বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৫

অলাত এহ্সানের গদ্য : ইলিয়াসের ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’র আত্মজৈবনিক পাঠ

কয়েক দিন ধরেই ভাবছিলাম, কী করে ইলিয়াসের, মানে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ গল্প নিয়ে কিছু লেখা যায়। এজন্য অল্পবিস্তর পড়াশোনাও করেছি। তা দিয়ে যা লেখা যায়, সেটা একটা একাডেমিক লেখা। আমি তেমন কিছু লিখতে চাই না। কারণ আমার মনে হয়, ইলিয়াসকে (এরপর থেকে আমি এই সংক্ষিপ্ত নামেই সম্বোধন করব) নিয়ে অনেক বেশি একাডেমিক, গুরুগম্ভীর লেখা হয়েছে গেছে। কোনও আনন্দপাঠ হয়ে ওঠেনি। ইলিয়াসকে যে আনন্দের সঙ্গেও পাঠ করা যায়, এটা কেউ বোঝায় নি।
ইলিয়াস কতটা সিরিয়াস ছিল, তার নিগূঢ় চিন্তার তলানী ছোঁয়ার উল্লাস হয়েছে। এসব করে ইলিয়াস অনেক বেশি বৃত্তবন্দি হয়ে পড়েছে। অনেক সময় মনে হয়, তাকে পার্টিজান করে তোলা বা অধিকার করে নেয়ার চেষ্টা আছে। তা কে কতটা ভাল পারে তার প্রতিযোগিতাও আছে। যেমন করে আমার প্রিয় চলচ্চিত্রকারদের একজন ঋতুপর্ণ ঘোষ মারা যাওয়ার পর ‘সানন্দা’কে তার এক অন্তরঙ্গ বন্ধু ও সুঅভিনেতা এমনটা বলেছিলেন— ওর মারা যাওয়ার পর আমি একটি কথাও বলিনি, ক্ষোভে, দুঃখে। যে ঋতু ছিল সবার, মৃত্যুর পর তাকে একটা পার্টির হয়ে গেল। তেমনই আরকি দখলদারিত্ব। এটা ঠিক ইলিয়াসের লেখা অনেক বেশি পলিটিক্যাল কনসাসনেস থাকে। আসলে তার জন্ম থেকে গল্পকার হয়ে ওঠা পর্যন্ত কি কোনো সুযোগ ছিল, রাজনৈতিক না হওয়ার?

লিখতে আমার ভয়ও হচ্ছিল, আমি কি বা পারব, একাডেমিকের বাইরে যেতে? আমি যখন ইলিয়াসের ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ গল্পটা পড়ছিলাম, মনে হচ্ছিল সালভাদর দালির আঁকা ‘দ্য পারিসটেনস অফ মেমোরি’ পেইন্টিং থেকে ঘড়িটা গলে গলে পড়ছে। বিশেষ করে যখন পড়ি, ‘বৃষ্টি-বুনোট এইসব রাতে আমার ঘুম আসে না, বৃষ্টিকে ভারি অন্যরকম মনে হয়, বৃষ্টি একজন অচিন দীর্ঘশ্বাস। এইসব রাতে কিছু পড়তে পারি না আমি, সামনে বই খোলা থাকে, অক্ষরগুলো উদাস বয়ে যায়, যেনো অনন্ত-কাল কুমারী থাকবার জন্যে একজন রিক্ত রক্তাক্ত জন্মদান করলো এদের। চায়ের পেয়ালায় তিনটে ভাঙা পাতা ঘড়ির কাঁটা হয়ে সময়কে মন্থর কাঁপায়।’ একটা ঘোরের মধ্য দিয়ে গল্পটা লেখা। স্যুরিয়ালিস্টিক। পড়তে পড়তে আমি আমার ঘোর অনুভব করি। কী দৃষ্টতা আমার! মুক্তিযুদ্ধ দেখেনে বলে কি সন্ত্রাসীদের হাতে অস্ত্রের ঝন্ঝনানি যুদ্ধ ভাবা যায়?

ইলিয়াস গল্পটি লিখছেন ১৯৬৯ সালের দিকটায়। তারপর সত্তুরের নির্বাচন, তারপরই একাত্তরের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। যত অবলীলায় ভাবা যায় আজ, সেদিন কি এমন সহজ ছিল? প্রতিটি দিন যাওয়া মানে আরেকটি রাতের মোকাবেলা করা। কিংবা গণঅভ্যুত্থানের পর যে একাত্তর আসবে, তাও তো বলার ছিল না। ইলিয়াসের গল্পটি পড়লে তা-ই মনে হয়। গল্পটি লেখার কিছুদিন আগেই ঘটে গেছে গণ-অভ্যূত্থান। কিন্তু আঁধারের ঘোর কাটেনি। নিরুদ্দেশেই যেন যাত্রা করছে দেশ। কিংবা অভ্যূত্থানের আগে দিনগুলো এটি। আমি যখন এই লিখছি, সেটা তার গল্প লেখার প্রায় ৫০ বছর পর। তখন যেন নিরুদ্দেশে যাত্রা করছি আমরা।

আমি অফিস থেকে ফিরি ক্লান্তি নিয়ে। রাস্তায় খানিটা দাঁড়ালে টের পাই শরীর ঝিম ঝিম করছে। পায়ের গোড়ালীর রগ আর মেরুদণ্ডের ব্যাথা টের পাওয়া যায় একটু হেঁট হতেই। গেটে ঝুলছে সার্বক্ষণিক তালা। রঞ্জুর ঘরটাও শিকল দেয়া ছিল, বাইরে থেকে। আমার কাছে চাবি আছে। আমি অবলীলায় বাইরে থেকে দরজার খুলে ভেতরে যেতে পারবো। অনেকটা নির্মলেন্দু গুণে কবিতার মতো, বাইরে থেকে দরজা খুলতে খুলতে ক্লান্ত হওয়ার মতো দিন আমার। রঞ্জুর তা নয়। রঞ্জুর কাছে শিকল খোলার উপায় ছিল না। তাই শব্দ করে ডাকছে আম্মাকে, দরজা খুলে দিতে। রঞ্জুর বাবা-মা নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন—

“এই যে শোনো, ফের ডাকছে। কি করি, এ্যাঁ? দরজা খুলে দেবো?’

আম্মার ভীরু স্বর শুনে রঞ্জুরো একটু ভয় করলো।

‘দরজা? দাও, খুলেই দাও। নইলে আরো বাড়তে পারে।’

‘যদি বেরিয়ে যেতে চায়?’

‘যাবে। এতো রাতে এসব ভাল্লাগে না। খুলে দাও।”

ইলিয়াসের তো এটা ব্যক্তিগত কথা। ইলিয়াসের পিতা বদিউজ্জামান মোহাম্মদ ইলিয়াস (সংক্ষেপে বিএম ইলিয়াস) একজন রাজনীতিক ছিলেন। মুসলীম লীগের রাজনীতি করতেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের মধ্যদিয়ে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের জন্মে তার বিশেষ ভূমিকা আছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর প্রাদেশিক আইন পরিষদের পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি নিযুক্ত হয়েছিলন। সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সংগঠন করেও তিনি ছিলেন যথেষ্ট উদার। যে কারণে ’৫২ ভাষা আন্দোলন, ’৫৪ যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে পরাজয়, ’৬২ শিক্ষা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে স্বাধের পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিপীড়কের চেহারা তার কাছে পরিস্কার, ওতো কেবল ক্ষমতার হাত বদল ব্রিটিশের হাত থেকে পাকিস্তানিদের কাছে। রাজনৈতিক আশা ভঙ্গে তিনি যথেষ্ট আহত। খানিকটা পরাজিতও। যে কারণে পিতার অভিমানী কথা,‘ ‘যাবে। এতো রাতে এসব ভাল্লাগে না। খুলে দাও।’ এর ভেতরে একধরনের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ও আছে। কারণ তখন রাজপথ কাঁপিয়ে দিচ্ছে রঞ্জুদের বয়সী ছেলেমেয়েরা। তারদের মাথায় পরিবর্তনের ছবি। কী সেই পরিবর্তন? সত্যি হবে কি? পিতা জানেন না, হয়তো আশা করেন। হয়তো মনে মনে বলেন, আমি তো পরলাম না, তোরা যদি পারিস সত্যি সত্যি কোনো পরিবর্তন। রঞ্জুর যাত্রা তাই নিরুদ্দেশেই। রঞ্জু এই পরিবর্তনের যাত্রাপথ ঠিক কি না, তা নিয়ে সন্দেহ করেন। ও হ্যাঁ, বলাই হয়নি। গল্পের রঞ্জু আসলে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস নিজেই। যে কারণে আমার লেখায় রঞ্জু গল্পের সীমানা ছাড়িয়ে ইলিয়াস হয়ে যায়, ইলিয়াস গিয়ে দাঁড়ায় রঞ্জুর পাশে। এও তো ঠিক, ইলিয়াসের ডাকনাম ছিল মঞ্জু। হতে পারে, শব্দের দোতনায় মঞ্জু হয়ে গেছে রঞ্জু। মুখোমুখি দাঁড়ায় আমার। কিন্তু এই রঞ্জু নিপাট ইলিয়াস নয়, ষাটের দশকের শেষ পাদে দাঁড়ানো লড়াকু-স্বপ্নালু-সন্দিগ্ধ রঞ্জুদের প্রতিনিধি।

আমার কাছে চাবি দিয়ে ঘরে ঢুকি। ভেতরে আমার জন্য কেউ অপেক্ষায় নেই। মা নেই, বাবা নেই, ভাই-বোন নেই। ভাতিজা নেই। ভাতিজী নেই, যাদের আমি ডাকি ‘আমার মৌমাছি’ বলে। বাড়িতে গেলে আমার পাশে সারা ক্ষণ গুঞ্জরণ করে বেরায়, পেছন ছাড়ে না। আমি শহরে থাকি। মোহাম্মদপুর। রঞ্জু থাকতো আজিমপুর। ‘পুর’! দু’টো নামের শেষেই কেমন আশ্চর্যমিল, ‘পুর’ আছে। নীলক্ষেতের পুরনো বইয়ের মার্কেটে গেলে কখনো কখনো আজিমপুর বন্ধুর সাথে দেখা করতে যাই। ইলিয়াস পড়তে পড়তে মনে সেই আজিমপুরের রাস্তার কথা মনে পড়ে। ঢাকা কলেজে পড়ার সময় বহুবার গেছি। কখনো কখনো ক্যাম্পাসের রাজনীতি নিয়ে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশন জট বিরোধী আন্দোলেনের কৌশল নিয়ে মিটিং করার জন্য গিয়েছি। কী আশ্চর্য! আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের (আই.এ) পড়া ঢাকা কলেজেই আমি অনার্স-মাস্টার্স পড়েছি। শেষ পর্যন্ত তিনি এই কলেজের শিক্ষক ছিলেন। তার প্রয়াণের (১৯৯৭) এক দশক পর আমি এখানে ছাত্র হয়ে এসেছি। শেষ পর্যন্ত এখানে ছাত্র নেতা হয়েছি। হয়তো সেই নেতৃত্ব ইলিয়াসের অল্প-স্বল্প পাঠকের মতো কলেজের কিছু শিক্ষার্থীর। কিন্তু অল্প-পাঠক হলে কি হবে, ইলিয়াস তো শ্রমিক শ্রেণির মানুষেরই প্রতিনিধিত্ব মূলক গল্প লিখেছেন, আমি নিজেকে হয়তো তাদেরই প্রতিনিধি মনে করেছি।

বার বার আমার কথা বলতে গিয়ে মনে হচ্ছে, আমি কোথায় যেন নিজেকে গ্লোরিফাই করছি। আমার তো গ্লোরি নেই। ইলিয়াসের ছিল। বাবা ছিল রাজনীতিক। দাদা পুলিশ। গল্পে রঞ্জু যখন পুলিশের সঙ্গে দেখা হচ্ছে লোকটা বলছে, ‘আপনি? ইলিয়াস সায়েবের লাড়কা না?’ পুলিশ তার বাবার কথা, দাদার কথা জানেন। তার বাবা কলেজে রাজনীতি করতো, মিছিল মিটিং করতে, দাদা ছিলেন পুলিশ অফিসার। রাস্তার পুলিশের ভাষায়, “তোমার আব্বা তখন কোলকাতায় পড়তো আর খালি মিটিং করতো ছাত্রদের সাথে মিলে। এই আজ রাণাঘাট তো কাল ঢাকা তো পরসোঁ বর্ডোয়ান, ফের সেরাজগঞ্জ, কখনো পাটনা, দিল্লী চলে গিয়েছে—এই খালি ঘুরতো আর মিটিং করতো। বড়োবাবু কতো রাগ করেছে, ‘তুমি এইসব করবে তো পড়ালিখা করবে কখন?” সত্যি সত্যি ইলিয়াসের বাবা রাজনীতিক ছিলেন, সে তো বলেছিই। তার দাদাও ছিলেন পুলিশের বড় কর্তা। আসলে গল্পের ছলে ইলিয়স তার পরিবারের কথাই বলে দিচ্ছেন, কিন্তু তাকে গল্প আর সময়ের শাসনে রেখে।

আমাকেও ইদানিং পুলিশে ধরে। দেশের অবস্থা এখন এমনই। পুলিশের খুব দাপট। রঞ্জুর সময়ের মতো ¯ৈ^রশাসক এখনো আছে। কিন্তু কোনো বড় আন্দোলন নেই, খুব তাড়াতাড়ি পরিবর্তনের নিশানাও নেই। সর্বপরি গণমানুষের কোনো রাজনীতি নেই। তাই রাজনীতিকও নেই। আছে মাস্তান আর দলীয় ক্যাডার। পুলিশ-আর্মির অস্ত্রের প্রতাপে দাঁড়িয়ে থাকে কাঁকতাড়–য়ার মতো ভূতুড়ে শাসক। তাই পুলিশের খুব প্রতাপ। তারা আমাকে এটা-সেটা জিজ্ঞেস করে। হেনস্ত করতে চায়। খুব বেশি পারে না। কারণ আমি সংবাদপত্রে চাকুরি করি। সংবাদপত্রে কোনো ক্রিয়েটিভি নেই। তাই ওটাও নিছক চাকুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গার্মেন্টসের মতো শ্রমিক শোষণ হয় সেখানে। মাসের পর মাস বেতন বাকি। ভদ্রলোক তারা। তাই কিছু বলতে পারে না। রঞ্জু বাইরে যেতে চায়, আমি চাই ঘরে ঢুকতে, ক্ষোভে মুখ লুকাতে। আমারও ‘আলমারির লম্বা আয়নায় পেছনের দেওয়াল শাদা ও নিরুদ্বেগ প্রতিফলিত।’ মানে কিচ্ছু হচ্ছে না।

রঞ্জু সিনেমা দেখতো ছোট বেলায়। আমি দেখি নি। ও বয়সে গ্রামের কেউ সিনেমা দেখা। বাবা-মাও দেখতেন না। তাই আমাকে নিয়ে যাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। রঞ্জুর যেমন সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ সিনেমা দেখে মনে হয়, দূর্গা তার বোন। বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’কে আছে সত্যিকারের জীবন। এই মনে ভেতর তৈরি হয় ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না একলা জেগে রই, মাগো আমার শোলোক বলা কাজলা দিদি কই?’

গল্পের ভেতর এই অদৃশ্য দূর্গা না থেকেও আছে। এটাও একটা চরিত্র। একটা শূন্যতার ভেতরে পূর্ণভাবেই আছে সে। আমার কাছে এটা মনে হয়, এটা ইলিয়াসের শূন্যতা বোধ। তার আপন বোন না থাকা থেকে এটা তৈরি। সত্যি সত্যি তার কোন বোন ছিল না। তারা ছিলেন চার ভাই। কী আশ্চর্য, আমরাও চার ভাই। দু’টি বোনও আছে আমার। তারপর আবার ‘রাস্তার লাল সুরকির ফাঁকে ফাঁকে জল একটু একটু ঘোলা, ইলেক্ট্রিক তার, মেঘলা আকাশ, ল্যাম্পোস্টের বিনীত মাথা সেই জলে তির-তির করে কাঁপে। ম্লান আলো বাল্বের অইটুকু ছায়ায় রঞ্জু দেখতো পেলো নিশ্চিন্তপুরের সময়-কাঁদা, নির্লিপ্ত মাঠে দুপুর ঝাঁ ঝাঁ করছে। ছোটো ছোটো ছায়া ফেলে দুর্গার সঙ্গে রঞ্জু রেললাইন দেখতে কতোদূর পাড়ি দিচ্ছে।’ আমার গ্রামের কথা মনে পড়ে। রঞ্জুর মতো মনের গহীনে বেজে উঠে রবীন্দ্র সঙ্গীত, ‘তুই ফেলে এসেছিস কারে’। আমারও বাজে। আমি গ্রামে বড় হয়েছি, এখন শহরে থাকি। ইলিয়াসও তাই। কিন্তু শহরে তারা পুরো পরিবারে ছিল। আমি এখানে একা। শুধু কি গ্রাম ছেড়ে এসেছি, আমি স্বস্থিকেও ছেড়ে এসেছি। রঞ্জুর মনে সৃজিত বোন দুর্গা রেললাইন পাড়ি দিচ্ছে। আমার বোনদের কথা মনে পড়ে। ইনফ্যাক্ট আজই সন্ধ্যায় ছোট আপা ও বড় আপা একবার করে বোন দিয়েছিলেন। আমার খোঁজ-খবর নিলেন। অফিসে বেতনাদি দিয়েছে কি না, জিজ্ঞেস করলেন। তিনমাস বেতন দিচ্ছে না অফিস। তবুও প্রতিদিন অফিস যাই, আজ না হলে কালই দিবে, মনে হয় আর আশা হত হই। প্রতিদিনই নিরুদ্দেশ যাত্রায় সামিল হই আমি।

বড় আপা সেদিন বাবা কথা বললেন, তিনি অসুস্থ। এবার অন্য চোখের ছানি কাটা দরকার। বয়সের কারণেই শরীর দূর্বল, হাত-পা কাঁপে। এটা-সেটা তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। কোমরের বয়সী বাতের ব্যাথা। গোসলের সময় কোমড়ে গরম পানি ঢাললে আরাম লাগে। কুসুম কুসুম গরম পানিতে গোসল করলে শরীর ঝড়ঝড়ে মনে হয়। পরশু ঠাণ্ডা পানি মেশাতে ভুলে গিয়েছিলেন। হয়তো খেয়ালও করেন নি। ওতে এতটাই গরম পানি ছিল যে, মাথা ও কপালের চামড়ায় ফোঁসকা পড়ে গোলে গেছে। এখন ঘা বেরিয়েছে। চিকিৎসা দরকার। মানে টাকা। টাকা তো নাই। অফিসে বলেছি, আমার টাকা দরকার, বাবা অসুস্থ। বাবা মুখটা মনে পড়লো। কী না করেছেন সংসারের জন্য। রঞ্জুর মন হয়, ‘আব্বাকে বিকেলবেলা অনেক পুরুষ শোনা যায়, কিন্তু এখন এতো সাধারণ, রঞ্জুর একটু দুঃখ হলো, দিনদিন আব্বা বড়ো সাধারণ ও সংসারী হয়ে পড়ছে।’ মানে এক সময়ের তুখোড় রাজনীতিক বিএম ইলিয়াস রাজনীতিকে দেখেন অসার, নিরুদ্দেশ যাত্রা। আমারও কি তাই মনে হয়? সেই একটা জায়গায় আটকে থাকা, তেজহীন, চিন্তাহীন, সমাজকে বুঝতে না পারা, কখনো কখনো সরকারের তলপাবাহি বি-টিম হয়ে থাকা, তাদের ফেলে যাওয়া জুতোয় পা ডুবিয়ে হেঁটে যাওয়ার চেষ্টা, রোম্যান্টিক গ্লোরি ভাজিয়ে বেড়ানো, থাকতে হয় বলে থাকা, আদৌতে ক্রমে ক্ষয়ে যাওয়া পার্টি দেখে তা হয় বৈকি?

মেসে ঢুকে দেখি আমার রুমমেট দুইজন ঘুমিয়ে আছে। একজন সিনিয়র, এনজিও কর্মী; অন্যজন জুনিয়র, ছাত্র। কেউ রাজনীতি করে না। শরীরে কিছুর আঁচও টের পায় না। রঞ্জু দেখে, ‘অঞ্জু মঞ্জু দুটো বিছানায় অনায়াস ঘুমোচ্ছে, স্বপ্নময়, নরম অন্ধকারে, সাধের মধ্যে সেঁধে। শেলফে আলমারিতে বইগুলো সারি সারি কফিনের মতো শুয়ে রয়েছে...’। আমি তাকিয়ে দেখি প্লাস্টিকের শেলফে, ডেবিলের ওপরের স্তুপে, ফ্লোরের একপাশে ঢিবি দেয়া রাজনীতি-অর্থনীতি-দর্শন-ইতিহাস-সাহিত্যের বইগুলো মরে পড়ে আছে। অসাড় মনে হয় ওগুলো। ওর কি কোনো দরকার আছে। কি হবে পড়ালেখা, কি হবে নীতি-টিতি তৈরি করে। সব অসার, নিরুদ্দেশ। দেশ তো এখন মুর্খদের দখলে। ‘যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি চোখে তারা আজ...’। এমনি কি পত্রিকা অফিসও।

কোনো মতে মুখে দুই দানা গুজে, একটা বইয়ের পাতাগুলো উল্টাই। হয়তো অভ্যাস বসত, মৃতপাতা, মন বসে না। রাত বেড়েগেছে। আজ তো আমাদের শহরেও বৃষ্টি হয়েছে। ডুবে গেছে অনেক এলাকা। ছোটাখাট যানবাহন বন্ধ। তাই ধস্তাধস্তি করে পাবলিক বাসে উঠতে হয়েছে। রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম, দাঁড়িয়েই আসতে হয়েছে পুরোটা। ক্লান্তি নামে। ঘুম থেকে উঠেই তো অফিস করতে হবে। তাই আগামী কালের জন্য কিছুটা এনার্জি জমিয়ে রেখে শুয়ে পড়ি। আমার ঘুম আস না। ‘আলোর মধ্যে একলা জেগে’ থাকে রঞ্জু। আমার ঘর ভরা অন্ধকার। দেশের এইগুমোট অবস্থা কি কাটবে? সব প্রতিষ্ঠানগুলোতে আবার লোক নিয়োগ হবে? ব্যবস্থা বাণিজ্য ঠিক হবে? পার্টি কি সত্যি লাইন খুঁজে পাবে? না থেকে যাবে ওই বুড়োদের দখলে? রঞ্জুর পাশে আলো ছিল কারণ তখন আন্দোলন হচ্ছে। ধরা যাক, উনসত্তুরের আন্দোলন। তারা পরিবর্তন চায়। আমার সময়ে কিছুই হচ্ছে না। পার্টিগুলো ভাঙতে ভাঙতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে পরিণত হয়েছে। কোনো রণ কৌশল নেই, জাস্ট পার্টি ওয়ার্ক, ডগমা, দাদার আমলে খাওয়া ঘিয়ের গল্প। কখনো কখনো রণ কৌশলই হয়ে যাচ্ছে রণ নীতি। হায়! বানের জলে ভেসে থাকার জন্য পিঁপড়াদের মতো স্তুপ করে আছে সব। নাকানি-চুবানি খেতে তারা ভেসে যাচ্ছে, নিরুদ্দেশে। পার্টির সাবেক কমরেডরা এখন এনজিও কর্মকর্তা, ডেবলপমেন্টের ভেগ ধারি। পার্টিগুলোর মধ্যে কোনো জোটও টিকে না, গণমুখি অন্দোলন নেই। কোনো তত্তি¡ক নেই, পত্রিকায় কলাম লেখক মাত্র। মাঝে মাঝে অপরের পশ্চাতদেশ কামড়ে ধরে নতুন দাঁত গজানোর খবর দেয়া।

আমার অফিসের চিন্তা, গ্রামে টাকা পাঠানোর চিন্তা, শহরের ভারি বাতাসে দম নিতে কষ্ট হয়, কতদিনে দেশ ঠিক হবে? রঞ্জু ভাবে এই যে অভ্যূত্থান, এই যে আন্দোলন, কিছুই তো সুপরিকল্পিত দিকে যাচ্ছে না, জাস্ট রিঅ্যাক্ট। দেশ স্বাধীন হবে, তেমন কোনো পরিকল্পনা কোথায়! সত্যিই তাই। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সেই সময় টের পেয়েছিলেন, উনসত্তুর নিয়ে যতটা ফুলিঙ্গ ছড়াচ্ছে, ভেতরে তেমন টেকসই কয়লার আগুন নেই। আন্দোলন, আত্মদান সবই নিরুদ্দেশ যাত্রা। আগেই বলেছি, আমরা এখন কত সহজেউ উনসত্তুর(গণঅভ্যূত্থান), সত্তুর(নির্বাচন), একাত্তর(মুক্তিযুদ্ধ) উচ্চারণ করি, এতো সহজ কিছু সেটা নয়। উনসত্তুর মোটেই প্লানেড কিছু ছিল না। প্লানেড কিছু হলে বিপ্লবের দিকেই যেত। তাহলে সত্তুরের মতো নির্বাচনী অসারতার ফাঁদে দেশকে পড়তে হতো না। ইতিহাসের দিকে তাকালেও দেখা যায়, বিপ্লবকে থামিয়ে দেয়ার জন্য নির্বাচনের প্রহসন আয়োজন করা হয়েছে। আর ক্ষমতা লিপ্সু রাজনীতিক সেই নির্বাচনের ডামাডোলে সব কিছু নিয়ে নির্বাচনের গর্তে ঢুকে পড়েছেন। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরি এটাকেই বলেন, ‘স্বাধীনতার স্পৃহা, সাম্যের ভয়।’ ইলিয়াস ঠিকই দেখে ফেলেছিলেন উনসত্তুর সাম্যের একাত্তরের দিকে যাচ্ছে না, মাঝখানে একটা গর্তে পড়তে যাচ্ছে, যা একাত্তরের চরিত্রটাকে নিরুদ্দেশ করে দিবে।

রঞ্জুর বাবা তাই রঞ্জুকে ঘুমানোর জন্য বুদ্ধি দেন, ‘চোখ বন্ধ করে চুপচাপ শুয়ে থাকো। ভাবতে থাকো, সামনে মস্ত এক মাঠ, মাঠে অনেকগুলো ভেড়া চরে বেড়াচ্ছে, অগুনতি ভেড়া, হাজার হাজার লাখ লাখ ভেড়া চরে বেড়াচ্ছে। অইগুলো গুনতে থাকো, মনে মনে গোনো, এক দুই তিন চার পাঁচ ছয়—।’ ঘুমের জন্য এই ভেড়া গণনা করা নিজেই একটা অসার কাজ, অহেতুক শক্তিক্ষয়, নিজেকে ক্লান্ত করা। রাস্তায় পুলিশ যেমন বলে, ‘নিদ আসে না, না? একটু পাইচারি করেন রাস্তায়, বেশ আরাম লাগবে, দেখবেন।’ সবই উনসত্তুরের নিরুদ্দেশ শক্তিক্ষয়কে ইঙ্গিত করে। আমিও আজকের দিনে ভেড়াগুনে ক্লান্ত হই। ভেড়া, মানে ছাগল প্রজাতি, গট, মানে গড্ডলিকা প্রবাহ। এই প্রবাহই বুঝি একমাত্র প্রবাহমান?

আমার ঘুমোতে দেরি হয়ে যায়, মনে করি ঘুম থেকে উঠতেও দেরি হবে। তাহলে? আমি আগে-পিছে ভাবি না। বেশি করে পানি পান করি, সকালে প্রশ্রাব আসবে, তার বেগে আমার ঘুমও ভেঙে যাবে। কি পরিষ্কার বুদ্ধি! রঞ্জু ভাবে, সে একজন মেমোরি মর্মরিত মানুষ। ‘এইকাল থেকে সেই কাল ঘুরে ঘুরে রঞ্জুর তেষ্টা ওর কণ্ঠের মধ্যে শুঁড় বসিয়ে দিলো।’ এই তৃষ্ণা ইলিয়াসে আমৃত্যু তৃষ্ণা, মানুষে মুক্তির তৃষ্ণা। কিন্তু সময়টা তো উনসত্তুর। যে কারণে ‘রঞ্জু জলের জন্যে কাঙাল হাঁ করে রইলো। বৃষ্টির জল ওর চিবুক পড়ে গড়িয়ে যাচ্ছে, নাকের ডগা থেকে ছিটকে চলে যায় কোথায়, গালে জলের ছিটে লাগছে। চারদিকে এতো জল, একটি ফোঁটাও ওর পাতলা ঠোঁট রেয়ে পড়লো না যা কিনা এলোমেলো দাঁতের সারি পার হয়ে জিহŸার সড়ক ধরে কণ্ঠে পৌঁছে যেতে পারে। রঞ্জু জলের প্রত্যাশায় জলে-ডোবা মানুষের মতো এলোপাথাড়ি ঢোঁক গিলতে লাগলো। প্রত্যেকটা ঢোঁক কাঁটা হয়ে ওর বুকের মধ্যে খোঁচা খোঁচা গেথে যাচ্ছে কেবল।’ উনসত্তুরের অবস্থা বোঝার জন্য গল্পের এই ক’লাইন যথেষ্ট। সেই কালের মতোই, ‘প্রবলরকম ঝড় হইতে শুরু করেছিলো।...এমন সময় শিমুল গাছের মস্ত একটা ডাল তার সমস্ত মর্মরিত পাতা, কাকলিশূন্য নীড়, বৃষ্টির ছড়ানো ফোঁটা ও রঞ্জুর জন্যে বুকভরা বর নিয়ে ঢেউয়ের মতো শব্দ করে ভেঙে পড়লো।’ এটা একটা প্রতিকের আশ্রয়ে অবস্থা বোঝানের চেষ্টা। শিমুল ফুল আসলে আশার প্রতীক। তাছাড়া এটা এতোটাই লাল হয়ে ফুটে যে, বহু দূর থেকেই নিজেকে চিনিয়ে দেয়। অথচ এটা সবুজের বুক চিড়ে বের হয়। যা আমাদের জাতীয় পতাকার কথাই মনে করিয়ে দেয়। বলা যায়, ওটা আমাদের জাতির প্রাকৃতিক পতাকা। আর ঝড় বলতে উনসত্তুরের বিক্ষুব্ধ সময়কেই বোঝা যেতে পারে। যেখানে সবুজ বালকের আত্মদানের মতো শিমুলের ডালও ভেঙে পড়ে। সে সময়ের হাজারো যুবকরে মতো রঞ্জু, ‘দ্যাখার জন্যে ও চোখ খুলতে চেষ্টা করলো; কিন্তু ভিজে শিমুল ফুলের রাশি স্তূপাকার পড়ে রয়েছে ওর চোখের ওপর।...শুঁকবে বলে রঞ্জু জোরে নিশ্বাস নিতে চাইলো, কিন্তু ওর নিশ্বাস তখন শেষ হয়ে এসেছে, রঞ্জু সুবাস নিতে পারলো না।’ সেই গুমোট দিনে কেউ নিশ্বাস নিতে পারার কথাও না। কিন্তু সম্ভাবনা জেগে থাকে। একটা পূর্ণ স্থিতি নিয়ে শেষ হয় আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’গল্পটি। আমিও লেখার শেষে পৌঁছে যাই।

আমার মনে পড়ে অফিসের কথা। সাড়ে তিনমাসে বেতন বাকি। দেয়ার নাম নেই। জনবল বৃদ্ধির কোনো উদ্যোগ নেই, এ্যাডমিনেস্ট্রনে লোক নেই, মার্কেটিংয়ের খবর নাই অথচ মালিক চাইছে আট পৃষ্ঠা দৈনিক বারো পৃষ্ঠা করবে। কী নিরুদ্দেশ যাত্রা। তারপর চাকুরি বাঁচাতে হবে কিছু একটা। আলটিমেট পুরো সেটাপ কলাপস করবে। তখন মালিক বলবে, তোমরা অযোগ্য, আমার টাকাই ধ্বংস করেছো শুধু, সুতরাং এতোদিন তোমাদের যে বেতন দিয়ে তা ফেরত দাও। তখন স্টাফগুলো যেনতেন উপায় পালাতে চাইবে। আগামীর নিরুদ্দেশে যাত্রা করবে। মালিকের গেইম প্ল্যান সাকসেস।

দেশের কথাই ধরা যাক। ‘অধভূত উটের পিঠে’ নিরুদ্দেশেই তো যাচ্ছে। একের পর ব্লগার হচ্ছে, প্রাণ রক্ষায় গোপনে দেশ ছাড়তে হচ্ছে মুক্তমনাদের। বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলছে। দলিয়করণ হচ্ছে প্রশাসন। নিয়োগ প্রক্রিয়া মানে টাকার খেলা। ১৫ টাকায় মিলে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র। সাম্প্রদায়িকতার সুরসুরি দিয়ে, জঙ্গি জুজুর ভয় দেখিয়ে ক্ষমতায় থাকছে দল। একটা পুলিশি রাষ্ট্র। তবু বলে সব ঠিক আছে। তবু বিদেশে থেকে পাচ্ছে পৃথিবী জয়ের ক্রেস্ট। পরিবর্তনের আপাত কোনো নিশানা নেই। সত্যি নিরুদ্দেশে চলছে দেশ।

বিশ্বেও এক অবস্থায়। যুদ্ধ, দখল, অস্থির জীবন। অভিবাসনের জন্য নদীতে নিরুদ্দেশ ঝাপ দেয়া। কি হবে আগামীর পৃথিবী, সবই নিরুদ্দেশ। একবার ইরাকে যুবক ছুড়ে দিয়েছিল দুইপাটি জুতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসকের দিকে। মিডিয়া বলে ছিল তা বুশের গায়ে লাগেনি। কে বলবে লাগে নি? তার থেকে জুতা তাড়িয়ে বেড়িয়েছে মার্কিন প্রসানকে, বিশ্বের সব  স্বৈরশাসকদের এই বুঝি কেউ জুতা ছুড়ে। ইলিয়াশের গল্পেও নাম করণ ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ হলেও নিরুদ্দেশ নয়। ইলিয়াসের গল্পেও মনে করিয়ে দেয় নিরুদ্দেশ যাত্রারই কথা। তিনি পারতেন গল্পের নামটা উত্তরাধুনিক করে দিতে—‘যে কারণে রঞ্জু জেগে থাকে’, ‘ বৃষ্টির রাত ও আজিমপুরে জেগে থাকা রঞ্জুর’, কিংবা ‘ মেমোরি মর্মরিত রঞ্জুর অন্বেষা ও রাস্তায় পুলিশের কথোপকথন’ ইত্যাদি ইত্যাদি। ইলিয়াস দিলে ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’। সব নিরুদ্দেশ ভেতরে উদ্দেশ খুঁজে পাওয়া আরকি। একটা নামের ভেতর দিয়ে গোটা পরিস্থিতিকে ধারণ করতে পারা। এমন সেই গল্প লেখার পঞ্চাশ বছর পেরের সময়কে ধারণ করতে পারা। দারুণ ভাবেই পারা। এটাই তার উর্বর মস্তিকের কারিগরি। পাঠের আনন্দ তো সেখানেই।


কয়েকটি একাডেমিক কথা :

১. আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ গল্পটি দারুণভাবেই প্রতীকাশ্রী গল্প। বরাবারই ইলিয়াসের গল্পে প্রতীকের নড়া-চড়া দেখা যায়। তথ্য মূল্যে জেনে রাখা ভাল, এটা তার প্রথম প্রকাশিত (১৯৭৬) গ্রন্থ ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’-এর প্রথম গল্প। বইটির নামও নিয়েছিলেন তার প্রিয় কথাসাহিত্যিক ট্রুম্যান ক্যাপোটি’র উপন্যাস ‘আদার ভয়েস, আদার রুমস’ অবলম্বনে। সামগ্রীয়কভাবে তার বইয়ের গল্পগুলোর নীহিতার্থ বোঝানোর জন্যই তিনি এই নাম গ্রহণ করেন। ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’ বইয়ের নাম যেমন, ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ গল্পের নাম হিসেবেও তেমন প্রতীকি। তিনি ষাটের দশকের জাতীয় জীবনের সন্ধিক্ষণের চিত্র পারিবারিক গল্পের আড়ালে বিমূর্তভাবেই এঁকেছেন।

গল্পের কয়েকটি কথার দিকে চোখ দিলেই প্রতীকের বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যায়। যেমন : রঞ্জুর ঘরের বাইরে থেকে তালা দেয়া কিন্তু বাইরে যাওয়ার জন্য তার আকুলতা, মায়ের কাছে ফেরা, আলমারিতে কফিনের মতো বই, মাঝ রাতে আগুন (ফায়ার ব্রিগেডের লাল রঙের দ্রুতশ্বাস গাড়ি), নখের খোচায় গেটের এক চিলতে কাঠ তুলেল ফেলা, বৃষ্টি, জলের তৃষ্ণা, ঝড়, শিমুলের ডাল ভেঙে পড়া, চোখের ওপর শিমুল ফুল সবই ষাটের দশকের জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষিতে প্রতীক হিসেবে পরিষ্কার।

২. আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বরাবরই সামাজিক ভাবে প্রতিশ্রুত সাহিত্যিক। আপাত দৃশ্যে মনে হয় আসলে গল্পের ভেতরে গল্প নেই, কিছু প্রতীকের নড়াচড়া মাত্র। প্রতীকের আড়ালে ইলিয়াস আসলে সেই সময়েরই চালচিত্র তুলেল ধরেছেন। ঋত্বিক ঘটকের ‘যুক্তি তক্ক গপ্প’ সিনেমায়ও এই ব্যাপারটা দেখা যায়। সেখানে একটা শূন্য থালা সামনে একজন হা-ভাতে বৃদ্ধ বসে আছে আর তার সামনে ছায়া নৃত্য চলছে। বুড়ো হা করে দেখছে। কিছু বুঝছে না, কিছু করছেও না। আসলে দেখা ছাড়া তার কিছু করারও নেই। ষাটের দশকে ভারতে কমিউনিস্ট পার্টিগুলো যখন পিকিং পন্থী আর রুশ পন্থী তর্কে নিজের মধ্যে ভাঙন তৈরি করছে, অন্যদিকে দুর্ভিক্ষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ, তখন আমাদের চোখে ভূতের ছায়া নৃত্য ও হা-ভাতে মানুষের বিহ্বল তাকানো দৃশ্য ছাড়া কী-ই। ইলিয়াসও তেমনি এই গল্পে ষাটের দশকের নিরুদ্দেশ যাত্রাকেই চিহ্নিত করেছেন মানসিক বৈকল্যের শিকার রঞ্জু ও তার পূর্বপুরুষের ইতিহাসের ভেতর দিয়ে।

৩. সাহিত্যতত্ত্বের বিচারে ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ গল্পটিকে স্যুরিয়ালিস্টি ও অস্তিত্ববাদী দর্শনের মিশ্রণ। একে আত্মজৈবনিক গল্পও বলা যাবে। আসলে সব গল্পই কমবেশি আত্মজৈবনিক। তিনি স্যুরিয়ালিস্টিক ঘোরের দিয়ে অস্তিত্ববাদী দৃশ্যকল্পকে প্রতিস্থাপনা করেছেন। গল্পে রঞ্জুর হেঁটে চলা নিরুদ্দেশ হাঁটারই নামান্তর। এই সময়হীন হেঁটে চলার ভেতর এটা তিনি জাতির এগিয়ে চলাকেই নির্দেশ করেছেন। অনেকটা ইউলিসিসের ভ্রমণের মতো এটা অস্তিত্ববাদীও বটে।


৪. ইলিয়াস পড়তে পড়তে মনে হতেই পরে তিনি অগ্রজ কথাসাহিত্যক সৈয়দ ওয়ালীউল্লার মতো স্যুরিয়ালিস্টিক ঘোরটাকে ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ গল্পটি পড়ার মনে হবে, এতে ওয়ালীউল্লার ‘নয়নচারা’ গল্পের ছায়া পড়েছে। যদিও ‘নয়নচারা’ গল্পটি ’৪৩-এর দূর্ভিক্ষে গ্রাম থেকে এসে শহরের ফুটপাতে আশ্রয় নেয়া নিরন্ন মানুষের (আমু, ভূত ও ভূতনীর) গল্প। অন্যদিকে ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ ’৬০-এর দশকে রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে শহরে মধ্যবিত্ত যুবক ও তার পরিবারের গল্প। গল্পের সেন্স না হলেও এথেন্স এসেছে সেখান থেকেই। বিশেষ করে ইলিয়াসের গল্প এবং ওয়ালীউল্লার গল্প থেকে উদাহরণ দিলেও বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যাবে।

নিরুদ্দেশ যাত্রা : “এই মনোরম মনোটোনাস শহরে অনেকদিন পর আজ সুন্দর বৃষ্টি হলো। রাত এগারোটা পার হয় হয়, এখনো রাস্তার রিকশা চলছে ছল ছল করে যেনো গোটিয়ার বিলে কেউ নৌকা বইছে, ‘তাড়াতাড়ি করো বাহে, ঢাকার গাড়ি বুঝি ছাড়ি যায়।’ আমার জানলায় রোদন-রূপসী বৃষ্টির মাতাল মিউজিক, পাতাবাহারেরর ভিজে গন্ধভরা সারি, বিষাদবর্ণ দেওয়াল; অনেকদিন পর আজ আমার ভারি ভালো লাগছে। ছমছম করা এই রাত্রি, আমারি জন্যে তৈরি এরকম লোনলী-লগ্ন আমি কতোদিন পাইনি, কতোকাল, কোনোদিন নয়।”

নয়নচারা : ‘ঘনায়মান কালো রাতে জনশূন্য প্রশস্ত রাস্তাটাতে ময়ূরাক্ষী নদী বলে কল্পনা করতে বেশ লাগে। কিন্তু মনের চরে যখন ঘুমের বন্য আসে, তখন মনে হয় ওইটা সত্যিই ময়ূরাক্ষী: রাতে নিস্তব্ধতায় তার কালো ¯্রােত কল-কল করে, দূরে আঁধারে ঢাকা তীররেখা নজরে পড়ে একটু—একটু’;...‘মেয়েটি হঠাৎ দুটি পয়সা দিযে চলে গেল রক্ত ঝলকিয়ে। কিন্তু একটা কথা : কি ভেবেছে যে তার মাথায় সাজানো চুল তারই? আমু কি জানে না—আসলে ও চুল কার। ও-চুল নয়নচারা গাঁয়ের মেয়ে ঝিরার মাথার ঘন কালো চুল।’

৫. গল্পের মূল সুর খানিকটা মানসিক বিকার গ্রন্থ রঞ্জুর ভেতরে জেগে ওঠা ঘরের বাইরে যাওয়া ও প্রকৃতিকে উৎযাপনের তাড়না। আখ্যান ভাগও গড়ে ওঠেছে তার বোঝা-পড়ার ওপর ভিত্তি করেই। রঞ্জুর আত্মকথন দিয়ে শুরু হলেও গল্প এগিয়েছে স্বপ্নময় ঘোর ও বোধের ভেতর দিয়ে। যেহেতু লেখক কোনো দ্বন্দ্বের দিকে যাবেন না, তাই তা গল্পটা অনেকটা চড়া পথেই এগিয়ে যায়। তবে এই ধরনের গল্পের ভয় থাকে শুরুর এই প্রস্থ শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে, নাকি ক্রমেই চিকন হয়ে কেন্দ্রতে গিয়ে মিশবে। ইলিয়াসের গল্পটি সমান প্রসস্থতা শেষ পর্যন্তও টিকে ছিলে। বলা যায়, তার গল্প দৈর্ঘ্য থেকে প্রসস্থই বেশি।

৬. যেহেতু গল্পটি গল্পনির্ভর গল্প না, বরং অনুভূতি ও সেন্স ফুটিয়ে তোলার ওপর নির্ভরশীল ছিল, তাই গল্পকার দৃশ্যকল্পে এ্যাবস্ট্রাক ফর্মেরও ব্যবহার দেখা যায়। তবে প্রথমে খানিকটা অনুভূতির বিস্তার দেখা গেলেও শেষ পর্যন্ত তার কার্যকারণও খুঁজে পাওয়া যায়। গল্পটি জমিয়ে তোলার জন্য শেষ পর্যন্ত শিমুলের ডাল ভেঙে ফুলের পাপড়ি ঝড়িয়েছেন লেখক। গল্পের স্বাদ পেতে হলে গল্পে সময় বা তা না হলেও পাঠককে অনুভূতি ওপর অনেক বেশি নির্ভর করতে হবে।


তথ্যসূত্র :

১. আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রচনাসমগ্র-১, ষষ্ঠমুদ্রণ ২০১০, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা
২. আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (জীবনী), কাজী মহম্মদ আশরাফ, কথা প্রকাশ, ঢাকা
৩. ইলিয়াস ও প্রশ্নের শক্তি, আনু মুহাম্মদ, শ্রাবণ প্রকাশনী, ঢাকা
৪. তৃণমূল, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সংখ্যা, সম্পাদনা : অনু মুহাম্মদ, ১৯৯৮
৫. গল্পসমগ্র, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, প্রতীক প্রকাশনী, ঢাকা। ০




লেখক পরিচিতি
অলাত এহ্সান

মূলত গল্পকার। জন্ম ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার বারুয়াখালী গ্রামে। ঢাকা কলেজ থেকে ব্যবস্থাপনা বিভাগে স্নাতক(সম্মান)ও স্নাতকোত্তর। ছাত্র জীবন থেকেই বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়া। কবিতা, প্রবন্ধ ও ফিচার লিখেন। একটি দৈনিকে কর্মরত। সখ ভ্রমণ, সিনেমা দেখা, গান শোনা ও পড়া।

প্রকাশিত বই ‌'হেঁটে যাতায়াত ও আমরা' (অনুবাদ)। প্রকাশিতব্য গল্পগ্রন্থ ‘পুরো ব্যাপারটাই প্রায়শ্চিত্ত ছিল’। প্রবন্ধের বই প্রকাশের কাজ চলছে। alatehasan@yahoo.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন