বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৫

শিমুল মাহমুদের কথাসাহিত্য : সঙ্কটের নানামুখী বয়ান

মাসুদ পারভেজ


সামন্ত ব্যবস্থা সেই কবে ফুরালে মহাকাব্যেরও ইতি ঘটে। তখন মহাকাব্যের নায়কের মতো অতিমানবীয় কোনো চরিত্র আর আসেনা কথাসাহিত্যে। যে চরিত্র একাই সব বিপদ আপদ মুশকিল আসানের ভার নেবে। সেইরকম চরিত্র আসে না ঠিক কিন্তু সঙ্কট ঠিকই আসতে থাকে। আর এইরকম সঙ্কট কিংবা পুঁজিবাদী শাসন ব্যবস্থায় বড় নিয়ামক হয়ে ওঠে ব্যক্তি। ব্যক্তির উত্থান, ব্যক্তির পতন, ব্যক্তির ক্রমবিকাশ, ব্যক্তির ক্রমবিনাশ সবই ঘটতে থাকে একই চক্রে। ব্যক্তি, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য, ব্যক্তিসর্বস্বতা একই সরলরেখায় আসতে থাকে। অবস্থা যখন এমন হয় তখন বৃহৎ কলেবরে ঘটে যাওয়া ঘটনা ইতিহাসে ঠাঁই পায় কিংবা ক্ষমতাসীনদের বুলি হয়। আর এর বাইরে যা থাকে তা আলোর মুখ দেখে না কিংবা আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়। সাহিত্যিক শিমুল মাহমুদ তেমনি এক আস্তাকুড়ের কাহিনি শোনাচ্ছেন--- ‘শীলবাড়ির চিরায়ত কাহিনী’ (২০০৭)।


শীলবাড়ির চিরায়ত কাহিনী নামে যে আখ্যান সেখানে কোনো সরল রৈখিক কাহিনি কাঠামো লেখক নির্মাণ করেননি। ঘটনা পরম্পরায় সিকোয়েন্সের ভেতরে দৃশ্য, দৃশ্যের ভেতরে আরও দৃশ্যের এক খেলা চলে। এই খেলায় কাহিনিকার দ্বিবাচনিকতার আশ্রয় নেয়। এটার একটা কারণ আছে বৈকি। আখ্যানের কাহিনিতে উত্তর ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে এমন এক অবস্থাকে তিনি হাজির করেছেন যেখানে ব্যক্তি আর রাষ্ট্রযন্ত্র এক দ্বন্দ্বে লিপ্ত হচ্ছে। যেখানে ব্যক্তি মহাকাব্যের নায়ক না হওয়ায় বারবার প্রত্যাখ্যাত হয় আর পরাজয় তার শেষ গন্তব্য। আমরা এমন একটা সময়ে বাস করি যখন সঙ্কটমুখী হয়ে সমাধানের চেয়ে সঙ্কট নিয়ে বেঁচেবর্তে থাকাটাই শ্রেয় মনে করি। এর কারণ ঐ যে ব্যক্তিসর্বস্বতা। আমাদের সামনে নজির রাখা হয় ব্যক্তি যদি রাষ্ট্রযন্ত্রের অপশাসনের বিপক্ষে কথা বলে তাহলে তার পরিণাম কী হবে। যেমন পরিণাম দেখা যায় আখ্যানের প্রধান চরিত্র অধ্যক্ষ অশোক শীলের।

অশোক শীলের ফাঁসির মধ্য দিয়ে আখ্যানের শুরু হচ্ছে। তারপর ধীরে ধীরে উন্মোচিত হবে আখ্যানের কাহিনি। কে এই অশোক বাবু কিংবা তার ফাঁসির হেতু কী আরও খোলাসা করলে কে এই শীল গোষ্ঠী কিংবা এই ভূখণ্ডে তাদের আগমনের ঘটনা। এটাকে আমরা ইতিহাস বলব নাকি নিম ইতিহাস বলব নাকি শুধুই একটি আখ্যান বলব তা পরে বিবেচ্য।

...‘যদিও আমাকে একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীর চিরায়ত কাহিনী লিখতে হচ্ছে; যা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের ঐতিহ্যগত ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত এবং আমাকে নিরাপত্তার স্বার্থে অধিকাংশ ভীতিকর ঘটনা গোপন রাখতে হচ্ছে; এবং পুস্তক ব্যবসায়ীদের মতো বলতে হচ্ছে, এই গ্রন্থের কোন ফিচার, কার্টুন বা মন্তব্যের সাথে জীবিত বা মৃত, অর্ধমৃত বা অর্ধজীবিত কারোরই জন্মসূত্রে কোনভাবেই কোন সম্পর্ক নেই; তারপরও যদি কোন বিশেষ সম্পর্ক আবিষ্কার করে ফেলেন তবে সেটা পাঠকের বাড়তি প্রতিভা হিসেবেই বিবেচিত হবে’(পৃ.-৭১)। এই কথাগুলো আখ্যানের বয়ানকারীর।

আখ্যানের প্রবেশ পথেই লেখক ইতিহাসের দিকে চোখ রাখছেন। শীলগোষ্ঠীর পরিচয় বর্ণনায় জানা যাচ্ছে, যখন তারা করতোয়ার তীরে বসতি স্থাপন করেন তখন কলম্বাস কেবল ইতালির বন্দরনগরী জেনোয়াতে এক তাঁতি পরিবারে জন্মগ্রহণ করে। এখানে শীল গোষ্ঠীর বসতি স্থাপনের সাথে কলম্বাসের জন্মসূত্র টেনে আনার কারণ একটা প্রশ্নের সম্মুখীন করার জন্যে। কলম্বাস যখন রাণী ইসাবেলার পৃষ্টপোষকতায় নৌ অভিযানে বের হয় তখন শীল গোষ্ঠী দামোদার নদীর ভাঙনে সর্বস্বান্ত হয়। যখন রাষ্ট্্র কিংবা পঞ্চায়েত কেউ শীল গোষ্ঠীর দায়িত্ব নিতে চায়নি তখন তারা সমতল ভূমি পাড়ি দিতে শুরু করে এবং তাদের দলটির নেতৃত্ব দেয় দেবপ্রিয় শীল এবং তার স্ত্রী করুণাময়ী শীল। জীবিকার নানামুখী সঙ্কটে শীল গোষ্ঠী যখন বিলীন হওয়ার দশায় তখন মাত্র এগার জন শীলসদস্য নিয়ে দেবপ্রিয় শীল ও করুণাময়ী শীল নলিতাবাড়িতে শীলবাড়ির গোড়া পত্তন করেছিলেন। ঠিক তখন আরেকটা তথ্য আমরা জানতে পারি যে, এই ঘটনার ঠিক ২৯৬ বছর আগে ইখতিয়ার উদ্দিন খিলজি পূর্ব বাংলার কিছু অংশ দখল করে নেয়।

আখ্যানে বর্ণিত তিনটি ঘটনাকে একটি প্লাটফর্মে ধারণ করতে গেলে আমরা দেখি---

১. কলম্বাস, যিনি ১৪৯২ এর ৩ আগস্ট প্যালোস বন্দর থেকে যাত্রা করেছিলেন ভারত লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যে,

২. শীল গোষ্ঠীর বানভাসি নেতা দেবপ্রিয় শীল এবং তদপত্নী করুণাময়ী শীল, যাদের প্রয়োজন ছিল একটি স্থায়ী নিবাস ভূমির এবং

৩. ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি; যার সাথে ছিল দেবপ্রিয় শীলের মতই মাত্র ১১ জন।

এই তিনজনের মধ্যে কে কতটুকু তস্কর বা কতটুকু লিগ্যাল? এই ত্রিবিধ সমস্যার ভেতর থেকে শীল গোষ্ঠীর উত্তর পুরুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, অধ্যাপক অশোক কুমার শীলকে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলানো হচ্ছে একটি ধর্মভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার মতো ভয়ানক এক উদ্দেশ্য নিয়ে। (পৃ. ১২)



এখানে অশোক শীলের ফাঁসি দেওয়ার কারণ সম্পর্কে লেখক ইঙ্গিত দিলেন। আখ্যানের শুরুতে লেখক অশোক শীলের ফাঁসি দেন তারপর কারণ বলছেন আর এবার আমরা ফাঁসির পেছনে যে মেকানিজম তা দেখতে পাব। এই মেকানিজমে আছে ঔপনিবেশিক কাঠামোর মধ্যে পালিত হওয়া শাসকের নিজেদেরও ঔপনিবেশিক মানসিকতা ধারণ করার চিত্র। ফলে শাসক আর শোষিতের যে চিত্র আখ্যানে উঠে আসছে সেখানে ক্ষমতা কাঠামো দখলের জন্যে ধর্মান্তরকরণ পর্যন্ত চলছে। বাইট্টা বাদল নামক এক সন্ত্রাসীকে দেখা যাচ্ছে এমপি ইলেকশনের জন্যে তোড়জোড় করতে আর তারই কৌশল হিসেবে সে অশোক শীলের বোন জোছনা শীলকে উঠিয়ে নিয়ে যায় এবং ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করে। তখন জোছনা শীল হয় জোবায়দা বাদল তালুকদার। আসল মেকানিজমটা হল জোছনার মাধ্যমে অশোক শীলের ওপর একটা মানসিক চাপ প্রযোগ করা আর যেহেতু অশোক শীল গোষ্ঠীর নেতৃত্ব প্রদানকারী তাই তার হাতে শীল গোষ্ঠীর সকল ভোট আছে তার বাইট্টা বাদলের জন্যে নিশ্চিত করা। আর এই ভোট ব্যাংককে হাতে পাওয়ার জন্যেই বাইট্টা বাদলের ভিলেজ পলিটিক্স। এই পলিটিক্সে অশোক বাবু বড় ফ্যাক্টর। তাকে আবর্তিত করেই আখ্যানের কাহিনি ডালপালা বিস্তার করছে। যেমন, অশোক বাবু নিখোঁজ হওয়ায় তার শ্বশুর সুবোধ শীলকে দিয়ে অপহরণ মামলা করানো হয় আর তাতে আসামি বানানো হয় অপজিশন গ্রুপের ১১ জনকে। এখানে বাইট্টা বাদল একটা পলিটিক্স করে আর তার শিকার হয় শীল গোষ্ঠী। যেহেতু অপজিশন গ্রুপের লোকদের আসামি বানানো হয়েছে এবং তারা এই কাজের সাথে জড়িত নয় তাই তারা প্রতিশোধ নিবে এবং সেই অবস্থায় অশোক বাবু এবং তার শ্বশুর গোষ্ঠী বাদল তালুকদারের কাছে আশ্রয় নিতে বাধ্য থাকবে। কিন্তু অশোক বাবু তা বুঝতে পারেনি কিংবা সংখ্যালঘু মানসিকতা নিয়ে তার সবকিছু বোধগম্য হওয়ার কথাও নয়। কারণ ব্যক্তি যখন তার ‘আইডেনটিটি ক্রাইসিসে’ ভুগে তখন তার চিন্তাভাবনার জগত সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। আর এই সুযোগটা নেয় নিপীড়ক শাসকগোষ্ঠী। যা শীলগোষ্ঠীর মানুষদের সাথে ঘটে। যার ফল হিসেবে অশোক শীল অপজিশন গ্রুপের ফাঁদেও আটকা পড়েন। আর তাতে আবার মঞ্চে উঠে দীর্ঘদিনের নিপীড়নের ক্ষোভ তার জবানে উগলে ওঠে। তখন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের যে চারটি মূলনীতি ছিল তা উদ্ধারের জন্যে আরেকটি যুদ্ধের কথা বলেন। অশোক শীলের এই মূলনীতির জন্যে যুদ্ধের আহ্বান আসলে স্বাধীনতাকামী এক স্বপ্নভঙ্গ জাতির মিনমিনে আকাক্সক্ষা। যা কখনোই পূরণ হয় না। আর এই মিনমিনে স্বভাবের মানুষের উপর যখন আরও মানুষ নির্ভর করে তখন সে ভার বহন করার ক্ষমতা না থাকার যে পরিণতি তা অশোক শীলের পরিণতির মধ্য দিয়ে উঠে আসে।

রাজনীতির মারপ্যাচ কিংবা ক্ষমতাসীনদের সাথে আপোষকামী না হওয়ায় অশোকবাবুর নামে নারী পাচারের মিথ্যা মামলা দেওয়া হচ্ছে। আর এই মামলার বাদী হিসেবে সৌদিতে নার্সের চাকরির কথা বলে পাঠানো ফরিদা বানুকে হাজির করা হচ্ছে। কিন্তু আসল ঘটনা তো অন্যখানে। ফরিদা বানুকে সৌদি পাঠানো হয় ঠিকই কিন্তু নার্সের চাকরি দিয়ে নয়, দেহ ব্যবসা করতে। সেই ফরিদা বানুকে ফিরিয়ে আনার পর সে অশোক শীলের কাছে আশ্রয় নেয় কিন্তু ভিলেজ পলিটিক্সের প্যাচে অশোক শীলকেই নারী পাচারকারী হিসেবে মামলা খেতে হয়। এসব ঘটনা হরহামেশা ঘটে যাওয়া ব্যাপারের মতো মনে হয় যখন লেখক সমকালীন বিশ্বের ঘটনা সমান্তরালে আখ্যানে হাজির করেন। তখন আমরা অশোক বাবুর চুরি হয়ে যাওয়া সন্তান কৃঞ্চের খবর পাই। আরও খবর পাই যে, কৃঞ্চ ধর্মান্তরিত হয়ে একটি মাদ্রাসায় পড়ে। এসব খবর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। জেলখানায় জেসমিন চৌধুরী নামে এক নারী নেত্রী যাকে পুলিশ রাস্তায় বেধড়ক পিটিয়েছিল তার সাথে অশোকের পরিচয় হওয়া কোনো কাকতালীয় ব্যাপার হিসেবে হাজির হয়নি। এখানে কয়েকজন নারীকে আমরা সমান্তরালে ভাবনার জগতে আনতে পারি আখ্যানের পরিস্থিতি বিচারে। যেমনÑ জেসমিন চৌধুরি, রোহিনী, মুখতারান মাই, কমলা সুন্দরী, রেণুকা দেবী। প্রত্যেকের সাথে একটি করে কাহিনি জড়িত আছে আর তা পুরুষশাসিত সমাজব্যবস্থায় উৎসারিত।

আখ্যানের মূল কাহিনি হল সংখ্যালঘু এক গোষ্ঠী মানবের ফাঁসি এবং সেই গোষ্ঠীর বিলীন হওয়ার ঘটনা। তখন বলা যায়, ফাঁসি তো অনেকের হয়েছে কিংবা হতে পারে। যেমন, ইতিহাস থেকে পাওয়া যায় সক্রেটিস, বেঞ্জামিন মোলায়সি, নাজিম হিকমত, ক্ষুদিরাম, সাদ্দাম এদের সবার ফাঁসি দেওয়া হয়। তার সাথে অশোক শীলের নাম যুক্ত হলে কীই-বা এসে যায়। তবে এক্ষেত্রে ব্যাপারটা তেমন নয়। অশোক শীলের যে ব্যক্তিত্ব লেখক হাজির করেছেন তাতে তাকে কখনোই মহাকাব্যিক কোনো নায়কের ভূমিকায় পাওয়া যায়নি। বরং সংকটের জালে আটকে পড়া পলায়নপর এক চরিত্র হিসেবে পাওয়া গেছে। আর এখানেই অশোকের ‘আইডেনটিটি ক্রাইসিস’ ধরা পড়েছে। ক্রাইসিস আরও ফুটে ওঠে যখন সে গিরিবালার কাছে তার যৌনাকাঙ্ক্ষা মেটায়। তখন অশোক বাবু সম্পর্কে আরেকটি কথা বলা যায় আর তা হল, সে শিক্ষিত মিডিলক্লাস শ্রেণির মানসিকতার ধারক। যাদের দিয়ে বিপ্লব হয় না। আর এখানেই অশোক তার ফাঁসির মাহাত্ম্য হারায়।

‘শীলবাড়ির চিরায়ত কাহিনী’র সাথে লেখক মিথ-পুরাণ-সভ্যতা-ইতিহাস-বিশ্ব রাজনীতির একটা যোগসাজেশ করেছেন। এইসকল বিষয়ের দিকে নজর দিলে পাওয়া যায়--- গঙ্গারিড, মোঘল শাহজাদা, কলম্বাস, রাণী ইসাবেলা, ইখতিয়ার উদ্দিন খিলজী, দামোদর নদী, মান সালভাদর, রেড ইন্ডিয়ান, গোয়াডলুপ দ্বীপ, হাইতি, চেঙ্গিস খান, বসনিয়া, ইরাক, বরফ যুগ, ইবনে সিনা, ইলা মিত্র, কানসাট, সুদান, নেপাল, করতোয় নদী, পুন্ড্ররাজ্য, কাশ্মীর যুবরাজ, লাঙলবন্দ, মেক্সিকোর সিটি আব দ্য গড্স, গৌতম বুদ্ধ। এইসব অনুষঙ্গ আখ্যানে বিভিন্ন সূত্র ধরে এসেছে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে এসব বিষয় প্রশ্নের সম্মুখীন করে। আর এই প্রশ্ন হল একটি মানব গোষ্ঠীর বিলীন হওয়া প্রসঙ্গে, অস্তিত্ব সংকট প্রসঙ্গে। তখন কেবল বলা যায়, রাষ্ট্র স্বাধীন হলেও সবার জন্যে স্বাধীনতা সমান অর্থ বহন করে না। রাষ্ট্রকাঠামো গণতান্ত্রিক হলেও গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থ শাসকেরা ধারণ করে না। যার ফল হিসেবে আমরা কেন্দ্র আর প্রান্তের বিভাজন দেখি, সংখ্যালঘু আর সংখ্যাগুরুর বিভাজন দেখি। আর এইসব কিছুর সম্মিলন হল শিমুল মাহমুদের শীলবাড়ির চিরায়ত কাহিনী।

২.
শিমুল মাহমুদের গল্পগ্রন্থের খোঁজ করলে ইলিশ খাড়ি ও অন্যান্য গল্প (১৯৯৯), মিথ মমি অথবা অনিবার্য মানব (২০০৩), হয়তো আমরা সকলেই অপরাধী (২০০৮) হাতে ঠেকে। এরপর ২০১৫ তে প্রকাশ পেয়েছে ‘ইস্টেশনের গহনজনা’ আর ২০১৬ তে প্রকাশ পেতে যাচ্ছে তাঁর ‘নির্বাচিত গল্প’। গল্পকার শিমুল মাহমুদ তাঁর প্রথম তিনটি গল্পগ্রন্থে মোট ২১টি গল্পকে স্থান দিয়েছেন। বিষয় বৈচিত্র্য আর গল্প বলার কৌশল হিসেবে প্রতিটি গল্পই পৃথক কাহিনি নিয়ে হাজির হয়েছে। আর গল্পকারের উপন্যাস থেকে জানা যায়, মিথ সম্পর্কিত বিষয়টি উপন্যাসের মতো তাঁর গল্পেও এসেছে। মিথের সাথে তিনি রাজনীতি, গ্রামীণ জীবন, নাগরিক মনকে, গল্পের বিষয় হিসেবে আটক করেছেন। আটক করা এই অর্থে বলা যায় যে, চাইলেই গল্পের চরিত্র কিংবা কাহিনিকে বিশ্বাসযোগ্য করে গাল্পিকভাবে পাঠকের কাছে উপস্থাপন করা যায় না, আটকাতে হয়। ঐযে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বাংলা ছোটগল্প কি মরে যাচ্ছে প্রবন্ধে বলেছিলেন,‘একটি মানুষকে একটিমাত্র অনুভূতি বা সমস্যা দিয়ে চিহ্নিত করা এখন অসম্ভব। লেখকের কলম থেকে বেরুতে-না-বেরুতে এখনকার চরিত্র বেয়াড়া হয়ে যায়, একটি সমস্যার গয়না তাকে পরিয়ে দেওয়ার জন্যে লেখক হাত তুললে সে তা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে গায়ে তুলে নেয় হাজার সংকটের কাঁটা।’ শিমুল মাহমুদের গল্পে এই ব্যাপারটি উঠে এসেছে সাবলীলভাবে। যেখানে ব্যক্তির সংকটের ভেতর দিয়ে সমাজ এবং সমাজের ভেতর দিয়ে রাষ্ট্রকে ধরার একটা চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। আর এইসব সঙ্কটের বিনির্মাণ করেছেন লেখক বিভিন্ন ইঙ্গিতের মধ্য দিয়ে।

লেখকের প্রথম গল্পগ্রন্থ ইলিশ খাড়ি ও অন্যান্য গল্প-এর প্রতিটি গল্প বিষয় বৈচিত্র্য নিয়ে হাজির হয়েছে। ইলিশ খাড়ি গল্পে মুক্তিযুদ্ধের কোনো ভয়াবহ বর্ণনা নেই তবে সামান্য ইঙ্গিত আছে আর তাতে যুদ্ধের প্রেক্ষাপট খাড়া হয় বীভৎসতার ম্যাজিক নিয়ে। যখন এক ধর্ষিতা নারীকে ইলিশ খাড়িতে ফেলে দেওয়া হয় আর সেই হতভাগা নারীকে ইলিশেরা ঠুকরে খায় তখন অনেকদিন পর গ্রামে যুদ্ধের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া ঘোষদের বউটার খাড়িটার মধ্যে ভেসে উঠে চড়া সুরে গান গাওয়ার কাহিনি চলে। এই ঘটনা গল্পের কেন্দ্রীয় কোন বিষয় না তবে গল্পকে জাঁকিয়ে তোলে। আর অরবিন্দ যখন তার পিতৃসূত্রে পাওয়া ইলিশ খাড়ি রক্ষায় জখম হয় এবং এর কিছুদিন বাদে নিখোঁজ হয় এবং চারদিন পর ইলিশ খাড়িতে সে ইলিশের খাবার হয় তখন সেই যুদ্ধের সময়ের স্মৃতি ইলিশের মুখে আবার উঠে আসে। লেখক কোনো মানুষের মুখে যুদ্ধের বয়ান শোনাননি। শোনাচ্ছেন এক বয়স্ক ইলিশের মুখে সেই সময় তারা যেভাবে মানুষের শরীর ঠুকরে খেয়ে শরীরে চর্বি জমিয়েছে। এসব গল্পের মধ্যে আবার হুট করে রাজনীতির এক প্যাচ দেখাচ্ছেন, ‘ইলিশচুক্তি হলে ওদের হাতে আর পয়সা আসবে না। তখন সরকার নিজেই কলকাতার বাবুদের কাছে ইলিশ বিক্রি করবে।’ এটা তো আমাদের বাস্তব জীবন থেকে উৎসারিত এক চিত্র। যখন নদীর পানি বন্টন নিয়ে কলকাতার বাবুরা বাহানা করেন তখন ইলিশের স্বপ্ন আর কতদিন থাকবে সেটা একটা বিষয়। নদীতে পানি না থাকলে ইলিশ আসবে কোত্থকে! এই সমস্যার উল্লেখ গল্পে নাই তবে অরবিন্দ মরার পর আগের যে-একটা স্বপ্ন ছিল তার আরেকটা ছেলে হবে যে ছেলে তার মতো মাছ ধরবে আর ইলিশ খাড়ি রক্ষা করবে তা যে-বাস্তবায়িত হবে না মানে বাংলাদেশের ইলিশের ভবিষ্যৎ যে বেহাত তা অরবিন্দের মৃত্যুর প্রতীকে উঠে এসেছে।

এই গ্রন্থের প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী গল্পে স্বপ্ন আর বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি নিয়ে লেখক এমন এক গল্প শোনাচ্ছেন যেখানে উঠে আসছে ‘মাতৃতুগ্ধপাপ’ ব্যাপারটি। গল্পে আরও পাওয়া যাচ্ছে মাতৃদুগ্ধসঙ্কটে শিশুদের কান্না। গল্পের একবারে শেষে ব্রেস্ট-ক্যান্সারে মৃত এক নারীর কথা জানা যাচ্ছে।

আমার মেয়ের নাম ছিল প্রজ্ঞা গল্পে তথাকথিত সভ্য মানুষের চিত্র উঠে এসছে যারা সন্তান জন্মদান এক ঘিনঘিনে কর্ম মনে করে। আর এতে তাদের জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য যেন নষ্ট হয়ে যায়। ‘রিয়া আপারা তো চার মাস এক বিছানায় ঘুমাতে পারেনি। শেষটায় কি বাজে অবস্থা।’ এই বাজে অবস্থা বলতে ইঙ্গিত করা হয়েছে সন্তান জন্মদানের পরবর্তী সময়কে। যার বিপরীতে সেই দম্পতি অ্যাবরশন করে নিজেরা পরিছন্ন হচ্ছে।

স্বপ্ন শিমুল মাহমুদের গল্পে একটি অন্যতম অনুষঙ্গ। চিত্রশিল্পী বিয়াত্রিচ গল্পেও স্বপ্নের আভাস পাওয়া যায়। তবে গল্পের মূল কাহিনি অন্যখানে যখন একজন নারীর মনে পুরুষ হওয়ার প্রচ্ছন্ন সাধ জাগে। তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চিত্রাঙ্গদা’র কথা উঠে আসে।

আখবাটী গল্পটি সাম্প্রতিক বিষয়ের এক বয়ান। আখবাটী নাম থেকেই উপলব্ধি করা যায় চিনি সংক্রান্ত বিষয় আশয়। আর এটা শুরু হয় আখের রসে চিনি তৈরি করতে গিয়ে বাখের আলীর পুড়ে যাওয়া ঘটনার মধ্য দিয়ে। ঘটনার ভেতর থেকে ইঠে আসে সরকারি নিষেধাজ্ঞা যে আখচাষীরা গুড় জ্বাল দিতে পারবে না। তখন আরও উঠে আসে সরকারি চিনির মিল বন্ধ হওয়ার চিত্র। যেখানে পাওয়া যায় ‘ভারতের চিনিতে লাভ বেশি’ এমন তথ্য। গল্পে আখচাষীদের দুর্দশার চিত্র আর মায়মুনার দুর্দশা সমান্তরালভাবে গল্পকার তুলে ধরেছেন। আখচাষীরা যেমন রাষ্ট্র ব্যবস্থার কাছে নির্যাতিত তেমনি মায়মুনাও একসময় মরে পড়ে থাকে।

মিথ মমি অথবা অনিবার্য মানব (২০০৩) লেখকের দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ। গল্পগ্রন্থের নামকরণ থেকে তিনটি বিষয় পাওয়া যাচ্ছে। মিথ, মমি এবং মানব। গল্পের শেষাংশে এক ধরনের পরিণতির কথা পাওয়া যায় কিংবা কোনো মেসেজ যা পাঠককে নিয়ে যায় ঈশপের সেইসব নীতিকথামূলক গল্পের কাছে।

গল্পগ্রন্থের প্রথম অংশ মিথ-এ তিনাট গল্প আছে। গল্প তিনটি হল, বুদ্ধ বলিলেন আমি এক জীবনে বহু জীবন ভোগ করিতে চাই, কুকুর জীবন ও ধানী দেবতার অভিশাপ, অতঃপর আক্কাস আলী দ্বীনের পথে বাহির হইল। মিথ ব্যাপরটির সাথে এক একটি গল্প চালু থাকে যা প্রাচীন কোনো ঘটনা থেকে উৎসারিত হয়ে আমাদের মধ্যে বসত গড়ে আবার কখনো কখনো আমাদের চালিত করে। এই গল্প তিনটিতে মানুষকে যে-মনোবৃত্তি দিয়ে লেখক নির্মাণ করছেন তাতে মানুষ হয়ে গেছে মিথ, তার কর্মকান্ড দ্বারা। মানুষের এইসব কর্ম এমন রূপ লাভ করেছে যে, দেবতারা মানুষকে নিয়ে শঙ্কিত থাকেন। বুদ্ধ বলিলেন আমি এক জীবনে বহু জীবন ভোগ করিতে চাই গল্পে বুদ্ধকে যখন প্রভু স্বর্গবাসী হওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে বুদ্ধ তা না নিয়ে মৃত্যুহীন অমরতা কামনা করছে। আর এরই ধারাবাহিকতায় আবার তার পৃথিবীতে আগমন ঘটলে যন্ত্রণাময় এক জীবন সে লাভ করে। কিন্তু তার তখন আর কোনো উপায় থাকে না কারণ গল্পের নামকরণে বুদ্ধের যে চাওয়া তারই ফল সে ভোগ করছে। ‘পৃথিবীবাসীর জন্য আমি মৃত্যু ব্যতীত আর দ্বিতীয় কোন আশীর্বাদ রাখিনি।’ কেন মৃত্যু আশীর্বাদ তা গল্পে লেখক তুলে ধরেছেন তবে সরাসরি নয়। এক শিক্ষার মাধ্যমে। তাই শেষে প্রশ্ন রাখছেন, বুদ্ধ তুমিই বলো, মৃত্যুহীন জীবন আজ কেমন? এ প্রশ্ন পাঠকের কাছেও করা হয়েছে। মিথ বিষয়ক গল্পগুলোকে লেখক বিনির্মাণ করেছেন। কুকুর জীবন ও ধানী দেবতার অভিশাপ গল্পটির মধ্যেও সেই সত্য নিহিত। যাতে মানব মনের রিপুর বিষয়টিকে লেখক প্রাধান্য দিয়েছেন আর তা কীভাবে প্রতিনিয়ত এক ভয়াবহ বিকারের মধ্যে মানুষকে তাড়িত করে আরেফ আলীর মাধ্যমে তা তুলে ধরেছেন। গল্পের শেষে লেখক তাই জানান দিচ্ছেন, মানুষের রিপু তাড়না এমনই প্রবল যে, মানুষ প্রতিনিয়ত পেরেসানির মধ্যে বাস করলেও প্রকৃত প্রস্তাবে মানুষ পেরেসান হয় না বরং পক্ষান্তরে দেবতাগণই পেরেসান হন। গ্রন্থের প্রতিটি গল্পে লেখক মানুষের মনোজগতের চিত্র তুলে ধরেছেন আর তাতে জিন, ভূত, পরীর অনুষঙ্গ এসেছে। আর এসবের পটভূমি হিসেবে কখনো গ্রামীণ পরিবেশ আবার কখনো নর-নারীর একান্ত আবেগঘন মুহূর্ত উঠে এসেছে।

হয়তো আমরা সকলেই অপরাধী গল্পগ্রন্থে ব্যক্তির জটিল মনোজগতের রহস্যকে চিত্রিত করেছেন লেখক। চেতনাপ্রবাহ রীতি গল্পগুলোর সরলরৈখিক বর্ণনায় যে প্রভাব বিস্তার করেছে তাতে পাঠক আচ্ছন্ন হয়। শত্রুসম্পত্তি গল্পে মৃদুল নামক চরিত্রটি সবার মাঝেই বাস করে। বালকবেলার স্মৃতিচারণ করে নস্টালজিক হয়ে যাওয়া, সাতচল্লিশের দেশভাগের কারণে কলকাতায় যাওয়া, পুরনো স্মৃতির টানে ফিরে আসা, তারপর খুঁজতে থাকে তার স্মৃতিময় অতীত। কিন্তু ততদিনে অনেক কিছু পাল্টে গেছে। তখন লেখক মৃদুলের অন্তর্মুখী বয়ান আমাদের সামনে তুলে ধরেন। তাতে উঠে আসে তার শৈশব-কৈশোর-প্রেম-সঙ্কট। একজন কবির ব্যক্তিগত জটিলতা গল্পের নামকরণ থেকে আন্দাজ করা যায় বিষয় কী হতে পারে। আর সেই বিষয়কে লেখক খোলাসা করেছেন। সেক্ষেত্রে বলা যায় গল্পকার নিজেও একজন কবি। আর তার বাস্তব অনুভূতির সূক্ষ্ণ বয়ান উঠে আসছে গল্পে। যদিও গল্পে ব্যক্তিগত জটিলতা বলা হচ্ছে কিন্তু রাষ্ট্রীয় সঙ্কটও উঠে এসেছে। তার মানে কবির ব্যক্তিগত জটিলতা কখনোই ব্যক্তিসর্বস্ব হয় না। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময়কার চিত্র, যখন কবি আর তার সঙ্গিনী বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে বাড়ি যাবার পথে হোটেলে রাত কাটায় তা অনেক দিন পর আবার ফিরে আসে কবির ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণায়। নস্টালজিক কবি সেই রাতের নারী কাবেরী কান্তাকে নিয়ে গল্প লেখেন।

নিতাই বৈরাগীর সঙ্গীতকথা গল্পে গ্রাম্য এক বাউলের জীবন দর্শন আর তার মৃত্যুবিষয়ক এক আবহ নির্মাণ করেছেন লেখক। এখানে প্রশ্ন এসেছে মানুষের মৃত্যু পরবর্তী অবস্থা নিয়ে। আর তাতে উঠে এসেছে রমজান মুন্সী, রমিজ আর মায়ার কথা। খোয়াব এই গল্পের অন্যতম চালিকা শক্তি হিসেবে এসেছে। গ্রামের এক সহজিয়া মানুষের জীবনকে দার্শনিক মহিমায় লেখক তুলে ধরেছেন।

শিমুল মাহমুদের গল্পে সঙ্কটের নানামুখী বয়ান উঠে এসেছে। হয়তো আমরা সকলে অপরাধী কিংবা অন্ধজনে দেহ আলো গল্পগুলো ব্যক্তিক, সামজিক, রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত মানুষের চালচিত্র। মানুষ এখানে প্রতিনিয়ত ঠোকর খায় রাজনৈতিক বাতাবরণে আর এটার বিকাশে বিদেশি এনজিও লেবাস ধারণ করে থাকে। তখন দেখা যায় তথাকথিত নারীবাদী ক্রিয়াকলাপ। আরও দেখা যায় ঔপনিবেশিকতার শিকল থেকে ভূখন্ড আপাত দৃষ্টিতে মুক্ত মনে হলেও আদতে তা নয়। কারণ মানুষের মন-মগজে-শিক্ষায় উপনিবেশের ধ্বজা বহাল তবিয়তে উড়ে। শিমুল মাহমুদ নানামুখী ঘটনাকে উপজীব্য করে তার কথাসহিত্যের যে জগৎ নির্মাণ করেছেন সেখানে সন্ধান মেলে ষোল কোটি মানুষের ভূখন্ড।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন