বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

চা বিক্রেতা খ্যাতিমান লেখক লক্ষ্মণ রাও এর আত্মকথা

অনুবাদ ও সম্পাদনা : মনোজিৎকুমার দাস

[লক্ষ্মণ রাও (জন্ম ২২ জুলাই ১৯৫২) বর্তমানে একজন চা বিক্রেতা ও খ্যাতিমান লেখক । শিক্ষাগত যোগ্যতা এম. এ.। লক্ষ্মণ রাও কৃষি শ্রমিক ,রাজমিস্ত্রি, স্পিনিং মিলের শ্রমিক, হোটেলের ওয়েটারের মতো কাজের পর ১৯৭৭ সালে দিল্লির আইটিও এর কাছে বিষ্ণু দিগম্বর মার্গে পান সিগারেটের দোকান খোলেন ,তারপর তিনি ওই দোকানটিকে চায়ের দোকানে রূপান্তর করেন। সে সময় থেকে তিনি হিন্দি ভাষায় বই লেখালেখি সূত্রপাত। তাঁর লেখা প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২৪ এর অধিক। এখনো তিনি চা বিক্রয়ের সঙ্গে সঙ্গে লেখালেখির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। লেখক হবার পেছনের ইতিবৃত্ত নিজের জবানীতে তুলে ধরেছেন তাঁর Biography তে। তাঁর লেখা উক্ত Biography কে বঙ্গানুবাদ করা হল।]


আমি লক্ষ্মণ রাও, আমার জন্ম মহারাষ্ট্রের অমরাবতী জেলার তালেগাঁও দাশাসার গ্রামে ১৯৫২ সালের ২২ জুলাই। পেশায় আমি একজন লেখক । উপন্যাস, নাটক, সাহিত্য ও দর্শন মিলিয়ে ২৪ খানা বই এ পর্যন্ত আমি লিখেছি। আমাদের গ্রামের একটা ঘটনা আমাকে লেখক হতে অনুপ্রণিত করে। আমাদের গ্রামের রামদাস ও আমরা একই স্কুলে পড়তাম, রামদাস কিন্তু ছিল আমার চেয়ে সিনিয়র। সে ছিল স্কুলের একজন অস্থির চরিত্রের ছাত্র । স্কুলের একজন শিক্ষকের প্রচেষ্টায় তার চরিত্র সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন হয়। সে সব শিক্ষকের প্রিয় হয়ে ওঠে। একদিন বিয়ের একটা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে ফেরবার পথে সে নদীতে গোসল করার জন্যে একটা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু সে আর নদীর জল থেকে উঠে আসে না। ওটা আত্মহত্যার ঘটনা ছিল না। ঘটনাটি আমাকে লেখক হতে অনুপ্রাণিত করে ।

আমি নাগপুর বোর্ড , মহারাষ্ট্র থেকে মারাঠি ভাষায় মাধ্যমিক পাশ করি। তারপর আমি সিনিয়র সেকেন্ডারি পরীক্ষাসমূহে উর্ত্তীন হই সি.বি.এস.ই. দিল্লি থেকে। নতুন দিল্লির দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পরীক্ষা পাশ করি।তারপর আমি হিন্দি ভাষায় এম.এ পাশ করি আইজিএনওইউ থেকে।

আমি একজন সফল লেখক হওয়ার উদগ্র আগ্রহ নিয়ে ১৯৭৫ সালে দিল্লিতে আসি। তার আগে আমি অমরাবতীতে একটা স্পিনিং মিলে কাজ করতাম। মিল বন্ধ হয়ে গেলে আমি মাঠে কাজ করতে শুরু করি।

এক সময় আমি বাবার কাছ থেকে ৪০ রুপি নিয়ে বাড়ি ত্যাগ করি। আমি দিল্লিতে যাওয়ার বাসনা করলেও ভোপাল থেকেই আমার অর্থ ফুরিয়ে যায়। তারপর আমি ভুপালে নির্মাণ শ্রমিক হিসাবে তিন মাস কাজ করি। কিছু অর্থ আমার হাতে আসে। আমি ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে দিল্লিতে পৌঁছাই। আমি সেখানকার বিড়লা মন্দিরের ধর্মশালায় দুই তিন দিন অবস্থান করে চাকরীর খোঁজ করতে থাকি। কিন্তু চাকুরী না পেয়ে আমি শ্রমিক হিসাবে কাজ করতে থাকি।

তারপর আমি রাস্তার পাশের খাবারের দোকানে দু বছর ওয়েটারের কাজ করি। ১৯৭৭ সালে আইটিও এর কাছে বিষ্ণু দিগম্বর মার্গে পান সিগারেটের দোকান খুলি। তারপর এক সময় আমি ওই দোকানটিকে চায়ের দোকানে রূপান্তর করেছি।

আমি হিন্দি ভাষায় লেখালেখি শুরু করতে মনস্থ করে সারাদেশের হিন্দি ভাষায় লেখা বই পড়তে বাসনা করি। তাই আমি যথাসম্ভব হিন্দি ভাষার বই পড়তে শুরু করি। আমি প্রত্যেক রবিবারে দরিয়াগঞ্জের পুরনো বইয়ের যেতে থাকি হিন্দি বই কেনার জন্যে। আমি সেখান থেকে কেনা বইয়ের মধ্যে গুলশান নন্দা, মুন্সী প্রেমচাঁদ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শেক্সপিয়ার, লেনিন, মার্ক্স এর লেখা বই পড়ি।

বই লেখার পর তা প্রকাশের জন্যে দিল্লিতে পাবিলিসারে দরজায় হাজির হলাম। নানা রকমের অজুহাত দেখিয়ে তারা আমাকে ফিরিয়ে দিল। একজন পাবলিসার তো বললেন,“ এখান থেকে মানে মানে কেটে পড়ো। তুমি বই পাবলিকেশনের খরচপাতির কথা কি জানো!” এই তিক্ত অভিজ্ঞতার ফলে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান খুলবো । আমি আমার প্রকাশনা সংস্থার নাম দিলাম ‘ ভারতীয় সাহিত্য কলা প্রকাশন’। ওখান থেকে আমি ১৯৭৯ সালে আমার প্রথম উপন্যাস ‘ নায়ি দুনিয়া কী নায়ি কাহনি’ প্রকাশ করি।

আমি ১৯৮৪ সালের ২৭ মে মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর সাথে তিনমূর্তি ভবনে দেখা করি। তিনি আমাকে বললেন আমি যেন আমার লেখা বন্ধ না করি। আমি অনুপ্রণিত হলাম তাঁর জীবনী লিখতে , প্রধানমন্ত্রীর শাসন আমল সম্বন্ধে কিছু কিছু লিখতে তিনি আমাকে বললেন । তারপর আমি তিন মাস পরিশ্রম করে একটা নাটক লিখে নাম দিলাম প্রধানমন্ত্রী। আমি মিসেস ইন্দিরা গান্ধীকে বইটি উপহার দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু দু:র্ভাগ্যের বিষয় মিসেস গান্ধী নিহত হওয়ার ফলে আমি সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলাম। প্রধানমন্ত্রী শিরোনামের বইটিতে আমি ইন্দ্রিরা গান্ধীর রাজত্বকাল (১৯৬৯- ১৯৭২ ) কে তুলে ধরলাম। প্রধানমন্ত্রী নামের বই প্রকাশিত হলো ১৯৮৪ সালে। হিন্দি ভাষায় লেখা আমার তৃতীয় উপন্যাস রামদাস প্রথম ১৯৯২ সালে বের হয়, যা ৩০০০ কপি বিক্রি হয়। এ পর্যন্ত আমার প্রকাশিত বইয়ের তালিকা নিম্নরূপ--

নায়ি দুনিয়া কী নায়ি কাহনি ১৯৭৯
প্রধানমন্ত্রী (নাটক) ১৯৮৪
রামদাস ১৯৯২,২০০১ ও ২০১৩
নর্মদা ২০০১,২০১৪
পরম্পরা সে জুদি ভারতীয় রাজনীতি ২০০৬, ২০১০,২০১৩
অবন্তিকা ২০১২
রেনু ২০০৮,২০১২
অহঙ্কার ২০১২
দৃষ্টিকোণ ২০১৪
প্রধানমন্ত্রী ২০১৫

এখন আমি কাজ করছি আমার আগামী বই ‘ ব্যারিস্টার গান্ধী’ বইয়ের উপর,যা মহাত্মা গান্ধীর জীবনী নির্ভর আর ডানশা ( একটা সামাজিক হিন্দি উপন্যাস)। সম্প্রতি আমার বেশি বিক্রিত হিন্দি ভাষায় লেখা ‘নর্মদা’ আমাজান কিন্ডেল থেকে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে।

২০০৯ সালের ২৩ জুলাই ভারতের রাষ্ট্রপতি মিসেস প্রতিভা পাতিল আমন্ত্রণে অমার পরিবার পরিজন সহ রাষ্ট্রপতি ভবনে ভবনে গিয়েছিলাম। আমি তাঁকে আমার লেখা সামাজিক উপন্যাস ‘ রেনু’ উপহার দিয়েছিলাম। রাষ্টপতির সাথে সাক্ষাৎ করার পর আমার লেখালেখি স্বীকৃতি লাভ করলাম।

অধিকাংশ লোকই আমাকে জিজ্ঞেস করে, আমি এত ভাল লেখা সত্ত্বেও কেন আমি চা বিক্রি করছি। আমি তো ইচ্ছে করলে কোন একটা অফিসে চাকরী খুঁজতে নিতে পারি। এ কথার জবাবে-- বলি একটা অফিসে কাজ করলে আমি লেখালেখির কাজ চালিয়ে যেতে পারবো না। চা বিক্রি করে আমি বেশি লেখালেখির সময় না পেলেও আমি একই সঙ্গে বই পড়া ও বই লেখালেখি করতে পারি খোলা মনে।

সাক্ষম আর্ট গ্রুপের ব্যানারে শ.সুনীল রাওয়াতের পরিচালনায় আমার লেখা ‘ রামদাস’ উপন্যাস অবলম্বনে একই নামে নাটক মঞ্চস্থ হয়। এটা প্রথম ২০১১ সালে শিক্ষক দিবসে নিউ দিল্লার আইটিও এর পিয়ারিলাল ভবনে অভিনীত হয়। তার আগে নিউ দিল্লিতে তা চার বার অভিনীত হয়। ২০১২ সালের ১১ মে লোদি রোডের ইন্ডিয়ান হ্যাবিট্যাট সেন্টারের অ্যাম্ফি থিয়েটারে রামদাস অভিনীত হয়েছিল। নাটকটির জনপ্রিয়তাই প্রমাণ করে চা বিক্রয়ের ফলে আমার সৃজনশীলতার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি। দর্শকেরা নাটকটিকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। তাদের কাছে নাটকটি জনপ্রিয় হয়।

আমি পূর্ব দিল্লির শাকারপুর এলাকাতে আমার স্ত্রী রেখা এবং আমার দুই ছেলে হিতেশ ও পরেশকে নিয়ে ভাড়া করা ফ্লাটে বসবাস করি। আমার বড় ছেলে হিতেশ চার্টার্ড একাউটেন্সিতে পড়ছে, আর ছোট ছেলে পরেশ পড়ছে এমবিএ। আমি আমার স্ত্রী প্রতি খুবই খুশি। আমি সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। আমার আশা আছে যে আমার বইগুলো থেকে একদিন আমি প্রচুর আয় করতে পারব। তখন আমি চা বিক্রি বন্ধ করে সার্বক্ষণিক ভাবে লেখালেখির সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে পারব। সেদিন আর খুব বেশি দূরে নয়।




অনুবাদক পরচিতি
মনোজিৎকুমার দাস

লাঙ্গলবাঁধ। শ্রীপুর। মাগুরা। 

গল্পকার, প্রবন্ধকার। অনুবাদক।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন