বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৫

মানুষের কথা, মানুষের মুখের কথা

সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত 

বিমান দুর্ঘটনা’র পর ধ্বংসস্তুপের মধ্যে যেমন ব্ল্যাক-বক্সের খোঁজ পড়ে এবং তা থেকে ধ্বংসের কারণ উদ্ধার করা হয়, ঠিক তেমনই কোনও বিপর্যয়ের পর ভুক্তভোগী মানুষের নিজ মুখে বলা বিভীষিকার কথা, যন্ত্রণাক্লিষ্ট মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথাই তাঁর লেখার মূল ভিত্তি তো বটেই, বিষয়বস্তুও তাই। তিনি বলেন ‘নভেল কোরাস’। স্ফেতলানা আলেকসান্দ্রভনা আলেকসিয়েভিচ। ২০১৫ সালের সাহিত্যে নোবেলজয়ী।
১৯৪৮ সালে ইউক্রাইনের স্তানিস্লাভ শহরে তাঁর জন্ম। পিতা বেলারুশের ও মাতা ইউক্রাইনের । ইউক্রাইনের মিনহস্ক শহরে তাঁর বড় হয়ে ওঠা । জীবিকা শুরু করেন সাংবাদিকতা দিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্বজন-হারা মানুষের মুখের কথায় কোনও আড়াল না দিয়েই তিনি তৈরি করেন তাঁর রিপোর্ট। কোপ পড়ল লেখায়। প্রথমে সম্পাদকের, পরে যথারীতি সোভিয়েত-সরকারের। প্রাক-পেরেস্ত্রোয়িকা’র সময়ে সাংবাদিকতা আর কোথায় তেমন অবাধ ছিল সোভিয়েত রাশিয়ায়! তবে আলেকসিয়েভিচের কলম থেমে থাকেনি। সংস্কার-মুক্ত লেখা, প্রথা-বিমুখ। প্রয়াত লেখক অ্যালেস আদামেভিচ’কে তিনি তাঁর আদর্শ মনে করতেন। যদিও আদামেভিচের চেয়ে আলেকসিয়েভিচের লেখার ধার বা স্রোত দুটিই বেশি গতিময়। সোভিয়েত-শাসনে দীর্ঘকাল থেকে যাওয়া রাশিয়া, এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মুখ থুবড়ে পড়ার সময় থেকে দেশের মানুষের ‘মৌখিক ইতিহাস’ (যা লোকমুখে শোনা) তাঁর লেখার উপাদান । বিশেষত সাধারণ মানুষের ধারাবাহিক ইন্টারভিউ। তাঁদের ইন্টারভিউ, যাঁরা কিনা বিশেষ বিশেষ রাষ্ট্র–নির্মিত কিছু ঘটনা/দুর্ঘটনা/বিপর্যয় নিজের চোখে দেখেছেন । অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন, উপলব্ধি করেছেন । যেমন চেরনোবিলের বিধ্বংসী পরমাণু-বিস্ফোরণ। গল্প হয়ে উঠেছে তাই মানুষের কাছের, ব্যক্তিগত খানিক।

১৯৮৬ সালের বসন্তে ইংরেজি ভাষায় একটি নতুন শব্দ সংযোজিত হয়। সংযোজিত হয় বিপর্যয়ের প্রতিশব্দ হিসেবে –‘চেরনোবিল’। ২৫ এপ্রিল ১৯৮৬ সালে ইউক্রাইনের রাজধানী কিয়েভ-এর ৮০ মাইল উত্তরে, একটি গ্রামে চালু থাকা এক পরমাণু-শক্তি কেন্দ্রের ৪ নং চুল্লিটি হঠাৎই গলতে শুরু করে। বিপর্যয়ের কোনও আগাম পূর্বাভাস কারও কাছে ছিল না । এমন কি মস্কো’র কাছেও নয়। যদিও বিপর্যয়ের পরে প্রেসিডেন্ট মিখায়েল গোর্বাচেভ তাঁর টিম-মস্কো’র সম্মানহানির কথাই চিন্তা করেছিলেন সকলের আগে, বিপর্যয়টিকে মোকাবিলার প্রশ্নটি আসে খানিক পর। এই বিপর্যয়কে ‘দুর্ঘটনা’র মোড়কে আবিষ্কারের নেশায় কয়েকজন কর্মী আইন ভঙ্গ করে পরমাণু-চুল্লির ভেতরে ঢুকে পড়েছিল । তারা এসেছিল রাতের শিফটে কাজ করতে। আশ্চর্যের বিষয় তারা কেউই পরমাণু-বিজ্ঞানে দক্ষ বা বিশেষজ্ঞ ছিল না। তারা এসে প্রথমেই চুল্লির ক্ষমতা দেয় কমিয়ে। আপৎকালীন ব্যাক-আপ সিস্টেমকেও অকেজো করে দেয় । শুধু এই দেখার জন্য, টারবাইন কতক্ষণ পর্যন্ত কাজ করার ক্ষমতা রাখে, আর চুল্লির সাধারণ শীতলীকরণ ব্যবস্থা কিভাবে স্বাভাবিকের চাইতে কম বিদ্যুৎ সরবরাহেও কাজ চালিয়ে নিতে পারে । কিন্তু এসব ফলাফল দেখার পরিবর্তে তাদের চোখের সামনে এক গলিত লাভাগিরি’র উত্থান হয়। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে চুল্লির ১০০০ টন স্টিল আর কংক্রিটে তৈরি ছাদ ফুঁড়ে তেজস্ক্রিয়-রশ্মি আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। হিরোশিমা ও নাগাসাকি’তে যে পারমাণবিক-বোমা নিক্ষেপিত হয়েছিল, চেরনোবিলে তার ১০০গুণ বেশি রাসায়নিক বিষক্রিয়া ঘটে। মৃতের সংখ্যা যে প্রকৃত হিসেবে কত তা কখনও জানা যাবে না। সরকারের রিপোর্ট অনুযায়ী ৮০০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল । এদের মধ্যে প্রায় সকলেই আগুনে পুড়ে মারা যান, বা বর্জ্য-নিষ্কাশনের সময়ে বিষক্রিয়ায় মারা যান। সঙ্গে তেজস্ক্রিয় পরিবেশ-দূষণের ফলে সৃষ্টি হয়েছে মানুষের কোষে ক্রোমোজোম-ঘটিত দুরারোগ্য ব্যাধি । নেমে এসেছে মৃত্যু, যা কিনা আজও ঘটে চলেছে, এবং বেশ কিছু যুগ ধরে চলতেই থাকবে ।

ক্রেমলিণের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল –কিভাবে পুরো ব্যাপারটাকে ধামাচাপা দেওয়া যায়। এমন কি পরে দুর্গতদের উদ্ধারের কাজে যাঁদেরকে পাঠানো হয়েছিল তাঁরাও নিজেরা জানতেন না যে কতটা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে তাঁরা আসলে কাজ করতে যাচ্ছেন, বা জানতেন না যে কত অনির্দিষ্ট দীর্ঘ দিন তাঁদেরকে সেখানে থাকতে হবে। উপযুক্ত সুরক্ষামূলক পোশাকাদিও তাঁদেরকে দেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত সুইডেন যখন এই বিস্ফোরণের সঠিক কারণ তদন্ত করে আন্তর্জাতিক মহলে চাপ সৃষ্টি করে, তখন মস্কো স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে, এটি একটি মানুষের তৈরি বিস্ফোরণ বা আগ্নেয়গিরি । গ্রামকে-গ্রাম মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। হিটলার ৬১৯টি বেলারুশীয়-গ্রাম ধূলিসাৎ করেছিল বিশ্বযুদ্ধের সময়ে, আর চেরনোবিল করল ৪৮৫টি গ্রাম। প্রথম ধাক্কা সামলে যাঁরা তখনও নিঃশ্বাস নিচ্ছিলেন, তাঁরা রাসায়নিক বিকিরণের কুফলে নানা দুরারোগ্য রোগ, যেমন ক্যান্সার, কিডনি ও থাইরয়েডের সমস্যা, পেট ও স্নায়ুর রোগ, চুল ও ত্বকের রোগ ইত্যাদিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। Voices from Chernobyl বইটি লেখার তথ্য সংগ্রহে আলেকসিয়েভিচ পাঁচশো’রও বেশি পরমাণু-দুর্গত মানুষকে ইন্টারভিউ করেন। আলেক্সিয়েভিচ নিজেও বিষক্রিয়ার ফলে প্রতিরোধাল্পতা-রোগে আক্রান্ত হয়েছেন, যদিও নিজের কথা তাঁর লেখায় আসেনি ।

প্রথম জীবনে মাতৃভূমি থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হলেও পরবর্তী সময়ে, সোভিয়েত ইউনিয়নের নানা কূটনৈতিক পট-বদলের পর, যখন ক্রেমলিনে গ্লাসনসৎ-কালীন মুক্ত হাওয়া বইছে, তখন রুশ-ভাষায় লেখা তাঁর বইটি প্রায় ২০ লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছে নিজের দেশে। ‘Wars Unwomanly Face’ বইটিসম্বন্ধে নোবেল কমিটি থেকে বলা হয়েছেঃ যন্ত্রণা আর লড়াইয়ের আশ্চর্য এক আখ্যান। এর পরের বই ‘শিশুদের গল্প’ প্রায় শ-খানেক শিশুদের সাথে কথা বলে লেখা। তবে তাঁর খ্যাতি শীর্ষে পৌঁছোয় ‘Zinky Boys’ (১৯৯২) বইতে। যা এক অবিচলিত, অপ্রতিরোধ্য লেখনিতে সোভিয়েত-আফগানিস্তান যুদ্ধের সময়কার রাশিয়াকে ছবির মত তুলে ধরেছে । দীর্ঘকালীন যুদ্ধের কারণে পনেরো হাজারেরও বেশি সোভিয়েত-সেনার মৃতদেহ দস্তার চাদরে মোড়া অবস্থায় কফিন-বন্দী হয়ে ফিরে এসেছিল তাদের পিতা-মাতার কাছে । সেই সব কম বয়সে প্রয়াত সেনাদের শোকার্ত পিতা-মাতার হৃদয়-বিদারক ইন্টারভিউ নিয়েই Zinky Boys.

সাধারণ চোখে সোভিয়েত-রাশিয়ার সমালোচনা বলে মনে হলেও, রাষ্ট্রের তৈরি বিভিন্ন রাজনৈতিক মৃত্যুকূপ’কেই তিনি তুলে ধরেছেন লেখনিতে । বিশ্বযুদ্ধের কালে হিটলারের অধীনে বেলারুশের দুর্গত মানুষ, তারপর স্তালিনের আমলে ইউক্রাইনের কুখ্যাত ‘হোলোদোমর’ বা মহা-দুর্ভিক্ষ, সোভিয়েত শাসনের শেষকালে চেরনোবিলের মহাবিস্ফোরণ, সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ, এর সবগুলোই মানুষের প্রাণ ব্যতীত আর কিছুই নেয়নি । কি চোখে দেখেন মানুষ তার সর্ব-কর্তৃত্বময়ী রাষ্ট্রকে ? সরাসরি মানুষের মুখের কথাই বসিয়ে দিয়েছেন তিনি আমাদের সবরকম প্রশ্নের প্রেক্ষিতে তাঁর একের পর এক বইতে।






৩টি মন্তব্য:

  1. যে কোনো ভাবেই হোক রাষ্ট্র তার বোঝা চাপিয়ে দেয় মানুষের ওপরে | ঠিক এরকম আমাদের রাষ্ট্রে আগেও হয়েছে এখনো হচ্ছে | খাদ্যের অধিকার জমির অধিকার | হয়ত কিছুদিন পর পড়ারও এবং পোশাক পরিধান করার অধিকারও কেড়ে নেওয়া হবে |

    উত্তরমুছুন
  2. যে কোন প্রক্রিয়াতেই ক্ষমতায় আসুকনা কেন, শাসকশ্রেণীর চরিত্র একই হয়। গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দায় তার নয়, জনগণের। সামাজিক সচেতনতার স্তরই গণতন্ত্রকে সুদৃঢ় করতে পারে।

    উত্তরমুছুন
  3. An excellent piece of informative writing which took me to the crevices of human agony and pangs..

    উত্তরমুছুন