বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

ইশরাত তানিয়া'র দুটি অনুগল্প :

বৃষ্টির দিনে রমণ সক্রিয় পুরুষ

জানালায় অপসৃয়মান বাতাসে তার চুলগুলো উড়ে যেতে চায়। বা হাতে বুকের কাছে চেপে ধরা এ্যবোরিজিনাল পুরুষের ভাস্কর্য। ভাস্কর্যের ডান হাতে লম্বাটে শিঙা ধরা। সে নিজেই ভাস্কর্যের অনুরূপ। তামাটে, রুখাশুখা, কোমরে বল্কল। পেছনে দিগন্তে ঠিকরানো ফোঁটা ফোঁটা আলো। সে এসেছে স্বপ্নজগৎ থেকে। সে পৃথিবী কালো, নিশ্চুপ, ভারি এবং মৃত। তার নাম- ডি সুজা, ইস্রাফিল, সঙ্ঘমিত্র কিংবা শঙ্খ।

একঘেয়ে টিপ টিপ বৃষ্টি ঝরছে গত মঙ্গলবার থেকে। সে তার নির্বাচিত কিন্তু ধোঁকাবাজ প্রেমিকার কারণে চোখ ফুলিয়ে বসেছিল। লাল এবং সজল। চুল সব স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে খুলির ওপর চেপে বসা। তখন বিষাদের কটুগন্ধী নোনা ধরা দেয়াল বুড়ো দার্শনিকের মতো বলেছে- অপেক্ষায় জাগো। একা। এসব ঘৃণ্য কথায় সে ক্ষেপে উঠে লাথি কষায় শুকনো থালায়। এলুমিনিয়ামের থালা গড়িয়ে লাট্টুর মতো ঘোরে।


কোন শৈশবে সে পিতৃমাতৃহীন হয়েছে তার মনেও পড়ে না। মদ, বিড়ির ধোঁয়াশায় মজুর খাটা দিন ফুরিয়ে সন্ধ্যা হয়। অসহ্য বিবমিষার মুখোশ সত্যিকারের মুখ হয়ে যায়। টানাহ্যাচড়ায় মুখোশ আরো এঁটে বসে। আঠালো সর্বাঙ্গ। বিস্তর পেরেক ঠোকাঠুকিতে চায়ের ছাঁকনির মতো বহুছিদ্রযুক্ত জীবন। অথচ তার বুকে ভেজা চা পাতা জমে থাকে না। পরিশুদ্ধ লিকারের সাথে চা পাতা চলে যায়।

ঘরের একটি মাত্র জানালা শাপগ্রস্ত একচোখার মত তাকে অবিরাম বিদ্রূপ করে। শুধু পক্ষপাত। ঈশ্বরকে পেলে জিজ্ঞেস করা যেত সে কতটুকু নিন্দাযোগ্য। সর্বত্র চুমু পরিধান করে সে সময়ে সময়ে। চুমুর গন্ধে উঠে দাঁড়ায় শায়িত কুকুর। নাক উঁচু করে গন্ধ নেয়। প্রভুভক্ত সারমেয় লেজ নাড়িয়ে কৃতজ্ঞতার পতাকা ওড়ায়। হেলে পড়া বন্ধ ঘড়ি ফুলের মতো ফুটে থাকে। শুধু একটি মুহূর্তকে ধারনরত।

ব্যাধিঘোরের মোহর ছাপ মুছে সে ডানা মেলে। চক্ষুস্মান হয়। মেঘ মাল্লারে ধুয়ে যায় বিজবিজে স্বেদ বিন্দু। সৃষ্টি পায় আগুন, জল, মাছ, পাখি, বালুর পাহাড় আর জীবন। মধ্যপদলোপী সমাসের মতো সে অবলুপ্ত হয়েছে। কবেই। ঘড়ির তিনটি কাঁটাই অনড়। সেই সময় কখন এসেছিল বলা যায় না। অথচ সবাই বলে স্বপ্নের সঠিক সময়টা জানা গুরুত্বপূর্ণ। ঘেমে চটচটে হয়ে যাওয়া গুচ্ছ গুচ্ছ চুলগুলো সে আঙ্গুল দিয়ে নিপাট করে। অন্ধকারে স্যুভেনির দোকানে সারিবদ্ধ এ্যবোরিজিনাল পুরুষ ভাস্কর্যগুলো নড়ে ওঠে। তাদের সবার হাতে একটি করে বুমেরাং ধরা।

.................................



স্বপ্নকমলা

একটা স্বপ্নের কথা বলব। স্বপ্নের ব্যাপারটা জানেন তো?

সবাই স্বপ্নের কথা বলতে ভালোবাসে কিন্তু কেউ স্বপ্নের কথা শুনতে চায় না। স্বপ্ন শুধু সত্য আর সত্য কিছু নয়। হিং টিং ছট্। গৌড়চন্দ্রিকা অহেতুক নয়। ভাবছেন, কী বিষম গল্প ফেঁদে বসি স্বপ্নের আড়ালে। না, না। সময় দিচ্ছি। বিবেচনা করে দেখুন স্বপ্নমঙ্গলের অমৃতবচন শুনবেন কী না। ফিরে যেতে পারেন। কিংবা খোসা ছাড়াতে পারেন স্বপ্নকমলার। এখনো যেহেতু চলে যাননি তার মানে এরই মধ্যে আপনি মনস্থির করে ফেলছেন। আপনি স্বপ্নকথা শুনবেন। মনস্থির শব্দটি শুনলে বোঝা যায়- মন কেমন অস্থির। কত প্রকারে ভুলিয়ে ভালিয়ে মন্ত্র পড়লে মনে স্থিরতা আসে। তবে এই বিধিদর্শী স্থির মন শুধু ঘুমের মধ্যে স্বপ্নের অনুভূতি প্রত্যক্ষ করে। ঘুম ছাড়া যে স্বপ্ন আমি তার বৃত্তান্ত বলি।

কৃষ্ণপক্ষের শেষ তিথি। চাঁদ দেখা যায় না। নীলাভ মনবারান্দা পেরিয়ে হেঁটে চলি রাতের ওপারে। স্বপ্নাবিষ্ট। হাতে সুগোল কমলা। সুগন্ধী, মসৃণ। কুয়াশা নেই, জোনাকি নেই, হাওয়া নেই। অন্ধকার গাঢ় হয়ে পাথরের মতো জমাট বাঁধা। প্রস্তরীভূত আঁধারে পা ফেলে ফেলে হেঁটে যাই। দৃষ্টিহীনের মতো দুহাতে আঁধার কেটে এগোই। আকাশ থেকে নামে আঁধারময় ধোঁয়াটে রুমাল। সেখানে দুটো নক্ষত্র বোনা সুতার কারুকাজ।

জল এসে আঁধারের ঘনত্ব মাপে। জল স্বয়ং তমসাবৃত হয়ে গান গায়। আমি হাঁটু ভেঙে বসি। অন্ধকারে অগাধ জলের গান শুনি। আঁধারের পড়ন্ত ফোঁটা মুছব বলে রুমাল খুঁজি। যেখানে দুটো নক্ষত্র ঘুমঘুম চোখে জেগে থাকে। হঠাৎ পাতায় বাতাসের শব্দ শোনা যায়। ঝড়ো হাওয়ায় ধুলোর সাথে আঁধার হয়। সাগরের জলে দাঁড়িয়ে থাকা উঁচু বাতিঘর হতে চেয়েছি। হালভাঙা নাবিকের জন্য নয়- এমনিই! পথনির্দেশ দেয়ার মতো এতটা সুবিন্যস্ত নই। ঝড়জলের রাতে সমুদ্রতীরে শুধু আলোর স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা। ঝলকানো জলের ফোয়ারায় ছড়িয়ে পড়া আলোজলের বিন্দু দেখা। রুমাল তুলব বলে ঝুঁকি। ফসকে যায় যা কিছু মসৃণ-প্রজ্জ্বল। ডিকোড করার আগেই উপকূলে কমলা গড়িয়ে পড়ে। আর যদি কমলা ধরি তখনই রুমাল উড়ে যায়।

কমলা ভেঙে দেখা যেত তরল সাদা আলো। স্ফটিকের মতো জমে যাওয়া। কমলার ভেতরে বাজে বাতাসের বিষণ্ণ ভায়োলিন। নিরর্থক, লয়হীন, শাঁই শাঁই সুরেলা। অথচ দেখুন, আরেকটি নির্বিকার হাতের কথা আমার মনেই ছিল না।

২টি মন্তব্য: