মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬

মাসুদুজ্জামান : কাফকার প্রেম


"প্রিয়তম ফ্রাউলি বাউয়ার, ... আপনার চিঠি আজ মেঘের বুক চিরে আমার ওপর পুষ্পবৃষ্টির মতো ঝরছে। এ হলো সেই চিঠি, যে-চিঠির জন্যে আমি অধীর আগ্রহ, উদ্বেগ আর উত্কণ্ঠা নিয়ে গত তিন সপ্তাহ ধরে অপেক্ষা করছি।" কী আবেগতপ্ত, হূদয়ের গহনলোক থেকে উঠে আসা ভাষা! কে লিখছেন এই চিঠি? প্রাপক যিনি তার নামতো চিঠির শুরুতেই উত্কীর্ণ হয়ে আছে। কিন্তু প্রেরক কে — সুলুকসন্ধান করলে বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয়। বিশ শতকের মহান লেখক তিনি, আধুনিক কথাসাহিত্যের কিংবদন্তি পুরুষ ফ্রান্ত্স কাফকা।
কাফকার প্রেমানুভব যে কতটা গভীর ছিল, এই চিঠির উল্লিখিত ছত্রগুলোতে শুধু নয়, একাধিক প্রেমিকাকে লেখা চিঠির পর চিঠিতে এর নিদর্শন ছড়িয়ে আছে। সংবেদনশীল কাফকা যেমন তাঁর লেখায় আধুনিক দ্বিধাপন্ন মানুষের সংকট আর আমলাতান্ত্রিক মুখোশকে টেনে খুলে ফেলে সমসময়কে আমাদের সামনে হাজির করেছিলেন, তেমনি ব্যক্তিগত জীবনে তার হূদয়াবেগ যে কতটা তীব্র ছিল, যারা তাঁর জীবনী পড়েছেন, সেই তথ্য তাদের অজানা নেই। রিচি রবার্টসন, তাঁর সর্বশেষ জীবনীলেখক জানাচ্ছেন, কাফকা চারজন নারীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে এসেছিলেন। এদেরকে ঘিরে তাঁর হার্দিক অনুভব যেমন গভীর হয়ে উঠেছিল, তেমনি ঘটেছিল সৃজনীপ্রতিভার বিস্ময়কর স্ফুরণ। এই নারীরা হচ্ছেন ফেলিস বাউয়ার, গ্রেতি ব্লক, মিলেনা য়েসেনেস্কা এবং ডোরা ডায়মন্ট। 

এই লেখার শুরুতেই যে চিঠিটির কথা আছে, কাফকা সেটি লিখেছিলেন ১৯১২ সালের ২৩ অক্টোবর। যাকে লিখেছিলেন সেই প্রাপকের পুরো নাম ফেলিস ফ্রাউলি বাউয়ার। চিঠিটি ফেলিসকে লেখা কাফকার চতুর্থ চিঠি। বুঝতে অসুবিধে হয় না, কাফকা ইতিমধ্যে ফেলিসকে তিন-তিনটি চিঠি লিখে ফেলেছিলেন আর অপেক্ষা করছিলেন প্রত্যুত্তরের। ফেলিস কাফকাকে প্রথম চিঠিটি লেখার পরই কাফকার ফিরতি চিঠিটি এইভাবে ভরে ওঠে উষ্ণ আবেগ আর ভালোবাসার তীব্র অনুভবে। কাফকাকে লেখা ফেলিসের এই চিঠির মাধ্যমেই পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হয়, যে-যোগাযোগ দীর্ঘায়িত হয়েছিল পরবর্তী পাঁচ বছর, প্রেমাবসানের পূর্বক্ষণ পর্যন্ত। কিন্তু এই পরিসমাপ্তির আগে কীভাবে তাঁরা ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন, সেই কাহিনি এতটাই চমকপ্রদ যে কাফকাকে বুঝতে হলে, কাফকার লেখাকে বুঝতে হলে, কাফকা-ফেলিসের প্রেমের সম্পর্কটি বুঝে নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে। কাফকা শুধু চিঠিই লেখেননি, লিখেছিলেন দিনপঞ্জিও। কাফকার সৃষ্টিশীল রচনার পরিপূরক এই চিঠি ও দিনপঞ্জি পাঠ না করলে তাঁর লেখকসত্তাটিকে কখনই ঠিক ঠিক উপলব্ধি করা যাবে না। আমাদের সৌভাগ্য, কাফকার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু লেখক ম্যাক্স ব্রড যদি কাফকার কথামতো তাঁর মৃত্যুর পর ওই দিনপঞ্জি পুড়িয়ে ফেলতেন, যে-অনুরোধ কাফকা জানিয়েছিলেন ব্রডকে, তাহলে আমরা বিশশতকের এই মহান লেখকের সৃষ্টিসত্তার যথার্থ পরিচয় পেতাম না। ফেলিসেরও ধন্যবাদ প্রাপ্য। তিনি যদি কাফকার প্রথম চিঠি থেকে পাঁচ বছর ধরে লেখা প্রায় সাড়ে তিনশো চিঠি বার্লিন থেকে প্রথমে সুইজারল্যান্ড এবং পরে আমেরিকায় পাড়ি দেওয়ার পরও দীর্ঘ ৪৩ বছর যক্ষের ধনের মতো আগলে না রাখতেন, তাহলে এই চিঠিগুলো আলোর মুখ দেখতো না। 

দুই

১৩ আগস্ট ১৯১২ সাল। চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাহা। কাফকার বন্ধু লেখক ম্যাক্স ব্রডের অ্যাপার্টমেন্ট। ওই দিন সন্ধ্যায় সেখানে উপস্থিত এই প্রেমোপাখ্যানের প্রধান কুশীলবেরা — কাফকা, ব্রড ও ফেলিস। দুজনের এই প্রথম সাক্ষাতের কথা অনেকবার নানা প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন কাফকা। এর প্রথম উল্লেখটি পাই ব্রডের কাছে ১৪ আগস্ট লেখা চিঠিতে। কাফকা এই চিঠিতে উল্লেখ করছেন, কীভাবে তিনি তার নতুন পাণ্ডুলিপি 'অনুধ্যান'কে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন বন্ধু ব্রডকে দেখাবার জন্যে। লক্ষ্য ছিল পাণ্ডুলিপিটি চূড়ান্ত করা। কাফকা লিখছেন, 'গতকাল আমরা যখন পাণ্ডুলিপির ছিন্ন অংশগুলোকে বিন্যস্ত করবার চেষ্টা করছিলাম তখনই ওই মেয়েটির প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষিত হয়। এটা হয়তো বোকার মতো একটা কিছু হয়ে গেছে, একটা (গোপনীয়) হাস্যকর পরিস্থিতিও হয়তো সৃষ্টি হয়েছিল।' কাফকা বন্ধুকে ধন্যবাদ দিয়ে বলছেন, তবে সবকিছুই এখন ঠিকঠাক চলছে। পর দিন কাফকা এই প্রথম সাক্ষাত্ সম্পর্কে তাঁর দিনপঞ্জিতে লিখলেন, 'অনেক ভেবে দেখলাম, এই নামটা লিখতে কেমন যেন বিব্রত বোধ করছি — এফ. বি.।' কে এই সংকেতায়িত এফ. বি. সেকথা বুঝতে আমাদের কষ্ট হয় না। 

এরপর ২০ আগস্ট, উভয়ের ওই সাক্ষাতের একসপ্তাহ পর কাফকা তাঁর দিনপঞ্জিতে ফেলিসের দেহের একটা বর্ণনা দিয়েছেন। এই বর্ণনা — ফেলিস দেখতে কেমন ভাবতে গিয়ে অবাক হচ্ছেন, 'শারীরিকভাবে আমি কতটা কাছেই না চলে এসেছি তার।' কাফকার বর্ণনায় ফেলিস তখনও অচেনা এক নারী। অন্যদের সঙ্গে তিনি বসে ছিলেন, কিন্তু ঠিকই চোখে পড়েছিল তাঁর। 'আমি যেহেতু পাশেই বসে ছিলাম, খুব কাছে থেকে প্রথমবারের মতো তাকে দেখি।' ওই দিনের ডায়রিতে কাফকা আরও লিখছেন, 'মিস এফ. বি.। ১৩ আগস্ট আমি যখন ম্যাক্সের বাড়িতে পৌঁছুলাম ও তখন আমার টেবিলের উল্টো দিকে বসে ছিল । ও যে কে, সেটা আমার জানার কৌতূহল ছিল না। তবু কেন যেন সেই মুহূর্তে আমি ওর প্রতি আকৃষ্ট হই। অস্থিসার শূন্য মুখটি যেন শূন্যতাকেই আঁকড়ে ধরছিল। নগ্ন গলা। গায়ে একটা সাদামাটা ব্লাউজ। ওই পোশাকে ওকে খুব ঘরোয়া মনে হচ্ছিল। পরে অবশ্য আমার এই ধারণা পাল্টে যায়। (খুব কাছে থেকে দেখে আমি নিজেকে ওর কাছ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন করে ফেলি। এখন আমার কী করুণ দশাই না হয়েছে! আসলে পৃথিবীর সবকিছু থেকে সাধারণভাবে বিচ্ছিন্ন থাকা ভালো। কিন্তু এই ভালোর প্রতিও আমার বিশ্বাস নেই।) ... প্রায় বসা নাক। গায়ের রঙ ধবধবে সাদা, ঈষত্ সোনালি রোম, ঋজু দেহ, অনাকর্ষণীয় চুল, তীক্ষ চিবুক।' ফেলিসের দেহের এই বর্ণনা শুধু নয়, কাফকা ওই দিনই তাকে প্রথম চিঠিটি লেখেন। সেই চিঠিতে কীভাবে ম্যাক্স ব্রডের বাড়িতে তাদের পরিচয় হয়েছিল সেকথা মনে করিয়ে দেন। ফেলিস যে পরের বছর, অর্থাত্ ১৯১৩ সালে তাঁর সঙ্গে ফিলিস্তিন বেড়াতে যাবেন, সেই প্রতিশ্রুতি নিশ্চয়ই তিনি রক্ষা করবেন। ওই সন্ধ্যায় যেমন এ বিষয়ে দুজনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তেমনি এ নিয়ে দুজনের মধ্যে আরও আলোচনা হওয়াও দরকার বলে কাফকা ফেলিসকে জানাচ্ছেন। ফেলিসের প্রতি কাফকার আকর্ষণের সূত্রপাত হয়েছিল এভাবেই। ফিলিস্তিন যেতে রাজি হওয়ায় ফেলিসের প্রতি আকৃষ্ট হন তিনি। ফিলিস্তিন ছিল তখন কাফকার কাছে এক 'প্রতিশ্রুতিপূর্ণ' স্বপ্নের দেশ। 

কিন্তু এই প্রথম চিঠিতেই কাফকা এমন একটা প্রসঙ্গের অবতারণা করেছিলেন যা থেকে কাফকার স্বভাব ও অভিপ্রায় সম্পর্কে কিছুটা হলেও আঁচ করা যায়। 'শুনতে যতই খারাপ লাগুক আর না-ই লাগুক, আমার অসুস্থ মনের ছবি ফুটে উঠুক আর না-ই উঠুক, অবশ্যই স্বীকার করবো যে আমি এক অস্থির চিত্তের পত্রলেখক। হ্যাঁ, আমার এই অস্থিরতা মারাত্মক হয়ে ওঠে যখন আমার নাগালের মধ্যে টাইপরাইটার থাকে না। কেননা, চিঠি লেখার মেজাজ না থাকলেও আমার আঙুল সবসময় লেখালেখি করার জন্যে উশখুশ করতে থাকে।' কাফকার কথা থেকেই বোঝা যায় লেখালেখির প্রতি তাঁর ছিল তীব্র টান। সেই সঙ্গে চিঠি লিখতে ভালোবাসতেন তিনি। পছন্দের নারীদেরকেও অকপটে মনের কথা বলতে পারতেন। এই সাহস, একালের য়ুরোপ বা পশ্চিমী দুনিয়ায় এখন যতটা সহজ তখন ততটা সহজ ছিল না। কাফকা নিজেও ছিলেন অন্তর্মুখী পুরুষ, সবসময় একধরনের মানসিক উদ্বেগ আর শঙ্কার মধ্যে দিন কাটাতেন। তাঁর স্বভাবটাই ছিল এরকম। কিন্তু ফেলিসের কাছে তিনি যে নিজের মনের কথা খুব সহজেই ব্যক্ত করতে পেরেছিলেন, উল্লিখিত চিঠির বয়ান থেকেই তা বোঝা যায়। শুধু চিঠিতে নয়, ব্রডের অ্যাপার্টমেন্টে ওই প্রথম সাক্ষাতের সময়েই টেবিলের ওপাশে বসা ফেলিসকে তিনি কিছু ছবি দেখতে দিয়েছিলেন। ওই ছবিগুলো তোলা হয়েছিল কিছুদিন আগে বেড়াবার সময়।

কিন্তু কীভাবে অন্তর্মুখী এই মানুষটি অর্জন করেছিলেন সহজভাবে ছবি দেখাবার বা চিঠি লেখার এই অনায়াস ভঙ্গি? নোবেল পুরস্কারবিজয়ী জার্মানভাষী বুলগেরীয় ঔপন্যাসিক ইলিয়াস কানেত্তি এরই একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন 'কাফকার অন্য বিচার ফেলিসের কাছে চিঠি' নামের একটা বইটিতে। কানেত্তি লিখছেন, ফেলিসের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে তিনি ভেহ্মারে ম্যাক্স ব্রডের সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলেন। ওখানে তার পরিচয় হয়েছিল অল্পবয়সী একটা সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে। মেয়েটির সঙ্গে চমত্কার কিছু মুহূর্ত কাটিয়েছিলেন তিনি। কখনও একসঙ্গে ছবি তুলে, কখনও বেড়িয়ে, কখনও কথা বলে জয় করে নিতে চেয়েছিলেন মেয়েটির মন। কিন্তু তিনি লক্ষ করলেন মেয়েটির ঝোঁক কাফকার চেয়েও তরুণ যুবা পুরুষদের প্রতি। এই ঘটনায় আহত না হলেও নারীদের সঙ্গে কীরকম আচরণ করতে হয়, কাফকা অর্জন করেছিলেন সেই সাহস। এখন ওই মেয়েটিরই যেন বিকল্প হয়ে উঠলেন ফেলিস, যাকে চিঠি লেখা যায়, ছবি এগিয়ে দিয়ে দেখানো যায়, একসঙ্গে বেড়ানো যায়, মুখোমুখি বসে লক্ষ করা যায় তার মুখশ্রী। 

এইসময়ে আরও একটা ব্যাপার ঘটেছিল কাফকার জীবনে। তাঁর দিনপঞ্জি ভরে উঠেছিল নানান ঘটনার অনুপুঙ্খ বর্ণনা আর আবেগপূর্ণ কথায়। তাঁর সৃষ্টিশীল লেখালেখিরও তুঙ্গতম মুহূর্ত ছিল সেটি। ফেলিসের সঙ্গে পরিচয়ের পর সৃজনশীলতার উত্সমুখ যেন খুলে গিয়েছিল। একটানে লিখে ফেলেছিলেন 'রায়' গল্পটি। কীভাবে এই গল্পটি লেখা হয় সে সম্পর্কে কাফকা তাঁর দিনপঞ্জিতে লেখেন, 'এই গল্পটি — "রায়" আমি একবার বসেই ২২-২৩ সেপ্টেম্বরের রাতে লিখে ফেলেছি। রাত দশটা থেকে লিখতে শুরু করে শেষ করি ভোর ছটায়। ... শুধু এভাবেই একটি লেখা লিখে ফেলা সম্ভব। এইরকম সুসমঞ্জসভাবে, শরীর ও আত্মাকে সম্পূর্ণ মুক্ত রেখে।' গল্পটি লেখার পর ব্রডকে কাফকা জানিয়েছিলেন, গল্পটি হয়ে ওঠার পেছনে ফেলিস অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছেন আর এজন্যে তিনি তার কাছে পরোক্ষভাবে ঋণী। শুধু তাই নয়, গল্পটি যখন শেষ করেন তখন কাফকার 'মাথার ভেতরে ঘটছিল তীব্র যৌনবিমোচন।' গল্পটির সর্বশেষ জার্মান শব্দটিও এই যৌনবাসনাকেই নির্দেশ করে। উত্কীর্ণ ওই শব্দটি হচ্ছে 'ভেরখের'। গল্পের পটভূমি অনুসারে এর অর্থ হবে 'ট্রাফিক' ব্যবস্থা। কিন্তু এই শব্দটির আরও একটি অর্থ আছে, সেটি হলো 'যৌনসঙ্গম'। কাফকার একজন জীবনীলেখক জানাচ্ছেন, ফেলিসের প্রতি তাঁর যে তীব্র প্রেমাবেগ জেগেছিল, লেখালেখি বা সৃষ্টিশীলতার দিকে তিনি তা ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। ফেলিস সম্পর্কে তাঁর আকর্ষণ সৃষ্টি হওয়ার আরও একটি কারণ ছিল। ব্রডের অ্যাপার্টমেন্টে যে-সন্ধ্যায় দেখা হয়, তখন ফেলিস জানিয়েছিলেন যে তিনি হিব্রু জানেন। ব্রডের পান্ডুলিপি কপি করে দেওয়ার আগ্রহও তিনি দেখিয়েছিলেন। কাফকা এসব কথা জানার পর বেশ অভিভূত হন এবং ফেলিস সম্পর্কে তাঁর মনে একধরনের গোপন অনুরাগের সৃষ্টি হয়। এই অনুরাগ তাঁর মধ্যে একধরনের আচ্ছন্নতা সৃষ্টি করে। 

ফেলিসের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের পর পরবর্তী সাত মাস তাই লক্ষ করলে দেখা যাবে, কাফকা একধরনের ঘোরের মধ্যে ছিলেন। দ্বিতীয়বার সাক্ষাতের আগে প্রথম সাক্ষাতের ছবিটিও তাঁর মানসপটে ছিল খুবই উজ্জ্বল। কাফকা ফেলিসকে যত চিঠি লিখেছেন, যার সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিনশো, তার অর্ধেকই কাফকা লিখেছিলেন এই সাত মাসে। চিঠিগুলোও ছিল দীর্ঘ, কোনো কোনো দিন দু-তিনটি চিঠিও লিখেছেন কাফকা। প্রায় সমস্ত চিঠিই আবেগকম্প্র ভাষায় লেখা। বর্ণনাভঙ্গিও চমকপ্রদ। 

প্রথম থেকেই দেখা যায়, ফেলিসকে তিনি খুব সহজেই আপন করে নিয়েছিলেন। মনে হচ্ছিল অনেক দিনের পরিচিত তিনি। ব্যক্তিত্বের দিক থেকে ফেলিস ছিলেন অজটিল, সহজ-সরল মনের সংবেদনশীল এক নারী। যে-কোনো বিষয়ে দ্বিধাহীনচিত্তে দ্রুত মুক্ত মন নিয়ে সাড়া দিতেন। প্রায় সব বিষয়ে মন্তব্যও করতেন সরাসরি, খোলাখুলিভাবে। ফলে কাফকার সঙ্গে বেশ দ্রুত তার পত্রযোগাযোগ ঘটে যায়। প্রতিদিন কাফকার কাছ থেকে চিঠি আসতো, তিনিও প্রায় একই গতিতে দ্রুততার সঙ্গে জবাব দিতেন। যদিও ফেলিসের চিঠিগুলো রক্ষিত হয়নি তবে কাফকার প্রতিক্রিয়া থেকে — যার উল্লেখ আমরা পাই কাফকার চিঠিতে — বোঝা যায় কত আন্তরিকতার সঙ্গে কাফকার চিঠির জবাব দিতেন ফেলিস। 

কাফকার দিক থেকে তাঁর চিঠিগুলো নানা অভিযোগ আর অনুযোগে ভরা থাকতো। তাঁর প্রধান উদ্বেগ ছিল স্বাস্থ্য নিয়ে। দ্বিতীয় চিঠি থেকেই কাফকা নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সুখী নন, এমন কথা উল্লেখ করে গেছেন। দ্বিতীয় চিঠিতে তিনি লিখছেন, 'আহ্, এখন চিঠি লেখার যে মুড আমার এসেছে, ফ্রাউলিন বাউয়ার, আপনাকে কী আর বলবো! এক অদ্ভুত হিমস্রোত অবিশ্রান্তভাবে আমার সমস্ত স্নায়ু বেয়ে নামতে শুরু করেছে। এখন যা চাইছি, পরমুহূর্তে হয়তো চাইবো অন্যকিছু। এইভাবে চলতে চলতে যখন এক তুমুল অনুভূতির উচ্চগ্রামে এসে পৌঁছুলাম, তখন কিন্তু আমি একেবারেই ভাবতে পারছিলাম না, হায়, প্রথম চিঠি লিখতে বসেই যদি আমার এই অবস্থা হয়, তাহলে প্রথম যেদিন আপনার অ্যাপার্টমেন্টের শেষ সিঁড়িতে গিয়ে পা রাখবো তখন আমার কী অবস্থা হবে। মনের দিক থেকে স্থির হওয়ার আগে বা চিঠি লেখার আগে আমি হয়তো নিজের মধ্যে অনেক অনিশ্চয়তা ঘনিয়ে তুলবো। ... আমার স্মৃতিশক্তি অনেক দুর্বল। আমার দ্বিধা ... মনে পড়ছে একবার ভাবতে ভাবতে তড়াক করে বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে পড়ি। আপনাকে অতি দ্রুত যা লিখবো বলে ভেবেছিলাম তা আর লেখা হলো না। যত দ্রুত বিছানা থেকে উঠেছিলাম ঠিক তত দ্রুত আমি আবার বিছানায় ফিরে যাই। এটা ছিল আমার দ্বিতীয় ব্যর্থতা। আমি আমার এই বোকামি আর উদ্বেগের জন্যে নিজেই নিজেকে ধিক্কার দিয়েছিলাম!'

লক্ষ করলে দেখা যাবে, ফেলিসের সঙ্গে প্রেম নিয়ে সম্পর্কের প্রায় শুরু থেকেই তিনি একধরনের দ্বিধায় ভুগছিলেন। ফেলিসকে নিয়ে উদ্বেগেরও শুরু এই সময় থেকে। পরে এই উদ্বেগ সঞ্চারিত হয় তার শারীরিক অবস্থাকে ঘিরে। নিজের শরীর আর স্বাস্থ্য নিয়েই তিনি চিন্তিত ছিলেন বেশি। ফেলিসকে লেখা পঞ্চম চিঠিটি শুরু করছেন এই বলে যে রাতে তার ঘুম হচ্ছে না এবং অফিসে বসে চিঠি লেখা অসম্ভব হয়ে উঠছে। 'ওহ্, কী নিদারুণ অস্বস্তি আর অনিদ্রার মধ্যেই না রাত্রিটা কাটলো। কেবল শেষের দিকে মাত্র দু ঘণ্টা, যে ভাবেই হোক আমাকে ঘুমাতে হবে — এই উদ্বেগ মাথায় নিয়ে জোর করে ঘুমাবার চেষ্টা চালিয়ে, নিজেকে ছিঁড়ে-খুঁড়ে নিঃশেষ করে কোনোক্রমে সামান্য একটু ঘুমালাম। তাও নামমাত্র ঘুম।' কাফকা এরপর ফেলিসকে যত চিঠি লিখেছেন সেই চিঠিগুলো এইভাবে নানা অনুযোগ অভিযোগে ভরা থাকতো। ফেলিসের কাছে ছিল তাঁর হাজারটা প্রশ্ন, ফেলিস সম্পর্কে খুঁটিনাটি সবকিছু জানতে চাইতেন। বুঝতে চেষ্টা করতেন ফেলিসের অফিসে কী ঘটছে, কী ঘটছে বাড়িতে। সচারচর যেসব প্রশ্ন করা হয় সেরকম প্রশ্ন নয়, ফেলিসের দৈনন্দিন ব্যক্তিগত জীবনযাপন নিয়ে তার অনেক জিজ্ঞাসা ছিল। কখন তিনি অফিসে পৌঁছান, সকালে কী নাস্তা করেছেন, অফিসের জানালা দিয়ে কোন দৃশ্য চোখে পড়ে, কী ধরনের কাজ ফেলিসকে করতে হয়, বন্ধুবান্ধবদের নাম কী, তারা পুরুষ না নারী, যে-ঘরে তিনি ঘুমোন সেই ঘরটি কেমন — এইধরনের প্রশ্ন দিয়ে শুরু হয়েছিল তার প্রাথমিক পর্বের চিঠিগুলো। পরে আরও নানা বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলেন তিনি। কাফকা চাইতেন, ফেলিসের দিনগুলো আরও ভালোভাবে কাটুক, নিরাপদে কাটুক। এই জন্যে বিভিন্ন চিঠিতে অনেকবার তিনি ফেলিসের স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রশ্ন করেছেন, স্বাস্থ্যের প্রতি নজর দিতে বলেছেন। কাফকা এইভাবে ফেলিসের স্বাস্থ্য আর স্বভাব সম্পর্কে যেমন উচ্ছ্বসিত ছিলেন, তেমনি নিজের মানসিক অস্থিরতা, শারীরিক দুর্বলতা এবং ভঙ্গুর স্বাস্থ্য সম্পর্কে ছিলেন উদ্বিগ্ন, শংকিত। অফিসে বসে বা রাতের পর রাত জেগে চিঠি লিখলেও সেই লেখা যে ব্যর্থ হয়নি, 'রায়' গল্পটি দ্রুত লিখে ওঠার কথা স্মরণ করলেই সেটা বোঝা যাবে। এই চিঠিগুলোর ভেতর দিয়েই তাঁর সৃষ্টিশীল রচনার চর্চা সম্পন্ন হচ্ছিল। লেখক হিসেবে তিনি আত্মবিশ্বাস অর্জন করছিলেন। 'রায়' গল্পটি লিখে শেষ করার পর এরকম আত্মবিশ্বাস নিয়েই তিনি বন্ধুদের সেটা পড়ে শোনান। এটি যে আসলেই একটা ভালো গল্প হয়ে উঠেছে সে সম্পর্কে নিঃসংশয় হতে পেরেছিলেন তিনি। এই আত্মবিশ্বাসের ওপর ভর করেই কাফকা পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ এবং মাসগুলোতে লিখতে পেরেছিলেন 'জ্বালানি সরবরাহকারী', 'আমেরিকা' উপন্যাসের ছটি পরিচ্ছেদ, 'রূপান্তরে'র মতো গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু লেখা। ফলে ফেলিসের সঙ্গে হার্দিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার পরই কাফকার দিনগুলো সৃষ্টিশীলতার উজ্জ্বল সোনালি শস্যে ভরে উঠেছিল। ফেলিসের প্রেমই কাফকাকে দিয়েছিল একধরনের নিরাপত্তার বোধ এবং মানসিক শক্তি। এই সাধারণ নারী, যার বিশেষ কোনো চাহিদা নেই, কাফকার জীবনকে সৃষ্টিশীলতার দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল। 

কাফকাও ঠিক এমনটাই চাইছিলেন। তাঁর প্রয়োজন ছিল এমন এক নারীর যার কাছে তিনি বিস্তারিতভাবে তাঁর লেখালেখির কথা, লেখালেখির গুরুত্বের কথা অকপটে বলতে পারবেন। ফেলিসের কাছে কাফকা যখন আবেগঘন চিঠির পর চিঠি লিখে যাচ্ছিলেন তখনই দেখা যায় তাঁর দিনপঞ্জি লেখায় বিরতি ঘটছে। আসলে এই চিঠিগুলোই ছিল তাঁর দিনপঞ্জির সম্প্রসারিত রূপ। ফেলিসকে লেখা কাফকার চিঠির বয়ান অবশ্য অভূতপূর্ব ছিল না, স্বতঃসিদ্ধও নয়। একটি চিঠিতে যা বলছেন, অন্য চিঠিতে ইচ্ছে করলেই তিনি তা সংশোধন করে নিতে পারতেন। আসলে কাফকার চিঠিগুলো ছিল তাঁর নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করে নেওয়ার একধরনের মাধ্যম। নিজের লেখা কেমন দাঁড়াচ্ছে, কী তিনি ভাবছেন, কী তাঁর করণীয়, এইরকম বিষয়আশয় সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন, আলোচনা করেছেন ফেলিসের সঙ্গে। কাফকার সৃষ্টিশীল সত্তাকে এই চিঠিগুলো দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল। দীর্ঘদিন ধরে, বিশেষ করে প্রথম তিন মাস কাফকার মনে ও ভাবনায় অনুভূত হয়েছে এর অভিঘাত। এ কারণেই 'আমেরিকা'র মতো উপন্যাস তিনি লিখতে পেরেছিলেন। এই যে বহুপ্রজ একটা সময়, যখন তাঁর লেখালেখি বিচিত্র ধারায় বিকশিত হচ্ছে, তখনই দেখা গেল ১৯১৩ সালের জানুয়ারি থেকে হঠাত্ তাঁর চিঠি লেখার হার কমে আসছে। সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রেও নেমে এলো একধরনের বন্ধ্যাত্ব। প্রশ্ন উঠতে পারে, এবং ওঠাটাই স্বাভাবিক, কেন অকস্মাত্ কাফকা এতটা নিস্পৃহ হয়ে উঠলেন? 

যে-কোনো প্রেমে প্রেমাস্পদের কাছে পরস্পরের কিছু চাহিদা থাকে, প্রত্যাশা থাকে। কাফকা ও ফেলিস, উভয়ের ক্ষেত্রে এই আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার নিবৃত্তি ঘটেছিল বলে মনে হয় না। কাফকা ফেলিসের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের জন্যে উদগ্রীব হয়ে চিঠি লিখেছিলেন। প্রচলিত অর্থে সেই চিঠিগুলোকে প্রেমের চিঠি বলা যাবে না। কেননা শুধু উচ্ছল প্রেমাবেগের প্রকাশ তাতে ঘটেনি, ঘটেছে কাফকার ব্যক্তিক উন্মোচন। এই আত্মপ্রকাশ, কোনো এক পুরুষ লেখক যখন কোনো এক নারীর কাছে বিমুক্ত করে দেন, তারও নিশ্চয়ই গভীরতর কোনো অর্থ থাকে। আর ওই সাধারণ নারী, সেও কী শুধু লেখক বলে এতটা ঘনিষ্ঠ হবেন কোনো লেখকের? বন্ধু হিসেবে কী তিনি তাঁকে পেতে চাইবেন না, বিশেষ করে সেই লেখক যদি নিজেকে তার কাছে মেলে ধরেন? কাফকা, বোঝাই যায়, নিজের হার্দিক অনুভবকে সৃজনীসত্তার মধ্যে প্রতিফলিত দেখতে চেয়েছিলেন। ভেবেছিলেন ফেলিসের সাহচর্যে নিজের লেখালেখিকে আরও শানিত করে তুলবেন। তিনি কী লিখছেন, কতটা আলাদা হয়ে উঠছে তাঁর রচনা, ফেলিসের মাধ্যমে তাও যাচাই করে নেওয়ার ইচ্ছে ছিল তাঁর। 'রায়' গল্পটি একারণেই ফেলিসকে উত্সর্গ করেছিলেন। বিভিন্ন চিঠিতে, লেখাটি সম্পর্কে ফেলিসের কী ধারণা, জানাতে বলেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য কাফকার, দীর্ঘ পাঁচ বছরেও তাঁর রচনা সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেননি ফেলিস। অথচ এই ফেলিসের চিঠিতেই অন্য লেখকদের সম্পর্কে নানা মন্তব্য থাকতো। 

কাফকার সঙ্গে তুলনাসূত্রে দেখা যাবে, ফেলিস যেখানে সহজ কথা সরাসরি বলতে পছন্দ করতেন, কাফকার চিঠিগুলো সেখানে আত্মগত ভাবনার গ্রন্থনায় কিছুটা জটিল। কাফকা চেয়েছিলেন ফেলিস এককভাবে শুধু তাঁরই কথা বলবেন, অন্তত চিঠিপত্রে। প্রেমিকার কাছ থেকে নিজের লেখা সম্পর্কে প্রত্যাশা করেছিলেন কোনো-না-কোনো মন্তব্য। ১৯১২ সালের ১১ ডিসেম্বর, অর্থাত্ তাদের পারস্পরিক পরিচয়ের চার মাসের মাথায় কাফকা তাঁর প্রথম বই 'অনুধ্যান'কে ফেলিসের কাছে পাঠিয়ে দিয়ে লিখেছিলেন, 'অনুগ্রহ করে আমার এই দুর্বল বইটির প্রতি কিছুটা হলেও সদয় থেকো! সেদিন সন্ধ্যায় আমরা যখন এই বইটি বিন্যস্ত করছিলাম, সেই অংশগুলোও এখানে আছে। লক্ষ করলে দেখবে, সময়ের দিক থেকে এর বিভিন্ন অংশের মধ্যে কত ফারাক। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলি, এর একটা অধ্যায় তো নিশ্চিতভাবে আট থেকে দশ বছর আগের লেখা। কম মানুষকেই বইটা দেখিও, তা না হলে আমার সম্পর্কে তোমার ধারণা হয়তো পাল্টে যেতে পারে।' ১৩ ডিসেম্বর কাফকা আবার উল্লেখ করলেন, 'যে দোষত্রুটি থাকুক না কেন, আমি খুবই খুশি এই ভেবে যে আমার বইটি ইতিমধ্যে তোমার কাছে পৌঁছেছে।' কিন্তু আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করি, ফেলিস এই বইটি সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেননি। নিজের লেখা সম্পর্কে প্রিয়জনদের কাছ থেকে একজন লেখক যে ধরনের প্রতিক্রিয়া আশা করেন, ফেলিস সেই ধরনের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি। বরং কাফকার সমস্ত ক্ষোভ গিয়ে পড়লো সেই লেখকদের প্রতি, যে-লেখকদের সম্পর্কে ফেলিস উচ্ছ্বসিত ছিলেন। ফেলিসের এরকমি একজন প্রিয় লেখক ছিলেন হের্বার্ট ইলেনবার্গ। কাফকা এর প্রতিক্রিয়ায় ফেলিসকে লিখেছিলেন, 'তোমার চিঠিতে যেসব মানুষের কথা আছে, আমি তাদের সবার সম্পর্কে ঈর্ষা বোধ করছি; তাদের নাম থাকুক আর নাই থাকুক, পুরুষ হোক কিংবা নারী, ব্যবসায়ী এবং লেখক (এদের প্রতি তো বটেই) ... আমি ভেরহেল, সফোক্লিস, রিকার্ডা হাচ, লাজেরলফ, ইয়াকবসেন সবার প্রতি ঈর্ষান্বিত। ... আমি এদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চাই, সবার সঙ্গে, কারণটা এই নয় যে আমি তাদের ক্ষতি করতে চাই, আসল কারণ হচ্ছে আমি তাদেরকে তোমার জীবন থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে চাই, তোমাকে তাদের কাছ থেকে সরিয়ে আনতে চাই। তুমি সেই চিঠিগুলোই পড়বে যে-চিঠিগুলো শুধু তোমাকে উদ্দেশ্য করে লেখা হবে, লেখা হবে তোমার পরিবার সম্পর্কে, এবং অবশ্যই অবশ্যই আমাকে নিয়ে!' 

পরদিন রবিবার ফেলিসের কাছ থেকে আকস্মিকভাবে একটা চিঠি এলো। কাফকা এই চিঠির জন্যে ফেলিসকে ধন্যবাদ জানিয়ে কেন ঈর্ষা বোধ করছেন তার ব্যাখ্যা দিলেন, '... তুমি আমার ছবি যতটা পছন্দ করেছিলে, বই ততটা পছন্দ করোনি।' বোঝা যায়, কাফকার বই সম্পর্কে ফেলিস কোনো কথা বলেননি বলে ভীষণ আহত বোধ করেছিলেন তিনি। ১৯১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই ক্ষোভেরই তীব্র প্রকাশ ঘটলো একটা চিঠিতে, 'প্রিয়তমা, শোনো! আমাদের মাঝে কারুরই স্থান হবে না, আমাদের আশে-পাশেও থাকবেন না কেউ।' অন্য লেখকদের প্রতি কাফকার এই যে ক্ষোভ, সেই ক্ষোভ আসলে ওই লেখকদের প্রতি নয়, পরোক্ষভাবে ফেলিসের প্রতি প্রকাশ পাচ্ছিল। তিনি ভেবে পাচ্ছিলেন না কেন ফেলিস তাঁর লেখা বুঝতে পারছেন না। অথচ কাফকার প্রয়োজন ছিল ফেলিসের মন্তব্যের সূত্রে লেখক হিসেবে মানসিক শক্তি সঞ্চয় করা। তখনও তিনি যা লিখছিলেন সেই লেখাগুলোর সাফল্য সম্পর্কে নিঃসংশয় ছিলেন না। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে চলছিলেন বলে ফেলিসের কাছ থেকে লেখাগুলো সম্পর্কে ধারণা পেতে চাইছিলেন। 'রূপান্তর' গল্পটি লিখে শেষ করার চারদিন পর 'অনুধ্যান' গল্পটি প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত এই বইটি ফেলিসের কাছে পাঠিয়ে তাঁর অভিমতের জন্যে কাফকা সতেরো দিন অপেক্ষা করেছিলেন। প্রতিদিনই চিঠি আদান-প্রদান হতো, কিন্তু কাফকার প্রতীক্ষার অবসান হলো না। ইতিমধ্যে 'রূপান্তর' লেখা হয়ে গেছে, লেখা হয়ে গেছে 'আমেরিকা'র একটা বড়ো অংশ, কিন্তু ফেলিসের কোনো সাড়া পেলেন না। ধীরে ধীরে ফেলিস সম্পর্কে তাঁর প্রদীপ্ত উত্সাহ ক্ষীণ হতে হতে একসময় নিভে গেল। 

কাফকার এইসময়ের চিঠিগুলো পড়লে বোঝা যায়, অন্য লেখকদের কথা উল্লেখ করে ফেলিস কাফকাকে শুধু আহতই করেননি, ফেলিসের ওপর থেকে তাঁর মন উঠে যায়। ১৯১৩ সালের ১৪ জানুয়ারি লেখা চিঠিতে ফেলিসকে তিনি লিখছেন, 'একবার তুমি বলেছিলে আমি যখন লিখবো, তুমি তখন আমার পাশে বসে দেখতে চাও। শোনো, এরকম হলে আমি তো লিখতেই পারবো না। ... লেখা মানে একজন যা নয় তারচেয়েও বেশি কিছু প্রকাশ করা ... এজন্যে লেখার সময় কোনো মানুষই পুরোপুরি নিঃসঙ্গ থাকতে পারেন না। কেন এরকম হবে, কেউ যখন লিখবে তখন তার চারপাশে থাকতে হবে অপার নৈঃশব্দ্য। রাত্রিকেও তাই মনে হয় যতটা শব্দহীন থাকবার কথা ততটা শব্দহীন বা নিরব নয়।' তিনি ফেলিসের সাহিত্যবোধ সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে পড়েন। পত্র যোগাযোগর মধ্য দিয়ে স্থাপিত তিন মাসের মধুময় স্বর্গ থেকে পতন ঘটে কাফকার। ফেলিস মূর্তিমান সমস্যা হিসেবে আবির্ভুত হন কাফকার জীবনে। নিঃসঙ্গ রাত, যে-রাতের জন্যে তিনি অপেক্ষা করতেন লেখালেখি করবেন বলে, সেই রাতগুলোকে তিনি হারিয়ে ফেলতে পারেন বলে শঙ্কিত বোধ করতে থাকেন। কাফকার লেখকজীবন এই পটভূমিতে নতুন এক পরিস্থিতির দিকে বাঁক নেয়। 


'কেবল লেখালেখি করবার জন্যেই জন্ম হয়েছে আমার ... সময় খুবই কম, শক্তিও সীমিত। অফিসকে মনে হয় ভয়ঙ্কর একটা জায়গা, অ্যাপার্টমেন্টটা কোলাহলে পূর্ণ। যদি কোনো স্বচ্ছন্দময়, একমুখী জীবন না পাওয়া যায় তাহলে কিছুটা ঘুরে বাঁক নিয়ে যা কিছু করা সম্ভব, একজন মানুষের তা-ই করা উচিত।' এটা ছিল ফেলিসকে লেখা কাফকার প্রথম দিককার একটা চিঠি, তাঁর নবম চিঠি। চিঠিটি কাফকা লিখেছিলেন ১৯১২ সালের ১ নভেম্বর। নিজের লেখালেখি সম্পর্কে কাফকা কতটা নিষ্ঠাবান ছিলেন, কী ধরনের আচ্ছন্নতা তাঁর ছিল, চিঠির ভাষ্য থেকেই সেটা বোঝা যায়। নিজের শরীর নিয়ে তাঁর যে উদ্বেগ, সেই উদ্বেগও তিনি অনুভব করতেন লেখালেখি করতে পারবেন কিনা, পারলে কতদিন সেটা সম্ভব হবে, তা-ই নিয়ে। কাফকা সবচেয়ে বেশি উত্কণ্ঠিত ছিলেন তাঁর দীর্ঘকায় শীর্ণ শরীর নিয়ে, 'আমি জানি, আমি হলাম সবচেয়ে ক্ষীণকায় মানুষ (ব্যাপারটা হলো একারণেই স্যানিটোরিয়ামে আমি কোনো আগন্তুক বলে বিবেচিত হবো না)।' এই মানুষটিই যখন প্রেমের জন্য উন্মুখ হয়ে উঠছেন তখন তাঁর পক্ষে উত্কণ্ঠা অনুভব করাই হয়তো স্বাভাবিক। কেননা প্রেম হচ্ছে শরীরী, সুস্বাস্থ্যের সঙ্গেও এর সম্পর্ক গভীর। কাফকা মনে করতেন, প্রেমের জন্যে, কাজের জন্যে, এমনকি বেঁচে থাকার জন্যে তাঁর শরীর একেবারেই উপযুক্ত নয়। নিজের ক্ষীণ শরীর সম্পর্কে তাই তাঁর অপরিসীম উত্কণ্ঠা ছিল, 'এটা নিশ্চিত যে আমার শারীরিক অবস্থাই হচ্ছে আমার উন্নতির প্রধান বাধা। এরকম একটা শরীর নিয়ে কোনো কিছু করা সম্ভব নয়। ... দুর্বলতার কারণে আমার শরীর অনেক দীর্ঘ। এই শরীরে এমন চর্বি নেই যা উষ্ণতা দিয়ে আমাকে রক্ষা করতে পারে, আমার ভেতরের উত্তাপকে সংরক্ষণ করতে পারে। সমগ্র শরীরটাকে নষ্ট না করে আমার দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে পারে, আত্মাকে মাঝে মাঝে জাগিয়ে রাখতে পারে, এরকম চর্বিও নেই আমার। কী করে আমার দুর্বল হূিপন্ড, যা আমাকে দেরিতে হলেও প্রায়শঃই সমস্যায় ফেলছে, আমার দীর্ঘ পা অবধি রক্ত সঞ্চালনের কাজ করতে পারবে?' ফেলিসের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর অন্য আরেক নারী মিলেনা য়েসেনেস্কার সঙ্গে যখন তার সম্পর্ক হয়, তখনও এই দুর্বল শরীরের কথা ভুলতে পারেননি তিনি। 

'রায়' গল্পে, যেটি তিনি লিখেছিলেন ফেলিসের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার অব্যবহিত পর, তাতেও এই দুর্বল ক্ষীণকায় এবং মৃত মানুষের কথা আছে। এমনকি কাফকা যখন রোগাক্রান্ত হয়ে স্যানেটোরিয়ামে শেষ দিনগুলো কাটাচ্ছিলেন, ডাক্তারের নিষেধ ছিল কথা বলা, তখন ফেলিস সম্পর্কে লিখে জানিয়েছিলেন, 'একদিন আমি হয়তো সে এবং তার কোনো বন্ধুর সঙ্গে বাল্টিক সমুদ্রোপকুলে বেড়াতে যাব। কিন্তু একটা কারণে আমি কুণ্ঠিত লজ্জিত হয়ে থাকবো, আর সেটা হচ্ছে আমার শীর্ণতা এবং ভয়।' কাফকা মনে করতেন তাঁর শরীর হচ্ছে একটা দর্শনীয় বস্তু, যা সবাই দেখছে। নিঃসঙ্গ এই শরীরে এমনকিছু হয়তো ঢুকে পড়বে যা তাঁর মৃত্যুর কারণ হতে পারে। শরীরে যাতে এরকম অজানা কিছু ঢুকে না পড়ে সেইজন্য কাফকা অনেক রাত নির্ঘুম কাটিয়ে দিয়েছেন। শরীরী সংকটের কথা ভেবেই নিজের ওপরও তিনি আস্থা রাখতে পারেননি। ফেলিসকে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, 'আমি তোমাকে ভালোবাসি এফ.। তবে সেটা আমার ক্ষমতার সীমার মধ্যেই, আর এ ব্যাপারে তুমি আমাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পার। কিন্তু অন্য কিছু সম্পর্কে এফ. আমি কিছুই বলতে পারবো না। কেননা সে সম্পর্কে আমি নিজেই পুরোপুরি জানি না। চমক আর হতাশাগ্রস্ততা আমার বেলায় এইভাবে একটার পেছনে আরেকটা অবিরাম বয়ে চলে, যার শেষ নেই।' শরীর সম্পর্কিত এই উদ্বেগ থেকেই কাফকা আবিষ্কার করেছিলেন, লেখালেখি হচ্ছে এমন একটা কাজ যা তিনি স্বাচ্ছন্দের সঙ্গে করতে সক্ষম। ফলে কাফকার কাছে লেখালেখিই হয়ে উঠেছিল সবকিছু। যা কিছু শক্তিশালী বা ক্ষমতাধর, তাই তাঁর মধ্যে ভীতির সঞ্চার করেছিল। ভয়ের এই অনুভবই হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবনভাবনার কেন্দ্রীয় বিষয়। ফলে বিয়ে, সংসার বা সন্তান কোনোটাই নয় — এইরকম জীবনই বেছে নিয়েছিলেন তিনি। ফেলিসের সঙ্গে একারণেই তাঁর সম্পর্ক শীতল হতে শুরু করে।

শরীর সম্পর্কে কাফকা ছিলেন অসম্ভব সচেতন। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মধ্যে যাতে সুসমঞ্জস অবস্থা বজায় থাকে, সেই জন্যে তিনি শরীরচর্চা করেছেন, সাঁতার কেটেছেন, দীর্ঘ পথ হেঁটেছেন। কিন্তু তার পরেও শরীর নিয়ে তাঁর ভীতি কাটেনি। তিনি একসময় ভেবেছিলেন, ফেলিসকে তিনি কখনই পাবেন না। কেননা, শরীরী সংকটের কারণে তিনি হয়তো নপুংসক বা নির্বীর্য হয়ে যাবেন। এরপর থেকেই কাফকার অন্তর্গত সংগ্রাম ছিল — কীভাবে বিয়ে না করে থাকা যায়। ফেলিসের শরীর নিয়ে কাফকার মধ্যে যে কুণ্ঠা দেখা গেছে, বিশশতকের অন্য কোনো লেখকের মধ্যে তা দেখা যায়নি। শরীরী এই সংকট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যেই তাঁর প্রয়োজন ছিল ফেলিসের কাছ থেকে শক্তি সঞ্চয় করা। ফেলিসের প্রেম এভাবেই কাফকার কাছে হয়ে উঠেছিল শক্তি সঞ্চয়ের উত্স। ফলে সব দ্বিধা অতিক্রম করে ১৯১৩ সালের ১৬ জুন তিনি ফেলিসকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু এই প্রস্তাব দেওয়ার পর তাঁর মনে দাম্পত্যজীবন সম্পর্কে ভয়ের সঞ্চার হয়। এর পরে লেখা প্রায় সব চিঠিতে তিনি কোনো নারীর সঙ্গে জীবন কাটাতে পারবেন কিনা, সে সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করেন। ফেলিসকে তিনি জানান, 'আমার যে কী সংকট তা যদি একটা তালিকা করে পাঠাই, তাহলে তা হয়ে দাঁড়াবে অনিঃশেষ একটা তালিকা। ... আমি আমাদের ভবিষ্যত নিয়েও শঙ্কিত।' বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার পর শুরু হয় তাঁর বিয়ে না করার সংগ্রাম। কিন্তু কিছু দিন পর দেখা গেল, তিনি যেমনটা ভেবেছিলেন, ফেলিসকে ভুলে যাবেন, ভুলতে পারেননি। ফলে আবার শুরু হলো হার্দিক পত্রালাপ। ১৯১৪ সালের ১ জুন তাঁদের বাগদান সম্পন্ন হয়। কিন্তু এই বাগদান শেষ হতে না হতেই আবার বিয়ে সম্পর্কে তাঁর সংশয় দেখা দেয়। ছয় সপ্তাহ পর ১২ জুলাই আক্সানিসে হফ নামের একটা হোটেলে তাঁদের মধ্যেকার বাগদান ভেঙে যায়। এই দিন কাফকার মনে হয়েছিল, তাঁকে ঘিরে বুঝি বিচারসভা বসেছে। 

বাগদান ছিন্ন করার বিষয়ে কাফকার আগ্রহই ছিল বেশি। কাফকা এভাবে সম্পর্ক ভেঙে দিতে চাইলে তাঁকে যখন অভিযুক্ত করা হয় তিনি তাঁর কোনো জবাব দেননি। ঘটনাটি কাফকাকে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে তিনি এর প্রতিক্রিয়ায় লিখে ফেলেন অন্যতম প্রখ্যাত গল্প 'বিচার'। এরপর দীর্ঘ তিন মাসের নীরবতা। কাফকা ও ফেলিসের মধ্যে কোনো যোগাযোগ ছিল না, চিঠির আদান-প্রদানও হয়নি। ওই বছরের অক্টোবরের দিকে মঞ্চে আবির্ভুত হন গ্রেতি ব্লক। ব্লক কাফকা ও ফেলিসের সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে এগিয়ে আসেন। পালন করেন মধ্যস্থাকারীর ভূমিকা। কাফকা এইসময় গ্রেতিকে একটা চিঠিতে কেন তাঁর মধ্যে বিবাহভীতি জন্ম নিয়েছিল, লিখে জানিয়েছিলেন। বাগদান ও বিয়ের মধ্য দিয়ে ফেলিসই হয়ে উঠছিলেন 'সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু'। এটাই কাফকার কাছে ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছিল। কাউকে বিয়ে করলে যদি এমনটাই ঘটে, অর্থাত্ লেখালেখির বিষয়টি কেন্দ্রচ্যুত হয়ে যায় আর এক নারী প্রধান হয়ে ওঠে তাহলে ফেলিস কেন, কাউকেই তিনি বিয়ে করবেন না। এভাবেই কাফকা নিজেই হতে চেয়েছেন তাঁর ভঙ্গুর শরীরের নিয়ন্ত্রক। তাঁর লেখালেখির স্বার্বভৌমত্ব কেবল এভাবেই রক্ষা করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেছিলেন। লেখালেখির জন্য তাঁর আসলে চাই অখন্ড নিঃসঙ্গতা, রাতের পর রাত, কোনো নারী নয়। ফলে আবার তিনি ফেলিসকে অগ্রাহ্য করা শুরু করলেন। এইসময় প্রায় তিন মাস তিনি ফেলিসের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখেননি, লেখেননি একটি চিঠিও। ১৯১৫ সালের জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত এরকমি চলছিল। লেখালেখিই হয়ে উঠেছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান। ১৯১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি লিখে ফেলেন 'পেনাল কলোনিতে' নামের গল্প। লক্ষ করলে দেখা যাবে, বাগদান-ছিন্ন পরবর্তী এইসময়টাই ছিল কাফকার জীবনের দ্বিতীয় ফলপ্রসূ সৃষ্টিশীল সময়। 

কাফকা এই সৃষ্টিশীলতা সম্পর্কে তাঁর দিনপঞ্জিতে লেখেন, বাগদান ভেঙে গেলে মুক্তির যে স্বাদ তিনি পেয়েছিলেন তা ছিল অভূতপূর্ব এক অভিজ্ঞতা। লেখালেখির কারণেই কোনো নারীর সঙ্গে কাফকার বাস করা সম্ভব হবে না, বিয়ে তো নয়ই। ফলে ফেলিসের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু আবার গ্রেতির মধ্যস্থতায় দুজনের দেখা হয়। মেরিয়েনবাদে বেড়াতে যান দুজন। ওখান থেকে ঘুরে আসার পর তাঁদের সম্পর্ক আবার পুনঃস্থাপিত হয়। চিঠিপত্রের যোগাযোগও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু আগে কাফকা ফেলিসকে যে ধরনের দীর্ঘ আবেগময় চিঠি লিখতেন, সেই ধারা কমে আসে। আসলে কাফকা ফেলিসকে যত চিঠি লিখেছিলেন তার প্রায় ৮০ ভাগ চিঠি ছিল প্রথম দু-বছরে লেখা। পরবর্তী তিন বছরে তিনি লিখেছিলেন অবশিষ্ট ২০ ভাগ চিঠি। দীর্ঘ চিঠি থেকে কাফকা নেমে এসেছিলেন ছোট ছোট পোস্টকার্ডে। এরই সূত্র ধরে ১৯১৭ সালের ১২ জুলাই ফেলিস ও কাফকার আবার বাগদান সম্পন্ন হয়। কিন্তু ওই বছরের শেষ দিকে কাফকা যক্ষা রোগে আক্রান্ত হলে সেই বাগদানও ভেঙে যায়। দ্বিতীয় এবং চিরকালের মতো দুজনের ছিন্ন হয়ে যায় এই সম্পর্ক। 

ফেলিসের জীবনে এরপর স্থিতি এলেও কাফকার জীবনে আসেনি। যক্ষা রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি প্রথমে ছোট বোন ওত্তলার গ্রামের বাড়িতে, তারপর পাড়ি জমান বার্লিনে। তিন বছর পর ভিয়েনার এক অনুবাদক মিলেনা য়েসেনেস্কার সঙ্গে চিঠির মাধ্যমে কাফকার পরিচয় হয় এবং তাঁরা প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু বছর দুয়েক চলার পর এই সম্পর্ক ভেঙে যায়। ১৯২৩ সালে এরপর পরিচয় হয় পোলিশ বংশোদ্ভূত ২৫ বছর বয়সী ডোরা ডায়মন্টের সঙ্গে। এই ডোরার সঙ্গেই জীবনের শেষ দিনগুলো কাটাবার মুহূর্তে ১৯২৪ সালের ৩ জুন বার্লিনের একটা স্যানেটোরিয়ামে তাঁর মৃত্যু হয়।

অন্যদিকে ফেলিস ১৯১৯ সালে বার্লিনের এক ব্যাংক ব্যবসায়ীকে বিয়ে করে সপরিবারে প্রথমে সুইজারল্যান্ড এবং পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে বসবাস করতে থাকেন। ১৯৬০ সালে মৃত্যুর আগে তাঁকে লেখা কাফকার সব চিঠি কাফকার প্রকাশককে দিয়ে যান। ১৯৬৭ সালে প্রথমবারের মতো সেই চিঠি প্রকাশিত হয়। এক মহান লেখক এবং তাঁর প্রেমিকার অবিস্মরণীয় এই প্রেমকাহিনি তখনই বিশ্ববাসীর নজরে আসে। লেখক ও মানুষ কাফকা সম্পর্কে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কাফকাপ্রেমীদের ধারণা আরও সুস্পষ্ট হয়ে যায়। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন