বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৫

যেভাবে লেখা হলো রহু চণ্ডালের হাড়

অভিজিৎ সেন

'রহু চণ্ডালের হাড়' আমার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ। এখন থেকে ৩০ বছর আগে লেখা একটি উপন্যাস এখনো পাঠককে আকৃষ্ট করে, এখনো নতুন সংস্করণ হয়_এ ঘটনা আমাকে অবাক করেছে।
প্রতিবছর বাংলা সাহিত্যজগতে দুই বাংলা মিলিয়ে অসংখ্য বই প্রকাশিত হয়। বেশির ভাগ গল্প কিংবা উপন্যাসেরই দ্বিতীয় সংস্করণ হয় না। অনেক বইয়ের ১০ থেকে ১৫ কপিও বিক্রি হয় না। আমি যখন গুরুত্ব দিয়ে লেখালেখি শুরু করি, সেই সত্তরের দশকে, এ রকম বইয়ের লেখকদের মনোকষ্টের কথা আমি জানতাম। আমি এ-ও জানতাম, পাঠকরুচি সব সাহিত্যেই খুব সাধারণ মাপের। যেসব লেখক জনপ্রিয় হন, তাঁরা আমাকে অল্প বয়সেও আকৃষ্ট করতেন না। 'রহু চণ্ডাল' লেখার সময় আমি নিজেই বুঝতে পেরেছিলাম, জনপ্রিয় লেখকদের মতো শুধু পাঠকের পছন্দ-অপছন্দের কথা ভেবে আমি লিখতে পারব না।

'রহু চণ্ডালের হাড়' আমার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ এবং মোটামুটি প্রমাণ মাপের একখানা উপন্যাস। এর আগে আমি ছোট আকারে আরো দুটি উপন্যাস লিখেছিলাম। উপন্যাস হিসেবে চিহ্নিত করলেও এই লেখা দুটি আসলে 'খড়হম ংঃড়ৎু' বা বাংলায় যাকে বলা হয় 'টানা গল্প'। প্রথমটির নাম 'বর্গক্ষেত্র'_সম্ভবত ১৯৭৯-১৯৮০ সালের লেখা। ১৯৮১ সালের বর্ষা সংখ্যা 'এক্ষণ'-এ এই লেখাটি উপন্যাস হিসেবেই প্রকাশিত হয়। 'এক্ষণ' সেই সময়কার অতি বিখ্যাত লিটল ম্যাগাজিন_প্রায় প্রতিটি সংখ্যায়ই সত্যজিৎ রায় নতুন প্রচ্ছদ করতেন। প্রখ্যাত নির্মাল্য আচার্য এর সম্পাদক ছিলেন। দ্বিতীয় উপন্যাস 'ক্রান্তিবলয়' সম্ভবত ১৯৮১ সালেই লিখি। এই দুটি উপন্যাসেই আমার নকশালপন্থী আবেগ বেশ উল্লেখযোগ্যভাবে প্রকাশ পেয়েছিল, যে মতাদর্শকে আমি প্রায় ১০ বছর আগেই ত্যাগ করে এসেছি। ফলে এই দুটি উপন্যাসের পরিণতিতে আমি নিজেই খুব সন্তুষ্ট ছিলাম না। 'রহু চণ্ডাল' লেখার একটা ইতিহাস আছে। অনেক উপন্যাসেরই এ রকম একটা ইতিহাস, অর্থাৎ লেখাটা কী করে তৈরি হয়ে উঠল, তার তথ্য লেখকের কাছে থাকে। আমাদের সাহিত্যে পত্রপত্রিকার পূজাসংখ্যা বা ঈদসংখ্যায় যেসব উপন্যাস লেখা হয়, তার বেশির ভাগই খুব একটা প্রস্তুতি ছাড়াই লেখা হয়। এসবে ইতিহাসও তাই বিশেষ থাকে না। আমি এ কথাও বলছি না, পূজা বা ঈদে যেসব উপন্যাস প্রকাশিত হয়, সেগুলোর সবই সস্তা জনপ্রিয় লেখা। এ মুহূর্তে মনে পড়ছে, মহাশ্বেতা দেবীর 'স্তনদায়িনী' পূজাসংখ্যায়ই লেখা; এবং তাঁর বয়ান অনুযায়ী, অন্য অনেক লেখার (যা তাঁকে প্রতিবছর পূজার সময় লিখতে হতো) সঙ্গে তৈরি আরেকটি লেখা, যা মাত্র কয়েক দিনের রাত জাগার ফল। কিন্তু এমন লেখা কদাচিৎই হয়।
'রহু চণ্ডালের হাড়' শুধু এক শ্রেণীর যাযাবরের জীবন-সংগ্রামের কাহিনী নয়। এই যাযাবরগোষ্ঠী, আমার উপন্যাসে যে গোষ্ঠীর নাম বাজিকর, তাদের এক-দেড় শ বছরের ঘোরাফেরাকে কেন্দ্র করে আমি একটি বিস্তৃত অঞ্চলের ওই সময়কার ইতিহাস, সমাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য, ধর্ম ইত্যাদি বিষয়কে টুকরো টুকরো করে তুলে এনেছি।
১৯৭৩-১৯৭৪ সালে এক বছর তিন-চার মাস সময়ের জন্য আমি তৎকালীন পশ্চিম দিনাজপুরের একটি সমবায় ব্যাংকে চাকরি করেছিলাম। সেই সময় বালুরঘাট মহকুমার তপন থানার কয়েকটি গ্রামে এসব বাজিকরের সঙ্গে আমার দেখা হয়। মাঝখানে কয়েক বছর বাদ দিয়ে ১৯৭৬-১৯৭৭ সাল থেকে ফের মেলামেশার সুযোগ হয়েছিল আমার।
বেশ কয়েক বছর কাছ থেকে এবং দূর থেকে দেখার পুঁজি সম্বল করে 'রহু চণ্ডালের হাড়' লেখার কাজ শুরু করি ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে। বালুরঘাটের তপন থানা হচ্ছে জেলার সবচেয়ে দরিদ্র অংশ। জমি ২০১১ সাল পর্যন্ত অধিকাংশই এক ফসলি। উঁচু-নিচু জমি, রুক্ষ কাঁকরময় গেরুয়া রঙের প্রাচীন পলিমাটি। মাটির নিচে জল নেই। মাঘ-ফাল্গুনে পানীয় জলের কুয়াও শুকিয়ে যায়। আদিবাসী এবং তফসিলিপ্রধান এই থানার দরিদ্রতম মানুষের মধ্যে বাজিকররা অন্যতম।
বাজিকরদের একটি দল সামান্য কিছু পাওয়ার আশায় যখন মুসলমান হওয়ার সংকল্প করে, সেই পর্যায়টা আমি ভালোভাবে লক্ষ করেছিলাম। বাজিকরদের নিজস্ব কোনো ধর্মবিশ্বাস ছিল না। তাদের বৃদ্ধদের কাছ থেকে আমি শুনেছিলাম, পথচলতি অবস্থায় গৃহস্থ মানুষের সমাজের কোনো কোনো লৌকিক ধর্মবিশ্বাসের দেব-দেবীকে তারা কখনো কখনো আশ্রয় করে। 'বিগামাই', 'ওলামাই'_এ রকম দু-একটি মাতৃশক্তির খুবই অস্বচ্ছ ধারণার কথা তারা আমাকে বলেছিল। 'ওলামাই' বোঝা যায়, কিন্তু 'বিগামাই' কে, কী তার কাজ, আমি বুঝতে পারিনি। তাদের কোনো দেবস্থান আমি দেখিনি, কোনো পূজা-অর্চনার স্থূলতর পদ্ধতিও দেখিনি আমি। দুই প্রবল ধর্মবিশ্বাসী সমাজের মধ্যে সততই নিষ্পিষ্ট বাজিকররা কেমন যেন অপ্রস্তুত তাদের অস্তিত্ব নিয়ে, এমনই তাদের মনে হয়েছিল আমার। বস্তুত, আমার অভিজ্ঞতায় এ রকম মানুষ আর ছিল না। তবু তারা বুঝেছিল, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে তাদের 'থিতু' হতে হবে। জোত-জমি, বাড়ি-ঘর নিয়ে যে জীবনযাত্রা চালায়, সে হলো 'গেরস্থ' এবং তার স্ত্রী 'গেরস্থানি'। তাদের মর্যাদা বাজিকরের ধরাছোঁয়ার বাইরে। সে শুধু স্থিত হতে চায়। বাজিকর চোর, বাজিকর ভবঘুরে, বাজিকর ভিখারি_সে আর এগুলো শুনতে চায় না। সে শুধু স্থিতিশীল মানুষ হতে চায়। 'আলীর ওপর কালী, না কালীর ওপর আলী'_এই বৃত্তান্ত সে কারো কাছে জানতে চায় না। কালী বা আলী_প্রধান এই দুই বৃত্তের যেকোনো একটির অন্তর্ভুক্ত হতে চায় সে। কোনোটিতেই তার অবশ্য দুর্বলতা নেই।
অবশেষে মুসলমানদের তরফে কেউ কেউ তাদের শুধু স্থিতিশীল হওয়ারই নয়, জাতপাতেরও আশ্বাস দেয়। আমি সেই পর্যায়টা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলাম। বাজিকরদের নিয়ে উপন্যাস লেখার ভ্রূণ সেই ঘটনা থেকেই আমার চিন্তায় রূপ পেতে শুরু করে। ধর্মান্তর ব্যাপারটি বাজিকরদের বেলায় খাটে না। তার শুধু ধর্ম গ্রহণ।
আমার তৃতীয় উপন্যাস লেখার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ফলবতী হয়। ১৯৭৯ কিংবা ১৯৮০ সালের কোনো একসময় আমি 'বর্গক্ষেত্র' লিখি, যে কথা আগেই বলেছি। সেই সময় আমি আমার সব লেখাই কলকাতায় মহাশ্বেতা দেবীর ঠিকানায় পাঠিয়ে দিতাম। তাঁর নির্দেশেই এ ব্যবস্থা। মহাশ্বেতা দেবী প্রকাশ্যেই সেই সময় রসিকতা করে বলতেন, 'আমি অভিজিতের কলকাতা এজেন্ট।'
'বর্গক্ষেত্র'ও মহাশ্বেতাদির কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। কয়েক মাস পর কলকাতায় এলে তিনি আমাকে বললেন 'এক্ষণ' সম্পাদক নির্মাল্য আচার্যের সঙ্গে দেখা করতে। কেননা, 'এক্ষণ' তথা নির্মাল্য আচার্য 'বর্গক্ষেত্র' লেখাটি ছাপাতে চেয়েছেন। ১৯৮১ সালের প্রথমদিকে কোনো একসময় আমি কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউসে একদিন দুপুরবেলা এক্ষণের সম্পাদক নির্মাল্য আচার্যের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। 'রহু চণ্ডালের হাড়' উপন্যাসের কথা বলতে গেলে প্রয়াত নির্মাল্য আচার্যের কথা স্মরণ করা আমার অবশ্য কর্তব্য।
১৯৬৭ সালে কলকাতায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং নির্মাল্য আচার্য সম্পাদিত 'এক্ষণ' পত্রিকার যাত্রা শুরু হয়। প্রথম প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই 'এক্ষণ' শিল্প-সাহিত্যের বিশিষ্টজনদের কাছে বিশিষ্ট লিটল ম্যাগাজিন হিসেবে গণ্য হলো। সৌমিত্র নির্মিত বিশ্ববিখ্যাত ছবির নায়ক এবং স্বয়ং একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতির অভিনেতা। নির্মাল্য আচার্য তাঁর সহপাঠী এবং বন্ধু। কালক্রমে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ছবির কাজে আরো জড়িয়ে যেতে নির্মাল্য আচার্যই একক সম্পাদকরূপে পত্রিকা পরিচালনা করতে শুরু করেন।
'বর্গক্ষেত্র' ১৯৮১ সালের বর্ষা সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। গত শতকের আটের দশক পর্যন্ত কলকাতায় আমার যোগাযোগ সব চিঠিতেই হতো। ২-৯-৮১ তারিখে নির্মাল্যদা আমাকে চিঠি দিলেন : 'বর্গক্ষেত্র প্রচুর ব্যক্তি পড়েছেন ও পড়ছেন। চতুর্দিকে বেশ একটা আলোচনাও শোনা যাচ্ছে। অনেকে আমাকে লেখাটি ছাপাবার জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন।'
সেই সময় এক্ষণে একটি গল্প বের হলে কলকাতা তথা পশ্চিম বাংলার সাহিত্য মহলে অনেকেই ধরে নিত, এই লেখক সাহিত্যে থাকতে এসেছে। নির্মাল্যদার চিঠি পেয়ে আমি যে অসম্ভব উত্তেজিত হয়েছিলাম, সে কথা বলাই বাহুল্য। চিঠির শেষদিকে লিখেছেন, 'যাযাবর সম্প্রদায়কে নিয়ে আপনার লেখাটি সম্পর্কে আগ্রহ রইলো। লেখাটি কি শেষ হয়েছে? আমাদের শারদীয় সংখ্যায় গেলে ভালো হতো।...যদি লেখা হয়ে থাকে, তাহলে কালবিলম্ব না করে পাঠিয়ে দিন।'
এক্ষণ তথা নির্মাল্যদার এই চিঠি আমার কাছে যেন কোটি টাকার লটারির নির্ঘাত টিকিটখানা কেউ আমাকে পাঠিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করছে।
বছরের গোড়ায় যখন তাঁর সঙ্গে দেখা করি, তাঁর প্রশ্নের উত্তরে বাজিকরদের নিয়ে আমার উপন্যাস লেখার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলাম। ইতিমধ্যে 'রহু চণ্ডালের হাড়' উপন্যাস আমি লিখতে শুরুও করেছিলাম। ৫০-৫২ পৃষ্ঠার মতো লিখে লেখাটা ফেলে রেখেছিলাম।
নির্মাল্যদার চিঠি পাওয়ার পরবর্তী সাত-আট দিন আমি একটা ঘোরের মধ্যে অমানুষিক পরিশ্রম করি। দিন-রাত ক্রমাগত লিখে লেখাটা দাঁড়াল ফুলস্কেপ কাগজের ১৫০ পৃষ্ঠার মতো। চিঠি পাওয়ার তিন-চার দিন পর এক কিস্তি, সাত-আট দিন পর আরেক কিস্তি_মোট দুই কিস্তিতে পার্সেল করে 'রহু চণ্ডালের হাড়'-এর প্রথম খসড়া নির্মাল্যদাকে পাঠিয়ে দিলাম। তখন না ছিল টেলিফোনের এমন সুযোগ-সুবিধা, না কুরিয়ার সার্ভিসের ব্যবস্থা। কাজেই দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করতে লাগলাম নির্মাল্যদার চিঠির।
দুরুদুরু বুকে, কেননা আমি জানতাম, লেখাটি নির্মাল্য আচার্যের পছন্দ হলেও তাঁর হাতে সময় আদৌ ছিল না। পশ্চিমবঙ্গের পত্র-পত্রিকার শারদীয় সংখ্যা বের করার সর্বজনগ্রাহ্য নিয়ম মহালয়ার আগে। আমি জানতাম, পার্সেল সঠিক সময়ে পেঁৗছলেও, লেখাটি নির্মাল্যদার পছন্দ হলেও, ব্যাপারটি সম্ভব নয়।
পরবর্তী ৯-১০-৮১ তারিখে তিনি লিখেছেন, 'এখনো ভালো করে (রহু চণ্ডালের হাড়) পড়ে উঠতে পারিনি। তাই এখনি মতামত জানাচ্ছি না। ছাপা তো হবেই, সে নিয়ে ভাববেন না।...আগে জানা থাকলে শারদীয় সংখ্যায় ছাপার পরিকল্পনা নেওয়া যেত। অথবা ১-১১/২ ফর্মার মধ্যে হলেও হতো। শেষ মুহূর্তে অত বড় লেখা ছাপা যায়?'
পরবর্তী ২২ নভেম্বর ১৯৮১ চিঠিতে লিখেছেন, 'অসামান্য বিষয়বস্তু।...যেমন-তেমন করে প্রকাশ করে এ লেখাকে কিছুতেই নষ্ট করা যাবে না। সেটা হবে বিরাট একটি সম্ভাবনার অপমৃত্যু। যা সাহিত্যে তরঙ্গ তুলতে পারে, তা দিয়ে বুদ্বুদ সৃষ্টি করা শুধু দায়িত্ব ও আদর্শহীনতাই হবে না, হবে অমার্জনীয় অপরাধ।...এখন শুধু আপনাকে দেখতে হবে, এটিকে আধুনিক বাংলা উপন্যাসের একটি প্রথম শ্রেণীর সৃষ্টি হিসেবে কেমন করে তৈরি করা যায়।...'
'তিতাস ও হাঁসুলি বাঁকের সঙ্গে পাল্লা দিতে হবে', লিখেছেন তিনি। নতুন লেখক আমার অবস্থা সহজেই অনুমান করতে পারবেন সবাই।
বাজিকরদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হলো। তাদের একটি বড় অংশ তখন মুসলমান হয়েছে। তাতে তাদের সমাজের মধ্যে যে একটা বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে, এতে আমার সন্দেহ ছিল না। কিন্তু সেই বিভেদ এই আশঙ্কায় যে, অল্প কিছু মানুষের গোষ্ঠী সেটা আবার দুভাগ হয়ে গেল! ধর্মের ব্যাপারে বৃদ্ধরা আমাকে বলেছিল, 'এটি দু-মাস, ওটি ছ-মাস থাকা_যখুন যেথায় থাকি_একটা কোট (পক্ষ) ধইরে লিই, বিয়ে-শাদির কোনো লাইন নাই_হিন্দুর শাস্তোর মতোও লয়, মোছোলমানের শাস্তোর মতোও লয়'_এ রকম বহু বিষয় আমি জিজ্ঞেস করে জেনেছিলাম। সেই সময় সবে এ দেশে টেপরেকর্ডার এসেছে। একটি টেপরেকর্ডার জোগাড় করে অনেক মানুষের সঙ্গে কথা বলে বাজিকরদের সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় রেকর্ড করেছিলাম। ধর্ম, ভাষা ও সমাজ বিষয়ে তাদের ধারণা_এসব।
এভাবে তৈরি হয়ে ১৯৮১ সালের পূজার পর পূর্ণ উদ্যমে 'রহু চণ্ডালের হাড়' লেখা শুরু হলো নতুন করে। নির্মাল্যদার পরামর্শে 'ঙহব ঐঁহফৎবফ ণবধৎং ড়ভ ঝড়ষরঃঁফব' পড়ে ফেললাম।
মার্কেজের বইখানা পড়ে আমার মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। নির্মাল্য আচার্যের আমার কাছ থেকে প্রত্যাশা কতখানি? ঙহব ঐঁহফৎবফ ণবধৎং-এর ১০০ মাইলের কাছাকাছি কি কোনো দিন পেঁৗছতে পারব? তবু ভারী কৃতজ্ঞতা বোধ হলো। এ দেশে হাতেগোনা কয়েকজন তখন পর্যন্ত বইখানা পড়েছেন; এবং তাঁদের মধ্যে আমিও একজন! কী অসাধারণ উপন্যাস!
গবেষণা বলতে যদি যাযাবরদের বিষয়ে খোঁজ-খবর, ওদের নিজেদের কাছ থেকে, স্থানীয় প্রবল দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের কাছ থেকে এবং সেই সময়ে বালুরঘাটে পাওয়া সম্ভব এমন কিছু বইপত্রও ঘাঁটাঘাঁটি করেছিলাম। জেলা লাইব্রেরিতে এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা ছিল। সেখান থেকে যাযাবরদের বিষয়ে যতটুকু পাওয়া যায় এবং তার ভেতর যতখানি আমার প্রয়োজনে লাগে, ততটুকুই আমি সংগ্রহ করেছিলাম। জিপসিদের বিষয়ে বাংলায় সেই সময় পাওয়া যাওয়া একমাত্র বই শ্রীপান্থর 'জিপসির পায়ে পায়ে'ও একবার পড়ে নিয়েছিলাম। পড়েছিলাম রমেশ চন্দ্র মজুমদারের বই থেকে আঠারো_উনিশ শতকের বাংলার ইতিহাসের খানিকটা। ১৯৮০-১৯৮১ সালে পশ্চিম দিনাজপুরে কর্মরত আমার শুভানুধ্যায়ী অসিত রঞ্জন দাশগুপ্ত আইএএস মশাইয়ের সহায়তায় আমার উদ্দিষ্ট সময়কালে লিখিত দিনাজপুর-রাজশাহী-রংপুরের জেলা শাসকদের পরস্পরকে লেখা কিছু চিঠিপত্র এবং সেগুলো নিয়ে লেখা দাশগুপ্ত সাহেবের দু-একটি প্রবন্ধ। এগুলো নিয়েই আমার 'রহু চণ্ডালের হাড়' লেখার পরিশ্রম পরবর্তী সাত-আট মাস ধরে। আমার হাতের লেখায় সেই লেখা দাঁড়াল ফুলস্কেপ কাগজের ৪০০ পৃষ্ঠার ওপরে।
'রহু চণ্ডালের হাড়' প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। কলকাতার বিশিষ্ট প্রকাশনা সুবর্ণরেখার স্বত্বাধিকারী ইন্দ্রনাথ মজুমদার পাণ্ডুলিপিখানা সাগ্রহে আমার কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছিলেন। প্রসঙ্গত, ইন্দ্রনাথ মজুমদার নির্মাল্যদার বন্ধুস্থানীয় এবং এক্ষণের কার্যালয়ও সুবর্ণরেখার ঠিকানা।
'রহু চণ্ডাল' প্রকাশের ব্যাপারে নির্মাল্যদার অবদান কোনো দিন ভোলার নয়, যদিও অনেক বাধা অতিক্রম করে বই সম্পূর্ণ হয়ে প্রকাশ হলো ১লা বৈশাখ, ১৩৯২ তারিখে।
বইটির আরো দুটি সংস্করণ সুবর্ণরেখা প্রকাশ করেছে। দ্বিতীয় সংস্করণ পৌষ ১৩৯৯ এবং তৃতীয় সংস্করণ ১৪০৭-এ। কলকাতায় জে এন চক্রবর্তী অ্যান্ড কম্পানি ডিসেম্বর ২০১০-এ আরো একটি সংস্করণ বের করেছে। এতসবের পরও বাংলাদেশে ২০১২-তে একুশের বইমেলায় নান্দনিক একটি মহার্ঘ্য সংস্করণ বের করার প্রস্তুতি নিয়েছে।
তবু কোনো একটি জায়গায় 'রহু চণ্ডাল' সাধারণ এবং বিশিষ্ট পাঠক_উভয়েরই মনোযোগ পেয়েছে। এতগুলো সংস্করণ এর একটি প্রমাণ। ১৯৯২ সালে প্রাপ্ত বঙ্কিম পুরস্কার আরেকটি। সবচেয়ে বড় মাপের প্রাপ্তি অগ্রজ কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের 'অভিজিৎ সেনের হাড়তরঙ্গ'। আমাকে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত করে দিয়ে প্রত্যক্ষ পরিচয়হীন গদ্যকার ইলিয়াস একটি আস্ত প্রবন্ধই লিখে ফেলেছেন 'রহু চণ্ডাল' এবং আমার সম্পর্কে! আর কী প্রবন্ধ, যেকোনো পাঠকই বুঝতে পারবেন, আমার লেখার সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখাতেও যেন তাঁর কষ্ট হচ্ছে!
১৯৯০ সালে তিনি এই প্রবন্ধ লিখেছিলেন। আমার পুরস্কার প্রাপ্তি তখনো হয়নি। কাজেই পুরস্কার যে কোনোভাবে তাঁকে প্রভাবিত করেছে, এমনটি বলার কোনো কারণ নেই। চেনা-জানা প্রত্যক্ষ পরিচয়ের কাছের লোকও আমি ছিলাম না। তাঁর প্রবন্ধ পড়ে আমার আত্মবিশ্বাস অনেকগুণ বেড়ে গিয়েছিল। তাঁর অসুস্থতার সময় কলকাতায় একদিন দেখা করতে গিয়েছিলাম। তখন সবে ৮-১০ দিন হলো তাঁর অঙ্গহানি হয়েছে। ওই অবস্থায়ই আমার সঙ্গে প্রায় ঘণ্টাতিনেক কথা বলেছিলেন। তার মধ্যে একটি কথা শুনে আমি বুঝতে পেরেছিলাম, 'রহু চণ্ডালের হাড়' তাঁকে কেন এত আকর্ষণ করেছে। অনেকবার বরিশাল থেকে স্টিমারে ঢাকায় যাওয়ার সময় স্টিমারের ডেকে এই বাজিকরদের দেখেছিলেন তিনি খেলা দেখাতে। 'লাগ্ ভেলকি লাগ্, চোখে-মুখে লাগ্', রহু চণ্ডালের হাড়ের ছোঁয়ায় 'সত্যের গুলি্ল মিথ্যা হউক, মিথ্যার গুলি্ল সত্য হউক'_এই ভানুমতি ভেলকি কতবার দেখেছেন? 'রহু চণ্ডাল' তাঁর ইম্যাজিনেশনে কেন ধরা পড়ল না! সত্যি সত্যিই তাঁর কণ্ঠে আক্ষেপ শুনেছিলাম আমি। আমি হেসে বলেছিলাম, আসলে হাড্ডি খিজির আপনাকে তখন ধরে ফেলেছে যে।
বাংলাদেশের অগ্রজ সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক এই 'রহু চণ্ডাল' প্রসঙ্গেই প্রথম চিঠি লিখেন আমাকে। নির্মাল্য আচার্যের প্রত্যাশাই তাঁর ১৯.১.১৯৯১-এর চিঠিতে। হয়তো তার চেয়েও বেশি।
"আপনার 'রহু চণ্ডালের হাড়' উপন্যাসটি আমাকে কলকাতায় তাঁর (ইন্দ্রনাথ মজুমদার) দোকানে দিয়েছিলেন। উপন্যাসটি পড়ে আমি মুগ্ধ হই। সাহিত্যের গুণগ্রাহী আমার যত বন্ধু এখানে আছেন, তাঁদের সবাইকে এক-এক করে এই উপন্যাসটি পড়তে দিয়েছিলাম। তারাশঙ্করের 'হাঁসুলি বাঁকের উপকথা', সতীনাথ ভাদুড়ির 'ঢোঁড়াইচরিত মানস' বা এ রকম কিছু কিছু বাংলা উপন্যাসের কথা মনে পড়লেও 'রহু চণ্ডালের হাড়' একেবারেই আলাদা উপন্যাস। সমস্ত বাংলা ভাষার সাহিত্যেই নতুন।'
অনেক বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক, অনেক সাধারণ মানুষ রহু চণ্ডালের মুগ্ধ পাঠ-প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন আমাকে বিগত ২৫-২৬ বছর ধরে। এই সুযোগে তাঁদের সবাইকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাই।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন