সোমবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০১৫

সৈয়দ শামসুল হক : দিবসের শেষে গল্পের কলকব্জা

আজ ভোরে ঘুম ভাঙতেই আমার মনে পড়ে যায় জগদীশ গুপ্ত নামে বাংলা ভাষার একজন লেখক ও তার ‘দিবসের শেষে’ ছোট গল্পটির কথা; এবং আজই আমি গল্পটি পড়ে ফেলি। এই ঘটনার ভেতরে, মনে হতে পারে আছে, কিন্তু, কোনো আকস্মিকতা নেই। আকস্মিক হতো যদি দিবসের শেষে আজই আমার হাতে অমনি এসে ধরা দিতো, যেমন কখনো হয়- কোনো লেখার কথা ভাবছি আর লাইব্রেরিতে হাজারখানার ভিড়ে সেই লেখাটিই হাতে উঠে এলো। আমি খুব খুঁজে পেতেই আজ বের করেছি জগদীশ গুপ্তর বই এবং ভোরে মনে পড়ে যাওয়া গল্পটি হাতে নিয়েছি আরো একবার।

আরো একবার ? সেই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে, আমার লেখক জীবনের শুরুর দিকে, একবার এই গল্পটি মনে নেই কোথায় পড়ে ভীত স্তম্ভিত হয়ে, কিছুতেই একে মাথা থেকে নামাতে না পেরে, কেবলি পায়ে পায়ে অবিরাম রমনার মাঠ ভেঙে এবং গল্পটি নিয়ে ভেবে এবং এর বক্তব্য নিয়ে ভেবে এবং এর নির্মাণ নিয়ে ভেবে, এর কলকব্জা যাবতীয় আঁত অংশ-অংশ খুলে ফেলে, বিছিয়ে দিয়ে, দূর থেকে দাড়িয়ে দেখে, তবে নিস্তার পাই এর হাতে থেকে। তারপর, এই আবার, আজ, গল্পটি আমি পড়লাম। তা না হয় হলো; তবে এই, জগদীশ গুপ্তর কথা হঠাৎ একটি ভোরে, যখন শীত কেবল পড়তে শুরু করেছে, যখন বছরের ভেতরে ঘুম এই কেবল সুশান্ত হয়ে উঠতে শুরু করেছে, আর গত রাতেই আমার একটি বড় লেখার শেষ পঙক্তিটি লেখা হয়ে গেছে এবং যখন শেষ রাত থেকে মাঠের শেফালি গাছ দুটি টুপটাপ করে ফুল দিয়ে চলেছে, মনে পড়ে যাওয়া, এই বিশেষ লেখকটিকে, সূর্যোদয়ের মতো চেতনার জলতল ভেদ করে, আকস্মিক নয় কি - না, আকস্মিক একেও আমি বলবো না; কারণ, আমি লিখি এবং অন্য লেখক ও তাদের লেখা আমার বিদ্যালয়, অতএব জগদীশ গুপ্তর কথা আমার মনেই আসতে পারে। মনে এসেছিল বলেই যে আজই আমাকে ঐ বিশেষ গল্পটি খুঁজে এনে পড়তে হবে, পড়তেই হবে- অনিবার্য নয়, অনিবার্য ছিলো না; কিন্তু আমি পড়েছি বটে।
আকস্মিক-এর অর্থ কী তবে ? কারণহীন কোনো ঘটনা - যুক্তিহীন কোনো আবির্ভাব ? সূত্রহীন কোনো পরিণতি । কিছু এমন, অপ্রত্যাশিত r কিছু এমন, অগাধয় । অথবা, আমরা এই শব্দটিকে প্রতিদিন ব্যবহার করি এর ব্যাস বেধ না জেনেই, প্রায় জনশ্রুতি হিসেবে পাওয়া একটি আওয়াজ হিসেবে- আকস্মিকতা ।
আর, অনিবার্য— ওটাই বা কী ? সাধারণ আমাদের জীবনে আমরা অনবরত ব্যবহার করি অনিবাৰ্য-সমূহের দীর্ঘ একটি তালিকা-দিন গেলে রাত আসবে, জল নিচের দিকে গড়াবে, দুয়ে দুয়ে চার হবে এবং আরো কত, আরো কত অনেক; আমরা এই সাধারণেরই আমাদের জীবন যাপনের ন্যূনতম অভিজ্ঞতা দিয়ে জানি, যে, অনিবার্যের চেয়ে অনিশ্চয়তাই প্রবল এ পৃথিবীতে।
আমি এখন আপনাদের ঠেলে দিয়েছি দুটি শব্দের দিকে, আকস্মিক এবং অনিবার্য; এর একটি উদ্দেশ্য আছে। জগদীশ গুপ্তর এই গল্প, ‘দিবসের শেষে', যা আমাদের ঘুম হরণ করে, আমাদের স্বস্তিতে চিড় ধরায় এবং পায়ের তলায় মাটি দুলিয়ে দেয়, এর ভেতরে বিপজ্জনকভাবে পুরে দেয়া আছে ঐ শব্দ দুটির প্রচণ্ড বিস্ফোরক।
সত্যিই, বিস্ফোরকের মতোই হাজার হাত দূরে সরিয়ে রাখেন একজন গল্পলেখক জীবনে যা কিছু অনিবার্য এবং যা কিছু আকস্মিক। তিনি এমন কিছুই ঘটাতে পারেন না যার প্রস্তুতি নেই। জীবনে অকস্মাৎ কত কিছু হয়, গল্পে অকস্মাৎ কিছু হতে নেই। এ এক মজার ব্যাপার, জীবন যা সবল ও সাবলীলভাবে ঘটিয়ে দিতে পারে, লেখকের সাধ্য কি তা পারে পারে না যে তার কারণটি বড় সরল-জীবন এক সম্পূর্ণ দুর্ঘটনা, গল্প সম্পাদিত একটি নির্মাণ। জীবন বহে যায়, ঘটে যায়, এগিয়ে যায়-ব্যক্তির মৃত্যু, বা যুগের অবসান জীবনের ধারা স্তম্ভিত করতে পারে না; লেখক এই বহমান ধারা থেকে কিছু উপাদান সংগ্রহ করেন, এবং সচেতনভাবে; তাকে অনবরত মর-চোখে যুক্তির অন্তর্গত হয়ে থাকতে হয়, তার এই সংগ্রহ করবার হাতটিকে চালনা করে জীবন সম্পর্কে তার দর্শন ও বক্তব্য, এবং শেষ পর্যন্ত এই বক্তব্যই তাঁর সংগৃহিত অংশগুলোকে অর্থবহ বিন্যাসে রক্ষা করে।
তবে, আকস্মিকতা যদি বর্জন করেন লেখক, তিনি কি আলিঙ্গন করেন অনিবার্যতাকে ? হয়, এমন যদি হতো, তবে কত সরল হতো গল্প নিৰ্মাণ। কিন্তু মানুষ সংখ্যা নয়, মানুষের জীবন গণিতের অংক নয়, এবং প্রতিটি মানুষ হন প্রতি-ভিন্ন এক ব্যক্তি; তাই, অনিবার্যতা মানুষের জীবনে অনিবার্য কোনো উপাদান নয়, রচিত গল্পে তো নয়ই। রচিত গল্পে অনিবার্যতা বরং প্রধান এক দুর্বলতা এবং তা এই কারণে যে, যা হবেই হবে তার ভেতরে মানুষের স্বাধীন কোনো ভূমিকা নেই। গল্প তখনই গল্প হয় যখন গল্পের চরিত্রগুলোর স্বাধীনতা থাকে সিদ্ধান্ত নেবার অথবা নিজের না থাকলেও যখন সে উপলব্ধি করতে পারে সেই স্বাধীনতার অস্তিত্ব আছে কোথাও না কোথাও কারো না কারো ভেতরে।
জগদীশ গুপ্ত তাঁর এই গল্পে- ‘দিবসের শেষে'- একজন লেখকের পক্ষে অবশ্যমান্য এই দুই নিষেধ উপেক্ষা করেছেন; গল্পটিকে তিনি দাড় করিয়েছেন আকস্মিকতা ও অনিবার্যতার ওপর, এবং তারপরও তিনি রচনা করতে পেরেছেন বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ একটি ছোটগল্প। গল্পটি একবার বলে নেয় যায়।
'রতির একটি মাত্র ছেলে, নাম পাঁচু ও বয়স পাঁচ । রতির স্ত্রী নারাণী তিনটি পুত্রকে প্রসবগৃহ হইতে নদী গর্ভে নিক্ষেপ করিয়া পাঁচু গোপালের মাদুলি ধারণ করে তারপর পেটে আসে এই পাঁচু "এই পাঁচুই গল্পের শুরুতে একদিন ঘুম ভেঙে উঠে মাকে বলে, মা, আজ আমায় কুমিরে নেৰে "শুনে চমকে ওঠে নারাণী, স্বামীকে অবিলম্বে সে জানায় ছেলের এই সর্বনাশ কথা। রতি তৎক্ষণাৎ ছেলেকে শাসন করে বলে, খবরদার, ফের যদি ও কথা মুখে আনবি তবে কাঁচা কঞ্চি তোর পিঠে ভাঙবো "পাঁচু আজ আর নদীতে স্নান করতে রাজি নয়। দুপুরবেলা রতি বাড়ি ফিরে ছেলেকে নিয়ে নদীতেই স্নান করতে যেতে চায়, কারণ তার কথায়, ওর ভুলটা ভাঙা দরকার। বাবুকে বললুম, শুনে তিনি হাসতে লাগলেন। তিনি তো হাসলেনই, আরো কতজন হাসলেন।" হাসবার কারণ, বাড়ির পাশে এই কামদা নদীতে কষ্মিনকালে কেউ কুমির দেখে নি; আর ছেলের যে-ভুলটা রতি ভাঙাতে চায়, তা হলো— ছেলেমানুষ একটা কথা বললেই সেটা সত্যি হয়ে যায় না।
পাঁচুকে নিয়ে নদীর ধারে গিয়ে রতির অবশ্য হঠাৎ ভয় হয়। নিস্তরঙ্গ বিস্তীর্ণ আবিল জলরাশি যেন ভয়ঙ্কর নি:শব্দে মধ্যাহ্ন রৌদ্রে শাণিত অস্ত্রের মতো ঝকঝক করিতেছে।" রতি সাবধান হয়েই পাঁচুকে স্নান করায়, বাড়ি এসে হাসতে হাসতে ছেলেকে ঈষৎ ঠাট্টা করে বলে, “কেমন কুমিরে নেয়নি তো "ছেলেও হাসে, মাও হাসে; মা বলে, ছেলের আমার এতক্ষণে হাসি ফুটেছে।"

সেদিন বিকেলেই ছোট্ট একটি অঘটন ঘটে। চুরি করে কাঠাল খেতে গিয়ে পাঁচু ধরা পড়ে গায়ে রস-কাদা-আঠা সমেত; মা চেঁচামেচি করে ওঠে, বাবা রাগ করে ছেলের হাত ধরে নদীর দিকে রওয়ানা হয় পরিষ্কার করাবার জন্যে।
জগদীশ গুপ্ত লিখছেন, পাঁচুর হাতে খেলার একটি ঘট ছিলো- সেইটি হাতে করিয়া অপরাধী পাঁচু চোখের জল ফেলিতে ফেলিতে বাপের আগে-আগে নদীর দিকে চলিলো। রতি তাহাকে জলে ফেলিয়া বেশ করিয়া রগড়াইয়া ধুইয়া তুলিয়া আনিলো। খানিকটা দূর উঠিয়া আসিয়া পাঁচু হঠাৎ থামিয়া বলিয়া উঠিলো, বাবা, আমার ঘট"
উভয়ে ফিরিয়া দেখিল, জলের ধারেই ঘট পড়িয়া আছে।
পাঁচু আকুল হইয়া বলিলো নিয়ে আসি বাবা ?
রতি বলিলো, যা।"
পাঁচু হেট হইয়া ঘট তুলিয়া লইয়া ফিরিয়া দাড়াইয়াছে এমন সময় তাহারই একান্ত সন্নিকটে দুটি সুবৃহৎ চক্ষু নিঃশব্দে জলের উপর ভাসিয়া উঠিলো, পরমুহুর্তেই সে-স্থানের জল আলোড়িত হইয়া উঠিলো, লেজটা একবার চমক দিয়া বিদ্যুদ্বেগে ঘুরিয়া গেলো— এবং চক্ষের পলক না পড়িতেই পাঁচু জলে পড়িয়া অদৃশ্য হইয়া গেলো। মুদ্রিত চক্ষু আডষ্ট জিহ্বা ভয়ার্ত রতির স্তম্ভিত বিমূঢ ভাবটা কাটিতে বেশি সময় লাগিলো না- পরক্ষণেই তাহার মুহূর্মূহু তীব্র আর্তনাদে দেখিতে দেখিতে নদীতীর জনাকীর্ণ হইয়া উঠিল ।
যখন ওপারের কাছাকাছি পাঁচুকে পুনর্বার দেখা গেলো তখন সে কুম্ভীরের মুখে, নিশ্চল। জনতা হায় হায় করিয়া উঠিলো, পাঁচুর মৃত্যু-পাণ্ডুর মুখের উপর সূর্বের শেষ হইয়া গেলো।"
তারপর আর একটি মাত্র লাইন, দুটি ছোট ছোট বাক্য, গল্প শেষ– কেবল পাঁচুর মা সে দৃশ্য দেখিলো না। সে তখন মূর্ছিতা। আমরাও স্তম্ভিত হয়ে থাকি, বইয়ের পাতা বন্ধ করতে ভুলে যাই; আমাদের মনের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ হয় এই ভেবে যে, শিশুটিকে বাঁচাবার কোনো উপায় আমরাও জানি না যে লেখককে বলবো, অনুগ্রহ করে আপনি তার প্রাণ রক্ষা করুন এই কৌশলে।
গল্পের সূচনাতে আছে পাঁচ বছর বয়সি পাঁচুর একটি উক্তি, মা, আজ আমায় কুমিরে নেবে- লেখকের ভাষায় তাহা যেমন ভয়ংকর, তেমনি অবিশ্বাস্য; কিন্তু তার চেয়েও বড়, উক্তিটি আকম্বিক। গল্পের শেষে এই উক্তিটিই সত্যি হয়ে যায়, অনিবার্য হয়ে ওঠে, যখন সত্যি সত্যি কামদা নদীর জল ভেদ করে কুমির ওঠে, যা কেউ কখনো শোনে নি, এবং পাঁচুকে নিঃশব্দে টেনে নিয়ে চলে যায়। সমস্ত গল্পটি ঘটে যায় অনিবার্যভাবে;  পাঁচুর কোমল কণ্ঠে উচ্চারিত হবার পরমুহুর্ত থেকে ভবিষ্যতবাণীটি ফলে যাবার দিকে অগ্রসর হয় দ্রুত গতিতে: প্রতিটি বাক্য, বর্ণনা, অণুঘটনা, সবই পাঁচুকে নির্মম ও নিশ্চিতভাবে ঠেলে নিয়ে যেতে থাকে কুমিরের
দিকে, তারপর যখন পাঁচুকে নিয়ে জলের ভেতরে তলিয়ে যায় কুমির- আমরাও তখন কবি-সমালোচক মোহিতলাল মজুমদারের সঙ্গে অনুভব করে উঠি, মানুষের জীবনে একটা অতিশয় দয়াহীন ও দুজ্ঞেয় দৈব-নির্যাতনের রহস্য ঘনাইয়া উঠিয়াছে; মনে হয়, জীবনের আলোকোজ্জ্বল নাট্যশালার একপ্রান্তে একটা অন্ধকারময় কোণ আছে, সেখানে একটা নামহীন আকারহীন হিংস্ৰতা সর্বক্ষণ ওঁৎ পতিয়া বসিয়া আছে- মানুষ তাহারই যেন এক অসহায় শিকার; তাহার নিষ্ঠুরতাও তত ভয়ঙ্কর নয়—যত ভয়ঙ্কর তাহার সেই অতি প্রাকৃতরূপ।
জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এক বস্তু, আর একে শিল্পে চালিয়ে দেয়া সম্পূর্ণ আরেক বস্তু। জগদীশ গুপ্ত নিয়তির এই নিষ্ঠুরতা, মোহিতলাল যাকে বলেছেন দৈবনির্যাতন, শিল্পে অনুবাদ করতে গিয়ে মৌলিক একটি কৌশল স্থির করে নেন; সেটি হচ্ছে, যেহেতু তিনি পাচুর একটি আকস্মিক উক্তি দিয়ে গল্প শুরু করবেন, এবং সেই আকস্মিক উক্তিটিকেই শেষ পর্যন্ত সত্যি করে দেবেন, বস্তুত, যেহেতু এই আকস্মিক উক্তিই এ গল্পের হয়ে ওঠার কারণ, তাই তিনি সারা গল্পে কোথাও কোনো আকস্মিকতাকে আর প্রশ্রয় দেবেন না। অচিরেই আমরা লক্ষ করবো, কীভাবে তিনি প্রতিটি বর্ণনা ও অনুঘটনার আভাস বহু আগে থেকেই দিয়ে যাচ্ছেন যাতে কোনো কিছুই আকস্মিক, উড়ে আসা বা ভাসমান বলে বোধ না হয়। বস্তুতপক্ষে গল্পটি দ্বিতীয়বার পড়বার কালে আমরা আবিষ্কার করবো কী আশ্চর্য উদ্ভাবন এই লেখকের, যে, এতবড় অনিবার্যতা’র ধ্বস মাথায় নামিয়ে দেবার জন্যে তিনি যে সরল কৌশলটি অবলম্বন করেছেন, তা হচ্ছে- কোনো কিছুই আগে বলা ভিন্ন পরে আমদানি করা হবে না; আর তবেই একটি আকস্মিক উক্তি এত অনিবার্যভাবে সত্যি হয়ে যাবে এবং আমরা বিনা প্রশ্নে তা মেনে নেবো।
এ গল্প লেখার আগে, জগদীশ গুপ্ত খুব হিসেব করে একটি সুরও স্থির করে নিয়েছেন– যেখানেই পারবেন ঈষৎ ব্যঙ্গ করবেন— নিয়তিকে, যে, তোমার দুষ্ট উদ্দেশ্য সাধনের জন্যেই তো তুমি সব সাজিয়ে নিয়েছিলে বহু আগেই। কিন্তু এই ব্যঙ্গ প্রযুক্ত হবে অত্যন্ত সূক্ষ্ম তুলিতে, প্রায় বোঝা যাবে কি যাবে না, দ্বিতীয় পাঠেও হয়তো ধরা পড়বে না, তৃতীয় বা চতুর্থ পাঠের প্রয়োজন হতে পারে। প্রশ্ন করা যেতে পারে, প্রথম পাঠেই যদি আবিষ্কৃত না হলো, তাহলে সে কৌশল প্রয়োগের মূল্য কোথায় । মূল্য এইখানে, যেমন, ঘড়ির ভেতরে কত সূক্ষ্ম দাঁত, চাকা, তার, কুণ্ডল— আমাদের না জানলেও চলে, কিন্তু ঐসবের উপস্থিতি বিনা ঘড়ি মোটেই সময় দেয় না।
দেখা যাক, জগদীশ গুপ্ত কীভাবে অগ্রসর হচ্ছেন পাঁচুর এই গল্পটি নিয়ে। গল্পের প্রথম বাক্য- রতি নাপিতের বাড়িটার অবস্থানক্ষেত্র বড়ো চমৎকার- বাড়ির পূর্বে নদী, কামদা, পশ্চিমে বাগান উত্তরে বেণুবন দক্ষিণে যতদূর দৃষ্টি চলে ততোদূর শষ্যক্ষেত্র।"লক্ষ্য করবো প্রথম বাক্যেই লেখকের মূল কৌশল ও সুর, দুটোই উপস্থিত। পাঁচু নদীতে গিয়ে কুমিরের মুখে পড়বে; পাছে আমরা প্রশ্ন করি ইদারা থাকতে, পুকুর থাকতে নদীতেই কেন যাবে পাঁচুকে নিয়ে তার বাবা, তাই গল্পের বিন্দুমাত্র আভাস দেবার আগেই আমাদের তিনি ধরিয়ে দিচ্ছেন যে, বাড়ির নিকটতম জল-উৎস হচ্ছে কামদা নদী। আর ব্যঙ্গটিও আমরা লক্ষ করতে পারবো নিয়তির প্রতি লেখকের ছুড়ে দেয়া চমৎকার এই বিশেষণটিতে-রতি নাপিতের বাড়িটার অবস্থানক্ষেত্র বড়ো চমৎকার।" কেন চমৎকার *কার জন্যে চমৎকার • আর কারো জন্যে নয়, নিয়তিরই জন্যে; কারণ নদীর পাড়ে বাড়ি বলেই পাঁচুকে নিয়ে স্নান করতে রতি যাবে নদীতে: এটা নিয়তিরই পাতা একটি জাল ।
গল্পের দ্বিতীয় বাক্যটি দীর্ঘ এবং দেখুন- সূর্যদেব দিগন্তরেখা স্পশ করতে না করতে তার টকটকে হিঙুল আভাটি রতির গৃহচূড়া চুম্বন করে, রতি ঠিক পাখির ডাকেই জাগে- গোধূলিতে তারা বৃক্ষাবসে ফিরিয়া আসিতেই তাদের কলকাকলির সঙ্গে সঙ্গে সেই শাক্তর সুরে সুর মিলাইয়া তার তুলসীতলায় সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলিয়া ওঠে; দক্ষিণের হাওয়ায় উত্তরের বাঁশ শিরশির করে, পশ্চিমে তার প্রতিধ্বনি জাগে, সুচিরুণ শ্যামল দোলের অস্ত থাকে না, কিন্তু এই এত বড়ো কাণ্ডটার প্রতি রতির দৃকপাতও নাই- তার চোখ কান এ সব দেখিতে শুনিতে শেখে নাই।"এই যে সূর্যদেবের কথা বলা হয়েছে, এটাও এক বড় রকমের আভাস দিয়ে রাখা; সূর্যকে দেবতা রূপে শুরুতেই চিহ্নিত করাটা গভীরভাবে পরিকল্পিত, কারণ, গল্পের শেষে, পাঁচু যখন কুমিরের মুখে, লেখক লিখবেন, পাঁচুর মৃত্যু-পাণ্ডুর মুখের উপর সুর্যের শেষ রক্তরশ্মি গেলো। এখানে সূর্যকে আর দেবতা বলা হয় নি, বলবার দরকারও নেই, কারণ আগেই আমাদের লেখক সূর্যকে দেবতা বলে সনাক্ত করেছেন, এখন এর সঙ্গে মনে মনে যুক্ত হলো দেবতার একটি বিশেষণ- রক্তপায়ী; সেই দেবতাকেই কুমির নিবেদন করছে তার মুখের আহার-পাঁচু-যেনবা দেবতার প্রসাদ পাচ্ছে সে। ওই দ্বিতীয় বাক্যে ব্যঙ্গের সুরটিও লেখক বাজিয়ে দিয়েছেন-প্রকৃতির এক প্রশান্ত সুশীল চিত্র আঁকবার পর এ কথা বলে, যে, রতির চোখ-কান এ সব দেখিতে শুনিতে শেখে নাই – যেন তিনি বলতে চাইছেন, ওইসব মন ভোলানো কথা কবি প্রসিদ্ধিমাত্র, রতি না জেনেছে ভালোই হয়েছে, আজ বিকেলেই তো সে দেখবে প্রকৃতির নিষ্ঠুর ভয়ঙ্কর রূপটি। রতি তার নিজের চোখেই যে সেটা দেখতে পাবে, লেখক সেই কথাটিই যেন জানাতে চান পরের বাক্যের এই অংশটিতে- রতি বস্তুতান্ত্রিক:- অর্থাৎ সে চোখ খোলা মানুষ।
চতুর্থ বাক্য দেখুন এবং লক্ষ করুন লেখক কীভাবে প্রতিটি বিষয়ের পূর্বাভাস বা বীজ রেখে যাচ্ছেন-একগুঁয়ে কোপসস্বভাব না হলে রতিকে মন্দলোক বলা যাইতো না, এবং রতির বাড়ীর পশ্চিমে যে বাগান তাহার মালিক যাদব দাস কাঁঠাল সম্বন্ধে তাহাকে যে সন্দেহের চক্ষে দেখে তাহা যদি অমূলকজ্ঞানে বিশ্বাস করা যায়, তবে রতি নিষ্কলঙ্ক চরিত্র "অর্থাৎ শাদা কথায়, পশ্চিমে যাদব দাসের বাগান থেকে রতি নাপিত আম-কাঠাল চুরি করে থাকে। এই সার কথার ভেতরে আমরা লেখকের বিশেষ কৌশলটি অবলোকন করতে পারছি। প্রথমত, গল্পের শেষ ভাগে পাঁচু ধরা পড়বে চুরি করে কাঁঠাল খেতে গিয়ে এবং তার মা কাঠাল চুরি সম্পর্কে বাকা কথা বললে রতির সেটা আঁতে গিয়ে লাগবে, কারণ, গোড়াতেই দেখেছি কাঁঠাল চুরিতে সে অভ্যন্ত, অতএব নিজের দোষ ঢাকবার জন্যে অহেতুক ক্ষিপ্ত হবেই সে, পাঁচুকে টান মেরে নিয়ে যাবে নদীতে গা ধোঁয়াতে, আর সেখানেই কুমির তাকে নেবে। পাঁচুর কাঁঠাল চুরি করে খাওয়াটা পাছে সাজানো বা আকস্মিক মনে হয়, তাই লেখক শুরুতেই পাঁচুর বাবা রতির প্রসঙ্গে কাঠালের বাগান ও চুরির কথা বলে রাখলেন। দ্বিতীয়ত, সেই যে নিয়তির প্রতি ব্যঙ্গ-এখানেও লেখক রতিকে সরাসরি আম-কাঁঠাল চোর না বলে বাকা ইশারা দিয়েছেন এই ভাবটি আনতে যে, দ্যাথো, নিয়তির এও এক ফাদ, রতি কাঁঠাল চুরি না করলে পাঁচুও গা নোংরা করতো না, নদীর ঘাটে যাবারও প্রয়োজন হতো না, কুমিরও তাকে নিতো না।
গল্পের দুটি অনুচ্ছেদ লিখে ফেলেছেন জগদীশ গুপ্ত, এখনো গতি সঞ্চার করেন নি, এখনো তিনি ক্ষেত্রই প্রস্তুত করে চলেছেন; গতিটি আনবেন তিনি চতুর্থ অনুচ্ছেদে, তার আগে তৃতীয় অনুচ্ছেদে নিয়তির নিষ্ঠুরতা ও অশুভ ছায়ার সংকেত দিচ্ছেন তিনি এভাবে একটি বাক্যে— ‘রতির একটি মাত্র ছেলে, নাম পাঁচু ও বয়স পাঁচ। রতির স্ত্রী নারাণী তিনটি পুত্রকে প্রসবগৃহ হইতে নদীগর্ভে নিক্ষেপ করিয়া পচুগোপালের মাদুলি ধারণ করে— তারপর পেটে আসে পাঁচু "গল্পটি পুরো পড়বার পর ফিরে এসে এই বাক্যটির দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাবো, পাচুগোপাল নামে দেবতাটি আরো কঠিন রকমে নিষ্ঠুর, কারণ তার নামে মাদুলি ধারণ করে যেপুত্রের মা হয় নারাণী, যে-পুত্রকে প্রসব গৃহ থেকেই নদী গর্ভে দিতে হয় নি, সেই পুত্রকে পাঁচ বছর মায়ের কোলে রেখে, মায়ের স্নেহের পুর্ণিমায় পাঁচুকে ভিজিয়ে তবে তার প্রাণ হরণ করেছে এই পাচুগোপালই– সম্ভবত কুমিরের ছদ্মবেশে।
অতঃপর চতুর্থ অনুচ্ছেদে পাঁচু ঘোষণা করলো, আজই তাকে কুমিরে নেবে; রতি তাকে কঠোর শাসন করলো কুকথা মুখে আনবার জন্যে; আর এখান থেকেই লেখক শুরু করলেন নতুন এক চাল, অতঃপর আমাদের একবার তিনি আশ্বস্ত আরেকবার উৎকণ্ঠিত করতে লাগলেন– যেন এই বিশেষ চালের মাধ্যমে আমাদের বিশ্বাস-অবিশ্বাস, ধৈর্য-অসহিষ্ণুতা, অমল-কুটিল এ সবের ব্যবধান ভেঙে দিতে তিনি এখন উদ্যত। ছেলের মুখে কুমিরে নেবার আগাম কথা শুনে রতি যদি বিচলিত হয়ে থাকে, পরের অনুচ্ছেদেই লেখক আমাদের আশ্বস্ত করছেন এই বলে, তখন আষাঢ় মাসের প্রথম ভাগ-নদী বাড়িয়া চড়া ডুবাইয়া জল খাড়া পাড়ের মৃত্তিকা ছলছল শব্দে লেহন করিতেছে, স্বচ্ছ শান্ত জল পংকিল ও খরগতি হইয়া উঠিয়াছে। তবুও ভয়ের কোন কারণ নাই। এই নদী, কামদা, তার দুই তীর আর জল তাহদের চিরপরিচিত, এ নদী তো নরঘাতনী রাজুসী নহে, স্তন্যদয়িনী জননীর মতো মমতাময়ী- চিরদিন সে গিরিগৃহের সুপেয় শীতল নীর তাদের পল্লী-কুটিরের দুয়ার পর্যক্ত বহিয়া আনিয়া দিতেছে। তাকে ভয় নাই।"
বেশ । ভয় নাই। রতিও দুপুৱে বাড়ি ফিরে পাচুর অহেতুক ভয় ভাঙবার জন্যে নিয়ে গেছে তাকে নদীর তীরে, কামদা নদী। রতি হঠাৎ দেখল, "নিস্তরঙ্গ বিস্তীর্ণ আবিল জলরাশি যেন ভয়ঙ্কর নি:শব্দে মধ্যাহ্ন রৌদ্রে শাণিত অস্ত্রের মতো ঝকঝক করিতেছে। দুর্লঙ্ঘ্য তীব্র স্রোত ছুটিয়া চলিয়াছে। এতোবড একটা গতিবেগ, অথচ তার শব্দ নাই, অবয়ব নাই, ভালো করিয়া সে যেন চোখে পড়ে না যেন গঙ্গাধরের সমস্ত দুঃশাসিত নির্মম শক্তি এই নিঃশব্দ গঙ্গীর গতির অনিৰ্দেশ্য বহিরাবয়ব ব্যাপিয়া গুটিত হইয়া আছে। এমন নিদারুণ নিষ্করণ রূপ লইয়া এই প্রিয় নদীটি আর কোনোদিন তার চোখে পড়ে নাই। আমরা গোড়াতেই দেখেছি, প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রতি রতির পক্ষপাতিত্ব নেই, তবুও সাধারণ মানুষের মতো নদীকে সেও মায়ের মতো জেনে এসেছে তার সুপেয় শীতল জলের জন্যে, সেই নদীকে আজ প্রথম তার ভয় করে ওঠে। আমরা লক্ষ করবো, এ গল্প যদিও সাধুভাষায় রচিত, এর আর কোথাও এতগুলো তৎসম শব্দের প্রয়োগ নেই- এবং এই শব্দ-চয়নেই আমাদের কাছে ধরা পড়বে, নদীর ওই চিত্রটি প্রাকৃতিক নয়, মানসিক— রতিরই, ভয়ঙ্করতা আনতেই তৎসম শব্দ লাগানো৷ ৰাক্যগুলো আরেকবার পড়লেই আমরা আবিষ্কার করতে পারবো, তৎসমেরও যে-শব্দগুলো লেখক ব্যবহার করেছেন তা ষষ্ঠ ইন্দ্ৰিয়ের দুয়ার দিয়ে আসা শব্দ। কিন্তু এই ভয়টিকে তিনি, জগদীশ গুপ্ত, পাঁচুর শুশুক দেখে ভয় পাওয়ার মতো ছেলেমানুষ দিয়ে কাটিয়ে দিলেন, বাপ ছেলে দুজনকেই হাসিয়ে দিলেন, তিন পুত্র বিনাশের পর চতুর্থ পুত্ৰ পাঁচুকে নিয়ে সদ্য শংকিত যে-মানারাণী, যে কুমিরে নেবে শুনে কাটা হয়ে আছে, তাকেও তিনি টান টান দড়ির ওপর থেকে নামিয়ে আনলেন।
‘রতি আসিয়া হাসিতে হাসিতে বলিলো, পাঁচু কই রে? রান্না ঘরের ভিতর হইতে ভারি গলায় পাঁচু বলিলো, খাচ্ছি বাবা।"
কেমন কুমিরে নেয়নি তো " মায়ের মুখের দিকে চাহিয়া পাঁচুও হাসিতে হাসিতে বলিলো, না।"
নারাণী বলিলে, ছেলের আমার এতোক্ষণে হাসি ফুটেছে।"
আমরা অনুভব করি, উত্তেজনা আমাদেরও আর নেই; সকলি শিথিল ও কোমল বলে বোধ হচ্ছে এখন, প্রায় যেন ঘুম পাচ্ছে, আমরা যেন ভুলেই গেছি পাচুর সেই ভোরবেলার ছেলেমানুষি আচমকা একটা কথার কথা, মা, আজ আমায় কুমিরে নেবে।"
কথাটা যে তুলে গেছি, বা প্রায় ভুলে গেছি-লেখকের এটি উদ্দেশ্যমূলক একটি বিভ্রম রচনা: এরপরেই গল্প যখন সামান্য বিরতির পর আবার শুরু হবে, আমাদের বুঝে উঠতে যেন বিলম্ব হয় গল্প এখন কোনদিকে যাচ্ছে। এই বিলম্ব হওয়াটা পুরো লাভ দেবে অচিরেই, কারণ, অপ্রস্তুত অবস্থায় আমরা যে আঘাতটি শেষে পাবো তার ওজন দশগুণ হয়ে তবেই তো দেখা দেবে।
শেষ ভাগে গল্প যায় কাঠাল চুরি করে ধরা পড়া পাঁচুর দিকে; গায়ে তার ধুলো, রস, আঠা; অন্যান্য সঙ্গীদের সঙ্গে সে কাঠাল খাচ্ছিলো, তার বাবা মা ছিলো দিবানিদ্রায়, এই সুযোগে; সঙ্গীরা পালিয়ে যায়, ধরা পড়ে এক পাঁচু।
পাঁচু মাৱ খাইতে খাইতে বাঁচিয়া গেলো— এতো বেলা পর্যন্ত সে যে বড়ো রাসের ক্লেশ সহ্য করিয়াছে - আমাদেরও এখন ঈষৎ স্মরণ হয় সেটা ছিলো কুমিরে তাকে নিয়ে যাবার ত্ৰাস; আমরা এখন পাঁচুর সঙ্গে, পাঁচুর মায়ের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাই– ছেলেটা তবে খামোকাই ভয় পাচ্ছিলো, আমাদেরও জ্বালাতন করে রেখেছিলো; তারপর, লেখক লিখছেন, কিন্তু তার অকারণ আর্তনাদে এবং নারাণীর ক্রুদ্ধ চিৎকারে রতির ঘুম ভাঙ্গিয়া গেলো। সে বাহিৱে আসিয়া গা-মোড়া দিয়া বলিলো, যেমন ছেলের গলা, তেমনি তার-হয়েছে কি"পল্লীর এ বড়ো পরিচিত একটি দৃশ্য, গৃহস্বামীর এ বড়ো পরিচিত একটি হুঙ্কার, আমরা নিশ্চিত হয়ে যাই যে, সেই কুমির বিষয়ে আর কিছুই উত্থাপিত হবে না। গল্প এগোয়, যেমন চিরকাল বাংলার পল্লীতে পল্লীতে এ ঝগড়া যে-পথে এগোয়, নারাণী বলিলো, “হয়েছে আমার শ্রাদ্ধ, চুরি করে কাঁঠাল খাওয়া হয়েছে। ছেলের বিদ্যে কতো।”- বলিয়া সে এমনিভাবে রতির দিকে চাহিল যেন চুরি করিয়া কাঁঠাল খাওয়া পুরুষ জাতির মধ্যে অত্যন্ত ব্যাপক।" এই ব্যঙ্গ, আমরা অচিরেই দেখবো, আমাদের বিভ্রান্ত করবারই কৌশল বটে, এবং নিয়তির প্রতি শেষ বিরূপ, যে, এই কাঠালের জন্যেই পাঁচুকে শেষ পর্যন্ত নদীর কাছে যেতে হবে, তুমিই এর নাট্যকার। রতি ভ্রুভঙ্গী করিয়া বলিলো, "থামো, আর চেঁচিও না। আমি গিয়ে ধুইয়ে আনছি, তা হলে তো হবে "বলিয়া সে উঠানে নামিলো। আসলে রতি স্ত্রীর মুখে নিজের কাঁঠাল চুরি করার প্রসঙ্গ পরোক্ষভাবে এলেও শুনতে চায় না, দ্রুত সে ছেলেকে নিয়ে নদীর ঘাটে যায়, তার পরের উদ্ধৃতি একটু আগেই আমি দিয়েছি, ঐ উদ্ধৃতিতেই গল্প শেষ হয়।
এবং গল্প শেষ হয় একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু জোরালো ওজনের ধাক্কায়-অন্য গল্পের মতো ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে নয়, অথবা কোনো মন্তব্যে নয়, চরিত্রের কোনো অন্তর্গত ভাবনা দিয়ে নয়— সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ একটি কোণ থেকে নিরাসক্ত কলমে আঁকা একটি অবিশ্বরণীয় চিত্র দিয়ে। রক্তের বর্ণে অঙ্কিত সেই চিত্র, সূর্যাস্তের বর্ণ, অস্তায়মান সূর্যের বিশাল গোলকের পটভূমিতে ক্ষণকালের জন্যে স্থির-কুমিরের মুখে পাঁচু, পর মুহূর্তে কুমির অদৃশ্য হয়ে যায়, কিন্তু তখনো আমাদের বিভ্রম ও অখিতারায় অঙ্কিত হয়ে থাকে ঐ চিত্রটি- এখন, অনেকক্ষণ ও সর্বক্ষণের জন্যে। রচনার এই অসামান্য কৌশলের কারণেই এ গল্প উৎরেছে বলে আমি মনে করি: সামান্য অমনোযোগে যে-গল্প আষাঢ়ে গল্প হয়ে যেতে পারতো, কারিগরি উদ্ভাবনী ক্ষমতার প্রয়োগে সেই গল্পই মানুষের অস্তিত্ব ও অবস্থান সম্পর্কে নিদ্রাহর একটি রচনা হয়ে উঠেছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন