বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৫

নরেন্দ্রনাথ মিত্র -সদর্থক জীবনের গল্পকার

তুহিন ওয়াদুদ

তাঁর গল্পে দেশবিভাগ-দাঙ্গা-মন্বন্তর-যুদ্ধোত্তর বিপর্যস্ত অর্থনীতি—সবকিছুই উঠে এসেছে। তবে তিনি যে রূপায়ণে এ প্রসঙ্গকে ছোটগল্পে চিত্রিত করেছেন তা সদর্থক। জীবন কখনো একক দুঃখের কিংবা একক সুখের সমষ্টি নয়, নিরবচ্ছিন্ন দুঃখময় জীবনেও সুখের আভাস বিদ্যমান। তাঁর গল্পের ভূমিতে থোকা থোকা কষ্ট ফুটে থাকে, দুঃখের বিদীর্ণ প্রান্তর তাঁর গল্পভূমি, দুঃসহ জীবনের রেখাপাত তাঁর একেকটি সৃষ্টি, সেই দুঃখসমুদ্র থেকে তিনি তুলে আনেন বিন্দু বিন্দু সুখের ছটা। সেই সুখের উদ্ভাস তিনি গল্পের পরিণতিতে এমনভাবে তুলির আঁচড়ে এঁকে দেন, যা পাঠকচিত্তকে জয় করতে কালবিলম্ব হয় না


বাংলা ছোটগল্পপরিমণ্ডলে নরেন্দ্রনাথ মিত্র (১৯১৬—১৯৭৫) অনেকটাই অনালোচিত-অনালোকিত। অথচ তাঁর গল্পের বিষয় ও কাঠামোগত বিন্যাস বাংলা ছোটগল্পতো বটে, বিশ্বছোটগল্পের প্রতিদ্বন্দ্বী। দ্বিতীয় মহাসমরকাল থেকে মৃত্যুদিন অবধি বাংলা ছোটগল্পের প্রভুপ্রতিনিধিদের সারিবদ্ধ ছিলেন তিনি। পাঠককে নিমগ্নচিত্তে গল্পপাঠে মুগ্ধতার সাথে ধরে রাখার এক অসামান্য শিল্পশক্তির আধার তাঁর গল্পমালা। শুধু সংখ্যা বিচারে চার শতাধিক গল্পের শিল্পী-স্রষ্টা মাত্র তিনি নন; তিনি প্রচুর ভালো গল্প লিখেছেন। বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাসে তাঁকে নিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরের আলোচনা ছাড়া আর কোথাও তিনি উল্লেখযোগ্যভাবে উপস্থাপিত নন। কিংবদন্তিতুল্য নরেন্দ্রনাথ মিত্রের গল্প নিয়ে স্বতন্ত্রপর্যায়ের বিস্তরায়তন আলোচনা হতে পারে। ৫১টি গল্পগ্রন্থ এবং ৩৮টি উপন্যাসের সার্থক কারিগর তিনি। সত্যজিত্ রায়, মৃণাল সেনসহ অনেকেই তাঁর রচনাকে চলচ্চিত্রে রূপ দিয়েছেন। তাঁর অনেক গল্পই হিন্দি, মারাঠি, রুশ, ইংরেজি, ইতালীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে। কর্মজীবনে অনেক ঘাত-অভিঘাত শেষে তিনি আনন্দ বাজার পত্রিকায় যোগদান করেন এবং আমৃত্যু সেখানে কর্মরত ছিলেন। ফরিদপুরের ভাঙা উপজেলার সদরদি গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। দেশবিভাগের পর তিনি কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। আর তাঁর বাংলাদেশে আসা হয়নি। বাংলা সাহিত্যে মানিক, বিভূতি, তারাশঙ্কর—এই ত্রিবন্দ্যোপাধ্যায়সহ নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র কিংবা সুবোধ ঘোষ যতটা আলোচিত, তার চেয়ে নরেন্দ্র নাথ মিত্র বেশি বৈ কম আলোচনার দাবি রাখেন না। কিন্তু আমরা নরেন্দ্রনাথ মিত্রের গল্পের ওপর সেই আলোটুকু ফেলতে পারিনি।

নরেন্দ্রনাথ মিত্র ঔপনিবেশিক শাসনে নিষ্পেষিত বিষাক্ত—ক্লেদাক্ত সমাজবাস্তবতায় শৈশব-কৈশোর অতিক্রম করেছেন। তা সত্ত্বেও নেতিবাচকতাপূর্ণ আস্ফাালিত সময়ের বিবর্ণ বর্ণচ্ছটা ভুলে সংকটের অতলে পড়ে থাকা সদর্থক জীবনের সন্ধান করেছেন। প্রত্যক্ষ করা মানুষের অন্তর্লোক গল্প বুননের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়েছে। তাঁর গল্পের শরীর দৃশ্যমান সমাজ, আর তাঁর গল্পের অন্তর-উঠান জুড়ে বিরাজিত মানুষের অন্তর্লোক। চল্লিশের দশক বাংলা সাহিত্যের উপরিকাঠামো এবং অন্তর্কাঠামোয় প্রভাবক হিসেবে অপরিমেয় তাত্পর্যসমৃদ্ধ। এ সময়—সমাজের মুকুরে বিম্বিত সাহিত্য ইতিহাসের পরিমণ্ডলস্পর্শী। সে ইতিহাসবোধ সংক্ষুব্ধ এবং হতাশামগ্নতার। নৈরাশ্যজগতের পটভূমি রচিত সময়ে নরেন্দ্রনাথ মিত্র আশার প্রদীপ শিখা প্রজ্জ্বলন করেছেন তাঁর ছোটগল্পে। তাঁর 'চাঁদমিঞা', 'কাঠগোলাপ', 'চোর', 'রস', 'হেডমাস্টার', 'পালঙ্ক', 'ভুবন ডাক্তার', 'সোহাগিনী', 'আবরণ', 'সুহাসিনী তরল আলতা' প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য গল্পসহ চার শতাধিক গল্পে অর্থনৈতিক-সামাজিক-মানসিক টানাপড়েন বিদ্যমান সত্ত্বেও গল্পগুলো হয়ে উঠেছে ইতিবাচক জীবনের গল্প। অধীনতার খোলসমুক্তির নিরন্তর প্রচেষ্টা দুর্ভিক্ষের কষাঘাত অতিক্রম করে স্বপ্নময় ভারত-পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি করে। আনন্দের একচ্ছত্র ভূমি হিসেবে বাঙালির জীবনে এই স্বাধীনতা আসেনি। আনন্দের রংয়ে মিশেছিল বিভক্তিজনিত বেদনার নীল। স্বাধীনতা-স্বাধীনতা ধ্বনি-প্রতিধ্বনিতে উত্তাল চল্লিশ যখন জাতি তত্ত্বদর্শন লাভ করে তখন বাঙালি হিন্দু-মুসলমানদের অনেকেই অন্তর্দ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত হতে থাকে। সেই ক্ষত কখনো কখনো দগদগে হয়ে উঠেছিল। বাঙালি শিল্পীগণ কেউ সেই বীভত্স ক্ষতকে রূপ দিয়েছেন তুলির আঁচড়ে রংয়ে, কেউ শব্দের ব্যঞ্জনায় রূপ দিয়েছেন গদ্যে-কবিতায়। সাহিত্যের স্রষ্টাগণ সময়ের বুকের ভাঙন-গড়নকে শিল্পনৈপুণ্যে সাহিত্যের সম্পদ হিসেবে সযত্নস্থান দিয়েছেন।

দ্বিতীয় মহাসমরকালে নরেন্দ্রনাথ মিত্র লিখতে শুরু করেন। কবিতায় তাঁর অভিষেক হলেও কথাশিল্পেই তাঁর শিল্পীমানসের বিকাশ এবং প্রতিষ্ঠা। চল্লিশের দশকের আগে যাঁরা যুক্ত হয়েছেন এবং চল্লিশের দশকে সাহিত্যের নির্মাতা হিসেবে কাজ করেছেন, তাঁদেরও অনেকেই চল্লিশের দুঃসময়াক্রান্ত হয়ে যুদ্ধ-মন্বন্তর-দেশভাগজনিত কষ্টের ছায়ায় ছোটগল্প লিখেছেন। সে বিষয়ানুগ গল্প নরেন্দ্রনাথ মিত্রও লিখেছেন। তাঁর গল্পে দেশবিভাগ-দাঙ্গা-মন্বন্তর-যুদ্ধোত্তর বিপর্যস্ত অর্থনীতি—সবকিছুই উঠে এসেছে। তবে তিনি যে রূপায়ণে এ প্রসঙ্গকে ছোটগল্পে চিত্রিত করেছেন তা সদর্থক। জীবন কখনো একক দুঃখের কিংবা একক সুখের সমষ্টি নয়, নিরবচ্ছিন্ন দুঃখময় জীবনেও সুখের আভাস বিদ্যমান। তাঁর গল্পের ভূমিতে থোকা থোকা কষ্ট ফুটে থাকে, দুঃখের বিদীর্ণ প্রান্তর তাঁর গল্পভূমি, দুঃসহ জীবনের রেখাপাত তাঁর একেকটি সৃষ্টি, সেই দুঃখসমুদ্র থেকে তিনি তুলে আনেন বিন্দু বিন্দু সুখের ছটা। সেই সুখের উদ্ভাস তিনি গল্পের পরিণতিতে এমনভাবে তুলির আঁচড়ে এঁকে দেন, যা পাঠকচিত্তকে জয় করতে কালবিলম্ব হয় না। গল্পগুলোকে তিনি পরিকল্পিতভাবে কদর্যপূর্ণ জীবনের বিপ্রতীপে উপস্থাপন করেন। তাঁর নিজের এ প্রবণতার পক্ষে 'গল্প লেখার গল্প' নিবন্ধে তিনি বলেছেন—'কিন্তু পিছন ফিরে তাকিয়ে বই না পড়ে নিজের গল্পগুলির কথা যতদূর মনে মনে পড়ে আমি দেখতে পাই ঘৃণা বিদ্বেষ ব্যঙ্গ বিদ্রূপ বৈরিতা আমায় লেখায় প্রবৃত্ত করেনি। বরং বিপরীত দিকের প্রীতি প্রেম সৌহার্দ্য, স্নেহ শ্রদ্ধা ভালোবাসা, পারিবারিক গণ্ডির ভিতরে বাইরে মানুষের সঙ্গে মানুষের বিচিত্র সম্পর্ক, একের সঙ্গে অন্যের মিলিত হবার দুর্বার আকাঙ্ক্ষা বার বার আমার গল্পের বিষয় হয়ে উঠেছে।' নরেন্দ্রনাথ মিত্রকে তাঁর গল্পগুলোতে আমরা তাঁর নিজের এই উক্তির ছায়া হিসেবে পাই।

'পালঙ্ক' গল্পে একটি পালঙ্ককে ঘিরে আবর্তিত গল্পের কাহিনি। গল্পে রাজমোহনের অশেষ মানসিক যন্ত্রণা লক্ষ করা যায়। সন্তানের প্রতি অভিমানে তিনি পালঙ্ক বিক্রি করেন। দেশবিভাগের সময়ে পরিবারের সকলেই দেশ ছেড়ে গেলেও তিনি কলকাতায় যানানি। বিক্রিত পালঙ্ক ফিরে পেতে তিনি একদিকে নিরন্তর চেষ্টা চালাতে থাকেন। অন্যদিকে ক্রেতা মকবুল না খেয়ে দিনাতিপাত করলেও পালঙ্ক ফেরত দিতে সম্মত নয়। একটি পালঙ্ককে কেন্দ্র করে গল্পের ঘটনা পরম্পরা দ্রুতই জটিল রূপ ধারণ করে। রাজমোহন যখন মৃত্যুপথযাত্রী, তখনো জ্বরে পুড়ে যাওয়া দুর্বল শরীর নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে রাতের অন্ধকারে বৃষ্টিতে ভিজে সেই পালঙ্ক ফেরত চাইতে গিয়েছিলেন। মকবু্ল যখন পালঙ্ক ফেরত দিতে সম্মত হয়। তখন সেই পালঙ্ক আর ফেরত নেয়না সে। পালঙ্কের ওপর মকবুলের সন্তানদের দেখে তার অনুভূতি বদলে যায়। সে তখন পরম তৃপ্ত। নরেন্দ্রনাথ মিত্র গল্প জুড়ে রাজমোহনের যে সীমাহীন আকুতি তুলে ধরেছেন তা মুহূর্তে প্রশমিত হয়। আর সেখানেই এ গল্পকারের স্বাতন্ত্র্য। ক্রমশ সিঁড়ি বেয়ে দুঃখের শীর্ষে পৌঁছাতেই যেন অকস্মাত্ সুখের সকাল ধরা দেয়।

'হেডমাস্টার' গল্পের হেডমাস্টার কৃষ্ণপ্রসন্ন সরকার চরিত্রটি একজন টিপিক্যাল শিক্ষকচরিত্র। অর্থনৈতিক সংকট তার জীবনের নিত্য সঙ্গী। তারপরও শেখানোর এক অদম্য চেষ্টায় রত। দেশবিভাগের পর শিক্ষকতার আয় দিয়ে সংসার চলছিল না। সে জন্য শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে এসে এক শিক্ষার্থীর কাছে ব্যাংকের চাকুরি নেয়। অফিসে গিয়ে তার কর্তা ব্যক্তি থেকে শুরু করে সকলের ভুল সংশোধন করা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এতে তার চাকরি হারানোর অবস্থা তৈরি হলেও তিনি দীর্ঘকালের শিক্ষকতা স্বভাব ভুলতে পারেন না। হেডমাস্টারের নিজের পরিবারের এবং কর্মক্ষেত্রের প্রতিকূল বাস্তবতা সত্ত্বেও গল্পের শেষে পাহারাদারদের নিয়ে তার যে স্বপ্ন, সেই স্বপ্নে জীবনকে সুন্দর করে দেখার প্রবণতা সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়। কৃষ্ণপ্রসন্ন সরকারের জীবনে যে কষ্টঘন পরিস্থিতির উদ্ভব হয় তা থেকে সম্পূর্ণরূপে উত্তরণ হয় না। কিন্তু মানুষকে নিয়ে কৃষ্ণপ্রসন্ন সরকারের স্বপ্ন গল্পটিকে শুভজীবনের মানদণ্ডে উন্নীত করে।

'রস' গল্পে মোতালেফ-মাজুখাতুন-ফুলবাণু তিনটি চরিত্রের যোজন-বিয়োজনের মধ্য দিয়ে গল্পটির পরিমণ্ডল গড়ে উঠেছে। রসাবহপূর্ণ জীবন পিয়াসী এরা সকলেই। মোতালেফ খুঁজেছে দেহগত সৌন্দর্য, গুড় তৈরিতে দক্ষ মাজুখাতুন খুঁজেছে জীবনের নিরাপত্তা, ফুলবাণু খুঁজেছে নিরাপত্তা ও সৌন্দর্য। তিনটে চরিত্রের মধ্যেই সুখাবহ সৃষ্টির পরিবর্তে নেমে আসে দুঃখময় মুহূর্ত। মোতলেফ মাজুখাতুনকে গ্রহণ করেছিল ফুলবাণুকে পাওয়ার জন্য। যখন মাজুখাতুন মোতালেফের ঘরে তখন সে ভালোবেসেছে ফুলবাণুকে আর যখন ফুলবাণু ঘরে তখন সে ভালোবেসেছে মাজুখাতুনেকে। রূপের মোহে ফুলবাণু আর গুণের গুণে মাজুখাতুন মোতালেফের প্রিয় হয়েছিল। রূপের মোহ কেটে গেলেও গুণের প্রতি তার আসক্তি অটুট থাকে। মাজুখাতুনকে ত্যাগ করলে মাজুখাতুন পুনরায় বিয়ে করে। মোতালেফ একদিন কিছু রস নিয়ে গুড় বানানোর কৌশল শেখার জন্য মাজু খাতুনের কাছে গেলে সে লক্ষ করে মাজুখাতুন তখনো তাকে ভালোবাসে। মোতালেফের প্রতি মাজু খাতুনের অনিঃশেষ ভালোবাসা গল্পটির সকল কষ্ট ভুলে যেতে সাহায্য করে। গল্পটির সমাপ্তিও সেখানেই। ফলে গল্পের পরিণতিতে সুখানুভূতির পরিণত রূপ গল্পটিকে যে ব্যঞ্জনা দান করে তা ইতিবাচক জীবনের।

'চাঁদমিঞা' গল্পে কয়েক স্তরের কষ্ট রয়েছে। নশরত্ আলীর চার-পাঁচ স্ত্রী মারা গেছে, ঘরে আছে আর চারজন। তার শেষ স্ত্রী রাবেয়া নশরত্ আলীর ঘোড়ার সহিস চাঁদমিঞাকে ভালোবাসে। নশরত্ আলী বুঝতে পেরে একদিন চাঁদমিঞাকে নির্মমভাবে আঘাতে আঘাতে মৃতপ্রায় করে তোলে এবং রাবেয়াকে গলা টিপে হত্যা করে। গল্পের প্রত্যেকটি স্তর এখানে কষ্টের ভিতের ওপর দণ্ডায়মান। অথচ, গল্পপাঠ সমাপ্তিতে সকল দুঃখবোধ ম্লান হয়ে যায় শেষাংশের গুণে। গল্পের শেষ দৃশ্যে জানা যায়, শেষ জীবনে নশরত্ আলী এবং চাঁদমিঞার মধ্যে ভীষণ হূদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কেন হয়েছে, কীভাবে হয়েছে এ নিয়ে বিস্ময় সৃষ্টি হলেও পরস্পরের বন্ধুত্ব ছিল ঘনিষ্ঠ পর্যায়ের। এমনকি মালিক-ভৃত্য সম্পর্ক উঠে গিয়ে বন্ধুত্বের পর্যায়ে উন্নীত হয় তাদের সম্পর্ক। নরেন্দ্রনাথ মিত্র গল্প বয়নে সাবধানতার সাথে সমাজের প্রকৃত অবস্থা উপস্থাপন করেন এবং গল্পের শেষে ক্লেদাক্ত সময়ে পরাজিত আশাবাদী ভাবনাকে যুক্ত করে দেন তাঁর গল্পে; যে অংশে নরেন্দ্রনাথ মিত্র স্বয়ং যুক্ত হন।

'কাঠগোলাপ' দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশবিভাগজনিত কারণে স্বদেশত্যাগীদের করুণ জীবনের আখ্যান হলেও গল্পের শেষে সেই করুণ আর্তি আর থাকেনি। নীরদ আর অণিমার জীবনের করুণ চিত্র গল্পটিকে আলো দান করলেও শেষ পর্যন্ত সেই চিত্রকে ছাড়িয়ে যায় গল্পের শুভ সমাপ্তি। দেশভাগের পর কলকাতায় বাংলাদেশ থেকে যাওয়া বাঙালিদের জীবনবাস্তবতা ছিল খুবই করুণ। নরেন্দ্রনাথ মিত্র এ গল্পে সেই সত্যের প্রতিচ্ছবি অঙ্কনে কোনো দ্বিধা-সঙ্কোচ করেননি, কিংবা সেখানে আরোপিত কোনো রং লাগাননি। তিনি জীবনের শুভ দিকের পক্ষপাতি বলে গল্পে সুখী মানুষের আনয়নও করেননি। তিনি তাঁর স্বতন্ত্র রংয়ের আলতো আঁচড় গল্পের পরিসমাপ্তিতে দুঃখবোধ থেকে পাঠকের উত্তরণ ঘটান। বাস্তবতাবিমুখ অণিমার বাস্তব ভূমিতে নেমে আসা এবং প্রতীকী অর্থে তার এ প্রচেষ্টাকে একটি ফুলের সাথে তুলনা করার মধ্য দিয়ে কষ্টের নিগড়ে পড়ে থাকা জীবনের মধ্যে যেন আশার উপ্ত বীজের সন্ধান পাওয়া যায়।

'চোর' গল্পে নরেন্দ্রনাথ মিত্র অমূল্যের চৌর্যবৃত্তির অপরিহার্যতা তুলে ধরেছেন। অমূল্যের স্ত্রী রেণু স্বামীর চৌর্যবৃত্তির প্রতি অশেষ ঘৃণা পোষণ করে। রেণুর ঘৃণার প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করে অমূল্য। শুধু তা-ই নয় ওপরতলা থেকে কাঁসার বাটি চুরি করার পরামর্শ দেয় স্ত্রীকে। একটি দোকানে কাজ করত অমূল্য। চুরির দায়ে চাকরি চলে যায়। তবু তার চুরি বন্ধ হয় না। চুরি না করলে উপোস করে থাকতে হতো বলেই চুরি করে অমূল্য। গল্পকার অমূল্যের চোরজীবনের যে আখ্যান গল্পে এনেছেন, এরচেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ রেণুর চোর হয়ে ওঠার অংশটুকু। একদিকে অর্থসংকট অন্যদিকে চোর স্বামীসঙ্গ রেণুকে চোর হিসেবে গড়ে তোলে। গল্পের বুনন, সংলাপ, নিম্নবিত্তের স্বরূপ, নারীর অসহায়ত্ব সবকিছুর মধ্য দিয়ে গল্পটি পাঠক চিত্তে স্থান করে নেয়। নরেন্দ্রনাথ মিত্র যেহেতুে জীবনকে ইতিবাচক করে দেখেন তাই গল্প সমাপ্তিতে শেষ রেখা টেনেছেন সুস্থ জীবনের দিকে ইঙ্গিত করে। নিজে চুরি করলেও চুরি পেশার প্রতি অমূল্যেরও যে ঘৃণা রয়েছে তার প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। সেখানে অমূল্য মহান হয়ে ওঠে। গল্পটি হয়ে ওঠে সদর্থক জীবনের গল্প।

'সোহাগিনী' গল্পে ত্রিকোণ প্রেমের পরিণতিতে তুফানীর মৃত্যু হয়। তুফানীর স্বামী বনমালী স্ত্রীকে মতি মিঞার বাড়ি থেকে আসতে দেখে নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা তুফানীকে বেদম প্রহার করলে তার মৃত্যু হয়। সেই রাতেই শ্মশানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। গল্পটি এখানে শেষ হলে দুঃখাবহ পরিণতি হতে পারত। কিন্তু, গল্পের শেষে দেখা যায়, শেষকৃত্য শেষে বনমালী এবং মতি মিঞা দুজনেই বর্ষরাতে তুফানীর শ্মশানে গিয়ে উপস্থিত। দুজনই অনুশোচনায় দগ্ধীভূত। নরেন্দ্রনাথ মিত্র এভাবেই গল্পের শেষ মোড়কে জীবনের আলো ছড়িয়ে দেন।

'আবরণ' গল্পের চাঁপা মন্বন্তরের জ্বলজ্বলে প্রতিনিধি। চাঁপার ন্যূনতম কাপড় নেই, যা দিয়ে নিজের শরীর আবৃত করতে পারে। চাঁপার করুণ অবস্থা নিবারণ করতে স্বামী বংশী গত্যন্তর না দেখে যৌনকর্মীর কাপড় আনার চেষ্টা করেছিল। বর্ণনাতীত এই দুঃসহ জীবনের মধ্যে স্ত্রীর জন্য বংশীর কাপড়ের চেষ্টায় এবং যৌনকর্মী সুখদার দগদগে ক্ষতবিশিষ্ট বুকের দিকে তাকিয়ে কাপড় ফেরত দেওয়ার মধ্যে নরেন্দ্রনাথ মিত্রের স্বকীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ সেখানেই শুভ জীবনের উন্মোচন।

'পালঙ্ক' গল্পের রাজমোহন-মকবুল, 'চাঁদমিঞা' গল্পের চাঁদমিঞা-নশরত্ আলী, 'চোর' গল্পের অমূল্য-রেণু, 'কাঠগোলাপ' গল্পের নীরদ-অণিমা, 'রস' গল্পের মোতালেফ-মাজুখাতুন, 'হেডমাস্টার' গল্পের কৃষ্ণপ্রসন্ন সরকার, 'সোহাগিনী' গল্পে বনমালী-মতিমিঞা, 'আবরণ' গল্পের চাঁপা-বংশী, 'ভুবন ডাক্তার' গল্পের ভুবন ডাক্তার—এরা সকলেই কোনো না কোনোভাবে দুঃখভারাক্রান্ত পর্বে বিন্যস্ত। তারা প্রত্যেকেই যন্ত্রণাবিদ্ধ। কখনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা, কখনো সময়-সমাজের অনিবার্য দুর্লঙ্ঘনীয় বাস্তবতার নিষ্পেষণ তাদের জীবনকে বিষময় করে তুলেছিল। নরেন্দ্রনাথ মিত্র তাঁর গল্পে সেই নিষ্পেষণে পীড়িত জীবনছবি চিত্রায়ণের সমাপ্তিতে বেঁচে থাকার স্বপ্ন যুক্ত করেন; যেখানে বেজে ওঠে মধুর সুরধ্বনি। জীবনের সীমাহীন কদর্থক অনুষঙ্গের আড়াল থেকে উঠে আসে তার প্রধান প্রবণতা—আশাবাদী জীবনের আলাপন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন