মঙ্গলবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০১৫

হাসান আজিজুল হকের গল্প - খাঁচা

সিঁডির কাছে এসে হাঁফ ধরল। বড্ডো ঠাণ্ডা। কোণাভাঙ্গা আর সাঁতলা-পড়া। বড্ডো পিছল। অধঃপাতের পথের মতো। সেখানে এসে ভাবল, যেতে পারছি না। তখন শিশিরের শব্দ। আর সেতার বেজে উঠল। গ্যাও-গ্যাও আওয়াজ অন্ধকারকে ধরে মুচড়ে দিলে কেউ যেন ব্যথায় কঁকালো। কই আলো আনো— কী করছে ছাই-আলো আনো না-ভারী অন্ধকার যে ! সেতার থেমে গেলে চিৎকার। আবার চিৎকার, আলো আনো।
অম্বুজাক্ষ বসে আছে সেতার কোলে । আমাকে খেপিও না এইভাবে । সরোজিনী উঠে এলে হারিকেনের আলো তাকে দেখে বিশ্রী হাসল। খোঁচা খোঁচা দাড়ি --কপালে ল্যাপটানো শনের মতো হালকা চুল। দেয়াল ফাটিয়ে যে অশথ গাছটা উঠেছে তার কালো ছায়া পাগলের মতো মাথা নাড়তে লাগল ।
বসো-নিজের পাশে মাদুরে বসার জন্যে অম্বুজাক্ষ সাদরে আহবান করে ।
না-কাজ আছে ।
একটু বসো। কাজের কথাই আছে তোমার সঙ্গে। একটু বসো ।
ছাদে বসে কাজের কথার ঢং ছাড়ো। কথা থাকে নিচে চলো।
তুমি ভাবছ তোমাকে বাইজি ভাবছি আমি তাই না ?
হারিকেনের আলোয় সরোজিনীর শিরা-ওঠা শীর্ণ হাত তর্জন করে ।
আমি এখন যাব ।
ক'টা পান দিয়ে যাবে ?
পান নেই বাড়িতে ।
দোকান থেকে আনিয়ে দাও না-মাতালের ভঙ্গিতে সরোজিনীর কোমর জড়িয়ে ধরে অম্বুজাক্ষ ।
তখন উগরে দেয়। সরোজিনী গলগল করে উগরে দেয়। দ্যাখো কত বিষ আমার । অতি তিক্ত, অতি কঠিন গলায় সে বলে, ছাড়ো। ছাড়ো আমাকে।
সরোজিনীর সামনের বাঁদিকের দাঁতটা পড়ে গেছে। কথা বলতে গেলেই দুর্গন্ধ থুতু বেরিয়ে আসে। অম্বুজাক্ষ তাকে তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিল ।
পান আনিয়ে দাও না ক'টা দোকান থেকে-আবার বলল সে ।
পয়সা নেই। আনবার লোক নেই কেউ এখন।
সুর্য কোথায় ?
সে বাড়ি আসবে রাত বারোটার পর।
তুমি কি যাত্রা দলের ঘোষক-এ্যাঁ!
একথার জবাবে হারিকেন রেখে সরোজিনী উঠল। যেয়ো না সরোজিনী যেয়ো না-তোমাকে আমার ভারী দরকার—এখুনি-সেতারে আকুল হয়ে এই কথাগুলো বাজাল অম্বুজাক্ষ এবং সরোজিনী সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল। কাজেই বিকৃত হেসে অম্বুজাক্ষ সেতারে আলাপ চালাতে থাকে। শিশিরের শব্দ কানে আসে না, হাওয়া না থাকায় আলাপের বুকভাঙ্গা শব্দ ছাদেই ঘুরতে থাকে ভূতের মতো --তারপর সিড়ির ফাঁক পেয়ে সেদিক দিয়ে নামে-নির্জন বারান্দা ধরে নিবিষ্ট পায়রাদের ওপর দিয়ে শুন্য ঘরগুলোতে গিয়ে ঢোকে।
এইভাবে আজকাল সেতার বাজাচ্ছে অম্বুজাক্ষ । বিশ বছর পর । অবশ্য বিশ বছর আগে অম্বুজাক্ষের হাতে সেতার আনন্দিত হয়ে বেজে উঠত। তারপর বন্ধ হয়ে গেল। অম্বুজাক্ষ হোমিওপ্যাথি ধরার পর। হোমিওপ্যাথি কঠিন জিনিস । মনোযোগের ব্যাপার। কিন্তু হোমিওপ্যাথি হোক আর এ্যালোপ্যাথি হোক আজকাল কেউ পয়সা দিতে চায় না। রোগ সেরে গেলে দুটো টাকা দিতে পারে। ক'সের চাল দিয়ে যেতে পারে। কিছু শাকসব্জি তরিতরকারি বাড়িতে পৌছে দিতে পারে। কাজেই রোগ সেরে যেতে পারে-টাইফয়েড নিউমোনিয়া যক্ষ্মা ইত্যাদির মতো নির্ণয় রোগ না হোক-নিদেনপক্ষে পেটের অসুখ, সর্দি, গা-গরম ইত্যাদি সারানোর মতো হোমিওপ্যাথি জানতে গেলে সেতার চলে না। খেলো ছকে হাতে বুড়ো বাপ এসে জিজ্ঞেস করেছিলো, বাজনটা ছেড়ে দিলি ? ও-বাজনায় পাগল সেরে যায়-বেশ লাগত সন্ধেটা। ছেড়ে দিলি একেবারে ? তাই অম্বুজাক্ষকে শুনিয়ে দিতে হয়, উপায় কী বলো ? জমিজমা শেষ –তোমারও আর-কিছু করার শক্তি নেই, একপাল ছেলেমেয়ে। সংসারটা না দেখলে চলবে কেন ?
শেষে হোমিওপ্যাথি ?
আর কী করি ?
একটা স্কুল-মানে একটা টোলের মতো করলে হয় না ? আমাদের কুলবিদ্যা-বংশগতবৃত্তি ।
অম্বুজাক্ষ বাপের দিকে চায়। হাতে খেলো হু'কো, গায়ে ময়লা মোটা পৈতে, ঘোলা চোখ ।
কী পেয়েছ জীবনে ? কিছু পেয়েছ? খড়ম পায়ে চন্ধোবত্তিগিরি করেছ। আর তো চলবে না, এখন পাকিস্তান হয়ে গেল-দেশ ভাগ হয়ে গেল-এখন কী হবে ?
অতএব সেতার পশ্চিমের অন্ধকার ঘরে সহায়হীন হয়ে ঝুলে থাকে। অম্বুজাক্ষ বাধক, তন্ডকা, অজীর্ণ, আমাশা থেকে শুরু করে পিত্তচাঞ্চল্য এবং বায়ুকোপ পর্যন্ত যাবতীয় বঙ্গীয় রোগবিশারদ হয়ে যায় ।
 কিছু কী হচ্ছে ? বাবা একেবারে ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে।
অম্বুজাক্ষ খুচরো গুনছিল বাজিয়ে বাজিয়ে। ভ্রু কুঁচকে তাকায়। ঠিক যেন চিনতে পারছিল না একটু সময়। তারপর অন্যমনস্কের মতো বলে, এই আর কী। এই যেমন ধরো, অম্বুজাক্ষ কথা শেষ করে না অথচ তার মাথার মধ্যে কথা চলে, যেমন ধরো কেউ দিলে না-ধরো ছেলের পিলে বেরিয়ে এসেছে –কিন্তু বাপ তার নিজের পিলের উপর ছেলেকে বসিয়ে নিয়ে এসেছে-এই অবস্থায়,  হ্যাঁ, জমির শেখের কথাই বলি আমি – এই অবস্থায় কার চিকিৎসা করা উচিত আগে আমি বুঝতে পারি না বাবা। আর পেটের পিলে থেকে কীভাবে টাকা বেরুতে পারে বলতে পারো। কিংবা পদ্মপিসির কথা ধরো-দুটো কুসী দিলে, বাবা মাজ্জনা করে দে, আর পারিনে, যমে নেয় না। এইরকম অবস্থা বাবা বুঝলে? এইরকম । খেলো হু'কো যেন ফেটে যাবে-কালীপ্রসন্ন চড়াং চড়াং টানে-দম বন্ধ করে কাশে। হিরণ, (অম্বুজাক্ষেৰ ডাকনাম ) অম্বু, আমার মানিক-বুডো হয়ে যাচ্ছিস। আমি চিনি না ওকে। ও চেনে না আমাকে । বাবা, এই বয়েসে তোর কষ্ট মুছে দিতে চাই। প্রয়োজনে মরে গিয়ে । মরে গিয়েও ।
খুচরো কতক্ষণ গোনা যায়। অম্বুজাক্ষ তাকায়। রোদের মধ্যে বাবা হেঁটে যাচ্ছে খড়মের আওয়াজ তুলে। কার্নিশে কাক ডাকছে। বাবা ফিরে এসো। অম্বুজাক্ষর ইচ্ছে করে। কালীপ্রসন্ন ফিরে এসে অম্বুজাক্ষের হৃৎপিণ্ড ধরে মুচড়ে দেয় কসাইয়ের মতো।
হিরণ, বাবা দু'আনা পয়সা দিবি ? অসুবিধে হলে থাক ।
কী করবে ?
দাড়িটা কামিয়ে আসতাম। হাত কাপে, নিজে ক্ষুর ধরতে পারি না।
অম্বুজাক্ষ পয়সা দু’আনা ছুড়ে দেয়, যাও, যাও।
খড়ম করুণ হয়ে বাজে। ফিরে যায়। মহাদ্যুতিমান সুর্য প্রহার করে । সকালে সে সর্বপাপঘ্নকে ডাকাডাকি করেছিল কালীপ্রসন্ন সে ।
কে যায় ? অম্বুজাক্ষ হেঁকে ওঠে।
অরুণ ।
শুনে যাও ।
কেউ আসে না শুনতে ।
কই, অরুণ শুনে যা ।
দূর থেকে সে বলে, পরে শুনব । জরুরি কাজে বেরুচ্ছি একটু।
এইসময় অরুণের মা সরোজিনী আসে। তার কাছে অরুণের ব্যবহারের অভিযোগ করলে সে উকিলের মতো জেরা শুরু করে, কী দরকার ওকে। অম্বুজাক্ষ কোনো দরকারের কথা মনে করতে পারে না। সে কিছুই মনে করতে পারে না। কোনো দরকারের কথাই তার মনে আসে না।
ওদিকটায় পাহাড় আছে, তাই না? দুহাতে মাটির উপর ভর কবে সরোজিনী অম্বুজাক্ষের দিকে ঝুকে আসে, পাহাড় আছে বলছিলে না তুমি ? রুগণ খুকির মতো বড়বড় চোখে সে চেয়ে থাকে, পাহাড় না থাকলে ওদিকে যাব না বাপু -আমার বাবা বলতেন-
 ওদিকে পাহাড কোথায় গো ? অম্বুজাক্ষ খেতে খেতে বলে, নলহাটি থেকে তুমি পাহাড় দেখতে পাবে-ছোটনাগপুরের পাহাড়-ঠিক যেন নীল মেঘ, ভারী সুন্দর।
সেখানে যেতে পারব না? সরোজিনী ঠোঁট ফুলিয়ে আবদার করে।
আহা, সে তো অনেক দুর-বিশ-ত্রিশ মাইল হবে। ওটা তো সাঁওতালদের জেলা ।
তাহলে ওখানে বিনিময় বন্ধ করে দাও তুমি। কত কষ্টে দেশ ছাড়ছি। ইণ্ডিয়ায় গেলে বারবার কী বদলাতে পারব ? বিনিময় যখন হবে একেবারে একটা ভালো জায়গায় যাওয়া ভালো না?
 আচ্ছা সে করা যাবে-এত ব্যস্ত কেন ? মনে হচ্ছে যেন আজই যাচ্ছ ? অম্বুজাক্ষ বলে।
যেতে যখন হবেই-তখন তাড়াতাড়ি কী ভালো নয় ? যত তাড়াতাড়ি মায়া কাটানো যায়। সবাই চলে যাচ্ছে। আমরাও তো যাব ।
আমরাও যাব-আমরাও যাব। বাজে। বুকের মধ্যে। এইসব পরিত্যাগ করে, এইসবের মধ্যে মরে গিয়ে। সজল আকাশ, ঠাণ্ডা বাড়ি, পুকুর ঘাট, সাদা পথ, লতার মিষ্টি গন্ধ, জমির শেখ, পদ্মপিসি এইসবের মধ্যে মরে গিয়ে আবার বেঁচে ওঠা। নতুন আলোয় চোখ রেখে নীল পর্বতশ্রেণী, উদ্রিক্ত সমুদ্র চেতনায় দোলে। আমরাও যাব। অম্বুজাক্ষ খুব তাড়াতাডি খেতে থাকে, আচ্ছা, আমাদের এই দেশেরই মতো দেখতে কোথাও গেলে হয় না ? যেমন ধরো নদী আছে, গাছপালা একটু বেশি-কোনো ঠাণ্ডা জায়গায় ? অম্বুজাক্ষ প্রশ্ন করে । অর্থাৎ একই পাখি দেখব – একই মেঘ আর আকাশ-এইরকম কথা বলে ফেলে সে ।
কোথায় যাবে ?
নবদ্বীপের কাছাকাছি কোথাও । শুধু নবদ্বীপ কেন-ও দেশটাই কতকটা আমাদের দেশের মতো। আমি গেছি তো-বেশ গাছপালা আর সব ছায়া ছায়া ।
না বাপু জঙ্গলে জায়গায় গিযে কাজ নেই। কোনো শুকনো জায়গায় চলো ।
বাদ দাও এখন এসব কথা-অম্বুজাক্ষ বাবান্দা থেকে হ’ত ধুয়ে ফিরে আসে, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। তিনটে বছর চলে গেল কিছুই করতে পারলাম না। বিনিময়ের পার্টি পেলেও হয় বনিবনা হচ্ছে না, না হয় গবমেণ্ট একটা কিছু বাঁধিয়ে বসছে। একটা না একটা গণ্ডগোল লেগেই আছে।
আমাদের কিন্তু পাকা বাডি চাই, এইরকম-সারোজিনী অবুঝ হবার ভঙ্গি করে ।
সেতো বটেই। এতদিনের অভ্যেস কি ছাড়া যায়। পাকা বাড়ি ছাড়া বিনিময় কবব না-অম্বুজাক্ষ ঘোষণা করেই আবার বেরিয়ে যাচ্ছিল, সরোজিনী বলে, পান নিয়ে যাও। ভুলে যাচ্ছিলে নাকি ?
বাইরের ঘরে আছি। ভ্যাবলাকে দিয়ে পাঠিয়ে দাও।
ভ্যাবলা নেই বাড়িতে ।
কোথায় গেছে ?
জানি না-ও কোথায় যায় আমি জানি না।
তুমি ঘুমোও নাকি ? জানি না-কী জানো তুমি আঁ? কী জানো সংসারের--অম্বুজাক্ষ মুহূর্তে খেপে ওঠে এবং যত কথা বলে তত খেপতে থাকে ! পাষণ্ডের মতো চেঁচায়, তুমি আছো কী জন্যে ? ছেলেপুলে এক-একটা মূর্তিমান হনুমান হচ্ছে। বড়বাবু দাড়িগোঁফ চাচতে শুরু করেছেন। এত বড় বেহায়া যে বাবার ক্ষুর নিয়ে গেছে চুরি করে। মেজোটি মারামারি করে বেড়ান। তার পরেরটির পাত্তাই নেই। বলি এই যে শুয়োরের পালটি পোষা হচ্ছে—কেন শুনি ?
সরোজিনীও রাগে দিশেহারা হলো, তোমার পিন্ডি চটকাতে । তিন বছর ধরে তো খুব লাফাচ্ছ-ইণ্ডিয়া যাব, ইণ্ডিয়া যাব । কোথায় ? হোমিওপ্যাথি করছেন-ছেলেপূলে এমনি মানুষ হবে, আকাশ থেকে টুপটুপ করে দেবপুত্র নামবে তোমার জন্যে !
শানের মেঝেতে খড়ম বেজে উঠল জোরে।
অন্ধকারে ধারালো ছুরির ফলার মতো চিৎকার সাৎ করে ছুটে আসে, সাপ, সাপ!
কোথায়, কোথায় ? তিনি তো সাপ নন। সাপেদের রাজা তক্ষক। গৃহদেবতা।
সবচেয়ে বড় আর সুন্দর ঘরটার উত্তর-পশ্চিম কোণ ফাটিয়ে যেদিন পান্নার মতো কচিপাতা নিয়ে অশথ দেখা দিল, ঠিক সেদিনই অদৃশ্য  চিড়গুলোর সূত্রপাত হলো। অশথের পাতার ভিতরে সুক্ষ জটিল জালের মতো চিড় । তারপর সেই বর্ষার শেষে প্রথম শরতে তিনি এলেন, ডেকে উঠলেন-কট কট কট তোক্কে তোক্কে এবং মূহুর্তে পাতার আড়ালে চলে গেলেন। ছাদ ইতিমধ্যেই চৌচির হয়ে গিয়েছিল বলে ঘর থেকে বাস সরিয়ে নিতে হয়েছিল। সেই ভাঙা ফাঁকা ঘরেই প্রথম দর্শন হলো সোজা ছেলে অরুণের সঙ্গে। বেশ বড় একটা টিকটিকি, সবুজে ছোপের সাদা রং । উপযুক্ত মারণাস্ত্রের খোঁজে বাইরে আসতেই দাদামশায়ের সঙ্গে দেখা-কি ব্যাপার ?
ঘরে একটা সাপ-মারব।
কই দেখি। দাদামশাই ঘরে এসে সেটার দিকে চেয়ে থাকেন। চোখ কুঁচকে উঠেছে, কপালে অসংখ্য ভাঁজ। কোনো প্রাচীনতাকে দেখছেন ? তারপর আর কী? কাপতে থাকল ঠোট । চোয়াল-চিবুক ভেঙেচুৱে কেঁদে ফেললেন, এতদিনে দয়া হলো ? এসেছো আমার বাড়িতে? থাকো, অধিষ্ঠান করে চিরঞ্জীব । অরুণের দিকে ফিরে বললেন, ওরে সর্প নয়, সর্পরাজ রে দাদা। খবরদার ওর গায়ে হাত দিসনে ।
এইসব কথা বলতে বলতে তক্ষক অশথ গাছে চলে গেল। সেই থেকে এখানেই আছে। আজ চিৎকার শুনে সরোজিনী দৌড়ে এলেন রান্নাঘর থেকে তাড়াতাড়িতে কুপিটা নিভে গেল বাতাসে। চেরা গলায় চেঁচানি, সাপ কোথায় অরুণ, কোথায় সাপ দেখলি ?
এসো না, এদিকে এসো না। তোমার পায়ের কাছেই জঙ্গলে । খবরদার এগিয়ো না-আমি মারছি ওকে।
শুকনো লম্বা ঘাসে সরসর শব্দ। আগাছা আর ঘাস । লম্বা-প্রায় হাটু পর্যন্ত লম্বা সোনালী ঘাস। কাঁটাঝোপ । সেইখানে দাঁডিয়ে সরোজিনী আপাদমস্তক থরথরিয়ে কাপে। ঐখানে বাঁধাঘাট ভেঙে চূৰ্ণ হয়ে গেছে। কাকচক্ষু জল আর নেই। সেখানে এই অনাহুত নির্দয় ঘাস। দেয়ালে দেয়ালে বট আর অশথ। সরোজিনী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপে। কিসের খোঁজে যেন অরুণ দৌড়াদৌডি করে স্রোতের মতো লাগে ওকে। অন্ধকার শূন্য ঘরগুলো খোলা দরজা দিয়ে ওর দিকে চেয়ে থাকে। সেখানে নৈঃশব্দ ।
দাদামশাইয়ের ঘরে আলো নিভে গেছে। স্থবির মাথায় কিছুই ঢোকে না। হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছেন। হয়তো আবছা অতীত হানা দিয়েছে প্রাচীন মস্তিষ্কে। দুর্জ্ঞেয় কিছু চলছে-বা সেখানে। কাজেই আবার নৈঃশব্দ। অম্বুজাক্ষ বাডিতে নেই-তামাক খেতে গেছে কোথাও । আর কেউ নেই বাড়িতে | কে ডেকে গেল যেন। মহাপৃথিবী থেকে এইখানে। হাওয়ার মতো শিস দিয়ে উঠল। শ্বসিয়ে উঠল হালকা বড়ো বড়ো ঘাসে । হাওয়াই এমন প্যাচ কম্বল যে অগ্নিশিখার মতো পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে শুকনো ঘাস, কেমন লেলিহান হয়ে উঠল আর তার বিরাট দেহের জায়গায় জায়গায় ঢেউ উঠল। কেউ কাটে না এই ঘাস। সরোজিনী আপন মনে বলে। কী হবে পরিস্কার করে—সব ছেড়ে তো যেতেই হবে। অম্বুজাক্ষই কি ফিসফিস করে উঠল ?
ইস, সব জঙ্গল হয়ে গেছে। অরুণ, ওদিকে যাসনে বাবা, পায়ে পড়ি তোর। কথা শোন ।
চুপ করো তুমি-কৰ্কশ কণ্ঠ ভেসে এল।
সাপ মারতে হবে না, বাবা আমার ।
সব ব্যাপারে খ্যাঁচ-খ্যাঁচ কোৱো না বলে দিচ্ছি। অরুণের হাতে লাঠি । লাঠি ঝাঁকিয়ে আস্ফালন করে চলল। এত নির্দয় যেন লাঠিই পড়ল সরোজিনীর পিঠে ।
কোন দিকে গেলি ? বেরোও বাবা-সোনা আমার ।
সেকি আর আছে রে-চলে গেছে। তুই বারান্দায় উঠে আয়।
খবরদার বুড়ি-রোষকষায়িত চোখে অরুণ চায়।
অন্ধকার লজ্জাহর। সরোজিনী অরুণকে দেখে না।
অরুণের কথা শেষ হয় না-অন্ধকারে আর-একটা আঁধার-বিদ্যুৎ চমকে ওঠে। হিস-স-স। দিলি তো শালা কামড়িয়ে-পা চেপে অরুণ ঘাসের উপর বসে পড়লো । কামড়িয়েছে । কামড়িয়েছে তোকে অরুণ ? ভয়ঙ্কর চিৎকার করে সরোজিনী। ওরে তোকে তখুনি বললাম। কী করলি রে-তুই কী করলি ?
 চুপ করো, কামড়িয়েছে তো কী হয়েছে ? কেঁউ কেঁউ করছ কেন ?
 তুই কী করলি রে বাপ-সরোজিনী বুক চাপড়ে চুল টেনে একটা কান্ড করে।
মৱে যাব এই তো ? বয়ে গেছে বাঁচতে । এই দ্যাখ্ কলা দেখিয়ে চলে যাব। অরুণ বিরাট অন্ধকারের মধ্যে বুড়ো আঙুল নাডাতে থাকে।
হোমিওপ্যাথিতে সৰ্পদংশনের চিকিৎসা আছে? অম্বুজাক্ষ কিছুতেই মনে করতে পারে না। একবার মনে হয় আছে—একবার মনে হয় নেই। আর্নিকা, পালসেটিলা, নাক্সভুমিকা ইত্যাদি নানান কথা মনে আসে বাজে কথার মতো। তার বাবা কালীপ্রসন্ন অন্ধকার থেকে উঠে আসে না। শেষে সাব্যস্ত হয় হোমিওপ্যাধিতে সৰ্পদংশনের ওষুধ আছে। সাক্ষাৎ ধন্বন্তরির মতো ওষুধ । তবে তার নাম মনে পড়ছে না। হতে পারে জানা নেই। বিদ্যে নেই। হতে পারে স্মৃতিবিভ্ৰম । যাই হোক ওঝার জন্যে অপেক্ষাই একমাত্র কাজ। ইতিমধ্যে অরুণ, নেতিয়ে পড়ে, গাঁজলা ভাঙে কষ বেয়ে ।
আমি সত্যি করে মরে যাচ্ছি নাকি রে-ঘুমের ঘোরে অরুণ বলে । সরোজিনী বলে, অরুণ ঘুমোস না-ঘুমোস না অরুণ, অরুণ, অরুণ-অম্বুজাক্ষ ঝাঁকি দেয়, ঘুমিয়ো না অরুণ, ঘুমুলে সর্বনাশ হবে।
কী জানি শালা কী ব্যাপার-বলতে বলতে অরুণ নিদ্রার মধ্যে চলে গেল । ভোরের দিকে সে প্রস্থান করল চিরদিনের মতো ।
জানো সরোজিনী, সব ব্যবস্থা হয়ে গেল ?
কিসের সব ব্যবস্থা ?
বিনিময়ের-বলেই একটু বিব্রত হাসি হাসল অম্বুজাক্ষ।
অনেকদিন থেকেই তো শুনছি-সরোজিনীর হাতে একটা হাতা, রান্না করছিল। রোগ মুখের ওপর চকচক করছিল চোখদুটো। একটু মেঘের মতো এসে সেটাকে ঢেকে দিয়ে গেল ।
 না এবার আর কোনো কথা নেই। আমাদের জমিসম্পত্তি সব দেখে গেছে।
পছন্দ হয়েছে ? উৎসাহকে প্রশ্রয় না দিয়ে আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করল সরোজিনী।
পছন্দ হবে না মানে — এমন বাডি, এমন গাছপাল কোথায় পাবে । শুধু বলল, বড্ড জঙ্গল-পুকুরটার সংস্কার দরকার। আর বলল বাড়িটাকে তো শেষ করেছেন । অশথ আর বটগুলোকে উৎখাত না করতে পারলে বাস করাই যাবে না। বাড়ি থাকবে না দু’বছরের বেশি। বললাম, আপনি এসে নতুন করে পত্তন করুন না। আমরা কী আর আছি এখানে ? এ-বাড়িতে আমরা একরকম মরেই গেছি বলতে পারেন । কেন যাচ্ছেন ? ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন । আপনারা কেন আসছেন? আমি জিজ্ঞেস করলাম উল্টো।
কী বললেন ?
এই আর কী । ভবিষ্যৎ নেই –নিরাপত্তা নেই। যেমন আমরা বলি আর কী।
এখানে আসলে রাজা হয়ে যাবে ভাবছে না ?
তাই তো মনে হলো। সব নাকি নতুন করে বানাবে।
আমিও তাই বলি-আমরাও সেখানে গিয়ে সব নতুন করে বানাব ।
এমন হয়েছে আজকাল যে চুল-নখ বড় হলে মনে হয় একবারে সেখানে গিয়ে কাটাব।
তা ভদ্রলোকের বাডি কোথায় ?
কাটোয়ার কাছে – অগ্রদ্বীপ।
 খুব স্বন্দর নাম তো !
এমনিতেও স্বন্দর। ছেলেবেলায় গিয়েছিলাম একবার বাবার সঙ্গে। কী জন্যে যেন। খুব ছেলেবেলায়। ধবধবে সাদা মাটি আর বিরাট বিরাট মাঠ। মাঠের বুক চিরে রেললাইন গেছে। এদিকে কলকাতা, ওদিকে খাগড়া আজিমগঞ্জ, নলহাটি, ছোটনাগপুর ঘেঁষে বোলপুর হয়ে বর্ধমান – এইসব ।
সরোজিনী রান্না বন্ধ করে দিল। এইসব শুনলে কিছুতেই কাজ করা যায় না|
কী বিরাট দেশ-অম্বুজাক্ষ বলে যায়, কোথায় যেতে চাও-দিল্পি, আগ্রা, পুরী, মথুরা, বৃন্দাবন ? অতি অবহেলায় যেতে পার।
ওদের বাড়িটা কি পাকা ?
হাঁ পাকা। ঠিক জানি না। যেখানে খুশি যেতে পারবে-অম্বুজাক্ষ কথা শুরু করে ।
কোথাও যাবার দরকার নেই আমার । কোথাও যাব না আমি। ভারী পরিশ্রম গেছে আমার সারা জীবন। চুপচাপ বিশ্রাম নেব সেখানে গিয়ে। আমাকে আর খাটাতে পারবে না তোমরা। একটা ছোট বাগান করে দিও। শিউলি, বকুল, চাঁপা, গোলাপ এইসব গাছ দিয়ে – এককালে আমাদের যেমন ছিল।
ছেলেমেয়েগুলোকে - এইটুকু বলেই অম্বুজাক্ষ থামল দম নিতে। সরোজিনীও কী বলতে গিয়ে থতমত খেয়ে গেল। সুর্য আজকাল বাড়ি আসে না। লেখাপড়া ছেড়েছে বহু আগেই । যেখানে-সেখানে মারামারি, বদমাইশি করে বেড়ায় । তার পরের পাঁচজনের দুজনে বাড়িতে একটু-আধটু পড়াশুনা করে। বাকি তিনজনে পরমানন্দপুর ঘুরে বেড়াচ্ছে ঝোপে, ঝাড়ে, মাঠে-ঘাটে-ছেড়ে দেওয়া গরুর মতো। মাঝে মাঝে নিজেদের মধ্যে আলাপ করে, ইন্ডিয়ায় গেলে বাবা আমাদের ইস্কুলে ভর্তি করে দেবে, তাই না। নতুন জামা আর প্যান্ট দেবে।
ছেলেমেয়েগুলোকে ভর্তি করে দিতে হবে । গলা পরিষ্কার করে অম্বুজাক্ষ বলে ওদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। আজ যাব কাল যাব করে ওদের ইস্কুলেই দেওয়া হলো না তো। এই বলে একটু চুপ করে হঠাৎ অম্বুজাক্ষ বলে উঠল, হোমিওপ্যাথিতে কিছু নেই আজকাল ।
কিছুতেই আর কিছু নেই-সরোজিনী বলে ।
তাই মনে হয় আমারো।
তাহলে বিনিময়ের ব্যবস্থা হয়ে গেল বলছ ?
প্রায় ।
আবার প্রায় । এই না বললে হয়ে গেছে ?
অনেকরকম বায়নাঙ্কা আজকাল-সহজে বিনিময় সম্ভব নয় আর ।
আর কবে যাব ? বুড়ো হয়ে গেলাম যে ।
বুড়ো হয়ে যাচ্ছি—তাই না ?
অম্বুজাক্ষ অন্যমনস্ক হয়ে বলেছিল। অশ্বখগাছ থেকে তক্ষক ডেকে উঠলে চমকে
উঠল সে। বাইরে দুপুরের তীব্র রোদ । বাড়ির সামনের লম্বা ঘাসগুলো শুকিয়ে
হালকা হয়ে গেছে ।
ঠিক এখন আগুন দেবার সময়, অম্বুজাক্ষ ভাবল, একটিমাত্র দেশলাইকাঠি খরচ করলেই হু হু আগুন জলবে, আগুন এগিয়ে যাবে ছাদে, বরগায়, শূন্য ধানের গোলায়-সরোজিনীর শুকনো হাড়ে। লাগিয়ে দিলে হয়, অম্বুজাক্ষ আবার ভাবল, তারপর সরোজিনীকে জড়িয়ে ধরি, বুকে টেনে আনি-তারপর আমি, সরোজিনী, বাবা, সুর্য, বরুণ, কমল, ভাবলা সবাই দাড়িয়ে থাকি, সর্বনাশ দেখি-শেষে ধ্বংস হয়ে যাই। কী বিশ্ৰ কথা-অম্বুজাক্ষ ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছিল না সম্ভবত, চোখ ঘষলো বারেবারে, তখন দেখতে পেল অশথ গাছটা কত বড় হয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠা করা গাছের মতো বিশাল, সবুজ-উত্তরদিকের দেয়ালটায় তলা পর্যন্ত ফাট ধরেছে। চেয়ে থাকতে থাকতে রোদ আরো তীব্র হয়ে উঠল আর যেন চোখের উপরেই চড়াৎ শব্দ করে দেয়ালটা চৌচির হয়ে গেল ।
 শীগগির একবার এদিকে এসে তো-সরোজিনী সোজা এসে ঘরে ঢুকল। অবাক অম্বুজাক্ষ তাকায়, কী হলো ?
এসো না একবার ।
অম্বুজাক্ষ ধীরে-সুস্থ্যে ওষুধের বাক্স বন্ধ করে। ময়লা ক্টোচাটা বার দুই ঝাড়ে ফটফট করে, চেয়ে দেখে সরোজিনী চলে গেছে। বাইরে এসে দরোজায় শিকল তুলে দেখল দ্রুতপায়ে সরোজিনী কালীপ্রসন্নর ঘরের দিকে যাচ্ছে। সেখানে এসে অম্বুজাক্ষ একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখতে পায়-সরোজিনী দুহাতে আলিঙ্গন করে আছে কালীপ্রসন্নকে। প্রাণপণে চেষ্টা করছে তাকে তুলতে। কালীপ্রসন্নের চোখ বোজা ।
বাবার কী হয়েছে ?
 হঠাৎ পড়ে গেলেন। ধরো একটু, বিছায়ায় শুইয়ে দিই। কালীপ্রসন্ন তারপর নি:সাড়ে বিছানায় পড়ে থাকেন।
কতবার বলেছি, বুড়ো মানুষ কোনো কাজ নিজে করার দরকার নেই। কিছুতেই শুনবে না। হলো তো-ভোগে এখন ছ'মাস। হোচট খেয়ে পড়েছে নিশ্চয় । অম্বুজাক্ষ ভারী তেতো গলায় এইসব কথা বলে। কিন্তু শোনা গেল কোনো কিছুতেই হোচট খাননি কালীপ্রসন্ন। খড়ম খুলেও যায়নি। হাটতে হাটতে বিনা কারণে পড়ে গেছেন ।
অম্বুজাক্ষ বজ্রাহতের মতো দাড়িয়ে থাকে, শেষে বলে, তাহলে হয়ে গেল !
 কী ?
পক্ষাঘাত ।
তক্ষকটা ওজুনি ডেকে ওঠে। কালীপ্রসন্ন চোখ মেলে ডাকেন, হিরণ।
অম্বুজাক্ষ বিছানার কাছে যায়। কালীপ্রসম্নের উপর ঝুকে পড়ে বলে,বাবা, কিছু বলছ ?
আমার কী হয়েছে হিরণ ?
কিছু হয়নি তোমার, এমনি পড়ে গেছ ।
ডানদিকটা হঠাৎ কেমন অবশ হয়ে গেল, মাথা ঘুরে উঠল—
শরীর দুর্বল থাকলে আমন হয় বাবা, আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে।
কালীপ্রসন্ন ডানহাতটা নাড়াতে চেষ্টা করেন, হিরণ আমি হাতটা নাড়াতে পারছি না।
সব ঠিক হয়ে যাবে।
কালীপ্রসন্ন যেন কিছুই শুনতে পান না, দেখতে পান না, পাগলের মতো চেচিয়ে ওঠেন, তবে কী আমার পক্ষাঘাত হয়ে গেল রে ? না মরে গিয়ে আমি কী তাহলে ফাঁদে পড়ে গেলাম ?
অম্বুজাক্ষ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। কালীপ্রসনের মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, গাল ভেঙে ভিতরে ঢুকে গেছে- জটিল গ্রন্থিতে দুর্বোব্য লাগছে কদাকার মুখ ।
মানুষ নিজের ইচ্ছায় মরতে পারে না হিরণ, তবে নিজেকে মেরে ফেলা যায় ইচ্ছে করলে। আমাকে মেরে ফেল বাবা, তোর পায়ে পড়ি, তোর ভালো হবে – আমি আশীর্বাদ করব তোকে ।
কী পাগলের মতো বকছ-অম্বুজাক্ষের মনে আস্তে আস্তে বিরক্তি বাসা বাঁধে।
আমাকে একটা কিছু দে, খেয়ে মরি। আমি এক্ষুনি মরে যেতে চাই । হিরণ, বাবা আমার-কালীপ্রসন্ন জড়িয়ে জড়িয়ে ঘ্যান ঘ্যান করে।
এরকম করলে আমি এক্ষুনি চলে যাব ।
তাহলে আমি কী করব বলে দে ।
চুপচাপ শুয়ে থাকো।
বুড়ো মানুষকে কাঁদতে দেখলে অম্বুজাক্ষের বরাবরই আশ্চর্য লাগে, যদিও সে জানে একমাত্র বুডোরাই কাঁদতে পারে ছেলেদের মতো। তবু শিশুদের কান্নার চেয়ে বৃদ্ধের কান্না অসহ্য, কারণ সে তার কান্নার মধ্যে সারা জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা ঢেলে দিতে পারে। কালীপ্রসন্ন সেই তেঁতো কান্না কাঁদে। তার স্বস্তিহীন কান্না নড়েচড়ে বেড়ায় ঘরের আনাচে-কানাচে-সবশেষে সরোজিনীকে কাঁদায়। সরোজিনী মুখে আঁচল চাপা দিয়ে দশ বছরের মেয়ের মতো কাঁদে। এই সময়ে ভারী নাটকীয়ভাবে সুর্য এসে ঢোকে। লুঙিটা হাটুর উপর তুলে পরেছে, খালি গা,
গুলিখোরের মতো চোয়াড় চেহারা-এসেই কালীপ্রসঙ্গের বিছানার দিকে চেয়ে চেয়ে স্বভাৰসিদ্ধ কর্কশ গলায় জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে ?
তার কথার কেউ জবাব দেয় না।
সঙের মতো সব দাড়িয়ে আছো কেন ?
তোর দাদামশাইয়ের পক্ষাঘাত হয়ে গেছে রে সুর্য – ফোঁপাতে ফোঁপাতে সরোজিনী জবাব দেয়।
কী হয়েছে ?
পক্ষাঘাত ।
হয়ে যখন গেছেই কী আর করবে ? কাঁদছো কেন ফোঁস ফোঁস করে ?
তার কথা এত রূঢ় আর অমানুষিক শোনায় যে কালীপ্রসন্ন পর্যন্ত লজ্জায় কান্না থামিয়ে ফেলে।
ওষুধপত্র করে আর কি, না মরা পর্যন্ত-সুর্য তেমনি হিসহিসে হিংস্র কণ্ঠে বলে, তারপর লোহার মতো কঠিন হাতে সরোজিনীর ডানহাতটা নাড়া দিয়ে আদেশ চালায়, দুটো ভাত দাও তো-খেয়ে একটু বেরুব-এই বলে সে বাইরে চলে যায়।
এই শহরেও শিয়াল ডাকে কেমন দ্যাখো-সরোজিনী চলে গেলে অম্বুজাক্ষ সেতার কোলে ভাবে । বাস্তবিকই, যেন হাজার হাজার শিয়াল চিৎকার করছিল একসঙ্গে। ভারী ঠাণ্ডা ছিল তখন বাতাস। এরই মধ্যে তক্ষকটা ডেকে উঠল কটকট করে। সেতার থামিয়ে অম্বুজাক্ষ বিরাট অশথ গাছটার কাছে গেল। সাবধানে যেতে হলো। চুলের মতো সরু শিকড়গুলো এখন বড়বড় ফাটল হয়ে গেছে। হ্যাঁ করে আছে। মাঝে মাঝে আজকাল ইট পর্যন্ত খসে পড়তে শুরু করেছে। অন্ধকারে দেখা যায় না, কিন্তু অম্বুজাক্ষ জানে দু-একটি ফাটল এত বিরাট হয়ে গেছে যে, পা পর্যন্ত ঢুকে যেতে পারে ভিতরে । অশথ গাছটার নিচে গেলে ছাদ যেন দুলতে শুরু করল। সেখানে দাড়িয়ে অম্বুজাক্ষ তীক্ষ্ম চোখে তক্ষকটাকে দেখার চেষ্টা করে। কিন্তু পাতার ফাঁকে শরতের ঠাণ্ডা বাতাসই শুধু শিস দেয়। অনেক চেষ্টার পর হতাশ হয়ে অম্বুজাক্ষ হাত থেকে ইটটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে ফিরে আসে। ছাদে শেওলার আস্তর এত পুরু যে গালিচার মতো নরম লাগল তার, আর এই আবেশে থাকতে থাকতে এমন পিছল একটা জায়গায় এসে পড়ল যে, আর-একটু হলেই পা হড়কে পড়ে যাচ্ছিল অম্বুজাক্ষ । বহু কষ্টে সামলাতে হলো। তার বুকের ভিতরে হাতুড়ি পেটার মতো ধকধক্ আওয়াজ দে শুনতে পেল।
সরোজিনী কী তাহলে আসবে না ? এই ভাবতে ভাবতেই সরোজিনী এসে হাজির, নিচে চলো, খেয়ে নেবে। আমার কাজ আছে বিস্তার।
একটু বোসো না সরোজিনী-অম্বুজাক্ষ গলাটা কাঁদো কাঁদো করে ফেলে।
আজ তোমাকে কী ভূতে পেয়েছে ? এরকম করছ কেন ?
একটু বোসো সরোজিনী-অম্বুজাক্ষ মন্ত্রের মতো একটা কথাই আওড়ায়। মাদুরেব এককোণে সরোজিনী বসে।
সে বসলে অম্বুজাক্ষ চুপ করে যায় ।
আমরা আর যাচ্ছি না সরোজিনী-অনেকক্ষণ পর একটি একটি করে উচ্চারণ করে অম্বুজাক্ষ, তারপর কথাটার অনতিক্রম্য বিষাদ কাটিয়ে ওঠার জন্যে বলে হাসতে হাসতে, যাওয়া গেল না আর কী। সব গোলমল হয়ে গেল । গিয়েই বা লাভ কী বলো ? একই কথা। খবরাখবর যা পাচ্ছি তাতে মনে হয় এখানে তবু খেতে পাচ্ছি দুমুঠো—সেখানে লোকজন শুকিয়ে মরে যাচ্ছে।
 সরোজিনী চুপ করে থাকে।
কোথাও যাব ভাবতেই ভালো-যাওয়া ভালো না। তাই না ? এতদিন যাব যাব করে কাটালাম। এখন যেতে হবে না ভেবে দেখি কেমন লাগে-অত্যন্ত আবছা অস্পষ্ট কথা চালিয়ে যায় অম্বুজাক্ষ।
তাছাড়া সবাই কত ভালোবাসে-সবচেয়ে বড় কথা বাবার এই অবস্থা, মনে মানে-না মরে যাওয়া পর্যন্ত-
কথাগুলো এত এলোমেলো হয়ে যায় যে, তার মাথামুণ্ডু ধরা যায় না। তাছাড়া সরোজিনী ঠিক প্রেতের মতো বসে আছে। সেজন্যে বাধ্য হয়ে অম্বুজাক্ষ আবার সেতার তুলে নেয় আর কত দ্রুতই না দেশ রাগের অভ্যন্তরে চলে যায়।
শেষ শরতের উছলে-পড়া কালো আকাশের মতোই সুর উপছে উপছে পড়ে। হারিকেনের লাল আলো আরো লাল হয়ে যায়। অম্বুজাক্ষ দুই চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়ে তালে তালে।
এই সময়ে বিকট আওয়াজ করে সেতারের খোলটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে গেলে অম্বুজাক্ষ চোখ মেলে সরোজিনীকে দেখতে পায়। সে তখন হাতের ছোট লাঠি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হারিকেনটা তুলে নিয়েছে। সেটা চুরমার হয়ে গেলে সরোজিনী অম্বুজাক্ষের দিকে এগিয়ে আসে। অম্বুজাক্ষ বারবার চেঁচায়, মিনতি করে-সরোজিনী, আমাকে নয়, আমি নই।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন