বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৫

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের গদ্য-- শহীদুল জহির : তার গল্পের পতনশীল মানুষেরা

শহীদুল জহিরের গল্পে চমৎকার কিংবা আঁতকে উঠার মতো ঘটনাই ঘটে; এমনকি আমাদের শঙ্কিত হওয়াও ক্রমশ বর্ধনশীল হয়। তবে আলোচনার স্বরণ করা যায় যে তাঁর গল্পগ্রন্থ পাঠে কিছু না কিছু কাজ হয়। তার গল্প শুধু গল্প নয়; নুয়ে পড়া মানুষের সমন্বিত পতনের শব্দে আমাদের সম্মোহিত-বিমোহিতও করে। কখনও কখনও ক্লান্ত এলোমেলো করে আমাদের।
আমরা আবারও নুতনভাবে নিজেদেরকে দেখার পরিকল্পনা বোধ করি। প্রসঙ্গত বলতে হয়, এমনই এক গল্পকারের প্রথম গল্পগ্রন্থটি মুক্তধারা থেকে বেরোয় ১৯৮৫ সালে- গল্পগ্রন্থের নাম পারাপার। অবশ্য তখন গল্পকার শহীদুল হক নামে লিখতেন। তিনি তার পরবর্তী গ্রন্থ জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় থেকে তিনি শহীদুল জহির নামে লেখেন। এ পর্যন্ত তিনি গল্পগ্রন্থ লিখেছেন তিনটি- তার অন্য দুটি গল্পগ্রন্থ হচ্ছে ডুকুর খেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প এবং ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প। পাঠক শহীদুল জহিরের গল্প পাঠান্তে একই বোধের আওতায় থাকতে পারেন বলে হয় না। ক্রমাগত নানামুখী সঙ্কটকে প্রত্যক্ষ করেন। তারা ভাববেন, ভূতের গলি কিংবা সুহাসিনী, ময়মনসিং-এর ফুলবাড়িয়া কিংবা চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার মানুষজনের মতো স্বপ্নভঙ্গের তাড়নায় রক্তাক্ত কিংবা হতবিহ্বল হবেন।

পারাপার গল্পগ্রন্থটির ৫টি গল্পই ভিন্নস্বাদের গল্প। গল্পপাঠের এক সহজিয়া ধারণা এখানে আছে। যেন গল্প বলতে শেষ পর্যন্ত তেমন কিছুই থাকবে না, কিন্তু শেষতক এক বড়ো ধরনের মোচড় লক্ষ করা যায়। এ গল্পসমূহে শহীদুল জহিরের কাজের ধরন খুব বেশি স্পষ্ট হয় না- ম্যান্টাল অ্যারেঞ্জমেন্টটা টের পাওয়া যায়, কমিনিউকেশন সম্পর্কে একটা ধারণা জন্মে। লেখার জোর, বিষয়-আশয় অস্পষ্টতার ভিতর বিদ্যুতের সজীব রেখার মতো ঝিলিক দেয় কেবল। প্রথম গল্প ‘মাটি এবং মানুষের গল্প’র কথায় ধরা যাক, অনেকটাই শাদামাটাভাবে যে শুরু হলো আখ্যানটি তা গল্পকারই জানিয়ে দেন। বাপের বাড়ি বেড়াতে এসে আম্বিয়া প্রতিবেশি বড়ো লোক খাঁদের ভিটায় বেড়াতে যায়। আফতাব খাঁ-ই সবচেয়ে উঁচুপদের। কিন্তু তার ছেলে মালেক মিয়া আর পুত্রবধু ময়নার ছেলেটি কালো। কিন্তু আম্বিয়ার ছেলেটি রোগা ছিপছিপে হলেও ফর্সা। নাম তার লাল। এই ফর্সাত্ব মালেকের মা আছিয়ার পছন্দ হয় না। ছিনালের পোলা সুন্দরই হয় বলে উস্মা প্রকাশ করে। তখনই গল্পটির আসল মোচড়টা বোঝা যায়, আম্বিয়া জানায় যে- কালো শরীরের কালো মানুষগুলোর নেংটি পড়া কোমরতো ফর্সাই। এমনকি আমিয়া জানায় আছিয়া বেগমেরও ঐ কালো কালো ফর্সা কোমরের মানুষটির সাথে সঙ্গমে তারও লালের মতো ফর্সা বাচ্চা হতে পারে। আম্বিয়ার সর্বাঙ্গে যে একরোখা-জেদি এমন ইতিহাস আর স্পৃহা জমে আছে তা শুরুতে বোঝার কোনো উপায়ই ছিল না। একপর্যায়ে গল্পকার আম্বিয়ার মনোভঙ্গিটি এভাবে জানান, ‘জোবেদ আলী রোদে পুড়ে পুড়ে বাদামী হয়েছে, বাদামী থেকে কালো।’ একটা অধঃপতিত-নীরিহ জাতিসত্তার সমূলে দাঁড়ানোর চমৎকার ইঙ্গিত পাওয়া যায় এখানে। ঘেয়ো রোদের প্রার্থনা নিয়ে এধরনের আরও কিছু অবদমিত ভাবনার জাগরণের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। লোকটা বা নবাব বা আলফাজউদ্দীন আহম্মদ তেমনি কিছু ধারণা তৈরি করে। আনন্দ পাল লেনের জীবন বদলে যায়, সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের সঙ্কেতময়তা, জীবনকে দেখার এই ভঙ্গিসমূহও ভালো লাগল। ‘ভালবাসা’ গল্পটিও ভালো লাগার উপাদান আছে। হাফিজুদ্দী আর জোবেদার দাম্পত্যজীবনের অতিসাধারণ কথকতা মনে হতে পারে এটি। শহীদ মিনারের পরিত্যক্ত ফুল এনে হাফিজুদ্দী বোতলের পানিতে রাখে। স্বামীর অগোচরে নিতান্ত কৌতূহলে ফুলটি খোঁপায় পড়ে এবং স্বামীটিও একসময় এতে সায় জানায়। ভালবাসার একটা রূপ স্পষ্ট হয়। নিরুত্তাপ, নিতান্ত অবহেলাই গল্পটির অবয়ব নির্মিত হতে থাকে। গল্পকারের আলাদা কোনো মোহ যেন নাই। পারাপার গল্পটি মানবিকতার এক সহজ পাঠ। এটি পাঠে যমুনাসেতুপূর্ব রেলওয়ের ফেরির জীবন স্পর্শ করতে পারে কাউকে কাউকে। ফেরি পারাপারের একটা নিবিড় চিত্র এখানে ফুটে উঠেছে। গল্পটির অন্তরপ্রবাহ বেশ নিখুঁত। মানুষের অবিশ্বাস হালকারেখার মতো ছড়িয়ে থাকে। তোরাব সেখ নামের গল্পটির মেজাজ বা তোরাব সেখের ভাবনাকে ইলিয়াসের ‘দোজখের ওম’-এর সহযাত্রী গল্পই বলতে হয়। চৈত্রের খররোদের মতো, জ্যাতা গাছের মতো, হাঁসফাঁস করতে করতে আরাম খোঁজার মতো তোরাব সেখ তার জেদ-একরোখা ভঙ্গিটি বহাল রাখে। তার অমতে তার মেয়ে লালবানু ডাকাতের মতো দোজবরের কাছে কেন চলে যায় তা তার কাছে স্পষ্ট হয় না। তার পরিবারের সাথে শেষ লড়াইটাতেও ও হেরে যায়। তাই তো চিরদিনের মতো বাড়ি ছেড়ে চলে যায় সে। সবচেয়ে বড়ো কথা হচ্ছে, সেই সময়কার লেখা গল্পগুলো বেশি জেদী, বহুমুখী আর স্পষ্ট ছিল। চরিত্রগুলো আলাদাভাবে বেড়ে উঠার সাহস কিংবা ধারণা ছড়িয়ে দেয়। গল্পগুলোর অবয়ব বা বেড়ে উঠার ধারণা যে আমাদের চারপাশে একেবারে ছিল না তা বলা যাবে না। সতীনাথ কিংবা মানিকের দেখার ঢং অনেকটাই এ-রকম হলেও তার স্বরটিও ক্রমশ আলাদা হয়ে যাচ্ছিল। গল্পগুলোর ভিতর করে ঘেয়ো রোদের প্রার্থনা নিয়ে, মাটি আর মানুষের রং আর তোরাব সেখ নামের গল্পত্রয়ে বেশ অহঙ্কারের মতোই একটা প্রেরণা লক্ষ করা যায়।

ডুমুর খেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প নামের গ্রন্থেও বেশকিছু গল্প মিথোলজির আদলে গল্পের স্বপ্নবাস্তবতা দীর্ঘজীবী হয়। তার ‘ডুমুর খেকো মানুষ’ নামের গল্পটার কথায় ধরা যাক- মনে হবে, এ হচ্ছে মোহাব্বত আলী জাদুকরের এক আজগুবি চালাকি। মিষ্টি জগডুমুর বিক্রি করে মানুষের ডুমুরপিপাসা বাড়িয়ে দেয়, ব্যবসা করে। প্রীতিলতা বা আবদুল নিয়ে জাদু দেখায় তারও তো পারিবারিক অস্তিত্ব নিয়ে জাদুকরের বাড়িটাতে। ভিক্টোরিয়া পার্কে জাদুর যে চমৎকার বর্ণনা শুরু করেন তা একেবারে শেষ পর্যন্ত বজায় রাখেন গল্পকার। শহীদুল জহিরের একটা অসাধারণ ক্ষমতা প্রকাশ পায় তার ভাষায়। পাঠককে একেবারে আটকে রাখেন গল্পপাঠে। গল্পের একেবারে দৃশ্যমান হয় জাদুবাস্তবতার এক অপূর্ব শব্দচিত্র। পাঁচজন ডুমুর খেকো মানুষ জাদুকরের প্রাসাদে গিয়েও ডুমুর গাছ না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়। আবদুল গফুরের নেতৃত্বে জাদুকরকে হত্যা করে। তারা ঘটনাটিকে স্বপ্নমোড়ানো ভাবলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কারণ তাদের লোহার রড, খঞ্জর আর নিজেদের গায়ে-জামায় লেগে থাকা রক্তই বুঝিয়ে এ বাস্তব। তারা বাড়িতে যার-তার বিছানায় চাদর বিছিয়ে শুয়ে থাকে। একসময় বাড়ির লোকগুলো আবিষ্কার করে যে সেখানে ধূসর বর্ণের এক খণ্ড হাড় পড়ে আছে। জীবন ভিতর থেকে এমনি এক জাদুর পরশ আবেশ ছড়ায় অনবরত। ‘চতুর্থ মাত্রা’ নামের গল্পটি যেন শব্দের এক জ্যান্ত চলচিত্র। মানুষের, সমাজের এমনকি রাষ্ট্রের গায়ে যে হিসাব-নিকাশের একটা বিষয় থাকেই তাই অত্যন্ত শিল্পসম্মতভাবে এঁকেছেন তিনি। দেখা যাচ্ছে, যেই পেপারওয়ালা পেপার ক্রয়ের সময় বলছে কাগজ বেশ সস্তা, আর বিক্রেতা বলছে এত কম দামে পোষায় না, আবার পেপারওয়ালা যখন কাগজ বিক্রি করছে তখন এরা পারস্পরিক উল্টা কথাটাই বলছে। ভাঙা গ্লাস কিংবা জমির মালিকও নিজের স্বার্থটাই নিজের ইচ্ছা মতো দেখছে। তবে এ গল্পের সবচেয়ে বড়ো দিক হচ্ছে একটা গল্প ধীরে ধীরে বুনে যাওয়ার অদ্ভুত মুনসিয়ানা। যত ধীরে ধীরে তিনি গল্প বলে গেলেন এখানে একটু অধৈর্য হলেই গল্পের অন্তর্গত শিল্পবোধটি মিইয়ে যেতে পারে। জীবন এক খণ্ড আয়োজন, ক্রমে ক্রমে তা শেষের দিকেই যায়। জীবন নিয়ে একটা স্তব্ধ হাহাকারও আছে গল্পটিতে।

শহীদুল জহিরের গল্পে স্মৃতিকাতরতা তুমুলভাবেই লক্ষ করা যায়- তবে তার এ নস্টালজিক বিষয় খুব বেশি বর্ধনশীল হয় না। কারণ গল্পের অবয়ব অবশেষে নির্মিত হয় একটা রাষ্ট্রীয়-সামাজিক বিষয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেয়ার জন্যই। ‘ধুলোর দিনে ফেরা’ গল্পটির কথায় ধরা যাক- মনে হবে মিয়া বাড়ির মেজছেলে আবদুল ওয়াহিদ নকশাল আন্দোলন থেকে বাড়ি ফিরে এলেও একটা পারিবারিক কিংবা গ্রামীণ সহজিয়া জীবনের গল্পনির্মাণই গল্পকারের লক্ষ। কিন্তু এমন হালকা মেজাজের ভাঙতে পাঠকের খুব বেশি সময় লাগেনি। এমনকি এও বলা যায়, গল্পকারের এত টালবাহানা করার স্পৃহাই নেই। তাই প্রথম প্যারাগ্রাফেই জানিয়ে দেয়া সে আসলে সুহাসিনীতে এসেইছিল মরার জন্য। এর ভিতর তরঢ় সেই সশস্ত্র সংগ্রামে জড়িয়ে পড়ার আমুল তৃষ্ণা, মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষার তুমুল বিস্তার সবই ঘটে। কিন্তু যাদের জন্য তারা কাজ করে অর্থাৎ বাম-উগ্রপন্থিদের সম্পর্কে গ্রামবাসীর একধরনের আগ্রহ থাকলেও তাদেও কোনো ইনভলম্যান্ট থাকে না। এমনকি সাধারণ অর্থে তাদেরকে ডাকাত হিসাবেই মানুষজন জানে। গল্পকারের অতি আকাঙ্ক্ষার ব্যাকুলতাও গল্পটিতে ফুটে ওঠে। নুরজাহানের সাথে আবদুল ওয়াহিদের সম্পর্ক, বন্ধু আবুল হোসেনের কথকতা, গোলাপ গাছ লাগানো নিয়ে ফুটন্ত-উজ্জ্বল জীবনের সঙ্কেত তৈরি করা গল্পটির অত্যন্ত পজেটিভ দিক। এখানে গ্রামীণ জীবনের সাথে আবদুল ওয়াহিদের মিশে যাওয়া, এমনকি তাদের মাথা-তুলে দাঁড়ানোর একটা ভঙ্গিই গল্পকার তৈরি করেন। আবদুল ওয়াহিদের প্রত্যাবর্তনের দৃশ্যটি খুবই চমৎকার। যেন ভালোবাসার পরশে তার আগমনকে ভরিয়ে দেয়া হচ্ছে। তেমনি তার মৃত্যুর বিষয়টা অনেক আগেই পাঠককে জানিয়ে দেয়া হলেও তার মৃত্যুর অসহায়ত্ব, তার প্রতি স্নায়ুছেঁড়া যন্ত্রণা তৈরি হয়। তেমনি সামাজিক দায়বদ্ধতার আরেক দলিল ‘আগারগাঁও কলোনিতে নয়নতারা ফুল কেন নেই’ নামের গল্পটি। এটিও অতি সাধারণ অর্থে মনে হতে নয়নতারা ফোটা কিংবা না-ফোটার এক অতি সাধারণ আখ্যান হচেছ এটি। কিন্তু গল্পটিতে রাষ্ট্রীয় আধিপত্য বিশেষ করে সামরিক শাসনবিরোধী এক প্রতিবাদ হয়ে পড়ে। আবদুস সাত্তার নামের কেরানীর বাসায় একসময় রীতিমতো যেখানে নয়নতারার জন্য প্রজাপতির হাট বসে যেত, সেখানে সময়ের তীব্র দাহনে একটা ফুলও ফোটে না। নগরায়ন হয়, প্রকৃতি বদলে যায়, ফুল না ফোটার কারণ বের করার জন্য উদ্ভিদবিজ্ঞানির পরীক্ষা-নীরিক্ষা চলে। ভূমিকম্পে আবদুস সাত্তার মারা যায়। তার মগজের ছোঁয়া পেয়ে দুইটি ফুলের চারা বর্ধনশীল থাকে। আসলে এ হচ্ছে একটা প্রতীকী আয়োজন। আবদুস সাত্তারের গাছ পাগল নির্মল মানুষের মাধ্যমে গল্পকার অবারিত-মুক্ত-শোষণ-ত্রাসনহীন জীবনের জয়গানই প্রজ্জ্বল হয়। গল্পটির বেড়ে উঠার সহজিয়া কিন্তু নিগূঢ় চেতনাবোধ গল্পটির অবয়বকে জেদী আর মর্মস্পর্শীও করেছে। ‘এই সময়’ গল্পটির চরিত্র বিশেষ করে মোহাম্মদ সেলিমের মাঝে মানবিক অবয়ব দেখার কোনো সুযোগই রাখেন না গল্পকার। ও আসলে সময়ের প্রতিনিধি। একটা সামাজিকবোধকেও রিপ্রেজেন্ট করে। তার জন্মটি একটা বিকট চিৎকার কিংবা হারানোর কলাকৌশলকে ধারণ করে। নয় মাসের তীব্র যন্ত্রণার পরই বাবুল আর হাজেরার সন্তান রূপে পৃথিবীতে আসে। হাজেরা আর বাবুল মিয়া ট্যাক্সিযোগে হাসপাতালে নেয়ার পথে চলমান বাসের ধাক্কায় মারা যায়। এখানে দুটি বিষয় ঘটে- সবার অজান্তেই অজ্ঞান হাজেরার সন্তান জন্ম নেয় এবং মৃত মায়ের স্তন থেকে সুগন্ধী দুধ খায় মোহাম্মদ সেলিম এবং সে তা তার বাকি জীবনে কখনও তা ভুলতে পারে না। বিজ্ঞানসম্মতভাবে তা কিন্তু সম্ভব নয়। কারণ সন্তানপ্রসব একটা প্রক্রিয়ার ব্যাপার। অজ্ঞান মানবীর প্রসব হতেই পারে, কিন্তু সবার অজ্ঞাতে তা কি করে সম্ভব? আর মৃত মানুষের সব প্রক্রিয়ায় স্তব্ধ হয়ে যায়। সেখানে মায়ের স্তনের দুধ নির্গমণ একটা শারীরিক প্রক্রিয়ার ব্যাপার। যার ফলে মানববিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গিতে দুটি পদ্ধতি মানা যায় না। তবে শিল্পের বাস্তবতাকে বিজ্ঞানের বাস্তবতা হিসাবে মানাটাও খুব বেশি জরুরি মনে হয় না। যাই হোক, ক্লাস টেনে পড়া মোহাম্মদ সেলিমের যাপিতজীবন, মাস্তানের হাতের পুতুল হওয়া, মৌলবাদী-সামরিক-অসামরিক-সামাজিক এলিটদের পেষণে এ সমাজ তার বেঁচে থাকা অসম্ভবই হয়। বিধবা শিরিন আকতারের সাথে গড়ে উঠা সহজাত প্রেম অতি নিষ্ঠুরভাবেই অধপতিত হয়। আসলে মানুষের সুস্থ স্বাভাবিক বোধ কেবলই থমকে যায়। এমনই এক সামাজিক-রাষ্ট্রীয় ভয়াবহতার চিত্র ফুটে উঠে। তবে এখানেও গল্পকার মোটেই উচ্চকণ্ঠ হননি। এটাই শহীদুল জহিরের এক অসামান্য পরিমিতিবোধ।

‘কাঠুরে ও দাঁড়কাক’ নামের গল্পটিতে বহুতল আছে। আছে সহজাত উইট এন্ড হিউমার, জলপাই রং নিষ্ঠুরতা, রূপকথার বাঙময়তাও তো আছেই। কখনও আকালু নামের চরিত্রটিকেই উটকো ঝামেলা মনে হয়। মনে হয়, সামাজিক বিন্যাসে ফালতু অস্তিত্বের মতো লেগে আছে সে। গল্পটির শুরুটি বেশ শাদামাটা- টেপি আর আকালু (এ নামটি বোধ হয় ইলিয়াস, মঞ্জু সরকার, মামুন হুসাইন, মশিউল আলম আর এ গল্পকারের মিলিত আকাঙ্ক্ষার ফলে কথাসাহিত্যের জাতীয় চরিত্রের রূপটিই পেল) নামের গ্রামীণ আটপৌরে জীবনই পার করছিল। বৈকুণ্ঠপুরের এ দম্পত্তির টেপি শুধু একটু আধাপাগলা, একা একা কথা কয়। কাঠ কাটতে যায় আকালু। জলপাইরং একটা কাপড়ের পোটলার ভিতর পলিথিনের ব্যাগে একশ টাকার অনেক নোট পায়। গল্পের মূল চরিত্র কিংবা রাষ্ট্রীয় লুটপাটের প্রতীক দাঁড়কাকই হয়ত তা আনে। নির্বোধ আকালু সেই টাকা ভোগ করতে ভয় পায়। উকিলের সাথে পরামর্শ করতে গিয়ে পান-বিক্রেতার খপ্পরে পড়তে পড়তে উকিলের শরণাপন্ন হয়। অর্ধেক টাকা নিয়ে নেয় উকিল, বাকি অর্ধেকের অর্ধেক পান-বিক্রেতা। উকিল পরামর্শ দেয় বছরখানেক পর রয়ে-সয়ে টাকা খরচ করার জন্য। কিন্তু সেই রাতেই ডাকাত এসেই বাকি টাকাগুলো নিয়ে যায়। পুলিশের ভয়ে গ্রাম ছেড়ে ঢাকা শহরে চলে আসে। এখানেও রিক্সা চালানোর সময় প্যাসেঞ্জারের টাকা কুড়িয়ে পেয়ে থানায় সরল মনে জানাতে গেলে পুলিশের দ্বারাই নিগৃহিত হয়। এভাবেই সুস্থ-জীবন ক্ষণে ক্ষণে জালে পেঁচায়। জেলখানা থেকে বেরিয়ে আলাদা ঝুপরিতে থাকার সময় দাঁড়কাক আবার তাদের আশপাশ জটলা পাকায়। তাদেরকে ঘিরেই রাখে। এইগুলোর সংগ্রহের অনেক কিছু ওরা পায়। এইগুলোর জন্য আশপাশের মানুষেরা পেতে চায়। এক পর্যায়ে রেগে ওদেরকে পুড়িয়ে মারতে চায় লোকগুলো। কিন্তু ওদেরকে পাওয়া যায় না। যেন দাঁড়কাকেরা তাদেরকে পোঁটলার মতো ঠোঁটে করে উঠিয়ে নিয়ে যায়। এভাবেই রূপকথাভিত্তিক এক অতিলৌকিক নিষ্ঠুরতা গল্পের অঙ্গে ছড়িয়ে দেয়া হয। গল্পের সনাতন কোলাহল শহীদুল জহিরের আর কোনো গল্পে দেখা যায় না। তবে গল্পটিতে জেলখানায় আকালু আর টেপির সেলে দেখা হওয়ার বিষয়টা যথার্থ হতে পারে না। পুরুষ আর মহিলা বন্দিরা এত আলাদাভাবে থাকে যে তাদের দেখা হওয়ারই কোনো স্কোপ নেই। ‘মনোজগতের কাঁটা’ নামের গল্পটিতে বাঙালি জাতিসত্তা, সংখ্যালঘুত্বের অফুরান যন্ত্রণা, মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী হিংস্রতাই মূলসুর। তবে সবকিছু ছাপিয়ে এদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মনোপীড়ন অত্যন্ত নতুন আঙ্গিকে দরদী লেখনীতে প্রকাশ পেয়েছে গল্পটিতে। সুবোধচন্দ্র আর স্বপ্নারানিকে ঘিরেই গল্পটি বি¯তৃত হয়। বি¯তৃত হয় না-বলে ক্রমাগত ঘুরপাক খায়, থমকে যায়, একটা অচিন ল্যাবিরিন্থ তৈরি হয়- এমন বলাটাই যুক্তিযুক্ত। এ গল্পের আরেকটি দিক হচ্ছে সৃজনশীলতার এক মাত্রা যোগ করতে পারা। গল্পটির শুরুতেই দেখা যাবে ভূতের গলির মানুষদের সঙ্কট কাটে না। এই ভূতের গলির মানুষগুলো কখনও একটা এলাকায় আবদ্ধ থাকতে পারে না। এরা আসলে দেশটাকেই রিপ্রেজেন্ট করে। সুবোধচন্দ্র ক্রমান্বয়ে একই নাম ধারণ করলেও আবদুল আলি নতুনভাবে তার ইয়োর চয়েস সেলুন সাজাতে পারে। এখানেও একটা সাঙ্কেতিক আবহ তৈরি হয় কিংবা বি¯তৃত হয় বলা যায়। কারণ ৮০ দশকের মার্শল ল জীবনকে নতুন ভাবে গড়ে, কিছু মানুষকে নির্লজ্জের মতো কিছু সুযোগ-সুবিধা দেয়। এখানে গল্পকার বলেও দেন, এই এলাকার জনসংস্কৃতির কাঠামোটি ভেঙে যায়। এটা বেশ স্পষ্ট বোঝা যায় যে, তিনটি সময়ে অধিক হারে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর নিপীড়ন-নির্যাতন নেমে আসে। ৬৫, ৭১ আর ৮০ দশকে তা ঘটে। শেষোক্ত সময়ে যখন বিজেপি-শিবসেনার লোকজন বাবরি মসজিদ ভেঙে দেয় তখন এদেশে একটা উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলা করে। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে তিনটি সময়েই গল্পের মূল চরিত্র সুবোধচন্দ্র আর স্বপ্নারানি একই নাম বহন করে। এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট যে এখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের জাতিগত অবস্থানটা অতি সহজেই, অনেকটা নির্লজ্জভাবে স্পষ্ট হয়ে যায়। এদেরকে বিভিন্ন সময়ে আবদুল আজিজের কুয়ার ভিতর মৃত পাওয়া যায়। অবশেষে এক গোলকধাঁধায় গল্প শেষ হয় । লোকায়ত বাঙলার অসাম্প্রদায়িক রূপটি বেশ সহজভাবে বহমান থাকে। গল্পটির ভাষা অত্যন্ত প্রখর-জ্যাšত। কোথাও এতটুকু ঝুলে পড়েনি।

২০০৪ সালে শহীদুল জহিরের তৃতীয় গল্পগ্রন্থ ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প প্রকাশিত হলো। এই গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ‘আমাদের কুটির শিল্পের ইতিহাস’ গল্পটি বহুমাত্রিক সরবতা নিয়ে আমদের গল্পসাহিত্যে এক আলোকময় অস্তিত্ব জানান দেয়। এটি শহীদুল জহিরের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় গল্পগ্রন্থেই আছে। কেন? এখানেই বাংলা গল্পসাহিত্যের একজন গল্পকারের শক্ত মেরুদণ্ড নিয়ে দাঁড়ানোর এক ইতিহাস জাগ্রত হয়ে থাকে। গল্পটি 'ডুমুর খেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প' নামের বইটিতেও একটা কমা দিয়ে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু প্রকাশনা সংস্থাটি এটিকে হয়ত উটকো ঝামেলায় মনে করেছেন! সনাতন ভাবনা হয়ত চমকেও ওঠে থাকতে পারে। যথারীতি এটি দাঁড়ি দিয়েই শেষ করা হয়। কিন্তু গল্পকারের ভাবনায় তা অনুচিত মনে হয়। শুধু একটি কম যথাস্থানে দেয়ার জন্যই তিনি তার তৃতীয় গল্পগ্রন্থ ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প নামক গল্পগ্রন্থেও অন্তর্ভুক্ত করেন। এটি মনে হবে দক্ষিণ মৈশুন্দিতে শিল্পায়নের শাদামাটা ইতিহাস বর্ণনার এক আয়োজন মাত্র। কিন্তু এর ভিতরেই আছে সমাজবিন্যাস, শিল্পের নামে যাপিতজীবনের চেনা বিশ্বাস বা আস্থাশীলতাকে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়ার ইতিকথা। সমগ্র গল্পটিই একটি মাত্র প্যারাতেই লেখা। তরমুজের মতো শাদামাটা ফলেও মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। চেনাজগতে অচিন গ্যাঁড়াকল দেখা দেয়। শিল্পায়নের ভিতর আজিজুল হক নামের কবি কিংবা আমিনুল হকের নামের স্বপ্নবাজ অথবা পুতুল নামের প্রেমিকা প্রায় অসহায়তার ভিতর, অনেকটা অচেনার ভিতরই শেষ হয়ে যায়। নগরায়ণের অনেক ভিতরে যেন একটা তীক্ষ স্রোত বয়ে যায়। নগর বাড়লেও আব্দুর রশীদের জন্য শেফালী ফুলগাছের জন্য একধরনের জান্তব যন্ত্রণা গল্পটির অবয়ব দখল করে। গল্পটিতে তরমুজ একধরনের প্রতীকমুখরতা নিয়ে আসে। তরমুজ এখানে বহুমাত্রিক জীবনের ভাবনাকে এমনকি সহজাত চলমান জীবনকে বিপর্যস্ত করে। একে ঘিরেই একটা জাতির চলমানতা, সহজিয়া ভাবনা প্রশ্নদীর্ণ হয়। শিল্পায়ন ঘটে। রহীমা বিবি তথা আবদুল গফুরের জায়গা দখল করা হয মসজিদের নামে। কবি আজিজুল হককে পাগলাগারদে রেখে আসা হয়। আমিনুল হক সাপের কাপড়ে বাগানে মারা যায়। শিল্পায়নের নামে সারা এলাকা মূলত উঠতি পুঁজিপতিদের দখলে যায়। আবদুল গফুর মাস্টারের পরিবারটি নানামাত্রিক জটিলতায পতনশীল হতে হতে একেবারে নিশেষিত হয়। ‘কোথায় পাব তারে’ নামের গল্পটি কি আসলেই দক্ষিণ মৈশুন্দিতেই শুরু হয়, নাকি মহাখালি বাসস্ট্যান্ডে নাকি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িতে? আমার তো তা মনে হয় না। এ গল্প যেমন কোনো প্রেমের গল্প নয় তেমনি এর শুরু বা শেষ কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় নয়। তামাম পূর্ববাংলা অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশটাই এর অবয়ব নির্মাণ করে। আবদুল করিম একসময় যে শেফালী বেগমের খোঁজে বের হয় ও আসলে এদেশের মানচিত্রই বলা যায়। দক্ষিণ মৈশুন্দিও লোকগুলো বাংলাদেশের লোকায়ত জীবনের অতি সাধারণ মানুষের সহজাত অস্তিত্ব। তারা যে ভঙ্গিমার ভিতর কথা বলে, দুলাল নামের লোকটাকে আবদুল করিমের সাথে দেয় কিংবা সেই যায়, একসময় ময়মনসিংহ পৌঁছে, ফুলবাড়ির শেফালিদের বাড়ি খুঁজে পাওয়ার একটা অবস্থা তৈরি হয়, এর সবই গল্পটির একধরনের মেকাপ। সবকিছু মিলেই স্বপ্নের দেশ তৈরি হয় কিংবা মায়াময় সেই দেশের একটা বাসনা চোখের সামনে ঝুলে থাকে। গল্পটি পাঠের সবচেয়ে সুখদায়ক ঘটনাটি বোধ হয় চমৎকার এক বুদ্ধিবৃদ্ধিক বৈরাগ্য একেবারে সঘন অবস্থায় মিলমিশ খেয়ে থাকে। শেফালীকে না-পেলেও একধরনের অপেক্ষা তৈরি হয়। এটাই এই গল্পের প্রয়োজনীয় এবং বড়ো ম্যাসেজ। ‘আমাদের বকুল’ নামের গল্পে সুহাসিনীর মানুষজন গল্পটির চরিত্র হয়ে এলেও এরা আসলে গ্রাম-বাঙলার মাঠে-ঘাটের অতি-সাধারণ ভেদ-বুদ্ধির মানুষজন। অনাদিকালই এদের শিক্ষক। তাই তো অতি সহজে অতি নিষ্ঠুরতার ভিতরও আকালুকে বলতে পারে আকালু তার বউ ফাতেমাকে মেরে ফেলেছে কিনা, বিক্রি করে দিল কিনা, মাদ্রাসার শিক্ষক রফিকুল ইসলামের সাথে তার স্ত্রী চলে গেল কিনা? গ্রামীণ বাংলার বর্তমান একটা রূপ যেমন পাওয়া যায় তেমনি স্পষ্ট এদেশের নারীর প্রতি নিষ্ঠুর নিপীড়নের রূপটি। আকালু বারবার বিয়ে করে। বউ কিংবা বিয়েতে দেয়া যৌতুকও মোটামুটি একই থাকে। আসলে এতে এই ম্যাসেজটিই বোঝা যায়, গ্রামীণ এইসব মেয়েমানুষ আর পশুতে যেমন কোনো পার্থক্য থাকে না, তেমনি তাদের আলাদা অস্তিত্ব চিন্তা না-করলেও চলে। এমনই এক অতি চেনাজানা গল্প বলেছেন গল্পকার। আকালু আর ফাতেমার মেয়ে বকুলও সুহাসিনীর লাল পিঁপড়ে অনবরত খেতে থাকে। অর্থাৎ ফাতেমা কিংবা সখিনা কিংবা বকুলও একই জীবনের ধারাবাহিক রূপ হয় কেবল। ‘মহল্লায় বান্দর, আবদুল হালিমের মা এবং আমরা’ নামের গল্পেও গল্প বলার ধরনটি মোটামুটি একই। এতে রাষ্ট্রীয় সামাজিক ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী বিভিন্ন সময়ের সন্ত্রাস-নিপীড়ন-বৈষম্যই এই গল্পের মূলস্বর। গল্পের বানরসমূহ আসলেই লুটপাটের জীবনকেই সরাসরি দেখিয়ে থাকে। ‘ইন্দুর-বিলাই খেলা’ নামের গল্পটিও পূর্বতন গল্প অর্থাৎ মহল্লায় বান্দর, আবদুল হালিমের মা এবং আমরা-এর আরেক দিক বলা যায়। গল্পটির শুরুতেই একটা ছক আছে যেখানে ইন্দুর আর বিলাই খেলা করে। ভূতের গলির একদল ছেলেপেলে দুইভাগ হয়ে খেলাটি খেলে। এটি মূলত সামাজিক বৈষম্যের এক রূপচিত্র। যেখানে বিলাই হচ্ছে শোষণকারী, রাষ্ট্রবিরোধী, বাংলাদেশের যুদ্ধবিরোধী রাজাকার-আলবদরদের প্রতীক। দুই পক্ষ হয়ে অনেকটা খামখেয়ালিবশত ওরা এই খেলাটি খেলে। স্বভাবতই খেলায় বিলাই পক্ষ জিতে। তবে গল্পটির আরেকটা দিক হচ্ছে পাকিস্তান আর্মি কর্তৃক রেপ হওয়া খতিজার চরিত্রটি। চরিত্রটি অনেকটা অবরুদ্ধ অবস্থায় রাজাকারদের পাক করে খাওয়াতে বাধ্য হয়। তাদের দ্বারা লাঞ্ছিত হয়। স্বাধীনতার পরবর্তীকালে খতিজার এই অপরাধে মুক্তিযোদ্ধা শামসুল আলমের বিচারের অধীনে চলে যায়। তাকে শামসুল আলমের বাড়িতে তিনদিন রীতিমতো আটকে রাখে। একসময় মাসুদ আর মুনির হোসেন তাকে হয়ত উদ্ধারই করে এবং নিয়ে যায়। পরবর্তীসময়ে শামসুল আলমের বাপ সিরাজ ব্যাপারি ছেলের বিয়ের জন্য খতিজার বাবার কাছে। খতিজা বিয়েতে রাজি হয় না। এখানেই এক রূঢ় এক বাস্তবতার জন্ম নেয়। এটিই হয়ত গল্পটির মূলস্বর। খতিজা একহিসেবে ধারাবাহিক লাঞ্ছনারই শিকার হয়। আল্লার কাছে বিচার চায় খতিজা। ভূতের গলিতে ইন্দুর-বিলাই খেলা চলেই। কারণ এটি বন্ধ হবার নয়। ভাষার এমন এক অসাধারণ গা শিউরে উঠা নির্মাণ করেন গল্পকার। ‘ডলু নদীর হাওয়া’ (কথা নামের ছোটকাগজে এর নাম ছিল ‘ঐ ডলু নদী দেখা যায়’) গল্পটি রূপকথার আদলে জীবনঘনিষ্ঠতার এক শব্দময় চিত্র। তৈমুর আলী চৌধুরি জোর করেই মগ মেয়ে এলাচিং বা সমর্ত বানুকে বিয়ে করে। এরও আগে সমর্ত বানুর ঘরে ঢুকতে গিয়ে এর চারপাশে করে রাখা ফাঁদের পাল্লায় পড়ে বাঁ পা ভেঙে ফেলে এবং পরবর্তীসময়ে সমর্ত বানুকে বিয়ে করে। তবে সমর্ত বানু তাকে তাদের বিবাহিত জীবনের ৪০ বছর এক খেলা বা ধাঁধায় ফেলে রাখে। প্রতিদিন খাওযার সময় দুটি গ্লাসে রাখার পানির যে কোনো একটা খেতে দেয়। একটায় স্বাভাবিক পানি এবং অন্যটায় আছে তার হাতেই রাখা হীরার আঙটির বিষ। একসময় দুইটি গ্লাসের পানিই খেয়ে ফেলে সে এবং পড়ে-মরে যায়। তবে ডাক্তার পরীক্ষা করে রায় দেয় হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে তৈমুর আলি চৌধুরি। এর সপক্ষে আরও একটা প্রমাণ হচ্ছে সমর্ত বানুর একেবারে ছোট ছেলে মিরাজ মিঞা সবান্ধব এটি চট্টগ্রাম শহরের হাজারি গল্লিতে বিক্রি করতে নিয়ে এলে, হীরা ব্যবসায়ী জানায় যে এটি হীরা নয় কাচ। সেই কাচের টুকরা নিয়েই মিরাজ সাতকানিয়ায় ফেরে। গল্পটিতে আঙ্গিকগতভাবে যেমন নতুনত্ব আছে তেমনি এর মিথোলজিক্যাল ট্রিটমেন্টও চমৎকার। শেষ পর্যন্ত পাঠককে ধোঁয়াটে মায়াজাল থেকেও পাঠককে মুক্তি দেন গল্পকার। রূপকথার মায়াময় পরশ থাকলেও এতে বুদ্ধিবৃত্তিক আয়োজন পাঠকের বোধকেও শাণিত করে। ভাষায়, প্রকরণে, গল্প-বলার টেকনিকে সর্বোপরি জীবনের সামগ্রিক আয়োজনে এটি আধুনিক গল্পগাঁথার এক উল্লেখযোগ্য আয়োজন। গল্পটির একেবারে গভীরে একধরনের গীতল আবহ আছে, যা আসলে ট্র্যাজিক রসে সিক্ত। একজন মগ রমণীর স্বতঃস্ফূর্ত উদারতায় পরিপূর্ণ হয়ে থাকে। সুরত জামালের তার উদ্যমী প্রেম একসময় তৈমুর আলি চৌধুরির ষড়যন্ত্রে ও দাপটে চূর্ণ হয়ে যেতে থাকে। মগ জাতির এক স্বপ্নময় দৃঢ়তা তবু বহমান থাকে। নিয়তিবাদী মিথোলজিক্যাল কাব্যপ্রবাহ দেদীপ্যমানও হয়। সবকিছুর পর গল্পটির প্রকরণ, ভাষাশৈলী, পূর্ববাংলার জনসংস্কৃতির একটা সহজিয়া রূপে এটি পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

‘প্রথম বয়ান’ এক অর্থে ‘ইন্দুর-বিলাই খেলা’ আর ‘মহল্লায় বান্দর, আবদুল হালিমের মা এবং আমরা’-এর সহযাত্রীই। মূল প্রেক্ষাপট মুক্তিযুদ্ধ এবং এর ফলে প্রাপ্ত অপ্রাপ্তি। তবে এর মানবিক আয়োজন কিংবা ম্যাসেজটি আরও গভীর আর জীবনস্পর্শী। এখানে আব্দুর রহমান চল্লিশ বছর পর কেরোসিন বাত্তির লোহার খাম্বা খোঁজে। এটি যেন ‘মহল্লায় বান্দর, আবদুল হালিমের মা এবং আমরা’ নামের গল্পটির আরেক উইং। খুনে, হত্যা, সন্ত্রাস আর মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনার আরেক হাহাকার। আব্দুর রহমান ৪০ বছর আগের কেরোসিন বাত্তির খাম্বাটি খুঁজে পায় না। কেউ এ কাজে তেমন সহযোগিতাও করে না। একধরনের নীরব বা সরব অবহেলার শব্দচিত্রই এঁকেছেন তিনি। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সময়কার স্মৃতিও তেমন মনে রাখে না কেউ। বাত্তির খাম্বাটি আসলে মুক্তিযুদ্ধেও চেতনা নিয়ে গড়ে উঠা প্রকৃত জনমুক্তিরই প্রতিবিম্ব। আব্দুর রহমান আর ঝর্ণা বেগমের পারিবারিক কথকতা এখানে উঠে এলেও প্রকৃত ম্যাসেজটি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি খোঁজার এক কৌশল। মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি, পালিয়ে বেড়ানোর ইতিহাস, সোপিয়ার সাথে হালকাচালে সম্পর্কের কথা উঠে আসে। তবে আসল কাজটি হলো আব্দুর রহমান কর্তৃক কেরোসিন বাত্তির লোহার খাম্বারূপী দিকনির্দেশনা খুঁজে বেড়ানো। এভাবেই গল্পকার হারিয়ে অথবা ভুলে যাওয়া কিংবা ভুলিয়ে দেয়ার এক গল্পকথা বলে যান।

কথাক্রমে বলতে হয়, পারাপার গল্পগ্রন্থে কোনো সমন্বিত চরিত্র বা বহুবচনে গল্প বলার লোকজন ছিল না। গল্পকারের মানসিক কাঠামোতে চরিত্র, ঘটনা, আবহ, ক্লাইমেক্স, পরিণতি এমনকি উপদেশ দেওয়ার যে প্রবণতা দেখা যায় এখানে, তা ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে। তার দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থে রূপকথার আদলে ঘটনা ঘটে, জাদুবাস্তবতা এমনকি জাদুটোনার আবহ দ্বারা চরিত্র বা মানুষজন আক্রান্ত বা পরিপক্ব হয়। তার তৃতীয় গল্পগ্রন্থে ভাষার মাধুর্য্য যেমন প্রকাশিত হতে থাকে, তেমনি গল্প বলার দায়িত্ব নিজ-আবহ থেকে সামাজিক আবহে ছেড়ে দিতে থাকেন। গল্প কোনো আলাদা ব্যক্তিই বলে না, সেখানে সামাজিক কিছু প্রাণময় বিন্যাস লক্ষ করা যায়। এরাই গল্প বলে কিংবা বলে না। কখনও কখনও অতি মাত্রায় বেয়াড়া হয়ে উঠে। এই প্রবণতা তার ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প নামের গল্পগ্রন্থের প্রতিটিতেই বিরাজমান। এই যেমন, ‘কোথায় পাব তারে’ নামের জোছনাসুন্দর গল্প কিংবা ‘ডলু নদীর হাওয়া’ নামের রূপকথার আদলে গ্রিসীয় চেতনালোকের মিথোলজিক্যাল ট্রিটমেন্টপূর্ণ গল্পই হোক, সামাজিক চরিত্রই তাদের কেরামতি দেখায় বেশি।

তবে তার গল্পে সনাতনী পাঠ-অভিজ্ঞতায় জারিত হলে একধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। শাদামাটাভাবে তার গল্পে তেমন কোনো জমাটবদ্ধ গল্পই থাকে না। কখনও কখনও শ্রেণীগত অবস্থান কিংবা বাস্তবতাও যথাযথ স্পষ্ট হয় বলে মনে হয় না। এই যেমন, ‘এই সময়’ গল্পে বাবুলের স্ত্রী অজ্ঞান অবস্থায় সেলিমকে প্রসব করে এবং মৃত অবস্থায় নার্সরা তার সন্তানরা তাকে দুগ্ধ পান করায়। দুটি ঘটনায় বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গিতে অসম্ভব। কারণ প্রসব প্রক্রিয়া কোনো অজ্ঞান রোগীর কারও অজ্ঞাত অবস্থায় সম্ভব নয়। নারীর দুগ্ধ নির্গমণও একটা জৈবিক প্রক্রিয়া। ধুলোর দিনে ফেরা নামের গল্পে আবদুল ওয়াহিদ উচ্চশিক্ষিত এবং মজদুরের ছেলে হয়েও অনায়াসে বিড়ি টানে। এতে চরিত্রটির প্রতি রাজনৈতিক আস্থা বাড়লেও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কি একেবারেই থাকবে না। ‘কোথায় পাব তারে’ নামের গল্পে আবদুল করিম শেফালি বেগমের খোঁজে ময়মনসিং-এর ফুলবাড়িয়া যায়। ভূতের গলি থেকে দুলালসহ এদ্দূর গিয়ে ঝামেলা মনে করে সেইদিনই ঢাকার বাসে চলে আসে। এই নিয়ে মহল্লায় কিছু কথাবার্তা হয়, অলস ভাবনাবিনিময় চলে। ‘আমাদের বকুল’ নামের গল্পে আকালু ক্রমাগত বিয়ে করে, সেই বউ চলে যায় বা আকালুই মেরে ফেলে। এই নিয়ে সুহাসিনীর চাষী ধরনের লোকজন নানাবিধ কানাঘুষা চালায়। ‘প্রথম বয়ান’ নামের গল্পে আবদুর আব্দুর রহমান হারিয়ে যাওয়া একটা ইলেকট্রিক খাম্বা খুঁজে এবং মহল্লার লোকগুলোর কাছে তা বাড়তি কোনো ম্যাসেজ নিয়ে আসে না। ‘মহল্লায় বান্দর, আবদুল হালিমের মা এবং আমরা’ নামের গল্পে মহল্লায় হঠাৎ দেখা দেয়া বান্দর মানুষের গার্হস্থ্য জিনিসপত্র বগলদাবা করে নিয়ে যায়। এ নিয়ে কিছু যন্ত্রণা দেখা যায়। এভাবে গল্পসমূহের সরলপাঠের গভীরে ছড়িয়ে আছে আরেক গভীর ক্ষত যা আসলে মানুষের গভীর তল খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দেখার আবহ তৈরি করে। এই গভীর সঙ্কট, রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, জীবনের গভীর প্রত্যাশা তার গল্পকে ভিন্নমাত্রা দেয়।

তবে তার এ দেখার ভিতর মাঝে মাঝে অসঙ্গতিও আছে বলে মনে করা যায়। যেমন, ‘মহল্লায় বান্দর, আবদুল হালিমের মা এবং আমরা’ নামের গল্পে ঢাকা শহরে পাকিস্তানি আর্মিরা ক্র্যাকডাউন শুরু করলে মহল্লার লোকগুলো কেবল বিহ্বলতায় পড়ে এবং এখন কী হবে বলে একে অন্যকে জিজ্ঞেস করে। সেই সময় অর্থাৎ ১৯৭১-এর ২৫শে মার্চে তারা শুধু অবাক হয় না, প্রতিদিন মিছিল-মিটিং চলে, ওইদিন সন্ধ্যার পর থেকে ঢাকার অনেক জায়গায় ব্যারিকেড দেয়। এমন এক প্রতিরোধের বাংলাদেশ আর কখনও দেখা যায়নি। এখানে একটা ব্যাপার লক্ষ করার বিষয়- ৭০-এ সংসদীয় নির্বাচনে বাঙালির পক্ষে যে ম্যান্ডেট আসে তার মূল উপকরণ ছিল ৬ দফা। এর ভিতরই জাতীয়তাকে আশ্রয় করে বুর্জোয়া আকাঙ্ক্ষা জমাট বাঁধতে থাকে। কিন্তু তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিক-সামন্ত-আমলারা বাঙালিদের এই উত্থানে শঙ্কিত-অপমান বোধ করে। তারা ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়। সারাদেশে সামরিক নিপীড়ন শুরু করে। কিন্তু ততদিনে সাধারণ বাংলার জনমানসে মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় বিভোর হয়ে পড়ে। রাজনীতিক হতবিহ্বলতায় তারা হয় মুক্তিআন্দোলনমুখী। এটাই মুক্তিযুদ্ধের জনচেতনা। শহীদুল জহিরের গল্পে এই চেতনার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন বারবার প্রকাশ পেয়েছে। তার অঙ্কিত চরিত্রসমূহে এই ধরনের প্রস্তুতি চরিত্রসমূহ ধারণ করে না। এখানেই জহিরের গল্পে একধরনের সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। তিনি চরিত্রসমূহে একধরনের অবদমিত চেতনাও প্রত্যক্ষ করান। অনেক সময় চরিত্রসমূহকে একই তলে নেয়ার আকাঙ্ক্ষায় তাদের চরিত্রের আলাদা স্পিরিট প্রত্যক্ষ করা মুশকিল। এমনকি কখনও কখনও তারা নিজস্ব শ্রেণীর দাপটও দেখাতে পারে না। যেমন, আমাদের বকুল মাঠের সমস্ত কৃষকের সাথেই আকালুর একই আচরণ করে। ‘কোথায় পাব তারে'ও এসব দেখা যায়।

এখন যদি বলা হয় এই গ্রন্থটিতে ‘কোথায় পাবো তারে’, ‘আমাদের বকুল, মহল্লায় বান্দর, আবদুল হালিমের মা এবং আমরা’, ‘ইন্দুর-বিলাই খেলা’, ‘প্রথম বয়ান’, ‘ডলু নদীর হাওয়া’, ‘আমাদের কুটির শিল্পের ইতিহাস’ নামের একটি গল্পই মূলত আছে তা হলে নিশ্চয়ই কেউই আমার সাথে একমত হবেন না। কিন্তু আমার তো মনে হয়, একটা বাংলাদেশের জন্য একটা গল্পই ক্রমাগত লিখে যাচ্ছেন। হয়ত এমনই বলা যায়, একটা গল্পে ক্রমাগত আমাদেরকে রক্তাক্ত করছেন কিংবা নিজেই রক্তাক্ত হচ্ছেন। আসলে তাঁর গল্প মানেই মননশীলতাকে জাগ্রত করার এক অফুরান কৌশল। তিনি তার চরিত্র বা ঘটনায় ভাষার জোরটি পান বিরাজমান সঙ্কট থেকেই। তার গল্পপাঠে এটাই স্পষ্ট বোঝা যায়, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় অবিচার, বৈষম্য, কথিত আবহমানকালের চলাফেরা তার ভাষার উপর কর্তৃত্ব করে। কোনো ধরনের আরোপিত হুঙ্কার তিনি দেন না। চরিত্রসমূহ যেন দায়ে পড়ে কথা বলে বা এই জটিল-কঠিন সময়ে কুত্তা-বিলাইর মতো বুকের কিঞ্চিত ধুকপুকানি নিয়ে জীবনযাপন করে। তিনি তার গল্পে একধরনের রাষ্ট্রীয়-সামাজিক বিশ্বাসকেই ক্ষণে ক্ষণে প্রতিষ্ঠা করেন। যদিও তার গল্পের কোনো চরিত্রই শেষ পর্যন্ত জোরে একটা ধমকও দিতে পারে না। তারা কেবলই পতনশীল হয়। এই ভেঙে পড়ার ভিতরই তাদের জেগে উঠার তুমুল আকাঙ্ক্ষাকে জানাতে পারেন গল্পকার। গল্পে একটা জাদুময়তার আবহ নিশ্চয়ই আছে। এটি তার গল্প ঘেয়ো রোদের প্রার্থনা নিয়ে থেকে শুরু করে ডলু নদীর হাওয়া পর্যন্ত বি¯তৃত। এ তার এক কৌশল। হয়ত চরিত্রের বহুবাচনিক স্টেটমেন্টেরই সমান্তরাল। চরিত্রসমূহের জীবনভঙ্গি কিংবা বলার কথা সামাজিক আবহ নিয়েই বাড়তে থাকে। যার ফলে প্রত্যেক চরিত্রই গ্রামীণ-লোকায়ত জীবনের ভঙ্গিকেই দখল করে রাখে। তিনি তার গল্পভাষা বা গদ্যশৈলীও মানবজীবনের গন্ধ নিয়েই তৈরি করতে চান। অনেক শব্দই তিনি মানুষের জীবনযাপন থেকে গ্রহণ করেন। লৌড়ানো, ফালাফালি, চাপা খায়া ইত্যাদি অবলীলায় ব্যবহার করে থাকেন; কুত্তা, বিলাই, ইন্দুর ইত্যাদি শব্দও তিনি ব্যবহার করছেন। এতে মানুষের জীবনটাকে আরও আস্থায় আনতে চান বলেই মনে হয়। এভাবেই শহীদুল জহির তার গল্পে পতনশীল মানুষের গতিশীল জীবনকে পূর্ণ বোধসহ বুনে যান অনবরত।

তার নির্মিত ভাষাও হৈচৈ চেনে না বা অহেতুক কথিত কোষ্ঠকাঠিন্যের আশ্রয় নেয় না, তবে একটা কাহিনীগদ্য থাকে। এ কাহিনী জহির এখন আর নিজে বলেন না, মহল্লার/ গলির / সুহাসিনীর কিংবা অন্য কোনো জায়গার মানুষজন বলে যায়। এতে লোকায়ত জীবন বা শহুরে অতি সাধারণ কথকতায় একটা গল্প তৈরি করে। দেশজ-লোকায়ত উপাদানে নবতর আধুনিকতা নির্মাণ করেন তিনি। এতে কখনও আক্রোশ-উচ্ছ্বাস-অসহায়তা প্রকাশ পায়। এতে আলালের ঘরের দুলাল (১৮৫৮) বা হুতুম পেঁচার নকশা’র (১৮৬১-৬২) মতো প্রাত্যহিক জীবনের কথা, বর্ণনা বা সংলাপ দিয়ে যে আখ্যানের অবয়ব তৈরি হতো, তাই নতুন আঙ্গিকে, যন্ত্রণায়, প্রেরণায় তিনি গল্প বুনে যান। বিভিন্ন মাত্রার মানসিক উপনিবেশ-নির্মিত ইংরেজি-সংস্কৃত বা আরবি-ফারসির ধার ধারে না। তার ভাষা বাত্তি খোঁজে, তামাম দেশ-গেরামের আদলের ভূতের গলিতে লৌড়ালৌড়ি করে। ডাইলপুরি বা আলুপুরি খায়, নরম মাটি বা ধানের গন্ধের ইশারা নিয়ে জননীরূপী শেপালি বেগমকে খুঁজতে ফুলবাড়িয়া যায়। তার এ পথচলা এমনই একরোখা যে মনে হয় আসল ঠিকানায় না-পৌঁছা পর্যন্ত থামবে না।

মুক্তিযুদ্ধ ভুলে থাকা এবং ঈদের জামাত-শেষের মতো বুকে-বুক লাগিয়ে ঝাপাঝাপির এ-সময়ে কিংবা ৭১-এর চেতনার কথা বলে ভোট চাওয়ার এই কালে শহীদুল জহিরের মুক্তিযুদ্ধটা কী ধরনের? না, জহির কোনো আশাবাদী হন না। থরো থরো নেশায় যুদ্ধবিরোধীদের বুকে বুক ঘষে না তার নির্মিত সঙ্কেত বা জাদুময়তা; ভোট চাওয়ার কোনো ইতিহাসও চিহ্নিত করেন না তিনি। ভোটের রংচঙে প্রচারণার এই ধরনের চেতনার গোয়া চুলকানো ভাব দেখে অনেক বুদ্ধিআশ্রয়ী ভদ্রজন নানামাত্রার প্রচারণা কম চালায় না। কিন্তু এসবের দিকে জহিরের মনোযোগ নাই। তার বান্দররা চোর-চোট্টামিতেই শুধু নিমগ্ন হয় না, সন্ত্রাসের মাল-মসলাও জোগাড় করে; দিনে-দুপুরে বান্দররা একে অপরের উপর উপগত হয়। জহির এভাবেই ভদ্রসমাজের মেকিত্বকে জোরসে যেন থাপ্পড় কষেন। তার গল্পের খতিজারা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে, যুদ্ধের পরপরই যৌন-নিপীড়নে পড়ে। গল্পকার অতি সাহসে, অতি মানসিক পীড়নে সেই সব গল্প বলেন। তার গল্পে কেবলই সঙ্কট দৃশ্যমান হয়, প্রায় নির্জীব লোকায়ত জীবনে একজন আব্দুর রহমান হারিয়ে যাওয়া কেরাসিন বাত্তির খাম্বা খোঁজে। কোথায় পাবে সেই খাম্বা?! এখন তো ইন্দুর-বিলাই খেলাই শেষ হয় না। কেবলই দারুণ অসহায়তায় পড়ে তার চরিত্রগুলো। জন-সংস্কৃতির কোন্ নিবিড় এককোনায় টিমটিম করে জ্বলতে থাকা সেই বাত্তির ইশারা খোঁজেন জহীর। প্রায় একা।! সত্যি কথা বলতে কি, পারাপার গল্পগ্রন্থে কোনো সমন্বিত চরিত্র বা বহুবচনে গল্প বলার লোকজন ছিল না। গল্পকারের মানসিক কাঠামোতে চরিত্র, ঘটনা, আবহ, ক্লাইমেক্স, পরিণতি এমনকি উপদেশ দেওয়ার যে প্রবণতা দেখা যায় এখানে, তা ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে। তার দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থে রূপকথার আদলে ঘটনা ঘটে, জাদুবাস্তবতা এমনকি জাদুটোনার আবহ দ্বারা চরিত্র বা মানুষজন আক্রান্ত বা পরিপক্ব হয়। তার তৃতীয় গল্পগ্রন্থে ভাষার মাধুর্য যেমন প্রকাশিত হতে থাকে, তেমনি গল্প বলার দায়িত্ব নিজ-আবহ থেকে সামাজিক আবহে ছেড়ে দিতে থাকেন। গল্প কোনো আলাদা ব্যক্তিই বলে না, সেখানে সামাজিক কিছু প্রাণময় বিন্যাস লক্ষ করা যায়। এরাই গল্প বলে কিংবা বলে না। কখনও কখনও অতি মাত্রায় বেয়াড়া হয়ে উঠে। এই প্রবণতা তার ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প নামের গল্পগ্রন্থের প্রতিটিতেই বিরাজমান। এই যেমন, ‘কোথায় পাব তারে'-এ নামের প্রায় বৈরাগ্যসুন্দর গল্প কিংবা ডলু নদীর হাওয়া নামের রূপকথার আদলে গ্রিসীয় চেতনালোকের মিথোলজিক্যাল ট্রিটমেন্টপূর্ণ গল্পই হোক, সামাজিক চরিত্রই তাদের কেরামতি দেখায় বেশি।

শহীদুল জহির তার গল্পে রাষ্ট্রীয়-সামাজিক বিশ্বাসকেই ক্ষণে ক্ষণে প্রতিষ্ঠা করেন। যদিও তার গল্পের কোনো চরিত্রই শেষ পর্যন্ত জোরে একটা ধমকও দিতে পারে না। তারা কেবলই পতনশীল হয়। এই ভেঙে পড়ার ভিতরই তাদের জেগে উঠার তুমুল আকাঙ্ক্ষাকে জানাতে পারেন গল্পকার। গল্পে একটা জাদুময়তার আবহ নিশ্চয়ই আছে। এটি তার গল্প ঘেয়ো রোদের প্রার্থনা নিয়ে থেকে শুরু করে ডলু নদীর হাওয়া পর্যন্ত বি¯তৃত। এ তার এক কৌশল। হয়ত চরিত্রের বহুবাচনিক স্টেটমেন্টেরই সমান্তরাল। চরিত্রসমূহের জীবনভঙ্গি কিংবা বলার কথা সামাজিক আবহ নিয়েই বাড়তে থাকে। ফলে প্রত্যেক চরিত্রই গ্রামীণ-লোকায়ত জীবনের ভঙ্গিকেই দখল করে রাখে। তিনি তার গল্পভাষা বা গদ্যশৈলীও মানবজীবনের গন্ধ নিয়েই তৈরি করতে চান। অনেক শব্দই তিনি মানুষের জীবনযাপন থেকে গ্রহণ করেন। লৌড়ানো, ফালাফালি, চাপা খায়া ইত্যাদি অবলীলায় ব্যবহার করে থাকেন; কুত্তা, বিলাই, ইন্দুর ইত্যাদি শব্দও তিনি ব্যবহার করছেন। এতে মানুষের জীবনটাকে আরও আস্থায় আনতে চান বলেই মনে হয়। এভাবেই শহীদুল জহির তার গল্পে পতনশীল মানুষের গতিশীল জীবনকে পূর্ণ মেজাজসহ বুনে যান অনবরত।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন