বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৫

হাসান আজিজুল হককে লেখা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের চিঠি




১২/৩ কে. এম. দাশ লেন

টিকাটুলি, ঢাকা-৩

২১.১১.১৯৮১


শ্রদ্ধাভাজনেষু

হাসান ভাই, আপনার চিঠির জবাব দিতে বড়ো দেরি করে ফেললাম। প্রশ্নগুলো পেয়ে পরীক্ষায় কমন না-পাওয়া ছাত্রের মতো ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। কাজটা তাই যত্ন করে রেখে দিয়েছিলাম বইপত্রের নিচে সহজে যাতে চোখে না পড়ে। খারাপ ছাত্রকেও পরীক্ষা দিতেই হয়। শেষ পর্যন্ত সবগুলো প্রশ্নের উত্তর লিখলাম, তবে ঠিক যথাযথ ও সংক্ষিপ্ত করা গেলো না। দ্যাখা যায়, ভবসংসারে একটি নিয়ম এই যে ভাবনা-চিন্তার সময় পেলে কোনো বিষয় অল্প কথাতেই বলা যায়, তাড়াতাড়ি কিছু বলা মানেই প্যাচাল-পাড়া। তা ধরুন, আপনাদের আশীর্বাদে সময় আমার অফুরন্ত, রাজার ভাণ্ডার, যতো ইচ্ছা যেভাবে ইচ্ছা খরচা করো, খাও দাও, বিলাও ছড়াও_কোনোদিন টান পড়ে না। তবে কি-না সময়ের সদ্ব্যবহারের জন্য উদ্যোগ নামে একটি বস্তুর দরকার পড়ে, সেটার কিঞ্চিৎ অভাব। আড্ডা এবং আড্ডা, বসে বসে আড্ডা, ঘুরতে ঘুরতে আড্ডা_এই করে করে যৌবন গেলো। যতদিন বাঁচি এ ছাড়া আর সলিড কিছু করা হবে বলে ভরসা হয় না। কিন্তু আপনার আদেশ_নইলে এইসব কঠিন কঠিন ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামানো এই গতরে কি পোষায়?


'কথা'র উদ্যোক্তাদের বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাই, কারণ, এইসব উত্তর লিখতে লিখতে অনেক কথা গুছিয়ে ভাবা গেলো। সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ ও আপনাকে নিয়ে অনেক দিন থেকে লিখবো লিখবো করছি। এই সুযোগে দুজনের সম্বন্ধে দুটি-একটি করে বাক্য অন্তত গড়ানো গেলো। এই করতে করতে আসল কাজ শুরু করা যাবে।

'কথা'র ছেলেদের সঙ্গে অনেক আলাপ হয়েছে। আমার কিন্তু মনে হয় ছাপানোর কাজটা রাজশাহীতে করলে ভালো হয়। তাহলে ঐ ছেলেরা সব সময় পত্রিকার সঙ্গেই জড়িয়ে থাকতো_সম্পাদনা করতো, টাইপ ঠিক করে দিতো, প্রুফ দেখতো। এতে ওদের উৎসাহ অব্যাহত থাকে এবং সর্বোপরি খরচটাও অনেক কম হয়। ফলে পত্রিকার দীর্ঘায়ু সম্বন্ধে ক্ষীণভাবে হলেও আশা পোষণ করতে পারি। আমি বিশেষভাবে অনুভব করি যে পত্রিকাটিকে টিকে থাকতে হবে। এরকম পত্রিকা খুব দরকার, খুবই দরকার।

আপনার উপন্যাস সম্পূর্ণ করতে আর কতদিন বাকি? গভীর আগ্রহের সঙ্গে আপনার উপন্যাসের প্রতীক্ষা করছি।

আমার 'দান' গল্পটা আপনার ভালো লেগেছে শুনে খুব উৎসাহিত হয়েছি। আমার লেখার অনেক ব্যাপার আপনি অনুমোদন না করলেও আপনার মন্তব্যে আমি সব সময় খুব উৎসাহ পাই। আপনি যে আমার লেখা মনোযোগ দিয়ে পড়েন এতে আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। 'রোববার' পত্রিকায় আমার উপন্যাস বেরুচ্ছে, 'চিলেকোঠার সেপাই'। লেখাটা মাঝে মাঝে পড়লে খুব খুশি হবো। আপনার শরীর এখন কেমন? শরীরের দিকে আরেকটু মনোযোগ দেবেন, তাহলে সকলেরই ভালো। আমার সশ্রদ্ধ প্রীতি ও ভালোবাসা নেবেন।

ইতি

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস





১২/৩ কে. এম. দাশ লেন

টিকাটুলি, ঢাকা-৩

১২.৩.১৯৮২

শ্রদ্ধাভাজনেষু

৮ তারিখে বিকালবেলা আপনার চিঠি পেয়েছি। ১৯৮০ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ৮-৯ জন প্রকাশকের কাছে ধরনা দিয়েছি। আরো ২/১ জনের কাছে গিয়ে প্রত্যাশা করি। প্রকাশকদের সংখ্যাটিকে রাউন্ড ফিগারে পরিণত করার পাঁয়তারা করছিলাম, এমন সময় আপনার চিঠি পেলাম। আমার প্রতিক্রিয়া আপনি অনায়াসে অনুমান করতে পারেন।

হ্যাঁ, আপনার নবীন প্রকাশকের প্রস্তাবে আমি সম্পূর্ণ রাজি। আমার ১০-১২টা গল্প আছে যা দিয়ে দুটো বই বের করা যায়। এর একটিতে দিতে চাই চারটে গল্প, নাম 'খোঁয়ারি', 'তারাবিবির মরদপোলা', 'অসুখবিসুখ' এবং 'পিতৃবিয়োগ'। প্রথম গল্পটা বড়ো, দুই থেকে আড়াই ফর্মা জায়গা নিতে পারে। তবে অন্য তিনটের প্রত্যেকটির জন্য এক ফর্মাই যথেষ্ট। পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ ফর্মার মধ্যে। সবই সম্পূর্ণ হয়ে যাবে। প্রকাশকের যাবতীয় শর্ত আমি মেনে নিলাম, সানন্দে মেনে নিলাম। আমার শর্ত কেবল একটি। তা হলো এই যে ওঁদের দেওয়া শর্তগুলো ওঁরা যেন মেনে চলতে চেষ্টা করেন। আমার পাণ্ডুলিপি প্রায় তৈরি, ওঁদের চিঠি পেলে পাঠিয়ে দেবো। চিঠিটা তাড়াতাড়ি পেলে ভালো হয়।

আমার বই প্রকাশের ব্যাপারে আপনার সক্রিয় আগ্রহের পরিচয় পেয়ে কি রকম অভিভূত হয়েছি আমার ভাষায় তা প্রকাশ কঠিন। আপনার এই ঋণ পরিশোধ করা আমার সাধ্যের বাইরে, সেরকম ইচ্ছাও। কোনো কোনো ঋণ অপরিশোধিত থাকা উচিত।

আপনার উপন্যাস লেখার কতোদূর হলো? এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস; বাংলা একাডেমীতে গেলাম, তা আপনার সঙ্গে ভালোভাবে কথাই হলো না। এইচান্সে আমার নিজের উপন্যাসের কথা একটু বলি। লেখাটা উপন্যাস হিসাবে। হোক না হোক, আমার কিন্তু মস্ত একটা লাভ হচ্ছে। উপন্যাস লিখতে লিখতে বেশ মানুষ দ্যাখা যায়। লেখার জন্য মানুষকে দ্যাখার দরকার আছে, আমার মনে হয় লিখতে লিখতেও মানুষকে খুব কাছে থেকে লক্ষ করা যায়। উপন্যাস লিখতে লিখতে মনে হয় চরিত্রগুলো খুব স্বাধীনতা চায়, কেবল চরিত্র হিসাবে ওরা থাকতে চায়। শুনি রাজশাহীতেও আপনি নানান কাজে জড়িত থাকেন। এত ব্যস্ততা আপনার শরীরের জন্য ভালো না, বাংলা সাহিত্যের জন্যও নয়।

আপনার শরীর এখন কেমন? 'কল্যাণ গুড়' পেয়েছিলেন? কোনো লাভ হলো? আমার মনে হয় কলকাতায় কি ভারতের অন্য কোথাও গেলে চিকিৎসা ভালো হতো। ব্যাপারটা ভেবে দেখবেন। আবার খুব বেশি করে লিখতে শুরু করলেও ভালো হতে পারে।

আপনার পত্রিকায় লেখার জন্যে আমি বিশেষভাবে আগ্রহী। কিন্তু প্রবন্ধ লিখতে গেলেই মনে হয়, এ তো সবাই জানে, এ নিয়ে কি লিখবো? তা কিছু কিছু সমস্যা মাঝে মাঝে মাথায় খুব বিঁধতে থাকে, তার একটা নিয়ে ভাবছি প্রবন্ধ-মতো একটা লিখবো। ভরসা করি মার্চের শেষনাগাদ আপনার হাতে পেঁৗছানো সম্ভব হবে। এর মধ্যে যদি পত্রিকা বেরিয়ে যায় তো মনোনীত হলে লেখাটা সামনের সংখ্যায় ছাপিয়ে দেবেন।

আমি ভালো আছি। আপনি আমার সশ্রদ্ধ ভালোবাসা নেবেন।

ইতি

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস





১১/৩ কে. এম. দাশ লেন

টিকাটুলি, ঢাকা-৩

৩০.৯.১৯৮২



শ্রদ্ধাভাজনেষু

জুলাই মাসে খুলনা গিয়েছিলাম। দুদিন ধরে আপনার সঙ্গে দ্যাখা করার জন্য অনেক ঘুরেও শেষ পর্যন্ত ম্যানেজ করতে পারলাম না। তাঁর 'প্রজ্ঞা' নামে বইয়ের দোকানে বসে জয়ন্ত চ্যাটার্জী মহাবিজ্ঞতার সঙ্গে জানান যে হাসান ভাইকে পেতে হলে বিদ্যুৎ সরকারের প্রেসে যেতে হবে। তড়িৎগতিতে সেখানে গিয়ে শুনি দশ মিনিট আগে আপনি বেরিয়ে গেছেন। আপনাকে পাওয়া যাবে অমিতবাবুর বাড়িতে। সেখানে গিয়ে দেখি আপনি তো নেইই, অমিতবাবুও আপনার সঙ্গে বেরিয়ে গেছেন। তারপর কয়েকটি রেস্টুরেন্টে আপনাকে খোঁজার চেষ্টা চললো। ঈদের দুদিন আগে শুনি যে আপনাকে দ্যাখ্যা গেছে মুজগুনি্নর মোড়ে; আরেকজন বললো, না, না হাসান ভাইকে রিকশায় জোড়াগেট পেরোতে দেখলাম। মুজগুনি্ন না জোড়াগেট_এই নিয়ে মতভেদ দ্যাখা গেলো, কিন্তু আপনার দ্যাখা পাওয়া গেলো না। এই চান্সে খুলনা শহরটা আমার বেশ ঘোরা হলো, খালিশপুরে আপনার বাড়িটা চেনা নেই, নইলে ওটাও অক্ষত থাকতো না।

আর নতুন বইয়ের দুটো ছাপা ফর্মা আমার সঙ্গে ছিলো, আপনাকে দ্যাখাবার জন্যেই খুলনা নিয়ে গিয়েছিলাম। বই এখন সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে গেছে। প্রচ্ছদপট এঁকেছেন কামরুল হাসান। প্রচ্ছদের ছবি আমার খুব ভালো লেগেছে, কবিও আমার মতোই খুশি, প্রায় অভিভূত বলা যায়। বইয়ের ছাপাও বেশ ভালো। এর চেয়ে ভালো ছাপা এখানে সম্ভব নয়। এখন বাঁধাই নির্ভর করছে শ্রীমান কবির ওপর। তবে এ পর্যন্ত ওর যে নৈপুণ্য ও তৎপরতা দেখলাম, তাতে ওর ওপর নিশ্চিন্তে ভরসা করতে পারি। এই বইয়ের প্রোডাকশনের যাবতীয় কৃতিত্ব কবির একার, আমি প্রায় কিছুই করি নি। এরকম শিক্ষিত ও নিষ্ঠাবান লোক আমাদের দেশে প্রকাশনা ব্যবসায় আর আছে বলে আমার মনে হয় না।

ওর হাতে আপনার জন্য একটি বই পাঠিয়ে দিয়েছি। দয়া করে পড়বেন। আমার বই প্রকাশের ব্যাপারে আপনি যে সক্রিয় উৎসাহ দেখিয়েছিলেন সে প্রসঙ্গ তুলে আপনাকে বিব্রত করতে চাই না। বই প্রকাশের প্রাক্কালে আপনাকে ফের কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই। আপনার ভালোবাসা ও অনুগ্রহের কথা মনে পড়লে আমি লেখায় প্রেরণা পাই।

আপনার পত্রিকার জন্য একটি লেখা আমি মনে মনে ঠিক করেছি। ভাবছি সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর এবার ছোটোখাটো একটি আলোচনা লিখবো। এই লেখাটির একটা খসড়ামতো ছাপতে দেবো সংবাদে। সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর ওপর ওরা কয়েকটা লেখা প্রকাশ করবে ১২ তারিখে। এরপর লেখাটি সম্পূর্ণ করে আপনাকে পাঠাবো।

আপনার লেখার খবর কি? আপনার লেখা অনেকদিন কোথাও চোখে পড়েনি। কেন? আপনার উপন্যাস লেখার কি হলো? আপনার নতুন গল্প ও উপন্যাসের জন্য অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করছি।

এর মধ্যে কি ঢাকা আসবেন? ঢাকা এলে দয়া করে খবর দেবেন, আপনার সঙ্গে দ্যাখা করবো। সেপ্টেম্বর মাসের শেষভাগ কি অক্টোবরের মাঝদিকে আপনি কি রাজশাহী থাকবেন? ঐ সময়টা তাহলে আমি রাজশাহী যাবো।

আপনার শরীর এখন কেমন? আমার প্রীতি ও ভালোবাসা নেবেন।

ইতি।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

৩০.৯.৮২



১২/৩ কে. এম. দাশ লেন

টিকাটুলি, ঢাকা-৩

৪.১.১৯৮৪



প্রিয় হাসান ভাই,

রবীন্দ্র-সংগীতের প্রথম দিকের কয়েকজন শিল্পীর গাওয়া গানের একটি এল. পি ক্যাসেটে তুলে পাঠালাম। সুমনকে কথা দিয়ে এসেছিলাম যে ঢাকা এসেই পাঠিয়ে দেবো। কথাটা ঠিকমতো রাখা হলো না, এক মাসেরও বেশি দেরি হয়ে গেলো। আমার এল. পি-টা খুব পুরনো, মাঝে মাঝে খসখস আওয়াজ করে, এগুলো মনে মনে সম্পাদনা করে নিতে হবে।

রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনের স্মৃতিসভায় আলোচকদের মধ্যে আপনার নাম দেখে বাংলা একাডেমিতে গিয়েছিলাম, আপনাকে তো পাওয়া গেলোই না, মাঝখানে নারী স্বাধীনতার ওপর বক্তৃতা শুনতে হলো। এর মধ্যে ঢাকায় আসবেন? যদি আসেন তো আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। খবর দিলে আমি নিজেই দ্যাখা করে আসবো।

ভাবী কেমন আছেন? তাঁর লো ব্লাড-প্রেসার নিয়ে একটু খোঁজখবর করা বোধ হয় দরকার। একবার ঢাকায় এনে চেক-আপটা করিয়ে নিন না। আপনার লেখার খবর কি? উপন্যাস কতোদূর এগোলো?

এবার ফেব্রুয়ারিতে আমার একটা বই বেরুতে পারে, প্রেসে কাজ চলছে, কিন্তু খুব ঢিমেতেতালা। গল্পের বই, নাম 'দুধভাতে উৎপাত'।

আমরা ভালো আছি। তিন কন্যা ও মৌলীনাথকে নিয়ে ভাবী ও আপনি কেমন আছেন, জানাবেন। রাজশাহীতে দুদিন আপনাদের সঙ্গে আমার এত ভালো কেটেছে যে এ নিয়ে কিছু বললে বাখোয়াজি বলে মনে হবে। ভাবী, তিন কন্যা (সত্যজিৎ রায়ের পর হাসান আজিজুল হকের) এবং মৌলীনাথকে আমার সালাম প্রীতি ভালোবাসা ও আশীর্বাদ জানাবেন। আপনিও সশ্রদ্ধ প্রীতি ও ভালোবাসা জানবেন।

ইতি

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস





পুনশ্চ: ক্যাসেটে জায়গা থাকায় রেণুকা দাশগুপ্তের গাওয়া অতুলপ্রসাদের তিনটে গানও তুলে দিলাম। এই রেকর্ডগুলোও মহাপ্রাচীন! সুতরাং অনুচিত শব্দ থেকে রেহাই পাওয়া গেলো না। ইলিয়াস

1 টি মন্তব্য: