বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারী, ২০১৬

হামীম কামরুল হক'এর গল্প : অক্ষরপুরুষ

শহীদ মিনারের বেদিতে তোড়াটা রেখে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ানোর সময় কথাটা মুখে এসেও ফিরে যায়,‘আমি পারলাম না, বাবা। তোমার কথা রাখতে পারলাম না।’ রিজওয়ান নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরে। তোড়াটা রাখার সময় ছেলেও তার হাতের ওপরে হাত রেখেছিল। একদিন এভাবে সেও তার বাবার হাতেরও ওপর হাত রেখে তাকে আশ্বস্ত করেছিল, সে কোনোদিন দেশ ছেড়ে যাবে না। আর আগামীকাল বাইশ ফেব্রুয়ারির ভোরে তার ফ্লাইট।


ঋদ্ধ আগেই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। পরনে লালটুকটুকে পাঞ্জাবি-পাজামা। একমাথা ঝাঁকড়া চুল। চুলটা কাটাতে চেয়েছিল রিজওয়ান। সুরভী বলেছে, ‘ঠান্ডার দেশে যাচ্ছি। এখন তো উইন্টার। সামারের সময় কাটানো যাবে।’

ছেলেকে নিয়ে সুরভীর আহ্লাদের কোনো সীমাপরিসীমা নেই। একেকদিন একেকটা নামে ডাকে। গুটলু, পুটলু। একেবারে ছোট্ট সময়ে খুব গোলগাল ছিল বলে, গাবলু-ডাব্লুু, গুচকু-ফুচকু, চিঙ্কটা-পিঙ্কটা-- কত যে নামে দিনরাত ডাকাডাকি। রিজওয়ান একদিন বলে, ‘কী সব নামে ডাকো! আজব!’

‘আজ পর্যন্ত একটা ভালো নাম তো বের করতে পারলা না। ঘোড়ার ডিমের লেখক হইছ।’

সত্যিই, তখন ঋদ্ধের নামটা রাখতে দিনের পর দিন হন্যে হয়ে উঠেছিল। একটা নামও পছন্দ হচ্ছিল না। কত রকমের অভিধান ঘাঁটাঘাঁটি। নিজের মামাতো, ফুপাতো, চাচাতো ভাইবোনের ছেলেমেয়ের নাম তার ঠিক করে দেওয়া আর নিজের ছেলের জন্য কোনো নামই ঠিক করতে পারছিল না। অনেকদিন পর যখন ছেলের দাঁত উঠবে উঠবে, প্রতিদিন ওয়াক ওয়াক করে বমি করবে করবে করেও করে না, সেসময় হঠাৎ ঋদ্ধ নামটা মনে জেগে ওঠে। ঋদ্ধ তো ঋদ্ধই। ঋদ্ধ হওয়ার পর থেকে তার জীবনে একটা পর একটা আড় ভাঙতে সেই যে শুরু করেছে, এখনো নাকি তার ধারা থামেনি, অন্তত সুরভী তা-ই মনে করে। দুই বছর হল ঋদ্ধ একটা কিন্ডারগার্টেনে যাচ্ছে। প্লেগ্রুপে পড়ছে। স্রেফ যাওয়া আসা করা আর কী-- খেলতে খেলতে শেখা, শিখতে শিখতে খেলা। সুরভীর এক বান্ধবী রীতিমতো পটিয়ে ঋদ্ধকে ওখানে ভর্তি করিয়েছে।

সন্তান পেটে আসার পর থেকেই সুরভীর চিন্তা, কোন স্কুলে পড়াবে, ঢাকা শহরে একটা ভালো স্কুল নেই, স্কুলিং বলে কিছু নেই, সবই স্কুলের নামে কোচিং সেন্টার। স্কুলের নামে সবখানে এখন কীকরে এস.এস.সি. আর এইচ. এস.সি.-তে ভালো নম্বর পাওয়া যায় তার জন্য কোচিং চলে। শেখা বলতে কোনো জিনিসের অস্তিত্বই নেই। স্কুল নেই, খেলার মাঠ নেই, সব খাবারে রাজ্যের ভেজাল-- এদেশে কোনো বাচ্চা মানুষ হয়! ঋদ্ধের জন্মের পর থেকে সুরভীর এমন একটা দিন যায়নি এই কথা না উঠিয়েছে। নিজে দিনরাত ইন্টারনেটে ব্রাউজিং করে খোঁজ করেছে কোন দেশে কীভাবে যাওয়া যায়। শেষ পর্যন্ত সেও পথটা বের করে ছেড়েছে। রাজ্যের কাগজপত্র জোগাড় করেছে। বলে, ‘কাগজপত্র জোগাড় করাই আসল।’ ইকোনমিক্সে এম এ ছিল সুরভীর, এখন এডুকেশনে কাজ করতে যাবে। কদিন আগে কানাডার ভিসা নিশ্চিত হল। তারপর থেকে অবশ্য এই কদিন আর কোনো অনুযোগ করেনি।

সেদিন ছেলেকে স্কুলের জন্য তৈরি করছে, জামাটা প্যান্টের ভেতর গুঁজে দেওয়ার সময় ঋদ্ধ বলে,‘মা আজকে ভালো লাগছে না। আজকে স্কুলে যাবো না।’

‘আর তোকে বেশিদিন স্কুলে যেতে হবে না।’

‘সত্যি!’

‘আমরা খুব সুন্দর একটা দেশে যাচ্ছি জানিস!’

‘বেড়াতে?’

‘না।’

‘তাহলে?’

‘থাকতে। কদিন পর থেকে আমরা সেই দেশেই থাকব।’

রিজওয়ান চা নিয়ে বসেছে, মুখের ওপর খবরের কাগজ ধরা।

‘কোন দেশ মা?’

‘কানাডা।’

‘কানাডা তো আমেরিকার পাশে, তাই না মা?’

‘ও বাব্বা! তুই দেখি তাও জানিস!’

‘ও মা! আমাদের ম্যাপ ম্যাপ খেলা আছে না, ম্যাটের মতো বড় একটা ম্যাপে আমরা দেশ খুঁজি। আর পয়েন্ট পাই। ম্যাপ ম্যাপ খেলায় আমার সঙ্গে কেউ পারে না।’ ঋদ্ধর কাপড়চোপড় ঠিকমতো পরা শেষ হয়।

‘মা?’

‘কী রে?’

‘আচ্ছা মা, সেখানে আমরা কোন ভাষায় কথা বলব?’

‘এটা কেমন কথা! আমরা আমাদের ভাষায় কথা বলব। বাংলায়!’

‘সেদেশের আকাশে বাতাসেও কি বাংলা অক্ষর ভাসে?’

‘আকাশে বাতাসে অক্ষর ভাসে মানে?’

‘সেদিন ম্যাপ ম্যাপ খেলার সময় আমি মিসকে বলি, আমেরিকার মানুষ কোন ভাষায় কথা বলে। মিস বললেন, ইংলিসে। আর চিনের মানুষ? তিনি বললেন, ম্যান্ডারিন। ম্যান্ডারিনই তো মা?’

‘হ্যাঁ ঠিকই আছে, ম্যান্ডারিন।’

‘আমি বললাম, ‘মিস, একেক দেশের মানুষ একেক ভাষায় কথা বলে কেন? মিস তখন টাওয়ার অব বাবেলের গল্প বলল। তুমি জানো না টাওয়ার অব বাবেলের গল্পটা?’

‘আগে জানতাম, এখন ভুলে গেছি। তুই বল, শুনি।’

ঋদ্ধ মহা উৎসাহে টাওয়ার অব বাবেলের গল্প বলতে থাকে। গল্প শেষ হলে সুরভী ছেলের মাথার চুল এলোমেলো করে দিয়ে আদর করে।

‘মিস আরো কী বলে জানো?’

‘কী বলে?’

বলে, ‘ভাষা ছাড়া আমরা নাকি বাঁচতে পারি না। ভাষা কি অক্সিজেন মা?’

‘হয়েছে এখন এসব জানা লাগবে না। বড় হও অনেক কিছু জানবে।’

রিজওয়ান সেদিন বিকালে ঋদ্ধকে আবার টাওয়ার অব বাবেলের গল্পটা শোনাতে বলে। ঋদ্ধ মহাউৎসাহের গল্পটা আবার বলে। রিজওয়ান খেয়াল করতে চেষ্টা করে, সুরভীকে যেভাবে বলেছিল, তাকে বলার সময় এর ধরনটা কতটা পালটায়। দেখল, না, খুব একটা বদল ঘটেনি বলার রকমসকমে। গল্প শেষ হলে ঋদ্ধ ক্ষণিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, ‘ভাষা কি বাতাস বাবা?’

‘ভাষাও বাঁচায়, বাতাসও বাঁচায়। মিল তো আছেই বাবা।’

‘মিসও বলল, বাতাস ছাড়া আমরা বাঁচতে পারি না, ভাষা ছাড়াও আমরা তেমন বাঁচতে পারি না। তখন আমাদের ক্লাসের সৃজন বলে, যেদেশের মানুষ যেভাষায় কথা বলে তার অক্ষরগুলো বলে সেদেশের আকাশে-বাতাসে ঘুরে বেড়ায়। মানুষের যখন যে কথা বলার দরকার হয়, সেই কথাগুলোর জন্য যে শব্দের দরকার হয়, সেগুলো তখন মানুষ নিঃশ্বাসের সঙ্গে সেই অদৃশ্য অক্ষরগুলো বাতাসের সঙ্গে বুকের ভেতর চলে যায়, বুকের ভেতরে সেই অক্ষরগুলো থেকে শব্দ তৈরি হয়। সেই অক্ষরগুলো সাজিয়ে নিয়ে তারপর আমরা বলে কথা বলি!’

‘মিস বলে, এসব কথা তোমাকে কে বলেছে?’

‘সৃজন বলে, আমার বাবা।’

‘মিস বলে, তিনি কী করেন?’

‘সৃজন বলে, তিনি একজন পেইন্টার।’

ঋদ্ধ জিজ্ঞাসা করে,‘পেইন্টার কী বাবা?’

রিজওয়ান উত্তর দেয়, ‘পেইন্টার হল যারা রঙ তুলি দিয়ে ছবি আঁকে।’

রিজওয়ান জানে পাঁচ বছর পর্যন্ত পৃথিবীর সবদেশে শিশুরা একই রকম থাকে। তারপর যেদেশের যেরীতি তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়ে ওঠে। ঋদ্ধকে এখনই কানাডা নিয়ে গেলে সে দেশে বাচ্চাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বড় হতে আর সমস্যা হবে না। এজন্য সুরভী আর দেরি করতে রাজি নয়। কিন্তু রিজওয়ান নিজের ভেতরে সায় পাচ্ছিল না। অথচ এক সময় নিজেই বিদেশে যাওয়ার জন্য দিনরাত চিন্তা করত কীভাবে বিদেশে যাওয়া যায়। বিয়ের পর অনেকদিন বাচ্চাকাচ্চা না হওয়ায় এক সময় ঠিকই করে ফেলেছিল সে বিদেশে যাবে। সুরভী তাকে বাচ্চা হওয়া না-হওয়া নিয়ে কোনো চাপাচাপি করেনি। এমন কি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়নি। তবে রিজওয়ান জানত সুরভীর নিজে ডাক্তারের কাছে গেছে। ডাক্তার বলেছে, সুরভীর কোনো সমস্যা নাই। সুরভী যখন দেখেছে তার কোনো সমস্যা নাই তখন নিজে যে এজন্য দায়ী নয়-- এটুকু নিশ্চিত হয়েছিল। এতে তার মনের খচখচানিটা থেমেছিল। রিজওয়ান এব্যাপারে বরারবই নির্বিকার। বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে তার কোনো কালেই আগ্রহ ছিল না। তখনো নেই। অন্তত বাইরে থেকে তাই মনে হত সুরভীর। অফিসের সময় ছাড়া বাসায় যেটুকু সময় থাকে সারাদিন সে লেখাপড়া নিয়ে থাকে। তখন সে লেখক হিসেবে উদীয়মান। এখানে-ওখানে তার কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ছাপা হচ্ছে। উপন্যাস লেখার প্রস্তুতি নিচ্ছে কিন্তু লেখা হয়ে উঠছে না। সেই সময়ে এক চাইনিজ রেসটুরেন্টে দুর্দান্ত সুন্দরী একটি তরুণী রিজওয়ানকে বলেছিল, ‘আপনি কি রিজওয়ান আশরাফ?’

‘জ্বী!’

‘আপনার ‘জীবনের অর্থ’ গল্পটা আমার ভীষণ ভালো লেগেছে।’

সেদিন রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে কয়েক কথা পরেই সুরভী বলেছিল, ‘আমি এসবই শুনতে চাই। আজ মেয়েটা তোমার গল্পের প্রশংসা করাতে আমার কী যে ভালো লেগেছে জানো।’

রিজওয়ান যখন সে সময় বিদেশে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানায়, সুরভী শুনেই বলেছিল, ‘আর তোমার লেখার কী হবে?’

‘এখন ইন্টারনেটের যুগ। পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় বসেই লেখা যায়। লেখা পাঠানো যায়।’

‘তা যায়। কী জানি বাপু, তোমাদের লেখকদের বোঝা তো মুশকিল।’

রিজওয়ানের তখন আরও অনেক কিছুর সঙ্গে মনে হয়েছিল বাংলাসাহিত্যে আর পড়বার মতো কিছু নেই। কিন্তু চাইলেই এখানে দান্তের ‘ডিভাইন কম্মেদিয়া’ কি জাঁ জেনের ‘দ্য থিবস জার্নাল’ পড়তে পাওয়া যায় না। ব্রিটিশ কাউন্সিলি, ইউসিসে যাওয়া যায়, কিন্তু শখের লেখাপড়া সে-বই জোগাড় করে তারিয়ে তারিয়ে না পড়লে হয় না, সে-পড়া বড় বড় লাইব্রেরি দিয়ে হয় না। রবীন্দ্রনাথ থেকে সৈয়দ হক-মাহমুদুল হক-হাসান-ইলিয়াস-কায়েস থেকে সেলিম আল দীনের যা যা পড়ার পড়া হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজির শিক্ষক কবি মোহাম্মদ রফিক বলেছিলেন, ‘সবার আগে মহাভারত-রামায়ণটা ভালো করে পড়ো। আমরা তো সিক্সটিজে আধুনিক সাহিত্য নিয়ে মাতলাম। তখন মহাভারত নিয়ে মাতলে আজকে এই আক্ষেপ করতে হত না। এখনো সময় আছে বেদব্যাস-বাল্মীকি পড়ো। তার পর অন্যান্য গ্রেট রাইটারের লেখা। রবীন্দ্রনাথ-জীবননান্দ, তলস্তয়-দস্তয়েভস্কি, টমাস মান- ফ্রাঞ্জ কাফকার মধ্যে একটা পাল্টাপাল্টি পরম্পরাগত মিল আছে-- এসব বুঝে শিখে তারপর দ্যাখো তোমার লিখতে ইচ্ছা করে কিনা।’

রিজওয়ান কেবল বলেছিল, ‘আমার কী লেখা উচিত স্যার?’

‘তোমার বোধ কী বলে? আমি বলে দিলে তো আর তা হয়ে যাবে না।’

সালেহিনও ওকে এক সময় বলত, ‘নিজের কাছে সবার আগে পরিষ্কার হওয়া দরকার-- আমি লিখব কিনা, আমার লেখা উচিত হবে কি না?’

সালেহিন এখন ইউ. কে-তে থাকে। ক’বছর আগে দেশে বেড়াতে এসেছিল। রিজওয়ান ওকে বলেছিল,‘জানিস, শুধু ভালো ভালো বই পড়ার জন্যই বিদেশে যেতে ইচ্ছা করে।’

সালেহিন বলে, ‘বিদেশে পড়ার মতো বই আছে, কিন্তু আমাদের মতো ইমিগ্রেন্টদের পড়ার সময় নাই। আর দেশে পড়ার সময় আছে, কিন্তু পড়ার মতো বই নাই।’

‘তবু আমি বিদেশে যেতে চাই।’

‘আয়। গিয়ে দেখে আস, হোয়াট দ্যা হেল ইজ গোয়িং অন।’ সালেহিন একটু থেমে বলে, ‘তুই একসময় বিদেশে যাওয়ার ঘোর বিরোধী ছিল। তারপর আবর তোরই বাই উঠল বিদেশে যাবি। পরে কেটে গেল আবার উঠল সেই বাই!...তোর সেই আড্ডার কথা মনে নাই, সুধীরদা আর সাদমান ভাইয়ের মধ্যে যে তর্কটাকে তুই সুধীরদার পক্ষ নিয়েছিলি। সুধীরদা বলেছিল, কবি দেশের বাইরে থাকলেও তার কবিতা লিখতে কোনো সমস্যা হবে না, কিন্তু ঔপন্যাসিক বা গল্পকারের জন্য দেশে থাকাটা জরুরি। দেশের বাইরে থেকেই দেশে ঘটনার অনুপুঙ্খ জানালেও একটা বিশেষ ব্যবধান থেকেই যায়, ঘটনাচক্রে অনেক বাইরে থাকার পরও কেউ দেশে থাকলে যে চাপটা বোধ করে, বিদেশে থাকা লেখক সেই চাপটা পায় না, অনেক দিন পরে দেশে ফিরে এলে মাঝখানে সময়েটা ঘটে যাওয়া অনেক কিছু, তার না-থাকা একটা না-জানা তৈরি করে-- এই না-জানাটাই বিশেষ ধরনের অজ্ঞতা তৈরি করে দেয়--এই যে অনুপস্থিতি-- এটাই ইগরোরেন্স। সাদমান ভাই একের পর এক নির্বাসিত লেখকের কথা টানছিলেন, আর সুধীরদা তাদের তুলেধুনো করে ছেড়েছিলেন। সুধীরদা কুন্দেরাকে নিয়ে যে সব কথা বলেছিলেন তোর মনে আছে?’

‘মনে আছে। কিন্তু আমি তো কুন্দেরা হব না। আমি রিজওয়ান আশরাফই হব, ভালো হই কি ঘোড়ার ডিমের লেখক হই আমি আমিই হব।’

‘দ্যাখ কী হয়। তোর জীবন-পথ তোর। তুই যেভাবে হাঁটবি সেটাই তোর হাঁটা। তোর হাঁটা তো অন্য লোকে হেঁটে দিতে পারবে না। তোর লেখাও তোর।’

আরিফ ভাইয়ের সঙ্গে দেথা হলেই দুয়েক কথার পরই জানতে চাইতেন, ‘তা, রিজওয়ান আশরাফ, বাংলা সাহিত্যের খরবাখরব কী?’

‘খবরটবর জানি না, অখবর হল আমাকে দিয়ে আর লেখা হবে না।’

‘বাহ্! এটা তো ভালো খবর!’

‘খবর নয়, অখবর।’

‘আরে না, না, তুমি লেখা ছেড়ে দিচ্ছ, এটা তো খবরই।’

‘খবর হতে পারত যদি ইচ্ছা করেই ছেড়ে দিতাম।’

‘তাহলে?’

‘ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছি।’

‘কী কারণে?’

‘কারণ তো খুবই সোজা।’

‘কী সেটা?’

আরিফ ভাইয়ের কণ্ঠে অস্থিরতা।

রিজওয়ান বলে,‘আমি লিখলে বাংলা সাহিত্যের এমন কোনো উন্নতি হবে না, আর না-লিখলে তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। আর ফরাসিদের মতো বলতে পারলে খুশি হতাম যে, আমার লেখা টিকে থাকলে নিজ গুণে টিকে থাকবে, আর না থাকলে আপনা আপনি মুছে যাবে। তবে মনেই হয়, যদি লেখাটা চালিয়েই যাই, তো সময় নষ্ট করা ছাড়া আর কিছু ঘটবে না।’

‘তুমি কি কোনো ব্যাপারে হতাশ।’

‘আপনি জানেন আমি কোনো হতাশাটতাশা জাতীয় বিলাসিতায় খুব একটা কোনো কালেই ভুগি না। আমি একটা জিনিস নিশ্চিত হয়েছি মাত্র।’

আরিফ ভাই কিছু বলেন না। রিজওয়ান কী বলে তা-ই শোনার জন্য চুপ করে থাকেন।

রিজওয়ান বলে, ‘আমার লেখায় এমন কোনো গুণের সন্ধান পাইনি যে তা নিজ গুণে টিকে থাকবে। সুতরাং লেখাটা ছেড়ে দেওয়াটাই সবদিক থেকে উত্তম।’

ইতিমধ্যে একথা আরো অনেককে বলা হয়ে গেছে। মুখে তো বলেই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে টের পায়, লেখা ছাড়া তার কোনো অস্তিত্ব নেই। ঋদ্ধের দিকে তাকলে সেটা আরো বেশি করে মনে হয়। ওর জন্ম না হলে লেখাই হত তার একমাত্র অবলম্বন।

‘ছেলেমেয়ে হয়নি তো সমস্যা কী! পুত্র আর মূত্র একই পথ দিয়ে বের হয়।’ প্রসঙ্গটা উঠলেই আরিফ ভাই এমনভাবে কথা বলতেন। বলতেন,‘অলেখা আর কুলেখা তো ওই কাগজেই ছাপানো অক্ষর ছাড়া কী? সবার অক্ষর অক্ষর নয়, আবর্জনাই বেশি। জানো না। যে-লেখায় হয় সততা, নয় সাহস; নয় সৌন্দর্য, নয় আনন্দ, নয় বেদনার উদ্যাপন থাকে না-- সেসব লেখা লেখাই নয়। প্রেম-ঘৃণা-সেক্সমেক্স যাই বল না কেন, যে-লেখক সেটা লেখার মাধ্যমে উদ্যাপন করতে পারে না, তার লেখা স্রেফ ছেড়ে দেওয়া উচিত।’ একটু থেমে বলতেন,‘ক্ষর আর অক্ষরের তফাত তো বুঝতে হবে। পৃথিবীর সেরা লেখকরাই প্রকৃত অক্ষরপুরুষ। শব্দই ব্রহ্ম-- কেন বলে জানো তো? অক্ষরজীবী হলেই অক্ষরপুরুষ হওয়া যায় না।’

একদিন তাঁর লেখার ভালোমন্দ নিয়ে কথা বলতে বলতে এমন আরো অনেক কথা বলেছিলেন আরিফ ভাই। বাসায় ফিরে সেদিন ক্ষর, অক্ষর, অক্ষরজীবী-- এইসব শব্দ অভিধানে খুঁজে অর্থগুলো দেখেছিল। অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিল। অক্ষরপুরুষ কথাটা কানে বেজে চলেছিল-- এই কথাটা অভিধানে নেই।

রিজওয়ান কাউকে বলতে পারেনি, কেবল টের পেয়েছে, সে হতে চায় অক্ষরপুরুষ, কিন্তু এখন যেন একটু একটু করে অক্ষমপুরুষ হয়ে যাচ্ছে। দেশ ছেড়ে যাওয়া তো কেবল একটা জায়গা ছেড়ে যাওয়া না। একটা ভাষা, অসংখ্য অভ্যাস আর আস্ত একটা জীবন ফেলে অন্য একটা জীবনের খোলসে ঢুকে পড়া। সেই অন্য খোলস কি কোনো দিন নিজের হবে? আর নিজের কিছু না বলে কোনো কিছু কি সৃষ্টি করা সম্ভব? রিজওয়ান তারপরও জানে মানুষের কোনো পারা, না-পারাকে আগাম বলে দেওয়া যায় না। বাপকে বলা একটা কথা সে রাখতে না পালেও আরেকটা কথা রাখতে চেষ্টা করবে-- যেখানেই থাকুক না কেন, লেখাটা ছাড়বে না। কোনোভাবেই না। বাবাকে কথা না দিলেও মনে মনে কথাটা বেজে উঠেছিল সেই দিন।

বাপ মুক্তিযুদ্ধের আগে আগেই সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে রাজনীতিতে মেতে উঠেছিলেন। পরে যুদ্ধে গেছেন। মাকে শুধু জানিয়েছিলেন, আমি যুদ্ধে যাচ্ছি, দেশ স্বাধীন হলে ফিরব, আর না হলে কোনোদিন ফিরব না। মা বাপের ধাঁতটা ঠিকই জানতেন। একরোখার চূড়ান্ত। যা ঠিক করে তো করেই, এতটুকু নড়চড় হয় না। ফলে কিছুই বলার ছিল না। দারোগার চাকরি করা দাদা ছেলেকে ত্যাজ্য করেছিলেন ভাষা আন্দোলনের সময়ে। রংপুরে ভাষা আন্দোলনের তার বাপের কাহিনি একটা নীরব কিংবদন্তির মতো এখনো ঘোরেফেরে। বাপ যা করেছেন সব নিজের চেষ্টায়। স্বাধীনতার আগে আগে কলেজের চাকরি ছেড়ে দিয়ে প্রথমে রাজনীতি, পরে যুদ্ধে গেছেন। যুদ্ধ থেকে ফিরে আবার কলেজে। মফস্বলে একটা কলেজে শিক্ষকতা করেই জীবন কাটিয়ে দিলেন। বাংলা ইংরেজির তো জানতেই, শখ করে আরো দুটো ভাষা শিখেছিলেন। ফারসি আর ফরাসি। ফেরদৌসীর শাহনামা ফারসিতে পড়েছিলেন। বালজাক, ফ্লবেয়ার, মোঁপাসা থেকে সার্ত্রে-কামু, আলা রবগ্রিয়ে-- এমন অনেক লেখকের লেখা মূল ভাষায় পড়ছেন। দেকার্তে পড়ছেন মূল ফরাসিতে। শেষ দিকে তার মনে হয়েছিল সংস্কৃতটা শিখতে পারলে সবচেয়ে ভালো হত। ছেলে লিখছে বলে খুবই খুশি হয়েছিলেন। রিজওয়ান নিজের লেখা কোথাও প্রকাশিত হলে কখনোই কাউকে বলে না। কিন্তু বাবা কীভাবে কীভাবে যেন ঠিকই টের পেতেন। রিজওয়ান বলেছিল, ‘আপনি নিজে কত পড়া-লেখা করলেন কত কিছু জানলেন। লিখতেই তো পারতেন। অন্তত মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটা স্মৃতিকথা তো পারতেনই লিখতে।’ তিনি বলেছিলেন, ‘লেখা তো কিছু শব্দের পর শব্দ বসিয়ে যাওয়া না। লেখা অন্য জিনিস। মানি, ভালো লিখতে হলে প্রচ- পরিশ্রম করতে হয়, কিন্তু লেখার ক্ষমতাটা ন্যূনতম হলেও থাকা লাগে। সত্তার সেঁধিয়ে যেতে না পারলে লেখক হওয়া যায় না। কিন্তু লেখাটাতো সত্তায়-আত্মায় থাকা লাগবে। বীজাকারে, নয়তো চার আকারেও থাকা লাগবে। সবাই তো লেখকজীবনের শুরু থেকে সাহিত্যে বটবৃক্ষ হয়ে যায় না। বড় প্রতিভা প্রকাশিত হতেও সময় লাগে। ফেরদৌসী পঞ্চাশ বছর বয়সে শাহনামা লিখতে শুরু করেন। আশি বছর বয়সে লেখা শেষ করেন। লেখক হল লেখা বহন করনেওয়ানা লোক। লেখা ছাড়া তার আত্মাসত্তার শান্তি মেলে না। আমার সত্তা লেখক সত্তা না-- এটা আমি নিশ্চিত জেনেছি। কত লোক আছে সারা জীবন ধরে লিখছে, কিন্তু সে জানেই না-- তার ভেতরে লেখক-সত্তাটাই নাই। এমন আরো আছে, সারা জীবন পাগলের মতো নাটকের করে গেল। জীবনটাই দিয়ে দিল নাটকে জন্য, কিন্তু জানেই না নাটক করার লোকই সে না। আমি এই অসুখের একটা নাম দিয়েছি, ‘গোরা সিন্ড্রোম’। গোরা হিন্দুত্বের জন্য এমন মরিয়া, অথচ সে জানেই না যে হিন্দু তো নয়ই, এমনকি ভারতীয়ই নয়। তাও তো তাকে সত্যটা জানিয়ে দেওয়া হল। আমাদের দেশের বহু লোক আছে যাদের কানে কানেও বলা যায় না, ভাই আপনি কিন্তু লেখকই না, অভিনেতা না, নেতা না। কেন লেখেন আপনি? কেন অভিনয় করেন? কেন রাজনীতি করেন আপনি-- বলা যায় বল? তো পড়ে থাকুক তারা ‘গোরা সিন্ড্রোমে’।’

‘আমি?’

‘তোর ভেতরে এখন একটা দেশলাইয়ের কাঠির মতো কিছু একটা আছে। লেখক হতে হলে সেটাকে দাবানলে পরিণত করতে হবে, বুঝলি। শেক্সপিয়র-গ্যেটে-তলস্তয়-দস্তয়েভস্কির লেখা তো দাবানল, তাই না। জাঁ জেনের বইগুলো কতবার পড়তে বললাম, পড়েছিস? পড়লে বুঝতি কাকে বলে দাবানল।’

রিজওয়ান চুপ করে ছিল।

তিনি যোগ করেন, ‘আগুনটা নিভতে দিস না।’

কথাটা শুনে রিজওয়ানা ঘর থেকে বেরোনোর জন্য পা বাড়াতেই তিনি তাকে ডাক দেন, ‘শোন!’

‘বলেন।’

রিজওয়ান বাবার খুব কাছে এসে দাঁড়ায়। কারণ তিনি তার হাত বাড়িয়েছিলেন ওর হাতটা ধরবার জন্য। ‘লিখবি বলে যদি ঠিকই করিস, কোনো দিন দেশ ছাড়িস না। ঘুরতেটুরতে গেলি সেটা অন্য কথা।’ রিজওয়ান কিছু বলে নি। বলতে পারেনি। বাবা তার হাতটা শক্ত করে ধরেছেন। রিজওয়ান বাবার হাতে একটু চাপ দিয়ে বাম হাতটা বাবার হাতটার ওপর রাখে।

বাবার মুখের পেছনে জানালা। বাইরে ঝকঝকে দিনের আলো। আলোর বিপরীতে থাকায় মুখটা অন্ধকার। এর আগে এমন আবেগময় মুহূর্ত কোনো দিন আসেনি। বাবাদের আবেগময় মুখ কি সন্তানকে স্বস্তি দেয় কোনোদিন?

নিজের মুখের ওপর তখন আলো। সেখানে বাপকে আশ্বস্ত করার কোনো অভিব্যক্তি কি ফুটে উঠেছিল তার? রিজওয়ান অনেকদিন পর টের পেয়েছিল, জীবনে কোনো দিন কাউকে কোনো কথা দেয়নি সে। তাই কোনো দিন কোনো কথা না-রাখার প্রশ্নও ওঠে নি। সেদিনও মুখে কিছু না বললেও মনের ভেতরে, কথা দেওয়ার একটা অনিয়ন্ত্রিত ইচ্ছা তেড়েফুঁড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল সারা শরীরে। সারা শরীর দিয়ে কথা রাখার সেই প্রচ-তায় তার একটা হাত নিজ থেকে উঠে এসেছিল বাবার হাতেও ওপর। আরও আশ্চর্যের ঘটনা-- সঙ্গে সঙ্গে সে টের পেয়েছিল, এই কথা সে হয়তো রাখতে পারবে না।

বাবাই হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলেছিলেন, ‘ঠিক আছে যা।’

তিন বছর আগে ২১ ফেব্রুয়ারি ৩টা ১০ মিনিটে বাবা মারা গেলেন। রিজওয়ান অনেকদিন পরে একটি পত্রিকায় ভাষা শহিদ রফিকের ঠিক এই সময়ে মৃত্যু হওয়ার কথা পড়ে চমকে উঠেছিল। বাবার নামও রফিক। রফিকুল আশরাফ। একইদিনে ঠিক একই সময়ে মৃত্যু হওয়ার ভেতরে অদ্ভুত যোগাযোগ খুঁজে পেয়ে রীতিমতো শিহরিত হয়েছিল রিজওয়ান। হঠাৎ মনে হয়েছিল, একালের লেখক-কবিরা নয়, বাবার মতো সেকালের মানুষেরাই অক্ষরপুরুষ-- যাঁরা নিজের কথা নিজের কাছে রাখতে পারতেন-- কথা অনুযায়ী কাজ করতে পারতেন--কোনো পরিস্থিতিতেই সেখান থেকে সরে যেতে না।

বাবা তাকে দেশে থেকে যেতে বলেছিলেন। কানাডাতে যাওয়ার পর, ঋদ্ধ যখন তার বয়সী হবে, সে যখন তার বাবার বয়সে পৌঁছবে, সে কি তাকে বলতে পারবে, ‘তুই দেশে ফিরে যা?’

ঋদ্ধ যখন বলে ওই দেশে গিয়ে কোন ভাষায় কথা বলবে, যে অক্ষরগুলো ওই দেশের আকাশে বাতাসে অদৃশ্যভাবে ভেসে চলে, সেই ভাষা নিশ্বাসে নিয়ে অন্য আর কোনো ভাষায় সে কি কথা বলতে পারবে? ঋদ্ধ ক্লাসের কথা, মিসের বলা কথা শুনে রিজওয়ানের অনেক দিন পরে মনে হয়েছিল, তোমার আকাশ তোমার বাতাস আমার প্রাণে যে বাঁশি বাজায় সেটাই ভাষার বাঁশি।

রিজওয়ানের মনে কত না খটকা এসে জড়ো হয়-- মধুসূদনের মতো কবি, বঙ্কিমের মতো লেখক বাংলায় লিখলেন, রবীন্দ্রনাথ এত এত লিখলেন বাংলায়, কেন? তারপর বিভূতি, তারাশঙ্কর, মানিক থেকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বাংলায় লিখেছেন। তারপর আরো আরো লেখক লক্ষলক্ষ পৃষ্ঠা বাংলায় লিখেছেন, কেন?-- এর পেছনে কেবল লিখে যাওয়াই ছিল, আর কোনো কারণ ছিল না। এর কোনো পরিণতি নেই? কটা লোক কথা বলে চেক ভাষায়, সেই ভাষার লেখক মিলান কুন্দেরা-ক্যারল চ্যাপকের লেখাও সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে? বাংলা নাকি চতুর্থ হয়ে আছে ভাষাগোষ্ঠীর ভেতরে, সেখানে বাংলাসাহিত্য, বাঙালির মনের কথা জানতে সেভাবে কারো কোনো আগ্রহ হল না, নাকি তেমন আগ্রহ জাগাতে পারেনি বাঙালি লেখকেরা? গত শতাব্দীর ভেতরে শত শত ভাষার মৃত্যু হয়েছে। না, বাংলা তো এত সহজে মুছে যাবে না, কিন্তু সেভাবে বিশ্বে না ছড়ালেও বাংলায় লেখা চলছেই কি কেবল নিজের জন্য? সে নিজের কার জন্য লিখছে? কীসের জন্য লিখেছে? কোন বিশ্বাসে লিখেছে? কদিন আগে একজন লেখকের সাক্ষাৎকারে পড়ে জানল, একদিন সারা পৃথিবীর প্রধান প্রধান লেখকদের প্রধান লেখাগুলো সবই ইন্টারনেটে পাওয়া যাবে। কম্পিউটারে থাকবে স্বয়ংক্রিয় অনুবাদের ব্যবস্থা। প্রত্যেক ভাষা থেকে প্রত্যেক ভাষায় স্বয়ংক্রিয় অনুবাদ করা যাবে যেকোনো ভাষার লেখা-- সেরকম সফটওয়ার অতিশীঘ্রই পাওয়া যাবে। তাহলে যে যে লেখক যে যে ভাষায় লেখে একাগ্রভাবে সেভাষায় পূর্ণতম সিদ্ধির কথা ছাড়া আর কোনো কিছু ভাবতে হবে না। তার লেখা ভালো হলে, সারা পৃথিবীর আগ্রহী পাঠকেরা সে-লেখা খুঁজে নিয়ে পড়বে। খুঁজে পড়বে জগদীশ গুপ্ত, টমাস উলফের লেখা, জাঁ জেনের লেখা, পড়তে পারে কায়েস আহমেদের লেখাও। সমস্ত বদ্ধতার বেড়া ভেঙে একটা মুক্ত সাহিত্যের কথা তখন কত সহজেই না ভাবা যাবে। কিন্তু বাস্তব আর সাহিত্যের সেই অতিপুরোনো ব্যবধান জীবনে কী ঘুচবে? সুরভী ঋদ্ধর জন্য বলে, ‘আই ওয়ানা গিভ হিম অ্যা বিগ লাইফ।’ সুরভীর এই ‘বিগ লাইফ’ বড় দেশে গেলে পাওয়া যাবে! সুরভী বলে, ‘ছোটদেশে থাকলে মন ছোট হয়ে যায়ে। ছোট বাড়িতে থাকলেও মনমানসিকতা বদ্ধ হয়ে যায়। তাছাড়া চাচারা সেখানে আছেন। তাদের এত বড় ব্যবসা। তুমি দেখো কোনো অসুবিধা হবে না। অন্যদের মতো অড জব করার কোনো দরকার হবে না। এজন্য তো যাওয়া, তাই না? আর তোমার লেখালেখিতে তো কোনো সমস্যা হবে না।’



‘বাবা আমরা ও দেশে গিয়ে বাংলা বলতে পারব তো?’

‘কেন রে?’

‘সেখানে আকাশে বাতাসে তো বাংলার অক্ষর ভেসে বেড়ায় না, কথা বলার জন্য যে, যে-বাতাস বুক ভরে নেব, তাতে তো বাংলা থাকবে না। তখন?’

এয়ারপোর্টে ঢোকার আগেও গাড়িতে এ কথা বলছিল ঋদ্ধ। লাউঞ্জে ঢোকার ঠিক আগে রিজওয়ান যেন শেষ বারের মতো দুচোখে ভরে নিতে চায় ভোরের বাংলাদেশ। বাবার দিকে তাকিয়ে ঋদ্ধ বলে, ‘বাবা আমি অনেক করে বুক ভরে শ্বাস নেই?’

‘কেন রে?’

‘তাহলে ওখানে গিয়ে বাংলাদেশের আকাশে বাতাসে যে শব্দগুলো ভেসে বেড়াচ্ছে তা দিয়ে অনেকদিন বাংলা বলতে পারব!’

‘ঠিক আছে, তুই বুক ভরে শ্বাস নে।’

ঋদ্ধ চোখ বন্ধ করে বুক ভরে শ্বাস নিতে শুরু করে। রিজওয়ান সেদিকে তাকিয়ে থাকে।#



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন