বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

কেট চপিনের গল্প : এক ঘণ্টার গল্প

অনুবাদ ও আলোচনা : মোজাফ্‌ফর হোসেন

মিসেস মালার্ডের হৃদরোগের সমস্যা আছে জেনেই তার স্বামীর মৃত্যুর সংবাদটা তার কানে দেওয়ার আগে যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করা হয়েছিল। তার বোন জোসেফিন বিষয়টিকে মোটামুটি ধামাচাপা দিয়ে ভাঙা ভাঙা স্বরে বলেছিল। তার স্বামীর বন্ধু রিচার্ডস সেখানে, তার পাশেই ছিল। সেই সংবাদপত্রের অফিসে ট্রেনের ভয়াবহ দুর্ঘটনায় নিহতদের তালিকায় ব্রেন্টলি মালার্ডের নাম দেখতে পেয়েছিল। এরপর সে আর একটা টেলিগ্রাম থেকেই মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যায় এই মৃত্যু সংবাদ সম্পর্কে। এরপর সে এই দুঃসংবাদটি টেনে এনেছে।


অন্য নারীদের মতো খবরটি সম্পর্কে সে অবগত ছিল না। খবরটি শুনেই সে তৎক্ষণাৎ বোনের কাঁধে এলিয়ে পড়ে, কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। এরপর শোক খানিকটা থিতু হলে সে তার রুমে চলে যায়। তাকে অনুসরণ করার মতো কেউ ছিল না। রুমের খোলা জানালার পাশেই ছিল একটা আরাম কেদারা। একধরনের ক্লান্তিবোধ থেকে চেয়ারে বসে পড়ে। ক্লান্তিবোধ ততক্ষণে শরীর থেকে সত্তায় পৌঁছে গেছে।

বাড়ির সম্মুখে খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোর চূড়া তখন বসন্তের নতুন হাওয়ায় খিলখিল করে হেসে উঠছেÑ চারিদিকে কেবলই প্রাণের প্রাচুর্য। বৃষ্টির সুস্বাদু সুঘ্রাণের এঁটো বাতাসে তখনও খানিকটা লেগে ছিল। নিচে ফেরিওয়ালা চিৎকার দিচ্ছিল তার বিক্রিসামগ্রী নিয়ে। দূর থেকে ভেসে আসছিল কারো একাকী গাওয়া মৃদুসঙ্গীত। অসংখ্য চড়–ই পাখির প্রাণখোলা কিচিরমিচির। মেঘময় আকাশের ফাঁকফোঁকর দিয়ে উঁকি দিচ্ছিল নীলরঙা আকাশ।

সে চেয়ারে মাথা এলিয়ে দিয়ে চুপচাপ বৃক্ষের মতো বসে ছিল। শুধুমাত্র সে একবার নড়ে ওঠে যখন তার চোখের একফোঁটা নোনতা জল গড়িয়ে তার ঠোঁটে এসে পড়লোÑ যেন কোনো শিশু কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ে স্বপ্নেও কেঁদে চলেছে।

সে ছিল অল্পবয়সী, সৌম্য-শান্ত চেহারার। তবে তখন তার চোখে বিষণœতার ছাপ দেখা যাচ্ছিল, চোখজোড়া এঁটে ছিল ধূসর আকাশের নীল ছোপে। এটা কোনো তড়িৎ প্রতিফলন ছিল না, বরং তার ভেতরে বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তা খেলা করছিল। কিছু একটা তার দিকে এগিয়ে আসছিল, সে আতঙ্কের সঙ্গে তার জন্য অপেক্ষা করছিল। কি ছিল সেটা? সে জানতো না; এটা এতটাই চাপা ও বিস্তৃতিপ্রবণ যে তা ছিল ব্যাখ্যার বাইরে। তবে সে তা অনুভব করতে পারছিলÑ আকাশ থেকে নিঃশব্দে কতগুলো শব্দ, কতগুলো গন্ধ ও রঙের সঙ্গে হামাগুড়ি দিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসছিল। এখন তার বুক ফুলে উঠলো। সে বুঝতে পারছিল তার ওপর ভর করতে তার দিকে যেটা এগিয়ে আসছে সেটা অন্যকিছুÑ সে পাল্টা আঘাত করছিল তার ইচ্ছাশক্তি দিয়ে। যখন সে নিজের ভেতর থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসলো তখন তার ঠোঁটদুটো কিঞ্চিৎ আলগা হয়ে হালকা মৃদুস্বর বেরিয়ে এল। সে বার বার, তার প্রতিটা নিঃশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চারণ করলোÑ মুক্ত, মুক্ত, মুক্ত! শূন্য দৃষ্টি, এবং যে ভয় সেখানে ছিল তা উবে গেল। তার চোখজোড়া আস্তে আস্তে উজ্জল হয়ে উঠলো। তার হৃদযন্ত্রের ওঠানামা বেড়ে গেল।

সে নিজেকে জিজ্ঞেস করতে ভুললো না, তাকে যে আনন্দ বশ করে ফেলেছে সেটা কোনো পাশবিক আনন্দ কিনা। সে জানতো যে সে লাশটি দেখা মাত্র আবার কেঁদে উঠবে। কিন্তু সে দেখতে পেল ঐ তিক্ত সময়কে অতিক্রম করে কয়েক বছরের এক দীর্ঘ মিছিল তার দিকে এগিয়ে আসছে, যে সময়টা একান্তই তার ছিল। এবং সে তার হাতদুটো প্রসারিত করে তাদের স্বাগতম জানালো।

তার আসন্ন বছরগুলোতে আর কারো জন্য তাকে বেঁচে থাকতে হবে না; সে শুধু এখন নিজের জন্য বাস করবে। আর কোনো প্রবল ইচ্ছাশক্তি তাকে বশীভূত করে রাখতে পারবে না।

তবে সে তাকে ভালবাসতোÑ মাঝে মাঝে বেসেছিল। মাঝে মাঝে বাসেনি। এখন তাতে কি আসে যায়? এখন এমন আত্মপরিশুদ্ধির সময় সেই ভালবাসাকে স্মরণ করে কী এমন লাভ?

মুক্ত! মন এবং শরীর! সে বিড়বিড় করে আওড়াতে থাকলো।

জোসেফিন হাঁটু গেড়ে বসে বন্ধ দরজার তালার ছিদ্রে ঠোঁট রেখে আকুতি মিনতি করে বলছিলÑ লুইস, দরজাটা খোলো। পায়ে পড়ি, দরজা খোলো। এমন করলে তুমি নিজেকে অসুস্থ করে ফেলবে। তুমি কি করছ লুইস? খোদার দোহায় লাগে, দরজাটা খুলে দাও।

এখন যা বলছি। আমি নিজেকে অসুস্থ করে তুলছি না।

না; সে পান করছিল জীবনের অমৃতসুধা ঐ খোলা জানালা দিয়ে।

তার কল্পনা তখন দৌড়াচ্ছিল আসন্ন সময়ের দিকে। বসন্তের দিন, গ্রীষ্মের দিনÑ এবং সবধরনের দিন এখন শুধু তার একান্ত নিজের হয়ে উঠবে। সে তড়িৎ প্রার্থনা করল, জীবন যেন দীর্ঘ হয়! অথচ এই গতকাল জীবন দীর্ঘ হবে ভেবে সে আঁৎকে উঠেছিল।

অবশেষে সে উঠে বসলো, বোনের জোরাজুরিতে দরজাটা খুলে দিল। তার চোখে তখন জয়ীর আভা, সে তার বোনের কোমর জড়িয়ে ধরলো এবং একসঙ্গে দুজনে সিড়ি বেয়ে নেমে পড়লো। রিচার্ডস তাদের জন্য নিচেই অপেক্ষা করছিল।

কেউ একজন বাইরে থেকে প্রধান ফটক খুলছিল। সে ছিল ব্রেন্টলি মালার্ড, প্রবেশ করলো হাতের ছোট ভ্রমণব্যাগ ও ছাতা সমেত। সে দুর্ঘটনার ধারে কাছেই ছিল না। এমনকি দুর্ঘটনার সংবাদ সম্পর্কেও অবগত ছিল না। সে জোসেফিনের হৃদয় বিদারক আহারাজি শুনে থতমত হয়ে পড়ল। রিচার্ডস দ্রুততার সাথে সরে গেলে তার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা জনাব ম্যালার্ড স্ত্রীর চোখে ধরা পড়ল।

