বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৫

হামীম কামরুল হকের গল্প : যতটুকু আমি বুঝতে পারি

‘গ্রামে গেলেই খালি পায়ের লোক খুঁজি। পাই না। প্রত্যেকের পায়ে হয় চপ্পল, নয়তো জুতা। হোক কম দামি; তাও খালি পায়ে আছে-- এমন একটা লোকও ইদানীং পাই না। যার মুখের দিকে তাকাই দেখি সেই লোকটা কত সুন্দর, সুন্দর মানে সুদর্শন অর্থে নয়, সুখী এবং জীবন্ত অর্থে। তাজা একটা ব্যাপার আছে পা থেকে মাথা পর্যন্ত। আর ফ্রেস মানেই তো সুন্দর। ঝরঝরে শরীর স্বাস্থ্য।’এসব শুনছিলাম। এই তো কদিন আগে রীতি এসেছিল ক্যাম্পাসে।
আমাদের সঙ্গে অনার্স পর্যন্ত পড়েছিল। বিয়ের পর পরই স্বামীর সঙ্গে কানাডা চলে গেছে। এখন টোরেন্টোতে থাকে। বলছিল, ‘আমি তো সারা পৃথবীতেই ঘুরি। দেশে ফিরে আমার একটা জিনিস ভালো লাগে জানিস। বাইরের দেশের লোকেরা কি পোলাপান থেকে বুড়োবুড়ি-- কী জোয়ান ছেলেমেয়ে এত মোটা মোটা সব, আমাদের দেশের লোক সে তুলনায় অনেক পাতালাপুতলা। আর ওদের তো রাজ্যের অসুখবিসুখ। আর তুই তো একেবারে সুপার আছিস। তোকে আবার নাইনটেনে ভর্তি করে দেওয়া যাবে। শালা বাঁচবি অনেকদিন।’ কিন্তু আমি জানি, আমাকে খুব বেশি দিন স্বস্তিতে বাঁচিয়ে রাখা হবে না। তবে যেকোনো সময় শেষ করে ফেলা হবে কিনা তাও আমি জানি না। আর এটা যে করা হবে আমি ছাড়া কেউ জানেও না। আফ্রিনকেও বলিনি। বললে পাগল ভাবতে পারে। আমাকে এই তো সেদিন বলেছিল, ‘এবার তুমি দিব্যি মরে যেতে পারো। আমার যা দেওয়ার সব দিয়েছি। বলো, তোমার সমস্ত ফ্যান্টাসি শেষ করে দিয়েছি কিনা? নাকি এখনো আরও কিছু বাকি আছে?’ হ্যাঁ, সে আমার জন্য সব রকম ঝুঁকি নিয়েছে। আসলে ও বলেছিল, ‘আমাকে এই ফ্যাটিশ থেকে মুক্ত না করলে তার নামই সে বদলে ফেলবে।’ আমি যদিও জানি ওর-ও আমাকে ততটাই দরকার ছিল, ওকে আমার যতটা দরকার ছিল। যদিও প্রতিবারই আমি মুখ মলিন করে রাখতাম। ও বলত, ‘এবারও হয়নি!’ আসলে আমি কোনো কিছুতেই আনন্দ পাচ্ছিলাম না। সবচেয়ে বড় কথা মাঝে মাঝে ওকেও আমার সহ্য হচ্ছিল না। বাঁচোয়া এই যে, আমি জোরে কথা বলতে পারি না। আর উত্তেজিত হই না। এটা পারি না বলেই হয়তো ও আমাকে সহ্য করতে পেরেছিল।

সময়টা শেষ হয়ে আসছিল। আমাকে যেকোনো সময়ই এখান থেকে চলে যেতে হবে। ও যদিও আরো বছর দুয়েক এখানে থাকবে। আমি আফ্রিনের তিন বছরের বড়। এটা তো সবাই জানে যে ছেলেকে মেয়ের চেয়ে কমপক্ষে চার বছরের বড় থাকতে হয়। কারণ মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে চার বছর আগে পাকে। কীসে মেয়েরা চার বছর এগিয়ে থাকে তার কোনো নমুনা তো আমি দেখলাম না-- এটাও অনেকদিন মনে হতো। এমন কত কী বলা হতো। ‘কোনো মেয়ের দিকে তাকাতে হলে সবার আগে কী দেখতে হবে কী? মানে কোন জিনিসটা?’ ‘কী?’ ‘ওই মেয়ের পা।’ এর মানে হলো যে মেয়ে তার পায়ের যত্ন নেয়, সে মেয়ে তার শরীরের আর সব কিছুর যত্ন নেয়। যত্ন নেয় তার মনেরও। আমি অবশ্য এসব সূত্রটুত্র মেনে কখনো চলিনি। যখন যা মনে হয়ছে করেছি। আবার তাও যে সব সময় করেছি, তাও তো নয়।

জীবনকে আমি সহজভাবেই নিয়েছিলাম। অথচ সেই বুঝজ্ঞান হওয়ার পর থেকে সবাই কানের কাছে একটাই কথা বলেছে, জীবন কঠিন। এই দেখতে দেখতেই তো অনেক দিন কেটে গেল। তখন আমিই বলতাম, ‘কঠিন সেই জীবনের সঙ্গে আমার তো আজো দেখা হলো না। নাকি এই যে আগামীকাল কী হবে, আমার ভবিষ্যৎ কী-- এসব নিয়ে একদম ভাবি না বলেই হয়তো আমার মনে এটা জাগতেই পারে না যে, জীবন কঠিন।’

মূলত যা কিছু কঠিন তার সবকিছুকে স্বাভাবিক হিসেবে নিয়েছিলাম। কেবল মনে হয়েছে, যে অবস্থায় আগে ছিলাম, একটু একটু করে সেই অবস্থার বদল হচ্ছে। যেমন আগে বেড়ার ঘরে, খড়ে ছাওয়া চালের নিচে দিন কাটিয়েছি। কলেজে উঠতে উঠতে বাড়িটা বেড়ার ঘর থেকে টিনের হল। মাটির মেঝে পাকা হলো। বাড়িতে রেডিও এলো। এখন টেলিভিশন চলে। বড় ভাই খুব হিসাবি মানুষ। হাইস্কুলে অঙ্ক পড়ায়। থানা সদরে কোচিং করায়। ওই অঞ্চলে অঙ্কের মাস্টার তার ওপরে আর কেউ নেই। প্রবোধকুমার সেনগুপ্তের পর এত ভালো অংকের মাস্টার এই পুরো এলাকায় আর কেউ ছিল না। তারপরও সুভাষচন্দ্র রায়, বিনয়ভূষণ মজুমদার, কালীচরণ চক্রবর্তী মতো মাস্টাররা ছিলেন। সুভাষ এবং বিনয়বাবু তো বৃটিশরা যাওয়ার আগেই নাকি হাওয়া বুঝতে পেরেছিলেন। যেতে হল আগেই যেতে হবে। প্রবোধচন্দ্র গেলেন, লোকে বলে এই তো সেদিন, ১৯৬২সালে। কেবল কালীচরণ এদেশে থেকে গিয়েছিলেন। গ্রামের শশ্মানেই তার দাহ হয়। তার পুত্রকন্যারা ঢাকায় বড় বড় চাকরি করে। এক কন্যা বিশ্বাবিদ্যালয়ের শিক্ষক। বড় ছেলে আর দুটো পদোন্নতি পেলে কোনো মন্ত্রণালয়ের সচিব হয়ে যাবেন। অন্যরা ভারতে গিয়ে কে কোথায় আছে, সেসব হয়তো হিন্দু কমিউনিটির লোকজন জানতে পারে। মুসলামানদের মধ্যে কেউ কেউ কেবল দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, ‘হিন্দুরা দেশটা ছাইড়া গেল আর স্কুলে বাংলা, অঙ্ক আর ইংরেজি-- এই তিনটার মান দুম করে পইড়ে গেল। এই তিন বিদ্যাই হল আসল।’

আমার বড় ভাই প্রায়ই তার শিক্ষক কালীচরণের কথা বলতেন। কী যে মজা তিনি দিয়ে গেছেন। তিনি বলেছিলেন, ‘অঙ্ক নারে ব্যাটা, বল গণিত। অঙ্ক তো থাকে নাটকে। জীবনে থাকে গণিত। ভালো করে গণিতটা আয়ত্ত কর। জীবনে আর কোনো কিছুর অভাব হবে না।’

কালীচরণের এক বন্ধু, মুসলমান, কিন্তু একে কমিউনিস্ট, দুয়ে অসাধারণ রবীন্দ্রসংগীতের শিল্পী ও শিক্ষক, নিজামুল হক তাকে বলেছিলো, ‘বন্ধু, গণিত আর সংগীত-- জগতের সবকিছুতে এই দুই বিদ্যা লাগে, কিন্তু এই দুই বিদ্যার কিন্তু কাউকে লাগে না। এর মানে হলো, গণিত আর সংগীতের যে চর্চা করে, আর কোনো কিছুর না বুঝে যদি সে এই দুয়ের কোনো একটা চর্চা করে তো সে এই বিদ্যার সর্বোচ্চ স্তরে যেতে পারে। কিন্তু জীবন তো গণিতও না, সংগীতও না। জীবন হলো জীবন। কোন পথে যে এর সর্বোচ্চ স্তরে যাওয়া যায়, তার কোনো বাঁধা ছকতো নাই। এর মানে আয় উন্নতির সর্বোচ্চমাত্রা না। এটা হলো বোধের জীবন। জীবনকে বোঝার, দেখার যে-জীবন। যে এটা বুঝে সে টাকার পিছনে ছোটে না। ক্ষমতার পিছনে ছোটে না। নিজামুল হক কালীচরণের মৃত্যুশয্যায় পাশে ছিলেন, তার হাত ধরে কালীচরণ খুব দুর্বল গলায় বলেছিলেন, ‘সেই গানটা গাও।’ নিজামুল হক জিজ্ঞাসাও করেননি, ‘কোন গানটা?’ মৃত্যুপথযাত্রী বন্ধুর হাতটা ধরে তিনি গানটা ধরে ছিলেন, ‘সমুখে শান্তিপারাবার।’ গানটা শুনে সবাই হু হু করে কাঁদছিল। কিন্তু মুখে হাসি লেগেছিল কালীচরণের। তিনি গানটা শেষ হওয়ার আগেই চোখ বুঝেছিলেন। সবার আগে টের পেয়েছিলেন নিজামুল। হাতের বাঁধন ঢিলা হয়ে গিয়েছিল। নিজামুল আশ্চর্য হয়েছিলেন, কী শক্ত করে তার হাতটা ধরেছিলেন কালীচরণ। গানটা শুনতে শুনতে আস্তে আস্তে সেই হাতের বাঁধন ঢিলা হয়ে যায়। কালীচরণের মুখে কোনো মলিনতা ছিল না, কোনো অতৃপ্তি ছিল না। আর থাকবেই বা কেন? একটি ছেলে সরকারের বড় চাকুরে। মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। পরের দুজনও পড়ালেখা শেষ করে আনছে। তাদের ভবিষ্যৎ ভালো বলেই আগাম দেখতে পেয়েছিলেন তিনি।

আমি আমার ভবিণষ্যৎ কী দেখতে পাচ্ছি? আফ্রিন আমাকে বলে, ‘ভবিষ্যৎ দেখা লাগবে না। বর্তমান দেখো।’ আমি বলি,‘বর্তমান দেখি বলেই তো ভবিষ্যৎ নিয়ে এসব হচ্ছে।’ আমার প্রায়ই মনে হয়, এই যে সময়টা যাচ্ছে এইযে আঠারো থেকে আঠাশের দিকে, এসময়টা যারা ধারালো হয়, পরে একটু একটু করে, তাদের কেউ কেউ বা বেশিরভাগই দুম করে ভোঁতা হয়ে যেতে পারে। আমি নিজেকে ধারালো মনে করি না। অবশ্য আমি নিজের ধার পরীক্ষাও করে উঠতে পারিনি, করার সুযোগও হয়নি। বন্ধুবান্ধবীরা সবাই বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এছাড়া আর তাদের সামনে কোনো পথ নেই। আমি সেই আগের মতোই চলছিলাম। সন্ধ্যা হলেই পকেটে একটা পুরো খবরের কাগজ রোল করে ঢুকিয়ে নিলে তিন নম্বর হলের পেছনে ফুলের বাগানে চলে যাচ্ছি। আফ্রিনের সঙ্গে আঠালো সময় কাটিয়ে তারপর ফিরছি। বাড়ি থেকে দুজনের টাকা এলে সেটা একসাথ করে আমরা চলে গেছি কক্সবাজার। আফ্রিন বলে, ‘সেদিন প্রোভেস্ট স্যার সবাইকে কমন রুমে ডেকে আচ্ছা মাতো ঝাড়ি দিলেন। বললেন, হলের পিছনে ফুলের বাগানে এসব খবরের কাগজ কেন বিছানো থাকে? এখানে ওখানে পড়ে থাকে কন্ট্রাসেভটিভ? আমার কাজ কি তোমাদের এসবের তালাশ করা, নাকি তোমাদের সুযোগসুবিধা দেখা?’ বলে আফ্রিন হিহি করে হাসলেও একটু পরেই বিষণ্ন মুখে বলেছিল,‘আমাদের আর মনে হয় ওই দিকে যাওয়া ঠিক হবে না। কিছু একটা উপায় করো গোলাম হোসেন!’

আমার সময় এমনিতে কমে এসেছিল। আফ্রিনের এই কথা শুনে কদিন সত্যিই ভয় খেয়ে যাই। এবং তখন রাতারাতি যে পরিবর্তনটা আমার মধ্যে হয়, সেটা নিয়ে আমিই আমার নিজেকে নিয়ে অবাক হই। আমি আফ্রিনকে বলি,‘আসলে বিসিএসটাই দিতে হবে। এছাড়া তো আর উপায় দেখি না।’

আফ্রিনের সঙ্গে নিজের বদলে যাওয়া টের পেয়ে আমার সত্যিই অন্য রকম লাগল। আমি দেখি যেসব নিয়ে আমি আমার মৃত্যুর চিন্তা করছিলাম-- আমাকে যেকেউ হত্যা করতে পারে সেটা থেকে আমি আসলে একটু একটু করে সরে এসেছি। আসলে সমাজের মানুষ যেভাবে চলে-- এত হাজারো কুসংস্করে ভরে থাকে তাদের মন-- আমি সেখানে বিজ্ঞানের কথা বলছিলাম। কিন্তু সবই চলে যাচ্ছিল মানুষের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে। আফ্রিন অবশ্য জানে না আমার এই দিকটা। তাকে একেবারেই বলিনি। বললে চিন্তায় পড়বে। পর পর তিন মাসে তিন জনকে শেষ করে দেওয়া হয়েছে। আমি ঢাকা থেকে দূরে থাকি। আবার খুব দূরেও তো না। আমি জানি ক্যাম্পাসে যতদিন আছি, সবাই একসঙ্গে চলা ফেরা করছি, ততদিন কেউ কোনো ঝামেলা করতে পারবে না। কিন্তু একা চলার সময়টা চলে এলেই সমস্যা শুরু হয়ে যাবে। সংস্কার মানে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা। আমি ও আফ্রিন সেটা একটা একটা করে ভেঙেছি। আমরা দেখতে চেয়েছি সোডোমিতে আসলেই মাটি দু’ভাগ হয়ে যায় কিনা। একদিন গভীর রাতে ওদের হলের অন্যপাশে সাপখোপের ভয়ডর তুচ্ছ করে একেবারে আদিম আদম-হওয়া হয়ে জঙ্গলের মধ্যে হেঁটেছি। কোনো কোনোদিন যতক্ষণ শরীরে শক্তি ছিল একজন্য অন্যজনের ভেতরে নিঃশেষিত হয়েছি। আমার মনে হয় এই যে ব্যক্তিগতভাবে আমারা এসব ভেঙে ফেলেছি, সেখান থেকেই আমি নিজেকে সমর্থন দিতে বা নিজের মনটাকে বুঝ দিতে বিজ্ঞান ও যুক্তিকে বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দাঁড়া করিয়ে দিয়েছি। আমি জানি আমাকে যদি হত্যা করা হয়, পরের দিনই আমার নামে রটনা হবে লুচ্চাটা মারা গেছে, কাজটা ভালো হইছে। আমি তো জানি, আফ্রিন জানে আমাদের মধ্যে কোনো রকম লুকোছাপা নেই। কিন্তু আমি জানি কিছু গোপন জিনিস সবারই থাকে। সব কিছু এত খুলে দিতে নেই। আমরা দুজনেই জানি, যতদিন ভালো লাগবে ততদিন আমরা একসঙ্গে জীবন কাটাবো, যখনই ভালো লাগবে না, সেটা জানাবে এবং আলাদা হয়ে যাবো। তার মানে এই না আমরা বিয়েশাদিই করবো না। আমি গ্রামের ছেলে। আফ্রিন যশোরের ব্যবসায়ী পরিবারের মেয়ে। আমাকে লোকজন বলে, ‘হলে তো হবা বড় জামাই। দুনিয়ার দায়িত্ব কিন্তু আপনার ঘাড়ে চাপবে।’ আমি চুপ করে থাকি। মনে মনে বলি, চাপলে চাপুক। আফ্রিনের মতো তো আর জগতে কাউকে পাবো না। আফ্রিন আমার জীবনের কত বড় আবিষ্কার সেটা তো আমি জানি। আফ্রিনও বলে,‘সত্যিই আমার কী করে কী করে একে অন্যকে খুঁজে পেলাম!’

বড় ভাই আমাকে কদিন পর পর ফোন করে বলে, ‘ভাইরে অনেক কষ্ট করে তোকে পড়াচ্ছি। আমার মান রাখিস না-রাখিস, নিজের মানটা কখনো হারাস না। আমাকে আব্বা মারা যাওয়ার সময় বলেছিলে, দুটো জিনিস থেকে দূরে থাকতে। এক রাজনীতি, দুই সিনেমা হল। আমি জানি এখন রাজনীতি করার জন্য মাঠে মাঠে দৌড়াতে হয় না। সিনেমা দেখতে হলে যাওয়া লাগে না। আমার কথা-- আর যাই করো নিজের সময়টা অন্যতে নষ্ট করতে দিও না। যে নিজের সময়টা অন্যকে দিয়ে দেয় সেই হল জগতের সবচেয়ে বোকা।’

সবকিছুই ঠিক ছিল, তখন আমার ঠিক আগের ব্যাচের একজনকে ওই সেই পেছন থেকে চাপাতির কোপ দিয়ে হত্যা করা হয়। আমি তাকে গুরুর মতো মানতাম। এত শান্ত ভদ্র একটা মানুষ ছিলেন। আছেন থেকে ছিলেন হয়ে গেলেন! তিনি আমাকে তার এই ঘটনার কদিন আগেও বলেছিলেন,‘আমরা খুব বিপদের মধ্যে আছি। ঠিক কারা আমাদের আসল শত্রু-- এখন তো সেটাই বোঝা যাচ্ছে। নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করার কাজটা শুরু হয়ে গেছে। এর বেশি কিছু বলতে চাই না। এর থেকে যা বোঝার বুঝে নাও।’

না আমি আসলে বুঝতে পারিনি। আফ্রিনকেও বলতে পারিনি যে আমি তলে তলে ভয়ংকর বিপদের দিকে পা বাড়িয়ে আছি। যদিও বিসিএস দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি, কিন্তু আমার মনটা আবার কদিনের জন্য সেদিকে ঘুরে যায়। আমি আবার অস্থির হয়ে উঠি। আফ্রিনও সেটা খেয়াল করে। ‘ তোমার কী মন খারাপ? বেশ কদিন ধরে কী সব চিন্তা করো। কী হয়েছে?’ আমাকে সময় সুযোগ বুঝে ওর ব্যাচের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর বাসায় নিয়ে যায়। সেখানেই বলতে গেলে আমরা জীবনের সবচেয়ে ভালো সময়টা কাটাই। অন্তত আফ্রিন আর আমার মনে কোনো চাপ থাকার কথা ছিল না। আমি একরকম সাড়া দিলেও মরার মতো পড়ে ছিলাম। শেষ পর্যন্ত আর পারলাম না। অনেকক্ষণ আফ্রিন কেবল তার ভূমিকা পালন করে গিয়েছিল। আমার সহ্যও হচ্ছিল না। শেষে আমার ভেতরে ও সাড়া এনে দেয় যে আমি সক্রিয় হয়ে উঠি। ও আসলে এমন সব কায়দাকানুন জানে। এটাকে বলে, ‘বায়ো এনহেন্সিং সিস্টেম।’ আর শরীর নিয়ে এত মজা পায়। যশোরে থাকার সময় ওর দুটো প্রেম হয়েছিল। সেসব আমাকে বলেছিল। প্রেম মানে যা যা হতে পারে সবই হয়েছিল। আমি জানতে চাইনি। নিজে থেকেই বলেছে। আফ্রিন আসলে কোনো কিছু লুকাতে চাইতো না। অন্তত শরীর বিষয়ে অভিজ্ঞতা ও শরীর সম্পর্কে এত আগ্রহ। ও বলে, এটাই ওর কাছে দেহসাধনা। নিজের বাবামায়ের শয্যাদৃশ্য বহুবার দেখেছে। প্রায় রাতেই সবাই ঘুমিয়ে পড়লে বাতি জ্বালিয়ে তারা কাজটা করতেন। অনেক সময় দরজা খোলা থাকত, জানালার পর্দাটা সরানো থাকতো। এমনিতে বাড়িটার দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। বর্গাকৃতি বাড়ি। একটা বাইরের দিক দিয়ে বারান্দা আছে, টানা। আবার ভেতরে দিকে অনেকটা জায়গা ফাঁকা রেখে বাগান। মানে বাড়িতে থাকার ঘরগুলিকে ঘিরে রেখেছে বাইরের বারান্দা, আর ভেতরে বারান্দা ঘিরে রয়েছে ভেতরের বাগানটাকে। দুটো বারান্দার মাঝখানে বাড়ির সব রুম। ভেতরে ও বাইরের এই বারান্দা দেওয়া ও বাগানওয়ালা বাড়ি ওদের ওখানে বলে বেশি নেই। নতুন একটা বাড়িও করছে ওর মা। ওর মা বিশেষ একটা রাজনৈতিক পার্টির সঙ্গেও জড়িত, যারা নাকি দেশটাকে ধর্মরাষ্ট্র বানাতে চায়। তাদের বাড়িতে এঁদের মিটিংও হয় মাঝে মাঝে। মা ঘরের বাইরে বের হলেই বোরখা পরে। আফ্রিন নিজেও সব মেনে চলে। বোরখা, নামাজ,কালাম পড়া, রোজরাখা সবই। ওর আরেকটা বোন আছে। তার কানে নাকি একটু সমস্যা। হেয়ারফোন ব্যবহার করতে হয়। আফ্রিন লম্বায় প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট। গোলগাল মুখ। বিশেষ করে ওর হাতের বাহুটা আমার হাতের বাহু দুটো মিলে যত মোটা হবে তার সমান। হালকা ভুড়িও আছে। পাছা একেবারে পিঠের সঙ্গে মেলানো। বুকটাও দেখতে তেমন ভালো নয়। সবমিলিয়ে একেবারে সাধারণ। দাঁতটা একটু উঁচু। কেবল সাজলে একটু চোখে লাগে। আমাদের সম্পর্ক হওয়ার পর থেকে সারাক্ষণ বলতে গেলে চব্বিশঘণ্টা তার পারলে আমার সঙ্গ চাইত। আমি বলতাম, ‘তুমি একটা বিশ্বাসী মানুষ। আল্লাবিল্লা করা মানুষ। আবার তোমার এত ইয়ে।’ ও বলে,‘মানুষের নেচার যা, তাই তাকে করতে হয়, তাই না? ওটাও তো তার দেওয়া। তাই না? এই জগতের কোনো কিছুই তো আমার-তোমার ইচ্ছায় হয় না। যা হয় তা হলো তিনি চান বলে।’ এ নিয়ে আফ্রিনের মধ্যে কোনো দ্বিধা নেই। কোনো গ্লানি বা পাপপুণ্যের বলাই নেই। বলে,‘খিদা লাগলে আমি যেমন খাই, এটাও তাই। ক্ষুধা হলে খেতে নিষেধ যেমন নেই, এও তো তেমন। আমি তো অন্যেদের বলা-কওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকবো না।’ আমি ওর এসব কথায় কোনো জটিলতা পেতাম না। সোজাসরল কথা। আমি বলি,‘কী সোজা কথা!’ ও বলে, ‘হ্যাঁ, সোজাই। সোজা না হলে সোজা করে নিতে হয়।’

আমার এক বন্ধু খেলাঘর করতো। সেই ছোটবেলায় একটা ছড়ার বইতে বিখ্যাত ছড়াকার সুকুমার বড়–য়ার একটা অটোগ্রাফ নিয়েছিল। ‘কোনো কিছু সোজা নয়/ সোজা করে নিতে হয়।’সেখানে এদুটো লাইনের ছড়া লিখে তাঁর স্বাক্ষর দিয়েছিলেন। কথাটা আমি কোনোদিন ভুলিনি। আফ্রিনকে বলেছিলাম ছড়াটার কথা। ও বলে, ‘পুরো জীবনের সবকথাই তো দেখি এই দুই লাইনের ভেতরে বলা হয়ে গেছে।’ এসব ছড়াকবিতাগানও আফ্রিন বেশ ভালো বুঝতো। কী সব বই পড়তো। আমি তো এক বর্ণও বুঝতে পারতাম না। অনিলা স্মরণে, সুহাসিনী পমেটম। ও বলত, ‘তুমি এত বিজ্ঞান বোঝো, আর বাংলা লেখা এই বাক্যগুলি বোঝো না! আশ্চর্য!’ আমি বলতাম, ‘আমি বিজ্ঞানের ছাত্র। সাহিত্যটা ঠিক মাথায় ঢোকে না। বাংলা খুব কম মার্ক পেতাম। আমার আশ্চর্য লাগে ভূগোলের মতো সাবজেক্টে নিয়ে তুমি কী সব জটিল জটিল জিনিস পড়ো।’

ও এসব শিখেছিল ওর হলের রুমমেট রুম্পার কাছ থেকে। রুম্পা আবার বামপন্থী একটা সংগঠন করতো। রুম্পার একটা লম্বা ঢ্যাঙ্গা একটা প্রেমিক ছিল। রুম্পা যতটা কালো প্রেমিকটা ছিল ততটা ভ্যারভেরে ফর্সা। ‘আমি কত সাবধান দেখো। রুম্পা একবার অ্যার্বেটও করেছে।’ রুম্পার কাছ থেকে ও এসব জটিল বইপত্র পড়তে পায়। অনিলা স্মরণের একটা জায়গা নাকি আছে ‘স্পিড মিঃ চ্যাটার্জ্জি স্পিড! হেলুভা স্পিড!’ এ জায়গাটা নাকি অসম্ভব প্রিয় আফ্রিনের। লং ড্রাইভে বের হওয়া নারীটি পুরুষটাকে বলতো, এত স্পিডে গাড়ি চালাতে যাতে সে আর ওই লোকটি ছাড়া জগতের আশপাশ সব আবছা হয়ে যাক। আমার নাম ধরে চাপা কণ্ঠে আফ্রিন বিশেষ সময়ের চূড়ান্তে ওঠার সময় ওই ‘স্পিড স্পিড হলুভা স্পিড’ তাহলে এখান থেকে নেওয়া। আমি আসলে ওর তালগোল কিছু বুঝতে পারতাম না। ‘তুমি যে কী!’ ও হেসে বলতো, ‘কী মানে আবার কী? ধর্মেও আছি, জিরফেও আছি।’ এটাও বলতো ছড়ার মতো করে। জীবনটাকে ও নিজের মতো করে একটা ছন্দ দিয়েছিল। আর আমার জীবনটা একেবারে গদ্য হয়ে গেল।

আফ্রিন আমাকে বলতো,‘তুমি বামও নও, ডানও নও। তুমি আসলে কী?’ আমি বলতাম,‘এখনো কোনো কী হয়ে উঠিনি। তবে প্রতিটি বিন্দুতে আমি সব রকমের সংস্কার থেকে মুক্তি চাই। আমার সব কিছু আমার সিদ্ধান্তে হবে, আমার বোধ জ্ঞানের ভেতরে হবে। এর বাইরে আমি কোনো কিছু মানি না।’ এই না-মানার জায়গা থেকেই আমি একটা ভয়ংকর জায়গায় চলে যেতে থাকি। সেই জায়গাটা আবার আফ্রিন জানে না। কেউ জানে না। কিন্তু আমি জানি আমাকে যারা জানার তারা তারা ঠিকই জানবে। যার খোঁজার ঠিকই খুঁজে নেবে। আর কোনো একদিন আমার পরিণতি কী হতে পারে তাও আর কেউ চিন্তা করতে পারবে না। নিজের সেই দৃশ্য দেখে আমি একটু একটু করে শিউরে ওঠাটা শুরু করি আর বুঝতে পারি আসলে আমি বা কেউ কোথাও পৌঁছাতে পারছি না। আমার এসব কাজকর্ম কোথাও কোনো মানে তৈরি করছে না। আমাকে আসলে সরেই আসতে হবে।

আগে আফ্রিন নানান সময়ে নানান আবদার করলে আমি গাইগুই করতাম। এখন বুঝতে পারি এসব গাইগুয়ের কোনো মানে নেই। যতদিন বেঁচে আছি ততদিন তো (যতটুকু আমি বুঝতে পারি) আফ্রিনের সঙ্গেই আমাকে কাটাতে হবে। ওর জায়গায় তো আর কোনো বিকল্প হতে পারেনি কেউ। তাই আমি ‘আমাকে যেকোনো সময় যেকোনোখানে মৃত’ দেখার চেষ্টা করতে শুরু করি। আমি অতিজীবিত হওয়ার জন্য পাশ করেই একটা জীবিকার কথা ভাবি। আফ্রিন আর বিশাল আকারের বিসিএস গাইডটাই আপাতত হয়ে উঠতে পারে আমার দুটো জগৎ। সেই দুই জগতেই আসলে আমাকে হারিয়ে যেতে হবে, যদি আমি পৃথিবী থেকে দুম করে একদিন হারাতে না চাই।#

-------------------------------------------------------
এই গল্পটি নিয়ে গল্পকারের সঙ্গে আলাপ পড়ার লিঙ্ক 

1 টি মন্তব্য:

  1. আপনার মন্তব্য লিখুন... একটি অসাধারণ গল্প পড়লাম! শব্দের পর শব্দে মানুষের সহজাত জীবনের যে অপূর্ব বয়ান দেখলাম, তাতে মুগ্ধ না-হয়ে পারলাম না। প্রিয় গল্পকারের জন্য অফুরন্ত শুভেচ্ছা ও শুভকামনা।

    উত্তরমুছুন