বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৫

মোস্তাক আহমাদ দীন-এর প্রবন্ধ : সবুজ পত্র : শতবর্ষের বিবেচনা

রবীন্দ্রনাথের কোনো পাঠকেরই এখন আর অজানা নয় যে নোবেলপ্রাপ্তির পর তাঁর সৃষ্টিজগতে লক্ষযোগ্য পরিবর্তন আসে, তিনি লিখতে শুরু করলেন নতুন ধরনের গল্প-উপন্যাস আর তাতে নতুন-পুরাতন উভয় প্রকার পাঠকের মনে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় : তখন কেউ-কেউ উৎসাহী ও আনন্দিত; কেউ-কেউ অস্বস্থ ও অস্থির এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে (প্রতি)বাদমুখর--এই পরিপ্রেক্ষিতে সবুজ পত্র-এর জন্ম, বলা যায়, নতুন-সজীব বর্ণের/চিন্তার জন্য সবুজ পাতা। তার জন্মতারিখও রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে--১৩২১ সালের ২৫ বৈশাখে, নোবেলপ্রাপ্তির একবছর পরে, এবং সম্পাদক, ‘অনিবার্য’ভাবেই, প্রমথ চৌধুরী।
‘অনিবার্য’ শব্দটি এখানে একারণেই অপরিহার্য যে, অন্য কারও সম্পাদকত্বে সবুজ পত্র-এর প্রকাশ সম্ভব ছিল না, সম্ভব হলে পত্রিকাটির নাম থাকত ভিন্ন, হয়ত তার সম্পাদক থাকতেন মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় কিংবা অন্য কেউ।

বোঝাই যাচ্ছে সবুজ পত্র-এর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক শুধু অঙ্গাঙ্গী নয়, সম্পর্ক জন্ম-সূত্রেরও--এ-বিষয়ে প্রমথ চৌধুরী তাঁর আত্মকথায় তো স্পষ্ট করেই বলেছেন যে, তাঁর লেখা ‘অঙ্গীকার'’ না-করে সবুজ পত্রের কোনো সংখ্যাই বের হয়নি আর তাঁর সাহচর্য ছাড়া ছয় মাসও সবুজ পত্র চালাতে পারতেন না। পরবর্তীকালে ডালপালা বিস্তার করে রবীন্দ্রনাথ যেভাবে মহীরুহে পরিণত, তাতে এখন এই মন্তব্য অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক মনে হবে যে : সবুজ পত্র বের না হলে তাঁর সৃষ্টিশীলতা ব্যাহত হতো। অথচ একাধিক গবেষক ইতোমধ্যে দেখিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথও সময়ে-সময়ে, নানা কারণে হতাশ হয়েছেন; হতাশ হয়ে অনগ্রসর পাঠকসমাজ ও বিদূষকদের কারণে লেখা ছেড়ে দেওয়ার মতো চিন্তাও কখনো-কখনো তাঁকে আচ্ছন্ন করেছে, যার বিবরণ প্রমথ চৌধুরী দিয়েছিলেন ঘটনার দুই যুগ পরে লিখিত তাঁর আত্মকথায়, রবীন্দ্রনাথ তখনো জীবিত :

আমি আর মণিলাল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে শিলাইদহে পদ্মানদীর ওপর তাঁর বোটে একবার কিছুদিন থাকতে যাই। তিনি বিকালে চরে বেড়াতে যেতেন। এই বোটেতেই মণিলাালের কাছে শুনি যে, রবীন্দ্রনাথ বলেন যে আর লিখবেন না, তিনি ঢের লিখেছেন। তা শুনে আমি তাকে বলি যে, বহুলোক আপনার বয়সে কেবল লিখতে আরম্ভ করেছেন। তিনি বলেন যে, প্রমথ যদি একটা কাগজ বার করে, তা হলে আমি তাতে লিখতে রাজি আছি। আমি বললুম, আপনি যদি লেখেন তা হলে আমিও কাগজ বার করতে রাজি আছি। তিনি বললেন অন্য কোন কাগজে আমি লিখব না।১

রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি যা লিখতে চান তা প্রকাশ করা সহজ নয়, আর তা প্রকাশের জন্য একজন সম্পাদকের যে-সতর্ক বিবেচনা, রুচি ও গুণগ্রাহিতার দরকার, তেমন সম্পাদক পাওয়া কঠিন, সেই কারণে প্রমথ চৌধুরীর মতো সম্পাদকের দরকার। রবীন্দ্রনাথের এ-সিদ্ধান্ত যে যথার্থ ছিল, সবুজ পত্র-এর দশ বছরের সফল আয়ুষ্কালই তার বড় নজির। শুনতে কিছুটা অস্বাভাবিক লাগলেও এ-কথাটি অস্বীকার করা যায় না যে, একজন লেখকের গদ্য-শৈলী কী রকম হবে তা কিছুটা হলেও নির্ভর করে সেটি কোথায় এবং কার সম্পাদকত্বে গৃহীত ও মুদ্রিত হবে, তার উপর। এ-কথার প্রমাণ আছে প্রমথ চৌধুরীর আত্মকথায়ও : ‘মণিলাল রবীন্দ্রনাথকে বলে যে, আপনার সবুজ পত্রের লেখার সঙ্গে অন্য লেখার এত তফাত যে অন্য কোনো কাগজে আপনার লেখা দিলে আর তেমন সমাদর হবে না। রবীন্দ্রনাথ একথা সমর্থন করেন।’ সমর্র্থন করারই কথা। অবশ্য কোনো লেখা কোন ধরনের পাঠক পড়বেন বা কোথায় ছাপা হবে তা না জেনে যদি সেই লেখাটি লিখিত হয়, তাহলে সে-কথা আলাদা, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক কারণে পৃথিবীতে এমন ঘটনা খুব কমই ঘটে : পূর্বের কিছু-কিছু দর্শন ও ধর্ম-পুথি এভাবেই লিখিত হয়েছে অবশ্য--এবং এখনো যে কেউ লিখছেন না তা বলা যাবে না--কিন্তু সে-ক্ষেত্রেও তো কোনো উদ্দিষ্ট/কাল্পনিক পাঠক থাকে, আর পাঠক থাকলে সংগত কারণেই চলে আসে মাধ্যমের কথা এবং সেই সূত্রে বলন/লিখন পালটে-যাওয়ার প্রশ্ন। কথাগুলো যে-কোনো চিত্রশিল্পী বা চলচ্চিত্রীর ক্ষেত্রে অধিকতর প্রাসঙ্গিক, অর্থাৎ তিনি কীভাবে আঁকবেন বা তুলবেন তা নির্ভর করে ক্যানভাস কতটকু হবে এবং মাধ্যম কী হবে তার উপর। দেবেশ রায় ‘কেন যে লিখি!’ শিরোনামের লেখায় লেখার কারণ খুঁজতে গিয়ে তাঁর এক প্রতিবেশী চিত্রশিল্পীর কথার সূত্র ধরে বলেছিলেন ‘ফ্রেম পাওয়াটাই তো আসল। ফ্রেম পাওয়া গেলে আর লিখতে কতক্ষণ?’ এ-স্থানে পাঠকের মনে পড়তে পারে যে সবুজ পত্র (বৈশাখ, ১৩২১)-এর প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত ‘সবুজের অভিযান’ শীর্ষক রবীন্দ্রনাথের সেই কবিতাটির কথা :

ওরে নবীন, ও রে আমার কাঁচা!
ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ,
আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা!
রক্ত আলোর মদে মাতাল ভোরে
আজকে যে যা বলে বলুক তোরে!
সকল তর্ক হেলায় তুচ্ছ করে
পুচ্ছটি তোর উচ্চে তুলে নাচা!
আয় দুরন্ত, আয়রে আমার কাঁচা!

কথাটি সত্য যে সবুজ পত্র প্রকাশিত না হলে রবীন্দ্রনাথের এ-কবিতাটির জন্ম হতো না, কিন্তু তার চেয়েও বেশি সত্য হলো এ-কবিতার আকাক্সক্ষা কোনোভাবেই একটি সাময়িক পত্রের আকাক্সক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। জীবেন্দ্র সিংহ রায় ‘প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঘটনাচক্রের অন্তর্নিহিত ভাবাবর্তের অভিঘাতে’ বাঙালির ভিত্তিভূমি (ও জনজীবন) ধ্বসে-যাওয়ার কারণে এখানে যে-মানসিক সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা গিয়েছিল, সবুজ পত্র সেই ‘দায়‘ভার গ্রহণ করেছিল বলে যে মন্তব্য করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের কবিতায় তো সেই অবস্থা থেকে মুক্তির/জাগরণ-এর আকাক্সক্ষাই অভিব্যক্ত। কবিতা ছাড়াও রবীন্দ্রনাথের আরও গুরুত্বপূর্ণ দুটি লেখা ছাপা হয়েছিল প্রথম সংখ্যায়--একটি প্রবন্ধ : ‘বিবেচনা ও অবিবেচনা’, ‘অন্যটি গল্প : ’হালদার-গোষ্ঠী’--এই দুটি লেখায়ও রয়েছে আধমরাদের ‘ঘা’-মেরে-বাঁচানোর চেষ্টা, আরও স্পষ্ট করে বললে, এতে রয়েছে স্ব-সমাজের সমালোচনা এবং জাগরণ-সম্ভাবনার ইঙ্গিত। প্রবন্ধে তিনি বলেছেন, আমাদের সমাজ মানুষকে নিয়ে প্রকাণ্ড পুতুলবাজির কারখানা খুলেছে, প্রাণীকে ‘এমন কলের পুতুল করিয়া তোলা জগতে আর-কোথায় ঘটিয়াছে?’ কিন্তু তিনি আশাবাদী--বলেন, যাদের মধ্যে প্রাণের প্রাচুর্য্য আছে তাদের সবদিক থেকে পিষে-ফেলার চেষ্টা করলেও সেই তেজ নষ্ট হয় না, তাই সমাজের অগ্রগতির জন্য চলার পদ্ধতির মধ্যে অবিবেচনার বেগ আর বিবেচনার সংযম দরকার, ‘তুমি শক্তিও চালাইয়ো না, বুদ্ধিও চালাইয়ো না, তুমি কেবলমাত্র ঘানি চালাও’ এই বিধান চলবে না। ‘হালদার-গোষ্ঠী’ গল্পেও রয়েছে সেই গোষ্ঠীর এক সদস্য বানোয়ারির গোষ্ঠীচেতনার বাইরে বেরিয়ে আসার গল্প। বানোয়ারির ছিল তিনটি শখ : কুস্তি, শিকার ও সংস্কৃতচর্চা; পালোয়ানের মতো চেহারা ছিল তাঁর, সে রাগ করলে ভয় পেয়ে যেত সবাই, তবে সেই জোয়ানের মনটা ছিল কোমল, তাঁর এই গুণের সহজ-স্বাভাবিক বিকাশের জন্য বাধা ছিল হালদার পরিবারের বহুদিনের রীতিনীতি ও হিসেবনিকেশ; রীতি-রক্ষার পক্ষে অন্যান্য সদস্যের ব্যাখ্যাও উপস্থাপন করেছেন রবীন্দ্রনাথ, যা পূর্বোক্ত প্রবন্ধের ‘বিবেচনা’-বোধের কথা মনে করিয়ে দেয়, আর ‘বানোয়ারি’র বৈশিষ্ট্যে রয়েছে সেই ‘অবিবেচনা’র আপাত-অসংগতিসহ সদর্থ চেতনার সমন্বয়।

প্রমথ চৌধুরীর মন্তব্য ও এই তিনটি লেখা থেকে মনে হওয়াই স্বাভাবিক যে সবুজ পত্র রবীন্দ্রনাথের মুখপত্র, অন্নদাশঙ্কর রায়ও নির্বাচিত সবুজ পত্র-এর ‘মুখবন্ধ’-এ উল্লেখ করেছেন ‘এক হিসেবে মুখপত্র’, ‘সম্পাদক হিসেবে প্রমথ চৌধুরী তাঁরই দ্বারা মনোনীত’, কিন্তু শেষপর্যন্ত অন্নদাশঙ্কর রায়ের অভিমত : ‘সবুজ পত্র এই দুই মনীষীর যুগ্ম কীর্তি’। প্রথম সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথের যেমন একাধিক লেখা ছাপা হয়েছে তেমনি নাম ও বেনাম মিলিয়ে একাধিক লেখা ছাপা হয় প্রমথ চৌধুরীর, এবং ভাব ও ভঙ্গির দিক দিয়ে পার্থক্য থাকলেও দু-জনের লেখার আন্তরিক সুর এক, আর তা হলো নতুন চেতনা সঞ্চারিত করবার আকাক্সক্ষা। এ-ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য তো তাঁর তিনটি লেখায়ই প্রকাশিত, আর প্রমথ চৌধুরীও শুরুতে জানিয়ে দিয়েছেন ‘একটা নূতন কিছু’ করার জন্য শুধু পত্রিকা প্রকাশ করেননি, ‘বাঙ্গালীর জীবনে যে নূতনত্ব এসে পড়েছে তাই পরিষ্কার করে প্রকাশ করবার জন্য’ সবুজ পত্র-এর প্রকাশ। এই ‘নূতনত্ব’ মানে শুধু নতুন-কিছু-করার হুজুগেপনা নয়, তার একটা ব্যাখ্যাও আছে তাঁর কাছে--বোঝা যায় এই ব্যাখ্যা সাধারণ কারও ব্যাখ্যা নয়, এই ব্যাখ্যার সঙ্গে রেনেসাঁসের একজন যোগ্য প্রতিনিধির ব্যাখ্যার সাদৃশ্যও রয়েছে। মানবেন্দ্রনাথ রায় ‘ভারতীয় রেনেসাঁস’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছিলেন অতীতের বিস্মৃত বৌদ্ধিক ও নান্দনিক সৃষ্টির পুনরুজ্জীবন জরুরি, কিন্তু তার জন্য আগে জানা দরকার কতটা সেই অতীত কতটা নশ্বর আর কতটা অবিনশ্বর; যা অবিনশ্বর, তাঁর মতে, অতীতের ধ্বংস¯তূপ থেকে তা পুনরুদ্ধার করতে হবে। প্রমথ চৌধুরী ‘মুখপত্র’ শিরোনামে এই কথাই বলেছিলেন যে, ইউরোপ থেকে আমরা তো এই অপূর্ব জ্ঞান লাভ করেছি যে, ভাবের বীজ যে দেশ থেকেই আনা হোক, দেশের মাটিতেই তা রোপন করতে হবে--তিনি লেখেন : ‘আমাদের এই নবশিক্ষাই, ভারতের অতিবিস্তৃত অতীতের মধ্যে আমাদের এই নবভাবের চর্চ্চার উপযুক্ত ক্ষেত্র চিনে নিতে শিখিয়েছে।’ বলা নি®প্রয়োজন, সবুজ পত্র এই চিন্তা বাস্তবায়নের জন্যই দশ বছর ধরে প্রত্যক্ষ লড়াই করেছে, তার অনুসারীরা এর পরেও পরোক্ষভাবে লড়াই করেছেন এবং তার প্রাসঙ্গিতা এখনো শেষ হয়ে যায়নি।

সবুজ পত্র তার এই লক্ষ্য নিয়ে প্রকাশিত হয় সব মিলে ১০৮ টি সংখ্যা, এতে মুদ্রিত হয় ১১৩ জন লেখকের ৩১৪টি প্রবন্ধ, ১১০টি কবিতা, ৩১টি নিবন্ধ, ৬টি সমালোচনা, ৩টি গান, ৮২টি গল্প, ৬টি নাটক ও ২টি উপন্যাস। মধ্যবর্তী বিরতির কথা বাদ দিলে টিকেছিল দশবছর এবং সেই ‘একদশকে সংঘ ভেঙে যায়’। ‘সংঘ’ যে বললাম, তা ঠিকই তৈরি হয়েছিল, যাকে বলে সবুজ পত্র লেখক সংঘ/গোষ্ঠী তা তৈরি হতে পেরেছিল কি না সে-প্রশ্ন উঠেছে। বুদ্ধদেব বসু অবশ্য কয়েকজন লেখকের লেখায় সমধর্ম লক্ষ করে লিখেছেন, সবুজ পত্র-এ বিদ্রোহ, যুদ্ধ-ঘোষণা ও গোষ্ঠীগত সৌষম্য ছিল, যেখানে ‘সমধর্মীরা পরস্পরের মনের স্পর্শে বিকশিত হয়ে ওঠেন তাকেই বলে গোষ্ঠী। সেটা যখন ঘটে তখনই কোনো পত্রিকায় সবুজ-পত্রের মতো সুরের ঐক্য দেখা দেয়, চরিত্রের ওমন অখণ্ডতা, প্রকাশের ওমন প্রথামুক্ত মুক্ত নির্ভয় ভঙ্গী।...যে সংখ্যায় বহু লোকের লেখাও বেরিয়েছে, সেটিও রূপ নিয়েছে সম্পূর্ণ একটি রচনার; অর্থাৎ সেই বহুর মধ্যে দপ্তরির সুতো ছাড়াও আন্তরিক একটি সম্বন্ধ থেকে গেছে। এই অখণ্ডতা গোষ্ঠীসাপেক্ষ, গোষ্ঠী ছাড়া সাহিত্যপত্র হয় না।’ বুদ্ধদেব বসু অখণ্ডতার সূত্রে গোষ্ঠী বা সংঘের কথা যে বলেছেন, সেটি একদশকের এই পত্রিকার ক্ষেত্রে অসত্য নয়, কারণ প্রমথ চৌধুরী নিজেও বলেছেন, পত্রিকার প্রবন্ধগুলোতে যেন একটি আদর্শ থাকে সে-সম্পর্কে তিনি সবসময় চেষ্টা করে গেছেন, পত্রিকার সুনামও ছিল সে-কারণে। তবু একথা বলতে বাধ্য যে, এই সত্য আংশিক সত্য, পুরোপুরি সত্য নয়; পুরোটা সত্য হলে পত্রিকাটি দীর্ঘকাল বেঁচে থাকত। প্রমথ চৌধুরী তাঁর আত্মকথায় লিখেছিলেন :

এ কাগজ উপলক্ষ্য করে যে-সব যুবক কমলালয়ে আমার কাছে আসতেন, তার মধ্যে কিরণশঙ্কর রায় ও তার ভগ্নীপতি অতুলচন্দ্র গুপ্ত ছিলেন। আর ছিলেন ধূর্জটিপ্রসাদ মুখুজ্জে, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, প্রবোধচন্দ্র ও সুবোধচন্দ্র চাটুজ্জে, অমিয় চক্রবর্তী, বরদাচরণ গুপ্ত, হারীতকৃষ্ণ দেব, সুধীন্দ্রনাথ সিংহ, সতীশচন্দ্র ঘটক, মানিকচন্দ্র দে, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, সুরেশানন্দ ভট্টাচার্য, সোমনাথ মৈত্র প্রভৃতি। এঁরা সকলেই যে সবুজ পত্রে লিখতেন তা নয়, কিন্তু সকলেরই লেখাপড়ার দিকে মন ছিল। ফলে ভবিষ্যৎ জীবনে অনেকেই নাম করেছেন। অতুলচন্দ্র গুপ্ত ও ধূর্জটিপ্রসাদ লিখতেন ও আজও লিখছেন। সতীশ ঘটক লিখতেন, কিন্তু অকালে মারা গেলেন। বরদাগুপ্ত দুই একটি প্রবন্ধ লিখে আর লেখেননি। সুনীতি চাটুজ্জে তাঁর বিলেতের অনেক ভ্রমণবৃত্তান্ত এই কাগজে লিখেছিলেন। সে বিষয়ে তিনি আজও লিখছেন।

এর মধ্যে অনেকেই পরবর্তীকালে লেখার ক্ষেত্রে স্মরণযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন, কিন্তু সেই সময় অর্থাৎ সবুজ পত্র প্রকাশকালে পত্রিকা দীর্ঘস্থায়ী করার মতো সক্রিয় তারা ছিলেন না। এমনিতে কাগজটির লেখকসংখ্যা ছিল কম, তার উপর অধিকাংশ লেখকই নতুন, তাই লেখক-বলের অভাবে পত্রিকাটি অনিয়মিত হয়ে যায়; আর এই লেখক-বল থাকলে হয়ত আর্ধিক দৈন্য সত্ত্বেও, পত্রিকাটি আরও দীর্ঘদিন বেঁচে থাকত। পত্রিকার সূচির দিকে লক্ষ করলেই বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ চৌধুরী ছাড়া নিয়মিত লেখক বলতে আর কাউকে ধরা যায় না। এই কারণে প্রমথ চৌধুরীর সুযোগ্য শিষ্য এবং সবুজ পত্র-এ প্রকাশিত কয়েকটি লেখার লেখক হারীতকৃষ্ণ দেব উল্লেখ করেন যে, চারদিক থেকে এই অভিযোগ উঠেছিল পত্রিকার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে, কারণ অধিকাংশ লেখাই রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ চৌধুরীর, ততদিনে বীরবল ও ভূপেন্দ্র মৈত্রও যে আসলে প্রমথ চৌধুরীরই অন্য নাম, তাও জানা হয়ে গেছে সবার।২ কিন্তু কেন এমনটি হয়েছে? রবীন্দ্রনাথ নিজেও তো কোনোভাবে চাননি যে শুধু সম্পাদক ও তাঁর লেখায় ভরে উঠুক পত্রিকা, তিনি মনে করতেন জাগরণের জন্য নতুন শক্তির দরকার, তিনি এও মনে করতেন যে, তাঁর ‘সাহিত্যলীলা’ শেষ হয়ে আসছে, গাণ্ডীব তোলার শক্তি কমে গেছে, ফলে চিঠিতে প্রমথ চৌধুরীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন : ‘আরো লেখক চাই। লেখা-সৃষ্টির দ্বারাই লেখককে টানা যায়, কিন্তু এখনো বেশি দূর পর্যন্ত সবুজ-পত্রের টান পৌঁচচ্ছে না। নবীন লেখকেরা সবুজ-পত্রের আদর্শকে ভয় পায়--তাদের একটু অভয় দিয়ে দলে টেনে নিয়ো, ক্রমে তাদের বিকাশ হবে।’ বোঝাই যাচ্ছে লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রমথ চৌধুরীর কিছু অলিখিত শর্ত ছিল, সম্পাদকীয়তে বা সম্পাদকের তরফে ভিন্ন শিরোনামে লিখিত রচনায় সে-বিষয়ে উচ্চবাচ্য না থাকলেও, সংক্ষিপ্ত সূচি ও লেখা নির্বাচনের ভঙ্গিতে এমন কিছু উচ্চম্মন্যতা ছিল যা রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি এড়ায়নি; সে-কারণে, একাধিক চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ প্রমথ চৌধুরীকে আরেকটু সহিষ্ণু হওয়ার কথা বলেছিলেন, বলেছিলেন লিখতে-লিখতে তরুণদের দুর্বলতা কাটবে। তারপরও মনে হয় না প্রমথ চৌধুরী তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হয়ে এসেছিলেন। যে-হারীতকৃষ্ণ দেবকে ‘সমজদার’ বলে গুরুত্ব দিতেন প্রমথ চৌধুরী, সবুজ পত্র ও কমলালয়ের আড্ডায় যার নিয়মিত অংশগ্রহণ আশা করতেন, যার মননশীলতা বিষয়ে আশাবাদী ছিলেন, তাঁর একটি লেখা প্রকাশের আগে তিনি যে-ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন তা লক্ষ করলে সম্পাদকীয় রুচি বা মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যাবে। হারীতকৃষ্ণ দেবের ‘টী-পার্টি’ রচনা, যেটি ১৩২৪ সালের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় ছাপা হবে, সেটি প্রকাশের আগে হাতে পেয়ে, ০৪. ০৪. ১৯১৭ তারিখে লিখিত চিঠিতে সে-সম্পর্কে যা লিখেছিলেন তার প্রাসঙ্গিক অংশ নিচে উল্লেখ করছি :

তোমার লেখাটা দেখেছি,--এবার লেখাটা তেমন ংসধৎঃ হয়নি। আমার বিশ্বাস যে, আমি সেটাকে মেজে ঘষে কতকটা ঝকঝকে করে তুলতে পারি, কিন্তু তাহলে ওটি কতকটা আমার হাতগড়া জিনিস হয়ে উঠবে। সুতরাং আমি চাই যে, তুমিই ওটিকে ফের হাতে নিয়ে নতুন করে গড়ে তোলো। তোমার সঙ্গে দেখা হলে আমি তোমাকে বলে দিতে পারতুম যে, কি করলে তোমার ফরধষড়মঁবটি চটকদার হয়। ...কাল বিকেলে অবশ্য আমি বাড়ি থাকব। যদি পারো ত সন্ধের দিকে দিকে একবার এলে ভাল হয়। নইলে পরশু তোমার লেখাটি ডাকে তোমার কাছে পাঠিয়ে দেব--তারপর তুমি সেটিকে বদলে সদলে ফের আমাকে দেখতে দিয়ো।

এরপর, ২৩. ০৫. ১৯১৭ তারিখের চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘‘তোমার ‘টী-পার্টি’ যে ছাপাব না তা একথা ত বলিনি। তবে আমার মতে লেখাটা একটু ‘চান্কে’ নিলে ভালো হত। কিন্তু তুমি নিজে যখন সে কাজ করতে রাজী হলে না, তখন যেমন আছে তেমন ছাপাব’’। হারীতকৃষ্ণ নিজেও উল্লেখ করেছেন, তিনি ডায়ালগ ‘চটকদার’ করার প্রস্তাবে প্রথমে রাজি হননি, সে-প্রসঙ্গে চিঠির পর চিঠি লিখেছেন তাঁকে, প্রমথ চৌধুরীও তার জবাবে একাধিক চিঠি লিখেছেন, (সেই প্রবন্ধের সূত্র ধরে আর্ট বিষয়ে অনেক কথাও বলেছেন) সেই পত্রাপত্রিতে কেউ কাউকে ছোট করেননি। ২৩. ০৪. ১৯১৭ তারিখের চিঠিতে প্রমথ চৌধুরী লিখেছেন, ‘নিজের উপর কতকটা ভরসা না থাকলে লেখক হওয়া শক্ত, এবং তোমার মনে যে ভরসা আছে এর পরিচয় পেয়ে খুশি হলুম।’ এবং সেই প্রসঙ্গে, ০১. ০৫. ১৯১৭ তারিখের চিঠিতে এও লিখেছেন যে, ‘যত শী¹গ্রি পারো তোমার নতুন লেখাটি পাঠিয়ে দিও’, ‘...তোমরাই হচ্ছ সবুজ পত্রের ভরসাস্থল’। ভরসার কথা বলা সত্ত্বেও, এই মন্তব্য না-করে উপায় নেই যে, প্রমথ চৌধুরী সবুজ পত্র-এর নানা লেখায়, নানা বিষয়ে অনেক পরোক্ষ পরামর্শ দেওয়ার পরও চিঠিতে সরাসরি যে-উপদেশ দিতেন তা সবুজ পত্র-এর লেখকদের পীড়িত করত কি না, এ যেমন একটি প্রশ্ন, তেমনি তাঁর এই মনোভাবই যে সবুজ পত্রকে লেখক-সংখ্যা কমিয়ে পত্রিকাকে ক্ষণস্থায়ী করেনি তা-ই বা অস্বীকার করব কীভাবে। এমনিতে অবশ্য নানা তথ্যে জানা যায়, তিনি বারবার লেখকদের আহ্বান করেছেন, হারীতকৃষ্ণ দেবের মাধ্যমে তো এও জানা যায় যে, সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে দিয়ে বাংলা ভাষায় লেখানোর আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেছেন একাধিক চিঠিতে; তিনি লেখাতে পেরেছিলেন এস. ওয়াজেদ আলীকেও, কিন্তু এরপরও এ-কথা অস্বীকার করবার উপায় নেই যে, তিনি পত্রিকাকে যে-প্রস্তরকঠিন ভাবমূর্তিতে দাঁড় করিয়েছিলেন, তাতে আরও অনেক লেখক তার প্রতি আগ্রহী হলেও শেষপর্যন্ত লেখা পাঠানোর মতো ভরসা পাননি।

কিন্তু এইসবের মধ্যেও পত্রিকাটি তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে নানা ভাবে যে-ইতিহাস রচনা করে চলছিল, সেই সময়ের লেখক ও পাঠকেরা তার কতোটা আন্দাজ করতে পেরেছিলেন জানি না, কিন্তু পত্রিকার সবুজ তারুণ্যের অংশিদার হওয়ার আকাক্সক্ষা যে অনেকেই মনে-মনে লালন করতেন তার প্রমাণ রয়েছে পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের স্মৃতিকথায়। সবুজ পত্র তার সমকালে সামাজিক মর্যাদায় এতটা উচ্চতায় উঠতে পেরেছিল যে, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার, যিনি ঠাকুর মার ঝুলির মতো একটি অসাধারণ গ্রন্থ লিখে বাঙালিদের মনপ্রাণ আলোড়িত করে ‘রূপকথা সম্রাট’ মর্যাদায় ভূষিত হয়েছিলেন, যে-বইটি পড়ে রবীন্দ্রনাথ এই বলে স্বাগত জানিয়েছিলেন যে--‘ঠাকুরমার ঝুলির মতো এত বড় স্বদেশী জিনিস আমাদের দেশে আর কি আছে?’...‘তাহার পাতাগুলি তেমনি সবুজ, তেমনি তাজাই রহিয়াছে’--তিনিও সবুজ পত্র-এ লেখা দিয়ে তা ছাপা না হওয়ার কারণে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন।২ আসলে কারও লেখা ছাপা না-ছাপার ক্ষেত্রে প্রমথ চৌধুরী তাঁর নিজের বিচার-বিবেচনাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন, এ-ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের প্রতি নিরঙ্কুশ শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও তাঁর মতও যে সবসময় গ্রহণ করেননি তার ইঙ্গিত প্রমথ চৌধুরীকে-লিখিত রবীন্দ্রনাথের চিঠিতে আছে। তাঁর এমন একাট্টা দৃষ্টিভঙ্গি সম্পাদক হিসেবে কিছুটা নঞর্থক বটে, কিন্তু এতে সদর্থকতাও কম নেই; এখন, শত বছর পরে এসে খোঁজ করলে তাঁর বিবেচনায় কিছু দুর্বলতা পাওয়া যেতে পারে হয়ত, কিন্তু আদর্শগত ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনাপস, অদ্বিতীয় ও দৃষ্টান্তযোগ্য। পাঠক হিসেবে সবুজ পত্র-এর প্রতি প্রীতিবশত তার (একদশকের) ক্ষণস্থায়িত্বের জন্য আমরা যে-ক্ষতির শিকার হয়েছি, তার জন্য আমরা সম্পাদকের প্রতি অভিমান বা অনুযোগ করতে পারি কিংবা ক্ষুব্ধও হতে পারি, কিন্তু মনে রাখতে হবে, সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপনহীন, অবাণিজ্যিক বিষয় ও নতুন-রীতিতে-লিখিত রচনা নিয়ে যে-পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়েছিল তার এমন পরিণতি যে হতে পারে, সে-বিষয়ে সম্পাদক নিঃসন্দেহ ছিলেন তা মনে করবার কোনো কারণ নেই। ফলে, সবুজ পত্র-এর যে-পরিণতি এবং তার শতবর্ষ শেষে একদশকের আয়ুষ্কালে যে-সাফল্য আজ আমাদের কাছে লক্ষ/লক্ষ্যযোগ্য বলে মনে হচ্ছে, মাননিক ক্ষেত্রে তার বঙ্গদর্শন ছাড়া আর কোনো পত্রিকা অর্জন করতে পেরেছে বলে মনে হয় না।

সবুজ পত্র-এর অর্জন প্রসঙ্গে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় রবীন্দ্রনাথের কথা : পত্রিকার জন্ম-সূত্র প্রসঙ্গে পূর্বে এ-প্রসঙ্গ আলোচিত না হলেও উচ্চারিত হয়েছে; এখানে পত্রিকা প্রকাশের জন্য রবীন্দ্রনাথ কেন ‘অস্থির’ হয়ে উঠেছিলেন তার ‘গুরুতর কারণ’ হিসেবে বিজিতকুমার দত্ত নির্বাচিত সবুজ পত্র-এর যে-প্রেক্ষাপটটি তুলে ধরেছিলেন, এখানে তার উল্লেখ করলে রবীন্দ্রনাথের নতুন সৃষ্টি ও চিন্তা প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে সবুজ পত্র-এর ভূমিকা স্পষ্ট হবে :

সেই সময়ের রাজনীতি, ধর্ম, সংস্কৃতি সাহিত্য ইত্যাদি চিন্তায় রবীন্দ্রবিরোধী হাওয়া বেশ জোরের সঙ্গে প্রবাহিত। বঙ্গবঙ্গের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশের মনীষীরা যেমন একজায়গায় মিলিত হতে পেরেছিলেন তেমনি এই উত্তেজনা যখন ধীরে ধীরে নেমে এল তখন দেখা গেল রবীন্দ্রনাথ যা চেয়েছিলেন সে দিকে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে না। বলা বাহুল্য রবীন্দ্রনাথ স্বরাজ অর্থে বুঝেছিলেন বিদেশের কূটনীতি, দেশের রাজনীতি দুই ভুল পথে। রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে দল বেঁধে নেমে পড়েছিলেন শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। বিপিনচন্দ্র পাল এমন কী দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশও রবীন্দ্রবিরোধিতায় উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

এই বিরোধিতার একাধিক কারণের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কারণ হলো, নোবেলপ্রাপ্তি উপলক্ষে শান্তিনিকেতনে আয়োজিত সংবর্ধনা-অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ-প্রদত্ত প্রতিভাষণ--সেখানে দেশবাসীর প্রতি ক্ষোভের প্রকাশ থাকায় উপস্থিত অতিথিগণ ক্ষুব্ধ হন, এবং সেইসময়কার সাহিত্যপত্রে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ হতে থাকে। অথচ সেদিনের সংবর্ধনা সভায় যেখানে সংবর্ধিতের প্রশস্তি লিখেছিলেন তাঁরই ঘনিষ্ঠজন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, উপস্থিত ছিলেন সুহৃদ জগদীশচন্দ্র বসু, তবু প্রতিভাষণে রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রতিভাষণে বললেন : ‘দেশের লোকের হাত থেকে যে অপযশ ও অপমান আমার ভাগ্যে পৌঁছেছে তার পরিমাণ নিতান্ত অল্প হয়নি, এবং এতকাল আমি তা নিঃশব্দে বহন করে এসেছি।’...‘আজ ইউরোপ আমাকে সম্মানের বরমাল্য দান করেছেন। তার যদি কোনো মূল্য থাকে তবে সে কেবল সেখানকার গুণীজনের রসবোধের মধ্যেই আছে। আমাদের দেশের সঙ্গে তার কোনো আন্তরিক সম্বন্ধ নেই। নোবেল প্রাইজের দ্বারা কোনো রচনার গুণ বা রস বৃদ্ধি করতে পারে না।’...‘আমি আপনাদের করজোড়ে জানাচ্ছি--যা সত্য তা কঠিন হলেও আমি মাথায় করে নেব, কিন্তু সাময়িক উত্তেজনার মায়া যা, তা স্বীকার করে নিতে আমি অক্ষম’।৩ বোঝাই যাচ্ছে এই বিরোধিতা নোবেলপ্রাপ্তির আগে থেকেই শুরু হয়েছিল এবং এতদিন তিনি তা সহ্য করে থাকলেও শেষপর্যন্ত তা মর্মান্তিক হয়ে উঠেছিল। রবীন্দ্র-বিরোধীদের তালিকায় দ্বিেেজন্দ্রলাল রায়, কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ, সুরেশচন্দ্র সমাজপতির নাম তো আছেই, এছাড়াও বিজিতকুমার দত্ত দল-বাঁধা বিরোধীদের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন বিপিনচন্দ্র পালের নামও, কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন শান্তিনিকেতনে প্রদত্ত প্রতিভাষণের কথা। কিন্তু এখানে উল্লেখ করা জরুরি, বিপিনচন্দ্র পাল তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামের লেখাটি লিখেছিলেন নোবেলপ্রাপ্তির দু-বছর আগে ১৯১১ সালে, আর সেই প্রবন্ধের শুরুও হয়েছিল ‘রবীন্দ্র-সম্বর্ধনা--এক দিক’ ও ‘রবীন্দ্র-সম্বর্ধনা--আরেক দিক’ উপশিরোনামের মধ্য দিয়ে, সেই সংবর্ধনা শান্তিনিকেতনের সংবর্ধনা নয়, সেটি তাঁকে দেওয়া হয়েছিল পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে, কলকাতার টাউন হলে। এই তথ্যগত ত্র“টির কারণেই হয়ত বিপিনচন্দ্র পালের লেখাটিতে কিছু প্রবণতাবিচারী মন্তব্য থাকা সত্ত্বেও, বস্তুতন্ত্রতার অভাব ও জনজীবন-বিচ্ছিন্নতার অভিযোগ তোলার কারণে রবীন্দ্র-ভক্তরা তার প্রতিবাদ করেন, আর বিপিনচন্দ্র পালকেও সেই প্রতিবাদের জের ধরে ‘সাহিত্যে বস্তুতন্ত্রতা’ নামক লেখায় লিখতে হয়--রবীন্দ্র-সাহিত্যে বস্তুতন্ত্রতার অভাব বলার কারণে তাকে ‘খাটো করা’ হয় না, কারণ ‘রবীন্দ্রনাথকে খাটো করিলে, ভারতীয় সাধনা ও বাঙালি জাতিকে’ খাটো করা হয়। কিন্তু এর পরও তার রেশ হয়নি, কারণ শান্তিনিকেতনে প্রদত্ত প্রতিভাষণের বিরোধীদের কণ্ঠের সঙ্গে তাঁর পঞ্চাশবছর পূর্তি উপলক্ষে প্রদত্ত সংবর্ধনা-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় উচ্চারিত সমালোচক-কণ্ঠ মিলে একাকার হয়ে গেছে। অবশ্য এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, যে-সকল পত্রিকায় রবীন্দ্র-বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয়েছিল সেই পত্রিকাগুলির সঙ্গেও তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগাযোগের ব্যাপারটিও এর পেছনে কম ভূমিকা রাখেনি। শুধু রবীন্দ্র-বিরোধিতাই নয়, এরপর সবুজ পত্র যখন বের হয় তখনো যে তিনি বিরোধিতায় সক্রিয় ছিলেন তার প্রমাণ প্রমথ চৌধুরীকে লিখিত রবীন্দ্রনাথের চিঠি : ‘বিপিন পাল এবং বিপিন পালের পালকবর্গ যে তোমার সবুজ পত্রের মাথা মুড়িয়ে খাবার চেষ্টা করবেন সে আমি জানতুম।’

বিপিনচন্দ্র পালের রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষ মত থাকলেও, দ্বিজেন্দ্রলাল যে রবীন্দ্র-বিরোধিতায় নেমেছিলেন, তা নিয়ে কারও দ্বিমত থাকবার কথা নয, কারণ ‘কাব্যের অভিব্যক্তি’ (প্রবাসী, ১৯০৬) ও ‘কাব্যে নীতি’ (সাহিত্য, ১৯০৯) প্রবন্ধ দুটিতে বলতে চাইলেন ‘রবীন্দ্রকাব্য অস্পষ্ট, ধোঁয়াটে ও স্ববিরোধী’ এবং ‘লালসা ও দুর্নীতিপূর্ণ’, আর চিত্রাঙ্গদাকে বলেছিলেন ‘অশ্লীল’; এছাড়া সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের ‘কেন যামিনী না যেতে জাগালে না’ গানটি সম্পর্কে এমন মন্তব্যও করলেন যে, ‘এ গানটা যদি গৃহস্থঘরের কোনো কুমারীর মুখে শোনা যায়, তাহা হইলে কি মনে করিতে হইবে?’৪

সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদকরূপে এবং দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের রবীন্দ্র-বিরোধিতার প্রশ্রয়দাতা হিসেবে সুরেশচন্দ্র সমাজপতির মনোভাব অস্পষ্ট থাকে না; তাছাড়া প্রমথ চৌধুরী সম্পর্কে হারীতকৃষ্ণ দেবের কাছে করা এক মন্তব্যে সমাজপতি বলেন ‘ওহে প্রমথ যে গুণী লোক তা অনেক দিন জানি। তবে রবিবাবুর পাল্লায় পড়ে ওর সব গুণ গোল্লায় যাচ্ছে।’ রবিবাবু সম্পর্কে এমন নির্বিচার মন্তব্যকারী সম্পর্কে নীরদচন্দ্র চৌধুরী লিখেছিলেন, তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দৌহিত্র ছিলেন বলে উত্তরাধিকারসূত্রে নিজেকে বাংলা সাহিত্যের অভিভাবকত্বের অধিকারী বলে মনে করতেন। নীরদচন্দ্র চৌধুরীর এক বন্ধু তাঁকে ‘এক সন্ধ্যায় তরল অবস্থায়’ রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন : ‘সত্যি কথাটা বলব? আমরা ভাবতাম সবাই বাংলা লিখছি, ইংরেজির ধার ধারিনে, সুতরাং সবাই এক। একদিন বুঝতে পারলুম যে, তা নয়, তিনি অনেক ওপরে। এটা সহ্য হল না।’

কালীপ্রসন্নকে ‘কাব্যবিশারদ’ উপাধি কেন দেওয়া হয়েছিল জানি না, কিন্তু নিম্নোক্ত কবিতাটি পড়লে, অন্তত এই কবিতাটির জন্যই তার উপাধিভূষিত নামটি যে অমর হয়ে থাকবে তাতে সন্দেহ নেই :

আয় রে তোরা কে দেখবে যাবি,
ঠাকুরবাড়ির মস্ত কবি!!
হায় রে কপাল হায় রে অর্থ!
যার নাই তার সকল ব্যর্থ!

উড়িস্ নে রে পায়রা কবি
খোপের ভিতর থাক ঢাকা,
তোর বকম্বকম্ আর ফোঁসফোঁসানি
তাও কবিত্বের ভাবমাখা।
তাও ছাপালি গ্রন্থ হল
নগদ মূল্য এক টাকা !!

এই দৃষ্টান্তের পরও তাকে ‘সর্বাপেক্ষা নীচ এবং নিষ্ঠুর’ বলে অভিহিত করা সত্ত্বেও নীরদচন্দ্র চৌধুরী শুধু তাকেই দোষ দিতে রাজি নন, তাঁর মতে, তিনি একশ্রেণির বাঙালির নেতা ও মুখপাত্র, তার পরিচয় তুলে ধরতে হলে সেই শ্রেণির পরিচয় তুলে ধরা জরুরি, তাঁর মতে, এরা সেই রকম বাঙালি যারা লেখাপড়া জানলেও ইংরেজি কম জানত, যারা বিশ্বাসে ও আচরণে গোঁড়া হিন্দু, তাদের মনে ছিল নির্বিচার ইংরেজ-বিদ্বেষ এবং এরা সংখ্যায় গরিষ্ঠ; এদের সকলের মধ্যে ‘রবীন্দ্রনাথের উপর একটা অযৌক্তিক সংস্কারপ্রসূত বিদ্বেষ ছিল। উহার মূলে ছিল অতি সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবোধ।’ এই সব প্রতিক্রিয়ার কথা মনে রাখলে রবীন্দ্রনাথের পূর্বোক্ত প্রতিভাষণের রুঢ়তার কারণ যেমন খুঁজে পাওয়া যায়, তেমনি সাময়িকপত্র ও অসূয়াপর সমালোচকদের বিরোধিতার কারণে রবীন্দ্রনাথের না-লেখার সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাস্তবতাও বোঝা যায়।

এই বাস্তবতার কথা মাথায় রাখলে সবুজ পত্র প্রকাশের বাস্তবতাও বোঝা যাবে, কারণ এই পত্রিকাটি প্রকাশের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথকে না-লেখার সিদ্ধান্ত থেকে ফিরিয়ে আনেন প্রমথ চৌধুরী; সবুজ পত্র-এর অন্য সব অর্জনের কথা বাদ দিয়ে দিলেও শুধু এই একটি কারণেই এই পত্রিকাটির কাছে বিশ্ববাসীর--বিশেষত বাঙালির--ঋণ কোনোদিন পরিশোধ হওয়ার নয়। কারণ, এরপর এই পত্রিকায়ই তিনি লিখতে শুরু করলেন নতুন ধরনের কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ এবং উপন্যাস এবং তাঁর অধিকাংশ লেখায়ই সবুজ পত্র-এরই সেই সজীব আদর্শ : ঘরে বাইরে উপন্যাসের নিখিলেশের বক্তব্যের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ও সবুজ পত্র-এর বক্তব্য একাত্ম, আর অন্য উপন্যাস চতুরঙ্গ-এর নাস্তিক জ্যাঠামশাইয়ের মুখ দিয়ে যখন তিনি বলান যে, ‘আমার এই চামার মুসলমান দেবতা’, তখন বোঝা যায় সবুজ পত্রের নতুন চিন্তার সঙ্গে এই সকল উদার ও অগ্রণী চিন্তার মিল কতখানি।

রবীন্দ্রনাথের কারণে সবুজ পত্র-এর কাছে বাঙালির ঋণ যেমন অশেষ, তেমনি সম্পাদক হওয়া সত্ত্বেও, প্রমথ চৌধুরীর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বুদ্ধদেব বসু অবশ্য তাঁর সাহিত্যপত্র প্রবন্ধে প্রমথ চৌধুরীকে সবুজ পত্র-এর প্রথম দান হিসেবে উল্লেখ করেছেন আর বলেছেন তাঁর আত্মপ্রকাশের জন্য এই পত্রিকার প্রয়োজন ছিল। তাঁর প্রথম কথাটির পেছনে কিছু যুক্তি আছে, কিন্তু তাঁর আত্মপ্রকাশের জন্য সবুজ পত্র-এর প্রয়োজনীয়তার কথাটি মানা যায় না, তবে স্বতঃস্ফূর্তি ও আত্মবিস্তারের তার দরকার ছিল, কারণ পত্রিকার সম্পাদক হওয়ায় তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে এমন-এমন বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছিলেন যা সেই সময় অন্য পত্রিকায় লেখার সুযোগ ছিল না। আর তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল সবুজ পত্র-যুগের আগেই এবং তখনি নানা বিষয়ে প্রবন্ধ লিখে পাঠককে আকৃষ্ট করেছিলেন, সেই সময়ের ‘জয়দেব’, ‘হালখাতা’, ‘কথার কথা’, ‘আমরা ও তোমরা’, ‘তেল নুন লক্ড়ি’, ‘মলাটসমালোচনা’, ‘তরজমা’, ‘বইয়ের ব্যবসা’, ‘সনেট কেন চতুর্দশপদী?’, ‘নোবেলপ্রাইজ’ প্রভৃতি প্রবন্ধগুলোও তার ভাষা ও বিষয়ের জন্য বিদ্বৎসমাজে আদৃত হয়েছে, কিন্তু সবুজ পত্র-এ তিনি লিখলেন ‘রায়তের কথা’ ও ‘অনু-হিন্দুস্থান’-এর মতো অনবদ্য রচনা। সেই সব প্রবন্ধের নানা পক্ষ-বিপক্ষ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে সেইসময়কার লেখায়, এই সব মিলে তাঁর প্রবন্ধসমূহ বাংলা গদ্যের প্রকাশসামর্থ্যরে সীমানা বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু তাঁর এই অবদান যেহেতু সবুজ পত্র-যুগের আগের-পরের মিলিত দৃষ্টান্ত, তাই পত্রিকা প্রকাশের একবছর পর থেকে তিনি যে গল্প লেখা শুরু করলেন তার কৃতিত্ব পুরোটাই সবুজ পত্র-এর :

গল্প-রচনার যে-প্রতিভা যে তাঁর আছে এ ধারণা প্রমথ চৌধুরীর নিজেরই ছিলো না, পরে শুভানুধ্যায়ীদের কাছে উৎসাহ পেয়েই (রবীন্দ্রনাথ তাঁকে যে গল্প লিখতে উৎসাহিত করেছিলেন--একথা তাঁর এক পত্র থেকে জানা যায়) তিনি ‘সবুজ-পত্রে’ গল্প লিখতে শুরু করেন। সে যাই হোক্, গল্প-লেখক প্রমথ চৌধুরীকে আবিষ্কার ও প্রতিষ্ঠিত করার কৃতিত্ব প্রধানতঃ ‘সবুজ-পত্রের’ প্রাপ্য।

প্রাবন্ধিক হিসেবে প্রমথ চৌধুরীর বিশেষ ভাবমূর্তি দাঁড়িয়ে যাওয়ার পরও তাঁর গল্পগুলো অনেক বিদগ্ধ পাঠক-সমালোচককে যে আকৃষ্ট করেছিল তাঁর প্রমাণ ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘প্রমথ চৌধুরীর গল্প’ শীর্ষক মূল্যায়ন। ধূর্জটিপ্রসাদের আলোচনাটি ছাপা হয় পরিচয় পত্রিকার বৈশাখ, ১৩৪৮ সংখ্যায়, সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে গল্পগুলো লিখিত ও প্রকাশিত হওয়ার অনেকদিন পর তিনি সেগুলো আবার পড়ে আশ্চর্যান্বিত হয়ে উল্লেখ করছেন, প্রমথ চৌধুরীর গল্পের কৌশল সেই ধরনের, পুনঃপরিচয়ে যার আনন্দ চক্রবৃদ্ধির হারে বাড়ে; তাঁর বিশ্বাস, গল্পকারের পদমর্যাদা ক্রমশ বাড়বে, এবং তিনি গল্পগুলো পড়ে এতটাই আশাবাদী হয়েছিলেন যে, লিখছেন : ‘গল্প লেখার ও পড়ার নেশা ও তাগিদ যতদিন বাংলাদেশে থাকবে, ততদিন প্রমথ বাবুর দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া গতি নেই মনে হয়’। কিন্তু বাংলা গল্পের ধারায় প্রমথ চৌধুরীর গল্পকার সত্তা তাঁর প্রাবন্ধিক-পরিচয়ের খ্যাতিতে যেভাবে ঢাকা পড়ে গেছে তাতে ধূর্জটির আশাবাদ ফলেছে বলে মনে হয় না। তবে গল্প-প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি তাঁর ভাষা-ভঙ্গি সম্পর্কে যে-কথাগুলি বলেছেন তা প্রমথ চৌধুরী গদ্যরীতি বিষয়েও মূল্যবান। তাঁর মতে, বীরবলী ভাষা প্রমথ চৌধুরীর ‘প্রযুক্ত চৈতন্য’, সে-ভাষা নিয়ে গালাগালি প্রচুর হলেও আলোচনা হয়েছে অল্প, কিন্তু শেষপর্যন্ত তা যে স্বীকৃত হয়েছে সেটিই যথেষ্ট--তাঁর মতে--এই ভাষা প্রবন্ধের জন্য উপযোগী আর গল্পের জন্য অনিবার্য--লিখেছেন : ‘ভাষা যদি অযথা বিশেষণে, উপসর্গ ও কৃ ধাতুর নাগপাশে আটকে যায় তবে গতি ও পরিণতি রুদ্ধ হতে বাধ্য। কি অদ্ভুত কৌশলে, অথচ কত সহজে কৃ ধাতুর ও অনাবশ্যক বিশেষণের ব্যবহার প্রমথবাবু পরিত্যাগ করেন দেখলে আশ্চর্য লাগে।’...‘বিশেষণ ত্যাগ তখনই সম্ভব যখন বিশেষ্য যথার্থ, ক্রিয়াপদ গতিদ্যোতক, এবং বাক্য অর্থবাহী। ভাষা, বিষয় ও লেখকের সংযম ও নির্বাচন-বুদ্ধির রাজঘোটকই আর্ট। যেমন প্রবন্ধে, তেমনই ছোট গল্পে প্রমথবাবু প্রকৃত আর্টিষ্ট।’ তাঁর ভাষা নিয়ে এমন সপ্রশংস উক্তি আছে সুধীন্দ্রনাথ দত্তেরও--তিনি স্পষ্ট করে লিখেছেন যে, তাঁর চলতি বাংলা আস্বাদন করতে হলে পাঠককে বহুভাষাবিদ এবং একাধিক বিষয়ে বিশেষ ব্যুৎপন্ন হতে হয়। আমাদের পাঠকসমাজের এমন গুণী পাঠক সবসময়ই সংখ্যালঘিষ্ঠ বলে যে-পত্রিকাটিতে তাঁর গল্প ও অধিকাংশ প্রবন্ধ ছাপা হয়, লেখাগুলির মতো সেই পত্রিকাটিও অজনপ্রিয় থেকে যায়।

এখানে, এইমাত্র, চলতি বাংলা বিষয়ে যে-কথা উঠল, তার প্রচার ও প্রসার বিষয়ে সবুজ পত্র-এর স্মরণযোগ্য অবদান সত্ত্বেও এ-প্রসঙ্গে এখনো যে পৃথকভাবে কোনো আলোচনা করা হয়নি তার কারণ এই অবদানের সঙ্গে অনেকাংশই যুক্ত রয়েছে প্রমথ চৌধুরীর নাম, এরপর সবুজ পত্র--রবীন্দ্রনাথ ও সবুজ পত্র-এর লেখকদের অবদান। একথা ঠিক যে প্রমথ চৌধুরী চলতি রীতিতে লিখিত গল্প সবুজ পত্র-এ প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু সেই রীতিতে লিখিত প্রবন্ধ সবুজ পত্র-এ যেমন প্রকাশিত হয়েছে তেমনি প্রকাশিত হয়েছে আগেও, সুতরাং এখানে একথা বলার সুযোগ আছে যে, এই লেখাগুলো সবুজ পত্র-এ প্রকাশিত না হলেও তিনি কোথাও-না-কোথাও ছাপতেন, কারণ তিনি যে এই রীতিতে লিখবেন সেটি সবুজ পত্র-যুগ বা তার নিকটসময়ের সিদ্ধান্ত নয়, সেই সিদ্ধান্ত তিনি আগেই গ্রহণ করেছিলেন। সবুজ পত্র প্রকাশের দুই বছর আগে ভারতীর পৌষ, ১৩১৯ সংখ্যায় ‘বঙ্গভাষা বনাম বাবু-বাংলা ওরফে সাধুভাষা’ এবং একই বছরের চৈত্র সংখ্যায় লিখেছিলেন ‘সাধুভাষা বনাম চলতি ভাষা’ প্রবন্ধ দুটি। প্রথম প্রবন্ধে রাজা রামমোহন রায়ের উল্লেখ করে লিখেছিলেন, সাধু ভাষা বিষয়ে রামমোহনের মত ছিল : সাধু সমাজের লোকেরা যে-ভাষায় কথা বলেন ও লেখেন তা-ই সাধু ভাষা, কিন্তু এখনকার মত দাঁড়িয়েছে যে-ভাষা সাধু সমাজ বলেনও না, শোনেনও না, সেই ভাষাই সাধু ভাষা, এবং সেই না-শোনা না-বলা ভাষায়ই তারা অভ্যস্ত। এখন তিনি, প্রমথ চৌধুরী, সেই ‘পরিশ্রমকাতর লেখকদের অভ্যস্ত আরামের ব্যাঘাত করতে উদ্যত’। এজন্য নানা আলোচনা ও প্রত্যালোচনার মাধ্যমে তিনি চলতি রীতির যে-রূপরেখা উপস্থাপনা করেন তার বীজ তিনি সংগ্রহ করেছেন অনেক আগে, কৃষ্ণনগর থেকে। তাঁর আত্মকথায় লিখেছিলেন, তাঁর ভাষার ‘বনেদ’ হলো সেকালের কৃষ্ণনাগরিক ভাষা, তাঁর মুখের কথা কিছু যদি বদলে গিয়ে থাকে তা কলকাতার প্রভাবে নয়, কৃষ্ণনগরের প্রভাবে; তাঁর মুখে ভাষা দিয়েছে কৃষ্ণনগর, সেই জায়গার ভাষাই তাঁর মূল পুঁজি--তাঁর মতে--যার গলায় সুর আছে, সে যখন গান করে তার সুর আপনাআপনি ‘বাঁকেচোরে আর ঘোরে’ তেমনি যার মুখের ভাষা ভালো, ভাষাকে সে বাঁকাতে-ঘুরাতে পারে, ‘ভাষার সেই স্থিতিস্থাপকতার সন্ধান কৃষ্ণনাগরিকরা জানতেন, এর নাম বাক্চাতুরী।’ বোঝাই যায়, প্রমথ চৌধুরীর লেখার যে-মুদ্রাগুণ, কেউ-কেউ যাকে মুদ্রাদোষ বলেও অভিহিত করেন, তার মূলে রয়েছে সেই সসময়কার কৃষ্ণনগরের ভাষা, তিনি তাঁর লেখায় তাকেই নির্বাচন করেছেন এবং তা সবুজ পত্র-যুগের আগে, লেখা শুরুর সময়কাল থেকেই, তাঁর লেখায় অনিবার্যভাবে যুক্ত। ফলে কোনোভাবেই চলতি রীতি প্রচার-প্রসারের ক্ষেত্রে এই পত্রিকার অবদানকে প্রধান করে দেখা যাবে না। এছাড়া পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় চলতি রীতিতে লেখার জন্য এমন কোনো নির্দেশ-পরামর্শ-উৎসাহ ছিল না, তাঁর লেখা ছাড়া রবীন্দ্রনাথের দুটি গদ্যের মাধ্যমও ছিল সাধুরীতি; দ্বিতীয় সংখ্যায় অবনীন্দ্রনাথের গদ্যও ছিল সাধুরীতির, এর পরেও অনেক দিন ধরে নানা সংখ্যায় সাধু-চলিত উভয় রীতিতে লিখিত হয়েছে গদ্য। অবশ্য প্রমথ চৌধুরী নিজে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ উভয়ভাবেই চাইতেন সব লেখকই চলিত রীতিতে লিখবেন, সেজন্য যারা সাধুরীতিতে লিখতেন বা মনে করতেন দুই রীতিতে লেখা চলতে পারে তাঁদের অন্বয় ও শব্দগত দুর্বলতা দেখিয়ে সমালোচনা করতেন কিন্তু সরাসরি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেন না। তবে এটা ঠিক যে, প্রমথ চৌধুরী শুরু থেকেই এককভাবে চলিত রীতির যে-উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন সবুজ পত্র-এ এসে সে-উদ্যোগ যৌথ উদ্যোগে পরিণত হয়ে একটা লড়াইয়ের রূপ নেয় এবং এর লেখকেরা তা বাস্তবায়নের জন্য সেই লড়াইয়ে শরিক হয়ে তার পক্ষে লিখেছেন, লিখে আক্রমণ ও বিদ্রƒপের শিকার হয়েছেন। সবুজ পত্র-এর তৃতীয় বর্ষ সপ্তম সংখ্যায় হারীতকৃষ্ণ দেব ‘বাংলা-সাহিত্যে বাংলা ভাষা’ প্রবন্ধে দেখাতে চেষ্টা করেছিলেন, প্রমথ চৌধুরীর ভাষা ভুঁইফোঁড় নয়, বাংলা গদ্যসাহিত্যের শুরু থেকেই তা ছিল--আরও বলেছিলেন--তিনি বাংলা থেকে ‘সংস্কৃত’ তাড়াতে উদ্যত হননি, বরং সংস্কৃতকে উচিত আদরে অভ্যর্থনা করছেন, আগে সংস্কৃতকে আলাদা আসন দেওয়া হত, এখন মুখের ভাষার সঙ্গে সস্কৃত শব্দ-ঝঞ্ঝনার সমন্বয়’ ঘটানো যাবে। এর প্রতিক্রিয়ায় সাহিত্য পত্রিকায় লিখিত হয়েছিল, ‘‘প্রমথ কি করিতেছেন--জানেন ঠিক যেন কোনও বখা ছোক্রা বুড়ো ঠাকুর দাদাকে গাঁজার আড্ডায় টানিয়া লইয়া গিয়া মজা করিতেছে! প্রমথর ‘উচিত আদরে’ ও কলিকাতা কক্নীর দরদে বুড়ো সংস্কৃত হাঁপাইয়া উঠিতেছে।’’ কিন্তু একথা তো ঠিক যে, শেষপর্যন্ত প্রমথ চৌধুরীরই জয় হয়েছে, এবং এই ক্ষেত্রে, তিনি সবুজ পত্রকে যেভাবে তাঁর মাধ্যম করেছেন, যে-দৃষ্টান্ত স্থাপন করে রবীন্দ্রনাথসহ অন্য লেখকদেরকেরও যে এই রীতির প্রতি আকৃষ্ট করেছেন, তার গুরুত্ব-বিচারে কৃতিত্ব সবুজ পত্র-এর প্রাপ্য। এ-প্রসঙ্গে একটি বিষয় আলোচনা হওয়া জরুরি যে, রবীন্দ্রনাথের চলিত রীতি গ্রহণ ও নির্বাচনের বিষয়ে নানা মাধ্যমে একটি তথ্য প্রচারিত হয়েছে, চলিত রীতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রমথ চৌধুরী রবীন্দ্রনাথকে প্রভাবিত করেছিলেন আর সেটিকে সবুজ পত্র-এর অর্জন বলেও বিবেচিত হয়। দেখতে পাচ্ছি এ-ব্যাপারে হারীতকৃষ্ণ দেবেরও সায় আছে। (সুরেশচন্দ্র সমাজপতির কটুক্তির সূত্র ধরে করা) প্রমথ চৌধুরীর ‘আমার যা কিছ গুণ দেখছ তা রবিবাবুর প্রসাদেই লাভ করেছি’ এই উক্তির উল্লেখ করে হারীতকৃষ্ণ উল্লেখ করেছিলেন, ‘‘এই উক্তির মূলে আছে তাঁর স্বাভাবিক বিনয়। আসলে রবিবাবু যেমন পদ্য-সম্রাট, প্রমথবাবু তেমনি গদ্য-সম্রাট। সবুজ পত্র বাংলা সাহিত্যে চলিত ভাষার প্রয়োগে যে-পথ নির্দেশ করেছিল, সে-পথে রবীন্দ্রনাথ চলেছিলেন প্রমথবাবুর অনুসরণে। এখানে ‘পুত্রাৎ শিষ্যাৎ পরাজয়ঃ’ বাক্যটি সার্থক হয়েছিল।’ এই ‘অনুসরণ’ মানে কী? ১৯১৪ সালের আগে রবীন্দ্রনাথ চলিত রীতিতে কোনো কিছুই কি লেখেননি? অন্যদেরকে-লেখা রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য চিঠির কথা না হয় বাদই থাকল, শুধু ছিন্নপত্রাবলীর কথাই যদি ধরি, ১৮৮৭ থেকে ১৮৯৫ সাল পর্যন্ত লিখিত চিঠিগুলোর প্রাঞ্জলতা ও প্রকাশসামর্থ্যরে যেন কোনো মূল্যই নেই! এটা ঠিক যে, সবুজ পত্র প্রকাশের পর থেকে পত্রসাহিত্য-বহির্ভুত গদ্যের মাধ্যম হিসেবে ক্রমশ চলিত রীতিকেই গ্রহণ করলেন রবীন্দ্রনাথ, কিন্তু সেই রীতির ক্রিয়াপদসহ সামান্যই গ্রহণ করলেন, আর-সব মুদ্রা অলংকার-বিশেষণ প্রয়োগের ভঙ্গি আগেকার মতোই রয়ে গিয়েছে। প্রমথ চৌধুরীর ‘বাকচাতুরী’, বচন-তৎপরতা, শব্দ-কথায় তৈরি খেলা, বিষয়কে নানা প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গে নানা ভাবে চুবিয়ে উপস্থাপন করার যে-রীতি তিনি আয়ত্ত করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ সে-পথের পথিক ছিলেন ছিলেন না, অনুসরণের তো; বরং দু-জনেই শেষমেশ একই রীতিতে লিখলেও যার যার দোষ/গুণ-এর মুদ্রা অক্ষুণ্ন রেখে সবুজ পত্রকে সমৃদ্ধ করেছেন।

চলিত রীতির প্রচার ও প্রসার বিষয়ে সবুজ পত্র-এর অবদান উল্লেখের পাশাপাশি লেখকদের সাহিত্যচিন্তাগত অবদানের কথাও সমানভাবে আলোচনার দাবি রাখে। কথাটি এজন্যই বলছি যে, অনেক আলোচকই সবুজ পত্র-এর লেখকদের চিন্তাগত নতুনত্বকে কম গুরুত্ব দিয়ে ভাষাগত দিকের উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করে থাকেন, এ-ক্ষেত্রে ভাষা ও সাহিত্যের তুল্যমূল্য বিচার করার চেয়ে এই দুই অবদানবে পরিপূরক হিসেবে দেখাটাই সংগত। এ-প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ চৌধুরীর পরে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, অতুলচন্দ্র গুপ্ত, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তীর, হারীতকৃষ্ণ দেব ও ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণীর কথা।

ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন সবুজ পত্র কিংবা প্রমথ চৌধুরীর মতোই অজনপ্রিয়, কিন্তু তাঁর ছিল পাণ্ডিত্য প্রশ্নাতীত। প্রমথ চৌধুরীর প্রেরণায় সবুজ পত্র-এ তাঁর জীবনের প্রথম বাংলা প্রবন্ধটি লেখেন ধূর্জটি, পরে তাঁর মননশীল প্রবন্ধসমূহ, ডায়েরি, তাঁর ত্রয়ী উপন্যাস অন্তঃশীলা বিদ্ধৎসমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লিখিত তাঁর ঞবমড়ৎব-অ-ঝঃঁফু বইটি সেকালে আলোচনা ও সিদ্ধান্তের দিক থেকে এতটাই উচ্চাকাক্সক্ষী ছিল যে, এর প্রকাশক বইটির গৌরচন্দ্রিকা/ভূমিকা পালন করার জন্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে অনুরোধ করেন। সত্যেন্দ্রনাথ বসু তাঁর ভূমিকার শুরুতেই জানিয়েছিলেন, এই বইটি বুঝতে গেলে এর লেখককে আগে বুঝতে হবে, তিনি আরও জানান, ধূর্জটি শুরুতে বিজ্ঞানের দিকে ঝুঁকলেও শেষপর্যন্ত ইতিহাস, অর্থ ও রাষ্টনীতির প্রতি আগ্রহী হয়েছিলেন, আর সুকুমার কলার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল অসীম এবং ‘তিনিই বোধ হয় আবিষ্কার করেন, রুশ, ফরাসী, জার্মান, নওরোজীয়ান ও অন্যান্য বিদেশী ভাষা থেকে অনূদিত সাহিত্য কলকাতায় পাওয়া যাচ্ছে। এবং সংগ্রহও করেছিলেন অনেক মহামূল্য ও দু®প্রাপ্য সাহিত্য চিত্রকলা ইতিহাস সমাজনীতির বই। আমরা তাঁর ভাণ্ডার থেকে অনেক সময় ধার করে উপকৃত ও লাভবান হয়েছি।’ তাঁর অপরিসীম জ্ঞান-তৃষ্ণা বিষয়ে তাঁর সুযোগ্য পুত্র সংগীতশাস্ত্রী কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়সহ আরো অনেকেই সবিস্তার লিখেছিলেন। এছাড়াও সংগীতচিন্তা গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথকে লিখিত তাঁর চিঠিগুলো পড়লে পাওয়া যাবে সংগীত-বিষয়ে পাণ্ডিত্যের পরিচয়। এরকম একজন লেখককের প্রথম বাংলা প্রবন্ধ যে সবুজ পত্র প্রকাশ করতে পেরেছিল তার কৃতিত্ব আসলে পত্রিকা ও তাঁর সম্পাদক প্রমথ চৌধুরীরই, এছাড়া বীরবলী গদ্যের প্রভাবও তাঁর লেখায় অস্পষ্ট নয়।

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় সবুজ পত্র-এ খুব বেশি লেখেননি, সেই কাগজে প্রকাশিত তাঁর ‘বিলেতের পত্র’ এবং ‘পত্র’ বিষয়ে প্রমথ চৌধুরী লিখেছেন ‘সুনীতির দেশের মাটি থেকে সরে গিয়ে পয়লা নম্বরেরর পত্রলেখক হয়ে উঠেছে। ...তার লেখার হাত দিন দিন খুলে যাচ্ছে--আর সে যত বিলেতের দিকে এগুচ্ছে তার ভাষা তত বাংলা হয়ে উঠছে।’ পরে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ভাষা সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়ে গবেষণার করে যে-শিখরে অবস্থান করছেন, তা যে-কোনো দেশ ও জাতির জন্য পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার। তাঁর এই অনপনেয় সাফল্যের কিছুটা কৃতিত্ব প্রমথ চৌধুরী ও সবুজ পত্রকেই দিতে হবে।

অতুলচন্দ্র গুপ্ত সম্পর্কে প্রমথ চৌধুরী তাঁর আত্মকথায় লিখেছেন : ‘অতুল বাবু লেখেন ভালো, কিন্তু বছরে একআধবারের বেশি নয়’, বোঝাই যাচ্ছে অতুল গুপ্ত লিখতেন কম, পেশায় ছিলেন আইনজীবী, কিন্তু বহু বিষয়ে আগ্রহী; এমনিতে আড্ডাপ্রিয় ছিলেন না, কিন্তু তাঁর লেখায় রসবোধ এবং মননশীলতার অপূর্ব সমন্বয় যে ঘটেছে তাঁর প্রমাণ পাওয়া যাবে তাঁর প্রবন্ধসংগ্রহ-এ। এই বইয়ের ভূমিকায় অতুল গুপ্তের সুযোগ্য পুত্র অভিজিৎ গুপ্ত লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর অবলম্বন আর পছন্দ করতেন ‘প্রমথ চৌধুরীর লেখার ঋজু অথচ বিধ্বংসী বিদ্রƒপ’, ব্যস্ততায় বা স্বভাবগত কারণে সবুজ পত্র-এর আড্ডায় অনিয়মিত থাকলেও, এই কাগজের প্রধান প্রবণতা ও সদ্গুণ তাঁর লেখায় ধারণ করেছিলেন।

বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু বাংলায় লিখতেন না বলে দুঃখ ও অভিমানবশত প্রমথ চৌধুরী লিখেছিলেন, ‘সত্যেন্দ্র সাদা কাগজের উপর কালো আঁচড় কাটেন না, বোধহয় তার কারণ তিনি কালো বোর্ডের উপর খড়ির সাদা আঁচড় কাটাটাই তাঁর স্বধর্ম বলে স্থির করে নিয়েছেন।’ তিনি সবুজ পত্র-এ কিছুই লেখেননি, কিন্তু হারীতকৃষ্ণ দেবের মতে, ‘‘তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান’ পত্রিকায় বীরবলের প্রিয় আদর্শ আজ প্রিয়দর্শন রূপ নিয়ে বসে আছে। সেদিক দিয়ে বলা যায় জ্ঞান ও বিজ্ঞান হচ্ছে সবুজ পত্রের উত্তরাধিকারী এবং প্রমথ চৌধুরীর স্মৃতিতর্পণ কার্যে সত্যেন বোসের পূর্ণ অধিকার।’’ পরবর্তী কালে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ থেকে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর বাংলা ভাষায় যে-রচনা সংকলনটি প্রকাশিত হলো, তার ‘প্রাক্-কথন’-এ লিখিত হয়েছে : ‘সুহৃদ হারীতকৃষ্ণ দেবের সাহচর্যে তিনি প্রমথ চৌধুরীর সবুজ পত্র-গোষ্ঠীর সঙ্গে পরিচিত হন এবং তাঁদের বৈঠকে নিয়মিত যোগদান করতেন। প্রমথ চৌধুরী বাংলাদেশে চলতি ভাষারীতি প্রচলন করেন, তা সত্যেন্দ্রনাথকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল এবং তাঁর নিজস্ব বাংলা রচনায় এই রীতির প্রভূত প্রভাব পড়েছিল।’

সবুজ পত্র-এর লেখকদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও প্রমথ চৌধুরীর মতো সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তীও একাধারে কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ লিখতেন এবং সবুজ পত্র-এ সর্বমোট তাঁর ৩৯টি লেখা মুদ্রিত হয়েছ। লেখার পরিমাণের দিক থেকে নয়, গুণগত দিক দিয়ে তাঁর লেখা পত্রিকাকে সমৃদ্ধ করেছিল এবং তাঁর এই যোগ্যতার কারণেই তিনি পত্রিকার সহ-সম্পাদনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। প্রমথ চৌধুরীর প্রভাব থাকা সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ এবং (স্টাইল-এর কারণে) অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁর লেখার প্রশংসা করেছেন।

সবুজ পত্র-এর লেখকদের তালিকায় হারীতকৃষ্ণ দেবের উপস্থিতি ছিল কম, কিন্তু তাঁর সবুজ পাতার ডাক বইটি পড়লে বোঝা যাবে কী নিবিড়ভাবে তিনি সবুজ পত্র ও সবুজ পত্রীদের কর্মকাণ্ড নিরীক্ষণ করেছিলেন। সবুজ পত্র ও ও তাঁর সম্পাদক প্রমথ চৌধুরীর প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও মূল্যায়নের সময় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সতর্ক ও নিরপেক্ষ। সবুজ পত্র-এর আড্ডা ও আলোচনার প্রকৃতিকে অবলম্বন করে লেখা কথোপকথনধর্মী ‘টী-পাটি’ রচনাটির মধ্যে তখনকার সবুজপত্রীর বৈঠকের নিখুঁত চিত্র পাওয়া। প্রমথ চৌধুরী এই লেখার কথোপকথনকে ‘চটকদার’ করার ইচ্ছা পোষণ করলেও তার দৃশ্যচিত্র নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেননি। আসলে তিনি ‘কমলালয়’-এর নিয়মিত আড্ডারু ছিলেন বলে পত্রিকার সদর-অন্দর উভয় মহলের হাড়ির খবর ছিল তাঁর জানা, সেই হিসেবে পরে তার ইতিহাস রচনা করে দায়িত্বওও পালন করেছেন। শুধু পর-কালের দায়িত্ব নয়, সম-কালেও যে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তাঁর পরিচয় রয়েছে ‘টী-পার্টি’ ছাড়াও ‘বাংলা-সাহিত্যে বাংলা ভাষা’ শীর্ষক প্রবন্ধে। সবুজ পত্র প্রকাশকালে তার লেখকদের, বিশেষত প্রমথ চৌধুরীর, চলিত গদ্যের ভাষা নিয়ে নেতিবাদী আলোচনা চলছিল, তখন এই প্রবন্ধে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নানা নজির হাজির করে প্রমথ চৌধুরীর গদ্যের পরম্পরা নির্দেশ করেন। এই সকল বিচারে সবুজ পত্র-এর অবদানের সঙ্গে হারীতকৃষ্ণ দেবের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীর লেখিকা-পরিচয়ের পেছনে পত্রিকা সবুজ পত্র, তাঁর স্বামী প্রমথ চৌধুরী ও পিতৃব্য রবীন্দ্রনাথের অবদান অস্বীকার করা মতো নয়, কিন্তু এরপরও মনে রাখতে হবে একজন সুলেখিকা হওয়ার মতো সবরকম গুণ ইন্দিরার ছিল। অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁর প্রবন্ধকে ‘স্বমহিমায় উজ্জ্বল’ ও ‘উজ্জ্বল মনীষা ও সহজ লিপিকুশলতার স্বাক্ষর’ বলে উল্লেখ করেছেন, আরও লিখেছেন ইন্দিরা নিয়মিত লিখলে তিনিই হতেন ‘আমাদের অগ্রগণ্য প্রবন্ধলেখিকা’। তাঁর সংগীতজ্ঞান, বিবিধ বিষয়ে পড়াশোনা এবং বহু ভাষায়--বিশেষত ফরাসিতে--ব্যুৎপত্তি তাঁর গদ্যকে সপ্রাণ ও প্রাঞ্জল করেছে। স্বীকার করতে হবে তাঁর গদ্যের বর্ণনায়, বাক্যের গঠনে বীরবলের ছায়া পড়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও তার লেখার ‘স্টাইল’ ছিল আকর্ষণীয়।

উপরিউক্ত লেখকগণ ছাড়াও সবুজ পত্র-এর অন্য লেখকরাও তাঁদের লেখার মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য এবং বিশেষত বাংলা গদ্যের সমৃদ্ধিতে অবদান রেখেছেন--এ-হলো প্রত্যক্ষ দৃষ্টান্তের কথা, এই সকল অবদানের পাশাপাশি আলোচনার দাবি রাখে অদৃশ্য-অলিখিত ও বিমূর্ত অবদানের কথাও। এখন বাংলা ভাষায় দু-একটি অনুল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম বাদ দিলে, কেউ গদ্য লিখতে গিয়ে সাধুরীতি না চলিত রীতি অবলম্বন কববেন এমন দোলাচলে পড়েন না, তার কারণ প্রমথ চৌধুরী ও সবুজ পত্র--একথার সপক্ষ পরিণাম উপস্থাপন করা সহজ, কিন্তু সকল ক্ষেত্রে কারণ উপস্থান করা কঠিন, কিন্তু তা-ই সত্য। শুধু ভাষার ব্যাপারেই নয়, নতুন বিষয়ের অবতারনায়, যে-কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক সৃষ্টিশীল উদ্যমে, সাহিত্যে শ্লীল-অশ্লীল-এর প্রশ্নে, পত্রিকার আকার-ওজন ও লেখার ক্ষুদ্র-বৃহৎ-এর কারণে মান-নির্ণয়ের স্থূল ধারণায়, লেখার মানের কথা ভেবে প্রয়োজনে এক লেখকের একাধিক লেখা নির্বাচনে এবং আপসহীন মনোভার অক্ষুণ্ন রাখার জন্যে বিজ্ঞাপন-ঝুঁকি গ্রহণ না-করার প্রবণতায় যে-পত্রিকাটি নিরন্তর সাহস ও অনুপ্রেরণা জোগায়, তার নাম সবুজ পত্র। সবুজ পত্র-এর শতবর্ষের মূল্যায়ন করতে গিয়ে একালের গদ্যকারদের সাহস ও অনুপ্রেরণার ক্ষেত্রে বারবার জীবনানন্দের ‘কবিতার কথা’ প্রবন্ধের প্রথম অনুচ্ছেদের সেই মর্মবাণীটির কথা মনে পড়ছে : ‘হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার স্বতন্ত্র সারবত্তা’...‘শতাব্দী ধরে এবং তাদের সঙ্গে-সঙ্গে আধুনিক জগতের নব নব কাব্য-বিকীরণ’-এর সাহায্য ও ‘নানারকম চরাচরের সম্পর্ক’ ইত্যাদি--এখানে, বাংলা গদ্যচর্চায়, ‘কাব্য-বিকিরণ’-এর পরিবর্তে ‘গদ্য-বিকিরণ’ লিখলেই হয়--অর্থাৎ গদ্যকার বুঝুন আর নাই বুঝুন, সচেতনই হোন বা অচেতন, তিনি কিন্তু লিখছেন সেই বিকিরণেই, যার মূলে সেই সবুজ পত্র-এরই চেতনা ও তার বিমূর্ত আভা।


টীকা :

১. নতুন পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে প্রমথ চৌধুরীকেই মনোনীত করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তা অনেকটা সশর্ত দায়িত্ব অর্পণ, কারণ সেটিই রবীন্দ্রনাথের লেখা-প্রদানের শর্ত। প্রমথ চৌধুরী আরও লিখেছেন, ‘মণিলালের একটা কাগজ ছিল। কথা ঠিক হয় যে, সেই কাগজই সবুজ পত্র নামে ছাপানো হবে। এই নতুন নাম আমিই দিয়েছিলুম।’ তাই নতুন নামে নতুন সম্পাদক হিসেবে প্রমথ চৌধুরীই ছিলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে অবিকল্প। যোগ্যতায় মণিলালও কম ছিলেন না, তাঁর মৃত্যর পরে কল্লোল (সম্পাদক দীনেশরঞ্জন দাশ)-এর ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় বিষ্ণু দে লিখেছিলেন : মণিলালের মৃত্যুতে সাহিত্যের, নৃত্যের, নাট্যশালার ক্ষতি ত হয়েছেই। কিন্তু কত লোকের ব্যক্তিগত ক্ষতিও যে হ’ল! সে প্রীতিপ্রবণ, কোমলহৃদয়, মার্জ্জিত, রসজ্ঞ গুণীর আন্তরিকতা ছিল দুর্লভ।’ এরপরও প্রমথ চৌধুরীকে সম্পাদক নির্বাচনের পেছনে নিশ্চয়ই রবীন্দ্রনাথের গভীর অন্তর/দূর-দৃষ্টিই কাজ করেছে।;

২. দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ‘বাদল ধারা’ কবিতাটি ছাপা না হওয়ায় পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় সবুজ পত্র সম্পাদককে লেখেন : ‘দক্ষিণাবাবু এখন বিশেষ অসুস্থ এবং চিকিৎসকের মত এই যে, কবিতাটি ছাপা হলে তাঁর রোগ সারবার পক্ষে তা সহায়ক হবে।’ পরে সেটি ১৩২৬ সালের অগ্রহায়ণ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।

৩. রবীন্দ্রনাথের প্রতিভাষণের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার পরে, ১৯১৪ সালের ১ ফেব্র“য়ারি রামমোহন লাইব্রেরীতে অনুষ্ঠিত এক সভায় তিনি তাঁর ক্ষোভমিশ্রিত বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেন : ‘আমি আপনাদের সম্পান প্রত্যাখ্যান করেছিলাম শুধু এইটুকু মনে রাখলে আমার উপর অবিচার করা হবে।...কবি যখন আপনাদের হৃদয়ের আনন্দে গান গেয়ে উঠে, তখন তার সব চেয়ে বড় দুঃখ হয় যদি সে তার দেশের, তার ঘরের ভায়েদের সহানুভূতি না পায় এবং তার সব চেয়ে বড় সুখ, সবচেয়ে বড় পুরস্কার সে পায় তাদের স্বতঃউচ্ছসিত প্রীতিতে। একথা বললে মিথ্যে বলা হবে যে কবে কোন সুদূর ভবিষ্যতে তার আদর হবে এই আশায় কবি নিশ্চিন্ত থাকে না, এরকম উপবাম করে থাকা যায় না। কবি চায় সমস্ত প্রাণ দিয়ে সহানুভূতি, প্রীতি--তার অভাবে তার কি বিপুল বেদনা তা সে ছাড়া আর কেউ বুঝে না। আমি জগতের হাত থেকে সম্মান নিতে পারি, কিন্তু আমার মার হাত থেকে, আমার ভায়ের হাত থেকে প্রাণের প্রীতি ছাড়া কিছু গ্রহণ করতে পারি না। এই প্রীতি আমি প্রাণভরে চাই--আপনারা আমাকে তাই দিন।’;

৪. দ্বিজেন্দ্রলালের উক্তিটি উদ্ধৃত করে নীরদচন্দ্র চৌধুরী লিখেছেন : ‘দ্বিজেন্দ্রলাল বৈষ্ণব হইয়াও কেন চৈতন্য দেবের ইয়ঃ কৌমারহরঃ’ স্মরণ করিলেন না? ...যিনি ‘আজি এসেছি বধূ হে, নিয়ে এই হাসি-রূপ-গান’ এই রূপ বহু উচ্ছলিত এমনকি উদ্দাম প্রেমের গান লিখিয়াছিলেন তাহার মুখে এই আপত্তি অপ্রত্যাশিত বলিয়া মনে হইতে পারে। কিন্তু দ্বিজেন্দ্রলালকে তখন যেন ডবল অর্থাৎ ব্রাহ্ম এবং নব্য হিন্দু নৈতিক শুচিবাইয়ে পাইয়াছিল। এই শুচিবাইয়ের বশে দ্বিজেন্দ্রলাল স্বভাবসিদ্ধ রসিকতাও হারাইয়া ফেলিলেন।’



সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি



অতুলচন্দ্র গুপ্ত (২০১০)। রচনাসংগ্রহ। আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।

অন্নদাশঙ্কর রায় (১৩৯৫)। দেখা শোনা। মিত্র ও ঘোষ, কলকাতা।

অরুণকুমার বসু, অপূর্বকুমার রায় [সম্পা.] (২০০৪)। বাংলা গদ্য জিজ্ঞাসা। সমতট প্রকাশন, কলকাতা।

অরুণকুমার রায় (২০০৯)। বাংলা সমালোচনার ইতিহাস। দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।

পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় (১৩৬১) চলমান জীবন। ক্যালকাটা বুক ক্লাব লিমিটেড, কলকাতা।

প্রমথ চৌধুরী (১৪১৪)। আত্মকথা। মাইন্ডস্কেপ (পরিবেশক, মনফকিরা), কলকাতা।

প্রমথ চৌধুরী (১৯৮৬)। প্রবন্ধ সংগ্রহ। বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলকাতা।

জীবনানন্দ দাশ (২০০৯ )। সমগ্র প্রবন্ধ, ভূমেন্দ্র গুহ সম্পা.। প্রতিক্ষণ, কলকাতা।

জীবেন্দ্র সিংহ রায় (১৯৮৬)। প্রমথ চৌধুরী। মডার্ন বুক এজেন্সী প্রাইভেট লিমিটেড, কলকতা।

দেবেশ রায় (২০০০)। তৃপাকে এক তোড়া। কবিতাপাক্ষিক, কলকাতা।

ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (১৯৮৭)। রচনাবলী দ্বিতীয় খণ্ড। দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।

নীরদচন্দ্র চৌধুরী (২০০০)। শতবার্ষিকী সংকলন। মিত্র ও ঘোষ, কলকাতা।

প্রমথ চৌধুরী (১৯৯৭)। আত্মকথা, মাইন্ডস্কেপ (পরিবেশক মনফকিরা), কলকাতা।

বিজিতকুমার দত্ত [সম্পা.] (২০০০)। সেরা সবুজ পত্র সংগ্রহ প্রথম খণ্ড। মিত্র ও ঘোষ, কলকাতা।

বিজিতকুমার দত্ত [সম্পা.] (২০০১)। সেরা সবুজ পত্র সংগ্রহ শেষ খণ্ড। কলকাতা।

বুদ্ধদেব বসু (১৯৬০)। ন্বদেশ ও সংস্কৃতি। বেঙ্গল পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকৃর (১৯৯০)। রবীন্দ্র উপন্যাস-সংগ্রহ। বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ। কলকাতা।

শিবনারায়ণ রায় [সম্পা.] (২০০২)। বাংলার রেনেসাঁস। রেনেসাঁস, কলকাতা।

সত্যেন্দ্রনাথ বসু ( ১৪০৫)। রচনা সংকলন। বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ, কলকাতা।

হারীতকৃষ্ণ দেব (১৯৯৭)। সবুজ পাতার ডাক। আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।













কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন