার্নি: জিরো টু ইনফিনিটি' পর্যন্ত নানান ঘাত-প্রতিঘাতের উপস্থাপনার মাধ্যমে তিনি অনুসন্ধান করেছেন জীবনের গভীরতম অর্থের। ফলস্বরূপ উঠে এসেছে এক কিমিতিবাদী অর্থহীনতা যা উদ্গীরণ করে এক মাদকতাময় বিষণ্ণতা- যে বিষণ্ণতা থেকে মুক্তির পথ খুঁজে দেয় সুরার মাদকতা। এই বিষণ্ণতাই হল সর্বোচ্চ মূল্যবান সম্পদ, এক চিরন্তনী আকাঙ্ক্ষা। এই বিষণ্ণতার মধ্যেই আমরা খুঁজে পাই জীবনের নেশা- এক বেদনানাশক মহৌষধ। মেঘ অদিতির বায়োস্কোপের শেষ দৃশ্যে একে-অপরের আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয় বেদনা ও মুগ্ধতা। এখানেই, ঠিক এই মুহূর্তেই, 'সময় শূন্যতার বায়োস্কোপ' চিরন্তনী সাহিত্যের বৃহত্তর আঙ্গিকে ধৃষ্ট পদচারণে প্রবেশ করে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন