বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারী, ২০১৬

মেহেদী উল্লাহ : ২০১৫ সালে যা লিখেছি, ২০১৬ সালে লিখব

গল্পপাঠ : ১
 ২০১৫ সালে কী কী গল্প লিখতে চেয়েছিলেন? লেখালেখির কি কোনো পরিকল্পনা করেছিলেন? 

মেহেদী উল্লাহ : ১
 ২০১৫ এর শেষে চৈতন্য প্রকাশনীর রাজিব চৌধুরী একদিন ফোনে গল্পের পাণ্ডুলিপি চাইলেন, ২০১৬ বইমেলায় বাজারে অনার জন্য। প্রসঙ্গক্রমে জানতে চাইলেন, কয়টা গল্প হবে? ফলে প্রকাশকের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মেইলে ঢুকলাম ও গুগলে 'মেহেদী উল্লাহ' লিখে সার্চ দিলাম কী কী গল্প কাকে পাঠিয়েছি আর লিংক পাওয়ার জন্য। নয়টা গল্প পাওয়া গেল।
না, এবছর নানা কারণে পরিকল্পনা করতে পারি নি, অবশ্য অন্য বছরগুলোতেও পরিকল্পনা তেমন ছিল বলে মনে পড়ে না। গল্পগুলোর পাণ্ডুলিপি 'ফারিয়া মুরগির বাচ্চা গলা টিপে টিপে মারে' চৈতন্য থেকে প্রকাশিত হবে আসছে বইমেলায়। ভাবতেই অবাক লাগে, 'তিরোধানের মুসাবিদা'(২০১৪) আর 'রিসতা' (২০১৫) গল্পগ্রন্থের গল্পগুলো লেখার সময় আমি এত সিরিয়াস কেন ছিলাম! সে সব মনে পড়লে হাসি/কান্না পায়। 

২০১৫ একটা ধকলের বছর ছিল। যে যা দিয়েছে, তার চেয়ে বেশি কেড়ে নেওয়ার (সবটা ব্যক্তিগত) বছরটা এখন অন্তে। অসংখ্য হারাতে হারাতে সিরিয়াসনেস খোয়াতে খোয়াতে কখন যে ৯টা গল্প লেখা হয়ে গেছে টেরই পেলাম না। কোনো সাহিত্য সম্পাদক অনুরোধ করেছেন লিখেছি; নিজে লিখেছি, সম্পাদক ছাপার জন্য চেয়েছেন, এমন এমন। 

সিরিয়াসনেস না থাকলেও, অভ্যাস এমন জিনিস কাউকে ছাড়ে না। সেই লিখিয়ে নিল। ভাবনা প্লাস, মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অমহান দুইটা গল্পও থাকছে! কিন্তু প্রেমিকা ফারিয়া কেন মুরগির বাচ্চা মারে? তাহার প্রেমিক প্রশ্নটি তাকে করতে পারে না। ভয়ে হয়তো, যদি গার্লফ্রেন্ড ছাইড়া যায়।আমাকেও এমন প্রশ্ন করা বৃথা-কেন আমি অসিরিয়াস? আসলে আমি আর সিরিয়াস না। তা বিনে আমি একটি অভ্যস্ততা। 

লেখকদের বিশেষ সুবিধা হল, তারা ঘটে যাওয়া একটা ঘটনাকে কেন্দ্র থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে পারেন। অন্য পেশার লোকজনও পারতে পারে। ধরা যাক, কোনো লেখকের প্রেম ভেঙে গেল। সেই লেখকের সামনে বিরহ যাপনের অনেকগুলো রাস্তা খোলা থাকে। ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী যে কোনো রাস্তায় তারা হাঁটেন, ছুটেন কিংবা বসে পড়েন। লেখকের বিরহ উদযাপনের একটা রাস্তা 'ক্রিয়েটিভিটি'র সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই বিরহ সাহিত্যে ঢুকে পড়ে তাদের হাত ধরে। ব্যক্তিগত বিরহকে লেখক সামষ্টিক করে তুলতে পারেন চাইলে। আমার চরমতম বিরহ যাপনের সময়ে আমি যেমন ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছি এভাবে, কোনো এক ফারিয়া আমাকে আশ্বস্ত করেছিল, তুমি পর্বতে উঠতে শুরু কর, জয় করে ফেরা না পর্যন্ত আমি নিচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করবো। তারপর আর আমার কিছুই মনে পড়ে না, পর্বত জয়ের নেশায় আমি বাইতে শুরু করলাম। গত এক বছরে রাতে ঘুমাতে গেলেই মনে পড়েছে ‘ঘুমাব কম, স্বপ্ন দেখব বেশি বেশি।

কারণ আমি জানি দু’চোখ বন্ধ করে থাকা প্রতিটি মিনিটে আমরা ৬০টি আলোক-সেকেন্ড নষ্ট করি।’ কি এক মারাত্মক রোগ, ভাবি আর ছটফট করি-ধরিয়ে দিলেন গার্সিয়া মার্কেস। এই গ্রহের আরেকটা প্রান্তে বসে, তা তিনি জানতেন না, জানবেনও না। আমি আরো ভাবি, ‘অন্যরা যেখানে বসে থাকবে আমি সেখানে হাঁটব, অন্যেরা যখন ঘুমোবে আমি তখন জেগে থাকব।’ ফারিয়া আবার এটাও বলতো, 'নো নিড পর্বত জয়, ইউ নিড রেস্ট, স্লিপ!' অথচ আসে না। ভয়বহ নিদ্রাহীনতায় আক্রান্ত ছিলাম…। ফারিয়া না বললেও মার্কেসের লেখা পড়ে আমি আগেই শিখেছি, 'সবাই পর্বতের চূড়ায় অধিষ্ঠিত হতে চায় এটুকু না জেনে যে, সত্যিকারের সুখ হলো ওই পর্বতারোহণে, চূড়ায় ওঠার অভিজ্ঞতায়।’ তারপর চূড়ার সুখ নিয়ে এসে শুনি, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ফারিয়া পর্বতের পাদদেশ ছেড়ে ততদিনে অন্য এক জনের সঙ্গে সমুদ্র জয় করতে গিয়ে তাকেও সুমদ্র জয়ে পাঠিয়ে নিজে তীরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে! ফারিয়া ভঙ্গ করেছে অঙ্গীকার! আরেকটা ছিল এমন,'আমাদের প্রেমটা ছিল মি. বিশ্বাসের অনেক পছন্দের এক জোড়া জুতার মতো। হঠাৎ একটা জুতা সে খুঁজে পাচ্ছে না। ফলে হাজার ইচ্ছে থাকলেও এখন আর অন্য জুতাটা সে পরতে পারছে না। আরেক জোড়া জুতা কেনার সামর্থ বিশ্বাসের আছে, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া জুতাটাকেই মিস করতে করতে বাটা-এপেক্স-বে এসবে ঢুকছে না সে।' আহা! দুইটা জুতা। দুইটা মানুষ। দুইটা মন! জুতাজোড়ার শোকে মি. বিশ্বাস অবিশ্বাস হয়ে গেছে ইদানীং; যেমন মানুষ থেকে অমানুষ জন্ম নেয়।গ


গল্পপাঠ ২. 
কি কি লিখেছেন? 

মেহেদী উল্লাহ : ২ 
ফোকলোরের ওপর একটা বই লিখেছি, প্রকাশিত হয়েছে বেহুলা বাংলা থেকে গতবছরের মে-তে। 'ফোকলোরের প্রথম পাঠ'-নাম শুনেই অনুমান করা যাচ্ছে কনটেন্ট কী কী থাকতে পারে। সহজ-সহজ, বেসিক জিনিসপত্র আছে ওতে। গল্পগুলোর নাম করতে চাই না। 'ফারিয়া মুরগির বাচ্চা গলা টিপে টিপে মারে' তে আছে, একটা বাদে, ওটা আগের গল্প, আমার জীবনের দ্বিতীয় গল্প। নাম 'শুষ্ক ঠোঁট তোমার'।


গল্পপাঠ : ৩. 
যা লিখতে চেয়েছিলেন সেগুলো কি লিখতে পেরেছিলেন? 

মেহেদী উল্লাহ : ৩
না। আমি বিভিন্ন কারণে এই বছরটায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। তার প্রভাব লেখালেখিতে পড়েছে। একে আমি ইতিবাচক ভাবেই দেখছি। এটা আমার সাহিত্যের গতিপথ পরিবর্তনের সম্ভাবনা।


গল্পপাঠ ৪.
যেভাবে লিখতে চেয়েছিলেন সেভাবে কি লেখাগুলো লিখতে পেরেছেন? 

মেহেদী উল্লাহ : ৪
হ্যাঁ। যে গল্পগুলো লিখেছি সেগুলো হয়তো এধরনের সময় না আসলে কখনোই লিখতে পারতাম না। কিছু লেখা নিজে থেকেই লেখকের জীবনের দুঃসময়ের অপেক্ষা করে, সে সময়েই তারা জন্ম নিতে চায়, এতেই তাদের সার্থকতা।


গল্পপাঠ ৫. 
সে লেখাগুলো কি নিয়ে কি আপনি তৃপ্ত? 

মেহেদী উল্লাহ : ৫
অবশ্যই। 


গল্পপাঠ ৬. 
২০১৬ সালে আপনার লেখালেখির পরিকল্পনা কী? কী কী লিখবেন বলে মনে করছেন? 

মেহেদী উল্লাহ :৬
২০১৬ এর শেষে গিয়ে যা রেজাল্ট দেখব, ভাবব তাই পরিকল্পনারই অংশ ছিল। আমার পরিকল্পনা অবচেতনে ঠিক হয় বোধ হয়, চেতনে পরিকল্পনা করে রেজাল্ট কখনো পেয়েছি মনে পড়ে না। চেতনে শুধু পরিকল্পনার বাস্তবায়িত রূপ যা পাই তাই দেখতে পাই।


গল্পপাঠ ৭. 
কিভাবে লিখবেন? লেখার জন্য আপনি কি ধরনের প্রস্তুতি নেবেন বলে মনে করছেন? 

মেহেদী উল্লাহ : ৭
২০১৫ এর লেখাগুলোর কনটেন্ট, ফর্ম-এসব যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকেই তো শুরু করা উচিত। পড়তে থাকব, দেখতে থাকব, ভাবতে থাকব, এটাই প্রস্তুতি।


গল্পপাঠ : ৮. 
আগামী লেখাগুলোর মধ্যে কি কোনো পরিবর্তন আনার কথা ভাবছেন? কী ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে মনে করেন?

মেহেদী উল্লাহ : ৮
একটা অসিরিয়াস মুড জারি থাকবে। সিরিয়াসে আর অসিরিয়াসে যে পার্থক্য, সেই পার্থক্য অবশ্যই পরিবর্তন আনবে। গল্পপাঠকে ধন্যবাদ। পাঠককে ধন্যবাদ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন