বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

ধারাবাহিক উপন্যাস : সখী রঙ্গমালা--দ্বিতীয় পর্ব

[সখী রঙ্গমালার পশ্চাদভূমি নোয়াখালী অঞ্চলের পালাগান ‘চৌধুরীর লড়াই’। সমতটের নামা-অনামা বহু কবি এ প্রেম ও সমরভিত্তিক গীত গেয়ে গেছেন যুগ যুগ ধরে। নিখাদ জনপ্রিয়তাই ছিল এর মূল চাবিকাঠি। বিপত্তিটা বাধে আমজনতার মহফিল ছেড়ে এটি যখন ছাপাখানা থেকে পুস্তকাকারে বেরোয়, তখন। তত দিনে ব্রিটিশরাজের অশ্লীলতা-নিরোধক ১৮৫৬ সালের ১৪ নম্বর আইন জারি হয়ে গেছে। এ দণ্ডবিধির কোপে পড়ে পালাগানের এক গ্রন্থকর্তা ও প্রকাশককে চল্লিশ চল্লিশ আশি টাকা জরিমানা দিয়ে বেরিয়ে আসতে হয়। পুস্তকের যাবতীয় কপি বাজেয়াপ্ত করে পুলিশ। এর প্রায় ত্রিশ বছর পর, ভিন্ন সূত্র থেকে সংগৃহীত পালাগানটি ড. দীনেশচন্দ্র সেন পূর্ববঙ্গ গীতিকায় সংকলিত করেন।
তা ছাড়া চৌধুরীর লড়াই কবি-কল্পিত শুদ্ধ পালাগান নয়, খ্রিষ্টীয় অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধের তৎকালীন ভুলুয়ার একটি ঐতিহাসিক ঘটনা, যা নোয়াখালী গেজেটিয়ার-এর কাগজের পাত ছাড়াও মানুষের কহন-কথায়, কিংবদন্তির গল্পগাছায় পল্লবিত হয়ে আছে।

এ সমস্ত প্রাপ্ত-অপ্রাপ্ত-বাজেয়াপ্ত সবকিছুর কাছেই ‘সখী রঙ্গমালা’ অশেষ ঋণী।- লেখক]

২.

মাত্র বছর খানেক আগে, ফুলেশ্বরী রাই তখনো পাগল খেতাব পায় নাই, মস্ত বড় নিমক কারবারির মেয়ে হিসেবে তার খুব নামডাক। স্বামী পায়ে ঠেললেও রাজবাড়িতে খাতির-যত্নের অনটন ছিল না। সে সময় একদিন রাই স্বপ্ন দেখে, ধোঁয়ার কুন্ডলীতে কেঁপে কেঁপে ঘুরছে একটি পঞ্চপ্রদীপ। আশপাশে পূজামন্ডপ বা পুরোহিতের চিহ্নমাত্র নেই। ঢোলের বাদ্য, ঘণ্টাধ্বনিও শোনা যাচ্ছে না। ঘুম ভাঙার পরও স্বপ্নটা কুয়াশার মতো চোখের পাতায় জড়িয়ে থাকে ফুলেশ্বরীর। সে দেখে, আচমকা ধোঁয়া ভেদ করে আলোটা থামে দুর্গামায়ের সোনার মুকুটে। ওতে একদন্ড জিরোয়। ফের কেঁপে কেঁপে তা মিলিয়ে যায়। আবার দূরাগত আলোর মতো ফিরে আসে পঞ্চশিখা। তা ধরা দেয় না, পুরোপুরি বিলীনও হয়ে যায় না। যেন দূর থেকে গোপন কিছুর ইঙ্গিত দিয়ে বারবার সরে যাচ্ছে। রাই ব্যাকুল হয়ে একে অনুসরণ করে। এবার আর অপেক্ষা করতে হয় না। সোনার মুকুট ছুঁয়ে কালো কালো আঙুর-থোকার মতো চাঁচর কেশের ধার ঘেঁষে আগুনের লকলকে জিব স্পর্শ করে দ্যুতি ছড়ানো কানপাশায়। দুর্গাপ্রতিমার অব্যক্ত রূপ ধোঁয়ায় মিলিয়ে যাবার আগেই বিছানায় ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে রাই।

ভোরের আবছা আলোয় ফুলেশ্বরীর চোখ যায় চন্দনকাঠের সিন্দুকের দিকে, যার খোলা তালা আংটা থেকে কাত হয়ে ঝুলছে। চাবির গোছা আঁচলেই বাঁধা। হাঁটার ছন্দে পিঠের ওপর ঝনঝনিয়ে বাজে। রাইয়ের দেহে যেন অসুর ভর করেছে - সে এক হাতে সিন্দুকের ডালা তুলে আরেক হাতে কাঠের আড়া লাগায়। কর্পূরের গন্ধে ঘর ভরে যায়, আর গোপন কোটর থেকে বেরোয় লাল মখমলের পেল্লাই সাইজের জেওরের বটুয়া। এর আধাটাক খালি। কমে কমে ওজনেও যে হালকা হয়ে গেছে, তা সে গ্রাহ্য করে না। যেন সাত রাজার ধন, বুকে চেপে পালঙ্ক পর্যন্ত বয়ে আনে। তারপর বটুয়ার সোনালি সুতলির ফাঁস খুলে গয়নাগুলি বিছানায় ঢালে।

হীরার কানপাশা গায়েব। আর কী কী খোয়া গেছে, সেদিকে দৃকপাত না করে রাই নেড়েচেড়ে সেই পাশা জোড়াই খোঁজে, যা খানিক আগে পঞ্চপ্রদীপের আলোয় ঝলকে উঠেছিল।

তাজ্জব ব্যাপার! ঘুমের মধ্যে তার এত বড় সর্বনাশ হয়ে গেল! বছরে দু-চারবার পূজা-পার্বণেই শুধু, বাকি সময় রাজবাড়ির বউ-ঝিদের সাজসজ্জার রেওয়াজ নাই বলে ঘরের সিন্দুকও খোলা হয় না। আটপৌরে গয়নাগাঁটিতেই চলে। কবে কানপাশা জোড়া চুরি হয়েছে কে জানে। ফুলেশ্বরীর ছোট্ট বুকটা যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে ওঠে। পাশা জোড়া যে তার মরা-মায়ের, রাজচন্দ্রের তো তা অজানা নয়! তার পরও হাতাবে? এ হয় কখনো! রাইয়ের বুড়ি ঠাকুরমা বলতেন - সন্দেহ করলে পয়লা নিজের আঁখি দুটিকেই করতে হয়। ঠাকুরমা আজ নেই। কিন্তু মানুষ না থাকলেও তার কথা থাকে। জেওরের বটুয়া থুয়ে উঠে দাঁড়ায় ফুলেশ্বরী। চকমকি ঠুকে মোমবাত্তি ধরায়। ঘরের সব কটা বাতিদানে একে একে আলো জ্বলে ওঠে। চোখ-ধাঁধানো রোশনিতে সূচ ফেলেও তোলা যাচ্ছে যখন, পাশা জোড়া হাতে পাক না-পাক, চোখ আর মনের বিরোধ তো ভঞ্জন হবে।

এবার গাছকোমর বেঁধে নামে ফুলেশ্বরী রাই। বার কতক সিন্দুকের জিনিসপত্তর উল্টেপাল্টে দেখে। প্রতিটা সুতা ধরে ধরে ছানে। বাকি থাকে শুধু মা সুমিত্রাকে ডেকে ছেলের নামে নালিশ করা। কিন্তু ডেকে এনে কি বলবে - হীরার কানপাশা সিন্দুক থেকে খোয়াব হয়ে গেছে? এটি এখন দুর্গাদেবীর দখলে? ভোররাতের স্বপ্নটা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়ার হিম্মত নেই ফুলেশ্বরীর। তা বলে সে তা বিশ্বাসও করে না। জেওর কে কোথায় পাচার করে, সিন্দুকের চাবি সামলানোর কথা শাশুড়ির পইপই করে বলার আগে সে নিজেই টের পেয়েছে। রাজচন্দ্রের ভয়ে রা করেনি। তবে এবার কিনা মরা-মায়ের স্মৃতি ধরে টানাটানি! মেয়ের আঁতে জবর ঘা দিয়েছে পাষন্ডটা। পাশা জোড়া এখন যার কানে, সে দেবী কি ডাইনি হোক, রাইয়ের তাকে একবার চোখের দেখা দেখন চাই।



‘হীরা, নরবাড়ি যা’নের হঁথ চিনস নি?’ ফুলেশ্বরীর শান্ত স্বরে কেঁপে ওঠে হীরা দাসী। দিন শুরু না হতেই একি আলামত! সে তখন কাঁসার বাটি হাতে ময়নার দাঁড়ের সামনে, পাখির মুখে সোহাগ করে ছোলা তুলে দিচ্ছিল। রাইয়ের কথা শুনে হাত ফসকে ছোলাসমেত বাটিটা মাটিতে পড়ে যায়। নিমেষেই তুলকালাম কান্ড। কাকের ঝাঁক কা কা করে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ওদিকে মুখের গ্রাস বেহাত হতে কালাচান ময়না রেগে আগুন। ‘বান্ডি বান্ডি’ বলে গাল দেয় হীরা দাসীকে। ময়নার মুখে নিজের শেখানো বুলি রাইয়ের আজ বরদাস্ত হয় না। সে কালাচানকে দাঁড় থেকে তুলে বকুলতলার বাঁধানো বেদিতে গিয়ে বসে।

কাকের সঙ্গে কাড়াকাড়ি করে মাটি থেকে ছোলা তুলছে হীরা দাসী। রাই সেদিকে কটমটিয়ে তাকায়। ‘ছোলা টোগানি খেমা দে মাগি,’ আচমকা ধমকে ওঠে ফুলেশ্বরী, ‘নরবাড়ির হঁথ চিনস না তুই? কতা কস্ না কিল্লাই?’

মুখে কথা না বললেও হীরা ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে ধপাস করে বসে পড়ে রাইয়ের পায়ের কাছটায়। চাতক পাখির মতো মুখ তোলে সে। ফুলেশ্বরীর মরাল গ্রীবা টান টান, দৃষ্টি দূরে - পাখির বাদাম ছাড়িয়ে পদ্মফোটা ডোবার ওপারে, যেখানে ডজন খানেক একঠেঙে বক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ধ্যান করছে। এই কদিনে বালিকাবধূর বয়স বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। চোখের নিচে কালির দলা, মুখের ভাঁজে ভাঁজে বঞ্চনার নীল ছোপ। ভগবান, ফুল না ফুটতে কার শাপে অকালে ঝরে!

হীরা তো কেনা বান্দি - হুকুমের দাস। তবু ফুলেশ্বরীর বাবা কালীচরণ গুহর দ্বারে মাথা কুটতে বাকি রাখে নাই, ‘এ বিয়া দিয়েন না, দিয়েন না। আমনে কি কানে তুলা ভরি থুইছেন? ভালা-বুরা হুনেন ন! আঁই এক্কান কতা কই - মাইয়্যাগারে কাডি গাঙ্গে ভাঁসাই দ্যান।’

ছোট মুখে বড় কথা! হীরার গালে ঠোনা মেরে কাছা দুলিয়ে বারবাড়ির দিকে হাঁটা দেন কালীচরণ। তিনি ভগবানের অশেষ কৃপায় নিমকের সামান্য কর্মচারী থেকে তুরমানে মস্ত বড় কারবারি হয়েছেন। এরই মধ্যে জমিদারি খরিদ করা হয়ে গেছে। জাতে ওঠা তখনো বাকি। সে পথও খুলে গেল সিন্ধুরকাইত চৌধুরীবাড়িতে মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধটা আসায়। এ কোনোক্রমে যেন বেহাত না হয়, কালীচরণ গুহ জান কবুল করে বসেন। সেই সঙ্গে দেদার টাকা খরচ। পাত্র কেমন, কী বৃত্তান্ত - এ সমস্ত তত্ত্বতালাশ বাহুল্য হয়ে পড়ে। বিয়ে-ভাঙচি দেয়ার লোকজনও মান খুইয়ে ফিরে যায়। এতে লাভ হয় পাত্রপক্ষের। যত বড় খান্দানই হোক, ছেলে আদতে ধর্মের ষাঁড় - গলায় দড়ি পরানোর জন্য চৌধুরীদের যেমন-তেমন একটা বউ দরকার ছিল। সেই বউয়ের সঙ্গে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা আর মালামাল-বোঝাই গরুর গাড়ির লম্বা বহর! সেদিন লামচরের নিমক কারবারির বাড়াবাড়িতে বাবুপুরারা যে মুচকি হেসেছিল, তা চিকের ফাঁক দিয়ে হীরার নিজের চোখেই দেখা।

হীরা দাসী তখন ফুলেশ্বরীর তাঞ্জামে। মেয়েটা জেওরের ভারে বসে থাকতে পারছে না, বারবার তার গায়ের ওপর ঢলে পড়ছে। চোখেমুখে একরাজ্যের বিভীষিকা। হীরা আর পাখির বাদাম সঙ্গে যাচ্ছে শুনে লাফিয়ে পালকিতে উঠলেও পেছনে বাপের বাড়ির নিশানা মুছে যেতে কান্না জুড়ে দেয়। পথে কনের তাঞ্জাম থামানোর জো নাই। কাহার-বরকন্দাজ সবই অচেনা। অচেনা পথঘাট। বারো ঘাটের জল খাওয়া হীরা দাসীরও কখনো এ মুল্লুকে পা পড়ে নাই। চরের বাতাস গায়ে মেখে, নদীর কূলে কূলে বড় হয়েছে সে। লামচর ছেড়ে যেতে হীরার মনটাও থেকে থেকে কেঁদে উঠছে -

যমুনাপুলিনে বসে কান্দে রাধা বিনোদিনী।

আজ কেন গো শুনি না বংশীধ্বনি ॥

একে শ্যামচাঁদের ব্যথা।

আরও লোকের নানা কথা ॥

মনে লয় পাষাণে দিব মাথা, ওগো প্রাণসজনী।

যমুনাপুলিনে বসে কান্দে রাধা বিনোদিনী ॥

ফুলেশ্বরী ঘুমিয়ে পড়েছিল। বাবুপুর পরগনায় তাঞ্জাম ঢুকতে মানুষের ঢল নামে। চিকের ফাঁক দিয়ে নতুন বউ দেখার চেয়ে গরুর গাড়ির লম্বা বহরেই তারা আমোদ পায় বেশি। লাঠিসোঁটা, বন্দুক, তলোয়ার বাগিয়ে আগে-পিছে ছোটাছুটি করেও পাইক-বরকন্দাজরা ভিড় সামাল দিতে পারছে না। রাই আতঙ্কে জাপটে ধরে হীরা দাসীকে। পাকা ধানখেতের দিগন্তে তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। তার সোনা-ছোঁয়া রক্তিম ছটায় আলপথে জেগে উঠছে পিঁপড়ার মতো মানুষের আঁকাবাঁকা লম্বা সারি। সবাই ছুটছে রাজবাড়ির দিকে।

শাশুড়িমা সুমিত্রাকে একনজর দেখেই হীরার বুক থেকে পাষাণ নামে। স্বামী যেমনই হোক, মা-মরা মেয়েটা নতুন করে মায়ের কোল পেল। মাটিতে থুলে সাপে কাটবে, জলে নামালে কুম্ভীরে কামড়াবে - নম নম করে পুত্রবধূকে বড় করেন তিনি। বউও বাপের বাড়ির মতো পাখপক্ষীর নাওয়া-খাওয়া, বিয়েথা নিয়ে মেতে থাকে। আজ দোয়েলের তো কাল বাজপাখির বা টিয়ার। রঙিন ফুল-পাতা দিয়ে খাঁচার বাহারি সাজ, পাখিতে পাখিতে মালাবদল, মিষ্টিমুখ - বাদামে বিয়ের উৎসব আর শেষ হতে চায় না। তাতে বাগড়া দিলে শাশুড়ির সঙ্গে বউ ঝুলাঝুলি করে, নয়তো গোসসা করে গাছে উঠে যায়। থালায় দুধ-ভাত মেখে নিচ থেকে কাকুতি-মিনতি করেন মা সুমিত্রা। ওদিকে রাই তরতরিয়ে উঠে পড়ে গাছের মগডালে। ডাল-পাতায় লুকিয়ে পাখির গলায় গান গায়। দিন যায়, মাস যায়, বছর ঘোরে। ঋতুস্রাব হওয়ার পর বাধে গন্ডগোল। বউয়ের মতি ফেরাতে পারেন না শাশুড়িমা। রাতে ছেলের ঘরে এক দুয়ার দিয়ে ঢুকিয়ে দেন তো বউ আরেক দুয়ার ঠেলে বেরিয়ে আসে। অগত্যা দরজায় পাহারা বসানো হলো। তখন রাজচন্দ্রের পায়ের আওয়াজ শুনে বিছানা থেকে সরতে সরতে রাই ধাক্কা খেত যে ঠান্ডা দেয়ালে, তাতে ঠোঁট চেপে ফিসফিসিয়ে বলত, ‘দেওয়াল, তুই গাছ অই যা। আঁই তোর উঁচা ডালে উডি বৈ থাইক্কুম।’ এভাবে আর কত দিন! মরদের জোয়ানকির জোয়ারের মুখে এমন আরজি খড়-কুটার মতো ভেসে যায়। এক বিহানে আলুথালু বেশে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে ফুলেশ্বরী। হীরাকে সঙ্গে লয়ে বাজের ঘরের পাশ থেকে পায়রার খাঁচাগুলি সরিয়ে নেয়। কী অদ্ভুত কান্ড! হীরা তাজ্জব হয়ে ভাবে - এতকাল তাবিজ-কবচ, তেলপড়ায় কিছু হলো না, যেই নরবাড়িতে সোয়ামির রাত কাটানোর সম্বাদ পেয়েছে, অমনি ভাতের ফ্যানের মতো পিরিত উথলে উঠছে! তাও সময়মতো হলে কিছু হয়তো করা যেত। রাজচন্দ্র ডুবে ডুবে জল খাচ্ছে, সেও প্রায় দেড়-দু বছর। যখন তামাম মুল্লুকের লোকের তা হজম করা সারা, তখন টনক নড়েছে মুখপুড়ীর। এখন ঠ্যালা সামলাবে কে?

ডোবার ধারের বকগুলি কখন মাছ খেয়ে উড়ে গেছে। ফুলেশ্বরী গোঁ ছাড়ে না, আগের জায়গায় একঠায় বসে হীরা দাসীকে তাড়া দিচ্ছে, ‘আইজ রাইতই আঁই নরবাইত যাইয়্যুম। তুই জান দি বন্দোবস্ত কর।’

পেছনে কার পায়ের তলায় পাতা ভাঙার মচমচ আওয়াজ! তড়াক করে ঘুরে তাকায় হীরা দাসী। রঙ্গনের ঝোপে মেজো ঠাকুরানির খাসবান্দি ক্ষান্তমণি ওত পেতে বসে থাকলে আজ আর রক্ষা নাই। মাগি কুচুটে স্বভাবের, তায় পেট পাতলা। কথাটা তুলার আগে বাতাসে ছড়িয়ে পড়বে। ফুলেশ্বরী তো সোনার ডিম-পাড়া হাঁস, গর্দানে খাঁড়ার কোপ পড়বে সাত কুলে যার কেউ নাই - সেই হীরা দাসীর। ঝোপের ভেতর ক্ষান্তমণি কি টেপি দাসী যে-ই থাক, হীরা তাদের ধাপ্পা দিতে গল্প ফাঁদে, নিজের জীবনের গল্প, দেও-দৈত্যের বদলে যা শুনিয়ে শিশুকালে ফুলেশ্বরীকে সে ঘুম পাড়াত - ‘আঁর দিদিমারে হার্মাইদ্যারা যে সোময় ধইচ্ছে গো দিদিমণি...’

‘রাক তোর হার্মাদ! আঁই হার্মাইদ্যা বেগ্গুনের গুষ্টি কিলাই, গুষ্টি কিলাই।’ ময়নাকে ছেড়ে দিয়ে শানের বেদিতে গুমগুম কিল মারে ফুলেশ্বরী।

কার ওপর দাদ তুলছে মাগি! পারলে নিজের পোড়াকপাল বাড়ি মেরে ভাঙে না কেন? ‘আইজ রাইতই’ বেদিতে জোরে কিল বসিয়ে রাই যেন তূণ থেকে শেষ বাণ ছোড়ে, ‘আঁর নরের বাইত যাওন চাইই চাই। হেতি দুর্গামায়ের ভেইক ধইচ্ছে।’

কে কীভাবে দুর্গাঠাকুরের ভেক ধরল, হীরার তা জানার কথা নয়। তবে সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে, যখন দেখে ফুলেশ্বরীর চোটপাটে রঙ্গনের ঝোপ থেকে ক্ষান্তমণি না, একটা খরগোশের বাচ্চা দৌড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। বাচ্চাটা কিছু দূর গিয়ে অবাক চোখে ফিরে তাকায়। কাছ থেকে মানুষ দেখা মনে হয় ওর এই প্রথম। তারপর কী মনে করে খিড়কি-দুয়ার দিয়ে সরসরিয়ে ভেগেও যায়।

খানিক বাদে সে-পথে ঢোকেন মা সুমিত্রা। তিনি মহলের পেছনের পুকুরে নেয়ে ভেজা কাপড়ে ঘরে ফিরছেন। এখন আর বউমাকে সকাল সকাল স্নান-সন্ধ্যার তাড়া দেন না। দেয়ার মুখ নাই মা জননীর। ছেলের লুচ্চামির চোটে মায়ের মুখের ধার কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের মতো দিন দিন ক্ষয়ে যাচ্ছে। শরীরের অবস্থাও তথৈবচ। উপবাসে উপবাসে তা ক্ষীণতর হচ্ছে। তিনি যেন ঝরা-পাতা - বাতাসে উড়ে উড়ে গাছের ফাঁক দিয়ে মিলিয়ে যান। এখন যে কাপড় ছেড়ে ঠাকুরঘরে ঢুকবেন, পেটে টান না পড়লে বেরোনোর নাম করবেন না। মা সুমিত্রা বিধবা মানুষ, স্বপাকে খান। এর কুটনা-বাটনাও করেন নিজ হাতে। সেই মহাযজ্ঞ শেষ হতে হতে বেলা দুপুর। ততক্ষণ রাইকে সামলাবে কে? সে কি নাওয়া-খাওয়া থুয়ে শানের বেদিতে বসে থাকবে? তা চেয়ে চেয়ে দেখবে হীরা দাসী? নাকি কাউকে ভূতে ধরলে ওঝা ডাকাই দস্তুর!

হীরা বলে, ‘দিদিমণি, বুধা হাগলা নানা দ্যাশ ঘুরি-হিরি গেরামে আইছে। হেতার তন্ সিন্দুর-হড়া আনি দিতাম নি?’ বুধা ওঝার স্বামী বশীকরণের অব্যর্থ দাওয়াই সিন্দুরপড়া - ‘আমার এ সিন্দুর-পড়া যদি লঙ্ঘন হয়/মহাশ্বরের জটা খসি উমা পদে পড়য়’।

হীরা দাসীর ভালো কথায় বুরা ফল হয়। ‘হা-ভাতারি, তুই কোয়াল-ভরি সিন্দুর দে, এই ধর,’ ফুলেশ্বরী নিজের বাজু থেকে চাঁদির বাঁধানো তাবিজখানা খুলে হীরার গায়ে ছুড়ে মারে, ‘তাবিজ ধুই জল খা, যাহ্।’

এমন পাক-পবিত্র জিনিস নিয়ে রং-তামাশা! হীরা দাসী ব্যস্ত হয়ে পড়ে - বুধার সিন্দুরপড়ায় আর কাজ নেই। হাতের তাবিজ জায়গারটা জায়গায় সত্বর ফেরত যাওয়া চাই। নইলে অকল্যাণ হবে।

ততক্ষণে ফুলেশ্বরী তিলাবাজের খাঁচায় ঢুকে দোর তুলে দিয়েছে। এমন দুর্ধর্ষ শিকারি, খাঁচায় থেকে থেকে নিস্তেজ হয়ে গেছে। আফিমখোরের মতো বিহানেও বসে ঝিমায়। রাই খোঁচা দিয়ে দিয়ে বাজটাকে জাগায়। তবে আঘাতে পাখিটা বিশেষ গা করে না, দাঁড়ের ওপর সরে সরে বসে। সকাল সকাল একি উৎপাত! তা আবার যার করার নয়, সে করছে! তাবিজ হাতে হীরাই বা কাঁহাতক দাঁড়িয়ে থাকবে খাঁচার বাইরে। খাঁচার দুয়ার তুলে দেয়াটা রাইয়ের চালাকি। বাইরে থেকে শত কাকুতি-মিনতিতেও কাজ হয় না। ফুলেশ্বরীকে নরবাড়ি লয়ে যাওয়ার কড়াল করে তবে তাবিজের ভারমুক্ত হয় হীরা দাসী। রাই একগাদা ধূসর লোম ঝরিয়ে বাজের খাঁচা ছেড়ে বাইরে আসে।

দাসীর ওপর গুরুদায়িত্ব চাপিয়ে ফুলেশ্বরী খালাস - দোলনায় দোল খেতে খেতে পাখির গলায় গান গাইছে। যেন আত্মারাম নরের বাড়িতে রাজচন্দ্রের বদলি আজ তার নেমন্তন্ন, সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে প্যাঁচা-হাড়গিলাসহ তামাম পোষা পক্ষী। খাঁচায় বসে এদের লম্বা উড়ালের সুযোগ নাই। তাই লম্ফঝম্ফ দিয়ে উল্লাস করছে। জমিদারবাড়ির মেয়েছেলের মতো পাখির জাতটাও বড় স্বার্থপর!

দমে দমে হীরা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। দুপুরে মুখে খাবার রোচে না। বেলা গড়াতেই নরবাড়ি যাওয়ার আঞ্জাম শুরু হয়।

প্রথমে মা সুমিত্রার ঘর। তিনি এককথায় স্বামীর কালের বজরার মাঝি করিম শেখের বাড়ি যাওয়া মঞ্জুর করেন, যখন শোনেন, রাইয়ের জন্য তেলপড়া আনতে হীরাকে মিরান শাহর মাজারে একবার যেতে হবে, তার জন্য গা ঢাকার একখান বোরকা চাই।

কথাটা করিম শেখের মেয়ে আয়নাও বিশ্বাস করে। তবে হীরার তাড়াহুড়া সে গ্রাহ্য করে না। কোলের বাচ্চাকে মাটিতে নামিয়ে বোরকার বদলে পান সাজতে ঘরে যায়। বাচ্চাটা কাঁচা উঠানে হামা দিয়ে হাতের কাছে যা পায়, তা-ই খায়। জন্মাবধি এ ছেলে বাপের মুখ দেখে নাই। আয়নার পোয়াতি-দশায় স্বামী আদম আলী সওদাগরি নাওয়ের টেন্ডল হয়ে সাগরে ভাসে। তখনই মেয়েটার কপাল পোড়ে। বাণিজ্য শেষে ডঙ্কা বাজিয়ে আর সব লোক ফিরে এলেও আদম আলীর দেখা নেই। বন্দরে এক কুহকিনীর ফাঁদে পড়ে রয়ে যায়। সুধারামের সুদর্শন মরদদের বেলায় এ আর নতুন কি! খানিক তত্ত্বতালাশ করে করিম শেখও হাল ছেড়ে দেয়। সেই থেকে আয়না বাপের বাড়ি। তার ছেলে নজর আলী ওরফে নজু মিয়া মাটি খাবে না তো চাঁদির বাটি আর সোনার চামচে দুধ খেয়ে বড় হবে! হীরার বারণ সত্ত্বেও বাচ্চাটাকে উঠানে চরতে দিয়ে পানের বাটা নিয়ে জাঁকিয়ে বসে আয়না বিবি।

রাজবাড়ির দাসীর মুখে রাজচন্দ্র-রঙ্গমালার কেচ্ছা শোনার সোয়াদই আলাদা। দুধের বাচ্চাও মায়ের মাই খেতে ভুলে যায়, আর আয়না তো স্বামীহারা ভরযুবতী। মেয়েটার আবদার হীরার আজ বিষ বিষ লাগে। যতবার আঁচল ধরে তাকে জলচৌকিতে বসায়, হীরা ততবার ছিলা-ছেঁড়া ধনুকের মতো সোজা দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু বোরকা না নিয়ে বাড়ি ফেরার ফায়দা কী।

‘নরিনীর সাবাস কত!’ পানে চুন ঘষতে ঘষতে আয়না মাথা ঝাঁকায়, ‘আঁই ছোডোকাল তন্ দেয়ি, চন্দ্র দাদা টাঙন দাবড়ায়। রাইত-দিন আতে বন্দুক লই ট’ল মাইত্যো। আল্লাহ্র কিরা, হেমুইক্কা কোনো সোময় চোক তুলি চাই ন।’ অন্যদিন হলে হীরা এ নিয়ে ঠাট্টা করত, আয়নার মেচেতা-ভরা গাল দুটি টিপে দিয়ে বলত - ‘চা’লি না কিল্লাই? তুই কি রঙ্গমালার তন্ কম সোন্দর নি!’

হীরার আজ তবিয়ত ঠিক নাই। আয়নার মা ছমিরন বিবি যে বারবার সারসের মতো গলা বাড়িয়ে রসুইঘর থেকে তাকে ইশারায় ডাকছে, তা বুঝেও না বোঝার ভান করে সে। মহিলার অবস্থা বেগতিক। এক হাতে চুলার আগুনে ধানের নাড়া ঠেলছে, আরেক হাতে লোহার খুন্তি। তেল-মসলায় পেঁয়াজকুচি ভুনা হলে হাঁসের সিদ্ধ ডিম কয়টা কড়াইয়ে ছেড়ে দিতে হবে। তার মধ্যে মাথার লম্বা একখান চুল সামনে টেনে ধরে, তা দিয়ে ডিমগুলি একে একে দুফালি করে কাটে ছমিরন বিবি। হীরা মুখ কুঁচকে চোখ ফিরিয়ে নেয়। এ বাড়ির ব্যতিক্রম করিম শেখের বোবা মেয়ে আমেনা। তার ড্যাবা-ড্যাবা চোখ দুটি কেমন যেন উদাস উদাস। অথচ কাজকামে বিরাম নাই। হাঁস-মুরগি খোঁয়াড়ে তুলে এখন মাটির দাওয়ায় উবু হয়ে বসেছে, বাঁশের চোঙা দিয়ে কুপিতে পুঁটি মাছের তেল ভরবে। ঘরে চেরাগ দেয়ার সময় হয়ে গেল, শেখবাড়ি থেকে হীরা ছাড়া পাবে কখন? ওদিকে গলাকাটা মুরগির মতো চুলার ধারে তড়পাচ্ছে ছমিরন বিবি। রঙ্গমালার গিবত না শুনলেই নয়। বোরকা হাতে হীরাকে চলে যেতে দেখে সে রসুইয়ের দুয়ারে দাঁড়িয়ে চ্যাঁচায় - ‘হীরা, তেল-হড়া লই যাওনের হঁথে দেআ করি যাইস। আঁই দোয়া হড়ি হুমাই দিয়্যুম।’ মহিলার মাথায় একটু-আধটু ছিট আছে, তা না হলে খোদার ওপর খোদকারি করে!

রাস্তায় নেমে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে হীরা দাসী। আয়নার স্বভাবটা লতার মতো, কেমন বেড় দিয়ে দিয়ে ধরে। বাচ্চাটা মুখে কেঁচো না পুরলে এত সহজে শেখবাড়ি থেকে ছাড়া পেত না সে। ওদিকে মাগরিবের আজান পড়ে গেছে, করিম শেখ যে এখনো বাড়ি ফিরে নাই - এ তার কপাল-জোর। লোকটার এলেম জবর। মানুষের গোপন খবর তো ছার, জেরা করে করে পেটের নাড়িভুঁড়ি বাইরে নিয়ে আসে। রাইয়ের খাসবান্দি বলে হীরাকেও সে রেয়াত করত না। আড়াল থেকে ঠারেঠোরে বাতচিত করে ঠিকই ওর পেটের কথা বের করত। এমন লোক মাঝি না হয়ে কাজি হলে চৌধুরীদের উপকার হতো বেশি।


গহিন রাতে ফুলেশ্বরীকে লয়ে রাজবাড়ির খিড়কি-দুয়ার দিয়ে বেরোয় হীরা দাসী। ওরা পুকুরপাড় পর্যন্ত যেতে পারেনি, পায়ে কাঁটা বিঁধে ফুলেশ্বরীর। ছোট্ট মান্দারের কাঁটা। তবু যাত্রারম্ভে এ অশুভ লক্ষণ বৈকি। হীরা বাড়ি ঢুকে কাপড়ের তলায় এক জোড়া চটি গুঁজে ফের রওনা দেয়।

চীনা চটি পায়ে চটর-চটর করে হাঁটছে রাই। গায়ে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত লম্বা কালো বোরকা। এর চোখের কাছে দুটি ছিদ্র রয়েছে দেখে দেখে পথ চলার। হীরা নিজেও ঘটা করে দিয়েছে মুসলমানি সাজ। হাত-ভরা কাচের চুড়ি, নাকে মস্ত বড় নথ, কপাল আধখান ঢেকে মাথায় খিলি ঘোমটা। একে অপরকে চিনতে পারছে না ওরা। বাকিটা ভগবানের হাতে।

নরবাড়ির পুকুরপাড়ের বাঁশঝাড়ের নিচে ফুলেশ্বরী গা ঢাকা দিয়ে দাঁড়ায়। পুকুরের মধ্যিখানে জলটুঙ্গি। সেখানে ঝাড়বাতি জ্বেলে মচ্ছব চলছে। মহারাজ গালিচার ওপর তাকিয়ায় হেলান দিয়ে গড়গড়া টানছেন। সামনের রেকাবিতে সোনালি-রুপালি তবক দেয়া পানের খিলি। সুরাই-চিলমচি হাতে জলটুঙ্গির এমাথা-ওমাথা ছোটাছুটি করছে দুর্গা দাসী। পথেঘাটে এমন খিদমতগার থাকতে মহারাজ ঘরে ফিরবেন কেন!

হঠাৎ দম আটকে আসে ফুলেশ্বরীর। রঙ্গমালার আবির্ভাবে জলের মৃদু তরঙ্গে চাঁদের আলোর ঝিকিমিকি - এ নারী, না অপ্সরী? পরনে সোনার কামদার শুভ্র মসলিন শাড়ি। সাদা কাঁচুলির আগাগোড়া জরির কাজ। গা-ভরা অলংকার - উঠতে-বসতে ঝমঝমিয়ে বাজছে। ফুলেশ্বরী রাই ভোররাতের স্বপ্নটার মতো এবারও রঙ্গমালার মুখ দেখার কসরত করে। কানে দ্যুতি-ছড়ানো কানপাশা না ঝুমকা, তা ঠাহর করা যাচ্ছে না। মাথায় মুকুট নেই, তবে কালো কোঁকড়া চুলে ঝাঁপটার বেড়া, তার ওপর একটুখানি ঘোমটা টানা। রাজচন্দ্রের ফুরসির কুন্ডলাকার ধোঁয়ার ফাঁক দিয়ে রঙ্গমালার মুখের যে ভগ্নাংশ দেখা যায়, তা স্বপ্নটার মতো না-দেখার খেদ আরও বাড়িয়ে তোলে। আচমকা রাইয়ের মনে হয়, সে আসলে জলের বুকে রঙ্গমালার প্রতিবিম্বই দেখছে, আসল রঙ্গিকে নয়। যা স্বপ্নে দেখা দুর্গাপ্রতিমার অব্যক্ত রূপের মতোই সুদূরপরাহত। তা ছাড়া রাজচন্দ্রকে কি চিনতে পারছে রাই? এমন খোশমেজাজ, কোমল চাহনি আর যার হোক রাইয়ের গুন্ডা স্বামীর হতে পারে না। এ অচেনা লোকটার পেছন পেছন এত দূর আসাটাই বোকামি হয়েছে।

এখানে আর একদন্ডও দাঁড়াতে ইচ্ছা করে না ফুলেশ্বরীর। তাড়াহুড়ায় বাঁশঝাড় থেকে বেরোতে গিয়ে বোরকার ঝুল কঞ্চিতে গেঁথে যায়। তা ছাড়াতে গিয়ে পেছন ফিরতেই রাইয়ের চক্ষুস্থির। রঙ্গমালা সুন্দরীকে পাঁজাকোলা করে রাজচন্দ্র তখন জলটুঙ্গির ঘরে ঢুকছে। দুজনে হাসছে বাঁধভাঙা জলের মতো কলকলিয়ে। হাসতে হাসতে রঙ্গি না কোল থেকে পড়ে যায়! চোখ বন্ধ করে ফেলে ফুলেশ্বরী রাই। খোলে যখন, ততক্ষণে ঘরের দুয়ার লাগিয়ে বাতি নেভানো হয়ে গেছে। দরজার বাইরের ঝাড়বাতিটা যেন অনেকগুলি চক্ষুবিশিষ্ট পাহারাদার, যে উল্টে ঝুলে আছে। নিজেকে সত্যিকারের পরিত্যক্ত মনে হয় ফুলেশ্বরীর। বুকের ঢিপঢিপ শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ কানে পৌঁছায় না। দম নিতেও যখন কষ্ট হচ্ছে, তখন হীরার হাত ধরে সে নরবাড়ির পুকুরপাড় থেকে নেমে আসে।

সামনে জ্যোৎস্না-ভাসা তেপান্তরের মাঠ। বুক উথালপাতাল অথচ কারও মুখে কথা নেই। চক্ষের পলকে সব উল্টেপাল্টে গেছে। রাইয়ের হাতটা হীরার মুঠোর ভেতর ঠান্ডা হয়ে আসে। যে মেয়ে পাখির মতো চঞ্চল, হাসিখুশি, এ দন্ডে কী বলে তাকে সান্ত¡না দেবে হীরা দাসী? রঙ্গমালার রূপের আগুনে হীরার চোখ ঝলসে গেছে। মনও বিকল।

ভগবান হীরাকে যে রূপ দেন নাই, তা নয়। রঙ্গিকে ষোল আনা দিয়ে থাকলে তার ভাগ্যে কমসে কম দু আনা জুটেছে। মা যখন ওকে লামচর হাটে তোলে, তখন মেয়ের গায়ে গোশত না থাক, সমুদ্র-রঙা নীল চোখ আর লম্বা ঠ্যাং দুটির জন্য এক লহমায় দাম ওঠে পঞ্চাশ থেকে এক শ সিক্কা, যা দিয়ে কালীচরণ গুহ তাকে খরিদ করেন। তখনো ফুলেশ্বরীর জন্ম হয় নাই। ঘরে তিন বিবি থাকা সত্ত্বেও যখন-তখন কর্তার ঘরে ডাক পড়ত হীরা দাসীর। একদন্ড বিলম্বও সহ্য হতো না নুনের বেপারি কালীচরণ গুহর। খড়ম খটখটিয়ে দাসীমহলে চলে আসতেন। কর্তার নোনা গা চাটতে চাটতে হীরা কর্ত্রী হওয়ার খোয়াব দেখে। সে সময় মেজো জন বাচ্চা প্রসব করতে গিয়ে মারা গেলেন আর হীরারও কপাল ভাঙল। তারপর খাসমহলে বাস করার ছাড়পত্র সে পেল বটে, তবে কর্ত্রী হিসেবে নয়, মা-মরা ফুলেশ্বরীর লালন-পালনের জন্য। কর্তা ওর হাতে শিশুকন্যা ও মৃত স্ত্রীর পোষা পাখির ভার দিয়ে অন্যদিকে মুখ ফেরালেন। বাকি জীবন মুখে নোনতা স্বাদ বয়ে বেড়ানো ছাড়া পতি তো দূর অস্ত, হীরার উপপতি-ভজনাও আর হলো না। তা বলে রূপ জিনিসটা ফ্যালনা নয়। এর এপিঠ-ওপিঠ দুপিঠই আছে। শয্যায় না তুলে কালীচরণ গুহ তাকে নিমকের তাফালে খাটাতেন, যদি সে কুরূপা হতো।

এসব কথা ফুলেশ্বরী জানে ভাসা ভাসা। বড় হয়ে আঁচ করতে পারলেও কালীচরণ গুহর নিষেধ থাকায় মেয়েকে ভেঙে বলা হয়নি কখনো। দিদিমা যজ্ঞেশ্বরীর গল্পও সেটুকুই হীরা বলেছে, যা শুনে বাচ্চারা ভয়ে চোখ বুজে ঘুমিয়ে পড়ে। আজ আর গোপন করার কিছু নেই। আজ সেই মেয়েটিও ছোট বাচ্চাটি নেই। আজ সে নিজ পতিকে দেখেছে খানকি লয়ে শয্যায় যেতে। এ নিয়ে কিছু বলতে গেলে ধিকিধিকি অনলে ফুঁ দেয়া হবে। হীরা কথা হাতড়ে বেড়ায়। রূপসিং পাথারের দখিনা বায়ে ভেসে আসে পুরানা দিনের কত সুখ-দুঃখের কাহিনি। কানের কাছে নানান সুরে সে সব গুনগুন করে। তাতে রূপকথার সোনা-রুপার জিয়নকাঠির ছোঁয়া থাকলেও ‘বিয়ের পর রাজা-রানি সুখে-শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল’র মতো শেষ বলে কিছু নেই। এ দুকূল ছাপানো বহতা নদী।


আমতলায় ঝামুর-ঝুমুর কলাতলায় বিয়া।
আইলেন গো সোন্দরীর জামাই মুটুক মাথায় দিয়া ॥


পুরনারীদের কণ্ঠে উলুধ্বনি ওঠে, শাঁখ বাজে। ঢোলের বাজনা রাতের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে বহুদূর। অন্ধকারে নদীর বুক চিরে উল্টো দিক থেকে ছুটে আসছে কতগুলি কোশা আর জালিয়া নাও। দাঁড়ের ঘায়ে জল তোলপাড় হচ্ছে। ওখানে আর কোনো শব্দ নেই।

মগ-হার্মাদ জলদস্যুর কোশার বহর যখন ঘাটে লাগে, যজ্ঞেশ্বরী তখন ছাদনাতলায়। কুলীন ঘরের কন্যা, বিয়ের ফুল ফুটতেই অষ্টাদশী। হোমাগ্নি থেকে কনের রূপ জুদা করা যাচ্ছিল না। বর-কনের মালাবদল-শুভদৃষ্টি হয়ে গেছে। সম্প্রদান করবে, সবে গাঁটছড়া বাঁধা হয়েছে। তখনই গাঁয়ে হার্মাদ পড়ার রোল ওঠে। বিয়েবাড়ির শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি তাতে চাপা পড়ে যায়। বর বিয়ের পিঁড়ি থেকে লাফিয়ে উঠে জানবাজ ঘোটকের মতো দেয় দৌড়। তার উত্তরীর কোণে যজ্ঞেশ্বরীর শাড়ির আঁচল বাঁধা থাকায় সেও আছাড়ি-পিছাড়ি ছোটে। তাতে বরের পালানোয় ব্যাঘাত ঘটে। বাড়ির উঠানও পার হতে পারে নাই, গা থেকে উত্তরী খসিয়ে বর দৌড়ে এগিয়ে যায় আর বউ ধরা পড়ে হার্মাদের হাতে। অন্দরবাড়ির দরজার মুখে যজ্ঞেশ্বরীর বাবা গুলি খেয়ে কাতরাচ্ছেন। তখনো তাঁর জান কবজ হতে বাকি। এর মধ্যে একটা ঘোড়ামুখো লম্বামতন লোক, মাথায় লম্বা-চোখা টুপি, হীরার শিরায় যার রক্ত বইছে, সে যজ্ঞেশ্বরীকে থকথকে লহুর ওপর দিয়ে টানতে টানতে নদীর ঘাটে নিয়ে যায়। ঘাটে সারি সারি ছিপ নৌকা। তার একটা নিশানা করে লোকটা তাকে পাখির মতো বাতাসে ছোড়ে। যজ্ঞেশ্বরী উড়ে গিয়ে পড়ে নৌকার খোলের অন্ধকার গহ্বরে। গড়গড়িয়ে মাথার ওপর কাঠের পাল্লা নেমে আসে।

পালে হাওয়া লেগে চিল-উড়াল দেয় ঝাঁকে ঝাঁকে দস্যুর নাও। ছইয়ের ওপর বন্দুক হাতে মগ-হার্মাদরা পাহারা দিচ্ছে। নৌকার খোলে খোলে কান্নার রোল। কেউ কারও মুখ দেখতে পাচ্ছে না। সকলের হাতের তালু ফুটো করে তাতে সরু লম্বা বেত ঢুকিয়ে মালার মতো গাঁথা হয়েছে, যাতে পালাতে না পারে। রাত গিয়ে পরের দিনও শেষ হয়। অন্ন-জল বিনা সব এক জায়গায় পড়ে রয়েছে। ওপর থেকে ছিটিয়ে দেয়া মুঠো মুঠো শুকনা চাল পাটাতন থেকে কুড়িয়ে কেউ কেউ মুখে দিয়েছিল। যন্ত্রণা আর আতঙ্কে তা গলাতেই আটকে আছে। দরিয়ায় ভাসতে ভাসতে পরের রাতে নিরাপদ জায়গায় এসে সামুদ্রিক এক জাহাজের সঙ্গে নোঙর করে কোশাগুলি। সেই রাতে যজ্ঞেশ্বরী যে নৌকায়, এর খোলে লাফিয়ে নামে সেই হার্মাদ ডাকু। তাকে বেতের মালা থেকে খসিয়ে দড়ির মই বেয়ে জাহাজে ওঠায়। দরিয়ার বুকে সাজানো ঘর। যজ্ঞেশ্বরীর তখন অবাক হওয়ারও অবস্থা নেই। পিঠামতো লম্বা এক রকম খাবার এগিয়ে দিয়ে যজ্ঞেশ্বরীর বাপের দেশের ভাষায় হার্মাদ কলকলিয়ে ওঠে, ‘পাউরুটি খাও মাইয়্যা। হেইয়্যা বাদে মোর কোলের ধারে বও দিনি! মুই তোমারে এন্তার ভালোবাসি।’ পেটে তখন রাক্ষসের খিদা। যজ্ঞেশ্বরী পাউরুটিখানা দুই হাতে মুখের কাছে ধরে খেতে থাকলে তার বাম হাতের তালু থেকে নতুন করে রক্ত ঝরতে শুরু করে।

যজ্ঞেশ্বরীকে আর কোশায় ফেরত যেতে হয়নি। হার্মাদ ডাকু তার রূপে পাগল। রাশি রাশি চুল নাকে ধরে শুঁকে, আগুন-রঙা ত্বক আঙুল দিয়ে ছোঁয়, কালো চোখের দিকে ফ্যালফেলিয়ে তাকায়। যজ্ঞেশ্বরীর কলসির মতো পাছা, বড় বড় বুক - সবই হার্মাদের পছন্দ। ‘রেস্ত’ হলে সে নাকি তাকে ‘বিভা’ করবে। রেস্ত কী - তা ব্যাখ্যা করে এর উপায়ের দিকটাও ভেঙে বলে ডাকু। প্রায় দিন কোশা ভর্তি বন্দী লয়ে হার্মাদ-দস্যুসহ মগরা অদূরে ডাঙার দিকে যায়। ওটা তাদের গোপন আস্তানা। গরানগাছের জঙ্গলের ধারে পরিত্যক্ত গ্রাম। মাটির ভিটা ছাড়া ঘরবাড়ি, মানুষজনের নাম-নিশানা নাই। ওখানে দেশি বণিক আর দালালরা আসে হার্মাদদের কাছ থেকে দাস কিনতে।

যজ্ঞেশ্বরী জাহাজ থেকে দিন দিন কোশাগুলি খালি হয়ে যেতে দেখে। রেস্ত হতে বেশি বাকি নাই। হার্মাদ তাকে খিরিস্তান বানিয়ে গির্জায় নিয়ে বিভা করবে। এর আগে পালানো চাই। সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি দ্রুতই চলে আসে। বিক্রিবাটা শেষ হবার দিন জাহাজে মহাভোজ। বন থেকে চিতা হরিণ, বনমোরগ শিকার করে আনা হয়েছে। সূর্যাস্ত থেকে শুরু হয় মদ-মাংসের অঢেল খানাপিনা। রাতের প্রথম প্রহরে দস্যুদলের উদ্দাম নৃত্যে জাহাজ দুলে দুলে ওঠে। সে সময় চামড়ার থলে থেকে খানিকটা বুলেপঞ্জ গলায় ঢালে যজ্ঞেশ্বরী। জিনিসটা ডাকুর পীড়াপীড়িতে হালে তার রপ্ত করা। খেলে মনে বেশ চনমনে ভাব আসে। এ অবস্থায় প্রণয়ীর পিঠে হাত রেখে সে বেসামাল পা ফেলে ফেলে নাচে খানিক। পরনে ঘাগরা-কোর্তা, গলা ভর্তি মুক্তার ছড়া, হাতে এক হাত করে বেলোয়ারি চুড়ির বাহার। দস্যু-সর্দারের বদান্যতায় সাজসজ্জা আর আহার-বিহারে খামতি না থাকলেও যজ্ঞেশ্বরীর শরীরটা তত দিনে শুকিয়ে অর্ধেক হয়ে গেছে। তাতে মেয়েটিকে আরও মোহনীয় দেখায়। ডাকুর ঢুলুঢুলু চোখ বুজে আসে আবেশে। হাতটা কোমর থেকে খসে পড়ে। শরীর খারাপের বাহানা তুলে যজ্ঞেশ্বরী ঘরে ঢুকে সাজ বদল করে নেয়। বেরোয় যখন, তখন রাত গভীর। মহাভোজ শেষ হয়ে গেছে। ডেকের ওপর নাক ডাকছে মৃত ফৌজের মতো গাদাগাদি পড়ে থাকা মাতাল দস্যুদের। আজ নৌকার খোলে খোলে বন্দী নেই তো সশস্ত্র পাহারাও তুলে নেয়া হয়েছে। যজ্ঞেশ্বরী পায়ে পায়ে জাহাজের রেলিংয়ের ধারে এসে দাঁড়ায়। তারাভরা আকাশটা যেন নেমে এসেছে মাথার ওপর। শান্ত দরিয়া। ছোট ছোট ঢেউয়ের মাথায় হীরার মুকুট জ্বলছে-নিভছে। ত্রিশ-চল্লিশ হাত উঁচুতে মাস্তুলের আসনে বসে সাগরের ওপর নজর রাখছে বুড়া এক মগ মালুম। যজ্ঞেশ্বরীকে দড়ির মই বেয়ে নামতে দেখে সে রা করে না। হয়তো ঘুমাচ্ছে। বগলে চেরা তক্তা লয়ে নিঃশব্দে জলে ঝাঁপ দেয় যজ্ঞেশ্বরী।

পেছনে হার্মাদ দস্যু, সামনে সবুজ তটরেখা। যজ্ঞেশ্বরী পেটে তক্তা চেপে প্রাণপণে সাঁতরায়। রাত ফরসা হয়ে ভোর হয় - তীরের নিশানা নেই। জাহাজ থেকে অদূরেই যে সবুজ তটরেখাটি নজরে আসত, তা গায়েব হয়ে গেছে। চারপাশে জল আর জল, রোদ পড়ে চিকচিক করছে। সন্দেহ নেই, রাতের অন্ধকারে সে ভুল পথে এগিয়েছে। পিপাসায় যজ্ঞেশ্বরীর গলা শুকিয়ে আসে। হাত দুটি অবশ মনে হয়। আর আশা নাই। তক্তায় মাথা রেখে ভাটার টানে সে গভীর সমুদ্রে ভেসে চলে।

দিন শেষে আধমরা যজ্ঞেশ্বরীকে জলের ওপর গাছের গুঁড়ির মতো ভাসতে দেখে একদল জেলে। নোনা পানি খেয়ে খেয়ে মেয়েটার পেট ফুলে ঢোল। জেলেরা নৌকায় তুলে তাকে জলের কলসিতে উপুড় করে শোয়ায়। নাকে-মুখে জল ঝরে পেট পাতলা হলে চাটিতে নামায়। ঝিনুকের চামচে করে মুখে ঘন ঘন ডাবের পানি দিতে একসময় যজ্ঞেশ্বরীর জবান ফোটে। জেলেরা তার বাপের দেশ ভোলা-মেহেন্দীগঞ্জের মানুষ। দরিয়ায় মাছ ধরে গাঁয়ে ফিরছে। পরদিন মুসলমান জেলেদের রান্না করা লইট্টা মাছ দিয়ে সে ভাত খায়। যা হওয়ার তা আগেই হয়ে গেছে। নতুন করে জাত যাবার কিছু নেই।

তিন দিনের পথ পাড়ি দিয়ে সাঁঝবেলায় যজ্ঞেশ্বরী যখন বাড়ির ঘাটে নামে, মা তখন চাল ধুয়ে ঘরে ফিরছিলেন। শাখা-সিঁদুর ছাড়া সাদা থানে মাকে মেয়ে চিনতে পারে না। মেয়েকে দেখে মাও ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে। হাতের ঝাঁঝরি মাটিতে নামিয়ে আকন্দ-ঝোপের অন্ধকারে খানিক গলা ধরাধরি করে নিঃশব্দে কাঁদে দুজন। কত ব্যথা বুকের ভেতর জমে পাথর হয়ে আছে! বাড়িটাও কেমন ছন্নছাড়া। মগ-হার্মাদরা দরজা-বেড়া ভেঙেচুরে যেমন রেখে গেছে, মাস খানেক পরও তেমনি আছে। একজন মানুষের না থাকার ক্ষতি কিছুতেই পুষিয়ে উঠতে পারছে না। মড়ার ওপর খাড়ার ঘা - ফিরঙ্গদোষ নিয়ে মেয়েটার ফিরে আসা। মা যে হাতে চাঁদ পেয়েছে, আর দশজন তা বুঝলে তো!

দিনের আলো ফুটতে যজ্ঞেশ্বরীকে মাচায় তুলে ফুটোর ডালা নামিয়ে দেয় মা। ওখানে দিনমান শরীর পেঁচিয়ে সে শুয়ে থাকে। দমও ফেলে আস্তে আস্তে, যেন মাছির গুঞ্জনের বাড়া আওয়াজ না হয়। রাতে ঘরের কুপি নেভানোর পর মেয়ে মাচা থেকে নেমে মায়ের কোল ঘেঁষে অন্ধকারে খেতে বসে। এক অন্নেই দিন যায়। কারও মুখে কথা নেই। কেঁদে কেঁদে দুজনের চোখের জলও ফুরিয়ে গেছে। নিদান দেখছে না। প্রায়শ্চিত্ত করে শুদ্ধ হতে গেলে যে পরিমাণ অর্থ লাগে, তা পাবে কোথায়। মগ-হার্মাদরা ধনে-জনে শেষ করে দিয়ে গেছে। প্রায়শ্চিত্তেরও যে বিধান, তা ভাবলে ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে। তপ্ত ঘি পান, ব্রহ্মতালু আর দুই হাতের তালুতে দীর্ঘক্ষণ জ্বলন্ত অঙ্গারের মালসা ধরে রাখাÑ এ তো মৃত্যুরও বাড়া। এ নিয়ে ভাবনা-চিন্তারও ইতি ঘটে, যখন মাচায় কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকতে থাকতে পেটে বাচ্চার নড়াচড়া অনুভব করে যজ্ঞেশ্বরী।

হার্মাদের জাহাজ থেকে পালানোর মাস চারেক পর আবার এক অন্ধকার রাত। গা থেকে ঘুমন্ত মায়ের হাত নামিয়ে মেয়ে দুয়ার খুলে বেরিয়ে আসে। সাগরে ঝাঁপ দেয়ার কালে যজ্ঞেশ্বরীর জানা ছিল, সে নিজের গাঁয়ে ফিরছে। এবার চেনা পথ ধরে চলে যাচ্ছে অচেনা দুনিয়ার দিকে। পায়ে পায়ে হারিয়ে যায় আঠারো-উনিশ বছরের অনেক সুখ-দুঃখের স্মৃতি। ভোরের আলো ফুটতে নদীর ঘাট থেকে রওনা দিচ্ছিল যে যাত্রীবাহী ভড়, সে তাতে উঠে বসে। গন্তব্য মেঘনার পূর্ব পারের বন্দর লক্ষ্মীপুর। নদীর বুকের কুজ্ঝটিকায় জন্মান্তর ঘটে কুলীন ঘরের মেয়ে যজ্ঞেশ্বরীর। শুরু হয় মোতি নামদারি বেশ্যার শরীর বেচে বাঁচার নতুন জীবন। গর্ভাবস্থায় বন্দরে এক শ্রেষ্ঠীর রক্ষিতা হয় সে। সেখানে সুস্থ-সবল শিশুর জন্ম দেয় যজ্ঞেশ্বরী। একে নিজের মেয়ের মতোই দেখত শ্রেষ্ঠী। এই ধনকুবেরের আনুকূল্যে যজ্ঞেশ্বরীর রোজগারপাতিও হয় দেদার, যা দিয়ে ঘাটের ধারে সে জমকালো একখানা বাড়ি বানায়। নদীর কূলে আনত হিজলগাছ আর তিন দিকে নারকেল-সুপারির বিশাল বাগান। দেহব্যবসা করলেও বনানীঘেরা প্রাসাদে যজ্ঞেশ্বরী তখন ডাকসাইটে জেনানা। বেশ্যার জাতপাত নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। তাকে নিজের বাড়িতে ঘটা করে কালীপূজা দিতে হীরা তার ছোটবেলায়ও দেখেছে। তত দিনে যজ্ঞেশ্বরী শুভ্রবসনা বৃদ্ধা। পায়ে জুতা গলানোর হক ছাড়া একজীবনে সবই আদায় করে নিয়েছিল। তার গর্ভের আর হার্মাদ-ডাকুর ঔরসজাত মেয়ে পান্না মায়ের সাহস, রূপ, বুদ্ধি - কোনোটারই নাগাল পায়নি। বাপের সূত্রে পাওয়া ঘোড়ামুখের চেয়ে আফিমের নেশাই পান্না বেশ্যার কাল হয়। মাথার ওপর থেকে মায়ের ছায়া সরে যেতে অভাব আর তাকে ছাড়ে না। যৌবনও মধ্যগগনে। নিজের উঠতি বয়সের সুন্দরী কন্যাকে আজিরপাট্টা লিখে মোটা অঙ্কে বেচে দেয় সে। তখন তার থোক টাকা দরকার...


যজ্ঞেশ্বরীর কাহিনির উঠতি বয়সের সুন্দরী মেয়েটি যে হীরা, এ নিয়ে ফুলেশ্বরী শিশুর মতো বাইচালি জুড়ে দেয়। মন-ভার-করা মেঘ কেটে গেছে - তাতেই স্বস্তি। ভবিতব্যের কথা কে বলতে পারে! গল্পে গল্পে তাদের পথ শেষ হয়ে এসেছে। ওরা রূপসিংহের পাথারের শেষ সীমানায়। একটি-দুটি করে নানা জাতের পাখি নামছে বিলে-পাথারে। হরেক রকমের কলকাকলি। চাঁদের আলো মরে গিয়ে পুব আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে খুনে লাল রং। তাতে তিরের ফলার মতো রাজবাড়ির কালীমন্দিরের চূড়াটা ধীরে ধীরে জেগে ওঠে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন