বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারী, ২০১৬

স্বকৃত নোমান : ২০১৫ সালে যা লিখেছি, ২০১৬ সালে লিখব

গল্পপাঠ : ১
২০১৫ সালে কী কী গল্প লিখতে চেয়েছিলেন? লেখালেখির কি কোনো পরিকল্পনা করেছিলেন?


স্বকৃত নোমান : ১
আমি মূলত ইতিহাসভিত্তিক একটা উপন্যাসের খসড়া প্রণয়ন করেছিলাম জানুয়ারির শুরুতে। গত প্রায় তিন বছর ধরে আমি ভারতবর্ষের ইতিহাসটাকে ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করেছিলাম।
ইতিহাস পড়তে পড়তেই উপন্যাসটার আইডিয়াটা পাই। উপন্যাসটা লেখার জন্য প্রচুর বইপুস্তক সংগ্রহ করে পড়ছিলাম আর নোট নিচ্ছিলাম। নোট নিতে নিতে পুরো একটা ডায়েরি শেষ করে ফেলি। কিন্তু একটি বিশেষ কারণে, যে কারণটি এখন বলা যাচ্ছে না, হয়ত কোনো একদিন বলব, মার্চে এসে আমি উপন্যাসটা লেখার পরিকল্পনা বাতিল করি। তবে উপন্যাসটি যদি লিখতে পারতাম, আমি নিশ্চিত, ভারতবর্ষের ইতিহাস নিয়ে নতুন করে ভাবনার একটা সূত্র তৈরি হতো। ভবিষ্যতে হয়ত কোনোদিন লিখব।

এছাড়াও উপন্যাস লেখার মতো আরো একটি বিষয় আমার মাথায় ছিল। সেটি ছিল অতীশ দীপঙ্করকে নিয়ে। এটা ছিল মূলত একটা জনপদ আবিষ্কারের কাহিনি। সেই কাহিনির মধ্যেই শ্রী অতীশ ঢুকে পড়তেন। উপন্যাসটির বিষয়বস্তু আমার মাথায় এসেছিল আরো দুই বছর আগে। গোটা মার্চ মাস এই উপন্যাসের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করি। তখন অতীশের বাস্তুভিটা বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রাম এবং বিক্রমপুরের নাটেশ্বর গ্রামে আবিস্কৃত বৌদ্ধ বিহার ঘুরে আসি একবার লেখক হামিম কামালকে সঙ্গে নিয়ে। সেদিন আমরা মুন্সিগঞ্জ বন্দরের অদূরের মাঝনদী থেকে লঞ্চে উঠে চাঁদপুর চলে গিয়েছিলাম।

যাই হোক, মার্চের উনত্রিশ তারিখে আমি উপন্যাসটির কাহিনি সংক্ষেপ লিখে ফেললাম। সময় নিচ্ছিলাম উপন্যাসের শুরুটা করার জন্য। শুরু করাটা আমার কাছে খুব জটিল মনে হয়। শুরু করতে পারলে আর সমস্যা হয় না।

এরই মধ্যে কেটে গেল প্রায় দেড় মাস। মে মাসের আঠার তারিখ একটি জাতীয় দৈনিকের একটি সংবাদ আমাকে খুব বিচলিত করে। সংবাদটির শিরোনাম ছিল এই, “খাবার নিয়ে সংঘর্ষ, নিহত ১০৪।”আমার মাথায় খেলে গেল একটা উপন্যাসের বিষয়বস্তু। শুধু এই একটি লাইন আমাকে অনুপ্রাণিত করে ‘শেষ জাহাজের আদমেরা’লেখার ব্যাপারে। শুরু করলাম গবেষণা। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত দৈনিকটির সব কয়টি সংখ্যা সংগ্রহ করলাম, যেগুলোতে সমুদ্রপথে মানবপাচার নিয়ে বিস্তারিত সংবাদ ছিল। ইন্টারনেট ঘেঁটে, মানচিত্র দেখে বাংলাদেশ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার ভূগোলটা আত্মস্ত করার চেষ্টা করি। কারণ উপন্যাসটির পটভূমি বঙ্গোপসাগর থেকে আন্দামান সাগর।

মে মাসের ৩০ তারিখে উপন্যাসটির একটা লাইনআপ তৈরি করি। প্রাথমিকভাবে উপন্যাসটা দুটি নাম নির্বাচন করি―এক. বংশধর, দুই. আদম। পরে যদিও একটিও রাখিনি। জুন নাগাদ উপন্যাসটি লিখতে শুরু করলাম। এত তাড়াতাড়ি হয়ত লেখা শুরু করতে পারতাম না, যদি না শুরুর পটভূমিটা আমার জানা থাকত। ‘বোগানা’লেখার সময় আমি বেশ কয়েকবার কক্সবাজারের দক্ষিণাঞ্চল সফর করেছি। ফলে ভূগোলটা আমার জানা ছিল। ঐ অঞ্চলের মানুষ, ভূগোল, সংস্কৃতি ও ভাষা সম্পর্কে আমার মোটামুটি ধারনা ছিল। তাই শুরুটা করতে পারলাম।

ডিসেম্বর নাগাদ উপন্যাসটির প্রায় উনচল্লিশ হাজার শব্দ লিখে শেষ করি। প্রথম কয়েকটি পর্ব সাহিত্য পত্রিকা ‘নতুন ধারায়’ ছাপা হয়। ওই পর্বগুলো পুনর্লিখনের পর ‘শেষ জাহাজের আদমেরা’নামে ‘পরস্পর’নামক সাহিত্যবিষয়ক একটি অনলাইন পোর্টালে ধারাবাহিকভাবে ছাপা হচ্ছে। উপন্যাসটির লেখা আগাচ্ছিল খুব ধীর গতিতে। প্রচুর পড়াশোনা করছিলাম এর ওপর। এখনো করছি। বলতে গেলে এটি নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম সারা বছর। এখনো শেষ করতে পারিনি। সব ঠিকঠাক থাকলে আগামি মে অথবা জুন নাগাদ শেষ করতে পারব আশা করি।



গল্পপাঠ : ২
 কী কী লিখেছেন?


স্বকৃত নোমান : ২ 
কোনো উপন্যাস তো আর একটানা লেখা যায় না। অন্তত আমি পারি না। একটা পর্ব লিখে আমাকে বেশ কিছুদিন বিরতি নিতে হয়। দ্বিতীয় পর্বটা কিভাবে শুরু করব তা নিয়ে অনেক ভাবতে হয়। কখনো একটা প্যারা লিখে সপ্তাহ-দশদিন বিরতি নিই। ভাবি। উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে আমার গতি ধীর বলা চলে। এই বিরতির ফাঁকে আমি বেশ কটি গল্প লিখি ফেলি। ডিসেম্বরে এসে খেয়াল করি বিরতির ফাঁকে আমি দশটি গল্প লিখে ফেলেছি! এটি আমার জন্য বিস্ময়কর। এসব গল্প লেখার কোনো পরিকল্পনাই আমার ছিল না। আইডিয়াটি মাথায় এলো, অমনি লিখতে শুরু করলাম। কোনো গল্পই লিখে শেষ করতে দুদিনের বেশি লাগেনি। দশটি গল্পের শিরোনাম যথাক্রমে―আর জনমে, বালিহাঁসের ডাক, বরাত, পুরুষ, মানুষ, উড়নচণ্ডীর কবুল, বৃষ্টিমুখরতায়, যেখানেই যাও, জ্বলে ওঠা বারুদ, যে আগুন। এই দশটি গল্প এবং ২০১৪ সালে লেখা চারটি গল্পসহ মোট চৌদ্দটি গল্প নিয়ে ‘বালিহাঁসের ডাক’নামে একটি গল্পের প্রকাশিত হচ্ছে এবারের একুশে বইমেলায়। বইটি প্রকাশ করছে অনিন্দ্য প্রকাশ।

এর বাইরেও অনেক লিখেছি। আরো দুটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছি। একটি ‘কথাসাহিত্যের অলিগলি’নামে অনুপ্রাণন প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে। এ বইটির অধিকাংশই ফেসবুকে লেখা। আরো একটি পাণ্ডুলিপি গুছিয়েছি, যেটির নাম বলতে চাই না। ওটা আসলে আমার মৌলিক কাজ নয়। আমার মূল কাজ গল্প আর উপন্যাস লেখা। এর বাইরে আমাকে প্রচুর লিখতে হয়। প্রকাশকরা বলেন লিখে দিতে, কিছু টাকার বিনিময়ে লিখে দেই। ওগুলোকে ঠিক আমার কাজ বলে স্বীকৃতি দিতে চাই না। বেঁচে থাকার জন্য অনেক কিছুই তো করতে হয়।



গল্পপাঠ : ৩
 যা লিখতে চেয়েছিলেন সেগুলো কি লিখতে পেরেছিলেন? 


স্বকৃত নোমান : ৩
পেরিছি আবার পারিনি। পেরেছি ‘শেষ জাহাজের আদমেরা’উপন্যাসটির অর্ধেকটা লিখে শেষ করতে। পারিনি ইতিহাসভিত্তিক সেই উপন্যাসটা লিখতে। আরও পারিনি অতীশকে নিয়ে উপন্যাসটা লিখতে। এছাড়া গত বছর আমি একটি গল্প লেখার পরিকল্পনা করেছিলাম। লিখতে শুরুও করেছিলাম। গল্পটার বিষয়বস্তু ছিল একটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে। ফেব্রুয়ারির শেষের দিকের কথা। এক রাতে আমি একটি দুঃস্বপ্ন দেখি। দেখি যে, একটা বহুতল ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডে একটা মাংসের দোকান। সেখানে মানুষের মাংস বিক্রি হচ্ছে। দোকানে মানুষের উরু ঝুলছে, হাত আর মাথা ঝুলছে। মেঝেটা রক্তে লাল হয়ে আছে। দুঃস্বপ্নের তাড়নায় আমার ঘুম ভেঙে যায়। ভয়ে একেবারে কুঁকড়ে যাই। মুখ ধুতে টয়লেটে যাওয়ার সাহস পর্যন্ত পাচ্ছিলাম না।

আমি আবার স্বপ্নকে গুরুত্ব দেই। কারণ স্বপ্নে যা দেখি অধিকাংশ সময় তা বাস্তবে ঘটে যায়। হুবহু না ঘটলেও কাছাকাছি কিছু একটা ঘটে। তাই পরদিন সারাদিন ভয়ে ভয়ে থাকলাম। স্বপ্নটা যদি সত্যি হয়ে যায়! পৃথিবীর কেউ বিশ্বাস করবে না এই কথা, আপনিও করবেন না হয়ত―সেদিন রাত নটা কি সাড়ে নটার দিকে আমি যখন ফেসবুক ওপেন করলাম, দেখলাম একটি সংবাদের লিংক। সংবাদটি ছিল এই, ‘বইমেলা থেকে ফেরার পথে দুর্বৃত্তদের চাপাতির আঘাতে লেখক অভিজিৎ রায় খুন হয়েছেন।’আমি শিউরি উঠি। চট করে মনে পড়ে যায় গতরাতে দেখা স্বপ্নটির কথা। আমি থরথর করে কাঁপতে থাকি। স্বপ্নটি আমার মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে। আমি কিছুতেই স্বপ্নটি মাথা থেকে তাড়াতে পারছিলাম না।

সেই দুঃস্বপ্ন এবং অভিজিৎ-এর হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ‘সক্রেটিসের বংশধর’নামে একটি গল্পের লাইনআপ তৈরি করি। প্রায় চার শ শব্দ লিখেও ফেলি। কিন্তু কেন যেন গল্পটি আর এগোল না। ভ্রুণেই নিহত হলো। তবে গল্পটি আমি লিখব। কোনো একদিন। অন্য কোনো আঙ্গিকে। সঠিক আঙ্গিকের জন্য হয়ত গল্পটি অপেক্ষা করছে।



গল্পপাঠ : ৪
 যেভাবে লিখতে চেয়েছিলেন সেভাবে কি লেখাগুলো লিখতে পেরেছেন?


স্বকৃত নোমান : ৪
হ্যাঁ, উপন্যাসটি যেভাবে আমি লিখতে চেয়েছিলাম মোটামুটি ঠিক সেভাবেই এগুচ্ছে। এছাড়া দশটি গল্পের মধ্যে অন্তত সাতটি গল্প আমি যেভাবে লিখতে চেয়েছি পুরোপুরি না হলেও কাছাকাছি লিখতে পেরেছি। কিন্তু মানুষ, উড়নচণ্ডীর কবুল ও বৃষ্টিমুখরতায়―এই তিনটি গল্পের ব্যাপারে আমার অসন্তুষ্টি আছে। এই তিনটিকে আমার মনের মতো করে দাঁড় করাতে ব্যর্থ হয়েছি। অনেক পাঠক এই তিনটির দুটি নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্যও করেছেন।



গল্পপাঠ : ৫
 সে লেখাগুলো কি নিয়ে কি আপনি তৃপ্ত? 


স্বকৃত নোমান : ৫
 আসলে কোনো লেখা নিয়েই আমি তৃপ্ত নই। সাময়িক হয়ত তৃপ্তি আসে। কিন্তু একটা সময় দারুণ অতৃপ্তি ভর করে। তখন মনে হয় আমি আসলে কোনো লেখকের পর্যায়েই পড়ি না। লেখালেখির নামে বেহুদা সময় অপচয় করছি। কারণ, যা লিখতে চাই তা হয়ে ওঠে না। আমি তৃপ্ত হতে পারি না। আমি আসলে একটি উপন্যাস লেখার জন্যই এত এত লিখছি। জানি না সেটি আদৌ লিখতে পারব কিনা। তবে লেখার জন্য মাল-মশলা জমা করছি। পরিকল্পনা করছি। আঙ্গিক খুঁজে বেড়াচ্ছি। বড় একটা ডায়েরিতে নোট নিচ্ছি। গত তিন বছর ধরেই নোট নেয়ার কাজ চলছে। বছর তিনেকের মধ্যে সেটি লেখা শুরু করতে পারব আশা করি। শেষ করতে পারলে হয়ত তৃপ্ত হতে পারব।



গল্পপাঠ : ৬
 ২০১৬ সালে আপনার লেখালেখির পরিকল্পনা কি? কী কী লিখবেন বলে মনে করছেন?


স্বকৃত নোমান : ৬
একমাত্র পরিকল্পনা ‘শেষ জাহাজের আদমেরা’লিখে শেষ করা। এটি এখন আমার মাথায় সিন্দাবাদের ভূতের মতো সওয়ার হয়ে আছে। এটি শেষ না করা পর্যন্ত আর কিছুই লিখব না। লিখে শেষ করতে আরো তিন-চার মাস লেগে যাবে। বেশিও লাগতে পারে। লিখে শেষ করে পরের চার-পাঁচ মাস ফেলে রাখব। তারপর শুরু করব সম্পাদনা। আমাকে অন্তত চার-পাঁচ বার সম্পাদনা করতে হয়। সম্পাদনা করতে করতে ক্লান্তি বা বিরক্তি না আসা পর্যন্ত আমি সম্পাদনা চালিয়ে যাই।

উপন্যাসটি লিখে শেষ করতে পারলে কয়েকটা গল্প লেখার ইচ্ছে আছে। এছাড়া ইচ্ছে আছে আত্মস্মৃতি মূলক একটি বই লেখার। একজন অধ্যাপকের সঙ্গে আমার সম্পর্কের ইতিবৃত্তকে আমি উপন্যাসের আঙ্গিকে লিখতে চাই। সেই অধ্যাপক আমার সাহিত্যের গুরু ছিলেন। তার কাছ থেকেই আমি মূলত বিশ্বসাহিত্যের পাঠ নিই। স্মৃতিগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ার আগে লিখে ফেলতে চাই।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন