মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬

কুলদা রায়ের গল্প : ঘোড়া রত্তনের অশ্ব

অপরাহ্নকালে খেঁজুর গাছ কাটা সহজ। তখন রোদ নেমে আসে। একটা নীরব হাওয়া ওঠে। দুএকটা ঘুঘুও ডাকতে ডাকতে ঝিমোয়। রত্তন মোল্লা  এর মধ্যে টিপটিপি পায়ে ছবির বাগানে ঢোকে। গাছে উঠে কোমরে গাছি বাঁধে। মাথাটা কাত করে আগাটা ভাল করে দেখে। আস্তে-সুস্থে হাসুয়া চালায়। একটা গানও করে । গানটির পুরো কথা স্পষ্ট করে শোনা যায় না।


মণ্ডলদের মেজবিবি এই সময় পুকুরঘাটে আসে। বাসনপত্র মাজতে বসে। এরপর গোসল সারবে। চারপাশটা একটু দেখে নিতেই চোখে পড়ল, কেউ নেই বটে, কিন্তু গাছের উপর কে একজন বিনবিন করে সুর তুলেছে। মুখটা বেজার হয়ে গেল। মাথায় আঁচল তুলে দিল। একজন পরপুরুষের সামনে কী করে গোসল সারে?

কিছুক্ষণের মধ্যে গানের সুরটা একটু স্পষ্ট হল কানে এল। কথাগুলোও বোঝা গেল--
কে যাসরে ভাটি গাঙ্গে বাইয়া
আমার ভাই বইনরে কইও নাওর নিতে যাইয়া।

মেজ বিবি বাপের বাড়ি যাওয়ার পথে এই গানটি প্রথম শুনেছিল শৈলদিয়ার হাটে। কে একজন বাতের ওষুধ বিক্রেতা মাইকে গাইছিল। সুরটা এখনো কানে লেগে আছে। এই গানের সুরটিই তার রাগ ভুলিয়ে দিল। গভীর করে রত্তন মোল্লার দিকে তাকাল। তার মাথা থেকে আঁচল খুলে গেল। লোকটিকে আর তার পর মনে হল না। মায়া হল। বহুদিন পরে লোকটি তাকে শৈলদিয়া ফেরত দিয়েছে। এবার তাকে বাপের বাড়ি যেতে হবে।
ঠিক এই সময়ই রত্তন মোল্লা কী মনে ঘাড় ঘুরিয়েছে। ঘাটের দিকে চোখ পড়তেই চমকে গেল। তার দিকে তাকিয়ে আছে বিক্রমপুরে রওশোনেরা। তার মুখ ভার। চোখে জল টলমলো। আর তখুনি মনে পড়ল—তার কোমরে গাছি বাঁধা হয়নি। আর বাঁধারও সময় নেই। ফলে গাছ থেকে নিচে পড়ে গেল।
নিচে উঁইপোকার ঢিপি ছিল। তার উপরে পড়লেও রত্তন মোল্লা জ্ঞান হারাল। মণ্ডল বাড়ির মেজ বিবি ঘাট থেকে ছুটে এল। কাছে এসে পরপুরুষকে ধরবে কি ধরবে না –এটা নিয়ে একটু সংশয় দেখা দিয়েছে তার মধ্যে। তবে একটু ঝুঁকে পড়ে বুঝতে পারল- - রত্তন মোল্লা মরে নি। তার শ্বাস পড়ছে স্বাভাবিকভাবে। পুকুর থেকে জল এনে তার চোখে মুখে ঢেলে দিল। তাতেও চোখ মেলছে না দেখে কানের কাছে হাতের পাতিলটা রেখে ঠুক ঠুক করে শব্দ করল।

রত্তন মোল্লা গভীর অন্ধকারের মধ্যে ঠক ঠক নয়—খটা খট করে ঘোড়ার পায়ের শব্দ শুনতে পেল। ঘোড়াটি দূর থেকে কাঁচা রোশনাই ছড়িয়ে সামনে এল। এবং তার দিকে এক পলক তাকিয়ে আবার দূরে চলে গেল। আর তখনি তার চোখ খুলল। দেখতে পেল, তার দিকে ঝুঁকে আছে রওশোনেরা নয়—মণ্ডলবাড়ির মেজবিবি। রওশোনেরা আছে বিক্রমপুরে। ঘোড়া নিয়ে সে গেলে চলে আসবে। ঘোড়া ছাড়া তার আসা সম্ভব নয়।

রত্তন মোল্লা ফিসফিস করে বলল, রওশোনেরা! রওশোনেরা!! বলতে বলতে তার চোখ জলে ভরে এল।

তাকে চোখ খুলতে দেখে মেজবিবি আস্তে করে বলল, ভাইজান, উইঠেন না। একটু শুইয়া থাকেন। আমি আপনের লাইগা দুগগা খাবার নিয়া আসি।
মেজবিবি খাবার নিয়ে এসে দেখতে পেল, রত্তন মোল্লা নেই। চলে গেছে। উঁইপোকার ঢিপি ছিল বলে রক্ষা। ঢিপির উপরে তার গায়ের ছাপ পড়ে আছে।

এতদ অঞ্চলে কোনো ঘোড়া নেই। তবে ঘোড়াদাইড় নামে একটি গরু ছাগলের হাট আছে। শোনা যায় সেখানে এককালে ঘোড়াও বিক্রি হত। কোন কালে সেটা কেউ বলতে পারে না। তবে বুড়ো ধুড়ো কেউ কেউ মুখ বাঁকা করে বলে, এই বিলা অঞ্চলে ঘোড়া আইবে কোইত্থেকা। এই হাটে ঘোড়া নয় রে বাপা—বিক্রি হইলেও হইতে পারে গাধা।

ঘোড়াদাইড় হাটে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে রত্তন মোল্লার সঙ্গে পাখিমারার আব্দুল আলি মুন্সির দেখা হল। মুন্সিজী হাটের এক কোণে বসে চোখ বুজে হুঁকো টানছিল। তখন সন্ধ্যেকাল সমাগত। হাট প্রায় শেষ। তাকে দেখে জিজ্ঞেস করল, বাড়ি কনে?
রত্তন মোল্লা বলল, চুনখোলা।
--সেতো মেলা দূর। দুইদিনের পথ।
--তাইলে পাটগাতি কইতে পারেন। এককালে বাঁশবাড়িয়াও ছিল।

এক কথায় ভ্রু কুঁচকে গেল মুন্সিজী। তারপর হেসে বলল, বুঝছি। তোমাগো মামাবাড়ি তাইলে পাখিমারা। ঠিক কিনা কও!

মাথা নেড়ে রত্তন মোল্লা বলল, খালাবাড়ি আন্ধারমানিক।
--আর কওন লাগবে না। এই হাটে আইছো ক্যান?
--ঘোড়া কিনতি।

রত্তন মোল্লার কথা শুনে সে বলল, ঘোড়া আছে চিন্তা নাই। দামেও সস্তা। তামাকের কল্কি রত্তন মোল্লার হাতে দিয়ে বলল, টানতে থাকো। আমি ঘোড়া লইয়া আইতেছি।
মুন্সিজী অন্ধকার ঘোর হলেই একটি ঘোড়া নিয়ে এল। ঘোড়াটি চেহারা ছোটোখাটো। বলল, অতি খাসা ঘোড়া। এইটা নিয়া যাও মেয়া। যদি কোনো সমস্যা পাও তো এইখানে আইসো। বদলাইয়া দেবানে।

রত্তন মোল্লার হুঁকো টানা শেষ হয়েছে। ঘোড়া দেখেই খুশি। এই ঘোড়া কেনার জন্যই এতোকাল থলির মধ্যে তিল তিল করে টাকা পয়সা জমিয়ে রেখেছে। এর মধ্যে কিছু টাকা পয়সা তার বাপজানেও রেখে গেছে। দাদাজানেরও কিছু মুদ্রা থাকতে পারে। বাপজান ফটিক মোল্লা মরণকালে পই পই করে তাকে বলে গেছে -- এই টাকা যেন সে ঘোড়া কেনাতেই ব্যয় করে। অন্য কোনো কাজে নয়। অন্যথা হলে তার কবর আজাব হবে।

রত্তন মোল্লার খুশি দেখে কে একজন দাঁত বের করে হেসে বলল, খাসা কিনছেন গাধাটা।

রত্তন মোল্লার ভ্রু কুঁচকে গেল। বলল, এটা গাধা নয়। ঘোড়া।

পেছন থেকে মুন্সিজী বলল, শোনো মেয়া, আকথা-কুকথায় কান দিও না। এই এলাকায় হাটে কোনো কালেই গাধা বিক্রি হয় নাই। বিশ্বাস না হইলে—তোমাগো নড়াগাতির দারোগা সাবরে জিগাইও।

সে আর দেরি না করে এই আধো অন্ধকারের মধ্যেই রওনা করল। তার মনের ভার অনেকটা কমে গেছে। বহুদিন পরে তার মুখে হাসি ফুটল। অবশেষে ঘোড়া পেয়েছে। এবার বিক্রমপুরে ঘোড়া নিয়ে যেতে পারবে। রওশোনেরাকে নিয়ে আসতে পারবে। সে আর না করতে পারবে না। তার বাপ-দাদার হাউস পুর্ণ হতে চলেছে।

একটা কি দুটো মাঠ পরে ফটফটে জ্যোৎস্না উঠল। কোন এক ছাড়ার বাড়ির উঠোনে দুটো বউ মানুষ ভাত রান্না করছে। একজন আরেকজনকে বলছে, তার স্বামীটা মস্ত বড় গাধা। কাম কাজে কোনো দিশা পায় না। যা করে তাতেও কোনো ফায়দা নেই।

এই আলাপের পরপরই রত্তন মোল্লার ঘোড়াটি ভ্যা করে উঠল। তা শুনে বউ দুটি হেসে উঠে বলল, ওই যে গাধাটা আইসা পড়ছে।

এটা দেখে রত্তন মোল্লা আর সামনে যাওয়ার সাহস পেল না। তার মনে সন্দেহ জেগেছে। সন্দেহ রাখা ঠিক নয়। আবার হাটে ফিরে এল। ততক্ষণে হাট শেষ। দুএকজন পিদিম জ্বালিয়ে মাল সামান গোছগাছ করছে। তবে রত্তন মোল্লার আতঙ্কের কিছু নেই। আব্দুল আলি মুন্সি হাটের পশ্চিম কোনায় তখনো হুঁকো টেনে চলেছে। তাকে দেখে কেসে উঠে বলল, ফির‍্যা আইলা ক্যান মেয়া?

মাথা চুলকে রত্তন মোল্লা জবাব দিল, এইটা তো গাধার নাহান ডাক ছাড়ে!

মুন্সি হুঁকোটা তার হাতে দিয়ে গভীর করে দেখতে লাগল। লেজ ধরে দুটো মোচড়ানিও দিল। ঘোড়াটি গাধার মত আর্তনাদ করে উঠল।

মুন্সিজী গম্ভীর হয়ে বলল, এইটা ঘোড়াই আছিল। সেনহাটি থেইকা আমার মামুজান কিন্যা আনছিল। তখন আয়ূব খাঁর মার্শাল ল’র জামানা। কথা ছিল খাঁ সাবে পাখিমারায় তশরিফ রাখবেন। এই উপলক্ষ্যে একটা ঘোড়াদৌঁড়ও হবে।

রত্তন মোল্লা আগ্রহ ভরে শুধাল, ঘোড়াদৌঁড় কি হইছিল?

--হয় নাই। আয়ূব খাঁ তখন আগরতলার হুজ্জত নিয়া ব্যস্ত। শ্যাখ সাবের নামে মামলা দিছেন। কইছেন—শ্যাখ সাব পাকিস্তান ভাঙতে চায়।

--কিন্তু মামুজানের ঘোড়াটার কি হইল?

--ঘোড়াটার আর কি হইবে। মামুজানের মন খারাপ। দিনকাল খারাপ। ঘোড়াটা আমার হাতে দিয়া কইলেন, ভাইগ্না, পারলে তুমি বেঁইচা দিও। না পারলে মাঝে মাঝে চইড়া তুমি মামীজানের খবর নিয়ো।

--মামুজানে আবার গেল কই?
--কই আর যাইবেন। ঢাকায় গেছেন। জেলখানার তালা ভাইঙ্গা শ্যাখ মুজিবরে বাইর করতে গেছেন। যাওনের কালে জোরে হাইকা কইলেন, জয় বাংলা। এইটা শুনে আয়ূব খাঁর ঘোড়াটা আর ঘোড়া নাই--চাইয়া দেখি, গাধা হইয়া গেছে।

সেই থেকে জন্তুটা মাঝে মাঝে গাধা হয়—আবার সময়কালে ঘোড়াও হয়। তুমি চিন্তা কইরো না। এইটা আমি ফেরত নিয়া যাইতেছি।

রত্তন মোল্লা আর্তনাদ করে উঠল। দূরের বিক্রমপুরের রওশোনেরার চোখ থেকে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়তে গেল। ঘোড়ার আশায় পথ চেয়ে আছে। সঙ্গে বোচকা-পাতি প্রস্তুত। ঘোড়ার এলেই দেরী করবে না—চটপট রওনা করবে। শেষমেশ ঘোড়া পেলেও কপাল দোষে গাধা হয়ে গেল। রতন মোল্লা বলল, তাইলে আমার ঘোড়ার কী হইবে?

আব্দুল আলি মুন্সি হেসে বলল, উতলা হইয়ো না। তোমার লাইগা এইবার টাট্টু ঘোড়া নিয়া আসবানে। বিশ্বাস রাইখো মনে। খাঁটি ঘোড়া। বিশ্বাস না আইলে তোমাগো দারোগা সাবেরে জিগাইও।
মুন্সিজীরে অবিশ্বাসের প্রশ্ন নেই। লোক খারাপ নয়। রত্তন মোল্লার হাতে অর্ধেক টাকা ফেরত দিল। বলল, এইটা রাখো তোমার লগে। পরের সপ্তায় ঘোড়া আইনা বাকী টাকা নেবানে।

পরের হাটে রত্তন মোল্লা গেল বটে—তবে আব্দুল আলি মুন্সিরে পেল না। জনে জনে তার হদিশ জিজ্ঞেস করল। কেউ তাকে চেনে বলে মনে করতে পারল না। পাখিমারার আব্দুল আলি মুন্সি নামে একজন ঘোড়া বিক্রেতা আছে শুনে কেউ কেউ হা হা করে হাসতে লাগল। বলল, মেয়া, ঠগের পাল্লায় পড়ছ।

এমন কি যে লোকটি তাকে দেখে বলেছিল ‘তার গাধাটি বেশ খাসা’ সেই লোকটির সঙ্গেও দেখা হল। সেও আব্দুল আলি মুন্সি বা তার ঘোড়া অথবা গাধা নিয়ে ঠাট্টা মস্করা করেছে বলে মনে করতে পারল না। সে সময়ে ঘোড়াদাইড় হাটে লোকটি ছিল না—খালুজানের জেয়াফতে মোড়েলগঞ্জে গিয়েছিল। সেখানে খাসির রেজালার ডেগসি তুলতে গিয়ে তার বাঁহাত পুড়ে যায়। পোড়া হাতটা বের করে রত্তন মোল্লাকে দেখালো। বলল, এ এলাকায় ঘোড়া কোনো কাজে লাগে না। এমন কি গাধাও কেউ কোনোকালে দেখে নাই। তাগো দরকার—নৌকা, গরু আর ছাগল।

লোকটি পরামর্শ দিল, এই ঘোড়া খোঁজা বাদ দিয়ে একটা ভালো দেইখা গরু কিন্যা নেও। শ্রাবণ মাসে গরুর খানা খাদ্যের বড় অভাব। সেইকালে আসলে সস্তায় গরু পাইবানে।

রত্তন মোল্লা মোটেই গরু কিনবে না। ঘোড়াই কিনবে।এ ছাড়া তার জীবনের অন্য কোনো লক্ষ্য নেই। এক ধরনের রোখ চেপে গেছে। হাল ছাড়ল না। প্রতি হাটে হানা দিতে লাগল। পঞ্চম সপ্তায় আব্দুল আলি মুন্সিরে খুঁজে পেল। হাটের পশ্চিম কোণায় বসে মুন্সি আগের মতই হুঁকো টানছিল। তাকে দেখে খুব খাতির করে বলল, তোমারেই খুঁজতেছি মেয়া। তোমার ঘোড়া পাওয়া গেছে।

রত্তন মোল্লা খুব খুশি হয়ে জানতে চাইলো, ঘোড়া কই?

--ঘোড়া আছে। আগে ঘোড়ারে দিন পাচেক দানা পানি খাওয়াইয়া তাজা বানাই। তারপর তুমি নেবা। বলে আব্দুল আলি মুন্সি তাকে ঘোড়ার বদলে ঘোড়ার কাটা একটা লেজ গছিয়ে দিল। ঠিক লেজের পুরোটা নয়। আদ্দেক। লেজের আগার দিকটায় এক গোছা চুল আছে। চুল দিয়ে নিজের গালে একটু সুড়সুড়ি নিল। বলল, সামনের সপ্তায় আইসো। তোমার ঘোড়া পাইবা। বিশ্বাস না করলে তোমাগো দারোগা সাবরে জিগাইও।

দারোগা সাহেবকে দরকার নেই। যে কোনো প্রকারে ঘোড়া তার চাই। শুধু তার মনে একটা খুঁত খুঁতানি জেগেছে। এটা নিরসনের আশায় জিজ্ঞেস করল, এই লেজটা কি সেই ঘোড়ার?

--হ মেয়া। কোনো সন্দো নাই।

--তাইলে কি আপনে আমারে শ্যাষ ম্যাষ ল্যাজ কাটা ঘোড়া দেবেন নাকি?

--ল্যাজ-কাটা ঘোড়ার সমস্যা কি? ঘোড়া ল্যাজ দিয়া দৌঁড়ায় না। পা দিয়া দৌঁড়ায়। যে ঘোড়া আনছি তার চারটা পা আছে কিনা সেইটা দেইখা নেবা।

শুনে রত্তন মোল্লা হা হয়ে গেল। কথায় যথেষ্ট যুক্তি আছে।

মুন্সি বলে চলেছে, ল্যাজ কাটা ঘোড়াই আনব। তুমি চাইলে ল্যাজটা জোড়া লাগায় দেব। সমস্যা নাই। লম্বা চাইলে লম্বা দেব। খাটো চাইলে খাটো করে লেজ দেব। যেই রকম চাইবা সেই রকম বানায় দেওন যাবে। এইটা তোমাগো নড়াগাতির দারোগা সাব জানে।

এরপরে আর কথা নাই। রত্তন মোল্লা রাজী। ঘোড়ার বদলে ঘোড়ার লেজ নিয়ে আশায় আশায় রইল। এবার আর কোনো ঝামেলা নেই। সত্যি ঘোড়া পেতে যাচ্ছে। লেজটা নিয়ে সে এলাকার মহিম দত্তের কাছে গেল। তিনি বিশিষ্ট পণ্ডিত লোক। স্মৃতিশাস্ত্রী উপাধী প্রাপ্ত। এক সময় টোলে পড়াতেন। টোল উঠে যাওয়ার পরে কয়েকটি হিন্দু বাড়িতে পূজা আর্চা করেন। আর সময় পেলেই রাধিকা পুরাণ নামে একটি টিকা পুস্তিকা লেখেন। তবে গ্রামের লোকজনের চিঠি পত্র লেখাও তার একটা কাজ। এটাতে বাড়তি একটা আয়-রোজগার আসে।

এক ভোরে মহিম দত্ত গাড়ু হাতে জমি থেকে ফেরার পথে রত্তন মোল্লাকে দেখলেন। তিনি রত্তন মোল্লাকে চেনেন। তার বাপকেও চিনতেন। দাদাজানকেও চিনতেন। এলাকায় এরা সাদা-সিধে লোক হিসেবে পরিচিত। কোনো ঝুট ঝামেলায় নেই। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এই প্রভাতকালে বৃত্তান্ত কি রত্তন?
রত্তন মোল্লা এটু লজ্জা লজ্জা করে বলল, একখান পত্র লেইখা দেওন লাগবে।

--কি পত্র?

--রওশোনেরাকে।

--রওশোনেরা আবার কে?

এ কথার কোনো উত্তর নেই। রত্তন মোল্লার চুল পেকেছে। এত কালেও তার নামের সঙ্গে কোনো মেয়েলোকের নাম যুক্ত হয়নি। কোনোকালে যুক্ত হবে বলেও শোনা যায়নি। তার বাপজান ফটিক মোল্লার সঙ্গে কোনো মেয়ে লোক ছিল না। শোনা যায় বিক্রমপুরে তার যাতায়াত ছিল। বিক্রমপুরের হাড়ি-পাতিলের ফেরিওয়ালাদের সঙ্গে সঙ্গে ঘুরত। টুকটাক ব্যবসা বানিজ্য করত। তবে সেটা চল্লিশ বছর আগেই চুকে গেছে। সে সময়ে ফটিক মোল্লা যখন শেষবারের মত বিক্রমপুর থেকে ফিরে এল—সঙ্গে নিয়ে এসেছিল একটি শিশুকে। লোকে জিজ্ঞেস করল, ওরে ফটিক, এই পোলাটা কার?

সে একটু উদাসীন ভঙ্গীতে জবাব দিল, কার আবার, নিজের পোলা। পোলার নাম রত্তন মোল্লা।

--সে কি। তুমি আবার বিয়া করলা কবে?
--মনে করলে বিয়া করছি। আর মনে না করলি করি নাই। বিয়া ছাড়া কি পোলা হওনের উপায় নাই?

শুনে কেউ কেউ অবাক হল। কেউ কেউ বিরক্তও হল। এ কী সৃষ্টি ছাড়া কথা। বিয়ে ছাড়া পোলার জন্ম? ঘোর অধর্ম। এটা নিয়ে শুরুতে কেউ কেউ শোর গোলও তুলল। তবে তুলে লাভ হল না। ফটিক মোল্লা গ্রামে এতো নিরীহ ও অপ্রয়োজনীয় লোক যে তাকে নিয়ে শোর গোল তুলে কোনো ফয়দা নেই। শুধু সময় নষ্ট। কেউ কেউ বলল, এটা কথার কথা। পোলাটা ফটিকের নয়। অন্য কারো এতিম পোলা। ফটিক পুষবে বলে নিয়ে এসেছে। পুষুক না। ক্ষতি কি।

তবে ছেলেটা বড় হতে হতে দেখা গেল তার কানের নিচে একটা কালো জড়ুল আছে। জড়ুলটা ফটিক মোল্লারও আছে। তার বাম পায়ের কড়ে আঙ্গুলটা সামায় বাঁকা। ফটিক মোল্লা বাপজানেরও বাঁকা আঙুল ছিল। এমন কি কথা-বার্তা ভাব- ভঙ্গী সবই ফটিক মোল্লারই মত। যারা আরেকটু বয়স্ক তারা শুধু ফটিকের সঙ্গেই নয়—ফটিকের বাপের সঙ্গে ছেলেটার মিল খুঁজে পেল। আরো একজন মরতে বসা বুড়ো মানুষ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগে ছেলেটাকে দেখে চেঁচিয়ে উঠল, ও ইনসান মেয়া, তুমি আবার কবে আইলা।
ইনসান মেয়া রত্তন মোল্লার দাদাজানের নাম। তবে শুধু ইনসান নয়—ইনসান মোল্লা। বুড়ো মানুষটা হয়তো ফটিকের পোলা রত্তন মোল্লাকে দেখে ইনসান মেয়া নামের কোনো এক লোককে মনে করেছেন। সেটা ইনসান মোল্লাও হতে পারে। আবার ইনসান মাঝিও হতে পারে। ফটিকের বাপও হতে পারে। রহমানের বাপও হতে পারে। তবে কে যে ঠিক সেটা জিজ্ঞেস করার সুযোগ তখনও পাওয়া যায়নি। তার আগেই বুড়ো মানুষটা ইন্তেকালে যান। এটা নিয়ে কোনো ঝামেলা হয়নি। সবাই মৃতের দাফন-কাফন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তবে লোকটি যে রত্তন মোল্লাকে দেখে ইনসান মোল্লার নাম ধরে ডেকেছিলেন এটা কেউ কেউ স্মরণ আনতে পেরেছিল বলে কথিত আছে। সবাই ভুলে গেলেও পণ্ডিত মহিম দত্ত স্মৃতিশাস্ত্রী ভোলেননি। তার সব কিছু মনে থাকে। মনে রাখেনও। এ বিষয়টি নিয়েও একটি টিকা লিখবেন সময় পেলে।
মহিম দত্ত কাগজ টেনে লিখলেন—

কল্যাণীয়েষু রওশোনেরা বিবি

পরসমাচার এই যে তোমার বেদনা বিধুর দিবসের সমাপ্তি সমাগত। অবশেষে অশ্ব পাওয়া গিয়াছে।

কিন্তু অশ্ব লিখেই একটু সংশয়ে পড়লেন। এই রত্তন বা তাদের মতন লোকজনেরা জাতে জোলা। এদের লেখাপড়া অতি সামান্য। তারা ধর্মাধর্মেও নেই। অশ্ব শব্দটি বুঝতে পারবে কিনা সন্দেহ। বুঝতে গেলে তার মতো স্মৃতিশাস্ত্রীর দরকার হবে। বিক্রমপুরে সে-রকম কোনো স্মৃতিশাস্ত্রী না থাকলে বিপদ। তাকেই হয়তো পড়ে বোঝাবার জন্য সেখানে যেতে হবে। এই বুড়ো বয়সে সে ঝক্কি পোয়ানোর ইচ্ছে নেই। এই হেতু তিনি অশ্ব শব্দটি কেটে ঘোড়া শব্দটি লিখলেন। লিখে তার মন খুঁত খুঁত করতে লাগল। ঘোড়া আদতে ভারতীয় প্রাণী নয়। আর্যরা এই ঘোড়া এনেই ভারতভূমি অধিকার করেছিল। এই ঘোড়া নিয়েই তারা রাজ্য জয় করতে বের হত। জয়ের পর তারা যে যজ্ঞ করত তার নাম ঘোড়া যজ্ঞ নয়—অশ্বমেধ যজ্ঞ। অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়ার কাছে রানীকে উৎসর্গ করার বিধান আছে। অশ্বকে ঘোড়া লিখে খাটো করতে তার মন সায় দিল না। ঘোড়া শব্দটি কেটে নয়—তার আগে খুব সাবধানে ভক্তি ভরে লিখে দিলেন অশ্ব। দুটোই থাকুক।

এই দুই লাইন লিখেই জিজ্ঞেস করলেন, বাপা রত্তন, পত্রে মিছে কথা লেখা কর্তব্য নয়। তুমি সত্য করে রওশোনেরার পরিচয় প্রকাশ করো। অন্তত আর কেউ না জানলেও আমার জানা আবশ্যক। না হলে পত্রের ভাবে বিভ্রম হবে। লজ্জা করে কিছু গুপ্ত রেখো না।

কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে থাকল রত্তন মণ্ডল। তারপর মাথা না তুলেই মৃদু গলায় বলল, রওশনেরা বিক্রমপুরের মেহরাব আকন্দের সাইজা মেয়ে। তিনি আমার মামা লাগে।

মামা মেহরাব আকন্দের লগেই আব্বাজান হাড়ি পাতিল বিক্রি করতে দেশগায়ে ঘুরে বেড়াত। আর অবসর কালে তাগো কাছারি ঘরে নিন্দ পাড়ত। সেইকালেই আমার জন্ম।

--তোমার বাপ ফটিক মোল্লা আর আম্মাজানের কি বিয়া হইছিল বাপ?
--হইছিল কি হয় নাই, সেইটা আমার আব্বাজানে আমারে কইয়া যায় নাই। তিনি কইছিলেন, রওশোনেরা সাধারণ মাইয়া না—কোহেকাফের পরী। তার লগে তোমার বিয়া পাকা। ঘোড়া নিয়া গেলেই রওশোনেরা কবুল কইবে। ঘোড়ায় চইড়াই রওশোনেরা বিবি বিক্রমপুর থেইকা শ্বশুরবাড়িতে রওনা করতি চান। এছাড়া তার আসনের হাউস নাই।

--এর কারণ কী বাপ?

--সেইটা আমার বাপ ফটিক মোল্লা ভালো কইরা কইয়া যায় নাই। তবে একদিন তিনি কইছিলেন, তার বাপজান ইনসান মোল্লাও বিক্রমপুরে বিয়া করছিলেন। বিয়া কইরা বউ নিয়া নিজের বাড়ি ফিরছিলেন। এসব কথা বাদ দিয়ে রত্তন মোল্লা তার দাদাজানে গল্পে ফিরে যায়।

কিছুটা হেঁটে, কিছুটা গয়না নৌকায় এসে ইনসান মোল্লা আর তার নয়া বিবি জোছোনা ভানু আবার হাঁটা পথ ধরছেন। তারা কিছুটা হাঁটেন। কিছুটা বিশ্রাম নেন। খলবল করে কথা কন। ঘরের কথা। পরের কথা। এইভাবে তারা যখন রাতৈল গ্রামে পৌঁছালেন তখন অন্ধকার নেমেছে। এখান থেকে তাদের নিজের বাড়ি দশ ক্রোশ বাকি। দাদাজানের ইচ্ছে এইখানে কোনো বাড়িতে আশ্রয় না নিয়ে এই রাতের মধ্যেই হাঁটতে হাঁটতে বিবি নিয়ে নিজের বাড়িতে আসবেন।

কিন্তু সেইকালে সেলিমাবাদ পরগনার সুলতান উদ্দিন চৌধুরীর মাইজা পোলা মসলেহ উদ্দিন চৌধুরী মুকিমপুর পরগণার শামসুল আলম খান সাহেবের বাড়ি উদ্দেশ্যে আসছিলেন। তার সাইজা বিবি মুকিমপুর পরগণায় বাপের বাড়িতে এসেছিলেন। নাইয়র কাল শেষ হয়েছে। শ্বশুরবাড়ি ফিরে যাবেন। এই উদ্দেশ্যে তার স্বামী মসলেম উদ্দিন চৌধুরী ঘোড়ায় চড়ে মুকিমপুর পরগণার খান বাড়ির দিকে রওনা করেছেন।

এই ঘোড়ার শব্দ শুনতে পেল ইনসান আলি ও তার বিবি জোছোনা ভানু। আধো জ্যোৎস্না আধো অন্ধকারে ঘোড়াটি কাছে এসেও পড়ল। সওয়ারী মসলেহ উদ্দিন চৌধুরীকে দেখাও গেল। ইনসান মোল্লা বিবি জোছোনা ভানুর চোখে পর্দা টেনে দিলেন। পরপুরুষকে দেখা হারাম। বিবিকে টেনে নিয়ে ঝোঁপ ঝাড়ের আড়ালেও গেলেন।

জোছোনা ভানু কখনো জমিদার দেখেন নাই। শুধু তাদের গল্প শুনেছেন। ফলে ঘোড়াটি খুব কাছে আসতেই তিনি ভালো করে জমিদারকে দেখার জন্য মুখের কালো নেকাবটি খুলে ফেললেন। ঝোঁপ থেকে মুখটি বের করলেন। তখন জ্যোৎস্নার রোশনি বেড়ে গেছে। ঘোড়াটি ঝোঁপের কাছে এসে থেমে গেল। মসলেম আলি চৌধুরী দেখতে পেলেন কোনো মানবী নয়—একটি পরীর মুখ তার দিকে চেয়ে আছে।

এই পর্যন্ত বলে রত্তন মোল্লা থেমে গেল। তার মুখে আর কোনো কথা নেই। মহিম দত্ত স্মৃতিশাস্ত্রী অধীর হয়ে জিজ্ঞেস করল, তারপর কি হল?
রত্তন মোল্লা আবেগহীন গলায় উত্তর দিন, জানি না। আমার বাপজান ইনসান মোল্লা আর বিশদ করে কন নাই। তবে কিছু লোকজনে কয়, সেই রাত্তিরে আমার দাদিজান জোছোনা ভানুকে ধইরা নিয়া গেছিলেন মোসলেম উদ্দিন চৌধুরী। আবার অন্য কিছু লোকজন কয়, মোসলেম উদ্দিন চৌধুরী তাকে নেয় নাই। তিনি সেদিন তার সাইজা বিবিকে নিয়া শ্বশুরবাড়ি থেইকা ফিরছিলেন। জ্যোৎস্নার মধ্যে তারা দুজনে কোহেকাফের বাদশা-বেগমের মতো যখন ঘোড়ার পিঠে চইলা যাচ্ছিলেন সেটা দেইখা আমার দাদিজান জোছোনা ভানু বাঁইকা বসলেন। না। তিনি এভাবে হাঁইটা হাঁইটা নয়া খসম ইনসান মোল্লার লগে শ্বশুরবাড়ি যাবেন না। গেলে তিনি ঘোড়ায় চইড়াই যাবেন। ঘোড়ায় চড়ার আলেদা ইজ্জত। এ ইজ্জত লাভ ছাড়া তার জীবনের আর কোনো হাউস নাই।

শুনে ইনসান মোল্লা বেকুব বনে গেলেন। বললেন, কিন্তু জোছোনা ভানু, ঘোড়া কেনার মতো টেকা-কড়ি তো আমার নাই।
এ-কথায় জোছোনা ভানু নিভে গেল। তার মনে হল এ জীবন বৃথা। এ বৃথা জীবন নিয়ে ঘর করার মানে নেই। তিনি বিক্রমপুরে ফিরে যেতে যেতে বললেন, জোগাড় করতি চেষ্টা করেন। ঘোড়া নিয়া আসবেন। তারপর আমি আপনার লগে আপনের বাড়ি যাব। এ ছাড়া আর কোনো কথা নাই।

জোছোনা ভানু খুব জেদি মানুষ। তবে পাষাণ নয়। দিলে মায়া-মহব্বত আছে। তার চোখ ভরে জল এলো। টপটপ করে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ল তার নাকফুল বেয়ে। তার হৃদয় ভেঙ্গে যাচ্ছে তার খসমকে ছেড়ে যেতে। তবু এটা ইজ্জতের সওয়াল। জীবনে একটিবারের জন্য ঘোড়ায় চড়ে শ্বশুরবাড়ি যাবে। এই একটি ছাড়া নারী জন্মের আর কোনো মাইফেল নেই। যাওয়ার আগে রওশোনেরা তার পরণের লাল ডুরে শাড়িটার আঁচল ছিঁড়ে ফেললেন। তার উপরে নিজের চোখ থেকে কাজল নিয়ে খাড়লেন একটা ঘোড়ার ছবি। নিচে লিখলেন--

সারা জনমের লাগি আড়ি আড়ি আড়ি।
ঘোড়া না আনলি যামু না আপনের বাড়ি।।

মহিম দত্ত স্মৃতিশাস্ত্রী মশাই কী একটু হিসেব কষলেন চক্ষু বুজে। তারপর রত্তন মোল্লারে কইলেন, বাপা, তুমি যে কাহিনীটি আমারে কইলে সেই সেলিমাবাদ পরগনার জমিদার মসলেম উদ্দিন চৌধুরী দেড়শ বছর আগে ছিলেন। তখন তোমার দাদাজান ইনসান মোল্লার জন্ম হয় নাই।

--তাইলে মনে হয় আমার পরদাদার গপ্প এইটা। অথবা তারও পরদাদার ঘটনা। কিন্তু ঘটনাটি কিন্তু সত্যি। আমার আব্বাজান কখনো মিছা কথা কন নাই।

তারপর রত্তন মোল্লা মুখটা নিচু করে। পায়ের নখ খুঁটে খুঁটে গুপ্তকথার মত বলে, আব্বা কইছে, বাপারে, তুই আগে ঘোড়া কিনবি। তারপর রওশোনেরার সন্ধান করবি। তার আগে নয়। আমার বাপজান ইনসান মোল্লা তার বিবিকে আনতি পারে নাই। আমিও আমার বিবিকে আনতি পারি নাই। আমাগো পোলার লগে তার বউ যেন ঘরে আসে। এছাড়া আর কিছু চাওয়ার নেই।

বাপজান আর দাদাজানের জন্য রত্তন মোল্লার বুক ব্যথা করতে লাগল। মহিম দত্ত এবারে অধীর হয়ে শুধালেন, তুমি কি রওশোনেরাকে দেখছো?
--না। দেখি নাই। দেখব কেমনে! আমি তো বিক্রমপুরেই কোনোদিন যাই নাই। বাপজান কইছেন—রওশোনেরা চান্দের লাহান। তাগো বাড়ির সামনে শুপারিখোলের বেড়া আছে। তার গায়ে মালঞ্চলতা ফোটে। তার ফাঁকে তার চোখ দেখা যায়। সে চোখ কোনো মানুষের চোখ নয়—পরীর চোখ। মায়াময়। ঘোড়া নিয়া গেলেই তার লগে আমার বিয়া হইবে।

শুনে মহিম দত্ত স্মৃতিশাস্ত্রী মশাই একটু কেসে ওঠেন। তিনি নিজেও বিয়ে করেননি। যে কন্যাটির সঙ্গে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল, বিয়ের দিন গিয়ে দেখেন তারা নেই। দেশ ছেড়ে গেছেন। তাদের খবর দেওয়ারও সময় পায়নি।

তিনি গভীর বেদনা পেয়েছেন। ফলে তিনি রত্তন মোল্লার রওশোনারার কাহিনীতে এসে কাতর হয়ে পড়েন। মহিম সন্যাসী চিঠি লেখার হাদিয়া নিলেন না। কয়েকটি কাঁচা টাকা তুলে দিলেন রত্তনের হাতে। বলেন, ঠিকই বাপা। ঠিকই। বাপদাদার কথা হেলা করা ঠিক নয়। আগে ঘোড়া কেনো। তারপর বিক্রমপুর যাও। ঘোড়া দেখলে রওশোনেরা আর না করতে পারবে না। সুড়সুড় করে তোমাকে কবুল করবে। ঘোড়ার পিঠে চড়ে তোমার সঙ্গে তোমার বাড়ি রওনা করবে। তুমি নিশ্চয়ই কামিয়াব হবা। ঘোড়া তুমি কিনতে পারবা। আমি আশীর্বাদ করি।


মহিম দত্ত বিচলিত হয়ে পড়লেন। তিনি যেন রওশোনেরাকে দেখতে পাচ্ছেন। রওশোনেরা বল্কলের পোষাক পরে এসেছে। সখি অনসূয়াকে নিয়ে গাছ-পালায় জল সিঞ্চন করে এসেছে। তাকে দেখে বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন,

অধরঃ কিশলবাগঃ কোমলবিটপানুকারিণৌ বাহু।
কুসুমমিব লোভনীয়ং যৌবনমঙ্গেষু সন্নদ্ধম।।
(অভিজ্ঞানম শকুন্তলা)
এর অধর নবোদগত পল্লবের ন্যায় অরুণিমায় সুশোভিত, এবং বাহুদ্বয় অতি কোমল অচিরজাত বিটপের ন্যায় সুন্দর। আর নবীন যৌবন বিকশিত কুসুমরাশির ন্যায় আপাদমস্তক ছাইয়া আছে।

ঘর থেকে কালিদাসের অভিজ্ঞানম শকুন্ত্লা বইটির প্রথম সর্গ খুলে বসলেন। অনসূয়া বলছে,

হলা সউন্দনে ইঅং সঅংবরবহু
সহআরসম তুএ কিদনামহেআ
ব্নজোসিনি ত্তি ণোমালিঅ নং বিসুমরিদাসি।।

ও লো শকুন্তলা! তুই যে নবমালিকার বন-জ্যোৎস্না নাম রাখিয়াছিলি, ওই দ্যাখ—সে কেমন স্বয়ংবর হইয়াছে, নিজেই গিয়া সহকারতরুকে আশ্রয় করিয়াছে।

শকুন্তলার রূপবর্ণনা পড়তে পড়তে তার চোখ বেয়ে টপ টপ করে জলবিন্দু ঝরে পড়তে লাগল। মনে হল, যে কোনো সৌন্দর্যই জলে সমাহিত। জলই সত্য। সত্যই জল।

এর মধ্যে মহিম দত্ত স্মৃতিশাস্ত্রীর স্মরণ হল, পত্রটি লিখলেন বটে, কিন্তু প্রাপিকা রওশোনেরার ঠিকানা লেখা হয়নি। ঠিকানা ছাড়া পত্র কোথাও যাবে না। ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখলেন, রত্তন মোল্লা চলে গেছে। শুধু ঠিকানাবিহীন পত্রটা পড়ে আছে।



রত্তন মোল্লা ঘোড়দাইড় হাটে গিয়ে দেখল, আব্দুল আলি মুন্সি আসে নাই। তার বদলে হুঁকো টানছে তার ছেলে। সে বলল, বাপজান কৃষ্ণনগর গেছেন। ফিরতে একটু দেরি হবে।

শুনে রত্তন মোল্লা হাহাকার করে উঠল, তাইলে আমার ঘোড়ার কি হবে?
-- চিন্তা নাই। আব্বাজান আপনের ঘোড়া পাঠায় দিছে।

শুনে রত্তনের মাথাটা হালকা হল। বড় করে শ্বাস নিল। আব্দুল আলি মুন্সি লোকটা তাহলে খারাপ নয়। বলল, ঘোড়া পাইলে বাকি টেকাটুকা আপনেরেই দেব। আমি আর দেরি করতে চাইনা। এখনই ঘোড়া নিয়া বিক্রমপুর রওনা হব।

কিন্তু ছেলেটির আশেপাশে কোনো ঘোড়া নেই। শুধু তার হাতে একটা কাপড়ের থলি। রত্তন তাকে জিজ্ঞেস করল, ঘোড়া কই? ঘোড়া তো দেখতে পাচ্ছি না?

--ঘোড়া আছে। ছেলেটি নিচু হয়ে বসল। তার থলির ভেতরে হাত ঢোকাল। বের করে আনল একটি ক্ষুদে ঘোড়া। বর্ণ সাদা। এই ঘোড়াটিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, এই নেন আপনের ঘোড়া।

ঘোড়া হাতে নেবে কি, ঘোড়ার সাইজ দেখেই রতন মোল্লার মেজাজ বিগড়ে গেল। বলল, ঘোড়া কি এতো ছোট হয় নাকি? ঘোড়ার বাচ্চাও তো এর চেয়ে বড় হয়।

--আপনে চাইছেন টাট্টু ঘোড়া। টাট্টু ঘোড়া ছোটোই হয়। লাগলে বড়ও হইতে পারে। দেখেন, কী সুন্দর লতাপাতা খাড়া আছে।

লতাপাতার কথায় রত্তন মোল্লা চেয়ে দেখল, কথা মিছে নয়। ঘোড়ার গলার কাছে সবুজ রঙ দিয়ে লতা-পাতা খাড়া। আর তার মধ্যে লাল লাল ফুল। ছেলেটি বলল, চিনতে পারছেন? এই ফুলের নাম মালঞ্চ ফুল। আব্বাজানে কইছেন-- এই ফুল আনছেন বিক্রমপুর থেকে।

বিক্রমপুরের কথায় রত্তন মোল্লা চমকে গেল। আর কোনো কথা ভাবতে পারল না। এই মালঞ্চ ফুল রওশোনেরাদের মালঞ্চ-বেড়ায় আছে। তার ফাঁকে ফাঁকে তার গভীর কালো চোখ দেখা যায়। চোখ দুটি জলে টলমল।

হাত বাড়িয়ে রত্তন মোল্লা ঘোড়াটি নিল। হাতে নিয়ে আরো বিস্ময়ে বলল, একি, এ যে সত্যি ঘোড়াও নয়। মাটির ঘোড়া! আমাগো গ্রামের কুমোর মশাইরা বানায়।
এ ঘোড়াটি যে মাটির তৈরি ঘোড়া সেটা প্রমাণ করতে সে ঘোড়টির লেজ ধরে সামান্য টান দিল। খুব সহজেই লেজটি ভেঙ্গে চলে এল। আঙুল দিয়ে চাপ দিলেই ধুলোর মত গুড়ো গুড়ো হয়ে গেল। এই মাটি মধুমতি নদীর সরমাটি। ফুঁ দিলেই ধুলো মাটি উড়ে গিয়ে ছেলেটির মুখে উড়ে লাগল।

হাত দিয়ে ধুলো মাটি মুছে ফেলে আব্দুল আলি মুন্সির ছেলেটি বলল, ডরাইয়েন না। এইটা মাটির হইলেও আদতে মাটির ঘোড়া না। ভাল করে চক্ষু খুল্যা দেখেন।
রত্তন মোল্লা চোখ বন্ধ করে আছে। খুলবে না। তার মন ভেঙ্গে গেছে। ঘোড়া খুঁজতে খুঁজতে চুল পাকিয়ে ফেলেছে। দাঁত নড়ে গেছে। কিন্তু কপালের ফের কাটে না। ঘোড়া পেতে পেতে ঘোড়া ফসকে যায়। রওশোনেরার কাছে যেতে পারে না। রওশোনেরা অপেক্ষা করে আছে। এ কষ্ট অসহনীয়।

কিন্তু এর মধ্যেই রত্তন মোল্লা টের পেল তার হাতের মধ্যে শির শির করে অনুভূতি হচ্ছে। কিছু নড়াচড়া টের পাচ্ছে। বেশ কোমল সেই নড়াচড়া। এবং সামান্য উষ্ণ। মাটির ঘোড়াটি যখন হাতে নিয়েছিল তখন এই বোধ ছিল না। এটা নতুন। চোখ খুলল। দেখতে পেল—মাটির ঘোড়াটির চোখ পিটপিট করছে। কান দুটো সামান্য দুলছে। শ্বাস নেবার সময় তার নাক উঠছে—নামছে। ঘাড়ের উপরে কেশর খাড়া হয়ে গেছে। তাকে অবাক করে দিয়ে চিঁহি চিঁহি করে ডেকে উঠছে।

ছেলেটি শুধাল, কী দেখছেন? অবাক হয়ে রত্তন মোল্লা বলল, ঘোড়া। তবে ঘোড়াটির লেজ নাই। কাটা।

--হা । হা। হা। লেজ নাই তো কী হইছে। লেজ তো আপনের কাছে। আব্বাজান আপনেরে সেদিন দিছিলেন। লেজটা দেন। জোড়া লাগায় দিচ্ছি।


রত্তন মোল্লা কোমরে একটি থলি গুঁজে রাখে। তার মধ্যে ঘোড়ার অর্ধেক টাকা আর কাটা লেজ রেখেছে। থলিটা বের করে তার মধ্যে হাত ঢোকাল। তাড়াতাড়ি বের করবে বলে ভেবেছিল, কিন্তু হাতটি বের করতে সাহস পাচ্ছে না। এদিক ওদিক তাকাতে লাগল।

আবদুল আলি মুন্সির ছেলে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, কি হইছে? হারাইছে নাকি কিছু?

--না। হারায় নাই। মনে হচ্ছে পইড়া গেছে।

--কি পড়ছে? টাকা-টুকা?
--না। টাকা আছে। লেজটা নাই। থলির মধ্যে ঘোড়ার লেজটা রাখছিলাম। এখন খুঁইজা পাচ্ছি না।

ছেলেটা খুশি মনে বলল, তাইলে চিন্তা নাই। টাকাগুলো দেন। আর ঘোড়া নিয়া যান।

--কিন্তু লেজ কাটা ঘোড়া নিয়া আমি করব?

--সেইটা আমি কী জানি। আপনে যখন লেজটা খুঁইজা পাইবেন তখন এইখানে আইসেন, লেজটা ফিট করে দেব।

কিন্তু রত্তন মোল্লা সে কথায় রাজী নয়। সে বলল, একটু অপেক্ষা করেন। আমি আরেকটু খুইজা দেখি। লেজটা পড়লে এই ঘোড়া দাইড়ের গরুর হাটের মধ্যেই পড়ছে।
কিন্তু আব্দুল আলির ছেলেটির দাঁড়ানোর সময় নেই। সে খুবই ব্যস্ত। তার আব্বাজান তাকে আন্ধারমানিক রওনা হতে বলেছে। সেখানে পূর্ণিমা রাতে মাঝে মাঝে বাঘ পড়ে। তবে বাঘ না বাঘডাসা—তা নিয়ে বহুমত আছে। তাতে কিছু যায় আসে না। আব্দুল আলি মুন্সি যে-কোনো বাঘডাসাকে রয়েল বেঙ্গল টাইগার বানিয়ে দিতে পারে। সেই এলেম তার আছে। বাঘ হোক আর বাঘডাসা-- যাই হোক না কেন সেটা কেনার চেষ্টা করবে। আজ সেই পূর্ণিমা। দেরী করতে চায় না।
রত্তন মোল্লাও খুব নাছোড়বান্ধা। সেও বায়না ধরেছে লেজ খুঁজে পেলেই টাকা দেবে। তার আগে নয়।

ফলে দুজনের মধ্যে একটু বাহাস বিতণ্ডা হল। ব্যাগ নিয়ে দুজনে টানাটানি শুরু করেছে। সবে গরুর হাটটি জমে উঠেছিল। আশেপাশের খদ্দের, গরুর পাইকার আর দালালদের গায়ে এসে পড়ল তারা দুজনে। গরুগুলোও ধাক্কা খেল। এই নিয়ে হাটের মধ্যে মহাহট্টগোল উপস্থিত হল।
এলাকায় রটে গেল চুনখোলার লোকজনের উপরে পাখিমারার লোকজন চড়াও হয়েছে। একজনের কান কেটে নিয়েছে। আরেকজনের নাক ফেটে গেছে। এই খবর মুহুর্তের মধ্যেই চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। চুনখোলা ও পাখিমারার লোকজনই লাঠি সড়কি নিয়ে পরস্পরের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। এই মারাত্মক কাইজার কারণে গরুগুলো উর্ধ্বশ্বাস এদিক –ওদিক ছুটল। কিছুক্ষণের মধ্যে শোনা গেল এই কাইজায় পাখিমারার দুইজন মারা গেছে। আর চুনখোলার তিন জন মারা যাবে যাবে করছে। কয়েকজনের মাথা ফেটেছে। ফলে আরও বড় কাইজার আয়োজন হল।

খবর পেয়ে নড়াগাতি এলাকার রহিম দারোগা এসে পাঁচ রাউন্ড গুলি ছুড়ল। গুলির শব্দে সারা মাঠ ফাঁকা হয়ে গেল। কারো টিকিটিও পাওয়া গেল না। কোথাও কোথাও ছোপ ছোপ রক্তের দাগ দেখা গেল। ছেড় জুতো, স্যান্ডেল, ছাতি পড়ে আছে। তবে কে বা কারা নিহত হয়েছে তার হদিশ পাওয়া গেল না। তবে এর মধ্যেই লেজ কাটা ছোট্ট টাট্টু ঘোড়াটি রত্তন মোল্লার তালু থেকে নিচে পড়ে গিয়েছিল। হই-হট্টগোল দেখে কিছুক্ষণ ঘোড়াটি খড় আর গোবরের মধ্যে লুকিয়ে ছিল। তারপর সুযোগ বুঝে এদিক-ওদিক তাকিয়ে সে গুটি গুটি পায়ে হাট থেকে সরে পড়ল। তবে যাওয়ার সময়ে ঘোড়াটির আকার ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। ঘনায়মান অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়ার আগে তার আকার একটা হাতির দ্বিগুন হয় বলেও কেউ কেউ দেখেছে।

নড়াগাতি থানার রহিম দারোগা কাইজা নিয়ে একটি রিপোর্ট লিখল—

চুনখোলা ও পাখিমারা পাশাপাশি দুটি গ্রাম। এ গ্রামের লোকজনের মধ্যে দীর্ঘকাল ব্যাপিয়া বিবাদ-বিসংবাদ চলিয়া আসিতেছে, গত ১৭ জ্যৈষ্ঠ অপরাহ্ন বেলা ১ ঘটিকার কালে দুই পক্ষের মধ্যে অতি তুচ্ছ কারণে কথাকাটাকাটি, ঠেলাঠেলি, হাতাহাতি শুরু হয়। পরে আবার ৩ ঘটিকার সময়ে উভয়পক্ষ রামদা, ঢাল, সড়কি সহকারে পরস্পরের সম্মুখিন হইলে নিম্নস্বাক্ষরকারী জনসাধারণের জান-মাল রক্ষার্থে পাঁচ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। তখন কাজিয়া থামিয়া যায় এবং বিশঙ্খলাসৃষ্টিকারিগণ ছত্রভঙ্গ হইয়া যায়। এলাকায় সকল প্রকার উত্তেজনা প্রশমিত হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের কেহ কেহ বলিয়াছেন যে পাখিমারার আবদুল আলি মুন্সি নামে এক দাগী আসামী সপুত্র চুনখোলার রত্তন মোল্লা ওরফে ঘোড়া রত্তনের টাকা-পয়সা জোরপূর্বক কাড়িয়া লইতে চেষ্টা করিলে এই বিপত্তির অবতারণা হয়। আবদুল আলি মুন্সি হাতি-ঘোড়া-ব্যাঘ্র-গাধা নানাবিধ জন্তু জানোয়ার বিক্রয়ের নামে সহজ-সরল লোকদিগকে প্রতারণা করিয়া থাকে বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে।
নিম্নস্বাক্ষরকারী বিস্তর তদন্ত করিয়া নিশ্চিত হইয়াছে যে, অত্র পাখিমারা এলাকায় আব্দুল আলি মুন্সি নামে কোনো লোক কদাপি ছিল না বা নাই। চুনখোলায় রত্তন মোল্লা ওরফে ঘোড়া রত্তন নামেও কোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের সন্ধান পাওয়া যায় নাই। প্রকাশ থাকে যে, ঘোড়া কিনিবার বাই রোগ ছিল বলিয়া রত্তন নামের উক্ত কাল্পনিক লোক ঘোড়া রত্তন নামে উক্ত হইয়াছিল।

আরো প্রকাশ থাকে যে, অত্র এলাকার ঘোড়াদাইড় নামে হাটের অকুস্থলে কেহ কাজিয়ায় নিহত বা আহত হয় নাই। সার্বিক পরিস্থিতি শান্ত ও নিয়ন্ত্রণে রহিয়াছে।

এ রিপোর্টটি উর্দ্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করেনি। শোনা যায় এরপরে আরো তিনটি তদন্ত হয়েছিল। তার কোনটি যে কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করেছে এতোদিন পরে জানা যায় না। দীর্ঘ কুড়ি বছর পরে জানার কোনো সুযোগও নেই। সময় সকল দাগই শেষ পর্যন্ত মুছে ফেলে।

সে সময়ে কলারণ গ্রামে বগার বিখ্যাত হাড়ভাঙ্গা ডাক্তার রমজান আলির ক্লিনিকে একজন চোর ধরা পড়ে। তবে লোকটি চোর কিনা যথেষ্ট সন্দেহ আছে। লোকটি অতিশয় দুর্বল। বুড়ো থুরথুরে। লোকটি ক্লিনিকের ভেতরেও ঢোকেনি। সন্যাসী-বাজার হতে নৌকায় করে পানগুছি নদী পার হয়ে কলারণে এসে থাকবে। দুদিন তাকে জমাদ্দার বাড়ির পাশের বটতলায় শুয়ে থাকতে দেখা গেছে। তৃতীয় দিনে ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে এসে হাড়ভাংগা ক্লিনিকের সামনে হা করে দাঁড়িয়ে থেকেছে বেশ কিছুক্ষণ। ক্লিনিকের চালের উপরে আর বেড়া-গোড়ায় অসংখ্য প্লাস্টার অব প্যারিসের ব্যান্ডেজ গোঁজা। লোকটি এগুলো হা করে দেখেছিল। এইভাবে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ডাক্তারের কম্পাউন্ডার এসে তাকে অনুরোধ করেছে, ভেতরে আইসা বসেন। ডাক্তার সাবে পত্তাশীর খাঁ বাড়ির কলে গেছেন। তাগো নয়া বউয়ের ঠ্যাং ভাঙ্গছে। তিনি ফিরলেই আপনের ট্রিটমেন্ট হবে। চিন্তা করবেন না।
কম্পাউন্ডারের এ কথায় বুড়ো লোকটির কোনো ভাবান্তর হয়নি। লোকটি দুপুর থেকে সন্ধ্যে অব্দি সেখানেই একইভাবে তাকিয়ে ছিল। এর মধ্যে সে পানি কিংবা বিড়িও খায়নি। এমন কি রাতের বেলায়ও যখন কম্পাউন্ডার দয়াপরবশ হয়ে তার জন্য খাবার দিতে চেয়েছে—তখনও তাকে নির্বাক—নিশ্চল দেখা যায়। তবে মাঝরাতে কম্পাউন্ডার ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখতে পায়, লোকটি ক্লিনিকের সামনে নেই। চলে গেছে মনে করে নিশ্চিন্ত হলে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু আরেক প্রহর পরে লোকজনের চিৎকারে তার ঘুম ভেঙ্গে গেল। চিৎকারটা হচ্ছে ক্লিনিকের পিছনে ডাক্তারে ঘরের পাশ থেকে। ভাল করে শুনে বুঝল চোর পড়েছে। ছুটে গিয়ে দেখল, এ বাড়ির লোকজন ও পাড়াপ্রতিবেশি একজন চোরকে ধরে আচ্ছা করে পিটাচ্ছে। লোকটির প্রায় মরণ দশা। কে একজন উৎসাহী লোক জানান যে, সে রাতে বাহ্য করতে বাড়ির বাইরে যাচ্ছিল। তখন দেখেছে-- এই লোককে ডাক্তারের ঘরের পাশে গোয়ালঘরে ঘুরঘুর করছে।

এই ঘোরাঘুরিটা বেশ সন্দেহজনক বলে তাকে জিজ্ঞেস করে, এইখানে কী খোঁজেন মেয়া?
লোকটি বলে, ঘোড়া খুঁজি।

--কোন ঘোড়া?
--ডাক্তার সাবের ঘোড়া।

বগা থেকে ডাক্তারি বিদ্যে শিখে এসে কলারণে যখন থিতু হলেন হাড়ভাঙ্গা ডাক্তার রমজান আলি, তখন এই এলাকায় কোনো ডাক্তার ছিল না। কারো হাত বা পা ভাঙ্গলে যেতে হত মোড়েলগঞ্জে। অথবা পিরোজপুর শহরে। তখন পথঘাট অতি খারাপ ছিল। এবং দুরত্বও কম নয়। এইকারণে রমজান আলি এই অজ পাড়া গাঁয়ে এসেই বছর পাঁচেকের মধ্যে নাম করে ফেললেন। একটা ঘোড়াও কিনে ফেললেন। সেই ঘোড়ার পিঠে চড়েই তিনি দূর দূর গাঁয়ে রোগী দেখতে যেতেন। নিজ হাতে দানাপানি খাওয়াতেন। তার তুল্য তাগড়াই ঘোড়া বৃটিশ আমলের পরে আর দেখা যায়নি। ঘোড়াটির গলায় একটি ঘণ্টি বাঁধা ছিল। এই ঘণ্টা বাজলেই লোকে বুঝত এখন বেহানবেলায় ডাক্তার সাবে রোগী দেখতে বের হয়েছেন। আর অপরাহ্নকালে ঘণ্টা বাজলে লোকে বুঝত তিনি রোগী দেখা শেষ করে বাড়ি ফিরছেন। এইবেলা তিনি ক্লিনিকে রোগী দেখবেন। ঘোড়াটি এই এলাকার মানুষের কাছে একটি মান মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা তাদের দাদীজান অথবা নানীজানের কাছে এই ঘোড়াটি দেখেই পক্ষীরাজের গল্প শুনতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। এমন কী দূর গাঁয়ের আত্মীয়স্বজন যারা এখানে বেড়াতে আসত তারা সবাই ঘোড়া না দেখে ফিরে যেত না। নিজ নিজ এলাকায় ফিরে দীর্ঘকাল ধরে সেই ঘোড়াটির গল্প করে কাটিয়েছে।

তবে পথঘাটের উন্নতি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হাড়ভাঙ্গা ডাক্তার রমজান আলি একটা হোন্ডা ৮০ সিসি মোটর সাইকেল কিনে ফেললেন। ফলে ঘোড়াটির যত্ন কমে গেল। তাকে কেনার মত লোকও তখন পাওয়া যায়নি। সর্বোপরি ঘোড়াটিকে ডাক্তার সাহেব বেঁচা-বিক্রি করতে চেয়েছেন বলেও কোনো আলাপ শোনা যায়নি। এইভাবে ঘোড়াটি ধীরে ধীরে অব্যবহারে নিসঃঙ্গ হয়ে গেল। একা একা ঘোরাফেরা করত। মাঝে মাঝে আশেপাশের মাঠগুলোতে ঘুরে বেড়াত। মাঝে মাঝে অনেক রাতে কলারণ টু পত্তাশির মাটির রাস্তায় নিঃসঙ্গ অবস্থায় দেখা গেছে। কোনো কোনো রোগীর বাড়ির দরোজার সামনে দাঁড়িয়ে চিঁহি চিঁহি করে ডাকও ছাড়ত। একদিন এই ডাকও আর শোনা গেল না। লোকে তাকে রাস্তাঘাটে বা মাঠের মধ্যে আর দেখতে পেল না। হয়তো হারিয়ে গেছে। অথবা মরে গেছে। যেখানে মানুষের কথাই মানুষ মনে রাখে না, সেখানে একটা পরিত্যাক্ত ঘোড়ার কথা কে রাখে!

এই ঘোড়াটিকে চুরি করতে আসা লোকটির মুখটা ভাল করে দেখে কম্পাউন্ডার বুঝল, এই লোকটাই আজ সারাদিন ক্লিনিকের সামনে দাঁড়িয়েছিল। লোকটির বুকে কান রেখে শুনল, তখনো মরে নি। হৃদপিণ্ড ধুকপুক করছে। অবস্থার যা গতিক তাতে কিছুক্ষণের মধ্যেই মরে যাবে। তবে মরে গেলে বিপদ হবে। খামোকা পুলিশের হয়রানিতে পড়বে। কম্পাউন্ডার বুদ্ধি করে সবাইকে সরে যেতে বলল। তার মাথায় পানি ঢালার পরে বুড়ো হাবড়া লোকটা চোখ খুলল। তির তির করে তার শুকনো ঠোঁট নড়ছে। কম্পাউন্ডার বহু চেষ্টার পরে বুঝতে পারল—বুড়ো লোকটা বলছে, ঘোড়া কোথায়?

কম্পাউন্ডার তাকে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, কোন ঘোড়া?

--ডাক্তার সাবের ঘোড়া।

ঘোড়াটির সন্ধান কেউ জানে না। স্থানীয় চৌকিদার ততক্ষণে এসে পড়েছে। এলাকার সব খবরাখবরই তার জানা থাকে। চৌকিদার বলল, ঘোড়াটিকে কলারণ গ্রামের পশ্চিম পাড়ার আন্ধাপুকুরে শেষবারের মত পড়ে থাকে দেখেছে। তবে সেটা কবেকার কথা চৌকিদার তা বলতে পারে না।
শুনে বুড়ো লোকটা টলমলো করে উঠে দাঁড়াল। তার মাথা নেতিয়ে পড়েছে। হাত ঝুলে আছে। পা হেলে গেছে। পায়ে চলার মত শক্তি নেই। কোটরাগত চোখ। মৃত একটি লোকই যেন দাঁড়িয়েছে। লোকে তাকে দেখে কিছুটা ভয় পেল। নিরাপদ দূরত্বে দূরে সরে গেল। ততক্ষণে লোকটার গলায় কিছুটা স্বর বেড়েছে। সেই ঘড়ঘড়ে গলায় সে জিজ্ঞেস করল, আন্ধাপুকুরটি কোন দিকে?
কারো সাহস নেই তার কথার উত্তর দেওয়ার। কিন্তু চৌকিদার এককালে ডাকাত ছিল বলেই তার সাহস আছে। হাত তুলে পূব দিকটা দেখিয়ে দিল।
বুড়ো লোকটি সেদিকে কোনভাবে পা নাড়তে চেষ্টা করছে। কিন্তু সে পা সরে কি সরে না। মনে হল পড়ে যাবে। পড়ে গেলেই তার হাড্ডি মাংস গুড়ো গুড়ো হয়ে ঝরে যাবে। সেটা এক ভয়াবহ ব্যাপার হবে। গলগল করে বেরিয়ে পড়বে রক্ত। সেটা সহ্য করার মত লোক এ গাঁয়ে নেই। কিন্তু লোকটা নাছোড় বান্দা। সে আন্ধাপুকুরের দিকেই যাবে। এ ছাড়া তার জীবনের আর কোনো উদ্দেশ্য নেই।
তখন চারিদিকে জ্যোৎস্না উঠেছে। একটা পাগলা হাওয়াও উঠেছে। দূরে কোথাও পাতি শিয়াল ডাকছে। পেঁচা উড়ছে।
চৌকিদার তার বিশাল কাঁধে লোকটিকে তুলে আন্ধাপুকুরের কাছে নিয়ে এল।
আন্ধা পুকুরটি নিস্তব্ধ। এককালে এই পুকুরের জল লোকে খেতো। এখন জমাদ্দার বাজারে একটি টিউব ওয়েল বসায় পুকুরে আর কেউ যায় না।
চৌকিদারের ঘাড়ের উপরে মাথা-এলিয়ে-থাকা বুড়ো লোকটি সোজা হল। পুকুরের দিকে চেয়ে এক অদ্ভুত কন্ঠস্বরে বলে উঠল, ওরে ও আব্দুল আলি মুন্সির ঘোড়া, আর দেরী করিসনেরে বাপ। উঠে আয়।

কে আব্দুল আলি, কি তার ঘোড়া—এসব কিছুই এই কলারণ গ্রামের লোকজন জানে না। তাদের গ্রামে মৃধা বাড়ি আছে। জমাদ্দার বাড়ি আছে। আছে শীল বাড়ি, সরকার বাড়ি। মজুমদার বা ঢালি বাড়িও আছে। এমন কি শেখবাড়িও এলাকায় এক নামে পরিচিত। কিন্তু মুন্সি বাড়ি বলে কোনো বাড়ি নেই। আর আব্দুল আলি মুন্সি নামে কোনো লোক থাকার কথাই নেই। ফলে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন বুড়ো লোকটির কথাকে রোগের বিকার হিসেবেই ধরে নিল। এদের মধ্যে দুএকজন অতি চালু লোক তার ভুল শুধরে দেওয়ার জন্য চেঁচিয়ে বলল, ঘোড়ার মালিক আব্দুল আলি মুন্সি নয় মেয়া—মালিক ডাক্তার রমজান আলি মৃধা।


তখন পুকুরের জলের ভেতরে একটি গভীর আলোড়ণ উঠল। চারিদিকে ঘুর্ণি জল উত্থিত হল। তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল-ঘোড়াটি। তার গলার চারিদিকে সবুজ লতাপাতা আর লাল লাল ফুল। এই ফুলের নাম মালঞ্চলতা। এক কেউ কেউ কুঞ্জলতাও বলে। ঘোড়াটি আকাশ বিদির্ণ করে ডাকল, চিঁহি। চিঁহি।

লোকটি চৌকিদারের ঘাড় থেকে ঘোড়ার দিকে ঝাঁপ দিয়ে পড়ল। তবে পড়ে গেল না। একটা পাখির মত উড়ে গিয়ে ঘোড়ার পিঠে বসল। তার কোমর থেকে একটা থলি বের করে চৌকিদারের হাতে তুলে দিল। তারপর ঘোড়ার উদ্দেশ্য ফিস ফিস করে বলল, বিক্রমপুরে চল। রওশোনেরা চাইয়া আছে। কলারণের সমবেত লোককে কাঁদিয়ে ঘোড়াটি খটাখট শব্দ তুলে জ্যোৎস্নার মধ্যে মিলিয়ে গেল।

চৌকিদার থলিটি খুলে দেখল—তার মধ্যে অনেকগুলো রানী ভিক্টোরিয়ার মাথাওয়ালা কাঁচা টাকা, জিন্না সাবের টুপিওয়ালা নোট আর শেখ মুজিবের হাসি হাসি মুখের ছবিওয়ালা টাকা আছে। আর আছে একটা অতিপুরাতন কাপড়ের টুকরো। কাপড়ের ভাঁজ খুলল। কাপড়ে কালো কালো আঁচড়। ভালো করে দেখলে বোঝা যায়—এগুলো ঠিক আঁচড় নয়—একটি ঘোড়ার ছবি। ছবির নিচে প্রায় অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া অক্ষরে লেখা,


সারা জীবনের লাগি আড়ি আড়ি আড়ি।
ঘোড়া না আনলি যামু না আপনের বাড়ি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন