বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৫

হাসান আজিজুল হকের গল্প 'সারা দুপুর' গল্প নিয়ে আলোচনা

জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা

মা-বাবা-সন্তানের ত্রিভূজ আকৃতির কোন সংসারে, তিনটে বাহু জোড়া থাকে অপার্থিব এক মায়ায়। মায়াময় সে ত্রিভূজের, বাবা বা মা যখন সন্তানের হাতটি ছেড়ে চলে যায় অন্য কোনোখানে, অন্য কিছুর সন্ধানে; তখন সংসারের বাকি মায়াগুলোও সম্ভবত আলগা হয়ে যায়। যদিও আর সব কিছুই থাকে, থাকে আগের মতোই! তবু উড়ে যাওয়া মায়া পাখিটি সব নিয়ে যায়, তার ওড়ার সঙ্গী করে। আর চেয়ার, টেবিল, জানালার কপাট, খাট, বিছানা, পানির জগ সব যেন এক চিরস্থায়ী নিস্তব্ধতার সঙ্গী হয়ে পড়ে। তখন মনে হয়, রাশি রাশি সকাল-দুপুর-রাত্রিও যেন, থেমে থাকা বিবর্ণ এক শীতের দুপুর। ঠিক যেমন কোন একটি নির্দিষ্ট দুপুরের গল্প না হয়েও, ‘এক বিবর্ণ দুপুর সদৃশ’ কারাগারের গল্প “সারা দুপুর”! কাঁকন নামক কিশোরটির মনোজগৎ আটকে ছিল যে বিষময় কারাগারে! প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক এর “সারা দুপুর” কিসের গল্প, কেমন গল্প- তা ছাপিয়েও, অন্য কিছু দেখা যেখানে জরুরি হয়ে ওঠে। লেখকের নির্মোহ বর্ণনায় কাঁকনের ভেতর-বাহিরকে পাঠক যেখানে অবিকল দেখতে পায়। আর কিছু না; কাঁকনের চিন্তাজগতকে তৃতীয় চোখে দেখার এ সুযোগ পাঠকের অপরিমেয় বলেই মনে হয়। গ্রন্থিহীন হতে হতে এক কিশোরের দৃশ্যপট কী অকপটেই না পাল্টায় ~ লেখক পাঠককে সেটাই দেখান সংক্ষিপ্ত এ কথকতায়।

“সারা দুপুর” ছোট এক বাচ্চা ছেলের ছোট্ট একটি গল্প। প্রথমদিকে মনে হচ্ছিল গল্পটি মনোলগ ধাঁচের। কিছুদূর এগুতেই তার মা আর দাদুর পরিচয় মেলে। ছেলেটি নিজের সাথে নিজে কথা বলে আর কখনো বা গাছকে শুনিয়ে তার কথাগুলো বলতে থাকে। ছেলেটি অর্থাৎ কাঁকন জীবনের সব রিক্ততা, শুষ্কতা স্পষ্ট দেখতে পায় (সম্ভবত বয়সের তুলনায়, বেশ আগেই)। তবু এসবের মাঝেও, সে তার প্যারালাইসিস আক্রান্ত দাদু এবং পরম নির্লিপ্ত মা’র সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটা জীবন কাটাতে চায়। মৃত্যুর সন্নিকটে আসা দাদু’র মৃত্যুকে নিয়ে কোন আবেগ তার নেই, ভাবনা জুড়ে থাকে শুধুই বাস্তবতা। স্কুল, বন্ধু, খেলাধুলা, দাদুর মৃত্যু-ভাবনা, প্রকৃতির ভেজা বা খটখটে শুকনো রূপ দেখা – সবই তার চলতে থাকে অদ্ভুত সমান্তরালে। কিন্তু এর মাঝেও তার মরে যেতে ইচ্ছা করে। একদিন যখন তার সাথে হেরে গিয়ে তার বন্ধু বলে বসে, “তোর বাবা একটা মাগীকে নিয়ে ভেগেছে।” বাবা আর কখনোই আসবে না! এবং এমনতর নির্মম সে না আসার কারণ, জেনে গিয়ে ফাঁকা বুকে কী প্রচণ্ড এক ঘৃণা পুষে সে! ঘৃণা নিয়ে বাঁচা? সে বড় কঠিন। ছোট্ট একটা বাচ্চা ছেলেও তা বুঝতে পারে। তখন তার মরে যেতে ইচ্ছা করে। তবে, মানব-মন তো! সে আশা খোঁজে। কিন্তু যখন একদিন স্কুল থেকে বেশ আগে বাসায় ফিরে, শোবার ঘরে দেখে একটি ফর্সা মতোন লোক; তখন তার খুব অবাক লাগে। ভীষণ অন্যরকম লাগে। অনেক কিছু ভাবে। যদিও মা’র কোলে সে আর শোয় না। কিন্তু সেই কোলে অন্য একটি লোকের মাথা; আর সে মাথায় মা’র অমন হাত বুলিয়ে দেওয়া একটুও ভাল লাগে না। তখন তার মরে যেতে ইচ্ছা করে।

মূলত এটাই “সারা দুপুর” এর গল্প। এ গল্পটুকুই বলতে চেয়ে, লেখক হাসান আজিজুল হক দেখিয়েছেন, কিশোর-বালকের কঠিন এক মানস-যুদ্ধ। শেষ মায়ার বন্ধনটিকেও আলগা হতে দেখলে, কেমন আশ্রয়হীন মনে হয়, ছোট্ট এক শিশুমনের – সেটাও চমৎকার বিবৃত করেছেন। গল্পে দেখা যায়, কাঁকন কিভাবে যেন চোখের রোদকে আচমকা কমে যেতে দেখে। কাউকে তখন আর তার আপন মনে হয় না! কারোর কোন কথা আর শুনতে ইচ্ছা করে না! কিন্তু কিসের টানে কোথায় যেন ছুটে চলে যেতে মন করে। হ্যাঁ, কাঁকনের এমনই ‘মন করে’; মরে যেতেও তার এভাবে ‘মন করে।’ পাঠকের বুকটা তখন দুলে ওঠে! পাঠকের চারপাশ চৌচির হয়, বিষণ্ণতার এক ডুবো-হাহাকারে! আর সেই জটিল বাস্তব পরিস্থিতিকে, কিশোর-মন কিভাবে ‘সামাল দেয়’ কিংবা ‘দিতে চেষ্টা করে’ কিংবা ‘দিতে পারে না’ – সেটাই পুঙ্খানুপুঙ্খ দেখিয়েছেন গল্পকার হাসান আজিজুল হক। কাঁকন তার মনের পরিস্থিতি অনুযায়ী, বিভিন্ন অনুভূতিতে চারপাশের প্রকৃতিকে বিভিন্নভাবে দেখেছে। এই কাজটি লেখক এত সহজাত ভাবে করেছেন, যে আলাদা ভাবে তা চোখে নাও পড়তে পারে। তবে মনোযোগী পাঠকের চোখ তা ঠিকই হয়ত চেখে দেখবে।

গল্পের শেষাংশে, কাঁকন তার মা’র কাছ থেকে এক বিকেলে জানতে পারে, তার আব্বা আসবে। ‘মাগী’ কথাটা সেই তখন সে না বুঝলেও পরে বুঝেছে। বাবা আসবে জেনে প্রথমে একটু খুশি হতে গিয়েও পরে আর সে পারে না। নিজেকে নিজেই জিজ্ঞেস করে, ‘তাহলে মায়ের ছেলে কাঁকন তোমার আব্বার মুখ দেখা উচিত কী?’ মা তাকে সে বিকেলে বাইরে বেরুতে নিষেধ করলেও, সে বেরিয়ে যায়। বাইরে বেরিয়ে সে আকাশের দিকে তাকালে, একদল বালিহাঁসকে উড়তে দেখে। দেখে, “রোদে ঝলকাচ্ছে ওদের ডানা, গলার কাছে ফিকে নস্যি রঙ যেন সোনালি। হঠাৎ সাঁ করে ঘুরে একটা বড় ত্রিভুজের আকার নিয়ে দলটা বিলের দিকে ফিরল। সব কষ্ট-দুঃখ ভুলে কাঁকন হাততালি দিয়ে বলল, এতদিন কোথা ছিলি তোরা?” লেখক বালিহাঁসকে এমন ত্রিভুজের আকারে দেখিয়ে, কাঁকনের মাঝে মা-বাবা-সন্তানের এমন ত্রিভুজাকৃতির প্রতি আকাঙ্ক্ষাই বোঝালেন কিনা পাঠক হয়ত তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি বোধ করবে না। কিন্তু পাঠকের মন ভিজে যাবে কাঁকনের এ কথায়, “একটা নেমে আয় না! ভয় নেই। দাদু একটা খেতে চেয়েছিল-তা দাদু আজ না হয় কাল, না হয় পরশু মরে যাচ্ছে, খেতে পারবে না। পুষব আয়!” হঠাৎ হাঁসগুলোকে আর দেখতে না পেয়ে তার মন দুঃখী হয়ে যায়। ভাবে, হয়ত দাদু এখন মরছে। পরক্ষণেই মা’র কথা মনে হয়। মনে হয়, মা-টাও তো তার আসলে মরেই গেছে। হ্যাঁ, মাকে মরেই গেছে মনে হয়। তারপর “আস্তে আস্তে উঠে এল সে রেললাইনের ওপর। চারদিকে চেয়ে দেখল। আকাশের রোদ কমে এসেছে, কিন্তু রেললাইনটা ঝকঝক করছে। বেলা তিনটের ট্রেন ক্রুর আনন্দে ঝকঝক গুমগুম শব্দ তুলে দৈত্যের মতো চলে গেল। তারপর কী নিদারুণ স্তব্ধ প্রশান্তি!”

এভাবেই শেষ হয়ে যায়, একটি ‘স্থির দুপুর’ সম বিষণ্ণ কিছু সময়ের গল্প “সারা দুপুর”। গল্পে লেখক তার নিজস্ব মতামত, নীতি-নৈতিকতার বোধ বা অন্য কিছুর ইঙ্গিত কোথাও না দিলেও, পাঠক এমন সমাপ্তির জন্য ছিল প্রস্তুত। কেননা গল্পের শেষ দিকে, এরূপ উপসংহারের ইঙ্গিতটুকু লেখক তার পাঠককে দিয়েছিলেন। অনেক গল্পেই পরিসমাপ্তির অংশটুকুতে সাসপেন্স থাকলে গল্পের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। পাঠকের কাছে গল্পটি আকর্ষণীয় হয়। গল্পটি পাঠক-সমালোচকের মনে স্থায়িত্ব লাভ করে। ‘সারা দুপুর’ এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম একটি গল্প। চেনাজানা ঘটনা সমৃদ্ধ এ গল্পের মূল সুর- গল্পের ঘটনায় বা ঘটনার আকস্মিকতায় নয়। পারিবারিক-সামাজিক চাপে ন্যুজ এক কিশোরের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণেই নিহিত এ গল্পের মূল তাৎপর্য। গল্পের প্রেক্ষাপটটিও এ ক্ষেত্রে অনন্য। পরিবার প্রথা যতদিন আছে, এ গল্পটিও ততদিন থাকবে তার সকল উপযোগ নিয়ে। অসামান্য কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক এর “সারা দুপুর” অনেক অনেক দিন পাঠককে ভাবাবে। বিষণ্ণতায় পাঠককে ভরিয়ে রাখবে। কোথাও কোন মেসেজ নেই, তবু এ গল্পটি নিজেই চমৎকার একটি মেসেজ হয়ে থাকবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন