বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৫

লেখকের বয়স বিতর্ক : একজন ‘তরুন লেখকের’ বয়েস কত হওয়া উচিত?

মৌসুমী কাদের

গত জুন সংখ্যায় দি নিউ ইয়র্কার পত্রিকা বিশজন সফল লেখকের তালিকা দিয়েছে যাদের বয়েস চল্লিশের নিচে। এর মধ্যে জশুয়া ফেরিস, জনাথান সেফরান, ফোয়ের, নেল ফ্রডেনবার্গার, রিভকা গেলশেন, নিকোল ক্রস, গ্যারী ষ্টাইনবার্গ, জি জি প্যাকার, ওয়েলস টাওয়ার উল্লেখযোগ্য। নিউ ইয়র্ক পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে, ‘আমাদের চারপাশে অনেক প্রতিভাধর তরুন গল্পকার আছে। মন দিয়ে পড়লে বোঝা যায়-- এদের লেখা এক প্রজন্ম ছাড়িয়েও আরও তিন প্রজন্ম পড়বে। এটা এক ধরনের আশার কথা। আমরা কিন্তু জানিনা আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম বা তাদের ছেলেমেয়েরা আদৌ গল্প বা উপন্যাস পড়বে কিনা। নিউ ইয়র্কার যে ভবিষ্যৎবানী করুক না কেন সেটা আমলে না নিয়েও একটু অনুসন্ধান করে দেখা যায় যায় এইসব লেখকরা তাদের সবচেয়ে সেরা ও দীর্ঘস্থায়ী লেখাগুলো তাদের তরুণ বয়েসেই লিখেছেন।


যাদের বয়েস একত্রিশ থেকে উনচল্লিশ তাদের ডাকা হয় ‘স্ফুটনোন্মুখ’ অথবা ‘প্রমিজিং’। প্রচলিত ধারণা রয়েছে-- ঐ সময়ে লেখকরা সৃষ্টিশীলতার সৃষ্টিশীলতার চূড়ায় উঠে বসে থাকে। কাজুও ইশিগুরো ( জাপানী বংশদ্ভূত ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক) ৫৪ বছর বয়েসে বলেছিলেন; ‘যখন তার বয়সে ৩০ তিনি অনুভব করেছিলেন, বড় বড় মহৎ উপন্যাসগুলোর বেশীর ভাগ লেখকের বয়েসই ছিল চল্লিশের নিচে। ফরাসী লেখক গুস্তাভ ফ্লবার্টের বয়স ছিল ২৯ যখন তিনি তার প্রথম উপন্যাস ‘মাদাম বোভারী’(১৮৫৬) লিখতে শুরু করেছিলেন এবং শেষ করেছিলেন ৩৪ বছর বয়েসে। জার্মান ঔপন্যাসিক পল টমাস মান (১৮৭৫-১৯৫৫) তার প্রথম ও সেরা শিল্পকর্ম ‘বাডেনব্রুক্স’ লেখেন ২৪ ব্ছর বয়সে। রাশান ঔপন্যাসিক লিও টলস্টয় (১৮২৮-১৯১০) ‘ওয়ার এন্ড পিস’ লিখতে শুরু করেন ৩৪ বছর বয়েসে। জেমস জয়েস ‘ইউলিসিস’ লেখেন ৩০ বছর বয়েসে। এমনকি বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য লেখক ফ্রানজ কাফকা ২৯ বয়সে লিখেছিলেন তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দি মেটামরফসিস’। মেটামরফোসিস উপন্যাসের প্রধান চরিত্র গ্রেগর সামসার মতন একজন মানুষের রূপান্তর হয় (মেটামরফজড) বিকট জীবে।

আমেরিকা দেশটি সব সময়ই তাদের বিস্ময়কর তরুণ লেখকদের নিয়ে মুগ্ধ থাকে। এই লেখকরাও তাদের সেরা কাজ গুলো করেছেন অনেক আগেই। হারমেন মেলভিল ছিলেন ৩২ বছরের যুবক যখন উনি ‘মবি ডিক’ লিখেছিলেন। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ২৭ বছর বয়েসে লিখেছিলেন ‘দি সান অলসো রাইজেজ’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী প্রজন্ম ছিল সবচাইতে সমৃদ্ধ। আমেরিকান ঔপন্যাসিক নরমান মেইলার(১৯২৩-২০০৭) ২৫ বছর বয়সে লিখেছিলেন ‘দি নেকেড এন্ড দি ডেড’। ২৯ বছর বয়সে ঔপন্যাসিক জেমস জোন্স আরো দীর্ঘ কাজ করেন ‘ফ্রম হেয়ার টু ইটারনিটি’।

বাংলা সাহিত্যেও কিন্তু একইভাবে আমরা দেখতে পাই; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) ষোল বছর বয়েসে ‘ভিখারীনি’ গল্প দিয়ে তার থেকে লেখা শুরু করেছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) অগ্নিবীনা লিখেছিলেন ২৩ বছর বয়সে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬) এর প্রথম গল্প ‘অতসীমামী (১৯২৮) ছাপা যখন তার বয়েস ছিল ২০। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬-১৯৪৭) আট ন’ বছর বয়স লিখতে শুরু করেন।

৩০-৪০ বছর বয়েসের পরে আর কোনো প্রোমিজিং লেখক পাওয়া যাবে না—এই ধারণাটিকে অনেকে উড়িয়ে দিয়েছেন। । জোসেফ করনার্ড পাঠকের নজরে পড়েন ৪০ বছর বয়সে। ক্যাথেরুন অ্যান পোর্টারের প্রথম গল্পের বইটি প্রকাশিত হয় ৪০ বছর বয়সে। নরম্যান হেসের প্রথম বইটি প্রকাশের জন্য তাকে ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

এদের মতটা হল, তরুণ বয়সই যে জীবনের সেরা করার জন্য উপযুক্ত সময় সেটা ধরে নেওয়ার কোনো যুক্তি নেই। হেনরি জেমস তার সেরা লেখাটি করেন ৬০ বছর বয়সে। ৩৮ বছর বয়সে তিনি লিখেছিলেন The adventure of Aguie March। এই উপন্যাসটির চেয়ে ৪৯ বছর বয়সে লেখা Herzog উপন্যাসটি মানের দিক থেকে বেশি প্রশংসিত। ৩৫ বছর বয়সে লিখেছিলেন থ্রিলার দি এন্ড জোন। কিন্তু ৬০ বছর বয়সে লেখা আন্ডারওয়ার্ড থ্রিলার হিসেবে তার সেরা কাজ বলে সমালোচকরা মনে করেন।

কিন্তু ৪০ অথবা ৫০ নয়, দি নিউ ইয়র্কার ম্যাগাজিনটি ৩০ বছর বয়সকে সেরা লেখার উপযুক্ত সময়। এই মনে করার যুক্তি হল, এই সময়কালে দেহ-মন থাকে টগবগে। থাকে আবেগের প্রাবাল্য। থাকে ঝুঁকি নেওয়ার দু:সাহস। সংসারের দায় দ্বায়িত্বও থাকে কম। সেক্ষেত্রে এই তিরিশ বয়সটিতে তরুণ লেখা আসে। সে লেখার চমকে দেওয়ার ক্ষমতা থাকে। তবে লেখাগুলোর মধ্যে এক ধরনের এক রোখা প্রবাহ থাকে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের নানা অভিজ্ঞতা বাড়ে। চিন্তার ক্ষেত্রে নানান জানালা খুলে যায়। নানা বহুবিধ দৃষ্টিকোন থেকে কোনো ঘটনাকে বিচার বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়। যে কোনো লেখাই হয়ে উঠতে পারে বহুরৈখিক। একই সঙ্গে লেখার নানাবিধ কলাকৌশলকে জানা যায়। বোঝা যায়। নিয়মিত চর্চা বজায় রাখলে লেখার ক্রাফটের ক্ষেত্রে অসামান্য দক্ষতা অর্জন করা যায়। বহুব্যবহৃত ক্রাফটককে সহজে সনাক্ত করে নতুন ক্রাফট নির্মান করার সুযোগ ঘটে। জীবনের গভীরতর বোঝাপড়া করা সম্ভব হয়।

তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীর স্বাস্থ্য মনে দুর্বলতা আসে। এক ধরনের অবসাদ ক্লান্ত করে ফেলে। ফলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই সতেজ লেখার চেয়ে দুর্বল লেখা চলে আসে।

সকল লেখক কিন্তু স্বভাবজাত নয়, আবার অনেককেই হয়ত শুরু করতে হয় তথ্য আর স্মৃতির ভাণ্ডার দিয়ে। তারপর সময়ের গতিতে ক্রমশ সেই লেখা কৃশ হতে থাকে। যৌবনে সাধারণত লেখকরা সরাসরি শৈশবের নবীন ও তীব্র অনুভূতিগুলো উদ্ঘাটন করতে পারে। আবেগ থাকে ঘন। পরবর্তীতে এই তীব্র অনুভূতিগুলো ফিকে হয়ে আসে। তখন অনেক ভাবনারই পরিমার্জন বা পরিশোধনের প্রয়োজন হয়। আবার ‘সাহিত্যের ঐতিহ্যও’ লেখার ক্ষেত্রে একধরনের নির্দেশনা দেয়; জীবন সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি বা বোধও নানা ধরনের সুফল এনে দেয়। কিন্তু তা সকল সময়ে শিল্পসম্মত নাও হতে পারে। গবেষক, সাইকলজিস্ট, ইতিহাসবিদ এরা তর্ক করেছেন, বয়েস এবং ‘সৃজনশীন চিন্তা' নিয়ে। আর্টিস্টিক মাইন্ডের ওঠা নামা নিয়ে। এদের কেউ কেউ বলছেন শিল্প, কবিতা, কথাসাহিত্য এসব সৃষ্টিতে বয়স কেবল ‘একটি ক্রিয়া’। সৃজনশীল মানুষটি যে শৃংখলায় নিজেকে বেঁধে রাখছেন সেদিকেই তার চিন্তা প্রসারিত হচ্ছে। আবার কেউ বলছেন ‘নান্দনিক পরীক্ষা’ এবং নানাবিধ ‘ধারণার সঞ্চালন' সৃজনশীন চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করে। সব ধরনের লেখার বিষয়ে যেটা সবকিছুর উপর বিশেষভাবে লক্ষণীয় তা হলো ভাষার উপরে দখল এবং গল্প বলার মুন্সিয়ানা।





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন