শুক্রবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৫

এলিস আমাদির গ্রেট পণ্ডস উপন্যাস নিয়ে আলোচনা ইচ্ছামৃত্যু ও অন্যান্য

সুদেষ্ণা দাশগুপ্তা

বৃষ্টি পড়েছে একটানা ক’দিন, অবিশ্রান্ত। পাখিগুলো ডানা ঝাপটে ঝাপটে ক্লান্ত কিন্তু গায়ের জল যেন শুকোয় না। স্বাভাবিক ডাক ও ভুলে গেছে তারা। আস্তে আস্তে সন্ধ্যে নেমে এল। আর তারপরেই সেই ভয়াবহ ও দুর্বিসহ দৃশ্য। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি গ্রাম জাটিন্ডা। আগুন জ্বালিয়েছে গ্রামের লোকেরা, স্থানীয় বাজনা-বাদ্যিতে কান পাতা দায়। আর হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে সব নাম না জানা পাখিরা ঐ দাউ-দাউ আগুনে যেন ঝাঁপ দিয়ে দিয়ে পড়তে লাগল। এ কী!


হাসিখুশি, জীবনিশক্তিতে ভরপুর গুহবাবু ফিটফাট সারাদিন। সেজেগুজে থাকেন সবসময়। দুর্গাপুর স্টীল থেকে রিটায়ার করে এসেছেন আমাদের কম্পানিতে পার্টটাইম কাজ করতে। হঠাৎ একদিন অফিসে যেই গেছি, শুনি

--  জানো তো, আমাদের গুহবাবু কাল রাতে আত্মহত্যা করেছেন

--  কি বলছ? সে কি?

-- হ্যাঁ জানো, বাড়িতে নাকি কিছুই হয়নি তেমন সমস্যা

পরে শোনা যায় গুহবাবু’র প্রস্টেট-গ্ল্যান্ডে কিছু সমস্যা ছিল, নানা পরীক্ষা ইত্যাদি হচ্ছিল। সেই রিপোর্ট খারাপ আসে। প্রস্টেট-গ্ল্যান্ডে নাকি বাসা বেঁধে বসেছে ক্যান্সার অনেকদিন। গুহবাবু স্থির করেন নিজের রিটায়ারমেন্ট বেনেফিট, যা পেয়েছেন তা মরণাপন্ন এক রোগীর পিছনে অনর্থক ব্যয় না করে স্ত্রীর ভবিষ্যতের জন্য গচ্ছিত রেখে দেওয়া অনেক কাজের কাজ।

আত্মহত্যার দুটি ভিন্নধর্মী ঘটনার উল্লেখ করেছি। প্রথমটির তো নানা ব্যাখ্যা আছে আবার নেইও। কিন্তু দ্বিতীয়টিতেও সাধারণভাবে আত্মহত্যার যে সমস্ত কারণ থাকে তার থেকে আলাদা। অপ্রাপ্তি থেকে অথবা শোক তাপ থেকে না। এটি একটি সিদ্ধান্ত এবং তা খুব দৃঢ়ভাবেই নেওয়া, আপাতদৃষ্টিতে এমনই মনে হয়।

এবার আসি মূল আলোচ্য বিষয়ে। Elechi Amadi –র The Great Ponds উপন্যাসের প্রধান চরিত্রগুলির মধ্যে অন্যতম চরিত্র Wago- র আত্মহত্যা প্রসঙ্গে। Chiolu এবং Aliakoru পাশাপাশি দুটি গ্রাম পূর্ব নাইজেরিয়ায়। প্রসঙ্গক্রমে বলি গল্পটি কিন্তু বেশ পুরনো, প্রাক-কলোনি যুগের সেই মন্ত্রতন্ত্র, কালাজাদু ইত্যাদি বিশ্বাস-করা মানুষগুলির মধ্যের। তা সেই দুটি গ্রামের ঝামেলা শুরু হয় Wagaba পুকুরে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে। Chiolu গ্রামের লোকেরাই এতদিন অবাধে, একচেটিয়াভাবে মাছ ধরে এসেছে সেই পুকুরে। কিন্তু বাধ সাধল Aliakoru গ্রামের শক্ত-সমর্থ কিছু মোদ্দা জোয়ান, যাদের মধ্যে অন্যতম Wago, যার খ্যাতি নেকড়ে-মারা বীর হিসেবে। তারা জোর ফলায় মাছ ধরার অধিকার নিয়ে । এই টানাপোড়েন নিয়েই গল্প এগিয়ে চলে তার ক্লাইম্যাক্সের দিকে। নিজেদের জয়ী করতে দুই গ্রামের অধিবাসীরাই নির্ভর করেছে তাদের নানা অন্ধবিশ্বাসে, তাগা-তাবিজে, একে অপরের মন্দ করার বিভিন্ন অলৌকিক পন্থায়। পরে বেছে নিয়েছে যুদ্ধক্ষেত্র, হয়েছে প্রচুর রক্তক্ষয়, ঘটেছে অসহায় ও নিরীহ মানুষের মৃত্যু।

“ আদিম হিংস্র মানবিকতার যদি আমি কেউ হই

স্বজন হারানো শ্মশানে তোদের চিতা আমি তুলবই” --

এই মানসিকতায় কেউ পিছপা হয় না। Wago এক বিচিত্র চরিত্র । সে অতি মুল্যবান তাবিজ ধারণ করে যার প্রভাবে ধারালো চাকুর আক্রমণও যেন পাথরে আঘাত খেয়ে ঠিকরে পড়ে তার গা থেকে। সে তুকতাকে জর্জরিত করে, নানা মৃত্যুবাণের আয়োজন করে শত্রুকে পরাভূত করার। যেন তেন প্রকারেণ জয়ী হওয়াই তার একমাত্র লক্ষ্য হয়। দৈবিক, অলৌকিক সব প্রথা অবলম্বন করেও সে যেন ঠিক আবার ভরসাও করতে পারে না সেসবের ওপর। বলশালী Wago পরাভূত হয়, বন্দী হয় এবং বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ। Wago হতে চেয়েছে হীরো। চেয়েছে তাকে সকলে মনে রাখুক এক বীর হিসেবেই। চেয়েছে বীরের মৃত্যু। হাতে নিয়েছে নিজেই নিজের অমোঘতার সিদ্ধান্ত।

অস্তিত্ববাদীরা নানা অনুবীক্ষণ-যন্ত্রের তলায় মানুষের আচরণবিধির চুলচেরা হিসেব করেন। নৈতিকতার মোড়কে রেখে ন্যায়-অন্যায়, উচিৎ-অনুচিত বিচার হয়। অতি বলশালী, নেকড়ে-মারা বীর Wago তন্ত্র-মন্ত্রের বেষ্টনীতে যেমন আবদ্ধ থাকত, তেমনি মনে তার সুপ্ত এই ধারণাটিও ছিল যে তার মৃত্যু একদিন হবেই। সে নিজেই তার মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ব্যর্থতা ঢাকতে আত্মহত্যাকে বেছে নিয়েছে মুক্তির উপায় হিসেবে।

আত্মহত্যা করবার ইচ্ছে কি নায়কোচিত ভাবনার সুপরিকল্পনার প্রতিফলন না হতাশার ইঙ্গিতবহ এটা জানতে আমরা বেশ কৌতূহল বোধ করি। বিভিন্ন দার্শনিক নানা মত দিয়েছেন এব্যাপারে। তবুও যখন নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করে আত্মহত্যার বৈশিষ্টকে চিহ্নিত করতে হয় তখন আত্মহত্যাকে একধরনের প্রত্যাখ্যান হিসেবে ধরা যেতে পারে। যুক্তিহীনতার শিকার হয়ে মানুষ নিজেকে অত্যন্ত বেদনাদায়ক ভাবে নিঃশেষিত করে ফেলতে পারে। যুক্তিহীনতা তাকে চূড়ান্ত হতাশার মধ্যে নিমজ্জিত করতে পারে এবং প্রতিমুহুর্তে তার দৈনন্দিন সমস্ত কাজে সে সমাজকে বিদ্রোহ এবং তুচ্ছ করার চেষ্টা করে নিজের ব্যর্থতাকে লুকোয় ।

এক ভাবে দেখতে গেলে, আফ্রিকান দৃষ্টিকোণ থেকে অস্তিত্ববাদের অর্থ জাতিগোষ্ঠির সাথে তাদের সম্পর্কের নিবিড়তার মাধ্যমে অন্ততঃ আংশিক ভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। Wago একজন পরাজিত নায়ক, যে পরাজয় তার সম্ভ্রমবোধকে অনবরত পীড়িত করে চলেছে। বলা বাহুল্য একজন নায়কের সম্ভ্রমবোধ অত্যন্ত ভঙ্গুর হয়। যারা তাকে একই সঙ্গে ভালোও বাসে এবং ভয়ও করে তারাই সেই সম্ভ্রমবোধকে আরো বেশি সংবেদনশীল করে তোলে। এই উচ্চাসন থেকে চূড়ান্ত পতন থেকে যখন সে ব্যক্তিগত এবং সামাজিক অবমাননার শিকার হয়, তখন নিজের কাছেও সে ছোটো হয়।

Wago চরিত্র বিশ্লেষণে আমরা হতচকিত হলেও, এটা ঠিক যে তার থেকে এরকম কিছুই কাম্য ছিল। দায়ভার মুক্তি’র দায়িত্বও সে পালন করেছে, ভুল কে ঠিক করেছে নিজের এই সিদ্ধান্ত দিয়ে। ‘আত্মহনন’ অর্থাৎ একটি জীবন নিঃশেষ করা। নির্মম এই ইচ্ছে অন্তরে বাইরে এক অতৃপ্তি থেকেই সৃষ্টি হয়। একজন হীরো নিজের প্রতি ক্ষুণ্ন হতে পারে, অথবা বিরক্ত হতে পারে নিজের ব্যর্থতায় আর তার থেকে মুক্তি পেতে সে সমাপ্তি ঘটাতে পারে তার জীবনের। এভাবে সে তার চেতনা-শুদ্ধি করে। কার্যসিদ্ধি করতে না পেরে সে বেছে নিতে পারে এই চরমতার, যা ঘটেছে Wagoর চরিত্রে The Great Ponds-এ।

লেখক দেখিয়েছেন এই আত্মহত্যা হতাশাব্যঞ্জক নয়, এ এক মুক্তিরও উপায়, কোথাও যেন পাপমোচনেরও এক পন্থা। কোথাও যেন চরিত্র নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছে, তার সাথে তার জীবন এবং বহির্জগতের সম্পর্ক, ও তার সঙ্গে বিচ্ছেদ । আত্মহত্যা দিয়ে, Wago চরিত্র দেখিয়েছে কিভাবে তার ‘ইচ্ছামৃত্যু’ সামঞ্জস্য পেয়েছে তার ব্যর্থতা, তার সঙ্গে হতাশামুক্তির উপায় হিসেবে। Wago বুঝেছিল তার শত্রুর দান করা বিকল্প ব্যবস্থা মেনে নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। তার এই ইচ্ছামৃত্যু যেন লজ্জার নয়, তা যেন বীরের সম্মানের সাথেই বরণ করা।

1 টি মন্তব্য: