শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০১৫

ফিরে পড়া : ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর 
(১৮২০ - ১৮৯১)


উনবিংশ শতাব্দীতে হিন্দু সমাজসংস্কারে যাঁরা অগ্রণী ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁদের অন্যতম। ঈশ্বরচন্দ্রের নানা প্রচেষ্টার মধ্যে যেগুলো ছিল অন্যতম, সেগুলো হল - বিধবাবিবাহ প্রচলন করা, বহুবিবাহ বন্ধ করা এবং শিশুবিবাহ রোধ করা। এছাড়া জনগণের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ও অন্যান্য সমাজহিতকর কাজে তিনি নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছিলেন। ওঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য ইংরেজ সরকারকে দিয়ে বিধবাবিবাহ আইনের প্রবর্তন।
এই আইনের প্রয়োজন বিশেষভাবে অনুভূত হয়েছিল যখন সতীদাহ বেআইনী হবার ফলে হিন্দু বিধবাদের সংখ্যা দ্রুত হারে বাড়ছিল। এই বিধবাদের অনেকেই ছিল শিশু। বিধবা হিসেবে সমাজে এদের যে অপরিসীম লাঞ্ছনা ও শারীরিক কষ্ট বরাদ্দ ছিল, সেগুলি দূর করতে বিদ্যাসাগর বদ্ধপরিকর হয়েছিলেন। তাঁর এই প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে গোঁড়া হিন্দু সমাজনেতারা রুখে দাঁড়ান এবং অজস্র বিদ্রুপ ও অপমান তাঁর উপর বর্ষিত হয়। ১৮৫০ সালে বিদ্যাসাগর হিন্দু ধর্মপুস্তক থেকে নানান তথ্য সংগ্রহ করে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ পুস্তিকাকারে প্রকাশ করেন। প্রবন্ধটির নাম ছিল: বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ-বিষয়ক প্রস্তাব। এটি প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে সমাজহিতৈষীরা প্রতিবাদের ঝড় তোলেন। সেই প্রতিবাদ খণ্ডন করে বিদ্যাসাগর তাঁর দ্বিতীয় পুস্তিকা প্রকাশ করেন।

তবে শুধু পুস্তিকা প্রকাশ করে বিধবাবিবাহ চালু করা যাবে না বুঝে বিদ্যাসাগর গভর্নর জেনারেল ডালহৌসির কাছে ১৮৫৫ একটা সালে পিটিশন দেন। সেই পিটিশনে ১০০০ শিক্ষিত এবং সমাজে সুপরিচিত হিন্দু সাক্ষর দেন। তবে এই পিটিশনের বিরুদ্ধে আরেকটি পিটিশন গভর্ন জেনারেলের কাছে জমা পড়ে - যেটি আসে রাজা রাধা কান্ত দেব ও তাঁর কট্টর হিন্দু অনুগামীদের কাছ থেকে। ১৮৫৬ সালে বিধবাবিবাহ আইন অনুমোদিত হয়।

এর পর থেকেই বিধবাবিবাহ শুরু হয়। বেশ কিছু ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগর নিজে বিধবাদের বিবাহের ব্যয়ভার বহন করেন। ফলে তিনি যথেষ্ট অর্থাভাবের মধ্যেও পড়েন। কট্টর হিন্দুরা বিদ্যাসাগরকে ক্ষমা করেন নি, যদিও তাদের প্রতিরোধের তীব্রতা কমতে থাকে। জীবনের শেষ দিকে বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহ সম্পর্কে তাঁর যুক্তিগুলি সরস ভাষায় সাধারণ মানুষের বোধগম্য করে দুটি বইয়ে প্রকাশ করেন। তার একটি হল ব্রজবিলাস (১৮৮৪) এবং দ্বিতীয়টি হল রত্নপরীক্ষা (১৮৮৬)। ব্রজবিলাস তিনি লিখেছিলেন সেইসময়কার এক হিন্দু পণ্ডিত ব্রজনাথ বিদ্যারত্নের বিবাহ-বিবাহের বিরুদ্ধে যেসব যুক্তি দিয়েছিলেন, সেগুলি খণ্ডন করার উদ্দেশ্যে। দ্বিতীয় বইটি লিখেছিলেন লিখেছিলেন সংস্কৃত কলেজের তিনজন অধ্যাপক, ভুবনমোহন বিদ্যারত্ন, প্রশান্তচন্দ্র ন্যায়রত্ন এবং মধুসূদন স্মৃতিরত্নের যুক্তি খণ্ডন করার জন্য। নিচের প্রবন্ধটি হল ব্রজবিলাসের দ্বিতীয় সংস্করণের বিজ্ঞাপন। হালকা সুরে লেখা এই ক্ষুদ্র রচনাটিতে সেকালের কট্টর হিন্দু পণ্ডিতদের প্রতি বিদ্যাসাগরের মনোভাব পরিস্কার ফুটে ওঠে।

ব্রজবিলাস

ব্রজবিলাস নিঃশেষিত হইয়াছে। কিন্তু গ্রাহকবর্গের আগ্রহনিবৃত্তি হয় নাই। এ-জন্য অনেকের অনুরোধপরতন্ত্র হইয়া, এই মহাকাব্য পুনরায় মুদ্রিত করিতে হইল।
ফাজিলচালাকরা স্থির করিয়া রাখিয়াছেন, তাঁহাদের মত বিজ্ঞ, বোদ্ধা, যোদ্ধা ভূমণ্ডলে আর নাই। তাঁহারা যে বিষয়ে সিদ্ধান্ত করেন, অন্যে যাহা বলুক, তাঁহাদের মতে, অভ্রান্ত ও অকাট্য। শুনিতে পাই, আমার এই ক্ষুদ্র মহাকাব্যখানি অনেকের পছন্দসই জিনিস হইয়াছে। সেই সঙ্গে ইহাও শুনিতে পাই, ফাজিলচালাকেরা রটাইতে আরম্ভ করিয়াছে, ইহা বিদ্যাসাগরের লিখিত। যাঁহারা সেরূপ বলেন, তাঁহারা যে নিরবচ্ছিন্ন আনাড়ি, তাহা এক কথায় সাব্যস্ত করিয়া দিতেছি।

এক গণ্ডা মাস অতীত হইল, বিদ্যাসাগর বাবুজি, অতি বিদ্ঘুটে পেটের পীড়ায় বেয়াড়া জড়ীভূত হইয়া পড়িয়া লেজ নাড়িতেছেন, উঠিয়া পথ্য করিবার তাকত নাই। এ অবস্থায় তিনি এই মজাদার মহাকাব্য লিখিয়াছেন, এ কথা যিনি রটাইবেন, অথবা একথায় যিনি বিশ্বাস করিবেন, তাঁহার বিদ্যাবুদ্ধির দৌড় কত, তাহা সকলে স্ব-স্ব প্রতিভাবলে অনায়াসে উপলব্ধি করিতে পারেন।

আমার প্রথম বংশধর 'অতি অল্প হইল'* ভূমিষ্ঠ হইলে, কেহ কেহ সন্দেহ করিয়া কোনও মহোদয়কে জিজ্ঞাসা করিতেন, এই পুস্তকখানি কি আপনার লিখিত? তিনি কোনও উত্তর না দিয়া, ঈষৎ হাসিয়া মৌনালম্বন করিয়া থাকিতেন। তাহাতে অনেকে মনে করিতেন, তবে ইঁহারই লিখিত। বিদ্যাসাগর মহোদয় সেরূপ চালাকি খেলেন কিনা, ইহা জানিবার জন্য, এবার আমি চতুর চালাক বিশ্বস্ত বন্ধুবিশেষ দ্বারা, তাঁহার নিকট এইরূপ জিজ্ঞাসা করাইব। দেখি, তিনি, পূর্বোক্ত মহোদয়ের মত, ঈষৎ হাসিয়া মৌনালম্বন করিয়া থাকেন, অথবা, আমার লিখিত নয়, বলিয়া স্পষ্ট বাক্যে উত্তর দেন। যেরূপ শুনিতে পাই, তাহাতে তিনি, 'না বিয়াইয়া কানাইর মা'হইতে চাইবেন, সে ধরণের জন্তু নহেন।

অধিকন্তু, তিনি ভাল লেখক বলিয়া এক সময়ে বিলক্ষণ প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়া ছিলেন, সত্য বটে। কিন্তু যে- অবধি আমি প্রভৃতি কতিপয় উচ্চদরের লেখক চূড়ামণি, সাহিত্যরঙ্গভূমিতে অবতীর্ণ হইয়া নানা রঙ্গে অভিনয় করিতে আরম্ভ করিয়াছি, সেই অবধি তাঁহার লেখায় আর তেমন গুমর নাই। ফলকথা এই, তিনি প্রভৃতি প্রাচীন দলের লেখকদিগের ভোঁতা কলমের থোঁতা মুখ হইতে এবংবিধ রঙদার মহাকাব্য নিসৃত হওয়া, গোময়কুণ্ডে কমলোৎপত্তির ন্যায়, কোনও মতে সম্ভব নয়।

যথাবিহিত অভিহিত হইল, ইহাতে যদি প্রাচীন দলের অভিমানী লেখক মহোদয়েরা রাগ করেন, করুন; আমার তাহাতে কিছুই বহিয়া যাইবেক না। আমি সকল এ-সকল বিষয়ে কাহারও তুআক্কা রাখি না, ও রাখিতে চাহি না। এজন্য যদি আমায় নরকে যাইতে হয়, আমি তাহাতেও পিছপাও নই।

যদি বলেন, নরক কেমন সুখের স্থান, সে-বোধ থাকিলে তুমি কখনোই নরকে যাহিতে চাহিতে না। এবিষয়ে বক্তব্য এই, কিছুদিন পূর্বে, কলিকাতার এক ভদ্রসন্তান বেয়াড়া ইয়ার হইয়াছিলেন। তিনি একেবারে উচ্ছন্নে যাইতেছেন ভাবিয়া, তাঁহার গুরুদেব উপদেশ দিয়া তাঁহাকে দুরস্ত করিবার চেষ্টা পাইয়াছিলেন। 'তোমার কি নরকে যাইবার ভয় নাই', গুরুদেব এই কথা বলিলে, সেই সুবোধ, সুশীল, বিনয়ী ভদ্রসন্তান কহিয়াছিলেন, 'আপনি দেখুন, যত প্রবলপ্রতাপ রাজারাজড়া, সব নরকে যাইবেন; যত ধনে মানে পূর্ণ বড় লোক, সব নরকে যাইবেন; যত দিলদরিয়া, তুখর ইয়ার, সব নরকে যাইবেন; যত মৃদুভাষিনী, চারুহাসিনী, বারবিলাসিনী, সব নরকে যাইবেন; স্বর্গে যাইবার মধ্যে কেবল আপনার মত টিকিকাটা বিদ্যাবাগীশের পাল। সুতরাং অতঃপর নরকই গুলজার; এবং নরকে যাওয়াই সর্বাংশে বাঞ্ছনীয়।' আমারও সেই উত্তর।

কিন্তু একটি বিষয়ে উক্ত ভদ্রলিকের সহিত আমার মতের সম্পূর্ণ বৈলক্ষণ আছে। তিনি কহিয়াছিলেন, 'টিকিকাটা বিদ্যাবাগীশের পাল স্বর্গে যাইবেন।' আমার কিন্তু দৃঢ় বিশ্বাস এই, যদি নরক নামে বাস্তবিক কোন স্থান থাকে, এবং কাহরও পক্ষে সেই নরকপদবাচ্য স্থানে যাইবার ব্যবস্থা থাকে, তাহা হইলে টিকিকাটা বিদ্যাবাগীশের পাল সর্বাগ্রে নরকে যাইবেন এবং নরকের সকল জায়গা দখল করিয়া ফেলিবেন, আমরা আর সেখানে স্থান পাইব না।

শ্রীমান বিদ্যাবাগীশ খুড় মহাশয়েরা, শাস্ত্রের দোহাই দিয়া, মনগড়া বচন পড়িয়া বলিতে থাকেন, জ্ঞানকৃত পাপের নিস্কৃতি নাই। বিষয়ী লোক শাস্ত্রজ্ঞ নহেন; সুতরাং তাঁহাদের অধিকাংশ পাপ জ্ঞানকৃত বলিয়া পরিগণিত হইতে পারে না। কিন্তু বিদ্যাবাগীশ খুড়দের শাস্ত্রেও যেমন দখল, পাপেও তেমনি প্রবৃত্তি; সুতরাং তাঁহাদের পাপের সংখ্যাও অধিক এবং সমস্ত পাপই জ্ঞানকৃত। এমন স্থলে, তাঁহারাই নরক একচেটিয়া করিয়া ফেলিবেন, সে বিষয়ে অনুমাত্র সংশয় নাই। তাঁহারা, আমাদিগকে ভয় দেখাইবার জন্য, নানা রঙ চড়াইয়া বর্ণনা করিয়া, নরককে এমন ভয়াবহ স্থান করিয়া তুলেন যে, শুনিলে হৃদ্কম্প হয় এবং একেবারেই হতাশ হইয়া পড়িতে হয়। কিন্তু আপনাদের বেলায়, 'মাকড় মারিলে ধোকড় হয়' বলিয়া অবলীলাক্রমে সমস্ত পাপকর্মে সম্পূর্ণ লিপ্ত হইয়া থাকেন। এ-বিষয়ে অতি সুন্দর একটি উদাহরণ দর্শিত হইতেছে।

কিছুকাল পূর্বে এই পবিত্র গৌড়দেশে কৃষ্ণহরি শিরোমণি নামে এক সুপণ্ডিত অতি প্রসিদ্ধ কথক আবির্ভূত হইয়াছিলেন। যাঁহারা তাঁহার কথা শুনিতেন, সকলেই মোহিত হইতেন। এক মধ্যবয়স্কা বিধবা নারী প্রত্যহ তাঁহার কথা শুনিতে যাইতেন। কথা শুনিয়া এত্য মোহিত হইয়াছিলেন যে, তিনি অবাধে সন্ধ্যার পর তাঁহার বাসায় গিয়া তদীয় পরিচর্যায় নিযুক্ত থাকিতেন। ক্রমে ক্রমে ঘনিষ্টতা জন্মিয়া অবশেষে ঐ বিধবা রমণী গুণমণি শিরোমণি মহাশয়ের প্রকৃত সেবাদাসী হইয়া পড়িলেন।

একদিন শিরোমণি মহাশয়, ব্যাসাসনে আসীন হইয়া, স্ত্রীজাতির ব্যভিচার বিষয়ে অশেষবিধ দোষ কীর্তন করিয়া, পরিশেষে কহিয়াছিলেন, 'যে-নারী পরপুরুষে উপগতা হয়, নরকে গিয়া তাহাকে অনন্তকাল যৎপরোনাস্তি শাস্তি ভোগ করিতে হয়। নরকে এক লৌহময় শাল্মলি বৃক্ষ আছে। তাহার স্কন্ধদেহ অতি তীক্ষ্ণাগ্র কণ্টকে পরিপূর্ণ। যমদূতেরা ব্যভিচারিণীকে সেই ভয়ঙ্কর শাল্মলি বৃক্ষের নিকটে লইয়া বলে, তুমি জীবদ্দশায় প্রাণাধিক প্রিয় উপপতিকে নিরতিশয় প্রেমভরে যেরূপ গাঢ় আলিঙ্গন দান করিতে, এই শাল্মলি বৃক্ষকে উপপতি ভাবিয়া সেইরূপ গাঢ় আলিঙ্গন দান কর। সে ভয়ে অগ্রসর হইতে না পারিলে, যমদূতেরা যথাবিহিত প্রহার যথোচিত তিরস্কার করিয়া বলপূর্বক তাহাকে আলিঙ্গন করায়, তাহার সর্বশরীর ক্ষতবিক্ষত হইয়া যায়; অবিশ্রান্ত শোণিতস্রাব হইতে থাকে। সে যাতনায় অস্থির ও মৃতপ্রায় হইয়া অতি করুণ স্বরে বিলাপ, পরিতাপ ও অনুতাপ করিতে থাকে। এই সমস্ত অনুধাবন করিয়া কোনও স্ত্রীলোকেরই এই অকিঞ্চিৎকর ক্ষণিক সুখের অভিলাষে পরপুরুষে উপগত হওয়া উচিত নহে' ইত্যাদি।

ব্যাভিচারিণীর ভয়ানক শাস্তিভোগের বৃত্তান্ত শ্রবণে, কথকচূড়ামণি শিরোমণি মহাশয়ের সেবাদাসী ভয়ে বিস্ময়ে অভিভূত হইয়া প্রতিজ্ঞা করিলেন, 'যাহা করিয়াছি, তাহার আর চারা নাই । অতঃপর আমি আর প্রাণান্তেও পরপুরুষে উপগত হইব না।' সেদিন সন্ধ্যার পর তিনি পূর্ববৎ শিরোমণির আবাসে উপস্থিত হইয়া যথাবৎ আর আর পরিচর্যা করিলেন; কিন্তু অন্যান্য দিবসের মত তাঁহার চরণসেবার জন্য, যথাসময়ে, তদীয় শয়নগৃহে প্রবেশ করিলেন না।

শিরোমণি মহাশয় কিয়ৎক্ষণ অপেক্ষা করিলেন; অবশেষে বিলম্ব দর্শনে অধৈর্য হইয়া তাঁহার নামপূর্বক, বারংবার আহবান করিতে লাগিলেন। সেবাদাসী, গৃহমধ্যে প্রবিষ্ট না হইয়া দ্বারদেশে দণ্ডায়মান রহিলেন; এবং গলবস্ত্র ও কৃতাঞ্জলি হইয়া, গলদশ্রুলোচনে, শোকাকুল বচনে কহিলেন, প্রভো ! কৃপা করিয়া আমাকে ক্ষমা করুন। শিমূল গাছের উপাখ্যান শুনিয়া আমি ভয়ে মরিয়া গিয়াছি; আপনার চরণসেবা করিতে আর আমার কোনওরকম প্রবৃত্তি ও সাহস হইতেছে না। না জানিয়া যাহা করিয়াছি, তাহা হইতে কেমন করিয়া নিস্তার পাইবো, সেই ভাবনায় অস্থির হইয়াছি।'

সেবাদাসীর কথা শুনিয়া পণ্ডিত চূড়ামণি শিরোমণি মহাশয় শয্যা হইতে গাত্রত্থান করিলেন; এবং দ্বারদেশে আসিয়া, সেবাদাসীর হস্তে ধরিয়া সহাস্য মুখে বলিলেন, 'আরে পাগলি ! তুমি এই ভয়ে আজ শয্যায় যাইতেছ না ? আমরা পূর্বাপর যেরূপ বলিয়া আসিযাছি, আজও সেরূপ বলিয়াছি। শিমূল গাছ পূর্বে ঐরূপ ভয়ঙ্কর ছিল, যথার্থ বটে; কিন্তু শরীরের ঘর্ষণে ঘর্ষণে, লৌহময় কণ্টকসকল ক্রমে ক্ষয় পাওয়াতে, শিমূল গাছ তেল হইয়া গিয়াছে; এখন আলিঙ্গন করিলে, সর্বশরীর শীতল পুলকিত হয়।' এই বলিয়া অভয় প্রদান ও প্রলোভন প্রদর্শনপূর্বক, শয্যায় লইয়া গিয়া, গুনমণি শিরোমণি মহাশয় তাঁহাকে পূর্ববৎ চরণসেবায় প্রবৃত্ত করিলেন।

পূর্ববারে অমার্জনীয় অনবধান-দোষবশত নির্দেশ করিতে বিস্মৃত হইয়াছি, এ-জন্য, ক্ষমা প্রার্থনাপূর্বক, বিনয়নম্র বচনে নিবেদন করিতেছি, তাহাতে কেহ এরূপ না ভাবেন, আমাদের মতে, ব্রাহ্মণ পণ্ডিত সম্প্রদায়ের সমস্ত লোকই একবিধ, তাঁহাদের ইতরবিশেষ নাই। আমরা, সরল হৃদয়ে, ধর্মপ্রমাণ নির্দেশ করিতেছি, ব্রাহ্মণ পণ্ডিত সম্প্রদায়ে এরূপ অনেক মহাশয় ব্যক্তি আছেন যে, তাঁহাদের দেখিলে, ও তাঁহাদের সহিত আলাপ করিলে, অন্তঃকরণ প্রকৃত প্রীতিরসে পূর্ণ ও প্রভূত ভক্তিরসে আর্দ্র হয়। তাঁহারা যশোহরধর্মরক্ষিণীসভার আজ্ঞাবহ দলের ন্যায়, বাহ্যজ্ঞানশূন্য নহেন। তাঁহাদের সদসদ্বিবেক, উচিতানুচিত বিবেচনা প্রভৃতি এ-কাল পর্যন্ত লয়প্রাপ্ত হয় নাই। তুচ্ছ লাভের লোভে, অবলীলাক্রমে, ধর্মাধর্ম বিবেচনায় বিসর্জন দিতে পারেন, তাঁহারা সেরূপ প্রকৃতি ও সেরূপ প্রবৃত্তি লইয়া জন্মগ্রহণ করেন নাই।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন