বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৫

স্ফেতলানা আলেকসান্দ্রভনা আলেকসিয়েভিচের সঙ্গে এনা লুসিস : আলাপচরিতা

অনুবাদ: মনোজিৎকুমার দাস

এনা লুসিস: 
ভয়েসেস ফরম চেরনোবিল হচ্ছে চমক লাগানো আবেগপূর্ণ বই। আপনি পাঠকদেরকে কী ধরনের আবেগ ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে চেষ্টা করেছিলেন?

স্ফেতলানা আলেকসান্দ্রভনা আলেকসিয়েভিচ: 
এত বছর পরেও চেরনোবিল সম্বন্ধে সবকিছু জানতে পেরে আমরা একটা বিশ্বাস লাভ করি। । এটা এখন অতীতের বিষয়, এখন এ সম্বন্ধে কেউই আর বেশি কিছু শুনতে চায় না। কিন্তু আসলে এটা শুধুমাত্র ভুলে যাওয়ার বিষয় না। চেরনোবিলের দৃশ্যপট কখনোই সঠিক ভাবে বুঝানো হয়নি।


এনা লুসিস: 
ভয়েসেস ফরম চেরনোবিল বইয়ে চারনোবিল সম্বন্ধে অধিকাংশ মানুষের সাধারণ প্রতিক্রিয়া কি?

স্ফেতলানা আলেকসান্দ্রভনা আলেকসিয়েভিচ:
সত্যের প্রকাশই হচ্ছে অধিকাংশ মানুষের সাধারণ প্রতিক্রিয়া : ".বাস্তবে আমার কোন ধারণা ছিল না ব্যক্তিগত পর্যায়ে কেমন একে গ্রহণ করেছিল। " এই বইটি কিন্তু চেরনোবিল দুর্ঘটনা কেন এবং কেমন ভাবে হয়েছিল সে সম্পর্কীত নয়। চারনোবিল বিস্ফোরণের পর কিন্তু দুনিয়ার মানুষ আলাদা আলাদা ভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে । এটা শুধুমাত্র চারনোবিলকেই ধ্বংস করেনি, তা প্রকৃতি ও হিউম্যান জেনেটিক্সকেও ধ্বংস করেছে । সেই অভিজ্ঞতা কিন্তু আমাদের জীবন এবং আমাদের চেতনাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একটা নতুন বিশ্বমতামতের জন্য অনুভূতির সৃষ্টি হয়, একজনই আমাদের সবাইকে রক্ষা করতে পারে।

যে সময় চারনোবিল নতুন ভীতি ও সংবেদনশীলতা তৈরি করে পুরনো অনেক কিছুকেই মুছে ফেলেছিল। ক্যমুনিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভয়কে উপেক্ষা করে অনেকেই তাদের পরিবার পরিজনকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যে পালিয়ে গিয়েছিল। বিকিরণের ভয় ছিল আর সেই সাথে পার্টি বস ও পার্টি- কর্তৃপক্ষের ভয়ও ছিল। কর্তৃপক্ষ পার্টি কার্ড ব্যবহার করে রক্ষা পাওয়ার জন্যে জোর দিয়েছিল। চারনোবিল ডিজাস্টারের ফলে জলবায়ুর বদলে যাওয়ার আশংকা সরকার উড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। অধিকাংশ মানুষ চারনোবিলের বিপর্যয়ের কারণ সম্পর্কে কিছুই জানতো না। বইটি লেখার সময়ই আমার মনে হয়েছিল বইটি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। শুরুর দিকে মানুষ তাদের জীবন ও জীবনের অর্থ সম্পর্কে ভাবতে শুরু করে। তারা ভবছিল, তারা কিভাবে নিজেদের রক্ষা করতে পারে ?

এনা লুসিস: 
আপনি তথ্য সংগ্রহ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য কত সময় ব্যয় করেছিলেন? বইয়ের উপর কাজ করতে আপনার কত সময় ব্যয় হয়? বইটিতে সংগৃহীত উপাদান কতটা অন্তর্ভুক্ত করেন ?


স্ফেতলানা আলেকসান্দ্রভনা আলেকসিয়েভিচ: 
 আমার সমস্ত গ্রন্থই সাক্ষ্য প্রমাণ, জনগণের জীবনযাত্রার কণ্ঠস্বরের ভিত্তিতে লিখিত। আমি সাধারণত একটি বই লেখাতে তিন থেকে চার বছর ব্যয় করে থাকি। কিন্তু এটি লিখতে দশ বছর বেশি সময় লেগেছিল। আমি প্রথম কয়েক মাস চারনোবিলে কাটিয়েছিলাম। এই বইটা লেখার সময়ে এখানটাতে অনেক দেশের সাংবাদিক ও লেখককে পরিপূর্ণ ছিল। সবাই শত শত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেছিলেন। যখন আমরা সবাই সাধারণ শব্দ ও অভ্যাসগত পদ বলতে চেষ্টা করেছিলাম সে সময় আমাকে একটি সম্পূর্ণ অজানা এবং রহস্যময় ঘটনার মুখোমুখি হতে হয় । আমরা কম্যুনিস্ট সিস্টেমের ত্রুটি সম্বন্ধে কথবার্তা আর প্রতারণার শিকার হওয়া মানুষদের সঙ্গে কথা বলেছিলাম, ওই অবস্থায় কী করার আছে আমাকে কী করার আছে তা তারা জানতো না। কর্তৃপক্ষ তাদেরকে আয়োডিন ও অন্যান্য জিনিস সরবরাহ করেছিল না। বেলারুশিয়া এবং ইউক্রেন প্রবল জাতীয়তাবাদী হওয়ায় তাদের মধ্যে রাশিয়ান বিরোধী অনুভূতি বর্তমান ছিল। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে রাশিয়ান পারমাণবিক স্টেশনে বিস্ফোরণ ঘটার কারণে তাদের মধ্যে রাশিয়া বিরোধী মনোভাব গড়ে উঠে। লোকজন বলল, “ রাশিয়ানরা রেডিয়েশনের দ্বারা আমাদেরকে চরম ভোগান্তির মধ্যে ফেলেছিল । অসুস্থলোকদের এই ধরনের কথাবার্তায় আমি অবাক হলাম। তাদের প্রশ্নগুলো আমাকে আরো অবাক করল। কেবলমাত্র রাজনৈতিক বা বৈজ্ঞানিক উত্তরই যথেষ্ট ছিল না। কেউই সমস্যার গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল না। উপলব্ধি করলাম আমি দ্রুত একই ধরনের বই লিখতে পারি। সেখানে অন্যান্য সাংবাদিকরাও ছিল, তাদের সংখ্যা শত শত। তাই আমি একটি ভিন্ন পদ্ধতি বেছে নিতে চাইলাম। আমি পাঁচ শত এর বেশি সাক্ষীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে শুরু করলাম । তা করতে আমার দশ বছরেরও বেশি সময় লাগল। সেই থেকেই আমি হঠাৎ করে একটি নতুন বাস্তবতা সঙ্গে মুখোমুখি হলাম। ছিন্নভিন্ন হওয়ার মানুষের তিক্ত অভিজ্ঞতা প্রতি আমি দৃষ্টিপাত করলাম। তারাই শুধু জানতো বাস্তবে কী ঘটেছিল । একটি নতুন বিশ্বের যা কী হতে যাচ্ছিল তা তারা পুরনো পদ্ধতিতে মোকাবিলা করার চেষ্টা করছিল। উদাহরণস্বরূপ, আমার মনে পড়ে, সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধে পাইলটদের সামরিক হেলিকপ্টার জ্বলন্ত চুল্লী উপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার কথা। তারা তাদের মেশিনগানের সাহয্যে কী করছিল সে সম্বন্ধে তাদের কোন ধারণা ছিল না। তারা জানতো না আর্মির সিস্টেম কিভাবে কাজ করছিল : তারা বিশ্বাস করতো সৈন্যসামন্তের বিশাল বাহিনী এবং ওয়ার টেকনোলজি যে কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারবে। তারা সেখানে উচ্চ শক্তি পদার্থবিদ্যা, পারমাণবিক কণা, বিকিরণ মাত্রা সত্যি সত্যি কী ঘটাছিল ছিল তা তাদের বোধগম্য ছিল না।

শেষ দিকে আমি উপাদান সংগ্রহ করছিলাম । ৫০০ জনের মধ্যে ১০৭ জনের চূড়ান্ত সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য অন্তর্ভুক্ত করলাম , যা পাঁচ জনের মধ্যে প্রায় একজন। মূলত আমি আমার অন্যান্য বইয়ের ক্ষেত্রেও এমনটা করেছিলাম। আমি পাঁচটি সাক্ষাত্কার মাঝ থেকে একজনকে নির্বাচন করতাম ।আর তা থেকেই একটা বই প্রকাশিত হয়েছিল। প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য আমি কন্ঠস্বর এবং ওরাল গল্প থেকে চারটা কিংবা তার বেশি টেপ রেকর্ড করি, আর তার থেকে ১০০ থেকে ১৫০ টি মুদ্রিত পেজ তৈরী হয়। তারপর আর মাত্র দশ পেজ বাকি থাকে।


এনা লুসিস: 
কিভাবে আপনি ভয়েসেস ফরম চেরনোবিল চারনোবিল লেখার সিদ্ধান্ত নিলেন ? কোথা থেকে প্রেরণা পেলেন?

স্ফেতলানা আলেকসান্দ্রভনা আলেকসিয়েভিচ:
 চারনোবিল আমাদের দেখিয়েছেন আধুনিক সভ্যতার “ কাল্ট অব ফোর্স্” কতটা বিপজ্জনক। সর্বপরি কিভাবে ক্ষমতা ও বলপ্রয়োগ অসিদ্ধ ভাবে মাথাচাড়া দেয়। আধুনিক বিশ্ববীক্ষা আমাদের নিজেদের কাছে কতটা বিপজ্জনক । কেমন ভাবে মানবিক মানুষ প্রযুক্তিগত মানুষ থেকে পিছিয়ে আছে। প্রথম দিনগুলো থেকে এই দুর্যোগ আমাদের মাথার উপর খাড়ার মতো ঝুলছিল। শুধুমাত্র চুল্লির ছাদও সশব্দে ফেটে গিয়েছিল না। চারনোবিল আমাদের পুরো বিশ্ব অভিমতকে উড়িয়ে দিল, সোভিয়েত সিস্টেমের ফাউন্ডেশনগুলো তলে তলে ধ্বংস সাধন করেছিল। সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের ফলে প্রথম তাদের অবমূল্যয়ান ঘটে। এই শক্তিশালী বিস্ফোরণ আমাদের জীবনকে ছিন্নভিন্ন করে তুলেছিল। আমার মনে পড়ে সাধারণ মানুষ ও শিশুদের রক্ষার জন্যে বেলারুশিয়াতে শত সহস্র জোরালো সরকার বিরোধী সমাবেশের কথা। আমি আমার অসাধারণ অভিজ্ঞতার কথা বলতে চেয়েছিলাম। এটাই ঘটেছিল বেলারুশিয়া তার পুরুষতান্ত্রিক, ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির সাথে হঠাৎ ভবিষ্যতের ভয়ের সঙ্গে তর্কবিতর্ক করেছিল।



এনা লুসিস: 
ভিন্নধরনের গল্প কি আপনি সরকারী লোকজনের কথাবার্তা ও মিডিয়া থেকে শুনেছিলেন ?

স্ফেতলানা আলেকসান্দ্রভনা আলেকসিয়েভিচ:
 গল্পগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। বেলারুশিয়াতে সব সময়ই এই অবস্থা ছিল, আংশিকভাবে রাশিয়াতেও ছিল। অফিসিয়াল বক্তব্য সাধারণ মানুষ কেমন ভাবে দেখে সে সম্বন্ধে সামান্যই জানতো ।কর্তৃপক্ষের প্রধান উদ্দেশ্য কী? নিজেদের রক্ষার জন্য তারা সব সময়ই প্রাণপণ চেষ্টা করেছে। সে সময়ের টোটালিটারিয়ান অথরিটিস স্পষ্টভাবে একে প্রর্দশন করেছিল: তারা আতঙ্কে ভীত ছিল, তারা সত্যকে ভয় পেত। কী ঘটছিল তা অধিকাংশ মানুষ সামান্যই বুঝেছিল। তাদের আত্মসংরক্ষণ প্রচেষ্টায় বাধা সৃষ্টি করে কর্তৃপক্ষ জনসাধারণের সঙ্গে প্রতারণা করে। তারা মানুষকে এই বলে আশ্বস্ত করল যে সব কিছু নিয়ন্ত্রণে আছে, বিপদের আশংকা নেই। শিশুরা চত্বরে ফুটবল খেলছিল, তারা রাস্তায় আইসক্রিম খাচ্ছিল। টলিচালকরা টলিতে বালি বাক্সগুলো বহন করছিল, এমনকি বহু মানুষ সৈকতে সূর্য স্নান করছিল। সেই সব শত সহস্র শিশু আজ পঙ্গু, আর তাদেরে অনেকেই মারা গেছে। মানুষ নিউক্লিয়ার ডিজাস্টারের সম্মুখীন হল। মানুষ সমস্যায় মাঝে পড়ে একাকী হয়ে পড়ল। মানুষ দেখতে পেল সত্য তাদের কাছ থেকে দূরে লুকিয়ে আছে, কেউই তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে এলো না, বিজ্ঞানী কিংবা ডাক্তাররাও এগিয়ে এলো না।ওই অবস্থাটা তাদের কাছে সম্পূর্ণ নতুন ছিল। উদাহরণস্বরূপ ফায়ারম্যানদের কথা বলতে হয়, তারা নিজেরাই ছোট্ট ছোট্ট চুল্লির মতো হয়ে গেল, ডাক্তাররা অসংবৃত হয়ে পড়েও তারা তাদের পরীক্ষা করলেন। ওই সব ডাক্তাররা তাদের পরীক্ষা করে প্রাণঘাতী বিকিরণ মাত্র দেখতে পেলেন। ফায়ারম্যান ও ডাক্তারদের অনেকেই পরে মারা গেল। ফায়ারম্যানদের গায়ে নিজেদের সুরক্ষার জন্য বিশেষ প্রোটেকশন স্যুট গায়ে ছিল না। তারা ওই সময় নিজেদেরকে বাঁচাতে পারল না। তারা বেঁচে থাকতে পারতো যদি তা স্বাভাবিক আগুন হতো। কেউই এ ধরনের দুর্ঘটনার জন্য প্রস্তত ছিল না। আমার সাক্ষাৎকারীরা আমাকে জীবনের আসল গল্পগুলো বলল। উদাহরণস্বরূপ বাড়ি খালি করে দেওয়া শুরুর আগে প্রিপিয়াট শহরে কয়েকটি বহুতল বাড়ির ব্যালকোনীতে দাঁড়িয়ে তারা আগুন দেখতে পায়। তাদের মনে পড়ে কী সুন্দর দৃশ্য , উজ্জ্বল লাল আলোর আভা।“ ওটা ছিল মৃত্যুর দৃশ্য। আমরা কল্পনা করতেই পারিনি যে মৃত্যুকে দেখতে এত সুন্দর।” এমনকি তারা তাদের সন্তানদের এ দৃশ্যকে তারিফ বলল,“ তাকিয়ে দেখার জন্য এসো। তোমরা জীবনের শেষে এটাকে স্মরণ করতে পারবে।” তারা তাদের মৃত্যুর দৃশ্যকে তারিফ করল , যে সব মানুষ নিউক্লিয়ার স্টেশন থেকে আসা শিক্ষক ও ইঞ্জিনিয়ার ছিল। লোকজনের কাছ থেকে দুর্বিপাক সম্বন্ধে বিস্তারিত বিবরণ পাওয়ার জন্যে কথা বললাম। দু’বছর পরে আমার মনে পড়ল আমাকে একজন হেলিকপ্টার পাইলটের ফোনের কথা:“ অনুগ্রহ করে আপনি যত তাড়াতাড়ি পারেন আসুন। আমার হাতে সামান্যই সময় আছে। আমি যা জানি তা আপনাকে বলতে চাই।” তিনি যে গল্প বললেন তাতে উপলব্ধি করা গেল তিনি ভোগান্তির শিকার হওয়া একজন মানুষ। তিনি বললেন,“ আপনি আসায় আমি খুশি হয়েছি। এ বিষয়ে আমি আপনার সঙ্গে আলাপ করতে পারি। অনুগ্রহ করে আমার কথাগুলো আপনি লিখে নিন। আমরা ভাল ভাবে বুঝতে পারিনি কী ঘটতে চলেছিল, এমনকি আজ পর্যন্তও তারা বুঝতে পারেনি না।” আমি একটা অনুভূতির মধ্যে বসবাস করছিলাম তাই আমাকে অবশ্যই সব কিছু লিখতে হবে। তখন কী ঘটেছিল মানুষ এখনো জানে না। আর এ কারণেই প্রকৃত সাক্ষ্য , চেরনোবিলের প্রকৃত ইতিহাস

রেকর্ড করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আজকের দিনে সে ইতিহাস অতলে তলিয়ে যাচ্ছিল।


এনা লুসিস: 
আপনি প্যারিসে বসবাসকারী বেলেরুশিয়ার একজন লেখক। আপনি কি একটা নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলের একটা সাহিত্য দৃশ্যপটে সম্পূর্ণ স্বাধীন হিসাবে নিজেকে দেখতে পছন্দ করেন?

স্ফেতলানা আলেকসান্দ্রভনা আলেকসিয়েভিচ:
 আমি বলতে চাই , আমি একজন স্বাধীন লেখক। আমি নিজেকে একজন সোভিয়েত লেখক কিংবা এমনকি একজন রাশিয়ান লেখক হিসাবে অভিহিত করতে পারি না।“ সোভিয়েত দ্বারা” আমি বুঝি সাবেক সোভিয়েত সাম্রাজ্যের সীমানাকে, যা স্বাভাবিকভাবেই সোভিয়েত স্বপ্নপুরীর জগত। আমাকে একজন বেলেরুশিয়ার লেখক বিবেচনা করতে পারেন না। আমি বলতে চাই সোভিয়েত স্বপ্নপুরীর ওই যুগের লেখক, আমি আমার প্রতিটি বইয়ে ওই স্বপ্নপুরীর ইতিহাস লিখেছি। আমি প্যারিসে শুধুমাত্র সাময়িক ভাবে আছি, এখানে আমার অবস্থান বেলারুশিয়ার রাজনৈতিক অবস্থা এবং বর্তমান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমার প্রতিকূলতার সঙ্গে সম্পর্কীত। আমার বইগুলো অনেক দেশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে, বেলেরুশিয়া থেকে নয়। গত দশ বছরে লুকাশেনেকোর শাসন আমলে সেখান থেকে আমার একটা বইও প্রকাশিত হয়নি। আমি কিন্তু লেখা চালু রেখেছি ক্ষুদ্র মানুষ বনাম মহান স্বপ্নপুরী সম্বন্ধে। আমি এই স্বপ্নপুরীর অর্ন্তধানের বর্ণনা করেছি এবং দেখিয়েছি কেমন ভাবে সাধারণ লোক প্রভাবিত হয়।


এনা লুসিস: 
আপনার বইগুলোতে কাল্পনিক কৌশলের সঙ্গে সাক্ষাৎকারগুলোর মেলবন্ধনে রচিত। আমার কাছে এটাকে মনে হয় এটা একটি অনন্যসাধারণ রীতি। অন্য লেখকরাও কি একই রীতিতে লিখছে?

স্ফেতলানা আলেকসান্দ্রভনা আলেকসিয়েভিচ:
আমার আগে রাশিয়ান সাহিত্যে এ রীতিতে গল্প লেখা, মৌখিক গল্প জীবন্ত কন্ঠস্বরে রেকর্ডিং করার ঐতিহ্য কি ছিল? আমি বুঝাতে চাচ্ছি দানিল গ্রানিন এবং এলেস অ্যাডামোভিচের লেলিনগ্রাড অবরোধের উপর লেখা বইগুলোর কথা ।উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আই কেম ফ্রম দ্য ফেইরি ভিলেজ বইটির কথা। ওই বইগুলো আমার নিজের বইগুলো লিখতে অনুপ্রণিত করে। আমার ক্ষেত্রেও ওটাই ঘটেছিল, জীবন একই ঘটনাগুলোর অনেক অনেক অর্থ ও ব্যাখ্যা দান করে যাতে গল্প কিংবা লিখিত তথ্য প্রমাণাদিতে শুধুমাত্র ভিন্নতা থাকতে পারে না; আমি অনুভব করলাম, একটি ভিন্ন আখ্যান কৌশল খুঁজতে বাধ্য। রাস্তা এবং আমার চারপাশের জিনিসপত্র থেকে আওয়াজ সংগ্রহ করতে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম । প্রত্যেক মানুষ , তা পুরুষ কিংবা নারীর হোক তার নিজের মতামত উপস্থাপন করে ? আমি উপলব্ধি করলাম তাদের নিয়ে একটা লেখা লিখতে পারি । জীবন খুব দ্রুত চলমান- শুধুমাত্র সম্মিলিত ভাবে আমরা একটা একক ছবি তৈরি করতে পারি, আমি এই ভাবেই আমার বই পাঁচটি লিখেছিলাম। আমার বইগুলোর বীরেরা, অনুভূতিগুলো এবং ঘটনাগুলোর সবই বাস্তব। প্রত্যেক ব্যক্তির ১০০ পৃষ্টার গল্প থেকে অনধিক পাঁচ পৃষ্টা পরিত্যাক্ত হয়েছিল আর মাঝেমধ্যে অর্ধেক পৃষ্টা মাত্র । আমি অনেক প্রশ্ন করি, আমি এপিসোড নির্বাচন করি, আর এভাবেই প্রত্যেকটি বই লিখতে আমি নিবেদিত হই। রাস্তায় কান পেতে আড়িপেতে থাকাই শুধুমাত্র আমার ভূমিকা ছিল না, আমার ভূমিকা ছিল একজন পর্যবেক্ষক ও চিন্তাবিদের। বাইরের একজন লোকের কাছে এটাকে একটা সহজ প্রক্রিয়া মনে হতে পারে। লোকজন শুধুমাত্র তাদের গল্পগুলো বলেছিল। এটা কিন্তু আসলে এত সহজ ব্যাপার ছিল না। আপনি কী জিজ্ঞাসা করবেন, আর তা কেমন ভাবে তা জিজ্ঞাসা করবেন, আর আপনি কী শুনবেন এবং সাক্ষাৎকার থেকে আপনি কোনটা নির্বাচন করবেন, এগুলোই গুরুত্বপূর্ণ । আমি মনে করি তথ্যপ্রমাণাদি ও মানুষের সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়া আপনি প্রকৃতপক্ষে জীবনের ব্যাপক ক্ষেত্রের প্রতিফলন ঘটাতে পারবেন না। ওইগুলো ছাড়া ছবিটা সম্পূর্ণ হবে না।



এনা লুসিস: 
আপনি উপসংহারে উল্লেখ করেছেন যে আপনি ভবিষ্যতের জন্য লিখতে অনুভব করেন। আপনি কি এ বিষয়ে মন্তব্য করবেন?

স্ফেতলানা আলেকসান্দ্রভনা আলেকসিয়েভিচ:
দশ বছর ধরে আমি চেরনোবিল জোন পরিদর্শন করছিলাম, ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমার মনে আবেগ অনুভূতির সৃষ্টি করে। লোকজন বারবার কিছু বলতে অনীহা দেখাছিল।“ আমি কখনোই তেমনটা দেখিনি। আমি কখনো এটা পড়িনি কোথায়ও। আমি কখনো এটা কোন সিনেমায় দেখিনি কিংবা কারো কাছ থেকে কোন বর্ণনা শুনিনি।” চেরনোবিল একটা নতুন অনুভূতি তৈরি করল, যেমন ভালবাসার ভয়; মানুষ শিশুদেরকে কাছে পেতে ভয় পেল ; নতুন দায়িত্ব বোধের সৃষ্টি হল; নতুন প্রশ্নের জন্ম দিল। উদাহরণ স্বরূপ, যদি আমাদের শিশুরা অস্বাভাবিক ভাবে জন্মে তাহলে কি হবে? পারমাণবিক কণার বিভাজনের সময় সীমা তিন হাজার থেকে এক শত হাজার বছর হলে আমরা কেমন ভাবে এ ধরনের সংস্কারকে পরিমাপ করতে পারি? যা জীবনের ওপর আপনাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত সৃষ্টি করে। আপনি কি কল্পনা করতে পারেন একজন কী অনুভব করেছিল তার বাড়িঘর ও জন্মস্থান পরিত্যাক্ত করে, একজন তার চেনাজানা গ্রাম কিংবা শহরে আর কখনোই ফিরে আসবে না জেনে। বাড়িটি কিন সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে? তাদের জন্য এটা ছিল সম্পূর্ণ্ একটা নতুন অনুভূতি কিংবা দৃষ্টান্তস্বরূপ দুর্ঘটনা পীড়িত গ্রামগুলোর সমস্যা। কিভাবে তাদেরকে সমাহিত করবে? তারা প্রথম মানুষজনকে প্রত্যেক বাড়ি থেকে বের করে দেয়; এখনো বাড়িগুলোর জিনিসপত্রে ভরা, তারা একটা গভীর গর্ত তৈরি করে; তারা সব জীজন্তুকে বাধ্য করে সমাহিত করতে। এভাবে মানুষ তার জীবজন্তু, তার জমিন ও তার বাড়ির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে। যখন আপনি সেখানে যান, তখন আপনারা পুরনো সমাধিতক্ষেত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হন , সমাধি স্তুপের ভেতর বাড়ি ও জীবজন্তুগুলো।এটা আপনাকে একটা আবে অনুভূতির সৃষ্টি করে।


এনা লুসিস: 
ইউএস তে আপনি কী ধরনের অভ্যর্থনা পাবেন বলে ধারণা করেন?

স্ফেতলানা আলেকসান্দ্রভনা আলেকসিয়েভিচ:
আমেরিকা একটা অসাধারণ দেশ কিন্তু আমি অনুভব করি ৯/১১ এর পরে তা অন্য একটা দেশে পরিণত হয়েছে। আমেরিকা এখন উপলব্ধি করে এই দুনিয়টা কতটা ভঙ্গুর এবং কিভাবে আমরা সবাই একে অপরের উপর নির্ভরশীল। যদি অস্ট্রেলিয়ায় কোন পরমাণু শক্তিকেন্দ্র বিস্ফেরণের ফলে তেজস্ক্রিয় বৃষ্টিতে লোকজন মারা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে তবে আমি মনে করি ৯/১১ এর পর আমেরিকানরা আমার বইগুলো প্রতি আগের চেয়ে আরো বেশি আগ্রহী হতে পারে। আমি অনুভব করি আমি সেখানে লোকজন খুঁজে পেতে পারি যাদের কাছে এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ । আধুনিক বিশ্বে অন্যান্য মানুষের ভোগান্তির অভিজ্ঞতাকে অবহেলা করা বিপদজনক। ওই বিষয়ের জন্য আমরা রাশিয়া ও বেলোরুশিয়াকে কঠোর পরীক্ষা ও ভোগান্তির একটা সভ্যতা হিসাবে বর্ণনা করতে পারি। প্রায় প্রায়ই আমরা রাশিয়ার দুর্দশার কথা পশ্চিমাদের ঔদ্ধত্বের কথা শুনি: সব সময়ই এই সব রাশিয়ানদের বিষয়ে কিছু একটা ভ্রান্তি থাকে। প্রকৃত সত্য, আজকের দিনে সারা দুনিয়া একটা ঝুঁকির মধ্যে আছে। ভয় আমাদের জীবনের একটা অংশ , যা ভালবাসার চেয়েও বড়। সুতরাং ভোগান্তি নির্দিষ্ট মূল্যবোধের সৃষ্টি করে। আমাদের সবার বেঁচে থাকার জন্য সাহসের প্রয়োজন। আমি আশা করি আমাদের তা যথেষ্টই আছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন