মঙ্গলবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০১৫

স্বকৃত নোমান : ২০১৫ সালে পড়া গল্পের সালতামামি

গল্পপাঠ : ১
২০১৫ সালে কত সংখ্যক গল্প পড়েছেন? 
স্বকৃত নোমান : ১
 দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় দেড় শ তো হবেই। আনুমানিক হিসাব। বেশিও হতে পারে। এ বছর আমি উপন্যাস খুব একটা পড়িনি। নগুগি ওয়া থিয়াঙ্গোর ‘গমের দানা’ এবং হোসে সারামাগোর ‘অন্ধত্ব’ উপন্যাস দুটি পুরোটাই পড়ে শেষ করি। মিলান কুন্ডেরার ‘অস্তিত্বের অসহনীয় লঘুতা’, ওরহান পামুকের ‘মাই নেইম ইজ রেড’, মারিয়া ভার্গাস ইয়োসার ‘সামরিক সারমেয় কথা’অর্ধেক পড়ে রেখে দিয়েছি। টানছিল না। অন্য কোনো সময় হয়ত শেষ করব। সেই হিসেবে বলতে গেলে বছরটায় আমি গল্পই বেশি পড়েছি।


গল্পপাঠ : ২
কোন কোন মাধ্যম থেকে গল্পগুলো পড়েছেন? 
স্বকৃত নোমান : ২
আমি সবসময় বই কিনে পড়ি। ইন্টারনেটে বা অন্য কোনো মাধ্যমে পড়ে আমার পোষায় না। পড়ার সময় আমি খুব দাগাই। পত্রিকায় দাগানো হয়ত যায়, কিন্তু পত্রিকা আমি সংগ্রহে রাখতে পারি না। বই আমার কাছে পাঠের জন্য যথার্থ মাধ্যম মনে হয়।

গল্পপাঠ : ৩ 
কোন কোন গল্পকারের গল্প পড়েছেন? 
স্বকৃত নোমান : ৩
অনেকেরই তো পড়েছি। সবার নাম হয়ত মনে করতে পারব না। যাদের নাম মনে পড়ছে তারা হচ্ছেন, জাঁ পল সার্ত্র, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, কমলকুমার মজুমদার, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, মিগুয়েল দ্য উনামুন, অ্যাজোরিন, ডলরেস ইবারুবি, ক্যামিলো জোসে সেলা, কারমেন লাফোরেত, স্তেবান সালাজার চ্যাপেলা, জুয়ান এডুয়ার্ডো জুনিগা, ফারনান্দো সাবিনো, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, ক্রিস্টিনা ফার্নান্দেস কুবাস, সিজার এন্টোনিয় মোলিনা, পেড্রো জারালুকি, ফারনান্দো আরামবুরু, বের্টা ভিয়াস মাহোউ, ক্যারি সান্তোস, ভিএস নাইপল, জন বার্গাস, নাডিন গার্ডিমার, জেএম কোয়েৎজি, কিংসলে অ্যামিস, পিটার ক্যারি, কাজুও ইশিগুরো, বেন ওকরি, রডি ডয়েল, মার্গারেট অ্যটউড, হিলারি ম্যান্টেল, এলিনর ক্যাটন, রিচার্ড ফ্ল্যানাগান, চিনুয়া আচেবে, লিডিয়া ডেভিস, হেরমেন হেসে, হোর্হে লুই বোর্হেস, হোসে সারামাগো, শলোম আলেইকম, মার্কো দেনেভি, সিলভানা ওকাম্পো, হুয়ান ম্যানুয়েল, নিকোলাই ব্লখিন, স্যার আর্থার কোনান ডয়েল, সৈয়দ শামসুল হক, শাহেদ আলী, ভার্জিলিও পিনেরা, বিলিয়ার্ড বল, শাহাদুজ্জামান, উম্মে মুসলিমা। জাকির তালুকদারের একটি গল্প সম্ভবত এ বছরই পড়েছি। দেশি-বিদেশি আরো বেশ কজন গল্পকারের গল্প পড়েছি, নামগুলো ঠিক মনে পড়ছে না।


গল্পপাঠ : ৪
এর মধ্যে ভালো লাগার গল্পগুলোর কয়েকটি নাম করুন। গল্পগুলো ভালো হয়ে উঠেছে কী কী কারণে সেগুলো উল্লেখ করুন।
স্বকৃত নোমান : ৪
হেরমান হেসের ‘সেই নগর’গল্পটি ভালো লেগেছে খুব। মূল জার্মান গল্পের র্যা লফ ম্যানহাইমকৃত ইংরেজি অনুবাদ ‘দ্য সিটি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন জিএইচ হাবিব। ভালো অনুবাদ। গল্পটি ভালো লাগার প্রধান কারণ এর গতিময় ভাষা। একটি নগরের উত্থান-পতন এর বিষয়। মাত্র পাঁচ পৃষ্ঠার গল্প। কিন্তু ঠাস বুনন। অপরদিকে, হোর্হে লুই বোর্হেসের ‘আলিফ’গল্পটি ভালো লেগেছে এর দার্শনিক ভাষ্যের কারণে। বোর্হেসের গল্পে সবসময় একটা দর্শন আমি খুঁজে পাই। তার শ্রেষ্ঠতম গল্পগুলোর মধ্যে ‘আলিফ’অন্যতম। একই কারণে ভালো লেগেছে ‘মৃত্যু ও কম্পাস’নামে তার আরেকটি গল্প। এটির অনুবাদও জিএইচ হাবিব। অনুবাদক হিসেবে তিনি বেশ শক্তিশালী। এ ছাড়া শাহাদুজ্জামানের ‘পণ্ডিত’গল্পটি ভালো লেগেছে। এটি তার ‘পশ্চিমের মেঘে সোনার সিংহ’ গল্পগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত একটি গল্প। আমার কাছে মনে হয়েছে শাহাদুজ্জামান সচেতন লেখক। তিনি বুঝেশুনে লেখেন। তার ভাষা মোটামুটি স্মার্ট। সমকালীন গল্পকারদের চেয়ে আলাদা।
কমলকুমার মজুমদারের ‘মতিলাল পাদরী’গল্পটি অসম্ভব খুবই লেগেছে। প্রায় আট বছর আগে তার উপন্যাস ‘অন্তর্জলী যাত্রা’পড়ে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলাম, সাহস করে ‘গোলাপ সুন্দরী’পড়া শুরু করেছিলাম। কিন্তু দেড় কি দুই পৃষ্ঠা পড়ার পর আর এগুতে পারিনি। দিনের পর দিন ‘উপন্যাস সমগ্র’টা অপঠিত পড়ে থাকায় কবি ও কথাসাহিত্যিক আবুবকর সিদ্দিক বিরক্ত হয়ে একদিন তার বই আবার ফেরত নিয়ে গেলেন। তারপর কমলকুমারের সঙ্গে আর আমার দেখা-সাক্ষাৎ নাই। নাই তো নাই-ই।
২০১৫ সালের কথা। বিশ্বসাহিত্যের বাংলা অনুবাদ পড়তে পড়তে নিজের ভাষার গতিটা যেন হারিয়ে ফেলেছিলাম। ভাষাকে লাইনমতো ফিরিয়ে আনতে বাংলা ভাষার অপঠিত গল্প-উপন্যাস যখন হন্যে হয়ে খুঁজছিলাম, কবি সৈকত হাবিব কমলকুমারের ‘গল্প সমগ্র’ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এই নাও, এইটা পড়।’নিলাম এবং পড়তে শুরু করলাম। ‘মতিলাল পাদরী’গল্পটি পড়ে আমি তাৎক্ষণিকভাবে ছোট্ট এক লেখায় লিখেছিলাম, “হে প্রজ্ঞার মালিক, হে দয়াময়ী সরস্বতী, তুমি আর কতবার আমাকে এভাবে নেংটো করবে? আমি প্রতিবারই এসব মহীরুহের সামনে দাঁড়িয়ে নেংটো হয়ে যাই। প্রতিবারই লজ্জায় লাল হয়ে যাই। দুমড়ে-মুচড়ে যাই। অস্তিত্বের অসহ্য সংকটে ভুগি। আমাকে তুমি উদ্ধার করো। এক টুকরো কাপড় দাও, আমি লজ্জা নিবারণ করি।”
বুঝুন এবার কতটা ভালো লেগেছে এই গল্প! গল্পটি পড়তে পড়তে কেন যেন আমার যিশুখ্রিস্ট এবং তদীয় মাতা বিবি মরিয়মের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। আচ্ছা, কমলকুমার কি এই গল্পের ভাব খ্রিষ্টের জন্মবৃত্তান্ত থেকে নিয়েছিলেন? কে জানে! হতে পারে। কেমন যেন মিলে যায়। হয়ত না। হয়ত আমারই ভুল ধারণা। কমলকুমার বিশেষজ্ঞরা (যেমন শোয়াইব জিবরান) ভালো বলতে পারবেন। সেই শিশুটির জন্মবর্ণনাটা যেভাবে দিলেন কমলকুমার, আহা, কী অসাধারণ! বর্ণনাটি এরকম, “...এ ঘোর জলেও তাঁর দেহ কি এক সত্যদর্শনে বিব্রত রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল। বিরাট পাহাড় ধসে যাওয়ার যে গম্ভীর বজ্র ব্যাপার, প্রকাণণ্ড প্রমত্ত সমুদ্রের দেহের ছোট নদীতে ঢল ঢুকে পড়ার যে প্রলয় অমোঘ ব্যাপার, তার থেকে ঢের বেশী এ দৃশ্য! চন্দ্র সূর্য তারকা নেই; শুধু প্রসিদ্ধ রক্তের জোয়ারের উত্তাল অলৌকিক শব্দ। যে রক্ত স্তিমিত আলোয়, বিদ্যুৎ এমন কি, কালোর পরিবর্তে অধিক কাল। মাংসল বীজ বিদীর্ণ করে ফেটে ছিঁড়ে, অন্ধকারবিরোধী একটি হাতিয়ার আসছে, অথবা ধরা যাক, আর একটি বৃক্ষ; যে বাসা দেবে, ছায়া দেবে, বৃষ্টি আনবে! অথবা শুধু মাত্র সন্দেহের পি- যা অজস্র আখছার। এ পিণ্ড আর একটি।...”
অমিতাভ রায় অনুবাদকৃত গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ‘বেচারি এরেনদিরা ও তার নির্দয় ঠাকুমার অবিশ্বাস্য করুণ কাহিনী’গল্পটি মার্কেজের অন্যসব গল্পে চেয়ে ভালো লেগেছে। ‘শত বছরের নির্জনতায় যে রূপকথা, উপকথা, ফ্যান্টাসি পেয়েছিলাম, গল্পটিতেও পাই এসবের কিছুটা। তার মশহুর ম্যাজিক রিয়েলিজম তো রয়েছেই।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর গল্প এর আগে বিচ্ছিন্নভাবে পড়েছি। এ বছর তার গল্পসমগ্র কিনে পড়া শুরু করলাম। ভালো লাগা গল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে নয়নচারা, জাহাজি, মৃত্যু-যাত্রা, খুনি, রক্ত, একটি তুলসীগাছ। মৃত্যু-যাত্রা গল্পে ওয়ালীউল্লাহ মন্বন্তরের যে চিত্র এঁকেছেন তা বাংলা সাহিত্যের খুব কম গল্পকারের পক্ষেই সম্ভব হয়েছে। এত জীবন্ত। যেন তিনি তুলি দিয়ে চিত্র আঁকলেন। ভবিষ্যতে তার গল্প নিয়ে বিস্তারিত প্রবন্ধ লিখবার ইচ্ছে আছে।
একইভাবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পও পড়ি এ বছর। এর আগে তার উপন্যাস পড়া নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। কম তো লেখেননি তিনি উপন্যাস। প্রায় চল্লিশ কি বিয়াল্লিশটা উপন্যাস লিখেছেন। আমি উপন্যাসের মানুষ, তাই তার উপন্যাসগুলোই আগে পড়ার চেষ্টা করেছি, যদিও সব কটি পড়তে পারিনি। ডিসেম্বরে তার ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’বইটি কিনি। আবদুল মান্নান সৈয়দের সম্পাদনা। ‘প্রাগৈতিহাসিক’গল্পটা আগেই পড়া ছিল, এবার আবার পড়লাম। গল্পকার মানিককে জানলাম নতুন করে। এটি গল্পসমগ্রের প্রথম গল্প। এই একটি মাত্র গল্প পড়ে মনে হলো, ঔপন্যাসিক মানিকের চেয়ে গল্পকার মানিক কম শক্তিশালী নন। কিংবা ‘আত্মহত্যার অধিকার’গল্পটির কথাই ধরা যাক। দারিদ্র্যতার যে চিত্র তিনি এঁকেছেন তাতে আমি অভিভূত। এত নিখুঁত লেখাও তবে হতে পারে! ‘অতসীমামি’তো তার প্রথম গল্পগ্রন্থ। প্রথম গল্পে তিনি এত শক্তিমত্তার পরিচয় দিলেন! বিস্ময়কর!

গল্পপাঠ : ৫
সেরা গল্পটি নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ বলুন। 
স্বকৃত নোমান : ৫
এ বছর পড়া সেরা গল্পের তালিকা দীর্ঘ। কোনটাকে সেরা বলি! সেরা গল্প নিশ্চয়ই আছে একটি। তবে সেটি নিয়ে এখনই কোনো পর্যবেক্ষণ তুলে ধরতে পারব না সময় স্বল্পতার কারণে। সময় স্বল্পতা, কারণ, আমি এখন একটা উপন্যাস লেখার মধ্যে ডুবে আছি। আরো অন্তত ছয় মাস ডুবে থাকব। উপন্যাসটি লেখা শেষ হলে এ বছর পড়া সেরা গল্পটি নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ লিখব হয়ত। এখানে শুধু একটি গল্পের কথা বলি, শামসুদ্দীন আবুল কালামের ‘পথ জানা নাই’। বিদ্যায়তনিক জীবনে গল্পটি আমাদের কোন ক্লাসে পাঠ্য ছিল মনে নেই। পাঠ্য ছিল, শুধু এটুকু মনে আছে। না বুঝেই, শুধু পরীক্ষায় পাসের জন্য গল্পটি পড়েছি। এবার পড়েছি নিজের গরজে। গরজ? হ্যাঁ গরজ। যেসব গল্পকার-ঔপন্যাসিকদের নিয়ে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের ভীত, তাঁদের মধ্যে শামসুদ্দীন আবুল কালাম অন্যতম। বাংলায় কথাসাহিত্য করতে হলে তাকে তো পড়তেই হবে। তিনি তাঁর গল্প-উপন্যাসের মধ্য দিয়ে যে ভূগোল সৃষ্টি করেছেন সেই ভূগোলটা তো জানা থাকা চাই। ‘পথ জানা নাই’বাংলা সাহিত্যে এমন একটি গল্প, যেটিকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। সাহিত্যের পাঠকরা গল্পটির কথা জানেন, গল্পটি পড়েছেন। বাংলা সাহিত্যের একজন নগণ্য কর্মী হিসেবে নিজের গরজেই আমাকে পড়তে হয়েছে এটি।
শামসুদ্দীন আবুল কালামের এই গল্পটি, পথ জানা নাই, মহাকাল মনে রেখেছে। নইলে এত এত বছর পর কেন আমি গল্পটি পড়লাম? নিশ্চয়ই কালকে উত্তীর্ণ করতে পেরেছে গল্পটি। বাংলা গল্পের ইতিহাসে চিরস্থায়ী আসন গড়ে নিতে পেরেছে এই গল্প। শামসুদ্দীন আবুল কালাম নামটি উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে প্রথমে আমার যে গল্পটির নাম মনে পড়ে সেটি ‘পথ জানা নাই।’ তিনি যে কটি গল্প লিখেছেন, সব কটি একত্রিত করে যদি শ্রেষ্ঠ গল্প বাছাই করতে বলা হয় আমাকে, তবে নির্দ্বিধায় এই গল্পটিকে শ্রেষ্ঠ গল্পের মধ্যে এক নম্বরে রাখব। কারণ? নিশ্চয়ই আছে। লেখক সমাজের বাইরের কেউ নন, তিনি রাজনীতিরও বাইরে নন। লেখক যে সাহিত্য করেন তা সমাজ ও রাজনীতিকে নিয়েই। ‘পথ জানা নাই’গল্পে সমাজ ও রাজনীতি সচেতনতা খুব স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় আমাদের কাছে। স্পষ্ট, কিন্তু শৈল্পিকভাবে। এই গল্পে সমাজটা কোথায়? মউলতলায়। এই মউলতলা গ্রামের গফুর আলী ওরফে গহুরালি একজন সামান্য কৃষক। মাত্র পাঁচ কুড়া জমির মালিক। শহরফেরত জোনাবালী হাওলাদারের ইচ্ছে হলো শহরের সঙ্গে মউলতলার একটা সংযোগ-সড়ক নির্মাণ করবে। তাতে গহুরালির পাঁচ কুড়া জমির মধ্যে দুই কুড়াই সড়কের পেটে চলে যাবে। গহুরালি আপত্তি নেই তাতে। কেন থাকবে? কাঁহাতক এভাবে দুটি দুটি ধান খুঁটে জীবন চালানো যায়! জোনাবালী বলেছে সড়ক হলে আয়-রোজগারের অনেক রাস্তা খুলে যাবে, নতুন জীবন হবে, জীবনে সমৃদ্ধি আসবে। জোনাবালীর মতো মানুষ, দশ বছর আগেও যার বাবা দিনমান খেটে এক মুঠো অন্নের সংস্থান করতে পারত না, অথচ তারই পুত্র শহরের কল্যাণে অগাধ ধন-সম্পদের মালিক এখন। জোনাবালী যদি পারে গহুরালি কেন পারবে না? রাস্তাটা হলে তার জীবনেও তো পরিবর্তন এসে যেতে পারে।
হ্যাঁ, রাস্তার কল্যাণে তার জীবনে পরিবর্তন আসে বটে। রাস্তা হলো। মউলতলার পরিবর্তন হতে লাগল ধীরে ধীরে। পরিবর্তনটা কী? গ্রামবাসীর আয়-রোজগার বাড়তে লাগল। গহুরালিরও। বছর তিনেকের মধ্যে খোড়োঘরের চাল ফেলে সে টিন তুলে ফেলল। মোটাদাগে এই হচ্ছে মউলতলার সমাজের অর্থনৈতিক পরিবর্তন। কিন্তু অর্থনীতির বাইরেও সমাজের সংস্কৃতি বলে একটা জিনিস আছে, যা প্রত্যেক সমাজেই থাকে। শহরগামী সড়কের কারণে মউলতলার সংস্কৃতির পরিবর্তন হতে লাগল। পরিবর্তন না বলে ‘ভাঙন’বলাটাই শ্রেয়। মউলতলার সংস্কৃতিতে ভাঙন ধরল। সড়কটির ফলে মউলতলা গ্রামের মানুষের আর্থিক উন্নতি হতে লাগল সন্দেহ নেই, তবে সেই সঙ্গে বহুদিনের শান্তিপূর্ণ গ্রামটিতে অশান্তিও হানা দিতে লাগল। শহরের ফৌজদারি-দেওয়ানীতে ছোটাছুটি শুরু করল গ্রামের মানুষ। সাদামাটা সরল জীবনে আসতে লাগল কূটবুদ্ধি আর কৌশলের দড়িজাল। মউলতলা ধীরে ধীরে জটিল হয়ে উঠল। একদিন খুনের ঘটনা ঘটে গেল একটা। মউলতলা স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি গ্রাম ছিল। হয়ত জীবনে তাদের কষ্ট ছিল, কিন্তু উপোষ থাকতে হয়নি,  দু-বেলা দু-মুঠো খেয়ে বেঁচে থাকতে পেরেছে। শান্তিপূর্ণভাবে। কিন্তু ইংরেজ শাসনের শেষদিকে এই গ্রামে দুর্ভিক্ষ হানা দিল। চাল-ডালের দাম বাড়তে লাগল ধীরে ধীরে। দাম চড়ল সব জিনিসের, কমলো শুধু জীবনের। রোগ-ব্যাধি, চোরাবাজার আর দুর্নীতির উত্তাল জোয়ার এলো। সুশাসনে নিযুক্ত সরকারি কর্মচারী আসে এই রাস্তা ধরে, আবার ঘুষ পকেটে নিয়ে ফিরে যায়। আর আসে তরি-তরকারী, কাঠ, হ্যানোত্যানো নানা জিনিস কিনতে মিলিটারির দালাল। ঘটনাচক্রে তাদের একজনের সঙ্গে গহুরালির পরিচয় হয়, ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। একদিন সকালে ঘুম থেকে জেগে গহুরালি তার স্ত্রী হাজেরাকে খুঁজে পেল না। কোথায় গেল হাজেরা? কোথায় আবার, মিলিটারির দালালের সঙ্গে পালিয়ে গেছে।

অতঃপর একদিন গহুরালি একটা কোদাল নিয়ে রাস্তাটি কোপাতে লাগল। এই রাস্তা সে কেটে ফেলবে। কারণ? কারণ এই রাস্তা দিয়েই গ্রামে এসেছে সমস্ত অশান্তি, এই রাস্তাই টেনে নিয়ে গেছে তার ঘরের মানুষটিকে। তাই রাস্তাটি সে আর রাখবে না। রাস্তা তৈরি ছিল একটা ভুল।
গল্পটি পড়ে সচেতন পাঠক ধরে ফেলবেন শামসুদ্দিন আবুল কালামের সমাজ-রাজনীতি ও ইতিহাস সচেতনতা। মউলতলা শুধু একটা গ্রামই নয়, যেন গোটা প্রাচীন বাংলা। মউলতলা স্মরণ করিয়ে দেয় বাংলার সেই সমৃদ্ধির কাল। বাংলার গুটিপোকা থেকে রেশম, তাঁত ও মসলিন দখল করেছিল সমগ্র ভারত, তুরস্ক, সিরিয়া ও আরবদেশের বাজার। ধান থেকে শুরু করে সব রকমের শস্য, মাংস, চিনি ও তুলার জন্য বিখ্যাত ছিল এই জনপদ। স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল এই বাংলার মানুষ, মউলতলার কৃষকরা যেমন। কিন্তু হায়, দিল্লি সুলতানের দু’বার বাংলা অভিযান, চট্টগ্রাম নিয়ে ত্রিপুরা ও আরাকান রাজাদের কাড়াকাড়ি, আহোম ও উড়িষ্যার রাজাদের আক্রমণ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজ্যগুলি উত্থান, পর্তুগীজদের বাংলায় অনুপ্রবেশ ও বঙ্গোপসাগর দখল, শেরশাহ ও মুঘলদের গৌড় দখল, মুঘলদের বাংলা বিজয়, তারপর ইংরেজদের আগমন, সব মিলিয়ে বাণিজ্যজাত লাভ বাঙালি বণিকদের হাত থেকে চলে যায়। বাঙালির জীবনে নেমে আসে দুর্ভোগ। বাংলার প্রকৃত সম্পদগুলো হারিয়ে গেল, যেমন হারিয়ে যায় মউলতলার কৃষিসম্পদ, যেমন হারিয়ে যায় গহুরালির বউ হাজেরা। বাঙালির সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির বন্ধন টুটে যায়, যেমন টুটে যায় মউলতলা গ্রামবাসীদের চিরায়ত সম্প্রীতির বন্ধন। বাংলায় শুরু হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, মউলতলায় যেমন খুনের ঘটনা ঘটে যায়। শেষ পর্যন্ত বাংলার মানুষরা রাস্তাটা কেটে দেয়ার উদ্যোগ নেয়, যে রাস্তা দিয়ে এসেছিল ইংরেজ বণিকরা। বহিঃশক্তির সঙ্গে তাদের লেনাদেনা চুকিয়ে, তাদেরকে এই ভূমি থেকে খেদিয়ে আবার ফিরে যেতে চায় নিজেদের সুবর্ণ অতীতে, গহুরালি যেমন ফিরে যেতে চায়।
কিন্তু ফিরে কি সত্যি যেতে পেরেছে? আমরা কি এখনো ঔপনিবেশিক অবশেষ থেকে নিজেদের পুরোপুরি মুক্ত করতে পেরেছি? পারিনি তো। গহুরালিও কি ফিরে যেতে পেরেছিল? গল্পে সেকথা বলা নেই। তবে আমরা নিশ্চিত মউলতলা তার পূর্বাবস্থায় ফিরে যেতে পারেনি। ‘পথ জানা নাই’র ধাঁধাটা এখানেই। অর্থাৎ মউলতলাবাসী আসলে প্রকৃত পথের সন্ধান পায় না। সমাধান কোনপথে? সড়ক কেটে দেয়ায়, নাকি পুনঃস্থাপনে? মউলতলাবাসী সঠিক পথের দিশা পায় না। এ কারণেই গল্পের নাম ‘পথ জানা নেই।’ গল্পটির মধ্য দিয়ে গল্পকার একদিকে আধুনিক সভ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। বলতে চেয়েছেন সভ্যতা মানুষকে যা দিয়েছে, নিয়েছে তার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। সভ্যতার খারাপ দিকটিই দেখাতে চেয়েছেন গল্পকার। আবার একই সঙ্গে এই প্রশ্নও তুলেছেন, সমাধান আসলে কোন পথে? গল্পের শেষ লাইনটিতে এই প্রশ্ন রয়েছে : “সকলের ইচ্ছা হইল জিজ্ঞাসা করে ঠিক হইত কী হইলে, কিন্তু গহুরালি দূরের কথা, তাহারাও কি তাহা জানিত! অন্য কোনো নয়া-সড়কের স্বপ্ন তো তাহাদের মনে কেহ জাগায় নাই।”
তার মানে এটাও ভাবার কারণ নেই সভ্যতার সব কিছুই খারাপ। তাই বলে এই নয় যে মানুষ মউলতলাবাসীর মতো যুগের পর যুগ একটা বদ্ধ জলাশয়ের মধ্যে থেকে যাবে। মানুষ প্রতিনিয়ত তার গণ্ডি অতিক্রম করতে চায়। মানুষ চায় অন্যের সঙ্গে মিলতে, নতুনের সঙ্গে নিজেকে মিলাতে। মউলতলার জোনাবালী হাওলাদার ঐ মিলানোর কাজটিই করেছে। শত শত বছর ধরে বদ্ধ জলাশয়ের মধ্যে থাকা মউলতলাবাসীকে সে উন্নত জীবনের সন্ধান দিতে চেয়েছে। একটি সড়ক নির্মাণ করে সে দেখিয়েছে, এই মউলতলার বাইরেও আরো জীবন আছে, জীবনের আরো অনেক রঙ-রূপ আছে। জোনাবালী এই সড়ক নির্মাণ না করলেও একদিন কেউ-না-কেউ করতই। এটাই স্বাভাবিক। কেননা মানুষ প্রতিনিয়তই তার গ-ণ্ডিকে অতিক্রম করে। ক্ষুদ্র থেকে মানুষ বৃহতের সঙ্গে মিলে। সেই মিলনের মধ্য দিয়ে সভ্যতার অগ্রগতি সাধিত হয়। এই মিলনের মধ্য দিয়ে প্রাপ্তি যেমন থাকে, তেমনিভাবে হারানোর ব্যাপারও থাকে। ভাগ্যান্বেষণে যে বৃটিশরা এই দেশে এসেছিল তারা আমাদের কাছ থেকে নিয়েছে অনেক, কিন্তু দিয়েছে কি কম? মোটেই না। তুর্ক, আফগান, মোগলের পরে নতুন এই বিদেশিরা এসে এ দেশে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করল। এই বিদেশিরা সুদূর ইউরোপ থেকে সওদাগরি জাহাজে চড়ে আসে। সঙ্গে আনে ইংরেজি ভাষার বইপত্র। গঙ্গার ঘাটে নামিয়ে দেয় সেসব বই। নাটক উপন্যাস কাব্য প্রবন্ধ। রাজনীতি অর্থনীতি দর্শন বিজ্ঞান সন্দর্ভ। ইংরেজদের ঘরে ঘরে ক্লাবে ক্লাবে বইপত্র জমে উঠে। বাঙালিরাও কি ক্রমে ক্রমে জমতে থাকা এসব বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়নি? নিশ্চয়ই হয়েছে। রামমোহন কি হননি? মাইকেল হননি? বঙ্কিম হননি? বিবেকানন্দ বা অরবিন্দ হননি? রবীন্দ্রনাথও কি হননি? ইংরেজ কর্তৃক ভারত শাসনকে কে বলেছিলেন ‘বিধাতার আশীর্বাদ’? রবীন্দ্রনাথই তো। তিনি বিশ্বাস করতেন পূর্ব আর পশ্চিম পরস্পরের পরিপূরক, মহামানবের সাগরতীরে তাদের মিলন হবে।
সুতরাং প্রাপ্তি আমাদের কম নয়, আবার হারানোর বেলায়ও কম হারায়নি। পেয়েছি যেমন, দিয়েছিও তেমন। এটাই স্বাভাবিক। বন্যা যখন আসে তখন বদ্ধ জলাশয়ের পচা-গন্ধ জলকে টেনে বের করে নিয়ে যায়, মাছগুলোকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, আবার কিছু মাছ বন্যার জলের সঙ্গে ঢুকেও পড়ে। অর্থাৎ যায় যেমন, আসেও তেমন। মউলতলার ওই রাস্তা দিয়ে বন্যার জল ঢুকেছে। এই বন্যা মউলতলাবাসীকে যা দিয়েছে, সমপরিমাণ নিয়েও গেছে। প্রাপ্তি ও হারানো সমান সমান। এই কারণেই মউলতলার সমস্যার সঠিক কোনো সমাধান পাওয়া যায় না। এই কারণেই গল্পের নাম ‘পথ জানা নাই’। অর্থাৎ সমস্যা সমাধানের পথটি জানা নাই।

গল্পপাঠ : ৬
আপনি কি মনে করেন, এই গল্পগুলো বাংলাদেশের চিরায়ত গল্পগুলোর সমতুল্য বা তাদেরকে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে?
স্বকৃত নোমান : ৬
এটি অবশ্য জটিল প্রশ্ন। এ বছর আমি যে গল্পগুলা পড়েছি তার আগে আমি এরচেয়ে ভালো গল্পও পড়েছি। এই তুলনাটি ঠিক করা যাবে না আসলে। যেমন ধরুন সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘একটি বানুকের উপকথা’ আমি চল্লিশবারের বেশি পড়েছি। হাসান আজিজুল হকের ‘আমৃত্যু আজীবন’ দশ-বারো বার পড়েছি। ভালো লাগে বলে পড়ি। এরকম আরো বহু ভালো গল্প বাংলা ভাষায় রয়েছে। সুতরাং অতিক্রম করার ব্যাপারটা আসলে আপেক্ষিক। প্রত্যেক লেখকই আলাদা আলাদাভাবে শ্রেষ্ঠ। 

৩টি মন্তব্য:

  1. শামসুদ্দীন আবুল কালামের ‘পথ জানা নাই’ নিয়ে বিশ্লেষণ খুবই ভালো লাগলো । কোন গল্প যে চল্লিশবারের বেশি পড়া যায়, কোন একটা গল্প যে দশ-বারো বার পড়া যায় তা স্বকৃত নোমানের কাছেই শেখা যায়। তবে বিদেশী থেকে দেশী গল্প নিয়ে আরও বললে ভালো হতো।

    উত্তরমুছুন