শুক্রবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৫

শামসুজ্জামান হীরা -র গল্প : অঘ্রানের কুয়াশা

এ-উপাখ্যানটির শুরু একটি বাড়িকে ঘিরে। প্রায় বিঘা তিনেক জায়গা জুড়ে বাড়িটি। বেশ ক’টা ঘর; তার মধ্যে বড়সড় যেটি, ইটের পুরু দেওয়াল, ওপরে টিনের ছাউনি।

হেমন্তের শেষ — সম্মুখে দিগন্তবিস্তৃত ফসলের খেত। আমন কাটা হয়ে গেছে — খেতজুড়ে আতঙ্কে খাঁড়া-হওয়া চুলের লাহান ঢেউখেলানো নাড়ার মোথা। কোথাও কোথাও ফাঁকে-ফুকে সিসারঙা মাটি — মাকড়শার জালের মতন চৌকোনো সরু সরু চিড়। গাছ তো আছেই ক’টা — ঝাঁকড়ামাথা অশথ, হিজল আর নিম; সওদাগরি নাওয়ের মাস্তলের মত আরও আছে সার সার দেওদার। পেছনের নালা ঘেঁষে বাঁশ আর বেতের ঝাড়।


এবং আমি এখন সেই বাড়ির এক কক্ষে স্থিত। বাড়িটা পুরনো; কত হবে বয়স? এক হাজার নাকি এক শ’ বছর— বোঝা বেজায় ভার। সময় তো স্মৃতিতে আঁকা ঘটনা বিন্যাসের বিরতিক্রম — দৈর্ঘ মাপার ব্যবস্থা, সেজন্য মাথায় রাখা অলৌকিক এক গজকাঠি। কী অদ্ভুত দ্যাখো, ঘরের একটা দেওয়াল একেবারে ঝকঝকে; কে যেন ইটের খোয়া ঘষে আঁকাবাঁকা আনাড়ি হাতে লিখেছে ২০১১; অন্যটা, ঠিক এর বিপরীত দেওয়ালটা শ্যাওলা-ধরা, কোথাও কোথাও পলেস্তারা উঠে-যাওয়া, ওটাতে কী-যে লেখা, যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখান থেকে বোঝা আদৌ সম্ভব নয়। তৃতীয় দেওয়ালটাতে ঝুলে আছে বিশাল এক ঘড়ি — প্রায় পুরো দেওয়াল জুড়ে; সময়চি‎হ্ন মুছে-যাওয়া‎ ডায়াল আছে, আছে শুধু ঘণ্টার কাঁটা, অন্যাদুটোর নেই কোনওটাই! বাইরে সোঁ সোঁ উত্তুরে বাতাস, পশ্চিম আকাশে শুকনো সিঁদুর ছিটোনো; ঝড় উঠবে নাকি জোর! উত্তুরে বাতাসে ঝড় ওঠে শুনেছ কখনও? সূর্য কোথায়! ডুবেছে নাকি, নাকি ডোবেনি এখনও — নাকি এখন মাঝরাত; কী জানি। বিবর্ণ স্তব্ধ ঘড়িটা ঝুলে আছে দেওয়াল দখল করে।

এ-বাড়িতে আমাকে আসতে হয়েছে। আসতে হয়েছে, কেননা চল্লিশ বছর আগে এ-বাড়িটা ছিল আমাদের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়স্থল। আসতে হয়েছে আরও এক কারণে; স্মৃতি থেকে খোয়া-যাওয়া ঘটনাগুলোকে খুঁজে পেতে। বর্তমানে পোড়োবাড়ি হলেও একসময় এ-বাড়িতে বহু লোকের সমাগম ছিল। যুবক হারাধন, তার নবপরিণীতা বধূ মালতীরানি, ছোট বোন কনকবালা, আর বিধবা মা আনন্দবালা দাস।

সমুখের দেওয়াল, যেটাতে সদর দরজা, একঝাঁক জোনাকি শরীরে জড়িয়ে নিয়ে কে যেন এগিয়ে আসে। দু’আঙুলের ফাঁকে গোঁজা জ্বলন্ত ধুম্রশলাকা। কাছে আসতেই আলোতে ভরে যায় ঘর। কাছে এলে চিনে ফেলি, বহুবছর পর আজ দেখা, নামটা কী যেন? নামে কী এসে যায়, আমি ডাকি, জোনাক-মানব। ও মিটিমিটি হাসে। সস্তা সিগারেটে দম দেয়। একটার আগুন থেকে আরেকটা ধরায়, তারপর আরেকটা। ফিসফিস করে কিছু কথা বলে, তারপর আবার মিলিয়ে যায় ঘড়ি ঝোলানো দেওয়াল গলিয়ে। যাবার সময় ঘুরে দাঁড়িয়ে আমাকে লক্ষ করে শুধু বলে, উলুখাগড়া। আচমকা মনে হয়, ওর নাম হয়তো আবু জাফর। নাকি সুরক্ষিত বড়ুয়া! নাহ্, শামসুজ্জামান হীরাও হতে পারে! কী এক গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খেতে থাকি! জোনাক-মানবকে শনাক্ত করা খুবই দুরূহ ঠেকে। গোল্লায় যাক জোনাক-মানব! সদর দরজা ঠেলে দক্ষিণমুখি বারান্দায় এসে দাঁড়াই। কিন্তু ও আবার কে? সিঁড়ির নিচে! বাইশ কি তেইশ বছরের উদ্ভিন্ন যৌবনা এক নারী! দু’হাতে ধরা দুই শিশু! চোখ ফিরিয়ে নিতে হয় ভীতি আর লজ্জায়!

দাদা, তীক্ষ্ণ মেয়েলি ডাকে ওদের দিকে চোখ ফেরাতে বাধ্য হই। সম্পূর্ণ নগ্নিকা, হাঁটু বেয়ে তখনো গড়াচ্ছে কালো রক্তের ধারা। গলায় গভীর দাগ — দেখে মনে হয় সুতানলি সাপ যেন পেঁচিয়ে গলায়। শিশু দুটোর পাঁজরে ছোপ ছোপ কালচে দাগ — রোদে ভাজা বাসি রক্তজবা যেন!

বাড়ির সামনের উঠোন — উঠোনের পাশে জলা; জলাঘেঁষা শেয়ালকাঁটা ঝোপে জমে শেষ অঘ্রানের কুয়াশা কাঁপে; বাতাসের তোড়ে আবার ছিড়ে ছিড়ে যায়; জমে আবার ছিড়ে ছিড়ে যায়। বাতাসের তাড়া খেয়ে, নাকি নিষিদ্ধ মাদকতায় জড়িয়ে ধরে বিবস্ত্রা যুবতীকে। ঝিঁঝি পোকার দল একটানা সুর তোলে হিমেল বাতাসে। হিজল গাছের শাখায় হুতোম পেঁচা সহজাত চাপা স্বরে কাকে যেন ধমক দেয় থেকে থেকে। মানুষের কথা ছাড়া অন্য কোনও ধ্বনিকে কি অক্ষরে আঁকা যায়, বলো? পেঁচাটা যে ধ্বনি ছড়াচ্ছে তা আমার কাছে মনে হল, অনেকটা এমন: ধুঁ ধুঁ চু ধুঁর! ছোটকালে বাড়ির গাছে পেঁচা ডাকলে গা ছমছম করত; মা বলতেন, বড় অলক্ষুনে পাখি রে, ঢিল মেরে তাড়া!

আমি পেছন হটে ঘরে ঢুকতেই দেখি সম্মুখে বিধবা আনন্দবালা দাস। পরনে সাদা ধুতি। বয়স পঞ্চাশ পেরোয়নি বলে ধারণা হয়। আমরা তো জানি, কম বয়সে বিয়ে হওয়া এই নারীর প্রথম সন্তান হারাধনের বয়স যখন আট, কন্যা কনকের দুই, স্বামী বিয়োগ হয় তাঁর। তারপর শক্ত হাতে আগলে রেখেছিলেন সংসারটিকে। হারাধনকে ঘিরেই ছিল তাঁর যত স্বপ্ন-সাধ। বিশাল বাড়ি, প্রচুর ফসলি জমি — অভাবের স্পর্শ নেই কণাপরিমাণ।

­– ইবা কনলে, হীরা না...? বহুদূর থেকে যেন ছেঁড়া ছেঁড়া প্রতিধ্বনিত শব্দের ঢেউ এসে কানে লাগে।

– হ। অনে ক্যান আছন মাসিমা, গম না?

– তুই কত বুড়া অই গেইও গই...আঁর থনও বেশি বুড়া!

চোখ যায় দক্ষিণ দেওয়ালে, — বিবর্ণ স্তব্ধ-অচল ঘড়িটা ঝুলে আছে দেওয়াল দখল করে!

দুর্বোধ্য হাসির রেখা খেলে যায় মাসিমার ঠোঁটে। এ-হাসির অর্থ কী? একটা না-কী বেশ ক’টা চামচিকে নিকষ কালো কক্ষে চক্কর খায় অবিরত।

– বাইরে উন কন? প্রলাপের মত শোনায় প্রশ্নটি আমার নিজের কাছেই।

– কন আবার, লাবণ্য — কিষ্টর বউ, তার পোয়া মাইয়া। চিনিন্ ন ফারো? ন চিনিনরই কথা...! তোঁয়ারা খেইল্য যে তাঁআরে লই! আঁরারেও!

– অ...। অস্ফুট শব্দ বেরোয় মুখ থেকে। মাসিমার কথায় শ্লেষ নাকি ঘৃণা! ওদের এ-অবস্থা সম্পর্কে জানা দরকার। মাসিমার দিকে চোখ তুলি। কিন্তু একি, কোথায় উধাও মাসিমা! ওঁর সঙ্গে অনেক কথাই যে বলবার ছিল। রেগে আছেন নাকি আমার অথবা আমাদের ওপর, যারা ওঁর বাড়িতে থেকে যুঝেছিলাম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আর তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে? রেগে থাকতেই পারেন। ওঁকে আমরা অনেক স্বপ্ন দেখিয়েছিলাম তো।

পুরনো আমলের ঘড়িটায় আবার চোখ গেঁথে যায়। আর কী আশ্চর্য, দ্যাখো, ঘড়িটা চলছে, চলছে বিপরীত দিকে তীব্র গতিতে! চলছেই ঘড়িটা। ঘড়ি সচল হবার সঙ্গে সঙ্গে ঝকঝকে দেওয়ালের গায়ে লেখাটাও বদলে গেছে, ওখানে এখন জ্বলজ্বল করছে ৪টি সংখ্যা ১ ৯ ৭ ১।

শ্লথ পায়ে এগিয়ে যাই শ্যাওলা-ধরা দেওয়ালটার দিকে। প্রাচীন পুরাকীর্তির গায়ে খোদাই করা দুর্বোধ্য সাংকেতিক লিপির ধাঁচে কীসব হিজিবিজি লেখা।

দেওয়াল থেকে অনুচ্চ অথচ ভরাট আওয়াজ আসে: চোখ বোজো; খোলা চোখে এ-লিপি পড়তে পারবে না। তোমাদের চোখে আজ ভয়াবহ ছানি। নিজের ভেতর ঢোকো। মগজেও সমস্যা; ওটার অলিগলি ধরে হেঁটে বেড়ায় পাকিপ্রেতাত্মারা... নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য তৈরি করা দেবতারা।

তথাস্তু। চোখ বুজি আমি।

চলচ্চিত্রের খণ্ড খণ্ড দৃশ্য যেন, একটার পর একটা ভেসে ওঠে; কিছুক্ষণ চলতে থাকে, তারপর মিলিয়ে যায়।



দৃশ্য:১

ভারত সীমান্ত পার হয়ে সাবরুম বর্ডার দিয়ে ২১ জনের গেরিলা দলটি ঢুকছে দেশের ভেতর। জনমানবহীন গহিন অরণ্য, পার্বত্য এলাকা। পিঠে ঝোলানো হ্যাভারশেকে কেজি দশেক ওজনের বোঝা — গ্রেনেড, প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ। কাঁধে রাইফেল, হাতে এলএমজি, এসএমসি। হেঁটে চলছে পাহাড়ি পায়ে-চলা সরু পথ ধরে। সারাদিন হেঁটেই চলছে। রাতে কোথাও একচিলতে সমতল স্থান বেছে দূর্বার বিছানায় পরিশ্রান্ত গা এলিয়ে দিচ্ছে সবাই। (ডিজল্ভ)।


দীর্ঘ দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে এখন সমতলে। সূর্য আলো ছড়াবার আগেই ফটিকছড়ির নানুপুরে, পার্টির এক সমর্থকের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছে গেরিলারা। দিন পার করছে ওখানে। লোকবসতি যদিও খুব ঘন নয়, তবুও দিনের বেলা চলাচল বিপজ্জনক। পাকবাহিনী আর দালালদের আনাগোনা। সন্ধ্যার পর অন্ধকার ঘনিয়ে এলে আবার হেঁটে চলছে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের স্পেশাল গেরিলা ব্যান্ডটি। (কাট)।


দৃশ্য:২

ভোরের আলো ফোটার আগেই ধ্বস্ত ২১টি শরীর এসে পৌঁছেছে উত্তর ভূর্ষি গ্রামে; কৃষ্ণ নাগের বাড়ি। বাড়িটা লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন — তিন পাশে জলা আর জঙ্গল; গাছগাছালিতে ভরা। সমুখে ধানখেত। দুটো মাটির ঘর; একটি একতলা, অন্যটি দোতলা — পাশাপাশি; দু’ঘরের মধ্যিখানের চিপা পথ। ও-পথ ছাড়া অন্য কোনওভাবে প্রবেশের সুযোগ নেই বাড়িটাতে। একতলার অপর প্রান্তঘেঁষে ছাপরা রান্নাঘর। টগবগে যুবক কৃষ্ণ, বয়স বেশি হলে পঁয়ত্রিশ। চুলোর পোড়া মাটির মত গায়ের রং। খাটো করে ছাঁটা একমাথা চুল। পেশীবহুল সুঠাম শরীর। কৃষ্ণ সহাস্য মুখে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে গেরিলা দলটিকে। নিয়ে যাচ্ছে মাটির বড় ঘরটির দোতলায়। গোল হয়ে বসেছে গেরিলারা।

জাফর: ক্যান আছন কিষ্টদা?

কৃষ্ণ: গম থঅনর উপায় আছে না? চাইর মিক্কাদি দালালর উৎপাত। অনারারও সাবধান থঅন পড়িব ।

জাফর: দালাল সব সাফ হয়ে যাবে, চিন্তা করবেন না...।

দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে ছ’-সাত বছরের এক মেয়ে; হাতে একটি বড়সড় গামলা। দরজার ফাঁক গলিয়ে উঁকি দিচ্ছে ছোট এক ছেলে। কৃষ্ণ ওদের দুজনকেই হাত নেড়ে ডাকছে । ঘরের ভেতর এসে দাঁড়িয়েছে ওরা; কিছুটা কাঁচুমাচু ভাব।

কৃষ্ণ: আর মিয়া দুগ্গা আর পোয়া অজ্জুন। (দুর্গা আর অর্জুনকে লক্ষ করে) তোআঁরার কাকু যে ইতারা। (মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ করে) অনেরার খঅন; চিড়া-গুড়...

জাফর: হ্যাঁ, খিদে পেয়েছে খুব; সেই দুপুর একমুঠো খেয়েছি আমরা। সন্ধ্যা লাগতেই দিয়েছি হাঁটা। সারারাত হেঁটে এসে পৌঁছেছি এখানে, দানাপানি পেটে কিছুই পড়েনি।

বৃহৎ মাটির হাড়িতে হাত ধুয়ে খেতে শুরু করেছে ওরা সবাই। তারপর আলো-আঁধারির মধ্যে একের পর এক নিচে নেমে যাচ্ছে পেটে জমে-থাকা বর্জ্য নিষ্কাশনের তাগিদে। (ডিজল্ভ)।


বেশ বেলা করে গেরিলাদের ঘুম ভেঙেছে। দুপুরের খাবার নিয়ে দোতলায় উঠে এসেছে কৃষ্ণর স্ত্রী লাবণ্য আর মেয়ে দুর্গা। সাধারণ এক কৃষকের স্ত্রীর শরীর জুড়ে যৌবনের একী জোয়ার! উজ্জল শ্যামবর্ণ — ফরসাই বলা চলে; অপূর্ব দেহবল্লরি। খাওয়াদাওয়া সেরে মেঝেতে বিছানো পাটির ওপর বসেছে ওরা। জাফরের কমদামি সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধে নাকে জ্বালা ধরে। নির্বিকারে একটার পর একটা টেনেই চলেছে সে। আর চোখ মুদে কী যেন ভাবছে।

সুরক্ষিত: মিলিটারির ক্যাম্প এখান থেকে কদ্দুর?

কৃষ্ণ: দূর কম হৈত ন। পইট্যা এডেত্থুন চাইর-পাঁচ মাইলর কম হৈত ন, ফাঁললার১...।

সুরক্ষিত: এসেছিল নাকি এদিকে কোনওদিন?

কৃষ্ণ: আইজঅ ন আইয়ে। দালালঅলরে খুশি রাখনর লাই যেইয়ান চাআর হেইয়ান দিদ্দি এরই।

জাফর: আমরা এখানে এসে আপনাদের সমস্যায় ফেললাম না তো? দালালরা টের পেলে...

কৃষ্ণ: দেশ স্বাধীন করন পইড়লে বিপদর ঝুঁকি লঅন ন পড়িব না? দালালরে তেল মারি মারি আর কদিন চইল্লুম? আর সহ্য ন অর। হয় এসপার নয় ওসপার...।

সুরক্ষিত: দালালদের সর্দার কে, নাম জানেন?

কৃষ্ণ: ন জাইনতাম ক্যা? সালেইক্যা; জামাত করে যে এরি। হিতার হঙ্গে জয়নাইল্যাও আছে। আগে আমেলীগ কইরত।

সুরক্ষিত: বলেন কী, আওয়ামী লীগ!

কৃষ্ণ: আঁরার ঢাগদির২ গ্রামর অনিল দস্তিদারের বাড়ি তো ইতা দঅল৩ করি ফেলাইয়ে। বিয়াগ্গিন স্বার্থ...।

জাফর: এখন স্বার্থের জন্য এক দল হানাদারদের সাহায্য করছে; দেশ স্বাধীন হলে দেখবেন, আরেক দল, যারা মালদার, নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে যা খুশি তা-ই করবে...। তবে আমরা যদি জনগণকে তাদের স্বার্থ বোঝাতে পারি; যুদ্ধ যদি অনেকদিন চলে, তাহলে অন্য কথা...। (কাট)।



দৃশ্য:৩

খুব ভোরে, বসতভিটা থেকে বেশ কিছুটা ফাঁকে, কৃষ্ণ জমি তদারকিতে ব্যস্ত। ছোট ছোট ধান-চারাগুলো বাতাসে মাথা নাড়ছে মৃদু মৃদু। কিন্তু দূরে ও-কী দেখা যাচ্ছে! অনেক দূরে হলেও, আকারে খুব ছোট দেখালেও, বোঝা যাচ্ছে, কালো আর খাকি পোশাকধারী জনাদশেক সশস্ত্র লোক জমির আল ধরে ধীর গতিতে এগিয়ে আসছে এদিকেই। ত্রস্তে বাড়িমুখো ছুটে চলেছে কৃষ্ণ। রীতিমত দৌড়োচ্ছে ও। বাড়িতে পৌঁছে খবরটা দিচ্ছে তখনও ঘুমিয়ে থাকা গেরিলাদের। বিছানা ছেড়ে ঝটপট উঠে পড়ছে গেরিলারা। কাউকে কাউকে বেশ বিচলিত দেখাচ্ছে — বিশেষ করে যাদের বয়স খুব কম। কী যেন বলছে জাফর; সবাই দ্রুত তুলে নিচ্ছে নিজ নিজ হাতিয়ার।

জাফর: আমরা চাই না এখনই কোনও সংঘর্ষে যেতে। আগে প্রস্তুতির দরকার। ওরা যদি এ-বাড়িতে না আসে তাহলে ঘাটাব না। কিন্তু এসে পড়লে যুদ্ধ না করে উপায় কী...। তবে আমি গুলি ছোড়ার আগে কেউ টু শব্দটি করবে না, ঠিক আছে?

জাফরকে দেখা যাচ্ছে সবার সঙ্গে হাত নেড়ে কথা বলতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সুরক্ষিতকে দেখা যাচ্ছে এলএমজি হাতে ছুটে গিয়ে বাড়ির বাইরে একটা গর্তে শুয়ে পড়তে। নিশানা, যেদিক থেকে সশস্ত্র লোকগুলো আসছে সেদিকে। দু’জন গ্রেনেডের থলি নিয়ে গিয়ে উঠছে গাছের আড়াল-করা রান্নাঘরের ছাপরার ওপর। অন্যেরা নিচ তলায় এসে জড়ো হয়েছে। হাতে থ্রি-নট-থ্রি। জাফর এসএমসিটা ঘরের আড়ালে ধরে তাকিয়ে আছে উর্দিপরা লোকদের দিকে। এখনও বেশ দূরে ওরা। প্রস্তরমূর্তির ন্যায় একঠায় দাঁড়িয়ে জাফর। (ডিজল্ভ)।



বাড়ি থেকে ত্রিশ গজের মধ্যে এসে পড়েছে সশস্ত্র দলটি। সম্মুখে কালো পোশাক-পরা তিনজন, তাদের পেছনে খাকি উর্দি আটজন। জাফরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এক কালো পোশাক চড়া গলায় জিজ্ঞেস করছে: তুই কন?

জাফর শান্ত গলায় উত্তর দিচ্ছে: তোঁআরাত্তে কারে লাআদ্দে?৪

বাড়ির দিকে অগ্রসরমান শত্রুদল। এবার আরও জোরে হাঁক: তুই কন? মালাউন না মুসলমান?

আর দেরি নয়। এক ঝটকায় দেয়ালের আড়াল থেকে এসএমসি বার করে গুলি ছুড়ছে জাফর। সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠছে সুরক্ষিতের এলএমজি। ছাপরার ওপর থেকে ঢিল ছোড়ার মত গ্রেনেড ছুড়ছে গেরিলা দু’জন। গাছগাছালির আড়াল থেকে চলছে থ্রি নট থ্রির গুলি।

লুটিয়ে পড়ছে হকচকিয়ে-যাওয়া আগত বাহিনী। ধানখেতের ভেতর দিয়ে কেউ কেউ পালাচ্ছে প্রাণপণে।

গেরিলারা দ্রুত জড়ো হয়েছে বাড়ির সমুখে। সুরক্ষিত দাঁড়িয়েই কোমরে চেপে ধরে এলএমজির ব্রাশ চালিয়ে যাচ্ছে পলায়নরতদের লক্ষ করে।

মরে পড়ে-থাকা সাতজনের অস্ত্র সংগ্রহ করছে গেরিলারা।

জাফর: ইচ্ছা ছিল না; কিন্তু ঘটনা ঘটেই গেল। অন্যকোনও পথ কি ছিল? আমাদের এক্ষুনই সরে পড়তে হবে; এক্ষুনই। আপনারাও তাড়াতাড়ি সরে পড়েন। খবরটা হানাদার পাকিস্তানিদের পটিয়া ক্যাম্পে পৌঁছামাত্র পাল্টা আক্রমণ করতে ছুটে আসবে কিন্তু হারামজাদারা। (কাট)



দৃশ্য:৪

আবার হেঁটে চলেছে গেরিলারা। প্রায় ৭ মাইল হাঁটবার পর এসে উপস্থিত হয়েছে করলডেঙ্গা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ছবির মতন দেখতে গ্রামটিতে। দক্ষিণ করলডেঙ্গা গ্রামের বিশাল এক বাড়ি। সেমিপাকা প্রকাণ্ড এক ঘর; তার পাশে দুটো মাটির ঘর। দক্ষিণে দিগন্তবিস্তৃত ফসলের খেত। বাড়ির আঙিনা জুড়ে গাছ আর গাছ। ঝাঁকড়ামাথা অশথ, হিজল আর নিম; সওদাগরি নাওয়ের মাস্তলের মত আরো আছে সার সার দেওদার। পেছনের নালা ঘেঁষে বাঁশ আর বেতের ঝাড়। বাড়ির উঠোনে এসে জড়ো হয়েছে যোদ্ধারা। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। জাফর একাই এগিয়ে যাচ্ছে সেমিপাকা ঘরটার দিকে। ঘরে পৌঁছোবার আগেই দেখা হারাধনের সঙ্গে। হারাধনের চেহারায় বিস্ময়ের ছাপ।

হারাধন: আপনারা, এই অসময়ে!

জাফর: কিষ্টদার বাড়িতে উঠেছিলাম। ইচ্ছা ছিল ওখানেই কাটাব বেশ কিছুদিন। তা আর হল কই; পাকি আর রাজাকাররা সব মাটি করে দিল। অবশ্য শালারা মরেছে জনাসাতেক। এখন আপনাদের এখানেই থাকতে হবে যতদিন স্থায়ী ঘাঁটি গড়ে না তোলা হয়।

হারাধন: আমাদের এখানে থাকতে তো কোনও অসুবিধা নাই। খবর ছাড়া হঠাৎ করে আসলেন তাই আশ্চর্য হয়েছিলাম।

গেরিলারা মালামাল নিয়ে উঠছে সেমিপাকা ঘরের দোতলায়। অস্ত্রগুলো ঘরের এক কোণে গুছিয়ে রাখছে ওরা। হাঁটাহাঁটি করলেই কাঠের পাটাতন থেকে শব্দ উঠছে থপথপ। (ডিজল্ভ)।



শেষবিকেলে হিজল গাছের নিচে বসেছে বেশ ক’জন যোদ্ধা। ওদের সঙ্গে হারাধনকেও দেখা যাচ্ছে।

জাফর: মাসিমা কি আমাদের উপর বিরক্ত?

হারাধন: এ কথা কেন?

জাফর: না, মানে, বেশ ক’দিন তো হয়ে গেল এখানে; এখনও আমাদের সাথে স্বাভাবিক হতে পারছেন না কিনা...!

হারাধন: উহু, তা ঠিক নয়। মায়ের স্বভাবটাই ওরকম। বরাবরই কম কথা বলেন; তার উপর একটু খুঁতখুঁতে; যাকে বলে শুচিবাই আর কি। বাছবিচার করেন একটু বেশি...।

জাফর: তাহলে তো কথা নাই। ভাবছিলাম, আমরা আবার কোনও অন্যায় করলাম কিনা...।

আলীমদ্দি: রাতের ভাত রান্না করা দরকার। দুপুরের ফেলনের ডাল, আর মুলা দিয়ে ইঁচা শুটকির তরকারি তো আছেই...।

হারাধন: আপনারা তো নিজেরাই রান্না করে খাচ্ছেন। এর আগে এক বাহিনী এসেছিল, যাদের প্রতিদিন ভালো ভালো খাবার আমাদের রেঁধে খাওয়াতে হত...। মায়ের উপর কী ধকলটাই না গেছে! (ডিজল্ভ)।



আনন্দবালা: পোয়াওয়া বেইন্যা গেল যে অহনঅ নঅ আইয়ে। মন এক্কেরে কৈছালি-কৈছালি৫ গরের...।

হারাধন: জাফরদা’র কথা কঅর্যে না? কন জরুরি কামে বলে আনোয়ারা গেইয়ে। বোওৎ দূরের পথ। ফিরতে ফিরতে বোত্তৎ দেরি হইব; গোডা রাইত কাডি যাইতগো পারে। তুঁই খাইদাই ফুতি৬ পড়গুই ।

আনন্দবালা: পোয়াওয়া ন আইলে আঁর মুখত খঅন ন উডিবো, ঘুম তো আইস্তই ন...। তোঁআরা পোয়াঅলে পারস। মাঅলে ন পারে!

মাসিমার চোখ জলে ছলছল করছে; হারাধনের নজর এড়ায় না। দু’হপ্তা না-গড়াতেই মায়ের মধ্যে এত বড় পরিবর্তন দেখে হারাধন বিস্মিত হচ্ছে। (ডিজল্ভ)।



পুলক: খবরটা শুনেছেন জাফর ভাই? কিষ্টদা’র বাড়িঘর সব পুড়িয়ে দিয়েছে পাকবাহিনী। ছেলে-মেয়ে দুটোকে গুলি করে মেরেছে...।

জাফর: কী বলছ! কিষ্টদা আর বৌদির খবর কী?

পুলক: কিষ্টদা তখন বাড়িতে ছিল না। বৌদিকে ওরা তুলে নিয়ে গেছে...।

জাফর: হারামজাদা — এই পিশাচ আর ওদের দালালগুলোকে নির্মূল না করা পর্যন্ত লড়াই চলবেই...। অস্ত্রগুলো সাফ্-সুফ করা হয়েছে?

পুলক: পুলথ্রো করেছি। সেদিনের অপারেশনে ভালোই গুলি আর গ্রেনেড খরচ হয়েছে...।

জাফর: শত্রুও তো কম হালাক হয়নি...কি বলো?

আলীমদ্দি: করলডেঙ্গা ঘাঁটির কাজ প্রায় শেষ। এমন পাহাড়ের উপর ঘাঁটি বানানো হয়েছে যে, কোনও শালার সাধ্য নাই আমাদের ক্ষতি করে।

জাফর: এসব কাজে আপনার জুড়ি মেলা ভার! গাঁয়ের লোকরা খুব খাটছে কিন্তু, যাই বলেন। একেই বলে জনযুদ্ধ... বাংলা হবে ভিয়েতনাম! (কাট)।



দৃশ্য:৫

বখতেয়ারকে বেশ অস্থির দেখাচ্ছে। বারবার হাত কচলাচ্ছে সে।

হারাধন: কী হয়েছে? এত অস্থির কেন?

বখতেয়ার: এইমাত্র খবর পেলাম হানাদার বাহিনীর একটি দল পটিয়া থেকে চাটগাঁ যাবে। বিকেল চারটা নাগাদ যাওয়ার কথা। এখন সকাল ন’টা। জাফর ভাই আর সুরক্ষিতদা কোথায়?

হারাধন: খুব ভোরে কী কাজে যেন বেরিয়েছেন, কখন ফিরবেন বলেও যাননি।

বখতেয়ার: ওরা ছাড়া তো সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। বিশেষ করে জাফর ভাই। কী বিশ্রী সমস্যায় পড়া গেল...!

ওর কথা শেষ হতে-না-হতেই জাফর আর সুরক্ষিত এসে পৌঁছেছে। বখতেয়ার কিছু বলতে চাইছে, বাধা দেয় জাফর।

জাফর: সব শুনেছি। এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নাই, ওরা চারটার দিকেই চাটগাঁ যাবে। কুইক, সবাই রেডি হয়ে নাও ঝটপট, কুইক... ।

অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যদ্দুর সম্ভব দ্রুত তৈরি হয়ে নিচ্ছে গেরিলারা। মাসিমা এসে উদ্বেগ মেশানো সুরে বলছেন: বেলা অইয়ে যে বাবারা; মুখত কিছু দি লও...।

জাফর: সময় নাই মাসিমা। এখান থেকে গৈড়লার টেক যেতে কমপক্ষে দুই ঘণ্টা লেগে যাবে। ওখানে গিয়েও অনেক কাজ করতে হবে। বাধা দেয় না, লক্ষ্মী মাসিমা...।

প্রায় দৌড়োনর গতিতে ছুটে চলেছে মুক্তিযোদ্ধারা। গৈড়লার টেকে পৌঁছে গিয়েছে ১২টার মধ্যেই। ফাঁকা, জনবসতিহীন পুরোটা এলাকা। রাস্তা থেকে গজ ত্রিশেক দূরে উঁচু উঁচু কিছু মাটির ঢিবি। ঢিবির আড়ালে জাফরের পরিকল্পনা অনুসারে অস্ত্র নিয়ে পজিশন নিয়েছে যোদ্ধারা। রাস্তার বিপরীত দিকে কিলিং জোনের দুপ্রান্তে রাইফেল নিয়ে প্রস্তুত ফ্রন্ট এবং রিয়ার কাটঅফ। এলএমজি নিয়ে যথারীতি সুরক্ষিত। এসএমসি নিয়ে জাফর। পুলক আর সুজিত তৈরি গ্রেনেড নিয়ে। সব প্রস্তুতি শেষ। এখন অপেক্ষা শুধু শত্রুবাহিনীর লরির। প্রতীক্ষার প্রহর বয় অতি মন্থর লয়ে। ঘড়িতে চোখ বোলাচ্ছে বারবার জাফর। তিনটা চল্লিশ। হঠাৎই চোখে পড়ে, বেশ অনেকটা দূরে আর্মি লরির মত একটা কী যেন ধীর গতিতে এগিয়ে আসছে। গাড়ির ঘর্ঘর শব্দে সবাই সজাগ। লরিটা কিলিং জোনের ভেতর প্রবেশ করতেই জাফরের এসএমসি গর্জে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে একসাথে সক্রিয় হয় সবগুলো অস্ত্র। গ্রেনেড ফাটতে থাকে বিকট শব্দ তুলে। মিনিট পনের। অস্ত্রের আওয়াজ থেমে যায়। আর্মি লরি থেকে রক্তের ধারা চুইয়ে চুইয়ে পড়ে সড়ক রঞ্জিত করে চলেছে; এঁকে চলেছে যেন এক অপরূপ আল্পনা! (ডিজল্ভ)



মুদে-থাকা চোখ খুলি আমি। পুরনো দেওয়াল, পোড়োবাড়ি, ঘড়ি কোনও কিছুই চোখে আর পড়ছে না। আশ্চর্য তো!

কিছুক্ষণ আগের কুয়াশা কোথায়! হিমেল কুয়াশা চিরে, এ-কী, এত লোক এল কোত্থেকে! চারদিক পরিষ্কার — সূর্যের তেরচা রস্মিতে অকস্মাৎ উবে গেছে নাকি কুয়াশা, কর্পূরের মতন?

জায়গাটা কোথায়? কোনও এক ছোট্ট বাজার — ভূর্ষি বাজার কী, না-কী করলডেঙ্গা! ধারেকাছে এক কদমগাছের নিচে বাঁশের মাচানে বসে আমি; সম্মুখে হারাধন, আলীমদ্দি, বখতেয়ার, পুলক দাস, সুজিত বড়ুয়া — আরো অনেকেই। সময়ের অদৃশ্য পরশ সবার চেহারা আর শরীরে নিয়ে এসেছে কত পরিবর্তন; চেনাই দুঃসাধ্য। হারাধনের একমাথা চুল কোথায় হাওয়া! সারা মুখে বলিরেখা। পালোয়ানের মত পেটা শরীর ছিল আলীমদ্দির, কে বলবে কুঁজো হাড্ডিসার লোকটিই সেই আলীমদ্দি! মুখ জুড়ে ধূসর দাড়ি; ছেড়া-ফাটা পাঞ্জাবি পরনে। ষোল বছরের পুলক এখন ছাপ্পান্ন বছরের এক স্কুল-টিচার। কিন্তু জাফর কোথায়? সুরক্ষিত?

– কত বছর পর আসলেন হীরা ভাই, আপনার কথা আমরা কত বলি...। আবেগ মাখানো গলায় বলে হারাধন ।

– তাই? আমারও মনে পড়ে সেইসব দিনের কথা। মাসিমা কেমন আছেন?

– মা গত হয়েছে একাশি সালে। ত্রিশ বছর হয়ে গেল দেখতে দেখতে। খুব বলত আপনার কথা — খুব বলত। আমাকে কতবার বলেছে, একবার আপনাকে তার কাছে নিয়ে যেতে।

– কেমন আছেন, জাফর ভাই? চল্লিশ বছর পর মনে পড়ল আমাদের কথা? পুলকের কথায় কিছুটা অভিমানের সুর।

– এখন কি ঢাকাতেই থাকেন, না-কী কাক্সোবাজারে, সুরক্ষিত দা? সুজিতের প্রশ্ন।

– আপনারা সবাই ভালো তো?

– বেঁচেবর্তে আছি..., ভালো থাকা কাকে বলে বুঝি না... ।


কান ঝালাপালা-করা শব্দে মাইক বেজে চলেছে: ভাইসব, আজ বিকাল চার ঘটিকায় উত্তর ভূর্ষি বাজারে বিশাল জনসভা; জনসভায় প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকিবেন এলাকার কৃতিসন্তান মাননীয় সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব আলহাজ মোহাম্মদ জয়নাল আবেদিন চৌধুরী সাহেব...; ভাইসব, আজ বিকাল চার ঘটিকায় দক্ষিণ করলডেঙ্গা বাজারে বিশাল জনসভা; জনসভায় প্রধান অতিথি...; ভাইসব, আজ বিকাল চার ঘটিকায় পটিয়া বাজারে বিশাল জনসভা...; ভাইসব, আজ বিকাল চার ঘটিকায়...


কিছুক্ষণ আগে চোখ বুজে বা তারও আগে যা কিছু দেখেছিলাম, তা কি স্বপ্ন? নাকি এখন চোখ খুলে যা দেখছি তা-ই স্বপ্ন! কী জানি, বুঝি না!


--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------


চট্টগ্রামের ভাষা বোঝা সহজ নয়। সংলাপে যেটুকু ব্যবহার না করলেই নয়, করা হল। পাঠক লক্ষ করবেন, কারও মুখে প্রমিত বাংলা, কারও চাটগেঁয়ে। সবার সংলাপ চাটগেঁয়ে হলে তা দুর্বোধ্যতার সীমা ছাড়িয়ে যেত। ইচ্ছা করেই তাই এই মিশ্রণ। তারপরও, যেগুলো বোঝা খুবই কঠিন সেগুলোর অর্থ দেওয়া হল।

১ ফাঁললার>বোধহয়। ২ ঢাকদির>পাশের। ৩ দঅল>দখল। ৪ তোঁআরাত্তে কারে লাআদ্দে?>তোমাদের কাকে লাগবে?

৫ কৈছালি-কৈছালি>আনচান। ৬ ফুতি>শুয়ে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন