বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারী, ২০১৬

সালেহা চৌধুরী'র গল্প : টলস্টয়ের মৃত্যু এবং একজন ভাঁড়ের স্ত্রী

মস্কো থেকে একশো তিরিশ মাইল উত্তর পূর্বে একটা ছোট রেল স্টেসন ছিল। সেখানে একজন স্টেসন মাস্টার অনেকদিন থেকে কাজ করতেন। আমুদে এবং মজা করবার জন্য সকলে চিনতো তাকে। এক একটা জোক শুনে সকলেই হাসতো এবং তিনি নিজে হাসতেন সবচেয়ে বেশি। গলা ফাটিয়ে হো হো শব্দ করে। নাম ছিল তার আন্দ্রেয়ভিচ ইভান ওযোলিন। সংসারে এক স্ত্রী ছাড়া আর কেউ ছিল না তার। ছেলেমেয়ে নেই। স্ত্রী আনা ওযোলিন ঘর সংসারের কাজে ব্যস্ত। খুবই সাধারণ একজন।


তখন ক্যালেন্ডারের তারিখে বছরের নাম ১৯১০ এবং মাস অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ। স্ত্রীর বয়স বেশি না। তার নিজের বয়সও এই খুব বেশি হলে চল্লিশ। একঘেয়ে জীবন কাটাতে কাটাতে ইভান ওযোলিন একদিন মনে মনে ভাবলেন এই অঞ্চলে তানিয়া নামের যে নারী বছর দুয়েক হলো বিধবা তিনি তার প্রেমে পড়েছেন এবং এ কথা তানিয়াকে বলতেই হবে। তানিয়ার বয়স পঞ্চাশের উপরে। এমন ভাবনার কারণ তিনি ঠিকমত খুঁজে বের করতে পারলেন না। তানিয়া স্বামী মারা যাবার পর থেকে ও যেমন কালো পোশাক পরে থাকে তেমনি সমস্ত হাসিঠাট্টাকে বিষের মত বর্জন করে। তারও একার জীবন। বেশ কয়েকবার তানিয়াকে বলেছেন আইভান ওযোলিন-- এমন করে থাকবার মানে নেই। চল একদিন আমার সঙ্গে ঘুরতে যাবে। তুমি আমি দুজনে মিলে জঙ্গলে গিয়ে কিছু মনের কথা বলবো।

তানিয়া বলে-- আমি কেন?

আইভান ওযোলিন বলে-- নয় কেন?

এমনি ভাবে কিছুদিন ওখানে যাবার পর কি জানি কেন তানিয়া রাজি হয়ে যায়। তার চাইতে বারো বছরের ছোট একজন যে ভাবে উৎসাহ দেখাতে শুরু করেছে সেটা কি এবং কারণই বা কি বোধকরি সেটা পরখ করতেই তানিয়া বলে-- ঠিক আছে। তানিয়া সাইকেলে চেপে এখানে ওখানে যায়। বোধকরি সাইকেলের পিঠে সওয়ার এই তানিয়াকেই পছন্দ ওর। যে হাসে না, কালো কাপড় পরে, এবং মোটামুটি একা জীবন কাটায়। এমন একজনকে আবার জীবনমুখী করবে এমন ভাবনা তাকে বেশ উৎসাহিত করে।

--আনা আমি একটু জঙ্গলে যাব। বউকে বলে ওযোলিন। আনা তখন তার ছোট বাগান তদারকিতে ব্যস্ত । সেখানে নানা সব ফুল ফোটায় ও। তরকারি লাগায় ঋতুতে। ভায়োলেট ফুটেছে এন্তার। আরো নানা ফুল। যেন আইভান তার সেই যৌবনটাকে পরখ করতেই চলেছে যার কলকবজা এখন একটু মরচে ধরা। একজন মেয়েকে আবার কবর থেকে তুলতে পারবে এমন ভাবনা তাকে তেজি ঘোড়ার মত খুশী করে। বলে আনা-- জঙ্গলে কেন?

জঙ্গল থেকে তোমার জন্য মাশরুম আনতে যাচ্ছি আনা। আজ তুমি মাশরুমের সুপ করবে।

আনা ঠিক বিশ্বাস করে না। কেবল স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলে-- হুঁ। মাথায় নতুন টুপি। কোটটা ধোপার বাড়ি থেকে পরিস্কার করা। পোস্টমাস্টার আইভান ওযোলিন আজ একটু অন্যরকম দেখতে। আনা নিজের কাজে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

যাবার আগে স্টেসনের টেলিগ্রাফ করবার কেরাণি ডিমিট্রিকে একটু খুলে বলে কোথায় চলেছে সে এবং কেন চলেছে। আইভান ও ডিমিট্রি হরিহর আত্মা। একজন ট্রেনকে পতাকা দেখিয়ে ট্রেনটাকে অন্যত্র পাঠায় আর একজন টরেটক্কায় যেখানে যোগাযোগ করবার দরকার যোগাযোগ করে। ডিমিট্রিকে এমন ভাব দেখায় আইভান যেন বলতে চায়-- দেখ এখনো একজন নারীকে জঙ্গলে নিয়ে যেতে পারি। ডিমিট্রি বলে গুডলাক। এই স্টেসনে নামে না তেমন কেউ। আসটোপোভোর নাম অনেকেই জানে না। দু একজন ব্যবহার করে স্টেসনটাকে যেতে আসতে এই মাত্র। বেশ নিরিবিলি নির্জন স্টেসন। ট্রেনকে সবুজ পতাকা দেখিয়ে তানিয়াকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। দুজনের দুটো সাইকেল। বেশ শাঁ শাঁ করে ওরা একসময় মিলিত হয়ে গন্তব্যস্থলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। পাশাপাশি সাইকেল চলছে। কিন্তু তানিয়ার মুখে তেমনি কুলুপ আঁটা। সে যে কেন রাজি হলো কে বলতে পারে।

দুজনে গভীর জঙ্গলে এসে ভালো জায়গা দেখে বসে পড়ে। আইভান তাকায় তানিয়ার মুখের দিকে। সেখানে কোন ভাবান্তর নেই। বলে আইভান ওযোলিন-- তোমার কি জঙ্গল ভালো লাগছে না।

তানিয়া বলে-- না।

--তাহলে এসেছো কেন?

--যে ভাবে তুমি আমার ব্যাপারে উৎসাহ দেখাতে শুরু করেছো ভাবলাম ব্যাপার কি? তাই।

কোন বড় বা গভীর কথা না বলে একটা পুরণো জোক শোনায় আইভান ওযোলিন। তানিয়া তেমনি মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। আইভান ওযোলিন নিজেই গলা ফাটিয়ে হো হো করে হাসে। তারপর তানিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে-- আমার স্ত্রী আনা মনে করে আমি একটা শস্তা ভাঁড়, যে সামান্য কারণে জোক করে। হো হো করে হাসে। এই পৃথিবীতে সবকিছু এত সিরিয়াস ভাবে নেবার কি আছে? হ্যাঁ তবে ভালোবাসার কথা আলাদা। ওকে সবসময় সিরিয়াস ভাবেই নিতে হয়। তোমার কি তাই মনে হয় না তানিয়া?

--ঠিক জানি না। তানিয়া বলে। খানিক আগে যে আলো পড়েছিল তানিয়ার মুখে তা মুছে গেছে। আলোটা গাছের ওপারে চলে গেছে। তানিয়া ওঠে। বলে-- তোমার সঙ্গে আসাই আমার ঠিক হয়নি। একদিন তোমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাইকেলে চেপে বনে আসবার ব্যাপারটা বোধকরি আমাকে উৎসাহিত করেছিল। এখন দেখলাম এটা এমন কিছু নয়। এই বলে তানিয়া সাইকেলে উঠে বসে। এবং কোনদিকে না তকিয়ে বাড়ির দিকে যাত্রা করে।

স্টেসনে ফিরে ডিমিট্রিকে দেখতে পায় আইভান। বলে ডিমিট্রি-- কেমন কাটলো সময়?

--তেমন ভালো না।

--কি করেছিলে?

--বড় একটা জোক শুনিয়েছিলাম। ও হাসে নি।

--কাজটা ঠিক করনি। হাতে হাত রাখবে। গভীর করে কথা বলবে। কপালে চুমু খাবে। দরকার হলে ঠোঁটে ঠোঁট রাখবে তা না করে তুমি কি করেছো জোক শুনিয়েছো? তুমি সত্যিই আসলে একটা ভাঁড়।


বাড়িতে ফিরতেই আনা বলে-- মাশরুম কোথায়?

পাইনি। স্বামীর দিকে তাকায় আনা। বলে-- ও। এই মাশরুম আনতে যাওয়া তোমার একটা বিশেষ জোক তাই না? বিশ বছর হলো স্বামীকে জানে আনা। যে কথায় কথায় জোক করে এবং মনে করে এইভাবেই জীবন চলবে। বলে আনা-- তোমার কথা আমি বিশ্বাস করি না।

-- হয়তো আমার আগে কেউ জঙ্গলে গিয়ে মাশরুম গুলো নিয়ে গেছে।

আনা বলে-- মনে হয় না। তুমি একটা ভাঁড় আর নম্বরওয়ান মিথ্যুক।

স্ত্রীর কথার প্রতিবাদ করে স্টেসনে ফিরে আসে আইভান। একটা দারুণ এক্সসাইটিং কিছু করতে চেয়েছিল ও। হলো না। আনাও কেমন সন্দেহের চোখে তাকিয়ে আছে। যাক গে। পরে আবার চেষ্টা করা যাবে। এই ভেবে আইভান ওযোলিন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।


অক্টোবর অনেক আগে শুরু হয়ে গেছে। বেশ ঠাণ্ডা পরেছে। সেই গতানুগতিক জীবন। ট্রেন আসে, ট্রেন যায়। এবার ঠাণ্ডা আবহাওয়ার কারণে ওয়েটিং রুমের চুলো এবং অফিসের চুলো গরম করবার জন্য কাঠ কাটে আইভান ওযোলিন। প্রতি বছরই এমন কাজ করতে হয় তাকে। নিজের বাড়ির জন্যও কাঠ ফাঁড়ে। কাজ করতে করতে বারবার মনে হয় কেন তানিয়া তার প্রেমে পড়লো না। মনটা একটু খারাপ সেই কারণে। জীবনটা কেমন পানসে। একই জিনিস করছে তারা গত বিশ বছর হলো। স্ত্রীর সাদামাটা মুখ দেখেই জীবন শেষ হবে তার। বলে ডিমিট্রিকে—বল তো ডিমিট্রি জীবনের এই একঘেয়েমি কাটানোর কোন ফর্মুলা আছে নাকি তোমার।

--আমি তো এক সাধারণ টেলিগ্রাফ কেরাণি আইভান। সারা পৃথিবীতে খবর পাঠাই। বলে ডিমিট্রি।

--কিন্তু বলতেই হয় ডিমিট্রি তুমি একটা দারুণ কিছু কর। সারা পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখো। বলে আইভান।

--তা রাখি। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমাকে কেউ টেলিগ্রাফ পাঠায়নি। ভালোমন্দ জিজ্ঞাসা করে। তোমার মতই আমার অবস্থা। একই কাজ, একই জীবন। অর্থহীন সময়।

কিন্তু তখনো ওরা দুজন জানে না খুব তাড়াতাড়ি ওরা একটি বিশেষ ঘটনায় শরীক হয়ে ইতিহাসের অংশ হবে।


সেদিন ছিল একত্রিশে অক্টোবর। বেশ জমিয়ে শীত পড়েছে। দক্ষিণ অঞ্চল থেকে কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস বইতে শুরু করেছে। এখন একটা ট্রেন আসবে তুলা থেকে। যাকে সবুজ পতাকা দেখিয়ে বিদায় করে বাড়িতে যাবে ও। খামাখা ঘর গরম করবার চুলোতে কাঠ ঠুঁসে কাঠ খরচ করবে না। ট্রেনটা এসে থেমেছে। কেউ নামেনি। কেউ ওঠেওনি। আইভান কেবল ইঞ্জিনকে পতাকা দেখিয়ে ট্রেনটাকে বিদায় করবে চেয়ে দেখে দ্বিতীয় শ্রেনীর কামরা থেকে বেরিয়ে কে একজন তার দিকে এগিয়ে আসছে। পতাকা দেখানো হয় না আইভানের। ভাবে ব্যাপার কি? কে এই মেয়ে। বলে কাতর গলায় মেয়েটা-- স্টেসনমাস্টার আপনার সাহায্য আমাদের বড় প্রয়োজন। আপনি অবশ্যই আমাদের সাহায্য করবেন।

আইভান ছুটে যায় মেয়েটার কাছে। যে গলায় কথা বলছে এবং যে ভাষায় তা কোন চাষাভুষো বা দিন মজুরের গলা নয়। বেশ একটু সম্ভ্রান্ত কথা তার। পোশাক পরিচ্ছদও বেশ উঁচু মানের।

--আমি কি করতে পারি? ব্যস্ত হয়ে প্রশ্ন করে আইভান।

--আমার বাবা খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আমরা ডানকাভো চলেছিলাম। মনে হয় না এখন এইভাবে ওখানে যাওয়া যাবে। আমাদের সঙ্গে একজন ডাক্তার আছেন। তিনি বলছেন-- এখন বাবাকে নামিয়ে একটা ভালো বিছানায় শুইয়ে তার চিকিৎসা করতে হবে। তাকে নিয়ে যাওয়া যাবে না। এখানে কি কোন ভালো হোটেল বা সরাইখানা আছে। যেখানে একটা ভালো বিছানা কি পাওয়া যাবে?

মেয়েটা তাকে নিয়ে যায় সেই দ্বিতীয় শ্রেণীর কামরায় যেখানে পাতলা কম্বলে ঢাকা একজন বৃদ্ধ চুপ করে পড়ে আছে। আর একজন ডাক্তার হাঁটু মুড়ে সেখানে বসে তার অবস্থা লক্ষ করছে।

ডাক্তারকে লক্ষ করে মেয়েটি বলে,  দুষাণ, ইনি হলেন স্টেসনমাস্টার।
মেয়েটা ঠিক শীতে নয়, অন্য কারণে থর থর করে কাঁপছে। যে বাবাকে নিয়ে অনেকদূরে চলে যেতে চেয়েছিল তার এমন অবস্থা হবে কেউ ভাবেনি। ডাক্তার দুষাণ মুখ তুলে স্তেসন মাস্টার  বলে-- একটা ভালো গরম বিছানার বড় প্রয়োজন। আপনি কি ব্যবস্থা করতে পারবেন? 

-- ভালো বিছানা? সরাইখানা? আইভান ঠিক কি বলবে বুঝতে পারে না।

--স্টেসনটার নাম কি?

--আসটোপোভো। বলে স্টেসনমাস্টার।

এমন স্টেসনের নাম জীবনেও শুনি নি। বলে সেই মেয়েটা। এখানে কি কোন সরাইখানা?

স্টেসনমাস্টার বলে-- ভালো সরাইখানা নেই মানে এই নয় ভালো কোন বিছানা নেই। ওই যে দূরে লাল বাড়িটা দেখছেন ওটা আমার বাড়ি। সেখানে একটা ভালো বিছানার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

ডাক্তার বলেন-- ঘটনাটা খুলে বলতে হয়। এই যে এখানে যিনি শুয়ে আছেন তিনি হলেও কাউন্ট লিও টলস্টয়। কাউন্ট লিও নিকোলায়োভিচ টলস্টয়। আমারা তাকে নিয়ে তাঁর ইচ্ছামত অনেক দূর যেতে চেয়েছিলাম। যেতামও ঠিক। কিন্তু হঠাৎ করে নিমোনিয়া ধরেছে তার। তাই তাকে নিয়ে আর ভ্রমণ সম্ভব নয়।

আইভানের মুখটা হাঁ হয়ে যায় এমন কথায়। কাউন্ট লিও টলস্টয়? কে না জানে তার কথা। এমন মানুষ আসটোপোভো নামের এক স্টেসনে এসে তার সাহায্য চাইছে? পৃথিবীতে এমন ঘটনাও ঘটে।

ব্যস্ত হয়ে বলে আইভান-- আমরা আগে ওঁকে স্টেসনের ওয়েটিংরুমে নিয়ে যাব। তারপর ভালো গরম বিছানার ব্যবস্থা হবে। আপনারা চিন্তা করবেন না।

হালাকা পাতলা দেহ টলস্টয়ের। হাতে তার একটা ছোট কুশন। যেমন করে ছোট ছেলেমেয়েরা কুশন জড়িয়ে ধরে তেমনি করে ধরে আছে সেই কুশন বুকের কাছে। ডাক্তার দুষাণ মাকোওভিক্সি টলস্টয়ের কাঁধটা যত্ন করে ধরে আর পায়ের দিকটা ধরে আইভান। খুব সাবধানে এই ঋষিকে নামাতে হবে। প্রথমে ওয়েটিং রুমে। তারপর বাড়িতে গিয়ে বিছানাপত্র সব গুছিয়ে ওকে বাড়িতে নিয়ে যেতে হবে। যখন ওরা টলস্টয়কে এই ভাবে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে, টলস্টয় চোখ খুলে বলে-- পালাতে হবে। যতদূরে চোখ যায় পালাতে হবে। না হলে ও এসে ঝামেলা বাধাবে। টলস্টয়ের পরণে খুবই সাধারণ পোশাক। চাষাভুষো যেমন পোশাক পরিধান করে কেমনি। একটা ট্রাউজারের মত ঢিলেঢালা পাজামা। আর একটা ফতুয়া। যিনি জীবনের বাহুল্য বর্জন করেছেন অনেকদিন আগে। তার হালকা শরীর আর সাদা ফুরফুরে দাড়ি শীতের বাতাসে একটু কেঁপে ওঠে।

আইভান ওযোলিন বলে-- ওঁকে একটু অপেক্ষা করতে হবে। যে ট্রেনটা স্টেসনে দাঁড়িয়ে আছে তাকে বিদায় করেই আমি ফিরে আসছি। বাড়িতে গিয়ে স্ত্রীকে ঘটনা বলতে হবে। চিন্তার কিছু নাই। কাউন্ট লিও টলস্টয়ের কথা বললে-- আমার স্ত্রী সাহায্য করবে। এযে সত্যিই অত্যন্ত এক অসাধারণ ঘটনা।


স্টেসন মাস্টারের বাড়িতে ছোট বড় মিলিয়ে সর্ব সাকুল্যে ঘর আছে চারখানা। একটা ওদের শোবার ঘর। একটা রান্নাঘর। আর একটা বসার ঘর। যেখানে নিজের একটা ছোট অফিস আছে। আর একটা ভাঁড়ার ঘর। বাড়িতে ঢুকেই হনন্তদন্ত হয়ে যখন ও আনাকে পুরো ঘটনা বলে আবাক হয়ে আনা বলে-- এই অখ্যাত স্টেসন অস্টোপোভোতে লিও টলস্টয়? এটা তোমার নতুন এক সিলি জোক নাকি? না ভাঁড়ামির আর এক নাম।

--না না। অস্থির হয়ে বলে আইভান ওযোলিন-- আমি ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলছি ঘটনা সত্যি। ওরা তুলা থেকে এসেছে। যেতে চেয়েছিল ডানকাভোর দিকে। হঠাৎ করে অসুখ এসে ধরেছে বলে ওরা আর কোথায় যেতে পারছে না। এবার আমাদের বিছানাটা বাইরের ঘরে বিছিয়ে দিতে হবে।

পুরণো লোহার বিছানার স্ক্রুগুলো ঢিলে করে সেটা খুলে বাইরের ঘরে আনতে সময় লাগে। বলে আনা-- ঘটনা রীতিমত অবিশ্বাস্য।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি। বলে আইভান।

এরপর বলে-- এবার কাউন্ট লিও টলস্টয়কে এখানে আনতে হবে। একটা ভালো বিছানা ওর জন্য বড় দরকার। তুমি চল আমার সঙ্গে।

ওয়েটিংরুমে এসে দেখে টলস্টয় তখন শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে। মেয়েটাও বোধহয় ক্লান্ত হয়ে হাঁটুমুড়ে বসে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়েছে। বাবার বিছানার বালিশের পাশে তার ক্লান্ত মুখ। কেবল  ডাক্তার দুষাণ মাকোওভিট্চি চুপচাপ দাঁড়িয়ে এদের পাহারা দিতে দিতে অপেক্ষা করছে কখন স্টেসনমাস্টার ফিরে আসে।

ওদের দেখতে পেয়ে প্রাণ ফিরে পায় ডাক্তার দুষাণ। বলে-- ইস বলেও বোঝাতে পারবো না কত বেশি কৃতজ্ঞ আমরা আপনার কাছে। ঘটনা এই দুই দিন আগে টলস্টয় বাড়ি থেকে পালিয়েছে। স্ত্রীর হাত থেকে বাঁচতে। জীবনটা একদম দুর্বিসহ করে তুলেছে ওর স্ত্রী। সারদিনই ঝগড়া। সারাদিনই চিৎকার। মাঝে মাঝে স্ত্রী আবার ভয় দেখায় সে নাকি আত্মহত্যা করবে। ফলে যা হবার হযেছে তিনি বাড়ি থেকে পালাতে চেয়েছেন। এই যে তিনি এখানে আছেন সেটা যেন পৃথিবীর কেউ না জানে। কোনমতে খবর কানে গেলেই কাউন্টেস সোনিয়া হন্যে হয়ে এখানে ছুটে আসবে। সেটা কোনমতেই হতে দেওয়া যাবে না। স্টেসনমাস্টার আপনি পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন তো? গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে।

চুপ করে ভাবছে আইভান। একটা মানুষ যার বয়স এখন আশি বছর সে সবকিছু ফেলে পালাতে চায়? কি এমন ব্যাপার যা বাড়িতে থেকে সমাধান হয় না। এটাই কি একটা বিয়ের পরিণাম? সে তাকিয়ে আছে তার স্ত্রীর দিকে। এখনি যার মাথার চুল দু একটা পেকে গেছে। যখন আরো বৃদ্ধা হবে কি হবে তখন? কেমন হবে তাদের জীবনের শেষের দিনগুলো? লিও টলস্টয়ের মত জ্ঞানী একজন? তিনিও কি সমস্যার কোন সমাধান করতে পারেননি? তাকেও সব ফেলে পালাতে হয়? বিয়ের বলয় থেকে?

ডানকোভার গাড়িটা আসবে। তাকে পতাকা দেখাতে হবে। সে বলে-- আপনারা আনার সঙ্গে বাড়িতে যান। আমি ডানকোভার গাড়িটাকে পতাকা দেখিয়ে চলে আসবো।


নতুন বাড়ির গরম বিছানায় এনে লিও টলস্টয়কে শুইয়ে দিয়ে মেয়ে বাবার কাপড় বদলে দেয়। চুল দাড়ি চিরুনি করে। পাশের ঘরে কোনো মতে নিজেদের থাকার ব্যবস্থা করেছে আনা ও আইভান। এ দিকে চোখ মেলে চারপাশে তাকিয়ে টলস্টয় বুঝতে পারছে একটা নতুন অপরিচিত জায়গায় এখন তিনি। মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে-- আমার জীবন ঠিক আর কতদিন জানি না। তুমি এক কাজ কর শাশা, ফট করে আমার সেক্রেটারি ভ্লাডিমির চারটকভের কাছে একটা টেলিগ্রাম পাঠিয়ে তাকে এখানে আসতে বল। ওকে আমার বেশ কিছু কাজের কথা বলতে হবে। ওকে এখন আমার বড়ই দরকার।

--ওকে বলতে গেলে সেটা যদি মায়ের কানে যায় পাপা, মাও চলে আসবেন। ভয়ে ভয়ে বলে শাশা।

--ও কথা বলবে না শাশা। তোমার মা? জীবনেও আমি ওর মুখ দেখতে চাই না। ঈশ্বর না করুক ওকে যেন আমার আর দেখতে না হয়। সেই ঝগড়া, সেই চিৎকার, সেই তর্ক। না শাশা সেটা আমি আর সহ্য করতে পারবো না। তবে ভ্লাডিমির চারটকভকে আসতেই হবে। আমার বইএর কপিরাইটের কি হবে তা ছাড়া আমার উইলের ব্যাপারটাও আমি ওর সঙ্গে আলাপ করতে চাই।

--আমি জানি পাপা আপনার ইচ্ছা। আপনি চান আপনার সমস্ত বই ভবিষ্যতে প্রতিটি রাশিয়ান যেন বিনি পয়সায় পায় সেটা আপনি ওকে বলবেন। যদি কিছু লিখিতভাবে দিতে হয় সেটা আপনি দেবেন। আর আপনার সমস্ত সম্পত্তি দেখাশোনার দায়িত্ব আমার এই তো?

--আর সব কিছুরই নির্বাহী মানুষ হবে ভ্লাডিমির চারটকভ। সে আমার উইল এবং আমার আদেশের নির্বাহী পরিচালক বা এক্সিকিউটিভ অথরিটি। আর কেউ না। সোনিয়া না, আর আমার অন্য কোন মেয়ে না কিম্বা আমার কোন ছেলেও না। ওরা কেবল জানে বাবুগিরি। জীবনের অন্য কোন অর্থ নেই ওদের কাছে। আমি ভ্লাডিমির চারটকভকে বলবো-- কোন বই কি ভাবে প্রকাশ হবে। আমার ডায়েরিগুলোর কি হবে। বলতে বলতে দম প্রায় বন্ধ হয়ে যাবে এমনি অবস্থা হয় লিও টলস্টয়ের। তিনি অনেক কষ্ট করে, একটু থেমে বলেন-- ডায়ে্রিগুলো। এই ডায়েরি নিয়ে তোমার মায়ের সেকি তুলকালাম কাণ্ড। পারলে সব গুলো চুরি করে, চুরি করে কি যে ও করতে চেয়েছিল কে জানে।

মেয়ে বলে-- আমি সব জানি পাপা। কেবল ভয় ভ্লাডিমির চারটকভকে বলতে গেলে মা যদি জেনে যায় কোথায় আছেন আপনি। সেটাই ভয়।

--তর্ক করবে না শাশা। এই তর্কই আমি সহ্য করতে পারি না। এটাই আমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়েছে। টলস্টয়ের অশ্রুভেজা কাতর কণ্ঠ শুনতে পায় পাশের ঘর থেকে আনা ও আইভান। টলস্টয় বলছেন-- দুষাণ কোথায়?

--তিরিশ ঘন্টা একটানা ঘুমায়নি ও। পাপা এবারে স্টেসনের ওয়েটিং রুমে ও একটু ঘুমিয়ে আছে। ঠিক আছে পাপা আমি দেখছি ভ্লাডিমিরকে কি ভাবে টেলিগ্রাম পাঠানো যায়। স্টেসনমাস্টার আমাকে সাহায্য করতে পারে এই ব্যাপারে।

ঠিক এ সময়ে স্ত্রী আনার ভয় তাড়াতে একটা মজার গল্প  মনে এসেছে স্টেসনমাস্টার আইভানের। কিন্তু সে গল্পটা এখন আর করে না। এই পরিবেশে এমন গল্প মানায় না।

তবু রাতের বেলা গল্পটা না বলে থাকতে পারে না আইভান ওযোলিন। বলে-- আমার দাদার ছিল এক গোপন ঘর। যেখানে গ্রামের নানা সব গরীব মেয়েরা তার সঙ্গে রাত কাটাতো বা দিনও কাটাতো। যখন যেমন। সবগুলো ঘরের মাঝখানে একখানা গোল ঘর। সে ঘরে ঢোকার পথ বা বেরুনোর পথ ভীষণ শক্ত। মাইনোটরের ঘরের মত। আমার সেই দাদার গ্রাম নিঝুনিতে লিও টলস্টয়কে নিয়ে যেতে পারলে কাউন্টেস সোনিয়া টলস্টয় কখনো ওকে খুঁজে পেত না। কিন্তু সেখানে যাওয়া শক্ত। বিশেষত ওর এই শরীর।

--কেন একজন স্ত্রী তার অসুস্থ স্বামীকে দেখতে চাইবে সেটা এমনকি খারাপ কাজ। এই বলে পাশ ফেরে আনা।

--স্ত্রী? যার ভয়ে বাড়ি থেকে মানুষ পালায় সেকি স্ত্রী? একটা ডিকটেটর। একটা কঠিন মেয়েমানুষ। ডাকাতের সর্দার। মেয়েমানুষেরা এমন। করতে পারে না এমন কাজ নেই।

আনা কোন কথা বলে না। মনে হয় সে ঘুমিয়ে গেছে।


পরদিন শীতের আকাশের মত আকাশ যখন বেশ কালো ভ্লাডিমির চারট্কভ সেই স্টেসনে এসে নামে। অবাক হয়ে দেখে যেখানে মহান সাহিত্যিক লিও টলস্টয় আশ্রয় নিয়েছেন। ডাক্তার দুষাণ এসেছে স্টেসনে। সে চারট্খভকে আমন্ত্রণ জানায়।
-- এ কোন জায়গা? প্রশ্ন করে ভ্লাডিমির চারটকভ।

দুষাণ বলে-- জায়গাটা যাই হোক এখানেই আছেন লিও টলস্টয়।

ট্রেন চলে গেলে রেলের পথ পার হয়ে নিজের বাড়িতে যায় আইভান ওযোলিন সঙ্গে ডাক্তার দুষাণ এবং ভ্লাডিমির চারট্কভ।

স্টেসনে ফিরে আসতেই স্টেসনের টেলিগ্রাফ করবার কেরাণি ডিমিট্রি আইভান হোকে ডাকে।  সাদা মুখে একটা টেলিগ্রাম দেখায় তাকে।  বলে-- দেখ কি লেখা আছে। আইভান দেখে এবং পড়ে-- আমি জানি তুমি এখন কোথায়। আমি আসছি। আমার সঙ্গে আসছে আন্দ্রে, ইলিয়া, টানিয়া, মিখায়েল। আজ রাতেই আমরা আসবো। আমাদের জন্য একটা বিশেষ পুলম্যান ট্রেনের ব্যবস্থা হয়েছে। ইতি-- তোমার অনুগত স্ত্রী কাউন্টেস সোনিয়া আন্দ্রেইভানা টলস্টয়।

আইভান টেলিগ্রাম পাঠ করে ভয়ে কাঠ। ডিমিট্রি বলে-- আইভান, এটা কি করে হলো? ওর স্ত্রী কেমন করে জানলো?

--তুমিই জানো এটা কেমন করে হলো। তুমিই তো নানা জায়গায় টেলিগ্রাম পাঠাও।

--আমি? ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলছি এমন কাজ আমি করিনি।

--ইস কি হবে? টলস্টয় বার বার বলছিলেন স্ত্রী সোনিয়াকে দেখতে পেলে সঙ্গে সঙ্গে তার হার্টফেল হবে। তিনি মারা যাবেন। এখন আমি কি করি? দাও দেখি টেলিগ্রামখানা। আমি ওদের কাউকে বলবো এই ঘটনার কথা। তারপর যা করা দরকার করবো।


বাড়িতে ফিরে দেখতে পায় প্রসন্ন মুখে খাটের রেলিংএ ঠেঁস দিয়ে শুয়ে আছেন টলস্টয়। মেয়ে শাশা কাছে দাঁড়িয়ে আছে। তার সাদা দাড়িতে আলো পড়েছে। আর তার মুখের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে ভ্লাডিমির চারটকভ। যিনি এই ঋষির বিশেষ বন্ধু এবং সেক্রেটারি। যখন লিও টলস্টয় স্টেসন মাস্টার আইভান ওয়োলিনকে দেখতে পান খুব খুশী হয়ে তাকে ভ্লাডিমির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন-- ভ্লাডিমির, এই স্টেসনমাস্টার একজন অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি। ওর এবং ওর স্ত্রীর যত্নে আমি এখন ভালো আছি। ভ্লাডিমির কৃতজ্ঞতার সঙ্গে মাথা ঝুকিয়ে ওকে অভিবাদন করে। লজ্জা পায় স্টেসনমাস্টার। ভ্লাডিমিরকে লক্ষ করে টলস্টয় বলেন-- স্টেসন মাস্টার, ভ্লাডিমির আমার বিশেষ বন্ধু ও সেক্রেটারি।

এরপর খানিক কথাবার্তা হয়। স্টেসনমাস্টারের পকেটে সেই বিশেষ টেলিগ্রাম্‌ যা তাকে অত্যন্ত চিন্তিত করেছে। একসময় ভ্লাডিমিরকে চোখের ঈশারায় পাশের ঘরে আসতে বলে। ভ্লাডিমির স্টেসনমাস্টারকে অনুসরণ করে। বলে-- এই দেখুন কি এসেছে।

ভ্লাডিমির টেলিগ্রাম পড়ে আঁতকে ওঠে। সর্বনাশ কেমন করে জানলেন উনি। আপনি কি কাউকে----

--না। আমিও না আমার টেলিগ্রাফক্লার্ক ডিমিট্রিও নয়। মনে হয় আপনাকে যেটা পাঠানো হয়েছিল সেটাই কেমন করে----

চিন্তিত মুখে বলে ভ্লাডিমির-- সে কি করে সম্ভব। উহ আপনি জানেন না স্টেসনমাস্টার এই মহিলা কি জিনিস। ওরে বাবারে। কথায় কথায় চিৎকার। ভয় দেখানো। প্রতিটি ডায়েরির পাতা খুঁজে দেখা সেখানে কি আছে। ভয়াবহ নারী ইনি।

তখন ডাক্তার দূষাণ একটা রেস্টুরেন্ট থেকে চা খেয়ে বাড়িতে ফিরেছেন। ছোট একটা রেস্টুরেন্ট আছে। এই একটু চা বা ছোট বানরুটি বিক্রি করে। তিনিও ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়েন। তারপর বলেন-- ঠিক আছে এই কথা লিও টলস্টয়কে বলবার কোন দরকার নেই। আমরা তাকে পাহারা দেব। তাঁর স্ত্রী কাউন্টেস সোনিয়া যেন কোনমতে এখানে আসতে না পারে সেটা দেখবো। টলস্টয়কে বলবার দরকার কি? আর কাউন্টেস সোনিয়াকেও বলবার দরকার নেই তিনি বর্তমানে কোথায়। মানে কোনখানে আছেন। তিনজন পুরুষ মানুষ একজন বদরাগী নারীকে দূরে রাখতে যথাসম্ভব ব্যবস্থা নেবে বলে ঠিক করে।

বলেন দূষাণ-- আমরা বাড়ির সামনে তালা দিয়ে রাখবে যাতে কেউ বুঝতে না পারে এখানে কেউ আছে। আর পেছনের দরজা আমরা ভেতর থেকে বন্ধ করে ওকে পাহারা দেব। কাউন্টেসকে কিছুতেই লিও টলস্টয়রে কাছে ঘেষতে দেওয়া হবে না।

সব ঘটনা শুনে আনা বলে-- ও এবার তাহলে বাড়ির সামনে পিছনে তালা দিয়ে ওকে জেলের ভেতরে রেখে দেব। প্রথমে ওঁকে আমাদের একমাত্র বিছানা দিয়েছি এখন নিজের বাড়িতে তালা লাগিয়ে আমাদের জেলখানায় বাস করতে হবে। চুলোতে আগুন জ্বালাতে জ্বালাতে নিচু গলায় বলে আনা।

স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে দেখে আইভান ওযোলিন। বয়স ধরেছে স্ত্রীকে। চুলে পাক ধরেছে। শীতের ঋতু তার মুখেও বছরের পর বছরের ঋতু বদলের স্বাক্ষর রেখেছে। আরো যখন বুড়ি হবে মুখের দিকে তো তাকানোই যাবে না। তখন কি হবে? রেগে স্ত্রী আনাকে বলে-- তাহলে তুমি কি করতে বলো আনা। স্ত্রীকে ওঁর সামনে আনতে বলো? এক কাজ কর না হয় ওর স্ত্রীর কাছে গিয়ে সব খুলে বল। তারপর দেখা যাবে তার বিশেষ পুলম্যান ট্রেনে উনি তোমাকেও মস্কোতে নিয়ে যাবেন।

--ওরে আমার রসের স্বামী। তুমি মনে করছো সব কিছুতেই একটা জোক করা যায়। কিন্তু এসব এখন আর জোক নেই। সব সত্যি। এই বলে চুলোয় পাতিল চাপায় আনা। অবাক হয়ে আইভান ওযোলিন ভাবে এই মেয়েমানুষের মনের ভেতর কি হচ্ছে এখন। দেখতে পেয়েছে এক গোছা ফুল সযতনে সাজিয়ে দিয়েছে ঋষির বেডসাইড টেবিলে। ওর প্রিয় ফুল ভায়োলেট। তারপর এবার এসব কি বলছে। তাতো বলবেই ওর মত অল্পবুদ্ধির এক মেয়েমানুষ। কেমন করে জানবে লিও টলস্টয় কে এবং কি। বউকে কোনদিন পেটায় নি ও। কিন্তু এখন আনার ভাবভঙ্গিতে তেমন একটা ইচ্ছা জাগে। কিন্তু এর চেয়েও বড় কাজে ব্যস্ত এখন সে। লিও টলস্টয়ের সেভিয়ার বা রক্ষাকর্তা এখন এই স্টেসনমাস্টার। মাঝে মাঝে ঈশ্বর এমন সব কাণ্ড করেন। মনে হয় তিনিই সবচেয়ে বড় রসিক একজন।


ঠিকই এসে গেলেন মিসেস টলস্টয়। তাঁর চারজন বড় বড় সন্তানসহ। বাতির মত উজ্জ্বল চকচকে পুলম্যান গাড়িতে। এমন গাড়ি এই স্টেসনে আগে কখনো আসেনি।  
স্টেসন মাস্টার ওযোলিন পুলম্যানের ড্রাইভারকে বললো-- আপনার গাড়িটা পাশের রেল সড়কে রেখে দিন। কারণ স্টেসন বন্ধ করে দিলে অনেক অসুবিধা হবে। 
পুলম্যানের ড্রাইভার কথা শোনে। শাশা গিয়ে মাকে নিয়ে স্টেসনের ওয়েটিং রুমে বসায়। আর সব ভাইবোন শাশাকে অনুসরণ করে। মিসেস সোনিয়া টলস্টয় কাঁদছে শাশার হাতের ভেতরে। স্টেসন মাস্টার সেখানে ঢুকতেই চিৎকার করে ওঠে সোনিয়া টলস্টয়-- তুমিই সেই মহা শয়তান যে আমার স্বামীকে লুকিয়ে রেখেছো, তাই না? মনে রাখবে তুমি, আমি সবসময় আমার স্বামীর সঙ্গে থাকি। যেখানে তিনি যান আমিও সেখানে যাই। আমাকে ছেড়ে তিনি কোথাও যান নি কোনদিন। ও যদি তোমার মত শয়তানের বিছানায় ঘুমায় আমাকেও সেখানে গিয়ে ঘুমাতে হবে। আমি তাঁর স্ত্রী। কখনো সেটা ভুলবে না। 

শাশা মাকে বলে-- চুপ কর মা। এমন আজে বাজে কথা বলো না। 
আর সব ছেলেমেয়েরা মাকে ঘিরে আছে। তারা ঠিক কি করবে বুঝতে পারছে না। মিসেস সোনিয়া টলস্টয় বুঝতে পারে তার পক্ষে এখন স্বামীর সঙ্গে দেখা করা সম্ভব নয়। গজ গজ করতে থাকে কেবল। দেখা যায় আনা এক ট্রে খাবার এনেছে। চা আর ঘরে বানানো দারুচিনির গন্ধ মাখা কেক।

দুষাণ বলে-- পুলম্যান যে কয়দিন থাকবে তার পয়সা গুনতে হবে আমাদের। কিন্তু এছাড়া উপায় কি আর! 
সেই স্টেসনের ওয়েটিং রুমেই ওদের থাকতে হয়। দু একজন গিয়ে পুলম্যান ট্রেনে ঘুমায়। আর আইভানের বিছানায় টলস্টয়ের শরীর সত্যিই খুব খারাপ হয়ে ওঠে। তিনি বার বার কাশতে থাকেন। একসময় আইভান দেখতে পায় সাদা বালিশে লাল রক্তের দাগ। নানা সব ওষূধ পত্র দেওয়া হয়। ডাক্তার মুখ গম্ভির করে রাখে। টলস্টয়ের শরীর এখন খারাপ থেকে আরো খারাপের দিকে যদিও তিনি স্ত্রী আসবার কোন খবরই জানেন না।

পরদিন সকালে তুলায় যাবার ট্রেনকে পতাকা দেখাতে গিয়ে আইভান ওযোলিন দেখতে পায় একজন বা দুজন যাত্রী অন্য দিনের মত সেখানে নামছে না। প্রতিটি দরজা খুলে নামছে অনেক মানুষ। প্রায় ষাট থেকে সত্তুর জনতো হবেই। বড় বড় চোখে আইভান ওযোলিন এইসব কাঁধে কামেরা ঝোলানো, হাতে নোট বুক এমন সব মানুষকে লক্ষ করে। বুঝতে পারে সারা দেশের রত্ন এই সাহিত্যিক কে শেষ বেলায় দেখতেই তারা এসেছে। না হলে জানতে ব্যাপার কি। শুধু রাশিয়া কেন পারলে সারা পৃথিবী আসতো এই ছোট আসটোপোভো স্টেসনে এতই বিখ্যাত তখন তিনি। আইভান বোকার মত চেয়ে দেখে। ওরা নেমেই হোটেল বা সরাইখানা খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আইভান মনে মনে বলে-- বন্ধুরা এই মহান মানুষের জীবনের এই পরিণতি দেখে আপনারা কি শিখছেন? ভাইসব কি জানছেন আপনারা। যেটা আমি জেনেছি সেটা কি আপনারাও জানেন নি। বুঝতে পারেন নি একজন মহান মানুষ কখন সব ফেলে পালাতে চায়? কিন্তু সেসব কথা মনে মনে। মনে মনে বক্তৃতার মকশো করা কেবল।

এই কি শেষ? 
আসতে লাগলো দলে দলে আরো সব সাংবাদিক, সাহিত্য অনুরাগীর দল। মানুষের ঢল নামলো সেখানে। সেই ছোট্ট স্টেসন আসটোপোভো যেখানে জীবন একদিন থেমে ছিল এখন তা মানুষের কলরবে মুখরিত হয়ে উঠলো। নানা সব দোকানও ব্যাঙএর ছাতার মত রাতারাতি গজিয়ে উঠতে লাগলো। কেউ কেউ আগুন জ্বালিয়ে আলু পুড়িয়ে বিক্রি করতে লাগলো। কেউ চা। কেউ কেক। কেউ স্যান্ডউইচ। সে এক মহা ঘটনা। কিন্তু কেউই টলস্টয়ের কাছে যেতে পারছে না। তারা সবাই ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে আছে। এদের কেউ কেবল পুলম্যানে, কেউ ওয়েটিং রুমে, কেউ বা প্লাটফর্মে কোনমতে রাত কাটায। ডাক্তার দূষাণ বলে দিয়েছেন, ওঁর আশে পাশে এখন যাওয়া যাবে না। যখন সময় হবে বলবো। কিন্তু তাতে কারো কোন ধৈর্যচ্যুতি নেই। সোনিয়াকেও যেতে দেওয়া হলো না তাঁর স্বামীর কাছে। চিৎকার কান্না কোন কিছুতেই কিছু হলো না।

নভেম্বর মাসের চার তারিখে আনার সঙ্গে একটু বিশেষ সখ্যতা করে। সোনিয়া টলস্টয় স্বামীকে দেখবে বলে আনার পিছু পিছু বাড়ির পেছন দিয়ে ঢুকতে চায়। আনা সোনিয়া টলস্টয়কে সাহায্য করবে বলে মনে মনে ঠিক করেছে। ওদের পেছনে চলেছে নানা সব সাংবাদিক, ক্যামেরা হাতে। স্টেসন মাস্টার ঘটনা দেখে ফেলেছে। ঘরে গিয়ে সে ভ্লাডিমির ও দূষাণকে বলতেই ওরা সকলে মিলে দরজা এমন করে ঠেঁসে ধরে রাখে যে আনা বা সোনিয়া কারো পক্ষেই সম্ভব হলো না দরজা ভেঙ্গে সেখানে যাওয়া। সোনিয়া টলস্টয় আর স্টেসনমাস্টারের স্ত্রী আনা  আনার বাগানে বসে  কিছুক্ষণের জন্য। শীতে কাঁপতে কাঁপতে সোনিয়া বলে, সারা জীবন এই মানুষের জন্যে সে কি করেছে। প্রায় চৌদ্দজন সন্তানের জন্ম দিয়েছে। তিনি চিরকালই ঋষি ছিলেন না। তাঁর জীবনের সমস্ত দৈহিক চাহিদা মিটিয়েছে, তার সব উদ্দাম উল্লাস সহ্য করেছে। এত গুলো সন্তানকে পৃথিবীতে এনেছে। খাওয়া দাওয়া কাপড় চোপড়ের সমস্ত দায়িত্ব নির্বিবাদে পালন করেছে। স্বামীর লেখায় কখনো বিরক্ত করেনি। এখন ঋষি হয়ে উনি আমাকে বর্জন করতে চান। এমনই কি হয় পুরুষ মানুষ? 

আনা বলে-- আর একটু অপেক্ষা করতে হবে কাউন্টেস, একসময় একটা পথ বের হবে।

সোনিয়া বলে, জানো আনা ওঁর “ওয়ার এ্যান্ড পিসের” কপি আমার হাতের লেখা দিয়ে তৈরী। সেটা আবার আমাকে কপি করতে হয়েছিল,  কারণ একটা কপি উনি হারিয়ে ফেলেছিলেন। “ওয়ার এ্যান্ড পিস” অনেক বড় বই। তুমি হয়তো জানো না। বলতে পারো সেগুলো উনি ভুলে যান কি করে? খালি সন্তান আর রান্না এই করিনি আমি। ওঁর লেখালেখিতেও সাহায্য করেছি। কথা বলতে বলতে কান্না চাপতে পারেন না কাউন্টেস টলস্টয়।

--ওঁর শরীর ক্রমাগত খারাপের দিকে চলেছে কাউন্টেস। ওঁর নিজের কোন ইচ্ছা এখন আর কাজ করছে না। আর যে সব পুরুষ মনে করছে তারা ওঁর রক্ষাকর্তা, তারাই এসব করছে কাউন্টেস। ওদের মধ্যে আমার স্বামী প্রধান। এখন আপনাকে বাইরে আটকে দিলেও   এক সময় আপনাকে ওঁর কাছে যেতে দিতে হবে। না দিয়ে পারবে না।
সোনিয়া আবার স্টেশনে ফিরে যায়।

বাড়িতে ফিরে আনা স্বামীকে প্রশ্ন করে-- কখন এসব শেষ হবে বলতে পারো?

--যখন উনি শেষ করতে চাইবেন। জানোতো লেখক নিজের ইচ্ছামত সব কিছু শেষ করে। কারো কোন কথা তারা মানে না।

আনা রেগে স্বামীর দিকে তাকায়। বলে-- কাউন্টেসকে আসতে দিতে আপত্তি কি?

--উনি তা চাননি। বউ ফেলে পালাতে চেয়েছিলেন সেটা এতদিনে জেনে গেছো না জানো নি?


আনা উত্তর করে না। কেবল আগুন চোখে স্বামীকে দেখে। মনে মনে বলে আইভান ওযোলিন-- উনিও একদিন বুড়ি হবেন। চুল পেকে যাবে, চামড়া কুঁচকে ঝুলে পড়বে তখন আমার কি হবে? সেটা পরে ভাববো-- এমনই ভাবনা তখন আসে আইভানের। আনা স্বামীর এসব চিন্তার কথা জানে না। সে জানে বর্তমানে রক্ষাকর্তার দায়িত্ব তাঁর ভাঁড় স্বামী বড় যত্নের সঙ্গে পালন করছে। আর সব পুরুষও ওরই মত।

সত্যিই তাই টলস্টয় সত্যিই মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছে। তাঁকে বাঁচানো যাবে না। তাঁর বুকে সর্দি বসে গেছে। নিঃশ্বাস প্রশ্বাসেও কষ্ট শুরু হয়েছে তাঁর। তাঁর আর তেমন জ্ঞান নেই।

ডাক্তার দূষাণের মনে হয় এবার একজন চার্চের ফাদারকে ডাকতে হয়। যিনি ওকে শেষ সময়ে চার্চের বানী শোনাবেন। তিনি আইভানকে বলেন-- যদিও তিনি অনেক আগে চার্চের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করেছেন তবু শেষসময় আমাকে ঈশ্বরের বানী শোনাতে হয়। এই আমরা করি।

--আমি চার্চে যাই না। তবে আমার স্ত্রী আনা চার্চে যায়। বলে স্টেসনমাস্টার ওযোলিন। আমি কেবল একজন স্টেসনমাস্টার।

--কিন্তু তোমার আত্মার জন্য চার্চে যাওয়া জরুরি।

ওযোলিন একটা রসিকতা করে। ফাদার এক ফোঁটও হাসেন না। কেবল গরম চোখে ওযোলিনকে লক্ষ করে।

সাতই নভেম্বর এসে গেছে। এবার সকলে বুঝে ফেলে লিও টলস্টয় আর কিছুক্ষণের মধ্যে পৃথিবী ত্যাগ করে চলে যাবেন। এবার কাউন্টেসকে ভেতরে আসার অনুমতি দেওয়া হয়। ঘরে ঢুকেই বিপুল কান্না আর চিৎকারে সোনিয়া পরিবেশ ভারী করে। শাশা এবং আর ছেলেমেয়েরা মাকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করে। বলে শাশা অশ্রুভেজা গলায়-- এই জন্যই মা বাবা তোমাকে আসতে দিতে চায়নি। তুমি সব কিছুতেই বড় নাটক কর। মেয়ের কথা হজম করে কাউন্টেস গিয়ে স্বামীর বিছানার পাশে বসে। এতদিন স্টেসনমাস্টার ওযোলিন অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে রক্ষাকর্তার দায়িত্ব পালন করেছে। দরজায় তালা, দরজা আটকে রাখা, বাইরে থেকে ইঁটকাঠ এনে দরজার সামনে স্তুপ করে রাখা, আবার ইঁটকাঠের বরফে মেঝে ভিজে গেছে বলে সাবধানে সেগুলো মুছে দেওয়া। আরো কত কি। চারপশের অসংখ্য মানুষের ভিড়ে ওর মনে হয় আপাতত এখন তেমন কিছু করবার নেই।

একসময় কাউন্টেস নিকোলিওভিচ লিও টলস্টয় পৃথিবী ত্যাগ করেন। তিনি জানতেও পারেন না তাঁর স্ত্রী সোনিয়া তাঁরই বিছানার পাশে বসে আছে। সকলে কাঁদতে থাকে। শাশা এবং আর সব ছেলেমেয়েরা। ভ্লাডিমির কাঁদতে চায় না। বেশ একটু শক্ত মুখ নিচু করে তাঁর এতদিনের বন্ধুর শেষ কাজ করছে । কিন্তু একসময় তাঁকেও কাঁদতে হয়। সকলে সচকিত হয়ে ওঠে যখন সোনিয়া টলস্টয় সকলের নিষেধ ভুলে চিৎকার করে ওঠে। বলে সে-- কি করে পারলে আমাকে এমন করে দূরে সরিয়ে রাখতে। তাঁর চিৎকার বাড়তে থাকে। সকলে তাঁকে থামতে বলে। সাংবাদিক ফট ফট করে ছবি তোলে। মৃত্য এবং শোকের, কান্না ও চিৎকারের।

সেই পুলম্যান গাড়িতে ঋষি টলস্টয়ের শরীর এনে তোলে সকলে অত্যন্ত সাবধানে। সঙ্গে তাঁর পরিবার এবং আরো লোকজনও চলেছে। যতজন সেখানে উঠতে পারে ওঠে। এরপর অন্য গাড়িতেও চলে যায় সকলে। আস্টোপোভো এবার আবার শান্ত হয়ে ওঠে। তার জীবনে এমন হৈ চৈ আগে কখনো হয়নি। গজিয়ে ওঠা দোকানপাট বন্ধ হয়ে যে যার জায়গায় চলে যায়।



দুইদিন পর সব কিছু শেষ হলে স্টেসনমাস্টার ওযোলিন এসে বসে তাঁর স্টেসনের অফিসে। এখন সব কিছুই চুপচাপ। ক্যামেরাম্যান তাঁর ও ছবি তুলেছে। সেটাই সান্ত্বনা। বসে বসে ভদকা ঢেলে দারুচিনি কেকের সঙ্গে পান করছে ওযোলিন। টলস্টয়ের জীবনের এই সমাপ্তি তাকে একটু ভাবুকও করেছে। সে কি ভাবছে কেউ জানে না। খানিক পরে টেলিগ্রাফ ক্লার্ক ডিমিট্রি গম্ভির মুখে আইভানের হাতে একটা টেলিগ্রাম তুলে দেয়। পান ও খাওয়া বন্ধ করে টেলিগ্রাম পড়তে থাকে আইভান ওযোলিন।

“আমি তোমাকে ত্যাগ করে চিরদিনের মত চলে যাচ্ছি আইভান ওযোলিন। তুলায় গিয়ে একটা ফুলের দোকান দেব আমি। আমার পিছু পিছু সেখানে আসবে না। তোমরা কেবল পালাতে পারো তাই না? আমরাও পারি। সই করা-- আনা বরিসনোভা ওযোলিন।”

টেলিগ্রাম পড়া হয়ে যায়। চুপ করে কি ভাবছে সে। ডিমিট্রি প্রশ্ন করে এমন ঘটনা ঘটবার কারণ কি আইভান?

বোধকরি আমার ভাঁড়ামিতে ক্লান্ত। বলে আইভান শান্ত গলায়। তা ছাড়া ও ফুল ভালোবাসে। বিশেষত ভায়োলেট। তারই দোকান করবে।

ডিমিট্রি কথা বলে না। বলে কেবল-- আনা এমন করবে ভাবতে পারিনি।

--আমিও না। বলে আইভান। পাকা চুল আর কোঁচকানো চামড়ার দিনে কি হবে তাদের এই ছিল তার এই কয়দিনের চিন্তা। এখন সেই চুল ও চামড়ার একজন চলে গেল বলে সে কি বেশ খুশী? বোঝা যায় না তার মনের অবস্থা। মনে মনে কত সব বক্তৃতা করেছে।-- ভাইসব দেখুন একটা বিয়ের পরিণতি কি হয়। আর আনা সবকিছু দেখে শুনে কি বুঝেছে কে জানে। এখানে সে আর ফিরে আসবে না। কখনো না।

--তুমি কি করবে? আইভান ওঠে। বলে-- জঙ্গলে যাব মাশরুম তুলতে। একা।


লেখক পরিচিতি
সালেহা চৌধুরী
বাংলা সাহিত্যের সমকালীন ধারায় সালেহা চৌধুরী এক পরিচিত নাম। তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, অনুবাদক ও কবি। শিশুসাহিত্যিক হিসেবেও তাঁর সুখ্যাতি আছে। দীর্ঘদিন থেকেই লিখছেন। প্রথম গল্পগ্রন্থ নিঃসঙ্গ প্রকাশ পায় উনিশশ সাতষট্টি সালে। সত্তর সালে প্রকাশ প্রকাশ পায় সাহিত্য প্রসঙ্গে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে কর্মরত থাকা অবস্থায়। তারপর বিদেশে চলে যান। বিশ বছর বাদে আবার লিখতে শুরু করেন। গ্রন্থসংখ্যা সত্তরের কাছাকাছি। লিখেছেন দুটি ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ। ২০১৫ সালে কলকাতার আনন্দ পাবলিশার্স থেকে ‘পঞ্চাশটি গল্প’ নামে আমার একটি বই বেরিয়েছে। সালেহা অনন্যা সাহিত্যপুরস্কার ও বাংলা একাডেমির সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সাহিত্যপুরস্কার পেয়েছেন।

1 টি মন্তব্য:

  1. আজ পড়লাম। অবাক হোলাম কোন মন্তব্য নেই দেখে!আমরা যারা ছোট গল্পে বাঁচি, তারাও এমন গল্প পড়িনা! হায় বাংলা ছোট গল্প!

    উত্তরমুছুন