যখন ডাক্তার এলো, তারা বলল সে হৃদযন্ত্রের ক্রীড়া বন্ধ হয়ে মারা গেছেÑ অতি আনন্দই তার জন্যে কাল হয়েছে।







গল্পপাঠ : এক ঘণ্টার গল্প



কেট চপিনের বর্তমান গল্পটি ১৮৯৪ সালে ‘ভোগ’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। তখন গল্পটির নাম ছিল ‘একঘণ্টার স্বপ্ন’। পরেরবার প্রকাশের সময় চপিন নাম বদলে রাখেন ‘একঘণ্টার গল্প’। ১৮৯০-এর দশকে গল্পটি প্রকাশের পরপরই সমালোচনার ঝড় ওঠে। কেননা গল্পে দেখানো হয়Ñ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন নারী, যে তার স্বামীর মৃত্যু সংবাদ শুনে স্বাধীনতা অনুভব করে। এরপর সমালোচকরা চপিনের পক্ষ নেন। তারা গল্পটি ব্যাখ্যা করেন এইভাবে: গল্পটি একজন নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া জীবন থেকে মুক্তির কথা বলে। সেই সময় ইউরোপ আমেরিকায়, এখনও বিশ্বের বেশিরভাগ অঞ্চলে, নারীরা নিজের ইচ্ছা মতা বিয়ে ও বিচ্ছেদে যেতে পারে না। তাদের একরকম জোর করেই সংসার করতে বাধ্য করানো হয়। কাজেই একজন মানুষ হিসেবে মানবিক বোধ থেকেই একজন নারী তার অবদমিত জীবন থেকে মুক্তি কামনা করতে পারে। গল্পটিকে বর্তমানে পৃথিবীসেরা নারীবাদী গল্পের কাতারের শুরুর দিকে ঠাঁই দেন কোনো কোনো সম্পাদক ও সমালোচক। একই ধরনের প্লট নিয়ে গল্প লিখেছেন আরেক বিখ্যাত গল্পকার আন্তন চেখব। ‘ওন ক্রিসমাস ইভ’ নামের সেই গল্পে তিনি প্রায় সমধর্মীয় বিষয় নাড়াচাড়া করেছেন।







নারীবাদী বিশ্লেষণ বা ফেমিনিস্টিক স্ট্যাডি

নারীবাদী সাহিত্যতত্ত্ব দ্বারা কেট চপিনের ‘এক ঘণ্টার গল্প’ খুব সহজেই বিশ্লেষণ করা যায়। গল্পে ম্যালার্ডের পরিবারকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তাতে বোঝা যায়Ñ পরিবারটি মধ্যআয়ের চাকুরে পরিবার। জনাব ম্যালার্ড রেলরোড ওয়ার্কার। মিসেস ম্যালার্ড গৃহিণী। তাদের কোনো সন্তান নেই। তারা পরস্পর পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। স্বামী ম্যালার্ডের হঠাৎ মৃত্যুসংবাদে স্ত্রী ভীষণভাবে ভেঙ্গে পড়েন। সংসারে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন হারিয়ে তিনি বিমর্ষ হয়ে পড়েন। এরপর তার ভেতরে একটা মিরাকল ঘটে যায়। তিনি আবিষ্কার করেন, এক সীমাহীন স্বাধীনতাকে। এতদিন তিনি তার স্বামীর হাতের পুতুল ছিলেন, এখন তিনি মুক্ত। তার জীবন এখন তিনি তার মতো করে সাজাবেন। স্বামী মৃত্যুর মুহূর্তে একজন স্ত্রী তার স্বাধীন জীবন পেয়ে ভেতর থেকে ‘জয়’ বা আনন্দ অনুভব করছেনÑ এটা আপাতদৃষ্টিতে অমানবিক মনে হতে পারে। বিষয়টি ফেমিনিস্ট দৃষ্টিতে দেখার মতো কি-না তা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারেন কেউ কেউ। কিন্তু বিষয়টি গভীর থেকে দেখলে প্রশ্নটি আর থাকে না। যে সংসারে স্বামীই সব, স্ত্রীর কাজ শুধু সংসারের আসবাবপত্র ঠিকঠাক রাখা আর স্বামীর উপস্থীতিতে নিজেই আসবাবপত্র-স্বরূপ আচরণ করা, যে স্বামী-স্ত্রীর ভেতরকার সম্পর্ক প্রেম নয়, সমঝোতার; সেখানে একজন মানুষ সম্পর্কের চেয়ে স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিতেই পারেন। এবং একজন ব্যক্তির প্রশ্নে অবশ্যই স্বাধীনতা আগে। এটি তার অধিকারও বটে। নারীবাদে যে ধরনের পরিবারকে একজন নারীর জন্য আদর্শ বিবেচনা করা হয় সে ধরনের পরিবারের স্ত্রী ছিলেন না মিসেস ম্যালার্ড। বিবাহের মাধ্যমে সে আসলে গৃহবন্দি জীবন যাপন করছিল। স্বামীর মৃত্যুসংবাদ তাকে গৃহবন্দী জীবন থেকে ছিটকে বের করে আনে। যে জীবনের জন্যে সে বহুবছর থেকে তৃষ্ণার্ত ছিল, সেই জীবনের স্বাদই তাকে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখাতে শুরু করে। মিসেস ম্যালার্ডকে বেছে নিতে হয় জীবন ও মৃত্যু অথবা স্বাধীনতা ও বন্দিত্বের একটিকে।

কেট চপিনের ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা গল্পে এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে ইন্ধন যুগিয়েছে। চপিনের জন্ম ১৮৫০ সালে। মিসোসরিতে। শিশুকালে বাবা হারানোর কারণে তাকে বেড়ে উঠতে হয়েছিল পরিবারের নারীদের মাঝে। বিবাহিত জীবনে চপিন ছয় সন্তানের জননী। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা নারী। সেই সময়ে একজন নারী হয়েও তিনি ধুমপান করার সাহস দেখিয়েছিলেন। তিনি রাজপথে একা হেঁটে বেড়াতেন, রাজনীতি সমাজনীতি নিয়ে পুরুষ বন্ধুদের সঙ্গে তর্কে জড়াতেন। ব্যক্তিজীবনেও চপিন মাঝবয়সে এসে স্বামীহারা হন। এরপর তিনি লুইস ম্যালার্ডের মতোই সাময়িকভাবে ব্যথিত হলেও ইটারন্যালি স্বাধীনতার স্বাদ পান। নিজের স্বাধীন জীবনে পরকীয়া প্রেম করেন এক বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে। চপিনের লেখার প্রধান বিষয় ছিল প্রেম, যৌনতা, বিবাহ এবং নারীস্বাধীনতা।

১৮৯৪ সালে ‘এক ঘণ্টার গল্প’ প্রকাশিত হয়। সেই সময় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র মিসেস ম্যালার্ডের চরিত্রায়ন। কেউ কেউ অভিযোগ তোলেন যে, চপিন তার ব্যক্তিজীবন সাহিত্যে টেনে তার সামাজিক স্বীকৃতি চাচ্ছেন। চপিন যখন এসব কথা বলেছেন তখন পর্যন্ত আমেরিকাতে নারীবাদী ধারনা প্রাদপ্রদিপের তলায় আসেনি। তাঁর সময়ে নারীদের জন্য স্বাধীনতার কথা বলাই ছিল অপরাধের সামিল। সে কারণে চপিনের সাহিত্যের নারী চরিত্ররা ছিল তাঁর সময় থেকে এগিয়ে।

গল্পের প্রতীকি বিশ্লেষণ

বিবাহ

বিবাহকে একজন নারীর জন্যে সম্পূর্ণ নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখিয়েছেন চপিন। গল্পে ল্ইুস মালার্ডের স্বামী মিস্টার মালার্ড যথেষ্ট ভদ্রলোক। তিনি কখনো স্ত্রী লুইসের সঙ্গে বাজে ব্যবহার করেছেন এমন নজির গল্পে পাওয়া যায়নি। ইনফ্যাক্ট, লুইস তার স্বামীর স্বভাবের প্রশংসাই করেছেন। তারপরও লুইস ব্যক্তিস্বাধীনতার কারণে এই মৃত্যু উদযাপন করেন। তিনি আসলে স্বামীর মৃত্যুকে উদযাপন করেননি, উদযাপন করেছেন বিবাহ নামক সামাজিক আচারের মৃত্যুকে। লুইস স্বামী মালার্ডের বিপক্ষে নন, তিনি সাধারণ অর্থে কোনো পুরুষের বিরুদ্ধে কথা বলেননি। তিনি অবস্থান নিয়েছেন বিয়ে নামক সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে।

কান্না

গল্পের প্রায় সিংহভাগই লুইস কেঁদে বা কান্নার কথা ভেবে অতিক্রম করে। কান্না থামে তখন যখন লুইস তার ভেতর থেকে স্বাধীনতা অনুভব করে। ব্রেন্টলি ম্যালার্ডের সঙ্গে তার বৈবাহিক জীবনে কান্না ছিল অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ। কিন্তু যখন সে ভেতর থেকে স্বাধীনতা অনুভব করে তখন থেকে সে আর কান্না অনুভব করে না। মৃত্যুসংবাদ শোনা মাত্রই অতি নাটকীয়ভাবে কেঁদে ওঠে লুইস। কারণ সে জানে, অধিকাংশ নারীই স্বামীর মৃত্যুসংবাদ শুনে এভাবে কাঁদে। কান্নাটা এক্ষেত্রে সামাজিক একটি আচার বা রিচ্যুয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হার্ট সমস্যা এবং আয়রনি

হার্টজনিত সমস্যা গল্পে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। লুইস ম্যালার্ডের হার্টের সমস্যা থাকায় তার বোন ও ভগ্নিপতি স্বামীর মৃত্যুসংবাদ দেওয়ার আগে চিন্তায় পড়ে যায়। যখন লুইস তার ভেতর থেকে স্বাধীনতা অনুভব করে তখন তার হৃদযন্ত্র আগের চেয়েও সক্রিয় হয়ে ওঠে। শেষে আবার যখন লুইস তার ‘মৃত’ স্বামীকে চোখের সামনে দেখতে পেয়ে নিজেই মারা যায় তখন ডাক্তার বলেন, স্বামীকের ফিরে পাওয়ার আনন্দে হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছেন তিনি। ডাক্তারের এই ধারনাটি হল আইরনি। অবস্থানগত আইরনি (সিসুয়েশনাল আইরনি) বলা যেতে পারে। কেননা, ডাক্তার মনে করছেন অতি আনন্দ অনুভব করার কারণে লুইস মারা গেছে। কিন্তু বাস্তবে ঘটনাটা উল্টোÑঅতি আনন্দ অনুভূতি সমাপ্তির কারণে লুইস মারা গেছে। আরও একটা আইরনি হল, যে মুহূর্তে লুইস বেঁচে থাকার স্বাদ পেলো ঠিক সেই মুহূর্তে তাকে মৃত্যুর স্বাদ ভোগ করতে হল। এটিকে ভাগ্যের পরিহাস বা আইরনি অব ফেইট বলা চলে।

খোলা জানালা

স্বামীর মৃত্যুসংবাদ শোনার পর থেকেই খোলা জানালা স্বাধীনতার বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করেছে। জানালা দিয়ে লুইস নীল আকাশ দেখতে পাই। দেখতে পাই হালকা সর পড়া মেঘের স্তর ও সবুজ গাছের চূড়া। সে পাখি ও পথিকের কণ্ঠে ভেসে আসা গান শুনতে পায়, গন্ধ পায় বৃষ্টির। সে তার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সবকিছুতেই জীবনের স্বাদ পায়। এরপর সে অনুভব করে, খোলা জানালা নিজেই তার জন্যে ভিন্ন এক জীবন নিয়ে উপস্থিত হয়েছে।

গঠনরীতি ও গঠনশৈলি

গল্পটি আকারে বেশ সংক্ষিপ্ত। কিন্তু গল্পে একঘণ্টার নাটকীয়তা ধরে রাখার জন্য চপিন উপযুক্ত গঠনরীতি ও বর্ণনারীতি অনুসরণ করেছেন। ছোট ছোট প্যারাগ্রাফের ভেতর দিয়ে গল্পটি এগিয়ে গেছে। গল্পে স্বামীর মৃত্যুর মাঝেও ল্ইুস যখন নিজেকে ‘ফ্রি’ বলে, তখন পাঠক বিস্মিত হয়। আবার স্বামীর ফিরে আসা দেখে যখন তার মৃত্যু ঘটে তখনও পাঠকরা বিস্মিত হয়। গল্পে এই দৃশ্যটির লজিক্যাল ভিত্তি হল, গল্পের শুরুতেই জানান দেওয়া যে লুইসের হৃদজনিত সমস্যা আছে।



অপ্রত্যাশিত সমাপ্তি বা টুইস্ট

টুইস্ট এন্ড বা অপ্রত্যাশিত সমাপ্তি বলতে বোঝায়, গল্পের প্লটের শেষের দিকে এসে হঠাৎ মোচড় নেওয়া বা বাক বদলানোর বিষয়টি। পাঠক এক ধরনের সমাপ্তির সম্ভাবনার কথা ভেবে এগুতে থাকে আর শেষ হয় অন্যভাবে। বর্তমান গল্পে লুইস ম্যালার্ডের স্বামীর মৃত্যু হয়েছে নিশ্চিত ধরে পাঠক এগুতে থাকে। তারা আশ্চর্য হয় এই ভেবে যে, একজন স্ত্রী তার স্বামীর মৃত্যুশোকে কাতর না হয়ে তাতে আরও খুশি হচ্ছে। তখনও তারা জানে না, এর চেয়ে বড় আশ্চর্যের বিষয় তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। চপিন খুব কৌশলে সেটি বুঝতে দেননি। তখন পর্যন্ত তার ফোকাস ছিল স্বামীর মৃত্যুপরবর্তী স্ত্রীর প্রতিক্রিয়ার ওপর। কিন্তু একেবারে শেষে এসে মিসেস ম্যালার্ড ঘর থেকে বের হয়ে এসে যখন দেখতে পায় তার স্বামী তার সামনে দাঁড়িয়ে, যাকে এতক্ষণ সকলে মৃত বলেই জেনে এসেছে। মিসেস মালার্ডের মতো তখন পাঠকরাও চমকে ওঠে। বড় চমকটা আসে যখন জানা যায়, মিসেস ম্যালার্ড বিস্ময় সামলাতে না পেরে স্ট্রোক করে মারা গেছে।

এপিফ্যানি বা নিদ্রভঙ্গ বা বোধোদয়



এপিফ্যানি হল একটি ফিকশনের এমন একটি মুহূর্ত যেখানে ঐ ফিকশনের কোনো চরিত্রের হঠাৎ কোন ঘটনার প্রেক্ষিত্রে বোধদয় বা গভীর কোনো উপলব্ধী হয়। এপিফেমি বা আত্মোপলব্ধির আগ মুহূর্তে ঐ চরিত্র হতাশাগ্রস্ত ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় থাকে। কিন্তু এফিফেমির পর তার মনে হয় তার ভেতর ঐশ^্যরিক কিছু ঘটে গেছে। সে এখন সকল সংশয় থেকে মুক্ত।



আলোচ্য গল্পে মিসেস ম্যালার্ডের জীবনে তার স্বামীর মৃত্যুসংবাদ এপিফ্যানির কাজ করে। স্বামীর মৃত্যুসংবাদ শোনার খানিক পরেই মিসেস ম্যালার্ডের ভেতরে সহসা উপলব্ধিতে আসে যে তিনি সেই মুহূর্তে থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন। মৃত্যুসংবাদ শোনা মাত্রই মিসেস ম্যালার্ড কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে, অসহায়ত্ব বোধ করে। কিন্তু খানিক পরে সে খোলা জানালার পাশে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ করেই ভেতর থেকে শান্তি অনুভব করে। এটিই হল এই গল্পের এপিফ্যানির ঘটনা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন