সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৫

শাহীন আখতার : সখী রঙ্গমালা নিয়ে আলাপ--পালাগানের ছেঁড়া পাতা

তখনো কাগজে আঁচড় কাটা হয়নি। ‘সখী রঙ্গমালা’ লেখার অজুহাতে এদিক-ওদিক ঢুঁড়ে বেড়াচ্ছি। দেখতে দেখতে মাইজদী শহরেই দু’দিন কেটে গেল। কাজীপাড়ায় উকিল খসরু সাহেবের বাসাসংলগ্ন চেম্বারে আমাদের ঠেক। ওখানে সন্ধ্যার পর থেকে মক্কেলের আনাগোনা আর লাগাতার লোডশেডিং। টেবিলে কেরোসিনের লম্প জ্বেলে, তোয়ালের ঢাকনাঅলা উঁচু পিঠের চেয়ারে বসে উকিল সাহেব ওকালতি করেন।
কাচের আলমারি ঠাসা মোটা মোটা বই, বেঞ্চি উপচে পড়া মক্কেল - পসার বেশ রমরমাই বলা চলে। তবে তিনি একাধারে কবি মানুষ, দীনেশচন্দ্র সেনের ‘চৌধুরীর লড়াই’ নিয়ে চুলচেরা গবেষণাও করছেন, মামলার মুসাবিদা করতে করতে হঠাৎ হঠাৎ ভাবের রাজ্যে চলে যান। বাতচিতও করেন থেমে থেমে সময় নিয়ে।

তখন রঙ্গমালা নিয়ে কী যেন কথা হচ্ছিল। আচমকা ঘরের আলো-আঁধারি কোণ থেকে মক্কেলদের একজন গেয়ে উঠলেন - ‘চৌধ্রী বল চৌধ্রী বল রাজ্যের অধিকারী, সিন্ধুরকাইত জঙ্গল কাডি বানাইছে রাজবাড়ি।’ গীত থেমে গেলেও সুরের রেশ তখনো কাটে নাই, হারিকেনের সলতে উসকে দিলেন উকিল সাহেব। কাঠের বেঞ্চির শেষ মাথায় গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বাপ-বেটা বসা। এ গান বাবারই কণ্ঠের। তিনি গোঁফহীন লম্বা পাকা দাঁড়ির প্রাক্তন হাবিলদার। মাথার তালুতে ছোট্ট মতন গোল টুপি। হাতে ঘরের ফুলদানি থেকে চয়ন করা বিবর্ণ কাগুজে-গোলাপ। এ আলো-আঁধারি তসবিরখানা মনে দাগ কাটার মতোই। আমরা নড়েচড়ে বসলাম।

হাবিলদারের ছোটবেলায় চৌধুরীর লড়াই পালাগান শোনেন নাই - এমন লোক নোয়াখালী অঞ্চলে কমই ছিল। সেইকালে মরদ মাগি সাজতো। তবে হ্যাজাকবাতিতেও চেনার জো ছিল না। কি নিখুঁত সাজপাট আর অ্যাকটিং! জলুসে চোখ ধাঁধায়। যে পুরুষলোকটা শ্যামপ্রিয়া বৈষ্ণবী সেজে আসরে নামতো, তার গলা ছিল সাংঘাতিক। মাগির ওপর ঘেন্না হলেও গান শুনতে শুনতে চোখে পানি চলে আসতো। পালাগান কয়েক রাত ধরে টানা চলতো এই মাইজদীতেই। মাইজদী তখন এ রকম শহর ছিল না, অজ পাড়াগাঁ - ঝোপ-জঙ্গল। রাতে রাতে বাঘ ডাকতো। তবে ও কিছু নয়। আসল ভয় অন্যত্র। ঘরের কর্তা ছিলেন বাঘেরও বাড়া। তার এক হুঙ্কারে ধরণী থরথর। একবার তো রঙ্গমালার পালা দেখে এসে হাবিলদার বাপের হাতে বেহদ্দ খড়মপেটা হয়েছিলেন।

আসর বেশ জমে ওঠে। হাবিলদারের গীতে, কথকতায় আমরা মুগ্ধ। ওদিকে ছেলের মুখ হাঁড়ি। বাপকে বাগে আনতে না পেরে একসময় মামলার ফাইলপত্রের ফিতা বেঁধে সে উঠে পড়ে। নট আর কী করবেন। কাগজের ফুলটা ফুলদানিতে গুঁজে তিনিও বেজার মুখে উঠে দাঁড়ান।

যবনিকা উঠতে না-উঠতে পালা সাঙ্গ হলো! এমন পাকা দাঁড়ি আর গোলটুপির তলায় যে পালাগানের নট লুকিয়ে আছে তা কে জানতো। আমরা চেয়েচিন্তে কোনোক্রমে তার মোবাইল নম্বর টুকে নিলাম। পরদিন উকিল সাহেবের তদবির সত্ত্বেও ওপাশ থেকে সাড়া মিললো না। যাত্রাপালা বলে কথা! এ দফায় ছেলেই হয়তো বাবার ওপর খবরদারি করছে।

বড় সড়কের একদিকে কাজিপাড়া, আরেক দিকে মাইজদী গোঁসাই বাড়ি। এ বাড়িরই মেয়ে চন্দ্রকলা, বাপের বাড়ি নাইওর আসার কালে রাজচন্দ্র চৌধুরী করিমপুর পাথারে যার ধর্মনষ্ট করে। অবস্থা পড়ে গেলেও দুইশ-আড়াইশ বছর আগেকার গোঁসাই বাড়ির এখনো খুব নামডাক। মানুষ এক ডাকেই চেনে। বাড়ির বড়ছেলে হারাধন চক্রবর্তী দর্জিগিরির পাশাপাশি যজমানি করেন। কালে কালে গোঁসাইদের সয়-সম্পত্তি বেহাত হয়েছে। তবে এর সিংহভাগ গেছে, নোয়াখালী নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার পর মাইজদীতে শহর পত্তনের সময়। হারাধন এ মর্মপীড়া নিয়েই দিন গুজার করেন। বেদনার একটা স্থায়ী ছাপ তার চোখে-মুখে। আমাদের বাতচিতও হারানো সয়-সম্পত্তির হাহাকারে পথ হারালো। গোঁসাই খান্দানের মেয়ে চন্দ্রকলার বাহাদুরির কথা ফেনিয়ে বলেও হারাধনকে ফেরানো গেল না।

গোঁসাই বাড়িতে পর্দার খুব আঁটাআঁটি। হারাধনের মা সত্তরোর্ধ বাসন্তী চক্রবর্তী আজীবন ঘেরাটোপের বাহনে চেপেই চন্দ্রকলার মতো বাপেরবাড়ি-শ্বশুরবাড়ি করেছেন। যাত্রাপালা দেখতে যাওয়া দূরে থাক, এসবের নাম জিন্দেগিতেও মুখে আনেন নাই। গোঁসাই বেজায় রাগী মানুষ ছিলেন কিনা! রঙ্গমালার দিঘিতে কারা যেন মাছ ছেড়েছে, এরপর মাছ ধরা নিয়ে রাজ্যের গেঞ্জাম - রঙ্গমালার দিঘি নিয়ে অন্তপুরবাসিনীর জানাশোনা এ টুকুই।

রঙ্গমালার দিঘির নামে, এককালের যাত্রার নট ও পেশায় দলিল লেখক অরুণচন্দ্র মালাকার ‘কমলারানি’র কিসসা ফাঁদেন। যে সদ্যকাটা শুষ্ক দিঘিতে জল বহানোর জন্য আত্মবলি দিয়েছিল। মালাকারের বয়ানে রঙ্গমালা জমিদার নন্দিনী। চৌধুরী যবন জমিদার। ধুন্ধুমার লড়াই করে সে রঙ্গমালাকে জিতে নেয়। তাদের একটি কইন্যাও জন্মায়। এরপর দিঘিতে জল ওঠা না-ওঠা নিয়ে বাঁধে বিপত্তি। হারিয়ে যায় রঙ্গমালা। তবে হারিয়েও সে হারায় না। দিঘির পশ্চিম ঘাটে এসে কন্যাটিকে বুকের দুধ দেয় রোজ। কথাটি চৌধুরীর কানে যায়। সে তক্কে তক্কে থাকে, মওকা পেলেই রঙ্গমালার পায়ে শিকলি দেবে, যাতে সে জলে ফিরে যেতে না পারে। সেইমতো একদিন মা যখন জলের ঘাটে এসে শিশুটিকে বুকের দুধ দিচ্ছিল, পেছন থেকে তার চুলের মুঠি চেপে ধরে চৌধুরী। হাতে কয়টা মাত্র চুল উঠে আসে। চক্ষের পলকে মাছের মতো অতল জলে ডুব দেয় রঙ্গমালা। আর কোনো দিন নদীর ঘাটে তাকে দেখা যায় নাই।

অরুণচন্দ্র মালাকার একসময় মাইকেলের ‘মেঘনাদ বধ’, আর সব অমিত্রাক্ষর ছন্দের যাত্রাপালা বেশি বেশি করতেন। হালে দাঁত পড়ে যাওয়ায় সে সব ছাড়ান দিতে হয়েছে। শেষ পালা করেছেন ছয় বছর আগে স্বাধীনতা দিবসে। নাম ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’। যে কোনো যাত্রায় রাজা থাকে, সেনাপতি থাকে। তিনি রয়েল মানে রাজার পাটটাই বেছে বেছে করতেন। ‘শকুন্তলা’ যাত্রায় মালাকার যথারীতি ভরত রাজার পাট করেছিলেন। তার করা শকুন্তলায় ভরত রাজার বারো বচ্ছরের বনবাস হয়। ওইখানে শকুন্তলা কাঠুরিয়ার মেয়ে। অপূর্ব সুন্দরী। রাজার সঙ্গে কাঠুরিয়ার মেয়ের গন্ধর্ব মতে বিয়ে হয়ে গেল। বারো বছর পর, বনবাসের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে রাজ্যের সৈন্য-সামন্ত গেছে রাজাকে আনতে। এবার শকুন্তলাকে ছেড়ে আসার পালা। তখন একটা প্যাথেটিক সিন ছিল - ‘শোনো প্রিয়ে, অদ্য মোর পূর্ণ হলো নির্বাসনকাল। মুক্ত আমি চিরতরে বনবাস হইতে। আমারে ফিরিয়ে নিতে এসেছে সাম্রাজ্যের অমাত্যবরগ - বিদায়ের কালে ফেল নাকো অশ্রুজল।’

কি সাংঘাতিক!

আমাদের হাতে সময় কম। ওদিকে রাতও হয়ে গেছে। বাড়ির নিচু গেট দিয়ে মাথা হেঁট করে বেরুচ্ছি, তখনো মেঘনাদের মরণ দৃশ্য মালাকার অমিত্রাক্ষর ছন্দে আওড়ে যাচ্ছেন।



শাহারমালার ঘাটে রাজেন্দ্র নারায়ণ দেখে রঙ্গমালাকে। কথাটা শুনে আমাদের তো ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। আমরা তখন চৌমুহনী-লক্ষ্মীপুর সড়ক দিয়ে বাংলাবাজার হয়ে সিন্ধুরকাইত রাজবাড়ির চৌচালা টিনের ঘরে। সময়টা মার্চের শেষাশেষি। চালের টিন তেতে ঘরের ভেতরটা আগুনের কুন্ড হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় হাতপাখার বাতাস খেতে খেতে কথা বলছিলেন বর্তমান বাড়ির মালিক মোহাম্মদ মোস্তফা মিয়া। তিনি আঠার পয়সা দিয়ে যখন এক প্যাকেট সিগার সিগারেট কিনতে পাওয়া যেত, সেই আমলে দর্শনা চিনির মিলে চাকরি করতেন। ওখানে তার কাজ ছিল গন্ধক আর চুন মিশিয়ে লাল চিনি সাদা করা। চব্বিশ ঘণ্টায় দেড়শ বস্তা গন্ধক ঢালা হতো মেশিনে। একদিন ডিউটিতে থাকাবস্থায় বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। সারা মিল অন্ধকার হয়ে যায় ধোঁয়ায়। ফোরম্যান বিপদ দেখে আগেভাগে সটকে পড়ে। সব জখমিদের অবস্থা যেমন-তেমন, মোস্তফা মিয়া পুরা তিন দিন ছিলেন বেখবর। বুকের থুকপুক ছাড়া আর কোনো সাড়া-শব্দ ছিল না। চারদিনের মাথায় হুঁশ ফেরে। সে যাত্রায় তিনি মরতে মরতে বেঁচে গেলেও চিরতরে শ্রবণশক্তি হারান। তখন থেকে কানের কাছে মুখ নিয়ে চেঁচিয়ে কথা না কইলে কিছু শুনতে পান না। আমাদের সওয়াল-জবাব চলছিল মোস্তফা মিয়ারই কলেজ পড়ুয়া ছেলের মারফত।

মোহাম্মদ মোস্তফা মিয়ার বয়ানে খুড়া রাজেন্দ্র নারায়ণও রঙ্গমালার পাণিপ্রার্থীর দলে শরিক হয়েছিলেন। শাহারমালের ঘাটে রঙ্গি রোজ স্নানে আসে। খুড়াকে কানপড়া দেয় এক লোক - ‘রাজিন্দ্র চৌধ্রী, একটা কইন্যা দেইকলে তোমার মাথা খারাপ হয়ি যাইবো।’ হলোও তাই। কইন্যার বাপের কাছে রাজেন্দ্র নারায়ণ শাদির পয়গাম পাঠালেন। সঙ্গে টাকার টোপ। তখন তো এখনকার মতো নোটের কারবার ছিল না, কাঁচা টাকার আমল। রাজেন্দ্র চৌধুরী বললেন - ‘ভাতিজা টেঁহা দিব গোনা-হড়া করি, আর আঁই দিয়্যুম পাত্থর দি মাপি।’ কিন্তু রাজচন্দ্র চৌধুরী জোয়ান বিধায় রঙ্গমালার ওপর তারই হক বেশি। এ নিয়ে চাচা-ভাতিজা ফাটাফাটি করে দুনিয়া মিসমার করে দিল। এ জঙ্গের সাবুদ তিনহাত লম্বা একখানা তলোয়ার, যা চৌধুরীর দিঘির পাড়ে হাল বাওয়ার সময় স্বয়ং মোস্তফা মিয়ার লাঙ্গলের ফালে উঠে আসে। খবরটা বোধ করি তাঁর পুত্রের জানা ছিল না। সে নিজে থেকে বাপকে জেরা করতে লেগে যায় -

তলোয়ারডা কে পাইছে?

আমি পাইছিলাম।

কই রাকচেন, কী কইচ্চেন?

মাডির তলায় থাইকতে থাইকতে মাডি খাই গেছে। ভাঙ্গি-চুরি গেছে।

মোস্তফা মিয়া ভাবছেন, এসব আনকা কথা বুঝি আমাদের সাক্ষাৎকারের অংশ। গম্ভীরচালে জবাবও দিয়ে যাচ্ছিলেন তাই। ওদিকে ছেলে তো থামে না। সেই ভাঙা-চোরা তলোয়ারখানা এক্ষুণি তার বাগানো চাই। বাপ-বেটার মাঝখানে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাদেরই কথার মোড় ঘুরিয়ে দিতে হলো।

রঙ্গমালা-রাজচন্দ্র চৌধ্রীর কাহিনী মোস্তফা মিয়া যা জানেন, গোটাটাই পরের মুখে শোনা। পর বলতে অত্র এলাকায় একটা যাত্রাপার্টি ছিল, ওরাই এ পালাটা করতো সাত রাত ধরে। তাছাড়া কার্তিক মাসে লাগাতার চলতো রূপবানের গান, রামলীলা, নিমাই সন্ন্যাস। টিভি চালু হওয়ার পর এসব উঠে গেছে।

এখানে আসার সময় আমরা মস্ত বড় এক দিঘির পাড় দিয়ে এসেছি। মোস্তফা মিয়ার বাড়ি এর দক্ষিণ-পশ্চিম কোণায়। দক্ষিণ পাড় এখনো পাহাড়ের মতো উঁচু - ওখানেই ছিল রাজবাড়ি। মোস্তফা মিয়ার জানামতে, চাচা-ভাতিজার হানাহানির পর একশ বচ্ছর বাড়িটা বেগার পড়েছিল। মানুষ না থাকলে যা হয়, ঝোপ-জংলায় খেয়ে ফেলে। সে অবস্থায় বেয়াল্লিশ একরের বাড়ি, পৌনে চারশ টাকায় ডাক ওঠে। কিনে নেন সোনাপুরের এক হিন্দু মোক্তার। এভাবে আরও একশ বছর গত হয়। এরপর, ঊনিশ শ ঊনসত্তর সালে এ কোণার জায়গাটায় বসত গাড়ে মোস্তফা মিয়ার পরিবার।

দক্ষিণ পাড়ের উঁচু মতো জায়গাটা কেমন খাঁ খাঁ করছে। গরমের গনগনে রোদ মাথার ওপর। আমরা আর ওদিকে পা বাড়ালাম না। দিঘির পশ্চিম পাড়ের খোয়া বিছানো রাস্তা ধরে ফিরছি। ছায়া-ঢাকা, পাখি-ডাকা পথ। কেমন ভেজা ভেজা। আচমকাই বিজলি চমকের মতো রাজবাড়ির পাখি-পোষা দুঃখী বউটার কথা মাথায় আসলো, যে মানুষের কহন-কথায়, গল্পগাছায় কোথাও নেই। ‘হাউস করি করাইছি বিয়া ফুলেশ্বরী রাই’ - রাজেন্দ্র নারায়ণের জবানে প্রাচীন পূর্ববঙ্গ গীতিকায় এটুকুই।



‘আপনে এক্কেরে প্রকৃত জায়গায় চলি আইছেন। খোদ ভিটাতে আইছেন। এই দিঘি রঙ্গমালার নামে কাটছে রাজচন্দ্র চৌধ্রী।’ কথাগুলি কিছু কানে ঢোকে, কিছু ঢোকে না। কেমন স্বপ্নের মতো মনে হয়। পালাকারদের ভাষ্য মতে, এককালে রাজচন্দ্র চৌধুরীর সুবাদে নরবাড়ির বহুৎ শানশওকত ছিল। আশি হাতের ওপর নহবতখানা, পুকুরে জলটুঙ্গি, জলটুঙ্গিতে ঝাড়বাতি, তাকিয়া-ফরাস, রুপোর গড়গড়া...। আমরা বসে আছি এক আধা গেরস্থবাড়ির কাঁচা উঠানে। আমাদের ঘিরে কতগুলি আন্ডা-বাচ্চা। বাড়ির বউ-ঝি, ময়-মুরব্বিদের মধ্যে ‘খবর না দিয়ে হুটহাট চলে আসা’ মেজবানদের আপ্যায়নের তোড়জোড়। ঘরে ঘরে হানা দিয়ে যে কয়টা চেয়ার, মোড়া, কাচের গেলাশ-জগ পাওয়া যায়, সব বয়ে এনে জড়ো করা হয়েছে উঠানে। বাড়ির দুরন্ত বালক পায়ে দড়ি বেঁধে কাটারি হাতে তরতরিয়ে উঠে গেছে নারকেল গাছে। মাটিতে উবু হয়ে বসে ডাব কাটছেন যে বৃদ্ধ, খানিক আগে তিনি তিল খেতে নিড়ানি দিচ্ছিলেন। মাটি ফুঁড়ে সদ্য বের হওয়া কচি কচি চারা। ওসবের ফুলের ঘা সহ্য হয় না তো মানুষের পায়ের পাড়া! আইলের ওপর আমাদের উজিয়ে উঠতে দেখে বৃদ্ধ খুরপি হাতে তেড়ে আসেন। আমরা তখন রঙ্গমালার দিঘির পাড়ে যাওয়ার শর্টকাট রাস্তা খুঁজছি। বৃদ্ধের দেখা লোকজন হোন্ডা চালিয়ে ভট ভট আওয়াজ করে দিঘি ভিজিট করতে আসে। পাড়ে হোন্ডা থুয়ে পানিতে নেমে হাত-মুখ ধোয়, কুলকুচি করে। জল স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ, টলটলে। আমরা চোরের মতো নিঃশব্দে হাজির হলেও যে, রঙ্গমালার দিঘির দেখনেওলা, তা মালুম হতে বৃদ্ধের মারমুখী রূপ নিমেষে মিলিয়ে গিয়ে চেহারায় সলজ্জ হাসি ফুটে ওঠে। লাটে ওঠে খেত নিড়ানি। আইলের ওপর খড়ের ব্যানা থেকে ধুমা উড়ছে, পাশেই হুক্কা, তামাক খাওয়ার আর সব আনুষঙ্গিক। সেখানে খুরপি-কাচি থুয়ে তিনি আগবাড়িয়ে আমাদের নিয়ে চলেন দিঘি দেখাতে। বৃদ্ধ ব্যবহারে যতোটা আন্তরিক, কথায় ততোটা অপটু। তার ওপর পান খেয়ে খেয়ে জিব অসার। ‘চান্দা এক রাইতে নয়শ মগ কাডি হালাইছে’ - তার পান-মুখে-কথার এটুকুই শুধু বোঝা যায়। নরবাড়িতে পা ফেলা মাত্র সে অভাব ষোলআনা পুষিয়ে দেন ভাতিজা নওশেদ আলম। নানা পথ-ঘাট ঘুরে আমরা ঠিক জায়গায় পৌঁছে গেছি দেখে তিনি খুশিতে বাগ বাগ। বৃদ্ধ মুখচোরা মানুষ, জগভর্তি ডাবের জল এগিয়ে দিয়ে নিজে পিছিয়ে গিয়ে বসেন ঘরের দাওয়ায়। গেলাশে করে আমরা ডাবের পানি খাই আর নওশেদ আলমের মন-খোলা কথা শুনি।

চিটাগাং বারো আউলিয়ায় হাবিব জুটমিলে চাকরি করতেন নওশেদ আলম। তখন বিদেশ যাওয়ার জন্য বিশ্বাস করে এক লোককে টাকা দিয়েছিলেন। টাকা নিয়ে সে উধাও। এ উনিশ শ ছিয়াশি সালের কথা। তারপর পথে পথে ঘুরে অবশেষে চৌমুহনীর এক লোকের পাছ ধরেন। লোকটার আতর, নীল, ব্লিচিংএর পাইকারি কারবার। নিজের হাতেই মালমাত্তা বানায়। নওশেদ আলমের নকরিটা মাল বিক্রির হলেও মালিকের অগোচরে তিনি তৈরির কাজটাও শিখে নেন। নিজের বানানো মালামালও বাজারে ছাড়তে শুরু করেন মহাজনের মালের পাছ পাছ। এ জোচ্চোরি বেশি দিন গোপন থাকে না। তা নিজে থেকে আগাম বুঝে দুম করে চাকরি ছেড়ে দেন নওশেদ আলম। কিন্তু এবার মহাজন তার পাছ ছাড়ে না। বাগে আনতে না পেরে নানাভাবে শাসায়। নওশেদ আলমও জবাব দিয়ে দিয়েছেন - ‘আন্নের বাড়ি যদি চৌমুহনী অয়, আঁর বাড়ি চন্দ্রগঞ্জ। আন্নে আঁর কিছু কইত্যে হাইত্যেন ন। আন্নের কাজ কইচ্চি, আন্নে আঁরে টাকা দিছেন। এহন আমার শইলে মানে ন, আঁই কইত্যাম ন। ব্যস।’

শরীর খারাপটা নওশেদ আলমের বাহানা। বর্তমানে সেই আতর, নীল, ব্লিচিং নিজে বানিয়ে বিক্রি করে টাকা কামাচ্ছেন। তারও পাইকারি কারবার। চৌমুহনীর দোকানে দোকানে মাল সাপ্লাই দেন। তার ভাষায় ‘এইভাবে কোনো রহমে নুনে-হেনে দিন যায়’।

সাত-আট পুরুষ ধরে নওশেদ আলমরা নরিয়ার ভিটায়। চৌধুরীদের জঙ্গে জঙ্গে নরবাড়ি শ্মশান হয়ে গেছে। যুদ্ধটা চান্দা বীর আর রাজচন্দ্র চৌধুরীর মধ্যেই হয়েছিল। তবে নওশেদ আলমের বয়ানে চান্দা চায় রঙ্গমালাকে বিয়ে করতে, রাজচন্দ্র চায় বিয়ে করতে - এ নিয়ে জঙ্গটা বাঁধে দুজনার। রঙ্গমালা ছিল এক কথার মানুষ। সে চৌধ্রীরে কয় - ‘ঠিকাছে, তুমি তো আমারে আইনছো। এই জায়গায় মেলা যুদ্ধ-টুদ্ধ অইবো, পারবা নি সামাল দিতে? চান্দাও কম ন। হে মস্ত বড় পালোয়ান।’ চান্দার মামা চন্দ্রগঞ্জের সোনাকর্তারা। দুই পার্টিতে লেগে গেল দমাদ্দম যুদ্ধ। সেই কি যুদ্ধ - বাপরে বাপ! কামানে-গোলায়, গুল্লি-গালাজে মাটি তামা তামা হয়ে যায়, মানুষ তো কোন ছার। নরের বংশ সেই দফায় খতম হয়ে গেল। তবে এ ভিটার নাম এখনো নরিয়ার বাড়ি। পুকুরটার নামও নরিয়ার পুকুর। নরিয়া নামটা দিঘির ওপর বহাল রেখে বাড়ির নাম বদলে দিয়েছেন হালের বাসিন্দারা। নওশেদ আলমদের উপাধি কাজি বিধায়, বাড়ির নাম রঙ্গমালা কাজি বাড়ি। রঙ্গমালার নামটা এভাবে খোদাই করে রেখেছে নওশেদ আলমের পরিবার।

এ কাহিনী ছোটকালে নওশাদ আলম তার বাবার কাছে শুনেছেন। বড় হওয়ার পর ভাত-কাপড়ের ফিকির করতে করতে পালাগানটা আর শোনা হয় নাই। কিন্তু মনের ভেতর সবসময় তা গুনগুন করতো। ‘মনে করেন এ বাড়িতে আছি। এত্তো বড় একটা ঘটনা ঘটলো এ জায়গায়।’ আতর-ব্লিচিং-এর ব্যবসায় অবস্থা ফেরার পর নওশেদ আলম পালাগানের ক্যাসেট তালাশে নেমে পড়েন। ক্যাসেটে কী কয় আর আব্বা কী বলছিলেন - দুটি মিলিয়ে দেখার সাধ জাগলো মনে।

অনেক তত্ত্ব-তালাশের পর চৌমুহনী বাজারে পাওয়া গেল তিনটি ক্যাসেট। কিন্তু এ নিয়ে নওশেদ আলম পড়ে গেছেন মহা ফাঁপরে - ‘তিনডা ক্যাসেট নব্বই গা টেঁহা দি আইনছি আঁই। এক্কেরে হুরা পিস্টুরি এ তিনগা ক্যাসেডে। এ বহু জায়গায় লই গেছে। এক্কান ক্যাসেড কাডি হালাইছে। মাইষ্যের জ্বালায় রাইকতাম হারি ন। হেতে কয় হেতে হুইনবো। হেতে কয় হেতে হুইনবো।’

বারে বারে শোনার পর ক্যাসেটের কিছু কথা ঝুট মনে হয় নরবাড়ির লোকদের। আমরাও বেকায়দায় পড়ি এ কথা বলে যে, চান্দা বীর তো সত্যি সত্যি রঙ্গমালার কল্লা কেটে ফেলছিল। ‘ন-ন কাডে ন’ - নারী-পুরুষ সবাই একযোগে জিগির দিয়ে ওঠে। ‘হেতে কল্লা কাডছে তো নয়শ মগের। কবিরা পদ খাডানোর লাই এ কাম কইচ্চে।’

এরপর আর কথা কী। তাছাড়া ছোট ছেলের উপযোগী করে বাপ যে কাহিনী শুনিয়ে গেছেন, তাতে রঙ্গমালা সুন্দরী রাজচন্দ্রের বাঁধা রান্ডি নয়, বিয়ে করা বউ। বহু বচ্ছর সুখে-দুখে সংসার করে আর সবাইর মতো তারাও একদিন পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। এ বিধির লিখন। আল্লাহর তামাম সৃষ্টি এ নিয়মের ডোরে বাঁধা।

যেন একটা শোকমিছিল বের হয়েছে রঙ্গমালা কাজি বাড়ি থেকে, এভাবে সবাই ধীরে ধীরে হাঁটছি। সামনে বৃদ্ধ, পাশেই ভাতিজা নওশেদ আলম, আমরা পেছনে আমজনতার ভিড়ে। বাড়ির বগলে পচা-পাতার গন্ধভরা ছোট্ট একটি পুকুর। এর শ্যাওলা-পড়া পানিতে কতগুলি বাচ্চা ডুবাডুবি খেলছে। ওদিকে কাঁপা কাঁপা তর্জনী তুলে বৃদ্ধ কয় - ‘চৌধ্রী এই হুষ্কুনির মাইজগানে খুডি গাড়ি ঘর কইচ্চে হাবা খাইতো। এইডারে হুলটুঙ্গি কয়।’ এ নিয়ে টকরা-টকরি বাঁধে চাচা-ভাতিজায়। নওশেদ আলমের আব্বা বলে গেছেন - নরিনী আগে থেকেই পুকুরের মধ্যিখানে জলটুঙ্গি তুলে থাকতো। অপূর্ব সোন্দরী কইন্যা। বিশ্বের মধ্যেও এমন সোন্দরী আর নাই। ওদিকে শ্যামপ্রিয়া বৈষ্ণবী ছিল খুব ডেয়ারিং স্বভাবের। তারে উকিল লাগায় রাজচন্দ্র চৌধুরী। ভিক্ষার ঝোলা-ঝালি লয়ে টুন টুন মন্দিরা বাজিয়ে বৈষ্ণবী তো আসে রঙ্গমালার মন্দিরে। এভাবে আসা-যাওয়া করতে করতে ভাব-ভালোবাসা হয়ে যায় দুজনার। বৈষ্ণবী বহুৎ যাদুটোনা জানত। একদিন পড়া-পানের খিলি রঙ্গমালার মুখে দিয়ে রাজচন্দ্রের বিয়ের পয়গামে রাজি করায় বৈষ্ণবী। চৌধ্রী কইছিল বৈষ্ণবীকে ‘যদি আঙ্গোর জোড় মিলাইতে হারো, তোমারে ওড়া মাপি টেঁহা তো দিয়্যুম দিয়্যুম, রাজগঞ্জ বাজারটাও লিখিতভাবে রেজিস্ট্রি করে দিয়্যুম।’

দিছিল?

দিছে না আবার!

রাজগঞ্জের বাজারে বৈষ্ণবীর ভিটা আছে?

অবশ্যই আছে। বৈরাগির ভিটা আছে।



শুক্কুরবার দুপুর বেলা। দোকানের ঝাপ ফেলে রাজগঞ্জ বাজারের দোকানিরা জুমার নামাজ পড়তে গেছেন। বাজারের মধ্যে সিএনজি থামতে একজন লোক দৌড়ে আসে। নাম রমজান আলি। তিনি রাজগঞ্জ বাজারের এক উদলা জায়গায় নানা পদের গুঁড়া-মশলা ঢিবি করে সাজিয়ে বেচাকিনি করেন। ঘরহীন, দুয়ারহীন বেসাতি। রমজান আলী মাইজভান্ডারির লোক। মূলত বাঁশরিয়া। চৌমুহনীতে বিষুৎবার বিষুৎবার মাইজভান্ডারি গানের আসর বসে। ‘খাজা বাবা খাজা বাবা/মার হাবা মার হাবা’ - এ জিগিরি গানে তখন তিনি শরিক হন। রমজান আলি চৌধুরীর লড়াইয়ের ব্যাপারেও রীতিমতো ওয়াকিবহাল। বললেন এ রাজগঞ্জ তো এককালে চৌধ্রীদেরই ছিল। আমাদের ঝুলাঝুলি করতে হলো না, বৈষ্ণবীর ভিটায় যাচ্ছি শুনে এক কথায় চলনদার হতে রাজি হয়ে গেলেন। রোগা-পাতলা মানুষ, চেপে-চুপে বসলেন চালকের পাশের ছোট্ট আসনে। এর আগে তাকে মশলার ঢিবিগুলি খবরের কাগজ আর ছেঁড়া পলিথিনে ত্বরিত চাপা দিয়ে আসতে হলো।

হলুদ-মরিচের কারবার থেকে অসময়ে ছাড়া পেয়ে গানপাগল মানুষ রমজান আলি মহাখুশি। সিএনজি ছাড়তেই গীত ধরেছেনÑ চৌধ্রী সাজিল রে রঙ্গমালার লাগি/রাজসিংহাসন ত্যাজ্য করি হইল বৈরাগি/চৌধ্রী সাজিল রে।

রাজগঞ্জ বাজার পেছনে ফেলে আমরা বহুদূর চলে এসেছি। পাকা সড়ক ছেড়ে মাটির রাস্তায় পড়েছে আমাদের বাহন। জায়গায় জায়গায় পথ বলতে খানা-খন্দ, কারও বাহির বাড়ির উঠান, চষা খেত, পুকুরপাড়। কোথাও শ্যামপ্রিয়ার ভিটার নাম-নিশানা নাই। কত কাল আগের কথা। রাজা-বাদশার আলিশান প্রাসাদই ধূলায় মিশে যায়, আর এ তো দিন এনে দিন খাওয়া বৈষ্ণবী! তাছাড়া জমিদারদের জবানের কি ঠিক আছে? কাম হাসিল হতে বৈষ্ণবীকে গলাধাক্কা দিয়ে ভাগিয়ে দিয়েছে নিশ্চয়। এভাবে ঠা ঠা রোদ মাথায় নিয়ে জান পয়মাল করা বোকামি ছাড়া আবার কী! আমাদের বেচঈনি বাত রমজান আলিকে টলাতে পারে না। কই মাছের প্রাণের চেয়েও তার ইমান শক্ত। ভাঙা রাস্তায় টাল খেতে খেতে নির্বিকার চলেছেন। ভাবখানা এমন - যত দূরই হোক মঞ্জিল সামনেই।

ধূলার ঝড় বইয়ে আমাদের বাহন থামে আরেক মুলুকে। চলনদার জবান ঠিক রেখেছেন। শ্যামপ্রিয়া বৈষ্ণবীর ভিটা না হোক, সামনে বৈষ্ণবদের আখড়া। অসংখ্য মোটা মোটা থামের ওপর বিশাল ছাদ। নিচে শানের চাতাল। উঁচু বেদীর ওপর রাধা-কৃষ্ণের যুগলমূর্তি। গতরাতে এখানে হরিসভা হয়ে গেছে। কীর্তনের সাথে বাঁশি বাজিয়েছেন রমজান আলি। পরদিনই আবার অদ্ভুত সব লোক নিয়ে হাজির। আমাদের দেখতে পিলপিলিয়ে লোকজন ছুটে আসে। সবাই পানি-বাসী, মাছ মারা কৈবর্ত। গলায় কণ্ঠি। কপালে তিলক। রাতভর কীর্তন গেয়ে দিনের বেলাটা ডাঙায়ই রয়ে গেছেন। এই অবসরে আখড়ার শীতল ছায়ায় আমাদের আসর জমে। মানুষগুলো পানির মতোই ঠান্ডা আর সুশীল। রাতজাগা বা চন্ডুর প্রভাবেই হোক - কানু দাস, শ্যাম দাস, জয়দেব দাস, ভুবন দাস কলকলিয়ে কথা বলেন। তাদের মুখের ভাষাটাও কান জুড়িয়ে যাওয়ার মতো ভিন্ন তারের।

পালাগানের যুগ খতম। দীনেশচন্দ্র সেন এতোদূর পৌঁছতে পারেন নাই। কিন্তু ক্যাসেট এসে যাওয়ায় চৌধুরীর লড়াইয়ের রস থেকে কৈবর্তরাও বঞ্চিত নন। ‘ক্যাসেট শুনে আমরা অনুভব কইত্যাম, সিন্ধুরকাইত রাজবাড়ির আদিকাহিনী আমরা শুনতেছি। শুইনতে শুইনতে শ্যামপ্রিয়া বৈষ্ণবী, রাজগঞ্জের কাছারি - শব্দগুলি আবেগ তৈরি কইত্যো।’ ছোকরা শ্যাম দাসের চোস্ত বাত শেষ হতে মুরুব্বি কানু দাস আসল কাহিনী শুরু করেন -

রঙ্গমালার বাড়ি আল্লাদি নগর। ভিক্ষার ছলে যায় বৈরাগি আল্লাদি নগর। ফিরে এসে রাজেন্দ্র নারায়ণকে বলে, ‘দেখেন রাজামশয়, একটা মেয়েকে দেখলে বোধ হয় আপনি আকৃষ্ট হবেন।’ রাজেন্দ্র নারায়ণ বললেন - ‘কই দ্যাখাও দেখি!’ তখন তো রাজা-বাদশারা অত্যাচারী ছিলেন, আবার পুণ্যবানও ছিলেন। যেমন পুণ্যবান রাজা হরিশ্চন্দ্র। তবে অত্যাচারীই ছিলেন বেশি। ভালো কিছু নজরে পড়ামাত্র নিজের করে পাওন চাই। রাজেন্দ্র নারায়ণ বৈষ্ণবীর পেছন পেছন গিয়ে দেখেন অপরূপ এক সুন্দরী মেয়ে। ওই মেয়ে দেখে তিনি আকৃষ্ট হলেন। শ্যামপ্রিয়া বৈষ্ণবী চাচা-ভাতিজা দুজনকেই কান-পড়া দেয়। আর এ থেকে বাঁধে বিশাল এক যুদ্ধ।

এ তো গেল ক্যাসেটের কথা।

সংসারী বৈষ্ণব কৈবর্তদের অগাধ ভক্তি সংসারত্যাগী ভেকধারী বৈষ্ণবদের প্রতি। ‘কোটি জন্মে থাকলে ভাগ্য/বিষয় ছেড়ে হয় বৈরাগ্য।’ শ্যামপ্রিয়া বৈষ্ণবী ছিলেন সেই গোত্রের সংসারত্যাগী ভেকধারী বৈষ্ণব। এ দীন-দুনিয়া, ঘর-দরজা ওদের জন্য নয়। পথই ঠিকানা। আজ এ জায়গায়, কাল আরেক জায়গায়। মানে তিনি তিন ঘর ভিক্ষা করে ওইখানে অবস্থান করবেন। আরেক গ্রামে গিয়ে আবার তিন ঘর ভিক্ষা করে দিনেরটা দিনে একবেলা আহার। এভাবে দিন যায়। শ্যামপ্রিয়া বৈষ্ণবী টাকার লালসে দূতীগিরি করবেন - এটি কবির কল্পনা। কবিরা লোক ভাঁড়ানোর জন্য এসব কথা কয়ে গেছেন।

নরবাড়ির লোকদের মতো এ কৈবর্তরাও ক্যাসেটের পুরোটা আমলে নেন না। শ্যামপ্রিয়া বৈষ্ণবী নির্লোভ, ত্যাগে মহান। নরবাড়ির হালের বাসিন্দা নওশেদ আলমের কাছে রঙ্গমালা তো বিশ্বসুন্দরী। তারা তাকে চান্দা বীরের হাতে অকালে মরতে দেন নাই। মাঝখানে যুদ্ধটা ছিল ফাউ। সুন্দরীকে রাজচন্দ্রের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে বৃদ্ধবয়স পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখেছেন। ভক্তের ভালোবাসা এমনই।

যতই মতান্তর থাক, এ তো সাড়া-জাগানো, পাড়া-মাতানো ক্যাসেট। আমাদেরও এ একখানা চাই। চৌমুহনীর শুঁটকির আড়তের পাশ দিয়ে যাচ্ছি, ঝাঁকে ঝাঁকে মাছি আর ঝাঁঝালো গন্ধ আসে আমাদের পেছন পেছন। বাবুল রেডিও হাউজের শাটার অর্ধেক নামানো। ভেতরে বিল-ভাউজার মেলাচ্ছেন দুজন কর্মচারী। আমরা ঢাকা থেকে রঙ্গমালার ক্যাসেট কিনতে গেছি শুনে তাদের দয়া হলো। একজন একজন করে উবু হয়ে আধো অন্ধকারে ঢুকছি। ঠাসাঠাসি ক্যাসেটের ভিড়ে দম ফেলার জো নেই। দেয়ালে উঁচু মই লাগিয়ে টর্চ জ্বেলে ক্যাসেট পাড়া হলো। বাবুল রেডিও হাউজের প্রযোজনায় সিরাজ বয়াতির তিনখানা সচিত্র ক্যাসেট। এর এক সেট উকিল খসরু সাহেবের জন্য স্ত্রী শিরীন আক্তার খরিদ করলেন। আরেক সেট আমরা। একেকটা ক্যাসেট নব্বই মিনিটের হলে সাকল্যে দাঁড়ায় দুইশ সত্তর। এ শুনতে শুনতে ঢাকা অব্দি চলে যাওয়া যাবে। চৌমুহনীর মোড়ে শিরীন আক্তারকে নামিয়ে দিয়ে আমি আর বাসবী বড়ুয়া ঢাকার বাসে উঠে বসি।





রচনাকাল: জুন-জুলাই, ২০১০

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন