বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৫

মৃন্ময় চক্রবর্তী'র ছুটির লেখা : কতদূর পথ

মেঠো পথে একটা গরুর গাড়ি চলেছে। গাড়ির ছইয়ের ভেতরে একটা ছোট্ট ছেলে চুপ করে বসে আছে। তার চোখের সামনে দিগন্ত বিস্তৃত শূণ্যতা। মাঝে মাঝে সে তার মাকে প্রশ্ন করে এটা ওটা জেনে নিচ্ছে। মাঠের আকাশ চিরে চলে গেছে টেলিগ্রাফের তার। ইয়া মোটা মোটা হাতির পায়ের মত সবুজ তার খুঁটি। সেগুলোকে ঘিরে বুনোলতা আগাছার জঙ্গল। দূরে দূরে মেঠো পথ চলে গেছে নানান গন্তব্যে। হটিটি ডাকছে,বুনোপায়রা চরছে এখানে ওখানে।

গাড়ির চাকায় আর্তনাদের শব্দ। লিক পথ ধরে এগিয়ে চলেছে গাড়ি আর বলদ। গাড়োয়ান দূর্বোধ্য ভাষায় তাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছে, হেই হেই বাহা বাহা হেই হেই......

কতক্ষণে গাড়ি ঢুকবে গ্রামে, কতক্ষণে দাঁড়াবে এসে মামারবাড়ির দুয়ারে!

দূরে দেখা যাচ্ছে ঘননীল দিগন্তরেখা। একটুবাদেই স্পষ্ট দেখা দেবে প্রাচীন বট আর তেঁতুলগাছগুলো। ওটাই গ্রামের সীমানা। তারপর স্পষ্ট হবে বিরাট ফনাওয়ালা ফনিমনসার ঝোপ। বহুযুগের পুরোনো শিবমন্দিরের চূড়ো। তারপর হয়ত দেখা যাবে স্নায়ুরোগাক্রান্ত বড়মামা টলমল পায়ে হাঁটতে হাঁটতে আসছে। তাঁর লুটিয়ে পড়া ধুতি ধুলোমলিন, খালিগায়ে বিবর্ণ উপবীত, চোখজোড়ায় অসীম আনন্দ।

আর কতক্ষণ? এরপর সন্ধ্যা ঘনাবে, মাথার উপরে দেখা দেবে নক্ষত্ররাজি, আকাশগঙ্গার ঈশারা। কতক্ষণে পৌঁছবে গাড়ি? ছেলেটা কি মাঠেই থেকে যাবে চিরকাল, এই গরুরগাড়ির ছইয়ের ভেতর? তার দিদা দুয়োরে অপেক্ষা করছে রোজ, মামা প্রতিদিন ভাবছে বাড়ি এসে ঠিক তাকে দেখবে।

সে পৌঁছেই দেখবে মায়ের- মাসীর হাতে বোনা লেখা শোভা পাচ্ছে মাটির দেওয়ালে, সঙ্গে দুটি সবুজ বনের টিয়া..."খাও পাখি গাও গান, সদা বল ভগবান"! মধু ময়রা কাঠিগজা ভাজছে রসগোল্লা বানাচ্ছে। কখন দেখবে সে এইসব?

তার গাড়ি তো এগোচ্ছেনা কিছুতেই, অথচ চাকায় শব্দ হচ্ছে, চলে যাবার শব্দ।

ধুলোর গন্ধ, খড়ের গন্ধ ভাসছে হাওয়ায়। গাড়ি এখনো দুলছে নৌকোর মত মাঠের শূন্যপথজুড়ে......

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন