বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৫

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস-এর ডাইরি

ডিসেম্বর ১৯৯৭

আজ Elechi Amadi-র লেখা The Great Pondsপড়লাম। এ বৎসর থেকে আফ্রিকার উপন্যাস বেশ কয়েকটি পড়া হল। Chinuya Achebe-র
Things Fall Apart, No Longer at Ease এবং Man of the Peopole –এর পর Elichi Amadi-র এই বইটা।–এ কাহিনীর আকর্ষণ অসাধারণ। আধুনিক কথাসাহিত্যে এরকম টেনে নেওয়া সাধারণতঃ দেখা যায় না। পূর্ব নাইজিরিয়ার চিলো এবং আলকোরো এই দুটো গ্রামের মধ্যে Wagaba পুকুরের স্বত্ব নিয়ে গোলমাল। আলকোরোর স্বত্ব দাবি করে এবং এই নিয়ে অনেকদিন নানারকম হাঙ্গামার পর তৃতীয় গ্রামের মধ্যস্তায় স্থির হয় যে, যে কোনো গ্রামের যে কোনো একজন ব্যক্তি তার জীবন বাজি রেখে দীঘির মালিকানা নির্ধারণ করতে পারে। চিলোর বীর যোদ্ধা ওলেম্বা (Olemba) নিজের জীবন বাজি রাখতে এগিয়ে আসে। ছ’মাসের মধ্যে তার মৃত্যু হলে দীঘির মালিকানা লাভ করবে আলোকোরো গ্রাম।


প্রতিদ্বন্ধী গ্রাম কিন্তু তীর ছুঁড়ে বা ছুরিকাঘাত করে তাকে হত্যার কোনো চেষ্টা করে না। কিন্তু ওলেম্বা তাড়াতাড়ি বুঝতে পারে যে আলকোরোর অধিবাসীরা পুরোহিতদের (dibia) দিয়ে তাকে শেষ করার আয়োজন চালাচ্ছে। তাকে সাবধান হতে হবে। কিন্তু ওলেম্বার মতো মানুষের পক্ষে অতি সতর্ক জীবনযাপন শাস্তিবিশেষ। একদিন গাছে উঠতে গেলে ভিমরুলের আক্রমণে সে মাটিতে পড়ে আহত হয়। শক্তিশালী ও নিপুণ একজন dibia –র কল্যাণে সে সুস্থ হয় বটে কিন্তু কয়েক মাস নিষ্কর্ম, সতর্ক ও উদ্বিঘ্ন জীবনযাপন তাকে দুর্বল করে তোলে। এর মধ্যে তার পুত্রসন্তান আশ্চর্য এক রোগে আক্রান্ত হয়। ওলেম্বা আরো বিচলিত হয়ে পড়ে। এর রোগ গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রতিদিন কিছু না কিছু লোক এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মরতে শুরু করে। গ্রামবাসী ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। অনেকের মনে হয় ওলেম্বার জীবন বাজি রাখা বোধহয় রাত্রির দেবতা Ogbunabali-র মনঃপূত নয়। (এই) দেবতা খুব শক্তিশালী ও প্রতিশোধপরায়ণ।

কিন্তু আলকোরো গ্রামেও এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানকার হিরো Wago সকলের আড়ালে চিলো গ্রামে আসে এবং ওলেম্বার দুর্বল দেব ও বিচলিত মনোবল দেখে অধীর আগ্রহে তার মৃত্যুর জন্য প্রতীক্ষা করে। চিতা বাঘের শুকনো চামড়া গায়ে একদিন তাকে আক্রমণ করে। ওলেম্বার সঙ্গীর হাতে প্রহৃত হয়ে সে পালায়। পরে চিলো গ্রামের কয়েকজন Wagaba-র দীঘিতে তার মৃতদেহ আবিষ্কার করে। সে আত্মহত্যা করেছে।

ওলেম্বা তার নির্ধারিত সময় অতিক্রম করে। কিন্তু তার গ্রাম দীঘির পরমকাম্য স্বত্ব থেকে বঞ্চিত হয়, কারণ কোনো জলাধারে কেউ আত্মহত্যা করলে তার মাছ ধরা নিষিদ্ধ বিবেচিত হয়। Waga দীঘিতে আত্মহত্যা করায় অন্য গ্রামের নিরঙ্কুশ জয়ের আনন্দ নিষ্প্রভ হয়ে যায়।

এই বইতে আদিম আফ্রিকাকে স্পষ্ট অনুভব করা গেলো। দুই গ্রামের বিবাদ ও সংঘর্ষ এম ন নির্লিপ্ততার সঙ্গে বর্ণিত হয়েছে যে Iliiad-এর কথা খুব মনে পড়ে। আমার মনে হচ্ছে, সব জাতিরই মহাকাব্য থাকে। আফ্রিকানদের মহাকাব্য হয়তো সময়মতো লেখা হয়নি; The Great Ponds-এ অন্ততঃ নাইজিরিয়ার মহাকাব্য লেখার চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। পশ্চিম আফ্রিকান গ্রামের আদিম রহস্যময়তা, সংগ্রাম, দ্বন্দ্ব, সংস্কারাচ্ছন্নতা, পৌত্তলিক ভয় ও বিশ্বাস এতো বলিষ্ঠ ভঙ্গীতে উপস্থাপিত হয়েছে যে, এর তুলনা কোথাও পাওয়া যায় না। যাকে আমরা কুসংস্কার বলি, এখানে তাকে বলা হয়েছে জীবনের স্বাভাবিক অংশ, তাকে অস্বীকার করার মতো reformative attitude লেখকের নেই। পুরোহিতদের মন্ত্রপড়া, ঝাড়ফুঁক—এসব স্বাভাবিকভাবে নিয়ে আসা হয়েছে। পাঠককে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করা হয়েছে। কোনটা কাকতালীয়, কোনটা অলৌকিক, এসব লেখক কোথাও বলে দেননি। ভৌতিক আবহ মাঝে মাঝে আছে কিন্তু কোথাও বাড়াবাড়ি নেই, ফলে পাঠকের দ্বায়িত্ব বাড়ে বৈকি। এসবই খুব বড় শিল্পকর্মের লক্ষণ বলে মনে করি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন