বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারী, ২০১৬

হামীম কামরুল হক : ২০১৫ সালের লেখালেখি

গল্পপাঠ ১. 
২০১৫ সালে কি কি গল্প লিখতে চেয়েছিলেন? লেখালেখির কি কোনো পরিকল্পনা করেছিলেন?

হামীম কামরুল হক ১.
আমি আগেও বলেছি, লেখালেখির পরিকল্পনা তেমন একটা থাকে না, কারণ আমাকে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার সম্পাদকদের তাগাদায় বিচিত্র সব লেখা লিখতে হয়, এবং সব পরিকল্পনাই তাতে ভেস্তে যায়।
প্রতি বছরই ভাবি, এবছর থেকে আর নয়--- কোনো সম্পাদকের অনুরোধে আর কোনো কিছু লিখবো না। কিন্তু পারি কই। এবছরের পরিকল্পনা তো নয়, ইচ্ছাটা সারা জীবনের, যে, এমন কিছু গল্প লিখব বা লিখে যেতে চাই যা একেবারে নতুন ভাষা, বিষয় ও ভঙ্গি নিয়ে প্রকাশিত হবে। বাংলা ছোটগল্পে রবীন্দ্রনাথ, বিভূতি, তারাশঙ্কর, মানিক থেকে প্রধান লেখক বলতে যাদের বুঝি, সতীনাথ থেকে সন্দীপন হয়ে হাসান আজিজুল হক বা ইলিয়াস যে-কাজ তাদের কালে করতে চেয়েছেন, করেওছেন--- তেমন কিছু গল্প যদি আমার যাপিত সময় থেকে আদায় করা যেত। হচ্ছে কই? পারছি কই? শুধু খেদ, শুধু অবসাদ, মহুয়ার ধুতুরার স্বাদই বাড়ছে। অনেক মায়া মোহ ত্যাগ করে আর লিখতে পারছি কোথায়?


গল্পপাঠ ২. 
কি কি লিখেছেন? 

হামীম কামরুল হক : ২.

তারপরও গল্প লিখেছি। ছোটকাগজ, বড় কাগজ, ঈদসংখ্যার জন্য বেশ কিছু গল্প লিখতে হয়েছে। ‘আগুন ও আলো’, ‘থৈ’, ‘নির্জন বারান্দায়,সন্ধ্যায় হয়ে গেছে’, ‘যতটুকু আমি বুঝতে পারি’, ‘যতক্ষণ শ্বাস’ এবং ‘ ভোগ-দুর্ভোগ’, বারো মাসে ৬টা গল্প লিখতে পেরেছি। এছাড়া দুটো উপন্যাস লিখেছি। একটি ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে--- ‘আবছা আলোয় দেখা কয়েকটি মুখ’। অন্যটি মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস---‘রক্ত অশ্রু ঘাম’। সেটি বইমেলায় প্রকাশিত হতে পারে।


গল্পপাঠ ৩. 
যা লিখতে চেয়েছিলেন সেগুলো কি লিখতে পেরেছিলেন?

হামীম কামরুল হক ৩. 
আসলে আমার সব লেখাই কমবেশি এক একটা অস্বস্তি আর যন্ত্রণা থেকেই হয়, সেটা হল সময়মতো লেখাটা বা গল্পটা দিতে হবে---এই যন্ত্রণা। এটা মহৎ কোনো যন্ত্রণা নয়। কেউ একজন লেখা চাইলেন। বললেন, এই মাসের মধ্যে দিতে। রাজি হলাম। হওয়ার পর দিনরাত্রি চেষ্টা করছি, কখনো মনে মনে, কখনো কাগজে কলমে, কীবোর্ডে, নিত্যই চলছে সেজন্য গল্প লেখার তাড়া, কিছুতেই গল্পের ‘ক্লিক’টা পাচ্ছি না। হন্যে হয়ে উঠি কোনো কোনো সময়, একমাত্র ভয়, কথা দিয়ে কথা রাখতে না পারার ভয়। তারপর হঠাৎ করে ক্লিকটা আসে, তখন স্রোতের মতো বাক্য আসে আর লিখে ফেলি গল্পটা। পরে দেখি রাজ্যের ভুল। এডিট করার পরও সেটা কাটানো যায় না। কিন্তু দিয়ে তো দিতে হয়। এই আর কী। এভাবেই লেখাটা হয়। আর এভাবে কোনো লেখাই যে খুব মানসম্মত হবে হয় না, অন্তত আমার কাছে, সেট বলা বাহুল্য।

গল্পপাঠ ৪. 
যেভাবে লিখতে চেয়েছিলেন সেভাবে কি লেখাগুলো লিখতে পেরেছেন?


হামীম কামরুল হক ৪. 
 যেভাবে লিখতে চেয়েছিলাম, সেভাবে পারার তো প্রশ্নই ওঠে না। কারণ গল্পটা শেষ না করার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্তও আমি জানি না কী লিখছি, এবং কোন দিকে লেখা এগিয়ে যাচ্ছে। তবে কোনো লেখা লিখে খুব একটা তৃপ্তি বা তুষ্টি কখনোই হয়নি। কেবল কোনো লেখা শেষ করলে একটা হাঁপ ছেড়ে বাঁচার স্বস্তি হয়। কথাটা রাখা যাবে---এই স্বস্তি, এছাড়া কিছু নয়।


গল্পপাঠ ৫. 
২০১৬ সালে আপনার লেখালেখির পরিকল্পনা কি? কি কি লিখবেন বলে মনে করছেন?


হামীম কামরুল হক ৫ 
আসলেই জানি না। আমি আসলে, ওই পথ চলি আর লিখি। পথ আমাকে পথ দেখায়। আমি খুব নিশানা ঠিক করে লেখার কাজটা পেরে উঠি না। তবে মনমতো একটা উপন্যাস লিখতে চাই। আর গল্প মোটামুটি সাতচল্লিশটা হয়েছে। ইলিয়াস গল্প লিখেছিলেন মাত্র বিশ-বাইশটা। অন্য দিকে এই সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছোটগল্পকার স্বপ্নময় চক্রবর্তী, যার বয়স ষাট পার হয়ে গেছে, গল্পের সংখ্যা প্রায় দুশো বলে শুনেছিলাম। কথিত আছে, অমর মিত্র বলে চারশো পার হয়ে গেছেন। আর আমাদের হাসান আজিজুল হক নট-আউট হয়ে থাকলেও গল্পের সংখ্যায় সেঞ্চুরি করতে পারেননি। তবে সংখ্যা নয়, পরিমাণ নয়, গুণগত মানেই গল্প। সার্ত্র মাত্র পাঁচ/ছয়টা গল্প লিখেছিলেন। কাম্যুও তাই। কিন্তু তাদের প্রতিটি গল্প বিশ্বসাহিত্যের সেরা গল্পগুলির পাশে দাঁড়িয়ে আছে।


গল্পপাঠ : ৬. 
কীভাবে লিখবেন? লেখার জন্য আপনি কি ধরনের প্রস্তুতি নেবেন বলে মনে করছেন?


হামীম কামরুল হক ৬. 
এটা জানি না। লেখা বা যেকোনো শিল্পসৃষ্টি খুবই অব্যাখ্যনীয় ব্যাপার। কী থেকে কী হয় জানা যায় না। দেখা যায়, নিজের মনে তাড়না থেকে লেখা গল্পটা একেবারেই উতরায়নি, অন্যদিকে হট্টগলের ভেতরে বসে, পত্রিকার সম্পাদকের তাড়া বা ধাওয়ার ভেতরে লেখা একটা গল্প অসাধারণ হয়ে গেছে--- এমনটাই শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন। 


গল্পপাঠ : ৭. 
আগামী লেখাগুলোর মধ্যে কি কোনো পরিবর্তন আনার কথা ভাবছেন? কী ধরনের পরিবর্তন আনতে বলে মনে


হামীম কামরুল হক ৭.
পরিবর্তন আনার কথা বললেই তো পরিবর্তন আনা যায় না। তবে বিষয়, ভাষা, উপস্থাপনা সবক্ষেত্রে তো পরিবর্তন আনতে চাই। কিন্তু পারি তো না। আমি চলি, সেও চলে আসে, আমি থামি সেও থেমে যায় ( জীবনানন্দ দাশের ‘বোধ’ কবিতার কথা থেকে নিজের মতো করে বললাম)। ফলে জানি না, বোধের পাঁকচক্রে কী কখন খেলে যায়, আর কোন লেখার কী পরিণতি হয়। লেখার ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকাটা তো বিরাট বাহাদুরি বলে মনে করি, আমি তেমন বাহাদুর আজো হতে পারিনি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন