বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারী, ২০১৬

জীবন পোড়ে তুষের আগুন : মাজহারউল মান্নানের ছোটগল্পের বই


আলোচক-মোমিনুল আজম

জীবন ঘষে তুষের আগুন ।। লেখক - মাজহারউল মান্নান ।। প্রকাশক - মনিরুল হক, অনন্যা, বাংলা বাজার, ঢাকা ।। প্রচ্ছদ- ধ্রুব এষ ।। প্রকাশকাল-জানুয়ারি ২০১৬ ।। মুল্য-১৫০ টাকা

তিনি ছিলেন বাঙলা সাহিত্যের অধ্যাপক। ক্লাসে পিনপতন নিস্তব্ধতায় রসিয়ে রসিয়ে পড়িয়েছেন কালজয়ী সাহিত্যের বিষয় আশায়। ' প্রেম' গল্পের বিএমবি স্যারের মতোই তাঁর ক্লাসে ভীড় লেগে থাকতো ছাত্রছাত্রীদের। ক্লাসকে উপভোগ্য করে তোলায় তাঁর কোন জুড়ি ছিলো না। এখন তিনি হাত দিয়েছেন সাহিত্য রচনায়। সফলতাও এসেছে। তাঁর প্রথম বই স্মৃতিচারণমুলক, আত্মজীবনীও বলা যেতে পারে। অনন্যা থেকে প্রকাশিত 'চোখ ভেসে যায় জলে ' বইয়ের ইতোমধ্যে তিনটি সংস্করণ বেরিয়েছে। সম্প্রতি অনন্যা থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর গল্পের বই " জীবন পোড়ে তুষের আগুন"। বইটির ছোট্ট ভুমিকায় তিনি বলেছেন-' এ বইয়ের গল্পগুলি আসলে গল্প নয়। গল্পের আদলে লেখা স্মৃতিকথা। কোনটা নিজের জীবন থেকে নেয়া, কোনটা অন্যের জীবন খুব কাছ থেকে দেখা।"

ছোটগল্প আসলে কী, রবীন্দ্রনাথের বর্ষাযাপন কবিতায় তার কিছুটা আভাস আছে। সমগ্র জীবন নয়, জীবনের অনেক ঘটনা থেকে একটি ঘটনা নিয়ে ভাষা আর উপমা দিয়ে লেখা হবে গল্প। সে গল্পে বাহুল্য বর্জন করে আঁটসাঁট গাঁথুনিতে যা বলা হবে তাতে থাকবে বাস্তবতার ছোঁয়া। শেষ করার পরও শেষ না হওয়ার একটা অতৃপ্তুি থেকে যাবে গল্পে। এখন কথা হলো গল্পে যদি কল্পনা আসে তাহলে তা গল্প হবে কিনা? এ প্রসংগে বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আলোচনার একটি অনুলিপি প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ‘প্রবাসী’তে। সেখানে রবীন্দ্রনাথ তরুণ লেখকদের উদ্দেশে বলেছিলেন -... একসময়ে ঘুরে বেড়িয়েছি বাংলার নদীতে নদীতে, দেখেছি বাংলার পল্লীর বিচিত্র জীবনযাত্রা। একটি মেয়ে নৌকো করে শ্বশুরবাড়ি চলে গেল, তার বন্ধুরা ঘাটে নাইতে-নাইতে বলাবলি করতে লাগলো, আহা, যে পাগলাটে মেয়ে, শ্বশুরবাড়ী গিয়ে ওর কি না জানি দশা হবে। কিংবা ধর একটা খ্যাপাটে ছেলে সারা গ্রাম দুষ্টুমির চোটে মাতিয়ে বেড়ায়, তাকে একদিন হঠাৎ করে চলে যেতে শহরে তার মামার কাছে। এইটুকু চোখে দেখেছি, বাকীটা নিয়েছি কল্পনা করে। একে কি তোমরা গান জাতীয় পদার্থ বলবে? আমি বলব আমার গল্পে বাস্তবের অভাব কখনো ঘটেনি। যা কিছু লিখেছি, তাকে দেখেছি, তাকে মর্মে অনুভব করেছি, সে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, আমার নিজের দেখা। তাকে গীতধর্মী বললে ভুল করবে।’
লাতিন আমেরিকান লেখক মার্কেস তাঁর গল্প লেখার কথা বলতে গিয়ে বলেছেন যে, ছোটোবেলায় তাঁর দাদুর কাছে গল্প শুনে শুনে গল্প লেখার হাত পাঁকিয়েছেন। তাই তাঁর গল্প লেখা মানে আসর জমানো বা একজন কথক বলে যাবেন আর শ্রোতারা শুনবেন।
আর হাসান আজিজুল হক বলেছিলেন-‘আমি বানিয়ে গল্প লিখতে পারি না। বাস্তবতাটা যা চোখে দেখি, সেটার বর্ণনা দিয়ে আমার গল্প বানানোর অক্ষমতাকে ভরিয়ে তুলতে চাই।

আমরা রবীন্দ্রনাথ, মার্কেজ কিংবা হাসান আজিজুল হকের গল্প সম্পর্কে যে দৃষ্টিভঙ্গি তার বিবেচনায় মাজহারউল মান্নানের গল্পের বই 'জীবন পোড়ে তুষের আগুন' এর গল্পগুলির যদি আলোচনা করি তাহলে মনে হয় বলতেই পারি এগুলি সার্থক গল্প হয়ে উঠেছে। গল্পের ঘটনাগুলোকে খূব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। পরিবেশ পরিস্থিতির বর্ননায় সেগুলি জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

প্রথমেই আসা যাক যে গল্পের নামে বইটির নামকরণ করা হয়েছে সেই 'জীবন পোড়ে তুষের আগুন' গল্পটি নিয়ে। আবুল খায়ের জুয়ার নেশায় স্ত্রী, সন্তান, সংসারের কোন খবর রাখে না। তার লক্ষ্য পাঁচ শ টাকার একটা দান মারতে পারলেই সবকিছু ছেড়ে দিয়ে সংসারি হবে সে। মাস যায় বছর যায়, সে দান আর মারা হয় না, জমিজমা বিক্রি করে নি:স্ব হয় সে। আবুল খায়েরে নাম হয়ে যায় খয়রা। স্ত্রী সবকিছু সহ্য করে স্বচ্ছল দেবরের ঘরে কাজ করে কোনমতে সংসারটা টিকিয়ে রাখে। ছেলে মেয়েরা বড় হয়। বড় মেয়ে আমেনার বিয়ে দেয় তার চাচা। বিয়ের দিন জুয়াড বোর্ডে বসে মনে পড়ে মেয়ের কথা। ছুটে আসে সে বাড়িতে । দায়িত্বহীন নিঁ:স্ব পিতার মেয়ে বা জামাই পক্ষের লোকজনের সাথে দেখা করার অধিকারটুকু থাকে না। শেষ রাতে যখন বিয়ে বিদায় হয় তখন রাস্তার মাথায় গরুর গাড়ীর পিছনের পর্দা তুলে 'মা গেলু' শুধু এ কথাটা বলে চলে আসে খয়রা। আঙ্গিকে ছোট একটি গল্প মর্মস্পর্শী বর্ননায় অসাধারণ হয়ে উঠেছে। জুয়াডি হয়েও পিতৃস্নেহের মহত্ব নিয়ে লেখা গল্পটির গঠনবিন্যাসও আধুনিক। সেরা গল্পটি নিয়ে গল্পের বইয়ের নামকরণের যে প্রথা চালু আছে সেটির সার্থক প্রয়োগ হয়েছে বলা যায়।

বইটির প্রথম গল্প 'ধলী চাচী।' প্রত্যন্ত অঞ্চলের জমশেদ চাচার সন্তান না হওয়ার কারনে দ্বিতীয় বিয়ের যে ঘটনা তা উঠে এসেছে এ গল্পে। তৎকালীন সমাজের যে চিত্র লেখক এঁকেছেন তা এসময়ে এসেও চোখের সামনে দিব্যি ভেসে ওঠে। স্বামীর দ্বিতীয় বিবাহকে নিজের অদৃষ্টের দোষ দিয়ে নির্বিকারভাবে মেনে নেয়ার যে প্রথা তা ভেবে এসময়ে বিস্মিত হতে হয়। গল্পের শেষে একটি চমৎকার চমক আছে তবে সে চমক এতোটা উদোম না করে 'শেষ হয়েও হইলো না শেষ' ধরণের একটি আবহ তৈরি করা যেত।

পরিবেশ পরিস্থিতির চিত্রনের মধ্য দিয়ে কাহিনীর বর্ননা করা গেলে সে গল্প হয়ে ওঠে জীবন্ত, সে গল্প পাঠককে মোহিত করে রাখে দীর্ঘ সময়। 'পন্ডিত স্যার' গল্পে সে সময়ের একটি জীবন্ত ছবি পাই আমরা। ওলাওঠা, নিউমোনিয়ার যে বিস্তারের কথা আমরা পড়ি ইতিহাসে, সেটি ফুটে উঠেছে গল্পটিতে।

পক্ষাশের দশকের নিটোল প্রেমের গল্প প্রেম। তরুণ পাঠকরা গল্পটি পড়ে এখনকার খোলামেলা প্রেমের সাথে এর একটা পার্থক্য তৈরি করতে পারবেন আর লেখকের সমসাময়িক পাঠকগণ গল্পটি পড়ে তাদের স্মৃতি রোমন্থনের সুযোগ পাবেন। ভালমানের একটি প্রেমের গল্প হয়েছে বলা যায়।

লেখক একসময় বামপন্থি রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। সেকারনে তাকে জেলে থাকতে হয়েছে দীর্ঘসময়। তার জেল জীবনের অনেক কথাই আছে তার স্মৃতিচারণমুলক গ্রন্থে। 'রিলিজ' গল্পটিও সে বইয়ের একটি ঘটনার সম্প্রসারিত রুপ। জীবনের গল্পই যে প্রকৃত গল্প 'রিলিজ' পড়ার পর তা আবার মনে হলো। বিনা বিচারে কারাগারের চার দেয়ালের ভিতর কতজনের জীবন যে ঝরে যায়, কতজনের কান্না শুকিয়ে যায় তার গুরুত্ব কে দেয়। অসাধারণ এ গল্পটি যে কাউকে আবেগে আপ্লুত করে তুলবে, চোখ ভেসে যাবে জলে।

পড়েছিলাম হাসান আজিজুল হকের বিখ্যাত গল্প 'পাতালে হাসপাতালে।' আশির দশকের হাসপাতালগুলোর অব্যবস্থাপনার নিখুঁত চিত্র তুলে ধরেছিলেন তিনি সে গল্পে। মাজহারউল মান্নানের 'চিকিৎসা' গল্পে হাসপাতালগুলোর তেমনি একটি চিত্র পাওয়া গেল। বাড়তি আকর্ষন বিখ্যাত কয়েকজন ডাক্তারের রোগ ও রুগী সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি ।

আলোচনাটি শেষ করবো অসাধারণ একটি গল্পের কথা বলে। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের ছবি আমাদের সাহিত্যে তেমনভাবে আসেনি, যেমনটি এসেছে তেতাল্লিশের মন্বন্তরের ছবি অথচ চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা তার চেয়ে কোন অংশেই কম ছিলো না। চুয়াত্তরের এই দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ ছবি ফুটে উঠেছে বইটির 'আকাল' গল্পে। দুর্ভিক্ষের দৃশ্যপট, ভাষা, উপমা আর ঘটনার বিন্যাসে এই ভয়াবহতা আমাদের উদ্বেল করে তোলে, মুক ও বধির হয়ে আমরা হারিয়ে যাই দুর্ভিক্ষের অতল গভীরে। লেখক যখন দুর্ভিক্ষের কথা বর্ননা করতে লেখেন- "কী থেকে কী হলো খড়ের ঘরে দাউ দাউ করে আগুন লাগার মতো তরতর করে গ্রামকে গ্রাম ছেয়ে নিলো নিদারুন আকাল। অবুঝ বাচ্চাদুটো আর নিজেকে প্রচন্ড মৃত্যুক্ষুধা থেকে রাঁচানোর লোভে ছবিরণ ছুটে আসে শহরে। শত শত ভুখানাঙ্গা মানুষের সাথে আস্তানা গাড়ে রেল ষ্টেশনের প্লাটফর্মে। কিন্তু শহরের পাষাণ নিষ্ঠুরতায় মাটির শানকির মতো ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যায় তার বাঁচার স্বপ্ন।" কিংবা খাদ্যের খোঁজে মানুষের মিছিল যখন যায় লঙ্গরখানার দিকে, সে দৃশ্যের বর্ননা লিখেছেন এভাবে-"ষ্টেশন রোড ধরে থালা বাটি কলাপাতা হাতে পিঁপড়ের সারির মতো চলছে হাড় জির জিরে মানুষ। চলতে চলতে মুখ থুবড়ে পড়ছে কেউ কেউ। মায়েদের কোলে পিঠে বড়শিতে গাঁথা কেচোর মতো ধনুর্ভাঁজ কঙ্কালসার শিশু। ঝুলে আছে প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়।" আকাল গল্পে চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষে ছবিরণের স্বামী সন্তান হারানোর যে চিত্র তিনি এঁকেছেন তার ভয়াবহতা আঁচ করে আমরা শিউরে উঠি কিংবা গল্পের শেষে ময়নার জীবন সম্পর্কে যে উপলব্ধি তা আমাদের বাস্তবতাকেই মনে করিয়ে দেয়।একজন লেখকের একটি গল্পের বইয়ে দশ পনেরটি গল্প থাকে, সব গল্প যে মানোত্তীর্ণ হয়, কিংবা আলোচিত হয় তা কিন্তু নয়। দু একটি গল্প ক্লিক করার কারনেই বইটি আলোচনার পাদপ্রদীপে চলে আসে। মাজহারউল মান্নানের "জীবন ঘষে তুষের আগুন" গল্পের বইটি 'রিলিজ', 'ধলী চাচী', 'আকাল' কিংবা বইয়ের স্ব-নামের গল্পটির জন্যই আলোচনার পাদপ্রদীপে আসবে এবং পাঠকপ্রিয়তা পাবে এ আমার দৃঢ বিশ্বাস।



আলোচক পরিচিতি
মোমিনুল আজম
গল্পকার, প্রবন্ধকার। কানাডা প্রবাসী

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন