বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৫

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্প নিয়ে আলোচনা

গল্পের ইলিয়াস : সাংগঠনিক কথাঅলার ইতিবৃত্ত
কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, যিনি সাহিত্যচর্চা করেছেন বিশ শতকের ছয় দশক থেকে, বাংলা কথাসাহিত্যের নান্দনিক এক প্রেরণার নাম। তিনি শুধু কথাসাহিত্য চর্চাই করেননি; প্রবন্ধ লিখেছেন, তৃণমূল নামের এক ছোটকাগজ সম্পাদনা করেছেন, লেখক শিবির নামের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে সক্রিয়ভাবে আমৃত্যু জড়িত ছিলেন, কবিতাও লিখেছেন।
তার গল্প থেকে যে ঋদ্ধতার পরশ পাওয়া যায়, জনমানসের মুক্তির জন্য তার ব্যাকুলতার যে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়- এর উৎস কোথায়? তার গল্পপাঠে, উপন্যাস পড়ে, জীবনযাপন খেয়াল করলেই এ বোধ জন্মে যে এ শক্তি মানুষের প্রাত্যহিক জীবনসংগ্রাম থেকেই সরাসরি সংগ্রহ করেছেন তিনি। এর মানে হচ্ছে জনমানসই তার শিক্ষক। তাই শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে, মানুষের প্রতি চরমনিষ্ঠায় নিজের রূপ-রস-কাঠিন্য মিশিয়ে কথাসাহিত্যের ফর্মে তা তার পাঠককে জানতে-বুঝতে দিয়েছেন। তিনি যেন সমাজ-পাঠের এক চলমান শৈল্পিক পাঠশালা খুলে বসেছিলেন। তবে এও বলতে হয়, তার মৃত্যুপরবর্তী-প্রচারণা তাকে হিরোর মর্যাদা দিয়েছে। এবং তিনি কিছুটা হলেও পণ্যবহুল জনপ্রিয়তাই অর্জন করছেন বলা যায়। যারা তার জীবতকালে তার সাহিত্যবোধকে, রাজনীতিকে, জীবনযাপনের ধরনকে মেনে নিতে পারতেন না, তার সাহিত্যিক বিশ্বাসকে কন্ফিউশনে ভরপুর বলতেন, অতি-বাম বলে দূরে রাখতে চেয়েছেন; এখন তারাই তাকে নিয়ে ক্রোড়পত্রও করছেন। একজন সাহিত্যিকের এমন প্রায় বাণিজ্যিক প্রয়োগ কম জনেরই সাহিত্যিক-জীবনে ঘটে। অনেকেই আনন্দবাজার নামের পণ্য-বিলাসি সাহিত্যগোষ্ঠীর কাছ থেকে তার পুরস্কার গ্রহণকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। তবে তাকে নিয়ে আলোচনার একটা বড়ো অংশে অবশ্যই থাকা উচিত তার সমাজবাস্তবতা গ্রহণের ধরনে নিয়ে। এসব অনেকে বললেও তা বাস্তবে রূপ দিতে তার রাজনীতিক কর্মপরিকল্পনা কি ছিল, তা নিয়ে মোটেই কথা বলতে চান না। এমনকি এও তাদের আলোচনায় বলা হয় যে, তিনি কোনো দলীয় রাজনীতিক বিশ্বাসকে ধারণ করতেন না। তার চরিত্রচিত্রণ, নিুবিত্তের গালিগালাজ, সেক্স, ভাষার আঞ্চলিক শক্তি প্রকাশে তার দাপুটে বিচরণই আলোচনায় থাকে। তাও ভাসা ভাসা স্টাইলে। যাই হোক, গল্পের ইলিয়াসকে দেখার পাশাপাশি তার শিল্পবোধ আর রাজনীতি বিষয়ে তার ভাবনাও আলোচনায় আনার প্রচেষ্টা থাকা উচিত।


ইলিয়াস গল্পের অনুষঙ্গ খুঁজে নেন সমাজ, মানুষ, রাষ্ট্র, সময় আর তার যাবতীয় বিষয়-আশয় থেকে। এক অর্থে সামাজিক মানুষের ভাবনাকে তিনি ট্রান্সলেট করেন মাত্র। সমাজকে পাঠ করার এত তীব্র-তীক্ষ্ণ আকাঙ্ক্ষা অন্য কোনো গল্পকারের ভিতরই দেখা যায় না। সেই হিসাবে তার দেখা, কথা বলা কিংবা পাঠকই হয়ত-বা তার গল্পের সৃজনকারী। যতদূর জানা যায়, তিনি গল্প লিখেছেন ৩০টি। 'নিরুদ্দেশ যাত্রা' ইলিয়াসের প্রথম গল্পগ্রন্থ অন্য ঘরে অন্য স্বরের প্রথম গল্প। গল্পগ্রন্থে প্রকাশিত গল্পের ভিতর এটিকে দলছুট গল্পও বলা যেতে পারে। কারণ এটিতে ইংরেজি শব্দের বাহুল্যই শুধু নেই, এত কাব্যিক বর্ণনা আর কোনো গল্পেই যেমন নেই, তেমনি একটা চরিত্রের মনোজাগতিক অবস্থা বর্ণনায় এত ধৈর্যও অন্য কোনো গল্পেই দেখাননি তিনি। এমনকি একজন পুলিশের কথকতাকেও অতি যত্ন আর প্রয়োজনীয় মনে করেই লিখে গেছেন তিনি। গল্পে রঞ্জু নামের ছেলেটি দৃশ্যত মানসিক ভারসাম্যহীন। তার ভাবনা কোনো নির্দিষ্ট কিংবা সলিড হিসাবে না-ধরলেও চলে। তবে এতে একজন মানুষের সামাজিক অবস্থান, তার বেড়ে উঠা, ক্ষণে ক্ষণে নিজেকে হারানোর একটা বিষয় উঠে এসেছে। ছেলেটির বাবার কথা, তাঁর রাজনীতির কথা, মিছিল-মিটিং-এর সংবাদ রঞ্জু নামের চরিত্রটিকে আশ্রয় করে পাঠকও জানতে পারে। 'নিরুদ্দেশ যাত্রা' একহিসাবে দখল গল্পটির সমগোত্রীয়ই। এখানে রঞ্জুর একটা মনোজাগতিক সঙ্কট আছে, বাবার রাজনীতির কথা আছে। হারিয়ে যাওয়ার একটা অবস্থান তৈরি হয়। মনে হবে ইলিয়াস একই গল্প দুইধরনের মাল-মসলা দিয়ে সাজালেন কেবল। তবে 'নিরুদ্দেশ যাত্রা'র ভাষাভঙ্গি, শব্দশৈলী ভিন্নধরনের- অনেকটা দোআঁশ মাটির মতো। প্রচুর ইংরেজি শব্দ অনায়াসে যেমন মিশেছে, দৃশ্যকল্পের ব্যবহারে বেশ মাখো-মাখো ভাবটি বজায় থেকেছে। এ গল্পে ডায়ালগ যেমন প্রচুর, কাব্যিক আবহ তৈরি করা হয়েছে অনেক। এসব তার পরবর্তী গল্পসমূহের সাথে তুলনামূলক আলোচনা করতে গেলে বাহুল্যময়ই মনে হতে পারে। গল্পটিকে তার প্রস্তুতিপর্বের গল্পও বলা যেতে পারে। কারণ পাঠককে মুগ্ধ করার কোনো কৌশলই তো ইলিয়াস আর ধারণ করেননি। মনে হবে, এসব যেন সুখে আছে যারা সুখে থাক ধরনের সুখবিলাসি কাজ। তবে গল্পটির অন্তর্নিহিত ভাবটি কিন্তু বস্তুবাদী প্রেরণায় উন্মুখ। রঞ্জু কোথায় যেন কী হারিয়ে এসেছে- এটাই এ গল্পের মূলসুর। শেষ পর্যন্ত রঞ্জু নিঃশ্বাস নেয়ার শক্তিটাও হারিয়ে ফেলে। ধীরে ধীরে সে মূলত মৃত্যুময় চেতনা দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। উৎসব নামের গল্পটি শ্রেণীগত ভাবনা দ্বারা রীতিমতো ভারাক্রান্ত হয়ে যেতে থাকে- গল্পটিতে শ্রৈণীবৈষম্য আর সমাজবাস্তবতা মূর্ত হয়ে উঠেছে। ইলিয়াস শ্রেণীকরণ বিষয়টাতে বেশ তৎপর তা তার প্রথম দিকের গল্পসমূহেই ভাস্বর হতে থাকে। সাধারণ মধ্যবিত্ত পর্যন্ত চরিত্র চিত্রণে ইলিয়াসের তত সমস্যা হয় না, কিন্তু উচ্চমধ্যবিত্ত থেকে যতই উপরের শ্রেণীর চরিত্র তার গল্পে আনবেন ততই তার রাগ-ঝাল-ধৈর্য রীতিমতো রোদের তীক্ষ্ণ ওমের মতো ঝা ঝা করতে থাকে। সেখানে চরিত্রসমূহ ক্রমশই বিপজ্জনক রূপ নেয়। সেই মানুষসমূহের আলাদা কোনো লাইফস্টাইলও দীর্ঘজীবী হয় না। এমন একটা বিষয় এই উৎসব গল্পটিতেও দেখা যায়। আনোয়ার আলী যে বড়োলোক বন্ধু কাইয়ুমের বাসায় দাওয়াত খেতে যায়, তারা শুধুই বড়োলোক, মেয়েগুলোও আলাদা কোনো চরিত্র হওয়ার বদলে বড়োলোক হয়েই থাকে। জীবন তাহলে এতই শ্রেণীনির্ভর? বাস্তবে একই ধরনের কাজ আমরা দেখি সশস্ত্র বাম সংগঠনগুলোর রাজনীতিক অ্যাকশনে। তারা মানুষটার শ্রেণীই কার্যত দেখে- মানবিক গুণাবলীর বিষয়টা প্রায় চোখের আড়ালেই থেকে যায়। সেই বড়োলোকদের মেধার বিষয়টাও যেন শ্রেণীমুখীই হয়ে পড়ে। এটা ঠিক, একটা শ্রেণীবিভক্ত সমাজে শ্রেণীবৈষম্যের বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একজন বাবা যখন তার বড়োছেলের জন্য কাঁদতে থাকে (গল্প : 'দখল') থাকে তখনও ইলিয়াস সেই কান্না নিয়ে অবহেলার একটা ধারণা তৈরি করেন। কথা হচ্ছে, সনাতন পরিবার প্রথার ভিতর একজন বাবা তো তার ছেলের জন্য হাঁ-হুতাশ করতেই পারেন। এমনকি কি তা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের মতোও হতে পারে। কিন্তু এই জায়গায়ও ইলিয়াসের ধৈর্য না-থাকাটা অস্বস্তিকর। উৎসব কিংবা মিলির হাতে স্ট্যানগান অথবা 'কীটনাশকের কীর্তি'তে দেখা যায় বড়োলোক মানুষ একই ঘরানার মানুষ। এরা কখনও আলাদা ব্যক্তি হয় না, বা এদের রুচিবোধ নিয়েও যেন বাড়তি কোনো টেনশন থাকতে নেই। উৎসব গল্পে আরও একটা শ্রেণীর বা রুচিবোধের মানুষ দেখা যায়, যারা একই সাথে রবীন্দ্র সঙ্গীত আর গণসঙ্গীত শোনে; বাঙালি জাতীয়তাবাদ আর সমাজতন্ত্রের জন্য কথাবার্তা চালায়। এদের কথার ধরন বা বাচনিক স্টাইল খুব সুন্দর, এরা প্রচণ্ড আড্ডামুখী এবং এই কাজটির জন্য নিরাপদ আর আলাদা একটা সুন্দর জায়গাও বের করে ফেলে। এদের কেউ কেউ আবার আমলাতন্ত্রের ধারক, কেউ মজা করে একুশে ফেব্রুরারি পালন করে। এইসবের ভিতর মূলচরিত্র আনোয়ার আলির মনোজগতের মধ্যবিত্ত দোদুল্যমানতা বেশ আয়েশ মিটিয়ে আঁকেন ইলিয়াস। সেই সময়ের শহুরে ধাপ্পাবাজ-সুবিধাজীবী মধ্যবিত্ত এখানে মূর্ত হয়েছে। ভাষায় কিছুটা হলেও মেদবহুল লালিত্য দৃশ্যমান হয়। অন্য ঘরে অন্য স্বর নামের গল্পগ্রন্থটি আসলে শহুরে-বজ্জাত-হুজুগে-সুবিধাজীবী মধ্যবিত্তে ঠাসা। স্বাধীনতা পরবর্তী সরকারপ্রেমী আদব-লেহাজহীন উগ্র হঠাৎ-গজিয়ে উঠা যুবক সম্প্রদায়ের নিখুঁত চালচিত্রও আছে এতে। এত নড়বড়ে, ভণ্ড, এলোমেলো মধ্যবিত্ত আর কোনো গল্পগ্রন্থে দেখা যায় বলে মনে হয় না। প্রতিশোধ নামের গল্পটিতে আরেক সংস্কৃতিজীবী মধ্যবিত্তের চেহারা উন্মোচিত হয়, যারা আসলে সংস্কৃতি সেবার নামে, সৌন্দর্যের নামে, এমনকি সমাজতন্ত্রের নামে মস্কো-কলকাতা করে সংস্কৃতিসেবার সেবার নামে আখের গোছানোর কাজই করেছে। তবে এই ব্যাপারটা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক যে তার গল্পে কোনো পিতা অসুস্থ হলে প্রায়ই দারুণভাবে অবহেলিতই হয়। এবং মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই অবহেলাকে রাজনীতিক অবহেলাও বলা যেতে পারে। ইলিয়াস হয়ত তৎকালীন মধ্যবিত্তকে ধরে নিতেন বুর্জোয়া সমাজের প্রতিনিধি আর অসুস্থ পিতারা হচ্ছেন ক্ষয়িষ্ণু সামন্তসমাজের প্রতিনিধি। ফলে সেই বাবা ‘দোজখের ওম’, ‘ফেরারী’ কিংবা ‘প্রতিশোধ’-এর হোক অথবা হোক ‘তারাবিবির মরদ পোলা’-এর- সর্বত্রই এরা বাড়তি একটা যাচ্ছেতাই অনুষঙ্গ হয়ে থাকে। ইলিয়াসের গল্পে বর্ণনা আসে ব্যক্তিকে পুঁজি করে, মানুষই তার আরাধ্য বিষয়। যার ফলে ঘর-দোর-উঠান ইত্যাদিতে খুব বেশি কথা খরচ করতে রাজি নন তিনি। তার গল্পে রঙের ব্যবহার খুব দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে আসেনি। আসলে তিনি প্রায়ই শুকনা-রোদহীন-জলহীন ক্যামেরা নিয়ে ঘুরে বেড়ান, সেখানে শ্রেণীময় মানুষ কেবল কিলবিল করে। তার চরিত্রের কথাগুলো অনেক সময়ই মানুষগুলোর শ্রেণীবৈশিষ্ঠ্যই সেরে নেয়।


ইলিয়াসের গল্পের একটা বাঁকবদল লক্ষ করা যায় তার ‘ফেরারী’ নামের গল্পে। পুরান ঢাকার জীবনই শুধু এখানে নিপুণভাবে আসেনি- এতে যেন জীবনের রূপান্তর ঘটানো শুরু করলেন তিনি। চরিত্রগুলোর লোকায়ত অন্তর্চেতনা এখানে অধিকতর স্পষ্ট হয়। মানুষের কাছ থেকে অর্জিত জীবন বা গল্পের রূপ যেন ভিন্ন আবহে পাঠককেই উপহার দিচ্ছেন। একধরনের পালাবদল ঘটছে। পরিবেশের বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনা লক্ষ করা যায়। জাদু আর স্বপ্নের আনাগোনা শুরু হয় এখানে, এ যেন ইলিয়াসের আরেক নির্মিতি। গল্পটিতে হানিফের বাবা অসুখে পড়ে। একেবারে মরণ রোগ। ভাবনার ভিতর, স্বপ্নের ভিতর পরীর আনাগোনা মূলত পূর্ববাংলার জল-কাদা-রূপকথা-স্বপ্নময়তার আরেক রূপ স্পষ্ট করেন। মানুষের অপরাধবোধ, জীবনের নানান বাঁক এতে উন্মোচিত হলো। ধর্মীয় অনুষঙ্গও প্রশ্নদীর্ণ হয়। হানিফ বাবার মৃত্যুর খবর শুনলে পর তার হাত থেকে কোরান শরীফ পড়ে যায়। এ এক সাঙ্কেতিক প্রকাশ যেখানে ভাববাদী কোনো জীবনবোধ যেন জীবনের চলমানতাকে পূর্ণমাত্রায় আশার আলো দেখাতে পারে না। সনাতন ধ্যান-ধারণার উপর এভাবেই নবতর আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট করেন ইলিয়াস। অন্য ঘরে অন্য স্বর গল্পটির ধরনই আলাদা- মনে হবে পারিবারিক ইতিবৃত্ত বেশ যত্নের সাথে বুনে গেছেন গল্পকার। স্বদেশপ্রেম, সংখ্যালঘু নিপীড়ন, ফ্যামিলিয়াল ক্রাইসিস, উচ্চাকাক্সক্ষা, ধর্মীয় সন্ন্যাসপনা, যৌন-আকুতি, সেক্সুয়াল ইনটলারেন্স সবকিছু মিলেমিশে একধরনের মানবিক সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে। বিশেষ করে পিসিমার স্মৃতিকথা বর্ণনায় ইলিয়াস যেন মানবিক ভাবনাকেও অতিক্রম করে গেলেন। স্মৃতিকথা এত আবেগ দিয়ে বর্ণনা করলেন তাতে যে কোনো সংবেদনশীল পাঠক ইমোশনাল হয়ে যেতে পারেন। প্রদীপের দেশ-বিদেশের নানা অঞ্চলে ঘুরে বেড়ানোর বিষয়টা বেশ তাৎপর্যময়- কলকাতা, ঢাকা, আসাম, শিলং ইত্যাদি জায়গায় ঘুরে স্বদেশত্যাগটাই যেন একঅর্থে ভুলে থাকতে চান। কিন্তু বাস্তবতা তো তা হতে দেয় না। স্বাধীনতা পরবর্তী উদ্যত-বেয়াদব মধ্যবিত্তের হুঙ্কার সারাটি গল্পেই আছে। গল্পের শুরুতেই দুটি ছোকরা পারিবারিক-সামাজিক আবেশকে তছনছ করে দেয় এবং তা সারাটি গল্পেই বিস্তৃত হয়। ননীর মেয়ে কলেজে ভর্তি হয়েও এসব হিংস্র আগাছাদের জন্য কলেজেই যেতে পারে না। সর্বত্র একটা লুটপাটের মহরা। এরই ভিতর পিসিমার পারিবারিক স্মৃতিময়তা অত্যন্ত দরদ দিয়ে ইলিয়াস আঁকতে থাকেন। ‘খোঁয়ারি’ নামের গল্পটির প্রকৃতি অন্য ঘরে অন্য স্বরের মতোই। তবে এখানে স্বাধীনতা পরবর্তী নব্য-লুটপাট করনেঅলাদের ধরন, দুঃসাহস, নির্মমতা অত্যন্ত সত্যনিষ্ঠভাবে এঁকেছেন গল্পকার। পার্টি অফিস করার নামে মানিক, ফারুক, জাফর, পাড়ার অন্যসব ছিঁচকে মাস্তানরা ভাড়া নেয়ার কথা বলে আসলে একটা হিন্দু বাড়িই দখল করতে চায়। সমরজিৎ কিংবা তার বাবা অমৃতলালের কথা যেন তারা হিসাবের ভিতরই আনতে চায় না। এভাবেই সেই সময়কার অর্থাৎ স্বাধীনতা পরবর্তী উঠতি বুর্জোয় শ্রেণী তথা রাজনীতিঘেঁষা যুব সম্প্রদায়ের বেয়াদবিই এ গল্পের মূলচরিত্র হয়। এদের কাছে নীতিবোধ বলতে তেমন কিছুই নেই। এরাই বিহারি ইফতেখারের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছে, মাউরা বলে মনে মনে গালি দিলেও সাথে নিয়ে ঘুরতে বা মাল খসাতে কোনোই সমস্যা হয় না। একটা সময়ের অত নিখুঁত অবজার্ভেশন খুব কমই দেখা যায়। এখানে একটা বিষয় খুব স্পষ্ট হয় যে, মুক্তিযুদ্ধের মতো অত বড়ো অসাম্প্রদায়িক জনযুদ্ধের মতো ঘটনা ঘটলেও তার পজেটিভ রেজাল্ট কিন্তু তেমন পাওয়া গেল না। স্বাধীনতার পর যে-ই হিন্দু সম্প্রদায় স্বাধীন মানুষ হিসাবে দাঁড়ানোর একটা ভঙ্গি অর্জন করতে চাইলো; কিন্তু সহসাই ফিরে আসা সাম্প্রদায়িক আবহ কিন্তু তা করতে দেয়নি। তবে এ ক্ষেত্রে ধর্মীয় আবহ সম্পর্কে কিছু কথা বলা যায়। পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে এককাতারে যুদ্ধ করলেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভাবনা থেকে কি সংখ্যাগুরুর ধর্মীয় আধিপত্যের কথা সমূলে বিনাশ করতে পারল? মনে হয় না। ওদের ভিতরে ভিতরে ভয় কিন্তু ঠিকই বজায় থাকলো কিংবা বজায় রাখতে হলো। মূল কথা হচ্ছে পাকিস্তান আমলজুড়ে বিস্তৃত-লালিত-আশ্রিত সাম্প্রদায়িক আবহ একেবারে শিকড় পর্যন্ত ছিল। স্বাধীনতার কিছু সময় পর থেকে তা দূর না হলেও কিছু তো কমল? কথা হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় আচরণ অসাম্প্রদায়িকতার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত না থাকলে, চর্চা না করলে তা আবার আগের অবস্থায় যেতে বাধ্য। এ একটা অবস্থা স্বাধীনতার পর দেখা গেল। অর্থাৎ হিন্দু সম্প্রদায় তাদের অসহায়ত্ব তেমন ঝেরে ফেলতে পারল না। তবে ইলিয়াস যেভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের অসহায়ত্ব দেখালেন তা বোধ হয় সঠিক নয়। তার সৃষ্ট সংখ্যালঘু নিপীড়ন ৬৫, ৬৯, ৭২, ৭৫, কিংবা তারও পরবর্তী সময়ে তেমন পার্থক্য দেখা গেল না। বিষয়টা একেবারে সঠিক বলে ধরা যাচ্ছে না। পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হওয়াতে ভারতের একটা বড়ো অবদান নিশ্চয়ই ছিল। হিন্দু সম্প্রদায় মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে আর্মি-রাজাকার-আল বদর দ্বারা ছিল সবচেয়ে নিগৃহীত। তবে এও স্বীকার করতে হয়, এ অঞ্চলের অর্থাৎ পূর্ববাংলার মুসলমান সম্পর্কে এ ধারণাও তাদের ছিল, মুক্তিযুদ্ধের মতো এত বড়ো ঘটনার ভিতর দিয়ে দেশটা স্বাধীন হলেও তারা অর্থাৎ মুসলমানগণ কোনো যাদুমন্ত্রবলেই ষোলআনা ধর্মীয় উদাসীন হয়ে পড়বে না। তাদের এ ধারণা ধর্মজীবনের নানান বাঁকবদল থেকেই সংগৃহীত। তবে এখানে আরও একটা অবজার্ভেশন উল্লেখ করা যায়- যেহেতু হিন্দু সম্প্রদায় ৭১'এ অধিক পরিমাণে অত্যারিত হলো, রিফ্যিউজি ক্যাম্পে হিন্দু সম্প্রদায় জড়ো হলো অধিক, কষ্টও করল প্রচুর- তাহলে তো হিন্দু সম্প্রদায়ের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের পরিমাণ বেশি হওয়ার কথা। বাস্তবে তা কিন্তু হয়নি। এও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক অদ্ভুত মানসিকতা যাকে অতি সরল হিসাবে কিছুই বলে দেয়া সম্ভব নয়। এ-সব বিষয় কথাশিল্পী কায়েস আহমেদের কথাসাহিত্যে লক্ষ করা যায়। তবে এ বিষয়টি এখানে বলা যায়, ইলিয়াস রাজনীতিকভাবে দায়িত্বশীল ছিলেন বলেই হয়ত তার দৃষ্টিভঙ্গিকে গল্পের কথিত প্রভাব ভর করেছিল। এ জন্যই হয়ত স্বাধীনতা পরবর্তীতেও হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর ধর্মীয়-জাতিগত নিপীড়ন একেবারে একই তালে দেখেছেন। এখানেই তার দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে দ্বিমত তৈরি হয়।


দুধভাতে উৎপাত নামের গল্পগ্রন্থের প্রথম গল্প ‘মিলির হাতে স্ট্যানগান’ গল্পটার কথায় ধরা যাক- এ গল্পের পটভূমি স্বাধীনতা পরবর্তী বছর তিনেক পরের নষ্টভ্রষ্ট সময়। একটা আকাঙ্ক্ষা যে ইলিয়াস লালন করেন তাই মিলির যাবতীয় কার্যকারীতার ভিতর উঠে এসেছে। মূলত গল্পটির সব চরিত্র মিলে মিলির চাওয়া-পাওয়াকেই নির্মাণ করেছে। এমনকি আব্বাস পাগলাও মিলির আকাঙ্ক্ষার কাছে শেষতক কেবলই ছোট হতে হতে প্রায় দেখাই যায় না। আব্বাস যখন পিজি হাসপাতালের মানসিক ওয়ার্ডে পাগল অবস্থা থেকে পূর্ণ সুস্থ হয়ে আসে, মিলি তখন তার পরিকল্পনার অংশ হিসাবেই তার কাছে গচ্ছিত থাকা স্ট্যানগানটি আব্বাস পাগলাকে ফেরত দেয়। কিন্তু আব্বাস পাগলা ততদিনে সুস্থ মানুষ হয়ে আব্বাস মাস্টার হয়ে গেছে। তার তো আর স্ট্যানগানটির প্রয়োজন নেই। এ গল্পে সনাতন আশাবাদ প্রচারণা করার মতো কিছু আয়োজন লক্ষ করা যায়। এমনকি সামাজিক-রাষ্ট্রীয় অনুষঙ্গের অসঙ্গতি এটিকে অসহায় করে ছাড়ে। গল্পটিতে রাষ্ট্রীয় কাঠামো বা তখনকার ইতিহাস কেমন ওঠে এসেছে? তা অবশ্যই আংশিক। এ ব্যাপারটিতে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে এ জন্য যে, এতে স্বাধীনতা পরবর্তীসময়ের নানাবিধ দূর্ঘটনা, রাষ্ট্রীয় অসহায়তা, দূর্বৃত্তায়ন গল্পের প্রধান চরিত্র। তাহলে মিলি বা রনি-সোহেল-সিডনি-ফয়সল কিংবা আব্বাসের চালচলন বা কথার ধরন এমন কেন হবে? তখন তো সরকারের নানাবিধ রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের পাশাপাশি গ্রাম শুধু নয়, ঢাকার প্রায় রাস্তায় জাসদের গণবাহিনী, সর্বহারা পার্টি, হক/তোয়াহার সশস্ত্র সংগঠন রীতিমতো দাবড়িয়ে-কাঁপিয়ে-শাসিয়ে বেড়াচ্ছে। আব্বাস কিংবা মিলির তো এ-ধরনের কোনো সংগঠনের সাথেই যোগাযোগ গড়ে তোলা বা থাকাটা স্বাভাবিক ছিল। তা যদি নাও হয়, গল্পটিতে কোনো চরিত্রের কোনো আলোচনায়ও তা থাকবে না? আসলে ইলিয়াস হয়ত জনযুদ্ধ ঘরানার স্বাধীনতা লাভের পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক ইতিহাস দেখে একেবারে হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন। যার ফলে তার সৃষ্ট মিলি আশপাশের চলমান বাস্তবতার সাথে নিজেকে একাত্ম করতে পারেনি। ক্লিন-সেভ করা সুস্থ আব্বাসের এ-কেমন পরিবর্তন যে তার আকাঙ্ক্ষার কিছুই মনে আসবে না! এখানেই গল্পটি ইচ্ছাপূরণের কথকতা হয়ে উঠে। গল্পটিতে ভাষার মোচড় আছে। ব্যক্তি-জীবনের গভীর থেকে কিছু বোধ উঠে এসেছে। তবে ছোটগল্পের ছোট প্রাণ ছোট কথার একটা ঝাপসা অবয়ব গল্পকারের চেতনালোক দখল করার কারণে এবং তিনি হয়ত-বা সাংগঠনিক ভাবনায় আচ্ছন্ন থাকাতে গল্পটির বিস্তার তেমন হয়নি এবং বাস্তবঘেঁষা শিল্পরূপ বজায় রাখতে পারেননি। ‘মিলির হাতে স্টেনগান’ শিরোনামের গল্পটিতে রাষ্ট্রীয়-পারিপার্শিক অসঙ্গতি নিয়ে যত কথা বলা হলো, দখল নামের গল্পটিকে ওসব থেকে ষোলআনা বিযুক্ত করা যায়। এটি মার্ক্সীয় নন্দনতত্ত্বের যথার্থই এক শিল্পবোধসম্পন্ন গল্প। গল্প বুনে যাওয়ার বিষয়টা এখানে খুবই পারফেক্ট। এটিও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সৃজিত সশস্ত্র দ্রোহেরই সমাহার। গল্পটির প্রতীকী সমাপ্তিও খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। গল্পের মূলচরিত্র ২৪ বছরের ইকবাল তার বাবার স্মৃতিই খুঁজে খুঁজে বেড়ায়। ওর বাবা কাজী মোহাম্মদ মোবারক হোসেনকে ১৯৫০ সালে রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে স্বৈরাচার পাকিস্তান সরকার হত্যা করে। তারপর ইকবালের মা শ্বশুরবাড়ি থেকে তার ৮ মাসের ইকবালসহ ঢাকায় থাকতে বাধ্য হয়। পরবর্তীকালে ইকবাল গ্রামের বাড়ি আসে মূলত পারিবারিক কারণে এবং একসময় তার বাবার রাজনীতিক কমিউনিস্ট সহচরদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলে। কিন্তু তার প্রধান আকর্ষণের জায়গাটা হয় তার বাবার কবরের পাশে রাখা আরেকটু খালি জায়গা যা সংরক্ষিত হয়েছে তার দাদার জন্য। এটি ইকবাল নিজের জন্য দখল করার প্রস্তুতি নিতে থাকে। এদিকে পাশের গ্রামের বাম সশস্ত্র লোকজন ইকবালের দাদার বাড়িতে হামলা করতে আসে। কারণ বাড়িটি রক্ষীবাহিনীকে সাহায্য করার আয়োজন করতে থাকে। তখন ইকবাল কবরের খালি জায়গায় শুয়ে-শুয়ে দখলিস্বত্ব বিস্তার করে। এভাবেই চমৎকারভাবে গল্পটিকে ম্যাচুরিটির দিকে নিয়ে গেলেন গল্পকার। ‘দখল’ গল্পটি রাজনৈতিক বিশ্বাস সম্প্রসারণের এক চমৎকার দলিল। গল্পটির শুরুতে মনে হতে পারে ইকবাল শহর থেকে এসেছিল বাবার সম্পত্তি উদ্ধার বা দখলের জন্য। কিন্তু পরবর্তীসময়ে দেখা গেল, ইকবালের সাথে বিলের ওপারের ভেদু বা অন্যদের সাথে একটা স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক যোগাযোগ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে ইকবাল তার বাবার কমিউনিস্ট রাজনীতির প্রতি দায়বদ্ধ হওয়া শুরু করে। জোতদার, রক্ষীবাহিনীর দালাল, কমিউনিস্টদের শত্র“ তার দাদার জন্য কবরটি রিজার্ভ রাখা অপমানের মনে করে ইকবাল। কবর দখলের সুযোগ গ্রহণ করতে চায় ইকবাল। তাই যখন বোঝা যায় বিলের ওপার থেকে সশস্ত্র কমিউনিস্টরা মোয়াজ্জেম হোসেনকে মারার জন্য দলে দলে আসছে তখনই ইকবাল কবরটি দখল করে শুয়ে থাকে। চমৎকার এক প্রতীকী প্রতিবাদ আছে গল্পটিতে। ‘পায়ের নিচে জল’ একহিসাবে গল্পটি দখলকেই পুননির্মাণ করে মাত্র। এ গল্পের আতিক ‘দখল’ গল্পের ইকবালেরই প্রতিচ্ছবি। ‘পায়ের নিচে জল’-এ শহরের চরিত্র আতিক বাপ-দাদার আমলের জমি বিক্রি করতে আসে। আর ইকবাল তার ওয়ারিশ তারই দাদার কাছ থেকে উদ্ধার করতে আসে। উভয়ের বাবাই গ্রামের সাধারণ মানুষের খুবই ঘনিষ্ঠজন। এই দুই ছেলেকে গ্রামের অতি সাধারণ মানুষ তাদের বাবার জন্যই এত পছন্দ করে। দুজনই শেষ পর্যন্ত তাদের বাবার স্মৃতিকে পুননির্মাণ করে। তবে ইলিয়াসের গল্পে খুবই নিবিড়ভাবে খেয়াল করলে দেখা যায়, মানুষের প্রতি ভালোবাসার এক নতুন দরজা খুলে দেন তিনি। দখল-এ কবরের জন্য খালি জায়গাটা যেমন অতি গুরুত্ব পায়, তেমনি ‘পায়ের নিচে জল’-এ ইলিয়াস মূলত একজন গ্রামের সাধারণ আধিয়ার কিসমতের ভালোবাসাকে নিপুণ কুশলে আঁকতে থাকেন। সারাটি গল্প কিসমতের শ্বাসরুদ্ধকর মানবিক টানের কাছে রীতিমতো অসহায় হয়ে পড়ে। আতিক যে একরকম পালিয়ে ঢাকায় চলে যাওযার সিদ্ধান্তটা নেয়, তাও কিসমতের গ্রাম্য-জীবন্ত ভালোবাসার কাছে অসহায় হয়েই। চরিত্রের বিন্যাস, সামাজিক-পারিবারিক অবয়ব গল্পটিকে সারাক্ষণই সজীব রাখে। গল্পটির শুরুতেই বাঁধের উপর মানুষজনের যে বর্ণনা থাকে তার ধারাবাহিকতা একবারে শেষ পর্যন্ত বজায় থাকে। মানুষের গায়ে গায়ে লেগে থাকা মানুষই গল্পটির শরীর ভরাট করে রাখে। মানুষের এত জীবন্ত উপস্থিতি খুব কম গল্পেই আছে।


‘কীটনাশকের কীর্তি’ সমাজের মানুষজনকে একেবারে গভীরভাবে দেখে, তাদের কাছ থেকে পাঠ নিয়ে ইলিয়াস যেন গল্পটি লিখতে শুরু করেন। তবে ইলিয়াসের কিছু অধৈর্য মানসিক পীড়ন এখানে আছে, মেকাপ দেয়ার নিজস্ব স্টাইল আছে, এবং একটা পরিণতিতে যাওয়ার বাসনা তৈরি হয়। তার এ গল্প বলতে যা বোঝায় তা এসবের মিলিত রূপ। এবার কিছু অসঙ্গতির কথা স্বরণ করা যাক- রমিজ তো এ বাড়িতে দীর্ঘদিন ধরেই চাকর হিসাবে আছে, তাহলে তার বোন যে পোকার ওষুধ খেয়ে মরল, তাই জানাতে পারবে না শেষ পর্যন্ত। চাকর-বাকর বা ড্রাইভার বা অন্য কোনো লোকই ও পেল না বাড়ি যাওয়ার খবরটা জানানোর জন্য? তবে হ্যাঁ, এসবকে মেনে নিলে সাহেবের মেয়ের মুখে বিষ ঢেলে দেওয়ার বিষয়টাও মেনে নিতে কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আসলে রমিজ তো তার ব্যক্তিত্বই ভুলে গেছে, বলা যায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। এ গল্পটির সবচেয়ে বড়ো বিষয়ই হচ্ছে, মানুষকে পাঠ করার প্রবণতা এবং তা থেকে গল্পের শরীর বুনে যাওয়ার অসাধারণ দক্ষতা। এসবই ইলিয়াসকে অন্য যে কোনো গল্পকার থেকে আলাদা করেছে। দোজখের ওম নামের গল্পগ্রন্থটির দ্বিতীয় গল্প ‘যুগলবন্দি’ও ‘কীটনাশকের কীর্তি’র আদলেই গড়ে উঠা আরেক জীবনঘনিষ্ঠ গল্প। যুগলবন্দীর আসগার হোসেনের সাথে কীটনাশকের কীর্তির রমিজ বলতে গেলে একই চরিত্রের ভাবনা বা জীবনবোধ বহন করে। ‘কীটনাশকের কীর্তি’র রমিজ একেবারে গল্পের শেষদিকে বোন অসিমুন্নেসার জন্য নিজের আবেগ প্রকাশ করে এভাবে- এইভাবে রাত কাবার হয়। কাঁদতে কাঁদতে চোখ জোড়া নুন, মরিচ, পেঁয়াজ, লেবুপাতা চটকানো পান্তাভাত-খাওয়া পেটের মতো আরাম হলে নোনতা ও কুসুম-গরম-পানির ওমে ভোরের দিকে রমিজের চোখ জুড়ে ঘুম নামে। এই গল্পগ্রন্থের ‘অপঘাত’ সবদিক থেকেই একটা নবতর শৈলীর গল্প। এর আগে মুক্তিযুক্তবিষয়ক সর্বদিক লক্ষ করে তিনি গল্প লিখেছেন বলা যাবে না। যাদুবাস্তবতার এক আশ্চর্য ফর্ম তিনি সৃষ্টি করেছেন। বুলু মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে পাকিস্তান বাহিনীর হাতে সরাসরি বুকে গুলি খেয়ে মারা যায়। এদিকে বুলুর বন্ধু আনোয়ার বাড়িতে রোগে ভোগে মারা গেল। তাকে দাফন করা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়। কারণ গ্রামের স্কুলে আর্মিদের ক্যাম্প দিয়ে কবরে যাওযার মানুষগুলিকে যেতে দেয় না। পাকিস্তান আর্মিরা এমনই নিষ্ঠুর যে জানাজায় অংশগ্রহণ মানুষজনদেরও মানুষ মনে করে না। ধীরে ধীরে বুলুর মৃত্যুর বিষয়টাও উন্মোচিত হয়। গল্প বলে যাওয়ার ধরন, মানুষকে অবজার্ভ করার অসাধারণ ক্ষমতা, ভয়াবহতার চালচিত্র অঙ্কন, ডিটেইলের চমৎকার বর্ণনা- সবকিছু মিলে এটি বাংলা কথাসাহিত্যের এক অসাধারণ সৃষ্টি। ‘দোজখের ওম’ গল্পটিও ইলিয়াসের আরেক চমৎকার সৃষ্টি। কামালউদ্দিন নামের প্যারালাইসিস দর্জির আশাবাদী সামগ্রিক জীবন, জীবনের আশা-ভরসা, ব্যর্থতা, জটিলতা, বেঁচে থাকার নিরন্তর আকাঙ্ক্ষা গল্পটির মূলপ্রাণ। তবে বারবার একই বিষয় পুনর্ব্যক্ত হওয়ায় গল্পের স্বাভাবিক বিকাশ কোথায় যেন জট পাকিয়ে যায়। তবে একজন নির্জন পঙ্গুব্যক্তির শারীরিক-মানসিক জটিলতা এত দীর্ঘ করে বর্ণনা করাও মারাত্বক শক্তিমত্তারই পরিচায়ক। বিশেষ করে গ্রামীণ লোকায়ত জীবন, ধর্মীয় অনুষঙ্গের প্রকাশ বিশাল জীবন সম্পর্কে চমৎকার ধারণারই শব্দচিত্র।


খোঁয়ারি গল্পগ্রন্থের ‘তারাবিবির মরদপোলা’ ইলিযাসের যুগান্তকারী এক সৃষ্টি। এর মূল জায়গাটি হচ্ছে তারাবিবির তথা অবদমিত যৌনতাকে দেখার এক দূরন্তপনা তৈরি করে যাওয়া। এ যেন যৌনতার এক অতৃপ্ত সরবতা। আর সেই সরবতাকেই গোলজার, তার বউ সখিনা এমনকি গোলজারের বাবা রমজান আলী, আলী হোসেন, আলী হোসেনের বৌ, কাজের মেয়ে সুরুজের মা তার জীবনের অংশ দ্বারা সেই হুঙ্কারের উপর মেকাপ দেয় মাত্র। তারাবিবি রমজান আলীর একসময়ের শ্যালিকা, বর্তমানে দ্বিতীয় বৌ। বয়সের পার্থক্য অনেক। তার ফলে তারাবিবির মনোজাগতিক একটা জটিলতা তার চারপাশ ঘিরে রাখে। সুযোগ পেলেই ছেলে আর ছেলের বউ’র মনে যৌনতা দিয়ে সন্দেহ ছড়িয়ে দিতে চায়। এ যেন অতৃপ্ত যৌনতাকে ভুলে থাকার একটা স্পষ্ট আয়োজন। গল্পটির শেষদিকে সুরুজের মায়ের সাথে গোলজারের যৌন সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া যায় এবং রমজান আলী এ নিয়ে তার স্ত্রী তারাবিবিকে শোনাতে থাকে। কিন্তু তা-ই পাত্তা দেয় না তারাবিবি। এর পরিবর্তে ছেলের চলে যাওয়ার দিকে তারাবিবি তাকিয়ে দেখে আর ভাবে- ছেলের কাঁপানো কেশরাশি দ্যাখার জন্য তারাবিবি তার মুখের সমস্ত রেখা কুঁচকে মাথা উঁচু করলো। এ গল্পের আরেকটা অদ্ভুত দিক হচ্ছে পুরান ঢাকার একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনকে কত নিবিড়ভাবে তিনি ধাতস্থ করেছেন তা দেখা! এর ভাষাশৈলী বা গল্প বলে যাওয়ার ধরন কোনো মতবাদ অর্থাৎ ফ্রয়েড, ফুকো কিংবা জাঁ-পল সার্ত্র তৈরি করে দেননি। পুরান ঢাকার মানুষের নিগূঢ় জীবনের এক কথকতা হয়ে উঠেছে। এর জন্য কোনো তত্ত্বকথা দ্বারা আক্রান্ত হয়নি গল্পটি। গল্পটির ভাষা, গল্পের অন্তর্গত প্রবহমানতা, উপমার নিবিড়তা মানুষের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব থেকেই উঠে এসেছে। ‘পিতৃবিয়োগ’ এ গ্রন্থটির আরেকটি চমৎকার গল্প। এখানে ইকবাল তার মৃত বাবাকে আবিষ্কার করে দুইভাবে। তার বাবা তার এবং মামার বাড়ির লোকজনের কাছে অত্যন্ত কড়ামেজাজের লোক। কারও সাথে সহজে কথায় বলে না। আর পোস্টমাস্টার এই ভদ্রলোক নিজ কর্মস্থলে ছিলেন একেবারে দিলখোলা ভিন্ন মানুষ। গফুর পিওন থেকে শুরু করে এহসান ডাক্তার, হেড-মাস্টার, সাব-রেজিস্ট্রার, স্টেশন-মাস্টার, রেলওয়ের গার্ড সাহেব, দোকানঅলা সবাই তাকে খুব ভালোবাসে। তার মৃত্যুতে রীতিমতো শোকাহত, উদ্বিগ্ন, বিচলিত, হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। গোপালপুরে সুগার মিলে ছোটোখাটো চাকুরি করে ইকবাল। মিলের স্টাফ কোয়াটারেই থাকে। ‘পিতৃবিয়োগ’ নামের গল্পটি বাবার দ্বৈতচরিত্র অবলোকনেরই গল্প। ইকবাল শেষ পর্যন্ত বাবার কবর পর্যন্ত জিয়ারত না-করে মেজোমামাকে এসব দায়িত্ব দিয়ে কর্মস্থলে চলে যায়। আশরাফ আলীর দ্বৈতচরিত্র আঁকায় মারাত্মক মুনসিয়ানা দেখিয়েছেন গল্পকার। এতে ট্রাডিশনাল ধারণার প্রতি প্রতি-ভাবনাও জাগ্রত হয়।


জাল স্বপ্ন স্বপ্নের জাল গল্পগ্রন্থটি প্রকাশ পেয়েছে ইলিয়াসের মৃত্যুর ( ৪-০১-১৯৯৭) পর। এর প্রথম গল্প 'প্রেমের গপ্পো'- যা ইলিয়াসের গল্প বলার ধরন থেকে আলাদাই মনে হয়। মনে হয় ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’র মতো ভিন্ন আঙ্গিকে অন্য এক গল্প সাজালেন। প্রচুর উইট আর হিউমার ব্যবহার করা হযেছে এটিতে। জাহাঙ্গীর আর বুলার পারিবারিক বিভিন্ন কথকতার ভিতর জাহাঙ্গীরের কলেজ জীবনের নানাবিধ বানানো প্রেমের গল্পই এটির মূল উপজীব্য বিষয়। কখনও বড়োলোকের স্পোর্টস উইমেন, কখনও ট্রাফিকে চাকুরি করা মহিলা পুলিশ, কখনও-বা কলেজের অন্য কোনো ছাত্রী জাহাঙ্গীরের প্রেমিকা হয়ে যায়। এখানে বুলা আর জাহাঙ্গীরের রুচি আর সামাজিকবোধের পার্থক্য বেশ উপভোগ্য। বুলা মূলত মস্কোপন্থি বাম-রাজনীতিই করত। এরা পারিবারিকভাবে এ সাংস্কৃতিক ধারা বহন করে। তার বড়ো ভাই হাফিজ, মুশতাক, তাদের শিক্ষক সুনীলদা বিভিন্নভাবে এ ধারার জীবনপ্রবাহকে বয়ে বেড়ায় এবং এ-ধরনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে রীতিমতো উপভোগ করে এরা। মুশতাক ও বুলার গানের শিক্ষক সুনীলদার জটিল অসুখের সময় মুশতাক আর বুলার প্রেমজনিত সম্পর্ক বোঝা যায়। ইলিয়াসের গল্পপাঠে এত সহজিয়া, কৌতূকময় প্রকাশ আর কোনো গল্পে দেখা যায় না। ‘জাল স্বপ্ন স্বপ্নের জাল’ গল্পটি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার এক পরিপূর্ণ ভাবনা বলা যায়। একধরনের জাদুময়তা গল্পটিতে আছে। লালমিয়ার স্বপ্নবয়ানে গল্পটির শরীর ভরাট হয়। তার বন্ধু ইমামউদ্দিনের সাথে বন্ধুত্ব, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, মৃত্যুবরণ, লালমিয়ার সুবিধা অর্জন, বুলেটের নামকরণ, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী তার সুবিধাবাদী অবস্থান নিয়েই গল্পটি গড়ে উঠে। গল্পটিতে উপন্যাসের একটা আঙ্গিক সহজেই বোঝা যায়। গল্পটি পড়তে-পড়তে, এর সাথে একাত্ম হওয়ার ভিতরই এ ভাবনা স্পষ্ট হয় যে এটি মূলত একটা উপন্যাসের বীজ। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ইলিয়াসের অতি আকাঙ্ক্ষা, সেই আকাঙক্ষা দুমড়ে-মুচড়ে যেতে থাকার ক্রমধারাবাহিকতাই গল্পটিতে ফুটে ওঠে। গল্পপাঠে এও বোঝা যায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ইলিয়াসের মানসিক ভাঙচুর ছিল। তার ভাবনা, হতাশা, চরিত্রের জীবনবাদী তৃষ্ণা গল্পটিকে আলাদা ইমোশান দিয়েছে। এ গল্পগ্রন্থটিতে ‘রেইনকোট’ নামের চমৎকার আরেক গল্প আছে। এটিও মুক্তিযুদ্ধের গল্প। বৃষ্টিমুখর দিনের এক ভয়মিশ্রিত চমৎকার বর্ণনার ভিতর গল্প শুরু হলেও, জীবনযাপনের একটা সহজিয়া রূপ দেয়ার ভিতর পাকিস্তানি সোলজারদের প্রতি যে, ধীরে ধীরে ঘৃণা চিহ্নিত হতে থাকে এটিই গল্পটির মুল বিষয়। কলেজের অধ্যাপক নুরুল হুদা তার শ্যালক মিন্টুর রেইনকোট গায়ে চড়িয়ে কলেজের দিকে যান। রেইনকোটটি মুক্তিযুদ্ধের একটা প্রতীক হয়ে ওঠে। তার সমস্ত চেতনায় একজন মুক্তিযোদ্ধার ইন্সপিরেশন ভর করে। একসময় পাকিস্তানি আর্মিরা তাকে ধরে নিয়ে যায়। কিন্তু ওইটির ওম যেন তার শরীরে লেগেই আছে। একসময় তার শরীর এরই উত্তেজনায় কাঁপে। এই গ্রন্থটির আরেকটি অতি চমৎকার জীবনবাদী গল্প কান্না। আফাজ আলী কবরস্থানে গোর দেয়া, কবর জেয়ারত, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচর্চা, মৃত্যুদিবসে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান করে দেয়া ইত্যাদি কাজে ইমামতি করে। এই কবরে অন্য হুজুরের সাথে কাজের ব্যাপারে দ্বন্দ্বও আছে। আছে তার সহকারীর সাথে কাজের মিলমিশ করে চলার টেকনিক। গল্পটিতে কবরস্থানের এসব ব্যাপারে প্রচুর ডিটেইলিংয়ের কাজ আছে। অন্যান্য গল্পের মতোই ইলিয়াস এখানেও এসবে বেশ তৎপর। আফাজ আলীর গ্রাম থেকে মনুমিঞা খবর নিয়ে আসে যে হুজুরের ছেলের বেশ অসুখ- দাস্তের ফলে ছেলের মরণদশা। কিন্তু আফাজ আলী মাত্র ৫ দিন পরই শবে বরাত বলে বাড়ি যেতে গরিমসি করে। শেষ পর্যন্ত ওইদিনই বরিশালের গ্রামের বাড়ি পৌঁছলেও ছেলেকে আর পায়নি। কারণ একদিন আগেই সে মরে গেছে। দাফনেও শরীক হতে পারেনি সে। আবার ঢাকার কবরস্থানে ইমামতি করতে চলে আসে। অন্য লোকের ছেলের মৃতের জন্য দোয়ায় ঢুকে যায় তার নিজের ছেলে হাবিবুল্লার নাম। গল্পের একেবারে শেষদিকের বর্ণনাটি বেশ ট্রাজিক- আফাজ আলী প্রাণপণে মোনাজাতের মাঝেই এভাবে ডাকে ‘আল্লা, আল্লাগো! আল্লা।’ তার কান্নায় আল্লার নাম ভিজে চপচপে হয়ে যায়, ভিজতে ভিজতে এমনকি মুছে যাওয়ার হাল হলেও আফাজ আলী হাউমাউ করে কাঁদে।


তার কথাসাহিত্যচর্চার প্রস্তুতি টের পাওয়া যায় ‘বংশধর’, ‘তারাদের চোখ’, ‘অতন্দ্র’, ‘চিলেকোঠায়’ ইত্যাদি ছোটগল্পে। তবে এসব গল্পে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিও ক্রমশ উন্মোচিত হয়। ধীরে ধীরে প্রগতিশীল ধারণাকেই প্রকাশ করতে থাকেন তিনি। তবে ‘বংশধর’, ‘তারাদের চোখ’ নামের গল্পসমূহ তার অপরিপক্বতা স্পষ্ট করে। সেই সময়ের কিছু কিছু গল্প কমলকুমার প্রভাবিত। ‘স্বগতমৃত্যুর পটভূমি’, ‘নিঃশ্বাসে’ যে প্রবাদ ইত্যাদি গল্পে কমলকুমারীয় ভাষাভঙ্গি বেশ বোঝা যায়। তার প্রথমদিকের গল্পগুলোর ভিতর পরিচয় নামের গল্পটি বেশ দৃঢ়-স্পষ্ট এমনকি ইলিয়াসের স্টাইলে রীতিমতো একরোখা মনে হয়। তিনি কেন এ গল্পটি তার জীবদ্দশায় কোনো গল্পগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করলেন না তা বোঝা মুশকিল। নাকি মুক্তিযুদ্ধকালীন ইন্ডিয়ার সোলজারদের ভূমিকা প্রকাশের ব্যাপারে তার মনোভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হয়েছিল। তা কিন্তু তার জীবনযাপন বা বিভিন্ন লেখায় বোঝা যায়নি। চিলেকোঠায় নামের গল্পে তার মানসিক পরিপক্বতার ধরনটা বুঝিয়ে দিতে থাকেন। গল্পটিতে হাসান বাসে, রাস্তায় চলাফেরায় সহজাত প্রেমে শুরু। কিন্তু তার পরিণত পরিসমাপ্তি ঘটে একটা চিলেকোঠায়। এভাবেই ইলিয়াস তার বি¯তৃত ভাবনাকে পরিণতির দিকে নেয়ার প্রস্তুতি নেন। ঘটনা, প্রতিবেদনধর্মী বিষয়, গল্পগাঁথা সাজানোতে তার মনোমুগ্ধকর একটা পর্যায় ছিল এবং এই শব্দবিন্যাস অচিরেই একটা দৃষ্টিভঙ্গিজাত যথার্থ প্রগতিশীল রূপ পায়। ‘স্বগতমৃত্যুর পটভূমি’ নামের গল্পটির কথাই ধরা যাক- গল্পটিতে আমাদের পরিচিত ইলিয়াসের প্রায় কিছুই নেই। নিশ্বাসে যে প্রবাদ নামের গল্পটি এক অর্থে স্বগতমৃত্যুর পটভূমির এক্সটেনশন। এতে যত উপমা, রূপক এমনকি বিশেষণ ব্যবহার করেছেন, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র এঁকেছেন, পরিবেশ-মানসজগৎ সৃষ্টি করেছেন তার কোনো কিছুই ইলিয়াসের মনে করাটা মুশকিল। কমলকুমারের গল্প বিশেষ করে ‘কঙ্কাল এলইজি’, ‘বাগান কেয়ারি’ ইত্যাদি গল্পের প্রভাবের কথা-ই মনে পড়ে। একধরনের ছেলেমিও তখনকার লেখাজোখায় ছিল। বিশেষ করে গল্প রচনার শুরু থেকেই আলাদা স্বর, বাক্যগঠনের স্পৃহা, পরিণতির আকুতিই তাকে ভাবিয়ে রাখত হয়ত। অনেকের লেখায় যেমনটি হয়, অর্থাৎ গল্পচর্চার প্রথমদিকে একধরনের এলোমেলো ভাব তারও ছিল। এভাবেই ইলিয়াসের মানসজগতের পরিপূর্ণতার ধারাবাহিক রূপটিও স্পষ্ট হয়।


তার ভাষার ধরনটি কেমন! তা কি এতই ছাঁচাচোলা? কোনোই ভদ্রতার লেশ নাই। শ্রাবণের ঘনঘোর আকাশের জলপাত নেই, কিন্তু একেবারেই কী শুকনা? শিল্পবোধহীন চণ্ডালের ভাষা? তিনি কি শুধুই ভদ্রলোকদের রক্তাক্ত করেছেন? মায়া-দয়া রেখে গল্প তৈরি করেননি? এত সহজভাবে এ-সবের সমাধান করা যায় না। তার দেখার ভঙ্গিটি বাংলা সাহিত্যের রূপ-সুখ-যৌনতা জাগানিয়া নয়, কিন্তু তাই বলে মানুষের প্রতি তার ভালোবাসার কমতি নাই। এবং সেই মানুষ অবশ্যই অবহেলিত-নুয়ে পড়ে অতি সাধারণ মানুষ। তিনি সময়কে আঁকতে গিয়ে চোখ থেকে, ভাবনা থেকে, এমনকি স্মৃতি থেকে সমস্ত সুখ-জাগানিয়া ভাববাদী ব্যাপার ঝেরে ফেলেছেন। এখন কথা হচ্ছে, চারদিকে যেখানে স্বস্তিতে একটা দীর্ঘশ্বাস নেযারও স্বাধীনতা খর্ব হয়ে যাচ্ছে, জীবন কেবলই ছোট হয়ে যাচ্ছে সেখানে শিল্পের কথা বলে, সৌন্দর্যের কথা বলে, নন্দনতত্ত্বের সুকুমার চর্চার কথা বলা মানেই জীবনবোধের সাথে কম্প্রমাইজ করা। সেই কাজটি ইলিয়াস প্রায় কখনও করেননি। তিনি কেবলই নিজের মতো করে দৃষ্টিভঙ্গি নির্ণয় করে গেছেন। যার ফলে সনাতন কায়দাই ইলিয়াসকে দেখতে গেলে তেমন কিছুই পাওয়া যাবে না। তিনি উপমার জায়গাটি মানুষের দ্বন্দ্ববহুল জীবনযাপন দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছেন।


তিনি অনবরত মানুষের জীবনে মিশে থেকেছেন; অন্তত তার গল্পপাঠে মনে হয় যে লোকমানসই তার আরাধ্য। তবে তিনি এই বাস্তবতা এঁকেছেন অনেকটা নিঃসঙ্গ হয়ে- সত্যি বলতে কি, তার সহযাত্রী হিসাবে মানিক, জগদীশ, হাসান, কায়েস কিংবা ওয়ালীউল্লাহর নাম করা যায় না। কী দেশভাগ, কী দেশভাগপূর্ব সাহিত্য, কোনো দিক থেকে তিনি সরাসরি কারও সহযাত্রী ছিলেন, এ কথা বলা মুশকিল। তার চরিত্রসমূহের অবস্থান কিংবা সামাজিক-রাষ্ট্রীয় দ্বন্দ্ব অনবরত মানবপাঠের ফলশ্রুতিতেই উঠে এসেছে। এও বলতে হয়, তার গল্পের মানুষজন সমাজবাস্তবতার ফসল হলেও তার অবজার্ভেশন তার নিজস্বই।





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন