মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬

মাহবুব লীলেন'এর গল্প : বাজারলক্ষ্মী

নৈশুন্দি ছাড়া অন্য কারো মুখে শুনলে কথাটা কানেই উঠত না। এরকম বাজার-চলতি যৌনগন্ধী কথাবার্তা আমরা হামেশাই শুনিবলি। কিন্তু যেখানে নৈশুন্দিকে দেখে গত মাসকয়েক আমি কথাবার্তায় সভ্যতার চর্চা করছি শব্দেবাক্যে ছাঁকনি বসিয়ে; সেখানে তার মুখে এরকম কথা আমাকে একেবারে বোকা বানিয়ে দেয়...

ঘোরতর ট্রাফিক জ্যামে একদিন গাড়ি থামিয়ে আমাকে তুলে একটা রেস্টুরেন্টে বসিয়ে রমিজ ভাই জিজ্ঞেস করলেন- খাওয়া দাওয়া তো এখনও হয়নি?


না হয়নি এখনও

ভাতের প্রথম লোকমা চাবাতে চাবাতে দ্বিতীয় প্রশ্ন করলেন- কবিতা-ছবিতা তো অনেক দিন থেকেই লিখছ। পয়সাকড়ি কিছু হয় ওইসব থেকে?

- কবিতা থেকে পয়সা আসবে কীভাবে?

ভাতের প্লেট শেষ করে এক ঢোক পানি গিলে আবার মুখ খোলেন- কবিতা-টবিতা খুব একটা বুঝি না। কিন্তু টুকটাক যা চোখে পড়ে তাতে মনে হয় তোমার আইডিয়াগুলা খারাপ না। তা এইগুলা দিয়া তো দুইটা পয়সা আয় ইনকাম করা যায়...

কবিতা দিয়ে আয় ইনকাম বলতে আমি বুঝি কোনো পত্রিকায় লেখা দিয়ে সম্মানী পাওয়া কিংবা প্রকাশকের কাছে পাণ্ডুলিপি দিয়ে রয়ালিটি নেয়া। কিন্তু বড়ো লেখকরাই যেখানে প্রকাশকদের হাতে পায়ে ধরে বই ছাপায় সেখানে আমি কী আশা করতে পারি। আমি ভাবলাম রমিজ ভাই হয়ত আমার বইটই ছাপাতে চায়...

ভাবনাটাকে আরেকটু আগানোর আগেই রমিজ ভাইর গলা শুনলাম- তুমি আমার সঙ্গে কাজ করো। এক অর্থে বলতে পারো কবিতারই কাজ...

পদের নাম ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর। আমিই ডিরেক্টর আমিই অফিসার আমিই পিয়ন আমিই একমাত্র লোক। রমিজ ভাই বিজ্ঞাপন তৈরি করেন। তিনি নিজেই সিইও নিজেই চিফ একাউন্টেন্ট। সজলের পদ ডিরেক্টর অডিওভিজুয়াল আর ডিরেক্টর মার্কেটিং হলো নৈশুন্দি...

রমিজ ভাই চলেন চোস্ত ফরমাল পোশাকে। সজল সাকসেসফুল কেয়ারলেস পোশাকে সব সময় স্মার্ট। নৈশুন্দি সব পোশাকই পরে যথেষ্ট রকমের শরীর দেখার উপযোগী করে আর রমিজভাই আমাকে বললেন তোমার গেটাপ যেমন আছে তেমনই থাকবে। মানে আউলাঝাড়া। তবে মাঝেমধ্যে চুলেদাড়িতে শ্যাম্পু দিও না হলে গন্ধ বেরোয়...

আমার কাজ বিজ্ঞাপনের আইডিয়া তৈরি করা। যদিও আইডিয়াগুলোকে রমিজ ভাই আর সজল মিলে সাইজ করতেন তবু সবার কাছে বলতেন আইডিয়াগুলো আমার তৈরি। সাথে এটাও যোগ করে দিতেন যে ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া লোকজন অনেক স্মার্ট আর পাংচুয়াল হলেও আইডিয়ার দিক থেকে একজন খাঁটি কবি অনেক বেশি কাজের। যদিও এদের দিয়ে কাজ করানোটা একটা বড়ো চ্যালেঞ্জ। এরা একটু পাগলা টাইপের হয়। নাওয়া খাওয়ায় খেয়াল নেই। ভাতের চেয়ে পছন্দ চা-বিড়ি। দিনের চেয়ে রাতে মাথা খেলে বেশি...

প্রথম কয়েকদিন এর তার সাথে খিলখিল হাসি- ঢলাঢলি ফোন আর কড়া পারফিউম ছড়িয়ে পাশ দিয়ে যাবার সময় ভেতরে একটা মোচড় ছাড়া নৈশুন্দির সাথে আমার কোনো আলাপই হয়নি। ওরে আমার পুরা একটা ঢলানিই মনে হতো। কোনো মিটিংয়ে তার প্রথম কাজই হলো বড়ো গলা ব্লাউজ পরে টেবিলে দুই কনুই ভর দিয়ে ঝুঁকে যে কোনো ছুতায় খিলখিল করে হাসা। তারপর চোখ ঠোঁট নেড়ে গায়ের সুগন্ধি ছড়িয়ে ফোকাল পার্সনের ব্যক্তিগত গুণ আর যোগ্যতা আবিষ্কার করে মুগ্ধ হয়ে তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর বাগানো। এবং তারপর বাজেট নেগোসিয়েশন থেকে বিল আদায় পর্যন্ত সবগুলো খিলখিল ফোন আর দিনে রাতে সেজেগুজে ওয়ান-টু-ওয়ান মিটিং কিংবা ডিনারের দায়িত্ব নৈশুন্দির একার...

আমি এড়িয়েই চলতাম। দাম দেখিয়ে সেও একটু দূরেই চলত। কিন্তু পরপর কয়েকটা আইডিয়া বিক্রি হয়ে যাবার পর হঠাৎ একদিন বলে বসল-- ঘাসের ডগা নড়ে চড়ে। ছাগি তোমায় মনে পড়ে’ এইসব দেখি ভালোই পারো...

তারপর থেকেই যেখানে সেখানে আমাকে খোঁচা মারা তার একটা শখে দাঁড়িয়ে গেলো; যার প্রধান বিষয় হলো কবি আর কবিতা নিয়ে যাচ্ছেতাই তামাশা। একদিন অনেক প্লান করে তাকে কবিতার কিছু বেসিক জিনিস বোঝাতে গেলে ধুম করে বুকের আঁচল ফেলে দিয়ে আমার দিকে ঝুঁকে এসে বলল-- নৈশুন্দি নিজেই একটা কবিতা; তোমার মতো বাকবাকুমের কাছে তার কবিতা বোঝার দরকার নেই...

তাকে যতই বোঝাই যে আমি ওরকম কবিতা লিখি না। ততই সে জিজ্ঞেস করে-- আমাকে নিয়ে তুমি কিছুই লিখো না বলতে চাও?

আমি তাকে পরিষ্কার বুঝিয়ে দেই যে আমার কবিতায় এরকম ঢলানির কোনো জায়গা নেই। আমার কবিতার নারী অন্য নারী। তারা অন্য রকম...

নৈশুন্দি হাসে-- খানকির পোলা। আমারে নিয়া কবিতা লিখো না। কিন্তু আমার ফিগার কল্পনা কইরা ঠিকই তো হাত মারো...

নৈশুন্দি এমন কথা বলতে পারে কল্পনাও করা কঠিন। আমি হা করে বসে থাকি। অতদিন আমি একা একা নৈশুন্দির কথাবার্তাকে ফলো করা শুরু করে দিয়েছি। যেখানে পরিচিতরা থাকে না সেখানে আমি তার স্টাইল কপি-পেস্ট করি। কীভাবে কথার ফাঁক দিয়ে শব্দ করে হাসি ঢুকিয়ে দিতে হয়। বেকায়দায় পড়লে কীভাবে এড়িয়ে যেতে হয় আর সবচে বড়ো কথা ছাপার অক্ষরের মতো গোটা গোটা উচ্চারণে কীভাবে কথা বলা যায় সবই আমি নৈশুন্দিকে দেখে অনুকরণ করি। কিন্তু এ কোন নৈশুন্দি?

এরপর থেকে নৈশুন্দির দুটো চেহারা হয়ে গেলো। লোকজনের সামনে সে আগের মতোই থাকল কিন্তু একা থাকলেই শুরু করত তুই তোকারি আর ফুটপাতি কথাবার্তা; দুটো জিনিস মেলানো কঠিন। আমিও মাঝে মাঝে ওর সাথে দুই দিকেই তাল মেলাতে চাইতাম কিন্তু সেটা প্রায় অসম্ভব। বরং সেটা করতে গিয়ে আমার মনে হতো যে একমাত্র তার পক্ষেই চূড়ান্ত অশালীন হওয়া সম্ভব যার শালীনতার উপর দখলও চূড়ান্ত। আর আমার মতো যারা না বুঝেই আধা শালীন আর বাকিটা অশালীন তাদের পক্ষে কোনোটাই ঠিকমতো সম্ভব না...

একা বিছানায় মনের মধ্যে নৈশুন্দি প্রথম দিন থেকেই বালিশ হয়ে আসা যাওয়া করে এটা অস্বীকারের উপায় নেই। তাই বলে সেটা নিয়ে তার সাথেই আলোচনা করা অন্তত আমার পক্ষে সম্ভব না। অথচ নৈশুন্দি অবলীলায় ব্লাউজের ভেতর থেকে ব্রার ফিতা টান দিয়ে দেখিয়ে বলে দিতে পারে-- রংটা দেখে রাখ। পরেরবার হাত মারতে গেলে মনে মনে আমার কাপড় খুলতে তোর সুবিধা হবে...

-- তুই একটা মাগি


খিলখিল করে হেসে উঠে নৈশুন্দি-- শেষ পর্যন্ত যে বুঝলি সেটাই আমার কপাল। কিন্তু এখনও যেটা বুঝতে পারিসনি সেটা হলো-- তুই নিজেও একটা বেশ্যা...


আমি ঝিম মেরে বসে থাকি। কিন্তু সে আবার খিলখিল করে উঠে-- তোদের মতো কবিরা বেশ্যারও অধম

-- মুখ সামলে কথা বলবে

চোখমুখ কাঁচুমাচু করে ফেলে নৈশুন্দি-- নিজের কোনোকিছু সামলানোর অভ্যাস যে আমার নেই। আমি শুধু জানি কীভাবে লোকজনকে সামাল দিতে হয়। যদি বেশি অন্যায় করে ফেলি তবে না হয় তোকেও একদিন খুশি করে দেবো নে। চলবে?

-- সাটাপ

নৈশুন্দির হাসিও থামে না আমিও শব্দ খুঁজে পাই না বলার। অনেকক্ষণ ধরে হাসতে হাসতে সে আমার দিকে তাকায়-- আচ্ছা কবিরা কি মেয়েদের বিছানায় বেশি পছন্দ করে নাকি দূর থেকে ফাঁকফোকর দিয়ে দেখতে বেশি পছন্দ করে?

নৈশুন্দি আবারো তার ঢলানি হাসিটা শুরু করে। আমার মুখের কাছাকাছি এসে ফিসফিস করে-- কবি সাহেব আঁচলটা কিন্তু আমার বুকে নেই। আপনি ইচ্ছে করলে তাকাতে পারেন...

হাসতে হাসতে এক ঝটকায় সরে যায় আবার-- কবিরা হলো চোরের গুষ্টি চোর। দিলে খায় না; না দিলে কাটে সিঁদ।

-- আমি না বলেছি চুপ করতে?

-- ঠিক আছে চুপ। কিন্তু বিকেলের মিটিংএ যেহেতু আপনার-আমার একসাথে যেতে হবে সেহেতু এখন আপনাকে একটু ঠাণ্ডা করা দরকার জনাব।

-- লাগবে না। আমি যথেষ্ট ঠাণ্ডা আছি।

-- বিশ্বাস করলাম না। ...আচ্ছা। আমি যদি এখন পায়ের দিক থেকে একটু একটু করে শাড়িটা উপরে তুলি তা হলে কি আপনি সন্তুষ্ট হবেন? যতই বলেন কবি মানুষ; শাড়ি খোলার চেয়ে শাড়ি তোলায় বেশি কাব্য খুঁজে পাবার কথা। এই যে দেখেন...

নৈশুন্দি শাড়ি টান দিয়ে একপাশে হাঁটু পর্যন্ত তুলে ফেলে-- এই শাড়ি উত্তোলন আপনার জন্য মহামান্য কবি...

আমি ঝিম মেরে থাকি। নৈশুন্দি মিটমিট হাসে আর শাড়িটা একটু একটু করে উপরে তোলে। একসময় আমি খপ করে থাবা দিয়ে ওর শাড়িটা নামিয়ে দেই। প্রচণ্ড শব্দ করে হেসে উঠে নৈশুন্দি-- চান্সে তো ঠিকই আমার রানে হাত দিয়া দিলি। এইবার একটা কবিতা হয়ে যাবে-- অজান্তে তোমার ফর্সা রানের স্পর্শ আমাকে আরো গভীর কিছু ছুঁয়ে ফেলার ইচ্ছা জাগায়... আহারে...

আমি চুপ করে থাকি। নৈশুন্দি একেবারে গম্ভীর-- তুই আমাকে মিনি স্কার্ট পরা দেখিসনি?

-- দেখছি। তো?

-- এখন শাড়ি তুলে যতটা দেখালাম মিনি স্কার্ট পরলে তার থেকে অনেক বেশি তো রাস্তার লোকেরাই দেখে। তাহলে এইটুক দেখেই ঘাবড়ে গেলি কেন?

আমি থ মেরে আছি। এর কী উত্তর। নৈশুন্দি ঠোঁট নাড়ায়-- আমাকে ছুঁতে চাস বললেই পারতি। নে ধর। ছোঁয়া টেপা সবই তোর জন্য ফ্রি। খালি কামড় দেয়া আর কাপড়ের ইস্ত্রি নষ্ট করা নিষেধ...

নৈশুন্দি গা ঘেঁষে বসে আমার। আমি উঠে যাই। নৈশুন্দি আমাকে টান দিয়ে বসিয়ে দেয়-- কবি জিনিসটা খারাপ না। আমাদের ক্লায়েন্টগুলা যদি তোর মতো কবি হতো তাহলে পরিশ্রম অনেক কম হতো। উরাত দেখিয়েই ব্রহ্মপুত্র পার... শুনেছিস প্রবাদটা?

-- না আমি শুনিনি

পরের দিন থেকে নৈশুন্দিকে আমি আর স্বপ্নে দেখি না। কথাটা শুনে নৈশুন্দি হেসে উঠে-- নিরালায় তোকে রান দেখানো ঠিক হয়নি। তোর কাছে ঘরের বৌয়ের মতো পানসে হয়ে গেলাম...

একদিন ধুম করে তার বাসায় আমাকে ধরে নিয়ে গেলো। একাই থাকে সে। ড্রয়িং রুমে আমাকে বসিয়ে অনেকক্ষণ পরে ফিরে এলো হাতে দুটো চায়ের কাপ নিয়ে। কিন্তু চুমুক ফেলে দিতে হলো আমার। দালান বাড়িতে কেউ কেরোসিনের চুলায় চা বানায়? চায়ের মধ্যে কেরোসিনের গন্ধ। নৈশুন্দি হাসে-- কবিদের মাথায় আজেবাজে জিনিস ছাড়া কিছু নাই। এখানে কেরোসিন পাবি কোথায়? কেরোসিন তোর মগজে...

নৈশুন্দির সাথে আমার কাজে ঠ্যালাঠেলির কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু মাঝে মাঝেই বাইরে থেকে ফিরে পাগলের মতো ক্ষেপে থাকে আমার উপর। প্রচণ্ড আজেবাজে কথা আর গালাগালি। আর তার সঙ্গে অবধারিত উপসংহার-- তোর মতো কবিরা হইল বেশ্যার ঘরের বেশ্যা। আমরা শরীর পাইতা দেই চোদনের লাইগা আর তোরা আত্মা বিছাইয়া পাবলিকের চোদন খাস...

আমি রিএক্ট করি না। নৈশুন্দি হঠাৎ সিরিয়াস হয়ে যায়-- তুই এই কাজটা ছেড়ে দে। অন্য কিছু কর

-- কেন? আমি ছাড়ব কেন? আমার কাজে দোষের কী?

- তোর কাজটা খুবই নোংরা। এটা ছেড়ে দে

-- নিজে এরকম একটা কাজ করে আমাকে নোংরা বলিস কোন মুখে?

নৈশুন্দি খেপে উঠে-- চুৎমারানি তুমি চোদন খাও আমার থাইকা বেশি। আমি শরীরের কাজ শরীর দিয়া করি। গোসল দিলে দাগ গন্ধ সব চলে যায়। কিন্তু তুমি চোদন খাও আত্মায়। খানকির পোলা তুমি বোঝো না পাবলিকে তোমার লেখার উপর নিজেদের গুমুত চাপায়ে দেয়?

কেরোসিন আমার মগজে। নৈশুন্দির বাসায় গেলেই কেরোসিনের গন্ধ পাই। নৈশুন্দি আমাকে নিয়ে হাসে। জীবনে কোনো ভালো পারফিউম দেখিনি তাই পারফিউমের গন্ধকে কেরোসিন মনে হয়। এইগুলা হলো ফকিন্নির পোলাগো কারেক্টার...

হয়ত তাই। কিন্তু আমার মগজ থেকে কেরোসিন যায় না...


আমি মাথা খাটাই। রাত জেগে আইডিয়া বানাই। রমিজ ভাই সজল নৈশুন্দি এক বাক্যে সাবাস বলে উঠে। তারপর ক্লায়েন্টের সাথে মিটিংয়ে যাই। কেউ শুনে মুখ বাঁকায়-- এইসব খাইব না কেউ। আমি বোঝানোর চেষ্টা করি। কিন্তু রমিজ ভাই চলে যায় অন্যপক্ষে-- আর বলেন না। কবি সাহিত্যিকদের নিয়ে এই এক ঝামেলা। খালি হাই থট। আসোলে আপনি ঠিকই বলেছেন স্যার। এইগুলো পাবলিককে খাওয়ানো মুশকিল। আসোলে জিনিসটা যদি এরকম হয়...

জিনিসটা কী রকম হলে ভালো হয় তা ক্লায়েন্টের মুখ থেকেই বের হয় আর রমিজ ভাই লুফে নেয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রোডাক্ট নিয়ে লাফালাফি। নাচগান। আমি বোঝাই বিজ্ঞাপন মানে আমার জিনিস পৃথিবীর সেরা জিনিস বোঝায় না। মূল জিনিসটা হলো মানুষকে জিনিসটার নাম মুখস্থ করিয়ে দেয়া। যখন সে হাজারো জিনিসের ভেতর একটা চেনা জিনিস পায় তখন সেটার দিকেই হাত বাড়ায়। কিন্তু না। মিটিংয়ে গিয়ে রমিজ ভাই পল্টি খায়। নৈশুন্দি খোঁচা মারে। আমাদের সবাই উঠে পড়ে লাগে আমাকে নিয়ে তামাশায়...

আমি বুঝি না। প্রতিটা মিটিংয়ের আগে আইডিয়া সবার সাথে শেয়ার করি। সবাই এপ্রুভ করলে নিয়ে যাই মিটিংয়ে। কিন্তু সেখানে গিয়ে কেন একটা মানুষও আমার পক্ষে স্ট্যান্ড নেয় না। নৈশুন্দি হাসে-- বেশ্যা যতদিন না বোঝে সে একটা বেশ্যা ততদিন সে ধর্ষিত হয়; আর যখন বুঝতে পারে সে বেশ্যা তখন সে হয়ে উঠে অভিসারিকা। তোর অবস্থা এখনও প্রথম দলে...

আমি হা করে তাকিয়ে থাকি নৈশুন্দির দিকে। নৈশুন্দি আমার মাথায় ঠোনা মারে-- আরে বেক্কল যে স্টোরি ক্লায়েন্ট পছন্দ করে না সেটা যতই ভালো হোক রমিজ ভাই যদি সেখানে তোকে সাপোর্ট করে তা হলে ওদের কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা সেখানেই মাটি

-- তাই বলে সবার সামনে আমাকে নিয়ে হাসাহাসির কী দরকার?

-- ওইটা একটা স্ট্র্যাটেজি। তোর বেকুবির উপর দায় চাপিয়ে আরেকটা চান্স নেয়া। না হলে কে বসে আছে আমাদের কনসেপ্ট দুইবার শুনতে?

এই ক্লায়েন্ট অনেক বড়ো ক্লায়েন্ট। নৈশুন্দি ওর সাথে পার্টি গার্ল হিসেবে ঘুরে এসেছে একটা ডিনার। প্রথম দিনের মিটিংটায় নৈশুন্দির ঠোঁট বাঁকানো ছাড়া রমিজ ভাই মাতিয়ে রেখেছিল বিভিন্ন আধাহালকা জোকস দিয়ে। হোঁতকা লোকটা দু-তিন বার তার ডানে বসা নৈশুন্দিকে ঠ্যালা দিয়ে কী যেন বলছিল। আমি চুপচাপ বসা। মাঝে মাঝে হাসি। বিজ্ঞাপনের কনসেপ্ট তৈরি করব আমি। যথারীতি আমাকে নিয়ে অনেক বড়ো বড়ো কথা রমিজ ভাই বলে ফেলেছে। কনসেপ্ট তৈরির আগে এরকম বরাবরই তিনি করেন। হোঁতকা লোকটা হঠাৎ বলে বসে সামনের মাসে তার মেয়ের জন্মদিন। আমি যেন সাহিত্য দিয়ে তাকে একটা আমন্ত্রণপত্র লিখে দেই। আমি কিছু বলার আগেই রমিজ ভাই লুফে নেয় অফারটা। শুধু লেখা কেন। ডিজাইনও করে দেয়া যাবে। মুচকি হেসে নৈশুন্দি কী একটা নাম বলে জিজ্ঞেস করল-- অমুক?

নৈশুন্দি হোঁতকার মেয়েরও নাম জানে। কিন্তু লেখালেখি করি বলে আমাকে শেষ পর্যন্ত চিঠি লিখে দিতে হবে? নৈশুন্দি তার আগের কথার রেশ টানে-- তোর সমস্যা হচ্ছে তুই এখনও নিজেকে লেখক মনে করিস

- লেখক না তো কী?

- লালনের গান শুনেছিস? ‘তলে তলে তল খোঁচা খায়/লোকের কাছে সতী কলায়’? তোর অবস্থা হচ্ছে সেরকম। এখানে তুমি কোন বালের লেখার কাজ করো বলো তো? লবণ আটা ময়দা লেইখা তুমি লেখকগিরি চোদাও?

কয়েকদিন ধরে নৈশুন্দিকে দেখলে হিংসা লাগে। অত ফ্রেশ থাকে কী করে মেয়েটা। যার তার সাথে বিছানায় যায়। একটুও ঘেন্না নাই? রুচিতে বাঁধে না সামান্য?

কিন্তু নৈশুন্দি হাসে-- আমি তো আর প্রেম করতে যাই না যে মানুষ কি চেহারা দেখব। আমার কাজ হচ্ছে যারে বুক দেখিয়ে পারা যায় তাকে বুক দেখানো। যারে রান দেখিয়ে পারা যায় তারে রান দেখানো আর যার সাথে বিছানায় যেতে হয় তাকে শরীর পেতে দেয়া। সেজন্য আমার কোনো ঝামেলা নাই। ঝামেলা তোর। বিজ্ঞাপন লেখারে তুই মনে করিস সাহিত্য। আরেক বেটার আটা-ময়দারে নিজের প্রেমিকা ভাইবা কাব্য লিখিস। ফলে তোর মাথা কামড়ায়। ক্লায়েন্টের মেয়ের জন্মদিনের চিঠি লিখতে তোর আঁতে লাগে...

চিঠিটা নৈশুন্দিই কীভাবে যেন ম্যানেজ করে। আমি একটা অক্ষর লিখিওনি দেখিওনি। আমার লেখা হচ্ছে না কিছুই। সবকিছু ছেড়ে আমি নৈশুন্দিকে নিয়ে পুরো একটা কবিতা সিরিজ ভাবতে থাকি। কিন্তু লিখতে বসলেই কেরোসিনের গন্ধ পাই। একটা অক্ষরও লেখা হয় না। শুনে নৈশুন্দি হাসে-- কবিতা লিখে তোর কাজ নেই। গদ্য লিখ: সুন্দরীর কেরোসিনগন্ধী জীবন...

আমি চিৎকার দিয়ে নৈশুন্দিকে জড়িয়ে ধরি। সুন্দরীর কেরোসিনগন্ধী জীবন; গদ্য না। এইটা একটা কবিতা। এক লাইনেই সম্পূর্ণ একটা কবিতা এইটা...

অফিসে যাওয়া বন্ধ করে দেই আমি। কারো ফোন ধরি না। ঘরে বসে ঘাড় গুঁজে সিরিজের কবিতাগুলো লিখি। একদিন নৈশুন্দি এসে হাজির-- কবিতাগুলো দেখা...

নৈশুন্দি কবিতাগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে। উনিশটা কবিতা। কিচ্ছু বলে না। আমাকে টেনে নিয়ে যায় তার বাসায়। চা নিয়ে আসে। নিটোল চা। কেরোসিনের গন্ধ নেই। আমি চুমুক দেই চায়ে। হঠাৎ কেরোসিনের গন্ধ। তাকিয়ে দেখি নৈশুন্দির হাতে একটা শিশি। শিশি খুলে নিজের মুখে হাতে ঘাড়ে কেরোসিন মাখছে নৈশুন্দি। আমি তাকিয়ে থাকি। নৈশুন্দি হাসে-- অন্যের জন্য মাখা সমস্ত পারফিউম সরিয়ে এই কেরোসিন আমাকে নিজের কাছে ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু তোর তো কোনো কেরোসিনের ফিল্টারও নাই...

চায়ের কাপ রেখে আমি উঠে দাঁড়াই। কবিতার সিরিজটা নতুন করে লিখতে হবে আবার। এই সিরিজে ছিল এক মেয়ের আস্তে আস্তে কেরোসিনের মতো দুর্গন্ধী হয়ে উঠার কাহিনী। কিন্তু নতুন সিরিজে হবে নৈশুন্দির শরীর গড়িয়ে কেরোসিনের সুগন্ধি হয়ে উঠার গল্প...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন