বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

শিমুল মাহমুদের গল্প : জরৎকুমারী


মুখের ওপর দরজাটা খুলে যেতেই অজিত প্রশ্ন করলো, এখানে কি বিধান মাস্টার থাকেন?

দরজা আগলিয়ে দাঁড়ানো লোকটা প্রথমে হকচকিয়ে গিয়ে তারপর একটু যেন বোকা হয়ে গেল, জ্বি আমিই বিধান মাস্টার।

অজিতের প্রশ্ন করার ঢং শ্যামলের কাছে একটু যেন উত্তেজিত আর অশালীন মনে হল। পরিস্থিতি সামলানোর জন্য শ্যামল চট করে বলে উঠলো, আমরা পলাশডাঙ্গা থেকে এসেছি।

আসুন আসুন, ভেতরে আসুন আপনারা।


পর্দার আড়াল থেকে কৃষ্ণা দেখলো একে একে ছয় জন লোক ওদের ড্রইংরুমে ঢুকে গেল। কৃষ্ণার কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে। একটু যেন ঘেমেও উঠলো ভেতরে ভেতরে। শুনেছে এবারের লোকগুলো ওদের আত্মীয়ের মধ্যে। কৃষ্ণা জানালার আড়াল থেকে উঠে এসে পেছনের বারান্দায় চলে গেল। বুকের ভেতরটা ধকধক করছে। দূরে রেললাইনের ব্রিজটা একা শুয়ে আছে মরা খালটার ওপর। উঁচু রেল রাস্তার ধার ঘেঁষে বাবলা গাছগুলোকে একটু যেন মায়া মায়া লাগছে। কৃষ্ণা কখনও রেলগাড়ি যেতে দেখেনি রেললাইনটা দিয়ে। যুদ্ধের আগে নাকি রেলগাড়ি চলতো। বনগা হয়ে কলকাতা চলে যেত। ব্রিজটার নীচে পাঁচ সাতজন লোক গোল হয়ে বসে তাস খেলছে। সিগারেট টানছে। অজিত দা কি সিগারেট খায়? অজিতকে কেন যেন খুব পরিচিত মনে হল কৃষ্ণার।

বাড়িটা হঠাৎই গরম হয়ে উঠেছে। কাকলি দি এসে গেছে। ওর ছেলে দুটো চিৎকার করে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলছে। কাকাবাবু বাজার করে ফিরে এসেছে। কাকলি দি স্নান করার জন্য ডাকছে কৃষ্ণাকে। কৃষ্ণা বারান্দা থেকে ভেতরে আসার মুহূর্তে লাল ব্রিজটার ওপর লোকগুলোকে দেখতে পেল। দাঁড়িয়ে গেল কৃষ্ণা। লোক তিন জনের মধ্যে অজিদ দা কে হতে পারে। ওদেরকে ব্রিজের ওপর বেশ ভাল লাগছে। ওরা স্লিপারের ফাঁক গলিয়ে অনেক নীচে নদীটার মরা পানিগুলোকে দেখছে। একে একে তিন জনকেই মনোযোগ দিয়ে দেখলো কৃষ্ণা। প্রতি বারই প্রত্যেককেই অজিত বলে মনে হল। আর শেষ পর্যন্ত তিন জনকেই ভীষণ ভাল লাগলো কৃষ্ণার।

কাকলি দি’র চিৎকার কানে যেতেই কৃষ্ণা ঘরে ফিরে গেল। ওকে এখন স্নান করতে হবে। তার পর এক বেলা ধরে ওর দিদি আর পিসি ওকে সাজাবে। গত বার সাজাবার পর ওকে বেশ মিষ্টি লাগছিল। কেমন করে যেন গায়ের রংটাও বেশ চড়ে গিয়েছিল। চোখজোড়া একটু বেশি মায়ামায়া। লোকগুলো অসভ্যের মত ওর দিকে সারাক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। দাঁত উঁচু লোকটাকে কৃষ্ণার কাছে চাড়াল প্রকৃতির বলে মনে হল। হলদে দাঁত দেখে কৃষ্ণার মেজাজটা বিগড়ে গেল। দ্রুত একটা ছবি ভেসে উঠলো মনের ভেতর। বিয়ের পর লোকটা ওকে বিছানায় ঝাপটে ধরে ঠোঁটের ওপর হলদে উঁচু দাঁত বসিয়ে দেবে। লোকটার ঠোঁট থেকে দুর্গন্ধ লালা আর থুতু গড়িয়ে পড়বে। কৃষ্ণার বমি বমি লাগছে। ঘামছে। লোকগুলোর মধ্যে থেকে কে একজন বলে উঠলো, একটু হেঁটে দেখাও তো মা। কথাটা শুনতেই কৃষ্ণার বুকের মধ্যে ধক করে উঠলো। মাথাটা মনে হচ্ছে নিজের নয়। কৃষ্ণা মাথা তুলতে পারছে না। পিসিমা ওকে ধরে দাঁড় করালো। হাঁটতে বলছে। পায়ে কোনও অনুভূতি পাচ্ছে না কৃষ্ণা। মনে হচ্ছে ঝিঝি ধরেছে। মাথা তুলবার চেষ্টা করতেই দেখলো দাঁত উঁচু লোকটা ওর উঁচু বুকজোড়ার ওপর অসভ্যের মত তাকিয়ে আছে। কৃষ্ণার কাছে মনে হল লোকটার জিহ্বা দিয়ে যেন লালা ঝরছে। কৃষ্ণার মাথার পেছনটা ঘৃণায় রিরি করে উঠলো। কৃষ্ণা হাঁটু ভেঙে পড়ে গেল। কারা যেন ওকে ভেতরের ঘরে নিয়ে গিয়ে ফ্যানের নীচে শুইয়ে দিল। বুকটা একটু বেশি ওঠানামা করছে। শেষ রাতে কৃষ্ণা একটা অসভ্য স্বপ্ন দেখলো। উঁচু আর পুরোন লাল রেল ব্রিজটার স্লিপারের ওপর হলুদ দাঁতের খ্যাটখেটে লোকটা ওর হলুদ জিহ্বা বের করে কৃষ্ণার মুখটা চেটে দিচ্ছে। লোকটা ওর দুধের ওপর খামচে দিচ্ছে, দাঁত বসিয়ে মাংসের গভীর থেকে লাল কস চুষে নিচ্ছে। চিৎকার করতে গিয়ে কৃষ্ণার গলা থেকে যেন লাল পুরোন একটা রেল গাড়ির হুইসেল ভেসে এলো। রেললাইনের সিগন্যালের সমান উঁচু একটা প্রকাণ্ড লাল রেলগাড়ি ব্রিজটার ওপর দিয়ে ছুটে আসছে। নেংটো লোকটা ভয়ার্ত চোখে উঠে দাঁড়াতেই কৃষ্ণা ধড়ফড়িয়ে বিছানার ওপর বসে পড়লো। কৃষ্ণা বাদবাকি রাতটা বারান্দায় অন্ধকারের মধ্যে বসে কাটিয়ে দিল।

বিশ্রী স্বপ্নটার কথা মনে হতেই কৃষ্ণার ভীষণ রাগ হল। বাথরুমের দরজাটা দরাম করে আটকিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো কৃষ্ণা। তার পর ওড়নাটা খুলে আয়নাতে নিজের বুকজোড়াকে দেখতে থাকলো। এক সময় জামাটা খুলে নীচে ফেলে দিল। ব্রেসিয়ারের ফিতাটা ঢিলা হয়ে গেছে। মাত্র এক মাস হল কেনা হয়েছে। কৃষ্ণা মনে মনে হেসে ফেললো। আমার দুটোতে ধার বেশি। কৃষ্ণার প্রথম দিনের কথা মনে এলো। যেদিন কাকলি দি’র সাথে সে দোকান থেকে প্রথম ব্রা কিনেছিল। কাকলি দি’ টা কী অসভ্য। পরিষ্কার করে ব্রা শব্দটা উচ্চারণ করলো। তারপর তাড়াতাড়ি কেনা বাদ দিয়ে বাছাবাছি শুরু করে দিল। আর যখন এই দোকান বাদ দিয়ে আরেক দোকানে গেল তখন কৃষ্ণার চোখে রাগে লজ্জায় পানি চলে এলো। ব্রেসিয়ার কেনা হতেই কৃষ্ণা দ্রুত বলে উঠলো, দিদি বাড়ি যাব আমি, মাথাটা ধরেছে খুব। কাকলি দি চট করে বলে বসলো, চা খাবি, চল কিরণ দা’র দোকানে যাই, যা মজা হবে দেখিস। কৃষ্ণা না বলে উঠতেই কাকলি দি ওর হাত ধরে ঝট করে একটা মিষ্টির দোকানে ঢুকে গেল। কাউন্টার থেকে লম্বা গলা বের করে কাল মত একটা ছোড়া বলে উঠলো, কাকলি দি যে, সাথে আপনার বোন বুঝি? ভেতরে গিয়ে বসেন, আজকে কিন্তু আমি খাওয়াচ্ছি।



কৃষ্ণার শরীরটা লজ্জায় জ্বলে যাচ্ছে। দিদির কাছে এর আগেও কিরণের গল্প শুনেছে। কিন্তু সত্যি সত্যিই ওকে নিয়ে দোকানে ঢুকবে তা ভাবতে পারেনি কৃষ্ণা। দিদির কথাবার্তা কোন দিন বিশ্বাস করেনি। এক দিন পরেই কৃষ্ণা একটা হলুদ খামে চিঠি পেল। হার্ট আঁকানো। হার্টের মধ্যে একটা তীর গেঁথে আছে। বাকাবাকা লেখাগুলো ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। প্রথমে খুব হাসি পেল। তার পর লেখাগুলো পড়তে পড়তে রাগে কৃষ্ণার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। মিষ্টির দোকানদার কিরণ ওর সাথে প্রেম করতে চায়। গুনে গুনে নয় বার কুত্তার বাচ্চা বলে গালি দিয়ে চিঠিটাকে নয় টুকরো করে বাথরুমে ফেলে ছেড়া টুকরোগুলোর ওপর প্রস্রাব করার পরও যখন রাগ কমলো না তখন শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে পানি ছেড়ে দিল। বুকজোড়া কচলাতে গিয়ে কথাগুলো মনে পড়তেই ভীষণ হাসি পেল কৃষ্ণার। আচ্ছা বিয়ের পরে তো অজিত এই দুটো দেখবে। কৃষ্ণার নিজেকে খুব অসভ্য মনে হয়। তার পর আয়নার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে ফেলে। পায়জামাটা খুলে ফেলতে ইচ্ছে হয়। খোলে না। নাভির নীচে পানি গড়িয়ে যেতেই কেমন যেন শিরশির করে ওঠে। হাতের তালু দিয়ে জায়গাটা ঠেসে ধরে। তার পর আরও খানিকটা নীচে হাত চালিয়ে কচলিয়ে নেয়। অনেক দিন পর স্নান করতে কৃষ্ণা পঞ্চান্ন মিনিটেরও খানিকটা বেশি সময় নিল।

বাথরুম থেকে বের হবার পর কৃষ্ণার মনটা বেশ হালকা হয়ে এলো। ভাল লাগছে বেশ। কী যেন একটা মিষ্টি সুর মনের ভেতর হালকা পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। কৃষ্ণা সুরটা ধরার চেষ্টা করেও বারবার হারিয়ে ফেলছে। একটু যেন অস্থির অস্থির লাগছে। না সুরটাকে ধরা যাচ্ছে না অথচ ভেতর থেকে সরছে না সুরটা। মৃদু পায়ে ছাদে চলে গেল কৃষ্ণা। চোখে রোদ পড়তেই গানের সুরটা পরিচিত হয়ে আসে। চোখের কাল মনিজোড়া চিকচিক করে ওঠে। কৃষ্ণার খুব জোরে চিৎকার করে হাসতে ইচ্ছে হয়। গামছাটা দুই হাতে মাথার পিছনটাতে নিয়ে চুলের পানি ঝরাবার জন্য পাঁচ সাত বার বাড়ি মারতেই পায়ের শব্দে ঝট করে ঘুরে দাঁড়ালো কৃষ্ণা। লম্বামত একটা লোক চট করে দরজার ভেতরে চলে গেল। ভীষণ হাসি পেল। ছেলেটা নিশ্চই ভীষণ লজ্জা পেয়েছে। যাক বাঁচা গেল, গায়ে পড়ে গল্প করতে আসেনি। আসলেই অজিত দা’র বন্ধুগুলো বেশ ভদ্র। অজিতের গায়ের রং নাকি লাল। পুরুষ মানুষ কি এতটা ফর্সা হয়! নাকি কাকাবাবু বেশি বেশি বলেছে। নিজেদের গাড়ি নিয়ে এসেছে ওরা। ভীষণ বড়লোক। ভাবতে গিয়ে মনটা দমে গেল কৃষ্ণার। অজিতদের তুলনায় ওরা বেশ কিছুটা গরিবই হবে। অজিত দা’রা পছন্দ করবে তো ওদের ঘরবাড়ি। অজিত দা’র মা নাকি ভীষণ ভাল। বিয়েতে ওদের নাকি কোনও দাবি নেই। শুধু পরির মত একটা বউ দরকার ওদের। গান জানতে হবে। কৃষ্ণার চোখজোড়া হেসে ওঠে। ওর গলাতে গান বেশ জমে। রবি দা তো ওর গানের জন্যই পাগল। রবি দা’র চেহারাটাও বেশ। নায়ক নায়ক ঢং আছে একটা। ওই ঢংটাই কৃষ্ণার বিরক্ত লাগে। ছোড়াটার টাকা পয়সা নাই অথচ ভাবখানা জমিদারপুত্র। ভারতের মেদিনিপুরে নাকি ওদের অবস্থা বেশ ভাল। রবি দা নাকি থাকতো বাকুড়াতে। বাকুড়া থেকে পালিয়ে এসে এখন গান বাজনা করে বেড়ায়। মাস সাতেক আগে পাড়াতে ওকে আর রবিকে নিয়ে বাজে কথা শোনা গেছে। কলেজের অনুষ্ঠানে রবি দা কৃষ্ণাকে ডেকে কমনরুমের কোণায় নিয়ে গিয়ে বেশ চমৎকার করে বলে বসলো, দেখো কৃষ্ণা, সব কিছুই তো শুনেছ, প্রেমপত্র লেখাটা আমার রুচিতে বাধে, বাদ দাও ওসব কথা, তুমি তো সবই জানো, আমাদের এখন উচিত একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া।

কৃষ্ণা বেকুব বনে গেল। কী শুনছে সে এসব। কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলো না। তারপর চট করে বলে বসলো, সিদ্ধান্ত মানে?

রবি দা বেশ অভিনয়ের ঢঙে হাসতে শুরু করলো, তারপর ফিসফিসিয়ে উঠলো, সিদ্ধান্ত মানে আমরা ইচ্ছে করলে বিয়ে করে ফেলতে পারি।

কৃষ্ণা প্রথমে বেকুব বনে গেলেও এবারে আহম্মকের মত রবির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। রবি কী বুঝলো এতে করে ঠিক বোঝা না গেলেও হাসিটা ওর মুখে ক্রমাগত বড় হতে শুরু করলো। কৃষ্ণা হঠাৎ করেই হুস ফিরে পেয়ে বলে ওঠে, অসম্ভব, আমি আপনাকে ঠিক সে দৃষ্টিকে কখনও দেখিনি। আপনি আমাকে আরও একটা মাস ভেবে দেখতে দিন। তবে রবি দা এতে কোনও লাভ হবে না।

রবি এবার শব্দ করে হাসতে শুরু করে, দেখো কৃষ্ণা ফালতু চিন্তা ভাবনা বাদ দাও। তোমাকে আমার সাথে বাকুড়া যেতে হবে।

কৃষ্ণা খানিকটা ভয় পেলেও ওর মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল, মিথ্যা কথা, আপনাকে বাকুড়ার পুলিশ খুঁজছে। আপনি বাকুড়া যাবেন না, বাদ দেন ওসব। কাকাবাবু রাজি হবে না, আমাদের জাত আলাদা, আর চুরি করে বিয়ে করার মত মাথা খারাপ হয়নি এখনও। সরে দাঁড়ান, আমি বাড়ি যাব এখন।

রবি কী যেন বলে শাসাতে চেষ্টা করতেই কৃষ্ণা রবিকে ধাক্কা দিয়ে পথ করে নিয়ে দ্রুত চলে এলো কমনরুম থেকে। সেদিনের অনুষ্ঠানে ওর আর গান গাওয়া হল না। রিক্সায় যেতে যেতে দ্বিতীয় বারের মত দেখা অসভ্য স্বপ্নটার কথা মনে এলো। বড় পূজাতে মিহির দা যখন অসভ্যের মত সারাটা সন্ধ্যা কৃষ্ণার গায়ে হাত দেবার জন্য ফাঁক ফোকর খুঁজলো, আর রাত শুরু হতেই যখন কারেন্ট চলে গেল, কৃষ্ণা বারান্দা থেকে ছুটে এসে নিজের ঘরের দরজা লাগিয়ে দিয়ে বিছানায় শুয়ে ঘামতে লাগলো। কৃষ্ণা গুনে গুনে ছত্রিশ বার মিহিরকে কুত্তার বাচ্চা বলে গালি দিল। তার পর পৌনে এক ঘণ্টা পর কারেন্ট ফিরে এলে দরজা খুলে কৃষ্ণা ছাদে চলে গেল। শেষ রাতে ঘুমের ভেতর মিহিরের দাঁতগুলো উঁচু আর হলদেটে হয়ে কৃষ্ণাকে কামড়ে দিল। স্বপ্নের শেষটাতে মিহিরও ন্যাংটো হয়ে লাল রেল ব্রিজটার ওপর দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল। কৃষ্ণার শরীরটা একেবারে খালি। লাল রেলগাড়িতে কৃষ্ণা বর্ডার পার হয়ে বেহালা যাচ্ছে, ঠাকুরদার বাড়ি। সামনে বসা লোকটাকে হাওড়া আর কতদূর জিজ্ঞেস করতেই কৃষ্ণা বুঝতে পারলো ওর পরনে কোনও কাপড় নেই। মুহূর্তে কৃষ্ণা চিৎকার করে ছুটন্ত ট্রেনের দরজা দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল।

বিশ্রী স্বপ্নটা মনে পড়তেই কৃষ্ণার ছাদে চুল শুকাবার নেশাটা নষ্ট হয়ে যায়। ঘরে আসবার পর কাকলি দি ওর চুলগুলো নিয়ে যাচ্ছে তাই শুরু করে দিল। কৃষ্ণা কিচ্ছু বলছে না। ভাবতে থাকে, আসলে ওর বিয়েটা হওয়া জরুরি। বাবাকে মনে পড়ে না। শুনেছে যুদ্ধের সময় ভারতে চলে যাবার পর আর ফিরে আসেনি বাবা। কাকাবাবুর সংসারে তিন বোন মানুষ হয়েছে। ওর ছোটটার বিয়ে হবে না কোন দিন। বুকে অসুখ আছে। কেয়ার তো বয়স কম হল না। এই নিয়ে দুবার এম. এ. পরীক্ষা দিল কেয়া। ওর বিয়ের পর কেয়াকে যদি ওর কাছে রাখতে পারতো। অজিতকে ঠিক রাজি করান যাবে। ওদের বংশের একটা সুনাম আছে। হিমানী মাসির বিয়েতে নাকি অজিতের বাবাই সব করেছিল। অজিতের মা নাকি কৃষ্ণার ছবি দেখেই পছন্দ করে রেখেছে ওকে। আজকে শুধু অজিতের জন্যই আয়োজন। না হলে কনে দেখার আয়োজনের হয়তো দরকারই ছিল না। আচ্ছা অজিত কি এর আগে কখনও ওকে দেখেছে? অজিত দেখতে কেমন। শুনেছে চোখা চেহারা, পাতলা লম্বাটে আর অসম্ভব ফর্সা। ওদের বংশের ধরাই নাকি ওমন। বিয়ের পর আমি আর কেয়া অজিদের সাথে বেহালাতে ঠাকুরদার বাড়ি বেড়াতে যাব। কলকাতায় নাকি অজিতদের বড় বড় আত্মীয় আছে। অজিতের নাকি বেড়াবার বাতিক আছে। ও যখন বুঝতে পারবে আমারও ভীষণ বেড়াবার নেশা তখন খুব মজা হবে। আমাকে ভীষণ পছন্দ করবে।

আসলে কৃষ্ণা কাকলির শ্বশুরবাড়ি আর পিসির বাড়ি ছাড়া আর কোথাও যায়নি। কৃষ্ণার যেন বিশ্বাস হতে চায় না যে, সে এই দু’জায়গায় ছাড়া আর কোথাও যায়নি। ওর কেবলি মনে হতে থাকে সে সারাজীবন শুধু ঘুরেই বেড়িয়েছে। কাকলিদিটা সারাদিন পাড়ায় পাড়ায় টো টো করে ঘুরে বেড়ায়। একটা বাজে স্বভাব। বিয়ের পর আমি কক্ষনো এমন করবো না। বেড়াতে হলে বিয়ের পর দু’জনে আগে যাব সমুদ্রে। ভয়ানক মজা হবে। কাকলিদি ভীষণ মিথ্যে বলতে পারে। ও নাকি গত বারের আগের বার পূজাতে যখন কলকাতা গিয়েছিল তখন সমুদ্রে গিয়েছিল। সমুদ্র পাবে কোথায়! দিদির কথাবার্তার কোনও ঠিক নেই। কেউ বিশ্বাস করুক আর না করুক বানিয়ে বানিয়ে গল্প করে বেড়াবে। ছিঃ কাকলিদির একটুও ভয় লাগে না। বিয়ের সময় তিন দিন উপোস করা বাদ দিয়ে চুরি করে খেয়ে নিল। যত কষ্টই হোক শুভলগ্নের আগে খাওয়া কিসের! ভাগ্যিস কাউকে বলে দেই নাই। বিয়ের পর অজিতকে কি বলে দেব? না, বলা যাবে না, তা হলে আমাকেও অবিশ্বাস করবে অজিত।

কাকলি কৃষ্ণার শাড়িটা পাল্টিয়ে দিল। কুচি ঠিক করতে গিয়ে দু’তিন বার কষে গালি দিল। কৃষ্ণাকে আনমনা দেখে পায়ে জোরে একটা চিমটি কাটলো। কৃষ্ণা চেঁচাতে গিয়ে নিজেই নিজের মুখ চেপে ধরে। চোখে পানি চলে আসাতে কৃষ্ণাকে আরও সুন্দর দেখাচ্ছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে থাকলো। বুক জোড়াকে একটু একটু ওঠানামা করতে দেখে কৃষ্ণার নিজেরই লজ্জা লাগে। চোখের কাজলটা কেমন যেন ঠিক মত আঁকা হয়নি। কেমন যেন মূর্তি মূর্তি লাগছে। দিদি কাজলটা আরেকবার এঁকে দে, ভাল লাগছে না।

কেয়া এগিয়ে এসে কৃষ্ণার মুখটা আলতো করে তুলে ধরে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। কথা বলতে গিয়ে কেয়ার গলাটা যেন ঝাপসা হয়ে এলো। দিদি, তুই এবার সত্যি সত্যি চলে যাবি?

যাবই তো, না যাবার কী আছে? তোকেও নিয়ে যাব।

হ্যাঁ তোর বর তোকে বাদ দিয়ে আমাকেই তো নেবে, বদামো হচ্ছে না?

মাঝখান থেকে কাকলি চট করে বলে উঠলো, ধুর ছেমড়ি, তোকে কাজের ছুড়ি বানিয়ে সাথে নেবে কৃষ্ণা।

তিন বোনই শব্দ করে হেসে ফেললো। কাকলি কেয়ার মুখ ঠেঁসে ধরে, সরে দাঁড়া, ধামড়ি কোথাকার, এত জোরে হাসতে আছে, পাশের ঘরেই তো অজিতরা রয়েছে।

কেয়া জিভ কেটে ভেজা গামছার কোণা দিয়ে কৃষ্ণার চোখের কোণাটা মুছিয়ে দেয়। তার পর অনেক ক্ষণ ধরে নতুন করে কাজল এঁকে দিল। কৃষ্ণার চোখ জোড়া ঝাপসা হয়ে আসছে। চোখের পানি আড়াল করতে চট করে মুখ সরিয়ে নিল। কেয়া বুঝতে পেরে বলে ওঠে, দিদি তুই কাঁদছিস?

কৃষ্ণা মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে কেয়ার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো। কাকলি দি কৃষ্ণাকে ধরে নিয়ে বিছানার ওপর বসিয়ে দিল। আজকে কৃষ্ণাকে সুন্দর দেখাচ্ছে। কনে দেখার পালায় আজকে কৃষ্ণা জিতে যাবে নির্ঘাৎ।

কৃষ্ণার হাতের তালুতে কাসার থালায় মিষ্ঠি পান সাজানো। একটু একটু যেন হাত কাঁপছে। পিসিমা ওকে ধরে নিয়ে ঘরের মাঝখানটা পর্যন্ত যেয়ে ছেড়ে দিল। কেয়াসহ বাড়ির আর সব আইবুড়ি মেয়েরা পাশের ঘরের পর্দার আড়াল থেকে নিঃশ্বাসপতন শব্দে অপেক্ষা করছে। কখনও বা এ ওকে ঠেলে এগিয়ে এসে পুরো ঘটনাটা দেখার কৌতূহলে কৃষ্ণার মতই যেন বা কাঁপছে। কৃষ্ণার একটু ভয় ভয় লাগছে। মনে হল অজিত ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। টেবিলে পানের থালা রেখে কৃষ্ণা সাহস সঞ্চয় করলো, তার পর আশ্চর্য ভঙ্গিতে বুকের কাছে জোড়হাত তুলে নমস্কার জানালো। কণ্ঠস্বরটা একটু যেন কেঁপে গেল।

পাঁচ ছয় জোড়া চোখ গেঁথে গেল কৃষ্ণার শরীরে। অজিতের চোখ কৃষ্ণার চোখে পড়তেই কৃষ্ণার চিবুকটা দু’বার কেঁপে উঠলো। অজিতের পাশে বসে থাকা ওর বন্ধু শ্যামলের চোখ কৃষ্ণার পায়ের পাতায় কিছুক্ষণ আটকে থাকার পর ধীরে ধীরে উপরে উঠতে থাকে। শ্যামলের চোখ কৃষ্ণার দেহের খুটিনাটি দেখে ফেলবার আগেই বিজনের চোখে কৃষ্ণার শাড়ি মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়। দ্রুত বিজন নাভি থেকে বুকের ওপর এসে হা করে তাকিয়ে থাকে। শেষ পর্যন্ত অজিতও যেন কৃষ্ণার সাজানো শরীরে কোনও কাপড় খুঁজে পায় না। কৃষ্ণা একটু একটু ঘামতে শুরু করেছে। শ্যামল মনে মনে বলে ওঠে, দুধ জোড়া আরেকটু উঁচু হলে ভাল হতো। অজিতের মামা কী যেন লিখতে বললো কৃষ্ণাকে। কৃষ্ণা লিখছে। মাথাটা টেবিলের দিকে ঝুঁকে আছে। অজিতকে চোরা চোখে এক বার দেখে নিল কৃষ্ণা। কেয়ার বর্ণনা মতে চিনতে কষ্ট হল না অজিতকে। ওর গায়ের রঙটা সবার থেকে আলাদা। পাতলা নাক। কৃষ্ণার কেন যেন মনে হল অজিত ওর অনেক দিনের পরিচিত। কৃষ্ণার কলম কাঁপছে। প্রথমে বাংলায় তার পর ইংরেজিতে লিখে ফেললো নিজেদের ঠিকানাটা। ভুল হচ্ছে না তো। নিজের লেখাটা কৃষ্ণার বেশ পছন্দ হল। হঠাৎই কৃষ্ণার কানে ভেসে এলো, কৃষ্ণা, একটু হেঁটে দেখাও তো মা।

মুহূর্তে কৃষ্ণার মাথাটা ফাঁকা হয়ে এলো। বুকটা ধক করে উঠলো। পা জোড়া কাঁপছে। ভেতর থেকে কাকলি দি দ্রুত ছুটে এসে কৃষ্ণাকে ধরে দাঁড় করালো। হাঁটালো। তার পর কৃষ্ণার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো, নমস্কার দে, তোকে এখন ভেতরে নিয়ে যাব। কৃষ্ণা মাথাটা একটু নিচু করে হাত দু’খানা বুকের কাছে তুলে নমস্কার জানালো। কণ্ঠস্বরটা যেন একটু কেঁপে গেল। প্রচণ্ড ইচ্ছে হল অজিতকে এক বার দেখতে। কিন্তু পারলো না। শুধু বুঝতে পারলো অজিতের চোখ এখন ঠিক ওর মুখের ওপর স্থির হয়ে আছে। তাকালেই চোখে চোখে ধরা পড়ে যাবে। কাকলি দি কৃষ্ণাকে ভেতরে নিয়ে গেল। অজিতকে ভীষণ আপন মনে হল কৃষ্ণার কাছে।

অজিতদের সবাইকে কৃষ্ণাদের বাড়ির সবাই গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিল। কৃষ্ণার কাকাবাবু অজিতের মামার হাত জড়িয়ে ধরে বিনয়ের সাথে বলে ওঠে, একটু বিবেচনা করবেন। ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমা করবেন। শ্যামলের কাছে গিয়ে একই ভাবে বলতে থাকলেন। চোখে যেন খানিকটা পানি এসে গেল, কণ্ঠস্বর ভারি হয়ে এলো। শ্যামল কিছুটা যেন অপ্রস্তুত হয়ে গেল। মনে মনে ঠিক করলো অজিতকে এ বিয়েতে রাজি করাতে হবে। কৃষ্ণার কাকাবাবুর দিকে তাকাতেই শ্যামলের বুকের ভেতরটা অদ্ভুত কুঁকড়িয়ে ওঠে। কাকাবাবুর চোখজোড়া আবেগে চিকচিক করছে। শ্যামলের কষ্ট হচ্ছে। কাকাবাবু চট করে একটু ঘুরেই হাতের পেছনটা দিয়ে চোখ দু’টো মুছে ফেললেন।

অজিতরা চলে যাবার পর ষোলটা দিন কাকাবাবুর বেশ অস্থিরতার মধ্যে কাটলো। গোপনে অজিতের মা-র কাছে চিঠি লিখে ফেললেন। প্রতি রাতেই নিজের সাথে যুদ্ধ করে পরাজিত হন। ঠিক করেন সকালবেলা উঠেই পলাশডাঙ্গা যাবেন। সকাল হতেই দিনের আলোতে কাকাবাবু নিজেকে সামলিয়ে নেন। চিঠির উত্তরটা হয়তো দু’একদিনের মধ্যে পেয়ে যাবেন। কাকাবাবু ভেতরে ভেতরে বিয়ের আয়োজন করতে থাকেন। সরকার বাড়ির লোক কিছু না দাবী করলেও নিজেদের একটা তো বংশ মর্যাদা আছে।

অতঃপর আরও নয়দিন পর পলাশডাঙ্গা থেকে চিঠি এলো। কাকাবাবুর নামে না। কৃষ্ণার নামে। চিঠিটা কৃষ্ণার হাতেই পড়লো। কৃষ্ণার বুকের মধ্যে ধক করে ওঠে। নিজেকে সামলে নিয়ে ছাদে চলে যায়। কড়কড়ে রোদ। একটা কাক বেল গাছটা থেকে কা-কা শব্দে ডেকে উঠলো। কৃষ্ণার কানের মধ্যে কা-কা ধ্বনিটা লম্বা হতে থাকে। চিঠির খামের ভেতর খুব ছোট্ট এক টুকরো নীল কাগজ। কৃষ্ণা প্রথম বার পড়ে কিছু বুঝতে পারলো না। শুধু অজিত নামটার ওপর ঠোঁটজোড়া ঠেঁসে ধরে লম্বা একটা চুমু খেল। তার পর ব্লাউজের মধ্যে কাগজটা রেখে আঁচলে চোখ মুছতেই বেল গাছের কাকটা কা-কা স্বরে দুপুরের রোদগুলোকে টুকরো টুকরো ভেঙে ফেললো। কৃষ্ণার বুকের ভেতর রক্তের ঝাঁক যেন মুহূর্তে ভেঙে ছড়িয়ে পড়লো হাড্ডিতে হাড্ডিতে।

দূরে লাল রেলব্রিজটা যেন বা একটু একটু কাঁপছে। ব্রিজ বরাবর রেলপাত ধরে কৃষ্ণার চোখ আরও খানিকটা দূর চলে গেল। যুদ্ধের বছর বাবা এই পথটা দিয়েই হাঁটতে হাঁটতে হারিয়ে গেছে। এই জায়গাটায় এলেই কৃষ্ণা মনে মনে ওর বাবার সাথে অনেকটা দূর পর্যন্ত চলে যায়। কৃষ্ণা মনে মনে হাঁটতে হাঁটতে লাল ব্রিজটার ওপর গিয়ে বসে। নীচের লোকগুলো তাস খেলা বাদ দিয়ে কৃষ্ণার দিকে তাস ছুঁড়ে দিচ্ছে। আর ঠিক তখনই অসভ্য কাকটা তৃতীয় বারের মত চিৎকার করে মেথর পট্টির দিকে উড়ে গেল। ঊনত্রিশ সেকেন্ড পর কৃষ্ণা নিজেকে সামলে নিল। বুকের ভেতর থেকে নীল কাগজের টুকরোটা তুলে নিয়ে ঠাণ্ডা চোখে পাঠ করলো, আমাদের সবার চোখ এড়িয়ে গেলেও আমাদের ড্রাইভারের চোখে ধরা পড়েছে তোমার একখানা পা খানিকটা ছোট। কৃষ্ণা, বোন আমার, ক্ষমা চাইছি,--- অজিতদা


লেখক পরিচিতি
শিমুল মাহমুদ
কবি। গল্পকার। ঔপন্যাসিক। প্রবন্ধকার।
উপন্যাস :  শীলবাড়ির কাহিনী


1 টি মন্তব্য:

  1. পড়তে পড়তে পড়ুয়া আমি একজন নারী হয়ে উঠলাম। যদিও আমার পিসতুতো দাদার নারী তথা কনে দেখার ঘটনা মনে পড়ে গেলো।

    উত্তরমুছুন