শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০১৫

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর এর অনুগল্প - যখন তার দেহমাজারে জলস্বভাব আয়ত্ত হয়


তার দেহমাজারে তখনও কাক্সুবাজারের নুনগন্ধের অস্পষ্ট সাগরজল মাতামাতি করে আছে। ওরা তখন কুয়াশাভেজা ভোরের কোমল সূর্যতাপকে জৈবিকবতায় রেখে সেন্টমার্টিনের পথে চলতে শুরু করেছে। জাগতিক কিছু নীরবতার ভিতর ওরা শরীর মাখামাখি করে চলে। অবশ্য ৩৭ সিটের এই মাইক্রোবাসটির পেটে আস্ত ৩৪টি মানুষ আলাদা আলাদা হয়ে চৈতন্যে রত। অনেক আঁকাবাঁকা পথ ধরে, ছাইয়ের মতো কুয়াশা উড়িয়ে উড়িয়ে সামনে এগোয় তারা।

এবং ওরা একসময় নাফনদীর ঢেউয়ের গন্ধ নিতে নিতে শিপে ঠাঁই নেয়। তিনতলা শিপটির মাঝখানের জল-বরাবর ওরা একে একে হাতের টিকিটের সাথে সিট মিলিয়ে বসতে থাকে। ওদের সিট নির্ণয়ের এই আয়োজনে শিপের মানুষজন হিহিহি করে হাসে। তাদের নিপুণ হাসিতে ভ্রমণকাতর প্রত্যেকের দেহমাজারে নানান বর্ণ তৈরি হয়। ওরা এই বর্ণ ভাঙার তালে আবারও হাসতে হাসতে জানায়, একটা মানুষও আধাঘণ্টার বেশি সিটে থাকবে না। কেন থাকবে না চোখের এমন ইশারাকে ওরা জলমুখি করে, নদীর স্বভাবে মাথা নাড়ায়, দূরে বহুদূরের পাহাড়ের মনোজাগতিকতা দেখায়। সমুদ্র মানুষের মাথা নানা পদের গ্যাঞ্জামে ভরে দেয়। সেই আউলাজাউলা হওয়া মাথা নিয়েই যেন অতগুলো মানুষ সমুদ্রের জীবন মাপে। শীপ নাম্বার ওয়ান তখন ঘোলাটে জল পেরিয়ে নীলজলে পড়ে। তাতে তাদের স্বভাব যেন ক্রমে ক্রমে নড়ে ওঠে। একজন বলে উঠে, এইখানে জাহাজ অত নড়ে কেন? তার চরিত্র’র অত গণ্ডগোলের কারণ কি? কফিওয়ালা এই কথাকে পাত্তা দিল কিনা বোঝা যায় না, ও বহুগুণ তেজে কফি বানায়, বিশ টাকায় প্রতিকাপ দিতে দিতে অতি মজায় বলতে থাকে, দইজ্যের ইক্কিনি দুশমনি নো-তাকিলে মজা নো লাগের। সাগরজলের ঢেউয়ে ঢেউয়ে সেই মজা বাড়ে। তাদের কাছে কক্সবাজারের নেশায় ভাটা পড়ে, জলের এমন স্বভাব থাকতে পারে তা তাদের দেহমাজারও জানত না। সেই মজায় মজে আবারও দুপুরের রোদে চকচক করতে থাকা ইলিশের পেটের মতো সমুদ্রের নীল ঢেউয়ের উপর রোদের প্রলেপ দেখে। একজন হোহো করতে-করতে তার ছবি তোলার কথা বন্ধুকে বলে। সারা শরীরটা ছবির ভিতর আটকে দিতে চায়। তিনতলার হাইক্লাশ কামরার ভিতর ঘুরতে ঘুরতে কেবিনের ভিতর তারই বন্ধুকে ঢোকাতে ঢোকাতে মজায় কিককিক করতে একজন বলে, বন্ধু তোমার মজা আমার মজার সাথে মিলাও। তারা কেবিনের ভিতর ঢুকতে থাকলেও নিজেদের হাসি ঢুকানোর ধান্ধা করে। একজন এক বার্মিজ জোয়ানকে পাকড়াও করে; তাদের সিগ্রেট, চকলেট, কাপড়া বাগানোর চিন্তা করে। কোস্টাল গার্ডের জালিয়াতি কী করে ফেস করা যায়, তা নিয়ে কেউ কেউ ঘ্যানর-গ্যানর করে। আচ্ছা, এইখানে, ওইখানকার প্রবাল দ্বীপে থাকা যায় না! তার কথাকে আরও প্রলম্বিত করে জানতে চায়, বার্মিজ মায়ামানুষ কালেক্ট করতে পারলে কী যে মজা হত। সে মজা খোঁজার ভিতর জলের পর জলের ভিতর দিয়ে চলাচল দেখে, মানুষের ভিতর ভিতর মানুষেরে বদলে যাওয়া বোঝার চেষ্টা করে। জলস্বভাব বলে আলাদা একটা স্বভাব এখানে আছে। তাকেই ধরা দরকার। জলের ভিতর জলের কী যে সংসার আছে, সেই সংসার দেখতে চাইলে দুই-চারটা দিন জলের সাথে থাকা দরকার; জলের জীবন জলের মতোন করে দেখা অত সোজা না! সেই জীবনটা আরাম করে দেখার জন্য জলের ভিতর কী যেন খোঁজে তারা। এমনি নানাজন নানান পথ খোঁজার ভিতরই জলের স্বভাব দেখতে-দেখতে ওরা সেন্টামর্টিন পৌঁছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন