বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারী, ২০১৬

রুমা মোদক'এর গল্প : ফেরদৌসী, আমি এবং আমাদের গল্প

- রুমা মোদক

তৃতীয় মহিলাটি যখন আমার কাছে এলো, তখন আমার মনে হলো সত্যিতো ঘটনাটির পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে এক্ষেত্রেও। প্রকৃতপক্ষে যা ঘটেছে প্রথম মহিলাটির ক্ষেত্রে যাকে আমি আদৌ দেখিনি কোনদিন, আর যা ঘটতে পারে আমার সামনে বসা তৃতীয় মহিলাটির ক্ষেত্রে আর দ্বিতীয় মহিলা আমি কিংবা আমরাই যাকে রক্ষা করেছি ঘটনা ঘটার হাত থেকে, হয়তো এ কথাটি ঠিক হলো না। আমরা রক্ষা করিনি, মূলত মেয়েটিই মেয়েটিকে রক্ষা করেছে। হ্যাঁ নিজেই নিজেকে।


শব্দগুলি চট করে ঘাই মারে মাথায় মাগুর মাছের মতো। আমি ছাই মাখানো হাতে চেপে ধরি, কেননা ভূমিকম্পের প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে যখন ভেঙ্গে চুরে পড়ার কথা, তখন প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলাতে হয় নিজেকে। তার পরের সাপোর্টটুকুতে না হয় আমরা। শব্দগুলো আমি প্রয়োগ করি তৃতীয় মহিলাটির তীব্র সংকটের মুখে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে আমি বোধ করি, প্রথম ঝাঁকুনির ধাক্কাটা সে ইতোমধ্যে কাটিয়ে উঠেছে। তবুও প্রথম মহিলাটির ঘটনাটির পুনরাবৃত্তি রোধের প্রচণ্ড বাসনাকল্পে আমি বলতে থাকি.........., শুনুন এসব বলবেন না, আপনাকে লড়াই করতে হবে। হারলে হবে না। বলি বটে, ভিতরে ভিতরে দ্বন্দ্বে জড়াই নিজের সাথে, একি কপটতা? আমি কী জানি না আমি যা বলছি তা কতটা কঠিন। আমি যা বলছি, তার কতটা আমার আত্মশক্তির জোরে আর কতটা অবস্থানের জোরে? খুব স্পষ্ট করে না জানলেও আমি জানি আমাকে আমার অবস্থান আর তা সংশ্লিষ্ট সংবেদনশীলতা চারপাশ থেকে নিরাপদ চক্রব্যূহ রচনা করে দিয়েছে। যেখানে দাঁড়িয়ে আমি নিশ্চিন্তে নির্ভাবনায় সংকটাপন্ন মহিলাদের আনুষ্ঠানিক সহায়তার বাইরেও জ্ঞানটুকু বিলিয়ে যেতে পারি অবলীলায়।

তৃতীয় মহিলাটি বলতে থাকেন- কিতা করতাম কইন আফা, আমার স্বামীর মরার ফরে তারা এক ফুটা সাহায্য সহায়তা করে না। আমার পুলা দুইডার দিকে ফিরাও ছায় না। ঈদে পাবনে একটা খাপড়ের টুকরা দেয় না। বাজার-সওদা, পুলার জ্বর আইলেও ওষুদটা পর্যন্ত আমার ঐ কিনা লাগে........আর.......। আমি আর-টুকু শুনতে থাকি। গল্পটা খুব অপরিচিত নয়।

নারী নির্যাতন রোধকল্পে যে প্রজেক্টটির চেয়ার পার্সন আমি এই জেলায়, তার মূল অর্থের যোগান দেয় যে সুইডিশ দাতা গোষ্ঠী, আমি তার বার্ষিক প্রতিবেদন সংক্রান্ত ঝকঝকে সুভ্যেনীয়রটি হাতে নিয়ে উল্টে-পাল্টে দেখি। তৃতীয় বিশ্ব- না শব্দটা ওরা লেখে নি। সেই যে ছাত্রজীবনে মাকর্সবাদী বিপ্লবের স্বপ্নে বিভোর করোটিতে শব্দটা ঢুকে পড়েছে, এখন পরিবর্তিত বিশ্বে একাধিপতি রাজত্বে এবং তাও যখন হুমকির মুখে, তখনো অকেজো শব্দটা মাথা থেকে তাড়াতে পারি না। হ্যাঁ গরীব, তারা যাদের আদর করে নাম দিয়েছে “উন্নয়নশীল”, দেশগুলির অসহায় নিপীড়িত নির্যাতিত মহিলাদের জন্য কী যে দরদ ওদের! শ্রমক্লান্ত, ঘর্মাক্ত (ছবি নির্বাচনে যৌনাবেদনটাও বাদ দেয়া হয় না বোধ করি) নারীদের ছবিগুলো সব ঝকঝক করছে।

আমি আলেয়ার দিকে তাকাই। বোরকা পরা মোটামুটি স্মার্ট মেয়ে আলেয়া। চুপচাপ কাঁদছে। আমি মনে মনে বলি-- আলেয়া তোমার এই যে শুরু হওয়া কান্না তা কেবল এক টেবিলে থেকে আরেক টেবিলে, এক বারান্দা থেকে অন্য বারান্দায় নিষ্ফল ঝরবে। আর প্রতিটি বারান্দায়, প্রতিটি টেবিলে ভারী হবে অনাকাঙ্ক্ষিত অশালীন বিশেষণের ঝুড়ি। তবে যা বলছো, যদি ফেরদৌসীর মতো ঝাঁপ দিতে পার রেললাইনের নীচে তবে সুবিচার নিশ্চিত। পরদিনই হাইকোর্ট থেকে রুলনিশি জারি হবে। জড়িতরা পলাতক......., হাজির......., গ্রেফতার......., রিমান্ড......., ব্যস্ত ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া......., প্রিন্টিং মিডিয়া......., তুমি তোমার সন্তান সমেত দখল করে থাকবে সব। তোমার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাবে সুশীল সমাজ, সচেতন নারী সমাজ ইত্যাদি কত কী। আর তা না হলে তোমাকে লড়াই করতে হবে বেশ খানিকটা। বলা যায় না আমরা যখন সাইনবোর্ড নিয়ে দাঁড়িয়েছি তোমার পাশে কিংবা তুমিই এসেছো আমাদের কাছে, পাশে দাঁড় করাতে, তখন হয়তোবা তুমি জিতে যেতেও পারো। কেননা আমাদের সাইনবোর্ডের বেশ শক্তি আছে, শক্তিটা দাতাদেশ থেকে আমদানিকৃত বলেই সমীহযোগ্য। আমরা জানি। কিন্তু এই যে জিতে যাওয়া, এর মানে কী? টিকে যাওয়া? জীবন যাপনে টিকে যাওয়া এই সমাজ বাস্তবতায় আলেয়ার মত অসহায় নারীর টিকে যাবারইবা কী মানে। বুকের ভিতরে আত্মপ্রতারণার শব্দ শুনি। আমি কি জানি না আপাত যুদ্ধে জয়ী হলেও কতটা বন্ধুর হবে তার সমগ্র জীবনের চলার পথটা। কতটা পথ অর্থ দিয়ে, সাইনবোর্ড নিয়ে তার পাশে থাকবে আমার অর্গনাইজেশন? আসলে এ সমস্তই আমার ব্যক্তিগত ভাবনা।

অর্গানাইজেশনের চেয়ারপার্সনের এতো কিছু ভাবার সময় ও প্রয়োজন কোনটাই নেই। ফেরদৌসীর মত আমারও রেললাইনের নীচে ঝাঁফ দেওন লাগব গো আফা-- আপাতত মেয়েটিকে বাঁচাতে হবে এই সংকট থেকে। রক্ষা করতে হবে ঝাঁপ দেয়া থেকে। যেহেতু সে এসেছে আমাদের কাছ পর্যন্ত। আলেয়ার কান্না শুনতে শুনতে আমাদের কাছে আসা এমন শতশত অভিজ্ঞতা আমার চোখের সামনে দিয়ে হেঁটে যায় সারি বেধে খাবার অন্বেষনে ছোটা পিঁপড়াদের মতো। চেয়ারপার্সন হিসেবে সবগুলোতে আমি জড়াইনা।

আজাদ, যখন তার সাথে আমার গভীর প্রণয়, একবেলা দেখা না হলে নাওয়া খাওয়া হারাম হয়ে যেত, তখন আমার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী শারমীনের সমস্যা সমাধান করতে উঠেপড়ে লেগে গেলে সে আমাকে বলেছিল আমি নাকি সবকিছুতে ইমোশনালি ইনভলবড হয়ে পড়ি। অন্যের সমস্যাকে নিজের সমস্যা মনে করি। অর্গানাইজেশনের চেয়ারে বসে রুটিনবাধা দায়িত্ব পালনে প্রথম প্রথম তাই হতো......., আমার আজাদের কথা মনে পড়তো।

আজাদের সাথে আমার শেয়ারিংটা খুব ভাল ছিল। ওর বউ নাকি এখন ওকে খোঁচা দেয় সখ-আল্লাদ সবতো আগেই শেষ করে এসেছো। আসলে ইমোশনালি নিজে ইনভলবড হওয়া মানে ভীষণ ঝক্কি। সমস্যা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আর কোনকিছুতে মনোনিবেশ করতে পারি না। তাই বেশির ভাগ সমস্যা এখন আর নিজে ঘাটি না। কিন্তু ফেরদৌসীর ঘটনাটা আমার এলাকায় ঘটে যাওয়ার পর আমি একটু নড়েচড়ে বসেছি।

বিখ্যাত লেখক হুমায়ুন আহমেদ মহোদয় কোলন ক্যান্সারের চিকিৎসায় যুক্তরাষ্ট্র যাবার আগে একটা লেখা রেখে গেছেন, দৈনিক পত্রিকায় সেটি ছাপা হয়েছে “মাইন্ড গেম”। তিনি লিখেছেন স্বামীকে শাস্তি দেয়ার জন্য নাকি মায়েরা সন্তানসহ আত্মহত্যা করে। হুমায়ুন আহমেদ লক্ষ পাঠকের হৃদয়মন দখল করে রাজাসনে বসে আছেন, আর একজন মা নারীর মনস্তত্ত্বের এতো সহজ ব্যাখ্যা দিলেন! আসলে কি পুরুষ, সে লেখক হোক কিংবা মানুষ কিংবা অমানুষ, সে উপলব্ধি করতে অক্ষম কি যাতনায় নারী সন্তানসহ ঝাঁপিয়ে পড়ে রেলগাড়ির নীচে। একি কেবলই কোন পুরুষ, সভ্যতা যার ঔরসের অধিকারের নাম দিয়েছে ‘পিতৃত্ব’ তাকে শাস্তি দেয়ার জন্য?

মাহবুবের সাথে আমার যখন ছাড়াছাড়ি হয়। কিংবা হঠাৎ অসময়ে ট্যুর থেকে ফিরে মাহবুব আর আয়েশাকে এক বিছানায় পেয়ে আমি যখন মাহবুবকে ছেড়ে আসার সিদ্ধান্ত নেই, তখন মাহবুব জানেই না অনুসূয়া স্কুলে যাবার আগে কি খায়, কতটা খায় কিংবা রাতে কোন গল্প শুনে গভীর ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে যেতে থাকে অথবা বাংলা বর্ণমালা কোন পর্যন্ত লিখতে পারে সে, ইংরেজি ক্যাপিটাল লেটারই কতটা বা স্মল লেটার কতটা.....। অনুসূয়া কার কাছে থাকবে প্রশ্নটা উঠায়নি মাহবুব। অবশ্য ভাবখানা ছিল এমন যে নিজের অক্ষমতা নয়, আমাকে করুণা। কিন্তু দায়িত্ব থেকে গা বেঁচে যাওয়ার স্বাস্তিটা চোখেমুখে লেগেছিল।

হুমায়ূন আহমেদের লেখাটি পড়ে নিজের কথা ভাবছিলাম- আমি যদি স্ব-ইচ্ছায় নিজেকে হত্যা করি অনুসূয়াকে কোথায় রেখে যেতে পারি? কার কাছে? একটা দুর্বিষহ অনিশ্চিত জীবনে ওকে ফেলে রেখে স্বার্থপরের মতো নিজে মরে বেঁচে যাওয়ার কথা তো আমি কল্পনাও করতে পারি না। আমি বাঁচি কিংবা মরি আমি ছাড়া পৃথিবীতে আর একটাও নিরাপদ আশ্রয় আছে ওর? মাহবুব, জৈবিক ভাবে তার শুক্রানু নিষিক্ত করেছে বটে আমার ডিম্বানু, পিতৃত্ব কি অর্জন করতে পেরেছে সে? প্রকৃতিই তাকে সে ‘দায়’ দেয়নি। দুর ছাই! এসব কী ভাবছি? একলা লড়াই এর প্রাথমিক ঝাঁকুনিটা আমি মোকাবেলা করে এসেছি, তবুও এখন মাঝে মাঝে মনে হয় মাহবুবকে কেন ছেড়ে এলাম। আয়েশার সাথে শুয়েছে। সুশ্রী, যুবতী, স্বামী পরিত্যক্ত খালাতো বোন, আমার পরিবারে যার মর্যাদাটা ঠিক মেইড সার্ভেন্টের ছিল না। রক্ত মাংসের মানুষের লোভ হতেই পারে। পাঁচ বছর ধরে বাসায় আছে, আয়েশার সাথে শুয়েছে। কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়েছে তাতে? যদি হঠাৎ ট্যুর থেকে ফিরে না দেখে ফেলতাম কিংবা এটা কি প্রথম? আমি কি জানি তা? ঘটনাটা উল্টে পাল্টে দেখি, আসলে ও বড় বেশি সততা দেখাতো আমার কাছে। মাঝে মাঝেই কথা উঠাতো আমার অতীত নিয়ে...... ও শুনেছে বিয়ের আগে আমি এ্যাবার্ট করেছি। আজাদের বাচ্চা। আমি মনে মনে হাসি! আজাদ! সে সাহসই ছিল না তার। আমারও ছিল না অবশ্য। সো-কলড মিডলক্লাস সেন্টিমেন্ট, বিয়ের আগে সেক্স...... নৈব নৈবচ। ভয়ও ছিল অবশ্য। জ্ঞান ছিল অপর্যাপ্ত। একদিন ওর রুম থেকে টুম্পা আর রাকিব বের হয়ে যাওয়ার পর বালিশের নীচ থেকে ব্যবহৃত কনডম আবিস্কার করে আজাদ বলেছিল- দেখলে আমরাই নিজেদের বঞ্চিত করছি। আমি উত্তর দিয়েছিলাম। ঠিক আছে বঞ্চিত করো না...... সেদিন সাহসী ছিলাম আমি। কিন্তু তবুও আজাদ ঠোঁট ছেড়ে বুক, এর নীচে আর নামতে পারেনি। পরে বলছিল আসলে কণ্ট্রাসেপটিভ নেই কিনা। আরে বাবা তীব্র আবেগের মোহে কেউ কণ্ট্রাসেপটিভ এর কথা মাথায় রাখে? অবশ্য সম্পর্কটা ভেঙ্গে যাবার পর আজাদ বুক ফুলিয়ে বলে বেড়িয়েছে ওর সাথে নাকি আমার কাবিন ছাড়া সব সম্পর্ক ছিল। দশ বছরের সম্পর্ক, হতেই পারতো। কিন্তু হয়নি। কিন্তু তবুও আজাদ কেন কথাটা বলে বেড়িয়েছে আমি বুঝতে পারি। ও প্রমাণ করতে চাচ্ছিল ও ঠকেনি, ঠকিয়েছে। আহা রে! আমার করুণা হয়! ঠকানোতেই বীরত্ব!! মাহবুব সব শুনেছে। ও মনে মনে খুব মহৎ কাজ করেছে, আমাকে বিয়ে করে উদ্ধার করেছে.......। এখন নিহত ফেরদৌসী, রোজিনা আমার সামনে বসে থাকা আলেয়া ওদের দেখতে দেখতে ওদের আয়নায় নিজেকে দেখতে পাই আমি।

ফেরদৌসী আমাদের কাছ পর্যন্ত আসতে পারেনি। ও হয়তো এই শাক্তিশালী সাইনবোর্ডটি কোনদিন দেখেনি, হয়তো জানতোও না। আমাদের নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সংক্রান্ত প্রজেক্টটির কর্মকাণ্ডের উচ্ছ্বাসিত জোয়ারের ধাক্কা লাগেনি শাহপুর গ্রাম পর্যন্ত। সালিশে ফেরদৌসী পরকীয়ার কারণে দোষী সাব্যস্থ হয়েছিল। রোজিনাও হয়েছিল। শহরতলীতে বাস করার কারণে রোজিনা দেখেছিল কিংবা জেনেছিল সহায়তার এই প্রজেক্টের জোয়ারের কথা। ও যেদিন এলো আমার কাছে, সেদিনও আমি আমার চেয়ারের দায়িত্ব ভুলে ইমোশনালি ইনভলবড হয়ে গেলাম। উত্তেজিত হলাম, তীব্র গালি-গালাজ করলাম ইমাম সাহেব আর রোজিনার জন্য তার ভাড়া করে আনা স্বামীকে। পারি তো তখনই পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে আনি। কিন্তু চেয়ারটার কথা মনে পড়ল তখন, যখন রোজিনা বললো সালিশে তাকে উপস্থিত থাকতেই হবে। নইলে গাঁয়ের মানুষ তাকে একঘরে করবে। তাইতো.....। ইমোশনালি ইনভলবড হয়ে আমারতো বাস্তবতা ভুলে গেলে চলবে না। অর্গানাইজেশনের নিয়ম আর বুদ্ধির সমন্বয়ে বিষয়টা বিবেচনা করতে হবে। রোজিনা আমার বাসায় আদা দেয়া লাল চায়ের কাপটাতে চুমুক দিতে না দিতেই ওর সেল ফোনটা বেজে উঠলো..... আফা নাজিম মিয়ার ফোন। শুনবাইন কিতা কয়? স্পীকার অন করল রোজিনা।

- কীতা ব্যাফার আইলায় না?

- চাচা অত রাইত? কেমনে আইতাম চাচা? শুনলাম চাচীও বাসাত না। দরখারটা কিতা ফোনেই কইন না।

- চাচী বাসাত নাই তে কিতা অইছে? শোন না অইলে কিন্তুক বিচার পাইতায় না। শোন তুমি অখন কই।

- চাচা আমি একটুখান বাইরে।

- আইচ্ছা রাখি।

রোজিনা অবাক হয়না, যতটা আমি হই। রোজিনা একটা মেরিগোল্ড বিস্কুট হাতে নির্বিকার,

- আফা আফনে খাইতাইন না?

- তুমি খাও। আমি এই তুমি আসার আগে মাত্র খেলাম, কি বলে লোকটা? আমি মূল প্রসঙ্গে ফিরে যেতে চেষ্টা করি।

- চিনচইন নি আফা? রহমতফুর গেরামের মুরুব্বী। বয়স বেশি না, পার্টির জোর।

- কি বলে তোমাকে?

- দেখঐননা, বউ নাই বাসাত, আমারে কয় খালি বাসাত যাইতাম এই সইন্ধ্যা বেলা।

সালিশের রায় সংক্রান্ত আগাম বাস্তবতাটা আমি রোজিনার সামনে তুলে ধরি। অর্গানাইজেশনের সেকেন্ড ম্যান- অসিত কুমার ও আমার সাথে থাকেন। আমরা ওকে বলি, ভরা মজলিশে তোমার ছরিত্র হনন করা হবে, দ্রৌপদীর কাপড় খুলে নেয়ার মতো। কোন কৃষ্ণ দাঁড়াবে না তোমাকে রক্ষা করার জন্য। নিজের সম্পর্কে অশ্লীল নোংরা কথাগুলি শোনার জন্য তুমি কেন যাবে সালিশে? সহ্য করতে পারবে? যেও না।

- না আফা যাওন লাগব। নাইলে গেরামের মুরুব্বীরা আব্বারে অফমান করব। ওর কণ্ঠে আত্মপ্রত্যয়। প্রথম দিনের নাকি কান্না আর নেই। রেজিনা সব বুঝে শোনে সালিশে গিয়েছিল। ওর পিছনে আমরা আমাদের অর্গানাইজেশনের শক্তিশালী সাইনবোর্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, সালিশকারীরা জানতো না।

কিন্তু ফেরদৌসী সালিশে যেতে বাধ্য হয়েছিল। বিদেশ থেকে স্বামী টাকা পাঠায় ঠিক। কিন্তু এই অজপাড়াগায় কে নিত্য বাজার করে দেয়। রাত বিরাতে ওষুধ এনে দেয় বাচ্চাদের? কে ওকে সাদরে নিয়ে যায় গাইনি ডাক্তার দেখাতে? দিনমজুর থেকে মধ্যপ্রাচ্য। স্বামীর “টাকা” হঠাৎ “রিয়াল” হয়ে গেছে। শুটকি সালুন থেকে হঠাৎ বোয়াল-মাগুর.......। ভাসুর-জা, পাড়া পড়শীর চোখ টাটায়। তাদের রাজমিস্ত্রীর জীবন ফুরায় না। নিত্য তরকারি জুটেনা। কত মরিচ পোড়া, লবণ? যাকাত ছাড়া নতুন কাপড়ের চেহারা দেখা হয় না তাদের। আর কি না ফেরদৌসী সদরে যায় রবিউল্লার সাথে বাচ্চাদের জন্য নতুন জামা কিনতে? যদিও ভাসুরের বাচ্চাদের জন্য দু’একটা আসে, মাঝে মাঝে আসে বাটিতে করে দু’এক টুকরা বোয়াল-মাগুরও। তবুও এ দয়া অসহ্য লাগে ওদের।

রবিউল্লাকে নিরাপদ লাগতো ফেরদৌসীর। বয়সেও বেশ ছোট, একটু বোকা সোকা। তার সাথে উঠা বসায় কেউ সন্দেহ করবে না। যে কোন দরকারে যখন তখন একজন পুরুষ মানুষকে তো ডাকা লাগেই। শরীরী ভাষার কোন ছোট বড় নেই ফেরদৌসী হয়তো তলিয়ে ভাবেনি কিংবা ভাবার অবকাশ ছিল না। কেননা শরীরী সম্পর্কে জড়ানোর আগ্রহ নিয়ে তো আর সে রবিউল্লাকে ডাকেনি। তলপেটে অসহ্য ব্যাথা, মাসিক হয়েছে মাস পার হতে চলেছে থামার লক্ষণ নেই, রবিউল্লাকে নিয়ে গিয়েছিল সদরের হাসপাতালে। ঘণ্টাখানেক সিরিয়াল কেটে বসে থাকার পর ডাক্তারনীর দেখা পেয়েছিল, আর ডাক্তারনী সঙ্গে সঙ্গে পাঠিয়েছিল আল্ট্রাসাউন্ডের রুমে। ফেরদৌসী জানে না কার আড় চোখ টাটিয়েছিল রবিউল্লার সাথে ওকে দেখে হাসপাতালের বারান্দায়। সেদিন ভর সন্ধ্যায় ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিল তার ভাসুর কর্মক্লান্ত, ঘর্মাক্ত।

- রবিউল্লার সাথে সদরে গেছিলা? হাসপাতালে?

- হ! ডাক্তার দেখাইতাম

- ডাক্তার দেখাইতায় তে রবিউল্লার লগে কেরে? আমরা আছলাম না?

ফেরদৌসী নিরুত্তর থাকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশ্বাস পায় ডালের কাক যেমন ঠিক আগেই তেমনই এক দুর্যোগের ছায়া টের পায় ফেরদৌসী ভাসুরের বক্তব্যে।

- কতা কওনা কেরে? আমরা কেউ আছলাম না?

কও পেট খালাস করতে গেছলা।

- ইতা কিতা কইন ভাইছাব?

- কিতা কই, কিতা কই, কাইল ঐ বুজমুনে। চেয়ারম্যান ছাব সালিশ ডাকছে।

ভাসুর ফিরে যায় বিড়বিড় করতে করতে দুবাই এর টেকার গরম। দেখমুনে যায় কই। ফেরদৌসী জানে না, চেয়ারম্যান সাব কিভাবে জানলো ও সদরে গিয়েছিল ডাক্তার দেখাতে। কে জানালো?

ফেরদৌসী জানলো সালিশে গিয়ে কি তার অপরাধ।

রোজিনা আগেই জানতো।



সালিশ-১

হল ঘরটা তত বড় নয় যত মানুষ জমায়েত হয়েছে। আসলে শহরতলীতে এ ধরনের সালিশ বৈঠক খুব একটা হয় না। সবাই থানা পুলিশ করে। মেয়েটা নেহায়েত গরীব আর প্রতিপক্ষ এলাকার ইমাম সাহেব বলে কথা। নাজিম মিয়া তাই স্বউদ্যোগে লোকজন খবর দিয়েছিল। প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে কথা শুরু করেন এলাকার বিশিষ্ট মুরুব্বী নাজিম মিয়া, বয়স চল্লিশ এর আশেপাশে, চুলে সবে পাক ধরেছে। অনেকদিন পর সালিশে বসেছেন তিনি।

- কও কওগো রোজিনা বেটি তোমায় কিতা কইবার আছে। হকলের সামনে খুইল্লা কও।

- ইমাম ছাব আমার ছোড ভাইডিরে আরবী পড়াইবার আইতেন। আমার আব্বা গরীব। চায়ের টং দোকান। আমি মেট্রিক ফেইল।

- কথা সংক্ষেপ কর।

- ইমাম ছাব আমারে কইলাইন একটা চাকরি দিবাইন। এক লাখ টেকা লাগব। আমি আশার থাইক্কা ঋণ লইয়া ২৫ হাজার টাকা নগদ দিছি আর বাকী..........

- তোমারে নু কইলাম কতা সংক্ষেপ করতায়

- সংক্ষেপেই তো কইতাছি ছাছা

- আরে আবার মুখে মুখে মাতে

মূহুর্তে সালিশের পরিবেশ বদলে যায়। নাজিম মিয়ার রুক্ষ ধমকে। কেউ কেউ ভড়কে যায়। যারা জানে নাজিম মিয়ার পার্টির জোর কতটা। রোজিনা ভড়কায় না। বলতে থাকে........ কেননা তাকে ভড়কে গেলে চলবে না।

- বাকী ২৫ হাজার টাকা আনছি সোনা বন্ধক দিয়া

- আরে ধান ভাঙতে গিয়া শিবের গীত গাইতাছ কেরে। ইমাম ছাবরে টাকা দিছ কোনু প্রমাণ আছে? বিয়া কেমনে অইল এইটা কও।

- টেকাডা ইমাম ছাবরে আমি দিলাম। চাকরি অইল না। খালি ঘুরায়। আমি কইলাম চাকরি লাগত না। টেকা ফিরত দেইন।

- এই মাইয়া অততা বেশি মাততাছ কেরে। বিয়া কেমন অইল ইটা কও।

- ইমাম ছাবে কইল, তোমারে চাকরি যখন দিতে পারলাম না একটা বিয়া দিয়া দেই। বালা একটা পুলা আছে আমার হাত।

- তোমারে কইল একটা বিয়া দিয়া দেই আর তুমি রাজি অইয়া গেলায় নি?

- না আব্বার সাথে আলাপ করছে, পুলার বাপরে আনছে কতা কইবার লাগইগা, আব্বা রাজী হইছইন।

- তার ফরে কিতা অইল? কাবিন উবিন আছে নি?

- জী আছে।

- দেখাওছেন।

যে কাগজখানা রোজিনা বের করে সযত্নে রক্ষিত তার পার্সব্যাগ থেকে তা একখানা মামুলি সাদা কাগজ। ২ লক্ষ টাকা দেন মোহরে বিয়ে, আর বর কনে ইমাম তিনজনের স্বাক্ষর। মুরুব্বী নাজিম, মিয়া ছোঁ মেরে নেন কাগজখানা রোজিনার হাত থেকে, তুলে ধরেন ভরা মজলিশে। কইন আফনেরা কইন ইটা কোনু বিয়ার কাবিন?

সকলে সমস্বরে বলে- না। এইবার নাজিম মিয়ার রাগ চড়ে সপ্তমে, চোখ থেকে ঝরে আগুন- ঐ মাইয়া ইডা কই ফাইছস? রোজিনা আবারও ভড়কায় না, নাইলনের দড়ি নিয়ে চলতা গাছে ঝুলতে গিয়েছিল, সেখান থেকে ফিরেছে সে। নাজিম মিয়ার চোখ রাঙানিতে ভড়কালে তার চলবে না। উত্তর দেয় সঙ্গে সঙ্গে-

-আমি বানাইছি না। ইমাম ছাবে....... কথা শেষ হয় না রোজিনার, ধমকে উঠে নাজিম মিয়া।

-ঐ কুলটা মাইয়া মানুষ। আবার মুখে মুখে মাতছ। ইমাম ছাব টেকা নিছে, তরে মিছা কাবিন দিয়া বিয়া দিছে। তখন থিক্কা ইমাম ছাবের দোষ দিয়া অই যাইতাস। কত্ত বড় সাহস তর।

এইবার মুরুব্বী উঠে দাঁড়ায়- তরে বেশী কইবার সুযোগ দিছি। চুপ কর মাগী। অবলীলায় আদি শব্দ নির্গত হয় নাজিম মিয়ার মুখে।

- আপনেরা ইখানে যারা আছঐন, তারার ধার এই মাইয়াডা সম্বন্ধে নতুন কইরা কইবার কিসসু নাই। আপনেরা হক্কলে নিজ চোক্ষে দেখলাইন, কাবিন ভুয়া, টাকা নিবার কোন প্রমাণ নাই। এই মাইয়া নষ্টা, চরিতত্রহীনা, কুলটা। এই মাইয়ার লাইগ্যা পুরা এলাকার পরিবেশ খারাপ অইতাছে। অনেক আগে আমরা নালিশ পাইছলাম তখন যদি ব্যবস্থা নিতাম আজ পাক পবিত্র ইমাম ছাবের নামে অতবড় মিছা কতা কইবার সুযোগ এই মাইয়া ফায়না। ইখানে মাইয়ার বাফও আছে। দাঁড়াও বা রমজান মিয়া। নিরীহ চা বিক্রেতা রমজান মিয়া, মেয়ের অপমানে চোখের জল বাধা মানে না। সারাজীবন কেবল অপমান আর হয়রানি। আজও উঠে দাঁড়ায় নীরবে সকল অপমান হজম করে নেবার প্রস্তুতিতে।

- কিতা মিয়া হাছা কইরা কও তোমার মাইয়ার কাছে রাইত দিন নানা রকম মাইনষের ভীড় না?

- জ্বী

- মিনমিন কইর না। হাছা কতা কও।

- টেইলারি করে, মানুষ কাম লইয়া আয়।

- মিছা কতা কও।

- আমি মিছা কতা কই না...... কছম।

- চুফ, চুফ...... আবার ধমকে উঠেন নাজিম মিয়া। তাইলে কিতা দাঁড়াইল। ইমাম ছাব নির্দোষ। ইমাম ছাবের সম্মান হানির লাইগ্যা এই নষ্টা মাইয়া মানুষটারে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা অইল আর সাবধান করিয়া দেয়া অইল। ভবিষ্যতে এলাকার পরিবেশ খারাপ করলে আমরা অইন্য ব্যবস্থা নিতে বাইদ্য অমু।

মুরুব্বী নাজিম মিয়ার রায় পড়া শেষ হলে রোজিনা উঠে দাঁড়ায় দৃপ্ত ভঙ্গিতে-ই বিচার আমি মানি না। যেন ঠাস করে চড় পড়ে সমাগত সালিশকারীদের গালে। সবই তাজ্জব বনে যায়। এতো সাহস মেয়ে পায় কই।

আসলে রোজিনাকে সালিশে যাবার আগে এই সাহসটুকু দিয়েছি আমরা। সালিশের রায়টা আগাম বলে দিয়ে বলেছি বিচার না মানতে। বাকীটা আমরা মানে আমাদের অর্গানাইজেশান দেখবে। রোজিনা হয়তোবা ‘মানিনা’ কবালার জোরটুকু পেল আমাদের কাছ থেকেই। কিন্তু ভরা মজলিশে এতোগুলো অশ্লীল শব্দ সহ্য করার জোরটুকু ওর নিজের।

কিন্তু ফেরদৌসীকে এই জোরটুকু দেয়ার সুযোগ আমাদের হয়নি। সালিশের অশ্লীল শব্দের তীক্ষ্ম অনল বানগুলো বুক পেতে নেবার মনের জোরটুকু ওর ছিল না। সালিশে ওকে আক্রমণের ভাষাটা ছিল আরো তীব্র....।



সালিশ-২

সদরের হাসপাতালে গেলায় কেরে?

এশার নামাজের পর সদ্য ভোটে পাশ করা ইউপি চেয়ারম্যান এর উঠানের উত্তর দক্ষিণে বাধা বাঁশের খুটিতে জ্বলে উঠে দু’খানা এক’শ পাওয়ারের ফিলিপ্স বাল্প। প্লাস্টিকের চেয়ারগুলো সাজানো থরে থরে। একজন দু’জন করে ভরে যায় পুরো উঠান, চেয়ারে জায়গা না পেয়ে ভীড় করে দাঁড়ায় কেউ কেউ পেছনে। গাছের ডালে বাদুড়ের পাখা ঝাপটানোর শব্দ, অনেক দূরে ডাকে ঝিঁঝিঁ পোকা আর নতুন বর্ষার ব্যাঙ। সালিশ শুরু হয়, চেয়ারম্যানের ডাকে মানুষ কম হয়নি। সদ্য সমাপ্ত ভোটের জটলার নেশা এখনো যায়নি তাদের অভ্যাস থেকে। ফেরদৌসীর তলপেট তখনো টনটন করছে। উরুসন্ধি বেয়ে নামছে অশ্রান্ত রক্তের স্রোত, বাধভাঙ্গা জোয়ারের মত। পুরনো কাপড়ের বাঁধনে বাধা মানে না। ডাক্তারনী যা বলেছে তা সে কেমনে বলে এই ভরা মজলিশে কয়েকশ মানুষ পুরো উঠান জুড়ে, ঘরের ভিতরে আড়ালে আবডালে মহিলারা। অর্ধভুক্ত অভুক্ত শিশুগুলো ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে তবু বসে থাকে, উঠানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ফেরদৌসীর দিকে তাকিয়ে। এমন সার্কাস তারা দেখেনি কোনদিন। ফেরদৌসীর নিজের বাচ্চাগুলো উঠোনের এক কোণে ঘুম ঢুলু ঢুলু চোখে জড়সড়, বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে তাদের মায়ের। ফেরদৌসীর বুক ধড়াস ধড়াস, জানটা যেন কানের কাছে লাফাচ্ছে, কান দিয়ে বের হচ্ছে গরম বাতাস....., চেয়ারম্যান ধমক দেয়

- কও না কেরে। গেলায় কেরে?

- জ্বী, আমার সমইস্যা। ডাক্তারনীরে দেখাইতে গেছলাম।

- সমইস্যাডা কিতা হক্কলের সামনে খুইল্লা কও।

ফেরদৌসী টের পায় পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা প্রস্তর খন্ডের মত একটা বড় রক্তের চাকা নেমে আসে ওর তলপেটে ভেঙে.....। ও দাঁড়াতে পারছে না। ডাক্তারনী বলেছে বিশ্রাম নিতে।

- কওনা কেরে? কিতা সমইস্যা তোমার?

নিরুত্তর থাকে ফেরদৌসী। মজলিশ কাঁপিয়ে ধমক দেয় চেয়ারম্যান

-কওনা কেরে?

-কওন যাইত না। ফেরদৌসীর অষ্পষ্ট জবাব।

-অ, তাইলে যেতা শুনছি ইতাঐ ঠিক। পেড খালাস করতে গেছলায়। কুলটা মাইয়া মানুষ। ঐ কার বাইচ্ছা।

ফেরদৌসী মনে মনে পড়তে থাকে ছোটবেলায় মৌলভী সাবের কাছে শিখা কোরান শরীফের সব সুরা-আয়াত। অর্থ জানে না সে। কেউ দাঁড়ায় না তার পক্ষ নিয়ে। এক আল্লাহ দাঁড়াবে- বিশ্বাস তার।

চেয়ারম্যান ছাব ঐ ঘরে রবিউল্লা ছাড়া আর কেউ যায় না- ফেরদৌসীর ভাসুর সালিশের কাজে বড় উপকার করেন নামটা নির্দিষ্ট করে দিয়ে। চেয়ারম্যান ক্রুদ্ধ স্বরে ডাকেন

-এই রবিউল্ল্যা, রবিউল্ল্যা কই?

-রবিউল্ল্যা উঠে দাঁড়ায়। নত মাথা। চোখ মাটির দিকে।

-ফেরদৌসীর পেডের বাইচ্চাটা তোমার আছিল?

রবিউল্ল্যা নাইজুবিল্লা পড়ে- বড় বইনের মতন দেখি।

-বড় বইন মারাইওনা। সামনে আস। আফনেরা কইন কিতা বিছার অইতে পারে এর।

ভরা মজলিশ নিরুত্তর। রবিউল্ল্যা দাঁড়িয়ে থাকে ফেরদৌসীর পিছনে। কয়েকশ চোখের কেন্দ্রে।

এ্যাই হাত জোর কইরা, নাকে খত দিয়া মাফ ছা হক্কলের কাছে। চেয়ারম্যান বলতে থাকে- আসলে রবিউল্ল্যা পুরুষ মানুষ। এর দোষ কিতা। এরে ডাকলে এ যাইত না? কয়বার না করব? এরে আফনেরা মাফ কইরা দেইন। কি দিলেন ত? সমন্বিত সালিশীরা রাজী হয় পুরুষ মানুষ রবিউল্ল্যাকে ক্ষমা করে দিতে। এবার শুরু হয় ফেরদৌসীর বিচার।

- কি অইতে ফারে? অই বদমাইশ মাইয়া মাইনষের বিচার? চেয়ারম্যান প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেয় বটে। উন্মুক্ত সালিশে। কিন্তু সিদ্ধান্তটা তার আগেরই নেয়া। আগের রাতে ফেরদৌসীর ভাসুর যখন দৈনন্দিন বৈঠকের পর, উঠানের এককোণায় মলিন পাঁচশ টাকার নোট খানা হাতে গুঁজে দিয়েছিল- চেয়ারম্যান ছাব পান বিড়ি খাইঐন।

তখনই বিচারের রায়টা চূড়ান্ত হয় হয়তোবা, কিঙবা আরও আগে, মেয়ে মানুষের হাতে হাজার হাজার টাকা, যখন ভোটের প্রার্থী হিসাবে ভোট চাইতে গিয়ে জেনেছিল এবং ফেরদৌসীর ভাসুরকে আশ্বাস দিয়েছিল পাশ করলে ব্যাপারটা দেখবে, সিদ্ধান্তটা তখনই নেয়া হোক, পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চেয়ারম্যান বলতে শুরু করে।

- এই মাইয়া মানুষ নষ্টা কুলটা, দেহ ব্যবসায়ী। হারামজাদী, বেশ্যা মাগীর জামাই থাকে বিদেশ, টেকা পাডায়। আর তাই বইয়া বইয়া মওজ করে। গেরামের জোয়ান পোলাডির মাতা চাবাইয়া খাইতাছে। ঐ মাগীর মাফ নাই। কিতা অইতে ফারে ঐ বেডির শাস্তি?

নাউজুবিল্লাহ নাউজুবিল্লাহ........ অবৈধ সন্তান পেডে ধরেছে।

ফেরদৌসীর কানে কেউ যদি ঢালতো গরম সীসা..... সেই কোনকালে যখন সীসা ঢালা হতো শুদ্রদের কানে যেন অপৌরুষের বেদবাক্য তাদের কানে পৌঁছে উন্মেষ না ঘটায় তাদের জ্ঞানচক্ষু। আজ ফেরদৌসী এই জঘন্য অশ্লীল নোংরা আক্রমণ থেকে বাঁচাতে চায় নিজের শ্রবনেন্দ্রিয় তপ্ত সীসায় - কিন্তু পারে না।

........আইজকা থিকা এ বেডী এক ঘইরা। কেউ ঐ বেডীর ঘরে যাইত না। ঐ বেডীরে কেউর ঘরে ঢুকতে দেওয়া যাইত না। জামাইরে জানাও বেডীর কু-কীর্তির কথা।

না, ফেরদৌসী বলেনি, বলতে পারনি এ বিচার সে মানে না। সেই জোর সে পায় কই? চারপাশে সমবেত পুরুষ-নারীদের অব্যক্ত ভাষা পড়তে পারে সে। ঘরের সতী সাধ্বি বউ আর আর মহিলারা সব ছি...ছি... করে- তলে তলে ইতানি বেডি? ওদের নাকের নোলক দুলে উঠে গর্বে- কত বিশ্বস্ত ওরা স্বামীর প্রতি !! পুরুষদের চোখে লালসা- আমরা কিতা দুষ করলাম। রবিউল্ল্যার দিকে তাকায় ঈর্ষার চোখে। ফেরদৌসী প্রস্তুত ছিল না মোটেই। ব্যথায় টনটন করা তলপেট নিয়ে দাঁড়াতে পারছিল না ও। ফেরদৌসী জানতো না ওর আত্মরক্ষার ঢাল হয়ে দাঁড়াতে পারতাম আমরা।


কিন্তু রোজিনা জানতো। আর জানতো বলেই পরদিন ওর পক্ষে অর্গানাইজেশন থেকে আমরা চলে যাই সরাসরি এসপি মহোদয়ের কাছে। ঘন দুধের চা আর টিপস বিস্কুট খেতে খেতে আমরা হারিয়ে যাই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের তুমুল আড্ডায়। এসপি মহোদয় আর আমি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, যদিও তখন কেউ কাউকে চিনতাম না, তবু এই মফস্বলে কেমন আত্মার আত্মীয় হয়ে যাই দু’জন। এক ফাঁকে এসপি মহোদয় ফোন করে দেন ওসিকে। ব্যবস্থা হিসেবে পরদিনই গ্রেফতার হয় রোজিনার স্বামী আর ইমাম। আর তার পরদিনই অর্গানাইজেশনে এর কাঠের দরজায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে গ্রামের চেয়ারম্যান, মেম্বার, প্রতারক স্বামীর বাপ-মা যারা একদিন দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিল রোজিনাকে। আজ তারা সব মানতে রাজি। রোজিনাকে ঘরে তুলে নেবে বউ এর মর্যাদায়......, রোজিনা যা চায় তাই হবে। আমরা আবার বৈঠকে বসি। রোজিনা জানায় ও সংসার চায়। আমরা ওকে বুঝাই

- তোমাকে ওরা কোনদিন বউ এর মর্যাদা দেবে না। ওর আগের বউ বাচ্চা আছে। তারপর তুমি জেল খাটাচ্ছ।

- তাইলে কিতা করতাম?

- তোমাকে কাবিনের টাকাটা উদ্ধার করে দেই। তোমার কাজে লাগবে। রোজিনা রাজি হয়। নারী ও শিশু অপরাধ দমন কোর্টের জজের সামনে রোজিনার হাতে হস্তান্তর য় দুইলক্ষ টাকার চেক। কোর্টের বারান্দায় রোজিনা আমার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে-আফা চলইন কিসসু খাই। রোজিনা চোখের পানি মুছে। আমিও মুছি। ঐ যে ইমোশনাল ইনভলবমেন্ট-দূর পাগলী, টাকাটা কাজে লাগাও। হ আফা দুইডা মেশিন কিননা দুগান ডা বড় করমু। রোজিনা আমাকে আশ্বস্ত করে।

ভরা মজলিশ থেকে বের হয়ে ফেরদৌসী চোখের জল ফেরেছিল কি না আমি জানি না। পরদিন যে চার সন্তান নিয়ে রেলগাড়ির নীচে ঝাঁপিয়ে পড়বে বলে মনস্থির করে, সে কি রাতে চোখের পানি ফেলে? কি ভাবনা খেলা করে তার মস্তিষ্কে? হৃদয়ে? আমি জানি না। আমি জানিনা কতটা ধিক্কার জন্মেছিল তার নারী জন্মের প্রতি- জীবনের প্রতি কি বিপুল ঘৃণা!!

আলেয়া আমার সামনে বসে কাঁদতেই থাকে- কিতা করতাম আফা? মরতামনি ফেরদৌসীর মতন? দায়িত্ব পালনের অজুহাতে কাল ওর শশুড় বাড়ির লোকেরা ওর এক বন্ধুকে পিটিয়েছে। বাড়ির বিধবা বউ এর প্রতি দায়িত্ব। এই বন্ধুটি তার বাজার করে দেয়, বাচ্চাদের নিয়ে বেড়াতে যায়, ওষুধ বিষুধও কিনে দেয়, আর ফাঁক পেলে এসে বসে চা খায়। আলেয়া বলতে থাকে- বিশ্বাস করঐন আফা। ওর সাথে আমার কোন অবৈধ সম্পর্ক নাই। কত্ত দরখারে একজন পুরুষ মানুষ লাগে। তারা তো কোনু খুঁজ নেয় না।

আবারও আমি ইমোশনাল ইনভলবমেন্টকে এড়াতে পারি না। ধমক দেই ওকে-চোখে মুছ। ভাবতে থাকি অবৈধ সম্পর্ক নিয়ে। সম্পর্ক কেমন হলে তবে তাকে অবৈধ বলে? সম্পর্ক তো সম্পর্কই। কথাগুলো ওকে বলা না বলা সমান। তবু বলি-চল উঠ। প্রথমেই জিডি করতে হবে। ওকে একা পাঠালে পুলিশ বাঁকা চোখে তাকাবে। তীর্যক অশ্লীল মন্তব্য ছুঁড়বে- প্রথমেই ওকে অবিশ্বাস করবে। তারপর যদি লাগে তো উকিল-পাড়া-প্রতিবেশী-স্বজন সবার কাছে কী অভিজ্ঞতা হবে ওর, সব আমার মুখস্ত। কিন্তু যখনই ওর পাশে থাকবো আমি, আমার চেয়ার আর সাইনবোর্ডের পরিচয় নিয়ে, সবাই সমীহের চোখ তাকাবে। ভিতরে যাই থাকুক, মুখে নারীমুক্তির ফোয়ারা ছুটবে। আলেয়া বেঁচে যাবে ফেরদৌসী হওয়া থেকে..... আলেয়া উঠে দাঁড়ায়। ওর চোখে আমি পড়ি বেঁচে থাকার তৃষ্ণা। ফেরদৌসীর চোখেও কী এমন তৃষ্ণা ছিল? আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করে।

মফস্বলের রাস্তার দু’পাশে থরে থরে কৃষ্ণচুড়া -হিজল, রাস্তায় স্বস্তির নীরবতা, টুং টাং রিক্সা দু’একটা। আমি যখন মাহবুবকে ছেড়ে আসি, মাহবুব পরিচিত আত্মীয়-বন্ধু সবাইকে বলে বেড়িয়েছে- আমি ট্যুরের নাম করে কার কার সাথে সাথে রাত কাটাই। আজাদের প্রসঙ্গও তুলেছে ঘুরে ফিরে......। এ মাসে মাহবুব বিয়ে করেছে। আয়েশাকে নয়। ওর সাথে শোয়া যায়। বউর মর্যাদা দেয়া যায় না। ওর বউ কলেজে দর্শন পড়ায়। এখনো আমার কানে আসে মাহবুব বলে বেড়ায় আগে দেশে থাকতো, এখন ট্রিপে বিদেশে যায়। আমার ফিলিপাইনের ভিসা হয়ে গেছে। এবার অনুসূয়াও সাথে যাবে। অসিতও ভিসার জন্য খুব দৌড়াদৌড়ি করছে। আজাদ-মাহবুব তোমাদের অযাচিত কথায় কি আমার জীবনের প্রতি তৃষ্ণা হারালে চলে!!! জীবন এক অমূল্য অনুভবের নাম, চুমুকে চুমুক পান করবো আমি, পান করাবো আমাদের....!!!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন