বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৫

মারিও বার্গাস য়োসা'র সাক্ষাৎকার : পড়ি কেন পড়ি তা নিয়ে বেশি ভাবিনি

অনুবাদ : রাজু আলাউদ্দিন

[স্প্যানিশ ভাষায় মারিও বার্গাস য়োসার এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন রিকার্দো এ সেত্তি ১৯৮৮ সালে। সুজান্নাহ হান্নিওয়েলের ইংরেজি অনুবাদে সাক্ষাৎকারটি লাতিন আমেরিকান রাইটার্স অ্যাট ওয়ার্ক গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। বইটি জর্জ প্লিম্পটনের সম্পাদনায় দ্য মডার্ন লাইব্রেরি, নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত হয় ২০০৩ সালে। দীর্ঘ এ সাক্ষাৎকারের প্রথম দিকের কিছু অংশের অনুবাদ এখানে পত্রস্থ হল।]


রিকার্দো এ সেত্তি: 
আপনি একজন সুপরিচিতি লেখক এবং আপনি যা লিখেছেন তার সঙ্গে আপনার পাঠকেরা পরিচিত। কী পড়ছেন তা কি আমাদের বলবেন?

মারিও বার্গাস য়োসা: 
গত কয়েক বছরে মজার কিছু ব্যাপার ঘটেছে। লক্ষ করলাম যে আমি সমসাময়িকদের লেখা পড়ছি খুবই কম এবং অনেক বেশি পড়ছি আগের লেখকদের। বিশ শতকের চেয়ে উনিশ শতকের লেখাই বেশি পড়ছি। ইদানীং আমার ঝোঁকটা প্রবন্ধ এবং ইতিহাসের চেয়ে সাহিত্যের প্রতি সম্ভবত কম। কী পড়ি, কেন পড়ি—এ নিয়ে আমি খুব একটা ভাবিনি। পড়াটা কখনো কখনো পেশাগত কারণে ঘটে। আমার সাহিত্যিক প্রকল্পগুলো উনিশ শতকের সঙ্গে জড়িত: ভিক্টর হুগোর লা মিজারেবল সম্পর্কে একটা প্রবন্ধ, কিংবা ফ্রাংকো-পেরুভীয় সমাজ সংস্কারক এবং ‘নারীবাদী’ আভা লা লেত্রে ফ্লোরা ত্রিস্তানের জীবনকাহিনি দ্বারা উদ্দীপ্ত হয়ে একটা উপন্যাস। তো আমার এও মনে হয়, পনেরো বা আঠারোয় আসার পর, আপনার মনে হবে যেন পৃথিবীতে আপনার অফুরন্ত সময় আছে। পঞ্চাশে এলেই আপনি লক্ষ করেন, আপনার সময় সীমিত এবং আপনাকে বাছবিচার করতে হবে। সম্ভবত এ কারণে আমার সমকালীনদের পড়া হয়ে ওঠে না খুব একটা।


রিকার্দো এ সেত্তি: 
তবে সমকালীন যাঁদের পড়েন, তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে কাকে পছন্দ করেন?

মারিও বার্গাস য়োসা: 
আমি যখন তরুণ, তখন আমি সার্ত্রের খুব ভক্ত ছিলাম। মার্কিন ঔপন্যাসিকদের পড়েছি—ফকনার, হেমিংওয়ে, ফিটজেরাল্ড, দোস পাসোস—বিশেষভাবে ফকনার। যৌবনে আমার পড়া লেখকদের মধ্যে তিনি অল্প কয়েকজনের একজন, যিনি এখনো আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁকে বারবার পড়া সত্ত্বেও আমি কখনোই হতাশ হইনি। তবে হেমিংওয়ের ক্ষেত্রে আমি হতাশ হয়েছি। সার্ত্রে আমি আজকাল আর পড়ব না। আজ পর্যন্ত আমার পড়া সবকিছুর সঙ্গে তুলনা করলে তাঁর উপন্যাসকে সেকেলে মনে হয়, তাঁর মূল্যও আর সেভাবে নেই। যেমন তাঁর প্রবন্ধ, বেশির ভাগেরই খুব একটা গুরুত্ব নেই, সম্ভবত একটা ব্যতিক্রম বাদে, ‘সন্ত জেনে: কমেডিয়ান কিংবা শহীদ’, যা আমি এখনো পছন্দ করি। বেশির ভাগ প্রবন্ধই স্ববিরোধিতা, অস্বচ্ছতা, অযথার্থতা আর এলোমেলো বক্তব্যে ভরা, যা ফকনারের বেলায় কখনো ঘটেনি। ফকনারই ছিলেন প্রথম ঔপন্যাসিক যাঁকে আমি পুরোপুরি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছি। কারণ, তাঁর শিল্পকৌশল আমাকে অভিভূত করেছিল। তিনিই ছিলেন প্রথম ঔপন্যাসিক যাঁর কাজকে আমি, উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সময়ের বিন্যাস, স্থান ও কালের প্রতিচ্ছেদ, আখ্যানের ভাঙনকে চিহ্নিত করার উদ্যোগের মাধ্যমে সচেতনভাবে পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করেছি। এবং নির্দিষ্ট এক অস্পষ্টতা তৈরির লক্ষ্যে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে গল্প বলার যে যোগ্যতা তাও তিনি করেছেন একে গভীরতা দানের জন্য। একজন লাতিন আমেরিকান হিসেবে আমি মনে করি ওই সময়ে তাঁর বইগুলো পড়াটা আমার জন্য কাজে লেগেছিল। কারণ, ওগুলো বর্ণনামূলক শিল্পকৌশলের এমন এক উৎস যা ফকনার বর্ণিত জগতে ব্যবহারের উপযোগী। পরে অবশ্যই, গোগ্রাসে পড়েছি উনিশ শতকের ঔপন্যাসিকদের: ফ্লবেয়ার, বালজাক, দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়, স্তাদাঁল, হথর্ন, ডিকেন্স, মেলভিব। এখনো আমি উনিশ শতকের লেখকদের গোগ্রাসী পাঠক।

লাতিন আমেরিকান সাহিত্য প্রসঙ্গে, অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ইউরোপে থাকার সময় আমি সত্যিকার অর্থে একে আবিষ্কার করি এবং গভীর আগ্রহ নিয়ে পড়তে শুরু করি। লন্ডনের বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাকে লাতিন আমেরিকান সাহিত্য পড়াতে হতো। সেটা ছিল আমার জন্য এক সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা। কারণ, এটা আমাকে লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের সামগ্রিকতা সম্পর্কে ভাবতে বাধ্য করে। তখন আমি বোর্হেস পড়তে শুরু করি, যার সঙ্গে আমি আগেই পরিচিতি ছিলাম। তারপর কার্পেন্তিয়ের, কোর্তাসার, গুইমারেস রোসা, নেছামা লিমা—গার্সিয়া মার্কেজ বাদে গোটা প্রজন্মই পড়েছি। মার্কেজকে আমি আবিষ্কার করি পরে এবং তাঁকে নিয়ে আমি বইও লিখেছিলাম গার্সিয়া মার্কেজ: ইস্তোরিয়া দে উন দেইসিদিও (গার্সিয়া মার্কেজ: দেবহত্যার ইতিহাস) নামে। উনিশ শতকের লাতিন আমেরিকান সাহিত্যও আমি পড়তে শুরু করি। কারণ, আমাকে তা পড়াতে হতো। পরে আমি লক্ষ করলাম, আমাদের অনেক অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ লেখক রয়েছেন। সম্ভবত কবি বা প্রাবন্ধিকের তুলনায় ঔপন্যাসিকের সংখ্যা কম, যেমন সার্মিয়েন্তোর কথাই ধরা যাক, যিনি কখনোই উপন্যাস লেখেননি। আমার মতে, তিনি লাতিন আমেরিকার মহত্তম গল্পকারদের একজন। তাঁর ‘ফাকুন্দো’ এক মহাসৃষ্টি। তবে আমাকে যদি একজনের নাম বেছে নিতে বলা হয়, তাহলে আমি বোর্হেসের কথাই বলব। কারণ, তিনি যে জগৎ তৈরি করেছেন তা আমার কাছে একেবারে মৌলিক মনে হয়। বিপুল মৌলিকতার পাশাপাশি তিনি তীব্র কল্পনাশক্তি আর সংস্কৃতির দ্বারা এতটাই সমৃদ্ধ ছিলেন যে তা একান্তভাবে তাঁর নিজস্ব। আর এ ছাড়া তাঁর ভাষা তো আছেই, যা আমাদের ঐতিহ্যবাহী পথের বাইরে উন্মোচন করেছে এক নতুন পথ। স্প্যানিশ হচ্ছে এমন এক ভাষা যার ঝোঁকটা হচ্ছে উচ্ছ্বাস, আতিশয্য ও অত্যুক্তির দিকে। আমাদের মহান লেখকেরা ছিলেন বাগাড়ম্বরপূর্ণ। সের্বান্তেস থেকে অর্তেগা ই গাসেত, বাইয়ে ইনক্লান কিংবা আলফনসো রেইয়েস পর্যন্ত। এর বিপরীতে বোর্হেস পুরোপুরি মিতভাষী, সংক্ষিপ্ত ও যথাযথ। স্প্যানিশ ভাষায় তিনিই একমাত্র লেখক, যিনি অসংখ্য শব্দের মতোই অসংখ্য ধারণার অধিকারী। তিনি আমাদের কালের মহান লেখকদের একজন।


রিকার্দো এ সেত্তি:
 বোর্হেসের সঙ্গে আপনার কী সম্পর্ক ছিল?

মারিও বার্গাস য়োসা: 
তাঁকে আমি প্রথম দেখি প্যারিসে, যেখানে আমি ষাটের দশকের প্রথম দিকে ছিলাম। ওখানে তিনি গাউচেস্কা সাহিত্যের এবং ফ্যান্টাস্টিক সাহিত্যের ওপর বক্তব্য দিচ্ছিলেন। পরে আমি ওই সময়ে আরটিএফের (রেডিও টেলিভিশন Fracaise) জন্য তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নিই। আমি ওখানে কাজ করতাম। এখনো আমি ঘটনাটা আবেগের সঙ্গে মনে করতে পারি। এরপর পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সময়ে আমাদের দেখা হয়েছে। এমনকি লিমাতেও, যেখানে আমি তাঁর সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করেছি। খাওয়া শেষে তিনি আমাকে টয়লেটে নিয়ে যেতে বললেন। প্রস্রাব করার সময় হঠাৎ করেই তিনি আমাকে বললেন, ‘ক্যাথলিকেরা, তোমার কি মনে হয় তারা খুব সিরিয়াস? সম্ভবত না।’

তাঁকে আমি শেষবারের মতো দেখি তাঁর বুয়েনেস আইরেসের বাসায়। পেরুর একটা টিভি শোর জন্য আমি তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম এবং আমার মনে হলো, আমার কিছু প্রশ্নের উত্তর তিনি বিরক্তির সঙ্গে দিয়েছিলেন। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তিনি উত্তেজিত হয়ে গেলেন। কারণ, সাক্ষাৎকার গ্রহণের পর—সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময়ে আমি সাংঘাতিক রকমের মনোযোগী ছিলাম তাঁর প্রতি, কেবল তাঁকে পছন্দ করি বলেই নয়, তিনি যে রকম নাজুক আর আনন্দদায়ক ছিলেন তাঁর প্রতি আমার গভীর অনুরাগের কারণেও—তো আমি তাঁকে বললাম, আমি বিস্মিত তাঁর বাসার হতশ্রী অবস্থা দেখে, যার দেয়ালগুলোতে চলটা ওঠানো আর ছাদের বিভিন্ন জায়গায় ছিদ্র। বিষয়টি তাঁকে ভীষণভাবে আহত করেছিল। ওই ঘটনার পর তাঁর সঙ্গে আমার আরও একবার দেখা হয় এবং তিনি ভীষণ দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন। অক্তাবিও পাস আমাকে বলেছিলেন যে তাঁর বাসা সম্পর্কে ওই বিশেষ মন্তব্য নাকি তাঁকে সত্যিই বিরক্ত করেছিল। এইমাত্র যা বললাম, কেবল এ ব্যাপারটিই হয়তো তাঁকে আহত করে থাকতে পারে। কারণ, এ ছাড়া আমি তাঁর প্রশংসা বৈ অন্য কিছু করিনি কখনো। মনে হয় না তিনি আমার বই পড়েছেন। তাঁর মতে, বয়স ৪০ হওয়ার পর তিনি কোনো জীবিত লেখকের বই কখনো পড়েননি। কেবল একই বই বারবার পড়তেন। আমি তাঁকে খুব পছন্দ করি। অবশ্য তিনিই একমাত্র নন। পাবলো নেরুদা অসাধারণ কবি এবং অক্তাবিও পাস—কেবল মহান কবিই নন, মহান প্রাবন্ধিকও তিনি। রাজনীতি, শিল্প এবং সাহিত্য সম্পর্কে এক বোদ্ধা মানুষ। তাঁর উৎসাহ ছিল বিশ্বজনীন। এখনো তাঁকে গভীর আনন্দের সঙ্গে পড়ি। তাঁর রাজনৈতিক ধারণাও একেবারে আমার মতো।


রিকার্দো এ সেত্তি: 
আপনার পছন্দের লেখকদের মধ্যে নেরুদার কথা বললেন। আপনি তাঁর বন্ধু ছিলেন। কেমন ছিলেন তিনি?

মারিও বার্গাস য়োসা: 
নেরুদা ছিলেন জীবনের পূজারী। চিত্রকলা, সাধারণ শিল্প, বইপত্র, বিরল সংস্করণ, খাবার, পানাহার—সবকিছুর ব্যাপারেই ছিল তাঁর জান্তব অনুভূতি। খাওয়াদাওয়া এবং পানাহার ছিল তাঁর কাছে এক মরমি অভিজ্ঞতা। স্টালিনকে নিয়ে তাঁর স্তুতিময় কবিতাগুলো যদি বাদ দেন, তাহলে অবশ্যই চমৎকার রকমের ভালোলাগার মতো এক মানুষ তিনি। জীবনরসে পরিপূর্ণ এক মানুষ। তিনি প্রায় সামন্ত ধরনের এক জগতে বাস করতেন, যেখানে সবকিছু তাঁর আনন্দের জন্য নিবেদিত। জীবনের জন্য ছিল তাঁর লালিত উচ্ছ্বাস। ইসলা নেগ্রায় এক ছুটির দিন কাটানোর সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। চমৎকার ছিল দিনটি। তাঁর চারপাশে একদল লোক রান্না করছে আর কাজ করছে—আর সব সময়ই প্রচুর মেহমান। বেশ মজার পরিবেশ, অসাধারণ রকমের জীবন্ত, মননশীলতার সামান্যতম চিহ্নও ওখানে নেই। নেরুদা ছিলেন বোর্হেসের একেবারে বিপরীত ধরনের মানুষ। বোর্হেসকে কখনো ধূমপান, খাওয়াদাওয়া বা পানাহার করতে দেখা যায়নি। যিনি একবার বলেছিলেন, তিনি কখনো প্রেম করেননি। তাঁর কাছে এই সবকিছুই মনে হতো পুরোপুরি গৌণ, আর তিনি যদি সেসব করেও থাকেন তাহলে সেটা পরিমিতির সঙ্গেই করেছেন, তার বেশি কিছু নয়। এর কারণ পড়াশোনা, লেখালেখি, সৃষ্টিই ছিল তাঁর জীবন। বিশুদ্ধভাবে মস্তিষ্কনির্ভর এক জীবন। সাহিত্য হচ্ছে জীবনের ইন্দ্রিয়জ অভিজ্ঞতা থেকে সৃষ্টি—হোর্হে আমাদো ও রাফায়েল আলবের্তির এই ঐতিহ্য থেকে আসা এক লোক হচ্ছেন নেরুদা।

লন্ডনে নেরুদার জন্মদিন পালনের দিনটি উদ্যাপনের কথা আমার মনে পড়ে। তিনি চেয়েছিলেন টেমস নদীতে এক নৌকায় এই পার্টিটা হোক। সৌভাগ্যক্রমে তাঁর প্রশংসাকারীদের একজন, ইংরেজি কবি অ্যালেস্টেয়ার রিড টেমসেই এক নৌকায় থাকতেন। সুতরাং আমরা তাঁর জন্য পার্টিটা করে ফেলতে পারলাম। তারপর সেই মুহূর্তটি এল এবং তিনি ককটেল বানাতে যাচ্ছেন—এই ঘোষণা দিলেন, জানি না কয় বোতল দোম পেরিগনো ছিল ওখানে। ফলের রসে তৈরি পৃথিবীর খুব দামি মদগুলোর এটি একটি। আল্লাহ মালুম আর কী কী আছে এতে। এর ফল, অবশ্যই ছিল চমৎকার, তবে ওর এক গ্লাসই ছিল মাতাল হওয়ার জন্য যথেষ্ট। তো ওখানে ছিলাম আমরা, কোনো রকম ব্যতিক্রম ছাড়া আমরা সবাই ছিলাম মাতাল। এমনকি আমার এখনো মনে আছে, তিনি আমাকে যা বলেছিলেন, গত কয়েক বছরে তা এক মহাসত্য হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। ওই সময় একটা লেখা—লেখাটা যে কী নিয়ে ছিল মনে পড়ছে না, আমাকে উত্তেজিত এবং বিরক্ত করেছিল। আমাকে অপমান করা হয়েছিল ওতে। এবং সেখানে আমার সম্পর্কে ছিল মিথ্যা কথা। নেরুদাকে আমি তা দেখালাম। পার্টির মাঝখানে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, ‘তুমি বিখ্যাত হতে যাচ্ছ। তোমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তা তোমাকে বলি। তুমি এ রকম যত বেশি আক্রান্ত হবে তত বেশি বিখ্যাত হবে। প্রত্যেকটি প্রশংসার জন্য থাকবে দুই-তিনটি ফল। আমার নিজের বুক অপমান, পাষণ্ডতা আর অখ্যাতিতে ভরা। এসব সহ্য করা এক লোক আমি। কেউ আমাকে ছাড়েনি। চোর, বদমাশ, বিশ্বাসঘাতক, ঠগ, ব্যভিচারী—এককথায় সবাই। যদি বিখ্যাত হও, তাহলে এসবের মধ্য দিয়ে তোমাকে যেতে হবে।’

নেরুদা সত্যই বলেছিলেন। তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী পুরোপুরি সত্য হয়েছিল। আমার কেবল বুকই নয়, আছে বেশ কিছু স্যুটকেস, যা ভর্তি হয়ে আছে মানুষের পরিচিত অপমানে পূর্ণ লেখাজোকায়।


রিকার্দো এ সেত্তি: 
গার্সিয়া মার্কেজ সম্পর্কে কী বলবেন?

মারিও বার্গাস য়োসা: 
আমরা বন্ধু ছিলাম। বার্সেলোনায় আমরা বছর দুয়েক পাশাপাশি ছিলাম, একই রাস্তায় থাকতাম। পরে আমরা ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক কারণে আলাদা হয়ে যাই। তবে আলাদা হওয়ার মূল কারণ ছিল ব্যক্তিগত সমস্যা, এর সঙ্গে তাঁর আদর্শিক বিশ্বাসের কোনো সম্পর্ক নেই। আমার কাছে এর কোনো মূল্য নেই। আমার মতে, তাঁর লেখা আর তাঁর রাজনীতি একই মানের নয়। বলা যায়, লেখক হিসেবে আমি তাঁর কাজের খুবই প্রশংসা করি। আমি ইতিমধ্যেই বলেছি, তাঁর কাজ সম্পর্কে ৬০০ পৃষ্ঠার বই লিখেছি। তবে ব্যক্তিগতভাবে তাঁর প্রতি আমার এতটা শ্রদ্ধা আর নেই। তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস সম্পর্কেও না, আমার কাছে তা গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে হয় না। আমার মনে হয়, এগুলো প্রচারমুখী এবং সুবিধাবাদী।


রিকার্দো এ সেত্তি: 
মেক্সিকোর মুভি থিয়েটারে ঝগড়া করার যে ঘটনার কথা আপনি বলেছিলেন, সেটাই কি ব্যক্তিগত সমস্যা?

মারিও বার্গাস য়োসা: 
মেক্সিকোতে একটা ঘটনা ছিল। তবে এ বিষয়ে আমি আলাপ করতে চাই না। এ নিয়ে এত বেশি জল্পনাকল্পনা হয়েছে যে এ বিষয়ে আমি মন্তব্যকারীদের জন্য আর বেশি কিছুর জোগান দিতে চাই না। যদি স্মৃতিকথা লিখি তাহলে ওখানেই আসল ঘটনাটি বলব।০



অনুবাদক পরিচিতি
রাজু আলাউদ্দিন

কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। ১৯৬৫ সালের ৬ মে শরিয়তপুরে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরডটকম-এ কাজ করছেন। দেশি ও বিদেশি সাহিত্য নিয়ে নিয়মিত লেখার পাশাপাশি ইংরেজি ও স্প্যানীশ থেকে প্রচুর অনুবাদ করেছেন।

প্রকাশিত অনুবাদ ও সম্পাদিত গ্রন্থ : গেয়র্গ ট্রাকলের কবিতা (মঙ্গলসন্ধ্যা), টেড হিউজের নির্বাচিত কবিতা (বাংলা একাডেমী), সি. পি. কাভাফির কবিতা (শিল্পতরু প্রকাশনী), কথোপকথন (বাংলা একাডেমী), সাক্ষাতকার (দিব্যপ্রকাশ), খ্যাতিমানদের মজারকাণ্ড (মাওলা ব্রাদার্স), নির্বাচিত বোর্হেস (ঐতিহ্য প্রকাশনী, ৫ খণ্ড, সম্পাদনা) বোর্হেসের আত্মজীবনী (সংহতি প্রকাশনী, সহ-অনুবাদক), আলাপচারিতা (পাঠকসমাবেশ, গৃহীত সাক্ষাতকার), অন্য আলোয় অন্য ভাষায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : বিদেশি ভাষায় রবীন্দ্রনাথের আলাপচারিতা(সংহতি প্রকাশনী), দক্ষিণে সূর্যোদয় : লাতিন আমেরিকায় রবীন্দ্রচর্চার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস(অবসর প্রকাশনী), অনূদিত কথাসমগ্র : অনূদিত সাক্ষাৎকার সমগ্র (কথা প্রকাশনী)।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন