সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৫

সাহিত্যতত্ত্ব : ডিকনস্ট্রাকশন

সুপ্রিয়া চৌধুরী

ফরাসি ও ইংরেজি deconstruction-এর তর্জমা ( অবিনির্মাণ) জ্যাক দেরিদার অনুবাদক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের অবদান।

অবিনির্মাণ মূখ্যত কোনো দার্শনিক বা নান্দনিক তত্ত্ব নয়। ফরাসী দার্শনিক জাক দেরিদার প্রয়োগ অনুসরণ করে শব্দটির তাৎপর্য দাঁড়িয়েছে দর্শন বা সাহিত্যসমালোচনার একটি বিশেষ পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া। এর পিছনে রয়েছে জার্মান দার্শনিক মার্টিন হাইডেগ্রের কিছু চিন্তা। তিনি লিখেছিলেন যে দর্শনে construction বা নির্মাণ মূলত deconstruction বা অবিনির্মাণ অর্থাৎ দার্শনিক তত্ত্বের ভাঙন ঘটানো। নিটশে ও হাইডেগার অধিবিদ্যার যে বিরুদ্ধ সমালোচনা করেছিলেন, দেরিদার চিন্তা সেই পথ ধরে এগিয়েছে ও পূর্বসূরিদের অতিক্রান্ত করেছে। তাঁর লেখায় আরো পাওয়া যায় অন্য কিছু তাত্ত্বিক ও দার্শনিক অবস্থানের জটিল পর্যালোচনা—যেমন হুর্সেলের প্রতিতী-বিজ্ঞান (Phenomenology), সোস্যুরের গ্রন্থনবাদী ( Structuralist) ভাষাতত্ত্ব, ফ্রয়েড ও লাকাঁর মনঃসমীক্ষণ (Psychoanalysis), মার্কসের রাজনৈতিক চিন্তা ইত্যাদি।


দেরিদার লক্ষ্য, পাশ্চাত্য দর্শনশাস্ত্রের নিরন্তর ‘বাককেন্দ্রিকতা (Logocentrism)-কে ধ্বংস করা। গ্রিক Logos-এর তাৎপর্য একাধারে ‘বাক, শব্দ’ ও ‘সত্য, যুক্তি’। বাককেন্দ্রিকতা হল সেই বিশ্বাস যে বাক্যের মধ্যে সত্য অবস্থান করতে পারে। এই বিশ্বাসের ফলে উচ্চারণ (Speech) ও লেখন (wrinting)-এর মধ্যে একটি দ্বন্দ্ববোধের সৃষ্টি হয়, উচ্চারণকে লেখনের উপরে স্থান দেওয়া হয়। এই ভাবধারা ও তার আরো বিস্তৃত প্রতিফলনকে দেরিদা আখ্যা দিয়েছেন ‘উপস্থিতির অধিবিদ্যা’ (Metaphysics of presence)।

এই চিন্তার যে ফাঁক ও ফাঁদ আছে, দেরিদা তা প্রথম তুলে ধরেন হুর্সেলের উপর তাঁর গ্রন্থ Speech and Phenomena (La Voix et le phenomena, ১৯৬৭)-এঃ গ্রন্থনবাদের সমালোচনা Writnong and Difference (L’Ecriture et la differene ১৯৬৭) ও Of grammatology (De la Grammatologie ১৯৬৭)- প্লেটোনীয় অধিবিদ্যার পর্যালোচনা Disssemination (La Dessemination ১৯৭২)-এ। এই বইগুলিতে তিনি লেখন ও ভাষাকে চিহ্নিত করেন পার্থক্য (Difference)-এর জালবিস্তার হিসেবে ও একই সঙ্গে অর্থ বা উপস্থিতি (presence)-কে স্থগিত বা মূলতবি রাখা (deferral)এ অশেষ প্রক্রিয়া বলে। এর পরিণাম অর্থের মুক্ত বিচরণ (wandering) অথবা সরে বা পিছলে যাওয়া (slippage)। এটিই হল অর্থসৃষ্টির আবশ্যিক শর্ত। এই প্রক্রিয়াকে তিনি নাম দেন স্বরচিত শব্দ deiffe’rance (difference এবং deferral)। শব্দটি তাঁর কাছে একটি নবলেখন বা neographism, যেহেতু এর দ্বৈতভাব ফরাসি ভাষায় একমাত্র লেখায় ধরা পড়ে, উচ্চারণে নয়। দেরিদার পরবর্তী কাজে অবশ্য পাশ্চাত্য দর্শন ও চিন্তার অন্য অনেক দিকের আলোচনা রয়েছে—বিশেষ করে যাকে তিনি বলেছেন বিশিষ্টতা (proper)-র বিধি। (ফরাসি ভাষায় proper-র অর্থ একাধারে ‘সভ্য, বিধেয়’ এবং ‘স্বয়ং, সবিশেষ’)। তাছাড়া মৈত্রী ও ন্যায়ের মতো কতগুলি সামাজিক ও রাজনৈতিক তত্ত্ব তাঁর চিন্তা দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
দেরিদার চিন্তা যদিও অবিনির্মাণের মুখ্য দৃষ্টান্ত, deconstruction শব্দটি ক্রমশ আরো ব্যাপকভাবে যুক্ত হয়েছে তাঁর গুণগ্রাহী কিছু মার্কিন সাহিত্যতাত্ত্বিকদের কাজের সঙ্গে—যেমন প্ল দ্য মাঁ (Paul de Man) জেফ্রি হার্টম্যান (Geoffreu Hurtman)। সাহিত্যতত্ত্ব ও সমাজবিদ্যায় আজ শব্দটি বহুপ্রচলিত। গতানুগতিক দার্শনিক পদ্ধতিতে বিপরীত প্রত্যয়ের ব্যবহারে দেরিদা দেখিয়েছিলেন, শান্তিপূর্ণ সহবাস নয়, একটি প্রত্যয়ের উপর অপরটি বলপুর্বক আধিপত্য-স্থাপন। অবিনির্মাণের লক্ষ্য হল এই আধিপত্যকে ভেঙে দেওয়া। তার উপর নতুন একপ্রস্থ প্রত্যয় স্থাপন করা নয়, বরং গৃহীত প্রত্যয়গুলোর ইতিহাস ব্যাখ্যা করে দেখা, সেই ইতিহাসে কী কী অবলুপ্ত বা উপেক্ষিত হয়েছে। কার্যত এই অবিনির্মাণের কৌশল হল ভাষার অলংকারিক প্রক্রিয়া খুঁটিয়ে বিচার করে তার নিহিত ঝোঁকটির পাশাপাশি বিপরীত অর্থ বা ইঙ্গিতকে তুলে ধরা।

শেষ বিচারে ভাষার অর্থবহ চিহ্ন (Signifier) সবসময়েই মুক্তভাবে বিচরণ করে, যদিও আমরা তাকে নির্দিষ্ট অর্থপুঞ্জে আবদ্ধ রাখতে চাই। ভাষার মধ্যে যে ফাঁক (aporial) বা অনির্দেশীয় (undecidable) শব্দ আছে, অবিনির্মাণের প্রক্রিয়ায় সেগুলি ব্যাখ্যানের অস্ত্র হিসেবে কাজ করে। আমাদের দৃষ্টিতে যা ছিল বদ্ধ, সীমিত, তা হয়ে যায় মুক্ত, বিস্তৃত, (dessemineted)। অবিনির্মাণ হচ্ছে সেই পাঠপ্রতিক্রিয়া যা পাঠের প্রচলিত ধারার বিরোধে কাজ করে—ভাষার বিস্তীর্ণতাগুণ ব্যবহার করে অর্থের অশেষ বিচরণের স্বাধীনতা দেয়।
আধুনিক তত্ত্ব ও সমালোচনার জগতে যে সংশয়বাদী, মানবিকীচর্চা ও মৌলবাদবিরোধী ধারা দেখা যায়, অবিনির্মাণ তারই অংশ। কিন্তু একে আত্মসর্বস্ব (solipsist), পাঠসর্বস্ব ও সামাজিকভাবে দ্বায়িত্বহীন বলেও আক্রমণ করা হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন