বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারী, ২০১৬

হেলাল মহিদীন'এর গল্প : মীনান্তরি

“তেলাপিয়াগুলা বাঁইচা আছে না মইরা গ্যাছে?”

তোতার ব্যবসাপাতির মোবাইল নম্বরে ফোন দিয়ে কিছুক্ষণ পরপর এই একই কথাই জিজ্ঞেস করছিল হারান ওরফে হারাইন্যা। হারাইন্যা এই ঘরের ছত্রিশ বর্ষীয় দেবোত্তর সদস্য। কিন্তু আজ বাজখাঁই কন্ঠের হারাইন্যার গলার স্বর অ্যাতটা অন্যরকম-অপরিচিত লাগছে কেন? কেমন ভোঁতাভোঁতা। আধিভৌতিক! কর্কশ। যান্ত্রিক। পুরনো ক্যাসেটের প্যাঁচ লেগে যাওয়া ফিতার ঘুরেঘুরে একই ট্র্যাকে বাজার মত।


‘হারাইন্যা হালায় পাগল-টাগল অয়্যা গ্যালো নাকি! আগে কোনোদিন ত’ এমন করতে দেহি নাই! ভুতেটুতে ধরে নাই তো’! তোতা বিড়বিড় করতে থাকে আপন মনে। লক্ষি, তোতার বিশেষ বান্ধবী, বিশেষ ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনের অন্যপাশে তখনো অপেক্ষায়। হারানের ফোন দু’জনের কামনা-বাসনার রসগল্লে বারবার ছেদ টানছিল। লক্ষি এখন ভীষণ বিরক্ত! কথায় বাটা মরিচের ঝাঁঝ—“হারাইন্যা অ্যাত ডিস্টার্ব করতেছে! আমি ফোন রাখলাম। কত বড় বড় মানুষ আমারে ফোন করে, ধরিনা। উপহার দেয়। কত আদর করে। জঙ্গলে বান্দরবানে সুন্দরবনে নিতে চায়, কক্সবাজারে নিতে চায়। যাইনা। যাইনা খালি আপ্নের টানে। আর আপনি খালি ‘পিয়ামনি এক সেকেন্ড, হারাইন্যা ফোন করতেছে, হারাইন্যা ফোন দিছে, হারাইন্যা হারাইন্যা করতেছেন। আমি রাখি। বা-আ-ই! আর শোনেন আমার লগে টেলিফোনে পিরিত করার সময়ও আপনে তেলাপিয়া চাষের সিডি শুনতে থাকেন, ভিসিডি দেখতে থাকেন। এইটা আর করবেন না!”

মেজাজটা কেমন লাগে? নিজে নিজেই গজরাতে থাকে তোতা—হারাইন্যা হালায় তিত-করলার আঁটি একখান।

ফোনে লক্ষির ওমগরমের শরীরি আলাপে ভাঁপ উঠতে শুরু করেছিল মাত্র। লক্ষি যখনই বলে ‘আপ্নেরে দ্যাখতে মোশাররফ করিমের মত লাগে’ বা ‘আপ্নের লগে কতা কইতে না পাল্লে আমার ছটফটানি হয়’ তোতার কোকিলা শরীর বরাবরই শীষ দিয়ে জেগে ওঠে ঊড়াল দেবে বলে।

ফোন বন্ধ করে রাখারও সুযোগ নেই। হারাইন্যা মা’কে নিয়ে গেছে দরগায়। বুড়ি আছে না গেছে বাঁচার-মরার কখন কী খোঁজ-খবর আসে কে জানে? এখন যায় তখন যায় অবস্থা।

‘শালি মরলেই শান্তি’। এভাবে ভাবতেও তোতার কোনো অনুতাপ-অনুশোচনা নেই। রোজইতো ভাবে—‘জানও একখান শা্লির বুড়ির! কৈ মাছের লাহান না-কি কচ্ছপের লাহান! কী এমন মজা এই দুনিয়ায় যে সাতটা বছর বিছানায় মরি মরি এই মরলাম এই গেলাম করেও মরেনা! হারাইন্যাও হালার বুড়ির মধ্যে কী যে পাইছে! এই যুগে পোষা কুত্তাও আড়াই মাস মালিকের লগে থাহেনা আর খাটাশটা আছে আটাইশ বছর! ওই হালায় না থাকলে বোধ হয় সাত বছর আগেই বুড়ি গেছিলো পরোয়ারদিগারের জিম্মায়!’


পাটের দড়ির খাটিয়ায় শুয়ে কঁকাতেই থাকে বুড়ি। চার কামলা পালকির মত করে খাটিয়াটি ব’য়ে নিয়ে যায় এই খানকা হতে ওই খানকায়। এই মাজার হতে ওই মাজারে। এই আখড়া হতে সেই আখড়ায়। হারাইন্যা পথ দেখানেওয়ালা। বেহারাপ্রধান। ঘুরাঘুরির ছুতায় বুড়ি খোলা দুনিয়ার আলো-বাতাস গায়ে লাগিয়ে বেঁচে থাকার এমন আজব বুদ্ধি বের করে নিয়েছে কিনা কে জানে? এ’সবে শান্তি পেলে মন্দ কী! সেবা-শুশ্রুষার আলগা ঝামেলা নিতে হচ্ছেনা বলে তোতা বরং খুশিই!

“তেলাপিয়াগুলা বাঁইচা আছে না মইরা গ্যাছে?”

আবারো। তোতার মেজাজ এবার আসমানে উঠেছে—“ওই হালার পো হালা মাংকির পোলা! মাছ মরবো ক্যা? তুই পুকুরে বিষ-টিষ ঢাইলা দিয়া গ্যাছোস নি কি? ওই ছইল্যা না ছোলেমান কি জানি নাম দ্যাখতো পুস্কুনিত মাছ ঠিক আছেনি?”

ছোলেমান ছেলেটা দৌড়ে আসে। ভয়ে কাঁপছে। বয়স দশও হবেনা। তেলাপিয়া চাষের আগা-মাথা কিছুই বুঝেনা জানেনা। ডানে যেতে বললে যায় বাঁয়ে। হারাইন্যা গত সন্ধ্যায় কোথা হতে যেন মানবশাবকটিকে যোগাড় করে এনে বল্ল পরদিন কাকভোরে খালি পেটে বুড়িকে নিয়ে ফকিরের আস্তানার পথে রওনা দেবে। কখন ফিরবে ঠিক নেই। রাতে সেই খানকায় থেকেও যেতে পারে! ছোলেমানকে দেখিয়ে বলে দিয়েছে যে ছেলেটি ছোট হলেও কাজে পাকা। হারানের মতই কাজ করতে পারবে। মাছের চাষ-পরিচর্যা সামলাতে পারবে। তাকে নাকি সব শিখিয়ে পড়িয়েও দেয়া হয়েছে ততক্ষণে।

তোতা ভেবে কূল-কিনারা পায় না—মা ঢেন্ডুন্নি বুড়ি। আছে আজ্রাইলের পাহারায়। সেও কিনা গেল ছালিবাবার কেরামতি দরবার শরিফে! এক-দুইদিন নয়, পরপর নয় নয়টা দিন!

হাজারে হাজারে মানুষ ধুপ-ধুনা-আতর, লাউ কদু, ডিম মুরগি নিয়ে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। দশ গ্রামে রটনার শেষ নাই। ছালিবাবার দরবারে যে যা হবার নিয়ত মানত করে তা-ই নাকি হয়। পরীক্ষিত। তোতা জানে এসবই বুজরুকি। গাঁজাখুরি। হারাইন্যারও কোনকালেই এসবে আগে কখনো কোনো বিশ্বাস দেখা যায়নি। বুড়ি জোয়ান বয়সে গ্রামের মহিলাদের এ’সব ঠগবাজির বিরুদ্ধে জ্ঞান-বুঝ দিত। সে-ই বুড়িই কিনা এখন ঠগের পাল্লায়! কি চায় বুড়ি? জোয়ান হতে? আরো একশ বছর বাঁচতে? ক’দিন যাবত এ-বাড়ি ওবাড়ির ছেলেবুড়োদের ডেকে এনে কেরামতির গল্প শুনেছে। সবাই নাকি উপকার পাওয়া। পরীক্ষিত।

ক’দিন আগে চাচী সম্পর্কের আসমার মা’র পথ আগলে তোতা প্রশ্ন করেছিল—‘আমি কাঊয়া হইতে চাইলে আপ্নের ছালিবাবা আমারে কাউয়া বানাইতে পারবে নি কি? বিলাই অইতে চাইলে বিলাই?’ চাচীর উত্তর হ্যাঁসূচক--“একজন চাইছে হ্যার পুস্কুন্ডির একটা মাছ য্যান হাঁস হয়। ছালিবাবার মাজারেত্তে বাইরাইয়া বাইত্তে গিয়া দ্যাহে হাঁচা হাঁচাই পুস্কুন্ডিতে এক বিরাট হাঁস”।

হারাইন্যা সারা জীবনই গোঁজা টাইপ। কথা বলে খুব কম। একশ’টা প্রশ্ন করলে একটার উত্তর দেয়। তোতা জানে উত্তর আসবেনা তবুও তারস্বরে চেঁচিয়েছিল গত সন্ধ্যায়—“দিনের পর দিন মাসের পর মাস কী কর ফকিরের কাছে? এই বুড়ি পাইছেডা কি? তুই হালার পোলা হালা এই বুড়ির মাথা পুরা নষ্ট কইরা দিছস। তোর ফন্দিটা কি শুনি! জমিজমা যা আছে এইগুলা চুরি-চোট্টামির ধান্দাফান্দা নি কি? আমি বুড়িরে দেখার সময় পাইনা হেল্লিগা ট্যাহা-পইসা বন্ধ করি নাই। ডাক্তার কবিরাজ যা লাগে নিয়া যা না বাপ, নিয়া যা! আমার মা-ই তো! রক্ত বেইচাও মা’রে দেখুম, দেখুম না? তো হালায় জ্ব্বিন-পরি, ফকির-পাগল কুফরি কালামের কামে নিয়া নিয়া ছোডো ক্যা? ডেইলি ডেইলি আকাম! একবার অইলে না হয় একটা কতা আছিল! ডেইলি ডেইলি?”

ছোলেমান ছেলেটা ভয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে। মা বুড়ির হেঁচকি উঠা শুরু হয়েছে। চোখে কান্নার বিশ্রী ভাঁজ। ছলছল জলের চেয়ে দুধ-সাদা পিঁচুটিই বেশি। সেসব ছলকে বেরোয়। হাড্ডিসার শরীরের খাঁচার হাঁপরের ঊঠানামা বন্ধ ছিল বহুদিন। আবার শুরু হলো তো ঘড়ঘড় করে চলতে থাকবে সপ্তাখানেক।

হারাইন্যা দাঁতে শুকনো খড় কেটে কেটে থু’থা করে মাটির মেঝেতে জমাচ্ছে। দ্রুততার সাথে। হারাইন্যার বদভ্যাস। এই বদভ্যাসেরও অর্থ আছে। তোতা জানে। ক্ষেপেটেপে গেলে মনে দুঃখ-কষ্ট পেলে হারাইন্যা সেকেন্ডে একটি খড়কাটা থুক ছিটায় মাটিতে। মন ভাল থাকলে একটি কা্টাখড় ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁতে কাটে। আয়েশি ভঙ্গিতে এদিকে ঘুরায় ওদিক ঘু্রায়।

মা’র সিঁদকাঠির মত হাত জোরে ডানে-বামে দুলছে। জোরে। চোখ দুটো যেন কোটর হতে ছিটকে বেরিয়ে আসবে। ঘড়ঘড়ে গলার অস্ফুট শব্দ তোতা শুনে চলে—“বাবারে, হারাইন্যার লগে খারাপ ব্যবহার করিসনা। শাপ লাগব। গুনা অইব। তোর বড় ভাই’র মত। বাপের মত। অ’রে দেইখা রাখিস।“

তোতা বিরক্ত। মাসির দরদ। নিজের পোলার চাইতে অন্যের পোলার আদর বেশি।

আটাশ বছর আগে এই গ্রামে হারানরাই ছিল তোতাদের একমাত্র হিন্দু পড়শি। পেশায় শীল। বংশ পরম্পরায় চুল কাটানোর পেশা নিয়ে টিকে থাকা হতদরিদ্র একটি পরিবার। আট বছরের হারাধন ওরফে হারানকে তার বাবা মা তোতার বাবা মায়ের কাছে রেখে ইন্ডিয়া গিয়েছিল। দু হপ্তা পর ফিরে আসার কথা থাকলেও তাদের আর কখনো কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরের বছর দুর গ্রামের হিন্দু আত্মীয়রা হারানকে নিয়ে যেতে চাইলেও হারান তাদের সাথে গেলনা। তোতার বয়স তখন তিন। হারানের ছয় বছরের ছোট। তোতাকে কোলে পিঠে রাখতে গিয়ে তার মায়াতে বাধা পড়েই গেলনা কিনা কে জানে? তোতা হারানকে ডাকত হারান কাকা।

হারান তোতার মা’কে ডাকত বৌদি, বাবাকে ডাকত দাদা। একবার মক্তবের হুজুর আপত্তি তুলেছিল। মা-বাবার বয়সিদের মা-বাবা ডাকুক। তা নাহলে অন্তত ভাই-ভাবি ডাকুক। মুসলমানের ঘরে থাকে মুসলমান না বানিয়ে রাখা ঠিক না। তোতার বাবা-মা’র যুক্তি ছিল হারান আমানত। হারানের বাপ-মা যে কোন সময় ফেরত নিতে আসতে পারে। তারা এসে হারানকে যেভাবে রেখে গেছে সেভাবেই ফিরে পাক। আমানতের খেয়ানত করাওতো মুসলমানের জন্য গুনার কাজ। আমানত প্রত্যর্পনের অপেক্ষায় আটাশটি বছর কেটে গেল। পাশের গ্রামে হিন্দুরা আছে। পুজায়-পার্বনে তোতার বাবা-মা সহযোগে হারান অংশ নিত। কোন ধর্ম নিয়েই হারানের কোন আগ্রহ অনাগ্রহ কিছু কখনো দেখা যায়নি। গ্রামে মাঝে সাঝে এ নিয়ে কথাবার্তা উঠেছে বটে কিন্তু তোতাদের পরিবারের একজন হারান কারো জন্য কোথাও কখনো কোন সমস্যা হয়নি। বরং গ্রামজোড়া অভ্যস্ততার দলিল হয়ে গিয়েছিল। পড়াশোনায়ও হারানের কোন আগ্রহ ছিলনা। তোতার বারো বছর বয়সে বাবা গতায়ু হল। মা হাল ধরল ডুবোনৌকা হতে চলা সংসারটাকে। বুদ্ধিমতি ও পরশ্রমি নারী। বীরাংগনার ধারা খেমটি। অভাব-কষ্টের সেই সময়েও একবারের জন্যও কারো মনে হয়নি হারান অপর বা আশ্রিত। তোতা হারানকে ‘তুই’ সম্বোধন করত সেই ল্যাংটাকাল হতেই। কিন্তু আগে এরকম চাকর-বাকরের মত তুই-তোকারি করত না। তুই-তোকারিতে বুড়ি বরাবরই অসন্তুষ্ট। হারান আজীবন বুড়ির ন্যাওটা হয়ে থাকার কারণে হয়তবা।

দু’হাত শুন্যে উঠানোর শক্তি নেই বুড়ির তবুও অনেকক্ষণ ধরে ঝুলিয়ে রেখেছে। সেগুলো তিরতিরিয়ে কাঁপছে নষ্ট ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটার মত। এই ভঙ্গির ভাষাও তোতার মুখস্ত। বাবারে, বুকে আয়। সেকন্ডের জন্য হলেও খানিক জড়িয়ে ধর। হাহাকারের ভাষা। বুড়ি কঁকায়—তোতা, তোতারে, বাপ আমার, তোতা, অ তোতা...

তোতার মন এসবে গলেনা টলেনা। বরং শক্ত হয়। আবেগ না আহ্লাদ না ছাই। এমন উতুপুতু তুলুনুলু বাংলা সিনেমার জন্য থাক। জীবন বড্ড কঠিন। নইলে সব কিছুতে ধরা খাওয়া কেন? বিএ পাশের আগেই জমিজমা বেচে ঢাকায় নেমে স্টক মার্কেটের লগ্নি হতে ভালোই কাঁচা টাকা আসছিল। তারপর কী হ’তে কী হল পুঁজিপাট্টা সব হাওয়া। বন্ধু রকিব; পাকা স্টক মার্কেট খেলোয়াড়, যার পরামর্শে স্টক ব্যবসায় নামা—সেও ধরা খেয়ে গেল! যদিও তাকে তোতার মত পথে বসতে হয়নি। এদিকে নিজ গ্রামকেও আর চেনা যাচ্ছেনা। সবার হাতে কাঁচা টাকা। গ্রামের হাঁটুর বয়সি বাচ্চা ছেলেপেলে ম্যাট্রিক পাশ না কি ছাতামাতা হয়েই ভোঁভোঁ শব্দে ধোঁয়া-ধূলা ঊড়িয়ে মোটর সাইকেল দাবড়ে বেড়ায়। দিনমজুর ভোলার পোলা পর্যন্ত বাপকে বলে দিয়েছে সাইকেল চালিয়ে কলেজে পড়তে যেতে পারবেনা। কলেজ ছাত্রের ইজ্জত গেলে থাকে কি? গুঁড়াগাঁড়া ছাওল-পাওল রোজ শহরে যাচ্ছে। ম্যাগডোনাল্ডস কেএফসি খাচ্ছে। গ্রামের কাঁচা ঘর খড়ের ঘরগুলো এখন হাফ-টিন হাফ দেয়াল। সব ঘরের দু’একজন বিদেশে থাকে। ফিক্সড প্রাইসের দোকান হয়েছে। কার কি নাই? কিছু ঘরে ফ্ল্যাট টেলিভিশনও এসে গেছে শোনা যাচ্ছে।

জুতা খাওয়া কপাল খালি তোতারই হতে হবে? খাবার ব্যবসা, কাঁচামালের ব্যবসা, পোল্ট্রি যেখানেই যার কাছেই লাভের ছড়াছড়ি শুনেছে তোতা কোমর বেঁধেইতো নেমেছে। টাকা খাটিয়েছে। সব কিছুতেই ডুবে-চুবে খাবি খেয়ে সারা। আর পথে বসা যাবেনা। দুনিয়া একদিকে তোতা একদিকে। কিয়ামত লাগলে লাগুক। তেলাপিয়া চাষে নামার পর তিন চালান বেচা হয়ে গেছে আজতক। মার্কেটে মারমার কাটকাট ডিম্যান্ড। এইবার এই একটাই ধ্যান-জ্ঞান। আজ হোক কাল হোক বুড়ি তো মরবেই। বুড়িকে নিয়ে বেশি ম্যা ম্যা আহ্লাদ আর ডাক্তার কবিরাজ করতে গেলে এই ব্যবসাটাও চাঙ্গে উঠবে। হারাইন্যা করে করুক। সে তার কৃতজ্ঞতার দায়শোধ করবে না? বুড়ি্রে নিয়া চান্দে গেলেও যাক!

তোতার রেগে কাঁই হয়ে থাকার আরো এক হাজার এক শ’ বিয়াল্লিশটা কারণ আছে। লক্ষির ফোন-কাটারি মাত্র একটা কারণ! ঘুম ভেঙ্গেছিল ফিশ-ফিড সাপ্লায়ারের ফোনে। ‘পাওনাদার শালারা ঘুমায়না নাকি? কোন রাত-দিন নাই?’

পাক্কা মনে আছে ফোন সাইলেন্ট করে ঘুমাতে গিয়েছিল তোতা। কপালে শনি থাকলে ফোনও সাইলেন্ট হয়না।

আবার ঘুমাতে যাবে তখনই স্বপ্নার ফোন। তিন বছর সংসার করে দুই বাচ্চার মা হলেও স্বামীভাগ্য হলনা তোতার এক সময়ের স্বপ্নকন্যটির। রোজ রোজ লাত্থিগুতা মারধরে তিন বছরেই বুড়িয়ে গেছে সদ্য চব্বিশের মেয়েটি। তোতাকে পাগলের মত ভালবাসত। তেলাপিয়ার চাষে নে্মেই তোতা বুঝেছিল দুনিয়ার সব ভাবনা-চিন্তা সমাজ-সংসার বাদ দিয়ে এই ব্যবসাটাকেই তার ধ্যান-জ্ঞান-রক্ত-ঘাম দিয়ে দাঁড় করাতে হবে। সংসার ফাঁদতে বসলে বরবাদি নিশ্চিত। সরাসরি স্বপ্নাকে বলেছিল--বিয়ে করে ফেল। আগামী পাঁচ-দশ বছরে আমার বিয়ে করা হবেনা। মেয়েটা আত্মহত্যা করতে গিয়ে বেঁচে এসেছিল। যে তোতা এক সময় কথায় কথায় ঝরঝর করে কেঁদে ফেলত সিনেমার নায়িকার সামান্য বিরহদৃশ্যে- স্বপ্নার মরে বেঁচে আসা বা বেঁচে গিয়ে মরতে থাকার ঘটনাও তার মনকে তরল করতে পারেনি। স্বপ্না আবারো আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে। বিগত দুঃস্বপ্ন-সময়ের স্বপ্নপুরুষকে পরিকল্পনাটি জানিয়েও যাচ্ছে। ভালবাসার শেষ দায়। ভেতরে ভেতরে কোথাও ভাঙ্গনের শব্দ; ঝড়ো আগুনের আঁচ কান ছুঁয়ে গিয়েছিল তোতার। ফোন রেখে ভাবল মরলে মরবে। দুনিয়ার কেউই অমর নয়। পিছুটানের ভারে হেলে পড়ে কার কি লাভ?

আবারো ঘুম নামে চোখে। আধো ঘুমে তোতা দেখে গ্রামটি রোশনাই শহর হয়ে গেছে। আন্ডারপাস-ওভারপাস। দামী গাড়ি। কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ের আলোকসজ্জা। পথে পথে রিয়েল্টরদের, রিয়েল এস্টেটওয়ালাদের সাইনবোর্ড জমে গাছ কেটে নেয়া শালবনের মত দেখাচ্ছে। ভোলা যুগালির ছেলে আইএ পাশ করেছে। বাড়ি বাড়ি মিষ্টি বিলাচ্ছে। সাইলেন্সার খোলা হুডখোলা দামী গাড়ীতে হাঁটুবয়সি গ্রামের ছেলেমেয়েদের হাসিকলরব-মাস্তি ইঞ্জিনের ভোঁ-ভাঁ ভেঁপুর সাথে মিলেমিশে হিন্দি সিনেমার আইটেম সং হয়ে যাচ্ছে। স্যূটেড-বুটেড তোতা নিজের সুপারস্টোরে ঢুকছে। র‍্যাকের পর র‍্যাক রংচঙ্গে মোড়কের পণ্যে ভর্তি। সবই স্বপ্না ব্রান্ডের। স্বপ্নার ছবি ছাপানো। বুকপকেটে পুষে রাখা স্বপ্নার পোঁকায় কাটা বাঁকা দাঁতের হাসিমুখের ছবিটি। যে হাসির জন্য তোতা কোথা হতে শুনে আসা পংক্তি খানিক পালটে নিয়ে আওড়াত--বিশ্বসংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে আনব হাজারটি নীলপদ্ম। হেসে গড়িয়ে পড়ত স্বপ্না। তোতার ভিতরে লালন গেয়ে চলত অবিরাম--অনন্ত রূপ সৃষ্টি করলেন সাঁই, শুনি মানব রূপের উত্তম কিছু নাই। এমন সুন্দর হাসি বেহেস্তের হুর-পরিদেরও নাই।

নাহ! স্বপ্নার দুঃস্বপ্নের ঘোরে দিনটিকে কোনোভাবেই নষ্ট হতে দেয়া যাবেনা। স্বপ্নার ভুত তাড়ানোর একটিই উপায়। লক্ষির কাছে যাওয়া। কিন্তু আজ তাও করা যাবেনা। পুকুরে কাদা বেড়েছে। কিছু তুলে ফেলে দিতে হবে। কামলাদের ডাকা দরকার। ফিশ-ফিড ভাসছে। বেশি ঢালা্র ফল। না সরালে মাছের ক্ষতি। টেট্রাসাইক্লিন আনার কথা। কতশত কাজ। লক্ষির সাথে বরং ফোনেই কথা চলুক!

মোবাইলের রিংটোনে গেয়ে ঊঠল শামশাদ বেগম –পিয়ার কিয়া তো ডরনা কিয়া, যাব পিয়ার কিয়া তো ডরনা কিয়া। লক্ষিই ফোন দিয়েছে। এটি লক্ষির পছন্দ করা রিংটোন। তোতার ফোনে সে-ই সেট করে দিয়েছিল। শরীর বেচলেও মেয়েটি তেলাপিয়ার মত। তোতা লক্ষিকে তেলাপিয়া ডাকে, আদর করে তেলামনি ডাকে। পিয়ামনিও ডাকে। তেলাপিয়ার তেলা ও পিয়া দুটো শব্দই থাকুক! বটপুকুরের মতও লাগে মেয়েটিকে। চারপাশে গাছগাছালির ছায়া নিয়ে চুপটি মেরে থাকা বটপুকুর। মাঝে মাঝে শান বাঁধানো ঘাটটার মতও লাগে লক্ষিকে। যেখানে বসলে পানি ডিঙ্গিয়ে আসা ভেজা বাতাস তোতা্কে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। বুকে পাথর-কষ্ট নিয়ে যতবার ঘাটে বসেছে হিমছড়ির ঝর্ণার মত ঝরঝর অঝোরে কেঁদেকুঁদে ততবারই হাল্কা হয়েছে তোতা!

ফোন ধরে তোতা। কানে ভেসে আসছে দুরাগত সুর--এমন মানব জনম আর কী হবে! লক্ষির সিডি প্লেয়ারে বাজছিল। তোতার উপহার। লালনের সিডিখানাও তোতার আরেক উপহার। লক্ষি লালন শুনছিল। এক অদ্ভূত অনুভবে ভর করে তোতার অস্তিত্বে। মনে হতে লাগল যেন এক অশরীরি আচ্ছন্নতা নিয়ে কুয়াশাঢাকা একটি সড়কের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে সে। ভাবছে সব সময় কি লালনই শুনতে থাকে মেয়েটা?

এই ঘোরটিও কেটে গেল অন্য ফোনের জান্তব চিৎকারে। লক্ষিকে হ্যালো বলতে পারার আগেই পিএইচডিওয়ালার ফোন। বহুদিন ধরে ফোনে ঘ্যানর ঘ্যানর করার পর গতকাল আসতে দিয়েছিল। রুরাল এন্ট্রেপ্রিনিওর না ছাইমাথা গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের নিয়ে উচ্চতর গবেষণা করছে লোকটা। ইন্টারভিউ করার চেয়ে বিরক্তই করেছে বেশি। গ্লোবালাইজশন গ্লোবালাইজেশন বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলছিল। তোতার কাছ হতে জানার চাইতে জানাতেই তার বেশি আগ্রহ। নিজের জ্ঞান ঝাড়তে গিয়ে খেয়ে ফেলেছিল তোতার তিনটি মহামুল্যবান কর্মঘন্টা। বলছিল—“দ্যাখেন আপনি তেলাপিয়া অবসেসড। সারা দিন সিডিতে শুনেই যাচ্ছেন কিভাবে পালবেন, খাওয়াবেন, ইঞ্জেকশন দিবেন, অষুধ দিবেন। এই যে দ্যাখেন নষ্ট দুইটা নিয়া আপনার চারটা মোবাইল ফোন, নষ্ট সাদাকালো টিভি ধরলে দুইটা টিভি; ইলেক্ট্রিসিটি আসার আগে নষ্টটা ব্যাটারি দিয়ে চালাতেন; এই যে টেবিলভর্তি ম্যাগডোনাল্ডস কেএফসসি স্যামসুং-এর অ্যাড; এই যে আপনার একটা সুপার স্টোরের মালিক হবার স্বপ্নের কথা বললেন—আমি আপনি সবাই যে গ্লোবালাইজেশনের পওন হয়ে যাচ্ছি সেটাই কিন্তু প্রমান করে”।

তোতা প্রশ্ন করেছিল--কার পোন হয়ে যাচ্ছি? কিছুকিছু কথা উড়োধুড়ো শুনে তার এমন প্রশ্ন। এসব আ-কথা শুনে তার তেলাপিয়া চাষের কি লাভ? তাই বেশির ভাগ কথাতেই তার মনোযোগ ছিল না। লোকটার মাথায় দু’চারটা তার ছিঁড়া কিনা কে জানে এবার এই সাত-সকালে ঘুম ভাঙ্গিয়ে প্রশ্ন করে বসেছে—গতকাল আপনি বলেছিলেন আপনার মা সারাদিন সারারাত কঁকাতে থাকে আর আল্লা-খোদাকে শাপ-শাপান্ত করতে থাকে। কিন্তু যখনই তেলাপিয়ার পরিচর্যা নিয়ে আলাপে ব্যস্ত হয়ে উঠেন উনি কঁকানো বন্ধ করে শুনতে থাকেন, তাইনা? তোতা উত্তর দিল—“হ্যাঁ। তাই। তো তাতে হইছেটা কি ভাই? আপ্নের অ্যাত টেনশন কিয়ের?” পিএইচডিওয়ালার উচ্ছ্বাসে কলকল প্রত্যুত্তর—“তা’হলে মানে দাঁড়াচ্ছে গ্রামে-গঞ্জে মৃত্যুপথযাত্রী অশীতিপর বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের মাঝেও উদ্যোক্তা হবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে”।

মহাবিরক্তিকর আইটেম তো! তোতা খেঁকিয়ে উঠে খেঁকশিয়ালের মত—“ধ্যাত্তেরি ভাই! আপনার পিএইচডি টিএইচডি না করলে হয়না? আমার মা’য় জান-পরান দিয়া বাধা দিছে। হাতে-পায়ে ধরছে। কান্নাকাটিও করছে। বুড়ির সোয়ামি, আমার বাপ, হাই স্কুল মাস্টার আছিল। বুড়ি জোয়ান বয়সে সুন্দরী আছিল। বুদ্ধিমতি আছিল। গেরামের মাইয়ালোকদের নিয়া সমিতি বানাইছিল। মূঠচাল আর খেত-ফসলির টাকা জমাইয়া ছাগল-গরু মুরগি কিনত, বেচত। যৌতুক দিতে নিতে না করত। আরো বহুত ঠ্যালা আছে বেডির। অনেক প্রেস্টিজ। চাইত আমি পড়াশোনা করি; মাস্টার হই......” কথা শেষ না করেই কিছু একটা ভেবে ফোনের লাইন কেটে দেয় তোতা। আগে কখনো ভাবেনি এমন কিছু নতুন নতুন প্রশ্ন জোঁকের মত কিলবিল করে তার মাথায় সেঁটে বসতে লাগল।

আচ্ছা লক্ষি কি এখনো অপেক্ষায়? ফোনের লাইন ধরে বসে নেই তো?

হ্যাঁ তাই। অপেক্ষায় ছিল মেয়েটি। লক্ষির সরাসরি প্রশ্ন—“মা’র খবর নিছেন?” তার কন্ঠে দুনিয়ার উদ্বেগ। “হারান বারবার ফোন দিতেছে কারণ আছে মনে হয়। আমি রাখতেছি। হারানরে জলদি ফোন দেন। এইটা আপ্নেরে মনে করায়া দিতে বারবার কল করতেছিলাম। রাখতেছি”।

লক্ষি, লক্ষি প্লিজ। আমার একটা প্রশ্ন--মা পীর ফকির তাবিজ কবজে বিশ্বাস ত’ করতই না গালাগালি করত, এখন কি যে হইছে...? লক্ষি শুনতেছ? আরেকটা ব্যাপার, তেলাপিয়ার চাষ, খাওয়া-দাওয়া, অষুধ নিয়া কথা বলতে থাকলেই মা কঁয়ানি-কাতরানি বন্ধ কইরা শুনতে থাকত... লক্ষি শুনতেছ?

লক্ষি কাঁদছে কেন? বাজারের মেয়ে কাঁদবে কেন? কার জন্য? মা’র কি কিছু হয়েছে? হলেও লক্ষির জানার কথা নয়। তার টেলিফোন নম্বর খালি তোতাই জানে। এখানে সমুদ্র নাই। তবুও বালিয়াড়িতে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের শব্দের ঝাপ্টা কানে লাগছে কেন? পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকায় তোতা। মৃত লাশের মত দেখতে কারা যেন এগিয়ে আসছে বুঝি! আজ মেঘ ছিলনা। ঝকঝকে দিন ছিল। তবুও বাইরে ঝড় ঝমঝম বৃষ্টি বিজলি জ্বলে উঠার ঘোর নিয়ে তোতা দেখতে পেল দড়িতে বানানো চিরচেনা খাটিয়াটি কাঁধ হতে নামিয়ে রেখেছে সেই চারজন গাঁও-কামলা। খাটিয়াটি সাদা চাদরে মোড়া। দুদ্দাড় দৌড়ে হারান নেমে পড়ছে বটপুকুরে। দু’হাতে পাখনা ঝাপ্টানো জলঘূর্ণি নামিয়ে খুঁজে ফিরছে ভেসে উঠা দু’একটি মরা মাছ।

“আমার মানত কবুল হয় নাইরে বৌদি! তোমারটাও না। পরজনমেই মাছ হইও বৌদি”—দু’হাতে বুক চাপড়ে বিলাপ করে হারান। হঠাৎ বটপুকুর ছেড়ে দিগন্তের দিকে ছুট দেয় সে। দ্রুত ধোঁয়াশার মত মিলিয়ে যেতে থাকে একটি ছায়া। একটি রেখা হয়ে দিগন্তে মিশে যায় হারান।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন