বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

হাসান আজিজুল হকের গদ্য : নিজের দিকে ফিরে


আমি যে কেন লিখি এ-প্রশ্ন আমাকে প্রায়ই করা হয়। ন্যায়সংগত প্রশ্ন। আমি নানান রকম কাজ করি, তার ওপর আবার লিখতে যাই কেন সে একটা প্রশ্ন বটে। যে ক্ষেত্রটি শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্র বলে পরিচিত সেখানে যাতায়াত থাকলেই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। আপনি লেখেন কেন, আপনি নাচেন কেন, আপনি আঁকেন কেন? কিন্তু এ কথা কেউ জিজ্ঞেস করে না, আপনি কেরানিগিরি বা আমলাগিরি করেন কেন, কামারের কুমোরের বা জেলের কাজ করেন কেন?
বোঝা যায় কাজের রকমফের আছে, কিছু কাজ করলে সে কাজ কেন করা হচ্ছে তার ব্যাখ্যা দেবার দরকার পড়ে না, যে কাজের উপযোগিতা স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাচ্ছে সে কাজ সম্বন্ধে কোনও প্রশ্ন নেই। দুঃখের কথা, মোটা দাগে দেগে দেওয়ার মতো তেমন কোনও উপযোগিতা লেখার কাজ, আঁকার কাজ বা বাজানোর কাজের মধ্যে নেই। যদি থাকত তা হলে প্রশ্নের হাত থেকে বাঁচা যেত। শুধুমাত্র এই একটি কারণেই লেখা, বিশেষ করে নিজের লেখার কোনও একরকম উপযোগিতা বা যাকে অন্য কথায় জবাবদিহি বলতে পারি তা খুঁজে দেখার চেষ্টা করি আমি। উপযোগিতা শব্দটা খুব দাগ-লাগা। দাগ-লাগা বলতে খারাপ কিছু বলছি না। খোলা আকাশের নিচে থাকার চেয়ে ঘরের মধ্যে ছাদের তলায় থাকা ভালো। গৃহ মানুষের জন্য উপযোগী। মানুষের একেবারে স্থূল অস্তিত্বের জন্য। হ্যাঁ, এই হল উপযোগিতা শব্দের অর্থ। এইরকম উপযোগিতা আমি সাহিত্যের জন্যে কখনওই খুঁজে পাবার আশা করি না। কিংবা বলতে পারি সাহস করি না। কিন্তু সাহিত্যের কাজটা দেখিয়ে দেবার জন্যে আমি উপযোগিতা শব্দটা একটু একরোখাভাবে ব্যবহারও করতে চাই।

একশো বছর আগে বঙ্কিমচন্দ্রও কিন্তু এর থেকে তেমন ভিন্ন চোখে সাহিত্যকে দেখেননি। দেশের কল্যাণ আর সৌন্দর্যসৃষ্টি এই দুটি কষ্টিপাথরের কথা বলেছিলেন তিনি। তাহলে আর বাদ থাকল কী? বাদ থাকল শুধু কল্যাণ আর সৌন্দর্য এই কথা দুটিকে ব্যাখ্যা করা। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর কথাসাহিত্যে, তাঁর প্রবন্ধ ও নানা রচনায় মানব সমাজের এই দু'রকম ব্যাপারের ব্যাখ্যা করে গেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় আমার সায় থাকুক আর না থাকুক, আমাকে আমার লেখায় এই একই ব্যাখ্যা চিরকাল করে যেতে হবে। অর্থাৎ মানুষের সমাজের ব্যাখ্যা। এ থেকে আমার মুক্তি নেই। মানুষকে সামনে রেখেই আমাকে আমার চারপাশের জীবনের, আমার কালের, আমার পৃথিবীর বাস্তবকে ব্যাখ্যা করে যেতে হবে তবে যদি আমার লেখায় বিন্দুমাত্র উপযোগিতা আমি খুঁজে পাই। যে বাস্তবের মধ্যে আমি বেঁচে আছি তার ব্যাখ্যাই আমার লেখার শেষ লক্ষ্য। আমি যে কেন লিখি এই তার কৈফিয়ত।

কী সহজ এই 'বাস্তবতা' শব্দতির ব্যবহার অথচ কী বিশাল এর বিস্তৃতি! দক্ষিণ আফ্রিকায় যে কালো মানুষদের রক্ত ঝরছে, জেলখানার ভিতরে প্রায় তিন দশকের বন্দি নেলসন ম্যান্দেলার জীর্ণ ফুসফুসে যে ঘুণ পোকারা অনবরত গর্ত খুঁড়ে চলেছে, লাতিন আমেরিকার দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদের যে দাঁতালো দানব শহর নগর মাঠ প্রান্তর ফুটিফাটা করে চলেছে, যে বহুজাতিক পুঁজি বিশ্বের এক একটা দেশকে ধরে দলামোচড়া করে ছেড়ে দিচ্ছে এই সবই কি আমার আজকের বাস্তবের অংশ নয় যেমন আমার নিজের দেশের দশকোটি মানুষের যুগপৎ আঁকুপাঁকু তলিয়ে যাওয়া আর বেঁচে থাকার সংগ্রামের সাগরগর্জন আমার কালের বাস্তবের অংশ, আমারই অভিজ্ঞতার অংশ। সেই বাস্তবের দিকে আমি যেভাবে সাড়া দিতে চাই একমাত্র তাই হতে পারে আমার লেখার বিষয়বস্তু।

বাইরের বাস্তবতা আমার লেখার বিষয়ে পরিণত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা আমার অভিজ্ঞতার অংশ হতে গিয়ে কি বাস্তব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে? আমি কি আমার লেখার ভিতর দিয়ে সংগোপনে টুকরো টুকরো বাস্তব গড়ে তুলছি যাকে লোকে শিল্পের বাস্তব বলে, যা প্রকারান্তরে বাস্তব থেকে পালাবার এবং লুকোবার একটা উপায়মাত্র। অনেকটা সিনেমায় যুদ্ধ দেখার মতো, যা চমৎকার নিরাপত্তার মধ্যে মানুষের জন্যে করুণা বা সহানুভূতি জাগিয়ে তোলে, একরকম নিষ্ক্রিয় ভালোবাসার জন্ম দেয়? না, বাস্তবকে অবলম্বন করে এরকম কোনো মোহ আমি তৈরি করতে চাই না। সাহিত্য হাজার রকমের মোহ সৃষ্টি করে। নন্দনতত্ত্বের নানারকমের মার্কা দেওয়া আলোচনার বারো আনা অংশ জুড়েই এই মোহের আলোচনা। কখনও সৌন্দর্যের নামে, কখনও শিল্পের নামে, কখনও প্রচারের দায়ে।

মানুষের বেঁচে থাকার সবটাই বাস্তব, তা থেকে যেটুকু আলাদা করে নিয়ে আদিখ্যেতা করা হবে সেটুকুর উপরেই পড়বে মিথ্যার ছায়া, মোহের আড়াল। এটা যেন কিছুতেই না ঘটতে পারে, বাস্তবের আটপৌরে, বাস্তবের দৈনন্দিন সাহিত্যের মধ্যে এসে যাতে একটা আবছা দেয়ালের আড়ালে যেতে না পারে সেটা দেখাই হচ্ছে শিল্পের কাজ। শিল্পের কাজ আমার কাছে তাই মোহ সৃষ্টি নয়, মোহমুক্তি ঘটানো। আমার এই কথা থেকে কেউ যেন চট করে ধরে না নেন যে শিল্পের একমাত্র কাজ হচ্ছে প্রতিরূপ তৈরি করা, অবিকলের দাসত্ব মেনে নেওয়া। বাংলা কথাসাহিত্যের নব্বুই ভাগই চেনা জীবনযাত্রার অবিকল বিবরণে ভরা এবং সেটা বেশ সন্তোষজনকও বটে, ব্যাবসা সাফল্যেও কম যায় না, কিন্তু তার সঙ্গে বাস্তবের সম্পর্ক কী? কথাটাকে এখন এইভাবে ঘুরিয়ে বলা যায় যে সাহিত্যের উপর থেকে যখন সমস্ত আস্থা চলে গেছে, সাহিত্যের কিছুমাত্র কাজ আছে এই বিশ্বাস যখন উধাও একমাত্র তখুনি সাহিত্যকে গাধা বানিয়ে তাকে দিয়ে বাস্তবের অছিলায় ভাড়া খাটিয়ে নেয়া যায়।

আমি প্রতি মুহূর্তে অনুভব করি আমার ক্ষমতা শোচনীয়ভাবে সীমিত, যৎকিঞ্চিত। বাস্তবকে নিয়ে আমি যা করতে চাই না, যখন ঠিক তাই করে ফেলি, সোজা রাস্তা ছেড়ে আমার কলম বাঁকা রাস্তা ধরে, দিনের আলোর সঙ্গে বসন্ত-জ্যোৎস্নার মেদুরতা মিশে যায়, তখন বাস্তবের সীমা নিয়ে আমাকে মহা ফেরে পড়ে যেতে হয়। বাস্তবের যথাযথ ছাপ পড়েছে যে মনোভূমিতে, যেখান থেকে লেখার শুরু সেখানে চেয়ে যখন দেখতে পাই জায়গায় জায়গায় আবছা, শুকনো ডাঙার কোথাও কোথাও ভাঙা বা টলটলে জলে ভরা, আলো-ছায়ার এক ধরনের মায়া তখন কি ধরে নেব অভিজ্ঞতাকে বুদ্ধি দিয়ে যাচাই করতে পারছি না, বুদ্ধির জাঁতায় কব্জা হচ্ছে অংশমাত্র, বাকিটা পড়ে আছে বোধের বাইরে? ধরে কি নেব যে বাস্তবের বোধ পুরো হয়নি বলেই জল-মেশানো দুধের মতো জলো কল্পনা আর কাঁচা আবেগ মিশিয়ে সাহিত্যের নামে একটা ভেজাল জিনিস তৈরি করছি? কখনও কখনও হয়তো তাই। কিন্তু সব সময়ই কি তাই?

ছেলেবেলায় রাঢ়ে থাকতে সর্ব প্রাণীর শেষ আশ্রয়গুলি আমাকে ভীষণ কুহকে টানত। আমি একা একা শ্মশানে বা গোরস্থানে ঘুরে বেড়াতাম। রাঢ়ে গাছপালা কম। মনে পড়ছে এক নির্জন দুপুরবেলায় জষ্টি মাসের প্রচণ্ড হাড়-ফাটানো রোদে হলুদ রঙের বড়ো বড়ো ঘাসের মধ্যে বসে আমি ধসে-পড়া কবরের মধ্যে আধো-অন্ধকারে শুয়ে থাকা একটা কঙ্কালের দিকে চেয়ে আছি। যেন শাদা কাগজ কেটে তৈরি করা একটা মানুষ শুয়ে আছে, কিছুমাত্র ওজন নেই। কাগজ-কাটা মানুষটাকে যেন হাতের তেলোয় গুটিয়ে মুটিয়ে রাখা যাবে। ওর নিজের যেমন ভয় ব্যথা বেদনা কিছু নেই, আমার মধ্যেও ও তেমনি এতটুকু ভয় ব্যথা বেদনা জাগাতে পারছে না। কী ভয়ানক নির্বিকারত্ব, কী অকল্পনীয় ঔদাসীন্য। আমার সামনে বৃক্ষহীন শাদা সমতল মাঠে জষ্টির রোদ কটকট করছে। প্রায় শাদা আকাশ আর তার নিচের পৃথিবীর মাঝখানে বাতাসে মেশা ধুলো অতি ধীর গতিতে ভেসে বেড়াচ্ছে। আমি কপালের ওপর হাত রেখে একবার সেদিকে তাকাচ্ছি, আবার চোখ ফিরিয়ে কবরের কালো গর্তের ভিতর শুয়ে থাকা শাদা কাগজের মানুষটির দিকে চেয়ে দেখছি।

বহুকাল পর্যন্ত বাস্তব শব্দটা শুনলেই আমার চোখে এই দৃশ্যটা ফুটে উঠত। যখন জলভরা ভিজে শ্যামল জায়গায় এলাম তখনও তাই- ভাগাড়ে একটি মোষের নিচের চোয়াল আর পাঁজরের ধপধপে শাদা হাড়গুলো অনন্তকাল ধরে রোদে শুকোচ্ছে। বাস্তব কি এইরকম? অসংখ্য মানুষ চোখে পিঁচুটি নিয়ে গালে হাত দিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসে আছে। হাজার হাজার একর জমির ফসল জলের নিচে তলিয়ে গেছে, তাদের সামনেই আছে সেই দৃশ্য, তারা চেয়েও দেখছে না। তাদের কুঁড়েগুলো বেঁকেচুরে মুখ থুবড়ে পচা স্থির জলের মধ্যে পড়ে আছে। ভাদ্রের শেষ বিকেলের গুমোট গরমে সব কিছু জ্যান্ত অবস্থায় পচে যাচ্ছে। মানুষ গরু ভেড়া ছাগল কুকুর বেড়ালের সেই সম্মিলিত পচে যাওয়ার গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে কিন্তু কী নির্বিকার সেইসব আধন্যাংটো কালো কালো গালে হাত দেওয়া মানুষ। ঠিক যেন চক্ষুহীন দৃষ্টিপাতে অন্ধ শুয়ে-থাকা ওজনহীন, ব্যথা বেদনাহীন শাদা মানুষ।

এইরকম বাস্তব চারদিকে। সামান্য রদবদল মাত্র। কোথাও চিৎকার হল্লা, শিরাফোলানো আক্রোশ, কোথাও উদ্যত গাঁইতি শাবল। কিন্তু বাস্তব যত বিচিত্র চেহারা নিয়েই আমার সামনে উপস্থিত হোক না কেন- আমার সামনে, মানে লেখক আমার সামনে- তার মূল চেহারা যেন একটাই : রাঢ়ের রোদ পোড়া খোলা মাঠের মধ্যে কটকটে শাদা করোটি চক্ষুহীন দৃষ্টিপাতে সীমাহীন শূন্যে চেয়ে আছে। মহাজন কড়ি গুনছে, কারখানার মালিক মজুরকে কলে ঢুকিয়ে দিচ্ছে, জোতদারের গোলায় সারা বছরের খোরাকি তুলে দিয়ে আসছে ভাগচাষি, বেশ্যার দেওয়া টাকা গুনছে মন্ত্রী- এইসব, এইসব। এইরকম অন্তহীন ফিরিস্তি হাজির করতে পারা যায়। জানি বাড়বাগ্মির মতোই গনগনে আগুন আছে মানুষের পাঁজরের তলায়, তা কখনো জ্বলে ওঠে দাউদাউ করে। যেমন ভীষণ নৈঃশব্দ্যের মধ্যে পেষণের ঘর্ঘর আওয়াজ শোনা যায়, তেমনিই শোনা যায় বাতাসের মধ্যে আগুনের ভেসে চলার হিস হিস।

বাস্তব ডাইনে বাঁয়ে হেলে না। সে সিধে খাড়া থাকে। মন্ত্র পড়ে তার কিছু করা যায় না। গঙ্গাজল ছিটিয়ে তাকে বিশুদ্ধ করা চলে না। তাকে কোনওভাবে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেও লাভ নেই। সব দায় পাশ কাটিয়ে চলার জন্যে সাহিত্যিক যখন বলেন তিনি সত্যিকার অর্থে কিছুই জানেন না একমাত্র নিজেকে ছাড়া তখন তিনি সত্যি কথা বলেন না। এই কথা বলে তিনি জানাতে চান বাইরের জীবনের তিনি দর্শক মাত্র। ভিতরে ঢোকার উপায় তাঁর নেই, কাজেই সব দরজায় তালা দিয়ে একমাত্র নিজের কথা বলাই সত্য বলার উপায় তাঁর। কিন্তু তিনি কি জানেন যে বাইরের জীবনের মতোই তিনি নিজেও নিজের জীবনের দর্শক মাত্র। যে বাস্তবের অংশ তিনি, নিজেকে দেখার ভিতর দিয়ে তিনি সেই বাস্তবকেই দেখে থাকেন? বাস্তবকে যেভাবে দেখতে তিনি বাধ্য হন সেইভাবে নিজেকেও দেখেন তিনি। মানবজন্ম পাবার পর মানবজীবনের যেসব শর্ত না মেনে তাঁর উপায় নেই, সেইসব শর্তেই তিনি নিজেকে আর বাইরের জীবনকে দেখতে বাধ্য। খুবই সত্যি কথা যে চেতনায় ঢোকার পথ না পেলে বাস্তব নেই, চেতনায় না আসতে পারলে অহং-ও নেই। কাজেই বিচ্ছেদই বলি, পারক্যের বোধই বলি, সবকিছুর ব্যাখ্যা বাস্তবের মধ্যেই, বাস্তবের অংশ হিশেবে।

লেখক হিশেবে আমি এই বিশ্বাসে এসে পৌঁছেছি যে বাস্তবকে না মানার কোনো স্বাধীনতা না থাকলেও তার রূপান্তর প্রতি মুহূর্তেই মানুষ ঘটিয়ে তুলছে। মানুষ অর্থাৎ মানুষের শ্রম। মানুষের সমাজে মানুষের শ্রম যখন মুক্ত হবে একমাত্র তখুনি মানুষ তার প্রাকৃতিক ও সামাজিক বাস্তবকে বদলে দিতে পারবে। যতদিন লেখক থাকব বাস্তবের ভিতরের জল ও আগুনের গল্প লেখার চেষ্টা ছাড়া আর কী করতে পারি আমি? বাস্তবের গায়ে স্তরান্তরিত বাস্তবের প্রতিফলন করার চেষ্টা ছাড়া? বাস্তবকে নিয়ে মোহসৃষ্টি নয়, কিন্তু বাস্তবের কোনো অংশেই কি মোহ নেই? যদি তা না-ই থাকে তা হলে বাস্তবের স্তরান্তর ঘটানোর চেষ্টার ব্যাখ্যা কী?







কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন