মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬

সাদিক হোসেন'এর গল্প : এই, এখানে


এখন, এই এত রাতে, প্যাট্রিকের পালসারের পেছনে বসে, স্কুল মাঠের মধ্যিখানে খাড়া করা ২৭ফুট ৫ইঞ্চি লম্বা কোকাকোলার বোতলটাকে ঘিরে চক্কর দেবার সময়, বোতলের গায়ে ঝলসানো আলো দেখে, বোতলের ভেতর, বোতলের কাচে ঘূর্ণায়মান কমলা আলোর বে-এক্তিয়ার খেলা দেখতে দেখতে রুক্-রুকু-রুকসানা খেয়াল করতে পারে, এই অঞ্চলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে স্টোরিটেলারের গোপন পলিটিক্স। সে প্যাট্রিককে জড়িয়ে ধরে। প্যাট্রিক পিক-আপ বাড়ায়। তখনি নেড়ি কুত্তাটা ক্যাঁক ক্যাঁক কিঁউ করে চিৎকার করে উঠলে একখানা বাদুড় কাটা পেঁয়াজের খোঁজে বাজারে উড়ে চলে। কিন্তু এত কিছুর পরেও, বাইকের ভট্ভট্ ভট্ আওয়াজ সত্বেও, সে, রুকসানা যতসব হিন্দু, মোল্লা, বিহারি, বাঙাল, কশাই আর জাহাজি আর দর্জি আর কারিগরদের সমবেত ঘুমের কোরাস শোনে ঠিক। প্যাট্রিক বড় রাস্তায় উঠে একবার থামে। সিগ্রেটে টান মেরে রুকসানাকে দেয়। তারপর এই অন্ধকারে, এখনও অব্দি না-হওয়া ফ্লাইওভারটার নিচ দিয়ে, এখান দিয়ে, হিরোইনকে পেছনে বসিয়ে ধাঁ হয়ে যায়।


তারপর পোড়া পেট্রলের গন্ধ সিগ্রেটের লিগলিগে ধোঁয়ার মত বাতাসে মিলিয়ে গেলে সুতোর মত বৃষ্টি নামে এলাকায়। দুবার পুড়িয়ে দিলেও এখনও অব্দি কোনক্রমে টিকে থাকা, এই ষোলবিঘার বস্তি আবার কাদায় থকথক করে ওঠে। কশাইখানা ভেসে যায়। বসা-রক্তের স্বাদ পাবে বলে ছুঁচোদের জিভ লকলক করে। তাদের মধ্যে যারা মিড-ডে মিলের কড়ায় লেগে থাকা ঝুটো খাবার চাখছিল এতক্ষণ, তারা চমকে ওঠে। কিন্তু এইসবকে ফেড-আউট করে দিলে, দেখা যায়, সিনেমায় যেভাবে নেমকার্ড ভেসে আসে, সেই ভাবে, সুতো সরাতে সরাতে, ভিজতে ভিজতে, কপালে ম্যালেরিয়ার জ্বর নিয়ে, পচা লিভার নিয়ে, কপাডি খেলতে গিয়ে ভেঙে যাওয়া পা নিয়ে, খোঁড়াতে খোঁড়াতে এগিয়ে আসছেন কমরেড সেরী। তিনি অতবড় কোকাকোলার বোতলটার দিকে তাকিয়ে থাকেন। কাছে-দূরে চকাত করে বাজ পড়ে। বোতলটার গায়ে সাদা আলোর ঝলকানি খেলে যায়। কুকুর ডাকে। কে যেন হাঁক ছাড়ল। আবার আকাশ চমকায়। কমরেড সেরী ঝুঁকে পড়েন। কেঁদে ফেলেন। তারপর কান্না থামিয়ে নিজের মনেই বলতে পারেন, বলতে গেলে তার গলা কেঁপে ওঠে, তবু বলতে থাকেন – সংশোধনবাদের দূর্গ চূর্ন কর।

কিন্তু এতসবে মানুষের কি হল? এত কচকচি, এত কারসাজি, এতসব ট্যাব, টাচস্ক্রিন, সাবঅল্টার্ন, পপকর্ন, অরিয়েন্টাল মাড়িয়ে কোথায় এলাম আমরা? হাঃ হাঃ, ক্রমে আলো আসিতেছে!

তাই ভোরের আলো ফুটবার আগে, আসুন, আমরা কল্পনা করি, প্যাট্রিক আর রুকসানা অবশেষে একটি নির্জন রাস্তার সন্ধান পেয়ে গেছে। চারদিকে স্বপ্নের মত ধোঁয়া উড়ছে। সিলভার রঙের চাঁদের আলো তাদের দুজনার মুখে এসে পড়েছে। রুকসানা ভিজে চুপসে গিয়ে ঠাণ্ডায় কাঁপছে। বারুদ গলে যাওয়ায় প্যাট্রিক আর সিগ্রেট ধরাতে পারছে না। সে নায়কের মত রুকসানার হাত ধরে টান মারে। রুকসানা ঘুরে গিয়ে চুলের ঝাপটা দেয় প্যাট্রিকের মুখে। প্যাট্রিক স্টাইল মেরে রুকসানার কোমর ধরে দাঁড়ায়। এইভাবে থাকে কতক্ষণ। বৃষ্টির ছাট আসে। তারা পরস্পরকে ইশারা দেয়। হাসে। কন্ডোমের বিজ্ঞাপনের মত গান গেয়ে ওঠে।

কিন্তু এইসব গান, মিউজিক, এইসব ইয়ো ইয়ো হানি সিং, বাদশা, হেগিমনি না হেজিমনি, ট্যান-ট্যান-ট্যান শোনার টাই রুকসানার বাপের নেই। সে ছানি পড়া চোখে পিচুটি ছাড়াতে ছাড়াতে, এই মাঝরাতে খামোকা উঠে বসে, দেওয়ালের দিকে তাকায়। দেয়াল থেকে ক্যালেন্ডারটা ছিঁড়ে গিয়ে মেঝেতে লটকাচ্ছে। সে তাকিয়ে দেখে ঐখান থেকে মাকু, ফুলা, শর্মা, ধুদিকে আর তারক আর তারা সিং – কমরেড সেরীর সঙ্গে মুঠি পাকিয়ে তাকে সিগন্যাল পাঠাচ্ছে। দরজাটা খোলা। বাইরে ঝড় বইছে। মেঝেয় বিছানা পেতে শুয়েছিল রুকসানা – এখন আর সে নেই।

তবে কমরেড সেরীর এইরকম মিসটাইম রুকসানার বাপকে অবাক করায় না। তার জানা না থাকলেও, গল্পের খাতিরে জানিয়ে রাখা যায় – ২০০৬ সালের ১৩ই নভেম্বর খোখার কালান গ্রামে শহীদ কমরেড সেরীর স্মরণসভার মঞ্চ থেকে ‘লাল কাফিলা’ পত্রিকা সেরীর ছবি সহ একটা ক্যালেন্ডার প্রকাশ করেছিল। কিন্তু পৃথিবী চলমান হওয়ায়, যেমন পৃথিবীর মধ্যেকার কোন বস্তুই প্রকৃতপক্ষে স্থির থাকতে পারে না – ক্যানেন্ডারটিও ছিল, সেই কারণে, গতিশীল। ফলে সেটি কোনক্রমে সেরীর পত্নী হরবনস্ কাউরের ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে পারলে, ক্রমাগত হাতফেরত হতে হতে, চুরি হতে হতে জাহাজির ঘরে এসে থামে। জাহাজি তখন হেভি ব্যাস্ত। দু-একদিনের মধ্যেই সে সুপুরির ব্যাপারি হবে বলে আন্দামানে রওনা দেবে। বাক্স-প্যাটরা গোছানো বাকি। কিছু টাকা সর্ট পড়েছে – সেটাও জোগাড় করতে হবে। এখন সে মাথায় হাত দিয়ে ভাবে, চলে গেলে এই শূন্য ঘরে কমরেড সেরী করবেনটাই বা কী? পরের দিন তার মাথায় লাইট জ্বেলে উঠল। সে আর দেরী করল না। ক্যালেন্ডারটিকে রুকসানার বাপের কাছে গচ্ছিত রেখে জাহাজে উঠে পড়ল।

কিন্তু ততদিনে যা হবার হয়ে গেছে। নিউমার্কেট জ্বলে পুড়ে ছারকার হয়ে গিয়ে আবার নতুন মার্কেট চালু হয়ে গেছে। যে কাপড়ের দোকানটায় সেলসম্যান ছিল রুকসানার বাপ সেটির মালিক নতুন মার্কেটে ঝকঝক করে। এত আলো, এত টিউবলাইট, এত ঝিনচ্যাক – তবু তার চোখে সব কিছু সাবান গোলা জলের মত ঘোলাটে মনে হয়। সে বেরিয়ে আসে।

সে ফায়ারব্রিগেড দেখে। লাল লাল গাড়ি, গাড়ির মাথায় মই ঝুলছে – এই সব দেখে। সাদা মানুষ, কোঁকড়ানো সোনালি চুল, লম্বা ঠ্যাঙ দেখে। ঠোটে আংটি ঝোলানো, মুখে মেচেদার দাগ, হাতে আর পেটে নীল রং দিয়ে আঁকিবুকি লেখা রয়েছে। সে দেখে অবাক হয়।

একদিন, আর থাকতে না পেরে, যেন সে কোন মাল বেচছে, সেইভাবে, এইরকম একজন মানুষকে বলে ফেলে – Take, take, no take, but see.

ব্যাস, এইখান থেকেই, এই ধেয়ানা এলাকা রুকসানার বাপের অন্য পরিচয় পেয়ে গেল। কদিন পরেই দেখা গেল, সাদা সাদা মানুষেরা বারমুডা পরে, মেয়েরা হটপ্যান্টের সাথে মাটির গয়না চাপিয়ে, আম ও আপেল খেতে খেতে, পপকর্ন চিবতে চিবতে, ব্যাটারি চালিত টেপ-রেকর্ডারে রিকি মার্টিন চালিয়ে, কখনও ট্যানট্যান, ক্যানক্যান, কখনও টুইস্ট দিচ্ছে।

রুকসানা সেই সময় ছোট। ফ্রক পরে সবে ধনধান্যে পুষ্পে ভরা শিখেছে। তবু সে বুঝতে পারে, তার বাপ এ হেন পিকনিক পার্টির দালালি করে ফেলায় সে ইতিমধ্যে স্কুলের ভেতর ‘ইয়েতে’ পরিণত হয়েছে। পাড়াতে সকলে তাকে ‘ইয়ে’ চোখে দেখে। এবং আশ্চর্যের বিষয়, কমরেড সেরীর সহচর্যে সে পাঞ্জাবি ভাষা এতটুকু না শিখলেও ইংরাজিতে সেই থেকে হাইয়েস্ট নম্বর পেতে শুরু করেছিল। যদিও ১টাকা ২০পয়সা, ৩টাকা ৪০পয়সা ও ৪টাকা ৮০পয়সার লসাগু ও গসাগু নির্নয় করতে গিয়ে সে মানবজাতির বিষণ্নতাকে ছুঁয়ে ফেলল একদিন।

আর শিল্পীরা বিষন্ন মানুষ ভালবাসে। তারা বিষণ্নতার কারিগর। তাই, রুকসানা যখন ক্লাস নাইন পাস ক’রে, বুকের টুসটুসকে লুকিয়ে ঘরে ফিরছিল, স্টোরিটেলার তার পথ আগলে ধরল। একঝটকায় মার্কশিট কেড়ে ছিঁড়ে ফেলল। একখানা গরুর শিং দিয়ে বলল, যাও। আরেকদিন লেডিজ টয়লেটে ঢুকে দুজন মিলে সিগ্রেট ফুঁকল। গঙ্গার ঘাটে বসে বিয়ার খেল। পিঙ্ক ফ্লয়েড শুনল। হাসল। রথের মেলায় নাগোরদলার টঙে উঠে ঝকমকে রাত্রি দেখল। মানুষজন, রাস্তাঘাট, কশাইখানা, টেংরিকাবাব, বুগুবুগি সব উপরনিচ বৃত্তাকারে ঘুরছে। সে ভক করে বমি করে ফেলে।

পরের দিন, স্টোরিটলার এই সব নিয়ে একখানা লেখা লিখেছিল। কিন্তু রুকসানা দেখতে চাইলে সে সহজে রাজি হয়না। রুকসানা টুসটুস দেখালে, তবে সে, শেষপর্যন্ত, লেখাটা দেখাল –
 
লেখা দেখে রুকসানা মাথার চুল ছেঁড়ে, মানে?

- কীসের মানে?

- এটা আবার কী? কিছুই তো বুঝলাম না।

- ভাল লাগেনি?

- মতলবটাই তো বুঝলাম না।

- আর্টের কোন মতলব নেই। এসব মানুষ এমনিই করে। আমি লিখি। আমি লিখেছি। আমি লিখলাম। ব্যাস, হয়ে গেল।

রুকসানা হাবা মেয়ের মত বলে, যা বাবা।

স্টোরিটেলার শেয়ানা হাসি ছাড়ে।


এদিকে দোকানপাট, ঝুপড়ি, সেলুন, আন্ডিগুন্ডিমায় সংসার ভাঙা শুরু হয়ে গেল। বিহারির ঘর থেকে স্টেনগান পাওয়া গেল। ট্রাক ভর্তি গরু উল্টে গেল রেলগেটের উপর। ষোলবিঘার জমিতে প্রথমবার আগুন জ্বলল। মন্ত্রী এল। চোরাগোপ্তা পেটো চার্জ শুরু হল।

আবার এধার-ওধার ১০টা, না ২১টা না ৩৭টা টাওয়ার উঠে গেছিল। প্লেগ্রাউন্ড আর মাল্টিজিম আর সুইমিংপুল ঘেরা স্কুল বানানো হল। বাচ্চারা ডিম আর পাস্তা আর নুডলস খেয়ে, থপথপ করে স্কুলবাসে চেপে সেইসব স্কুলে যায়। সন্ধ্যের পর ফর্সা আলো জ্বলে। অন্নপ্রাশনে, পার্টিতে, শনিবারে বুম-চিকি-চিকি-বুম বাজে। হেডফোন কানে গুজে মানুষেরা অফিস যায়। এরমধ্যে কোন একদিন, আকাশপথে উড়তে উড়তে, হাত-ভাঙা বান্ধবীকে নিয়ে, মারাদোনা এখানেই ফুটবল আকাদেমির উদ্বোধনে চলে এল।

তখন, আহা, স্লিম স্লিম মেয়েরা আর ভুড়িওলা পুরুষেরা ভাবতে লাগল আমাদের ফ্লাইওভার নেই কেন?

এসবের আড়ালে, রাতেরবেলায় ঘোলাটে চাঁদের উপর দিয়ে মেঘ সরে গেলে গঙ্গার পানি ভাটাকতি-হুয়ি-আত্মার মত কাঁপে। চিকিচিকি ঢেউ খেলে। ঘাটে মরা বাপের নেড়া হওয়া ছেলের চুল খাবি খায়। নেড়ি কুত্তারা ডেকে চলে। একটা শুশুক উঠে আসে একলা।

জাহাজি পোকা ধরা সুপুরির কারবার করতে গিয়ে হেবি কেস খেয়ে গেছিল। এখন সে চাইনিজ সেট বেচে দুপাইস ফাদার-মাদার যাহোক কামিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু চোলাই-এর ঠেক থেকে চালান হয়ে গিয়ে দুতিনদিন পর আবার ফিরে এসে রুকসানার বাপ আর পিকনিক পার্টির দালালি করতে রাজি হয়না। এমনিই ফ্যা ফ্যা করে ঘোরে। পি-সি খাটার কাহিনী শোনায়। রুকসানা টিউশানি নিয়ে দিদিমণি বনে গেলে তবে সে একদিন ট্রেনে ওঠে। দুপুরের ফাঁকা ট্রেনে উঠে সে চারদিক তাকায়। মানুষজনকে মাপে। শেষে একজন বৌদিকে টার্গেট করে বলে চলে – খাবার পর থালায় জল ঢালা হয় কেন? দাঁত দিয়ে নখ কাটতে নেই কেন? পঞ্চমীতে পাকা বেল খেতে নেই কেন? কালরাত্রি পালন করা হয় কেন? মেয়েদের চুলে হাত দিতে নেই কেন?

সেদিন ঘরে ফিরছিল রুকসানা। কিছু বোঝবার আগেই একটা পালসার তার ওড়না নিয়ে হাওয়া। এর একদিন, ঠিক সামনে এসে, ফ্লাইং কিস ছুড়ল। কদিন পর সে দেখে, পালসারটি পাড়ার মোড়ে দাঁড় করানো রয়েছে।

সে লেডিস সিটে বসে ছিল। পাশের বুড়িটা কমলালেবুর খোসা ছাড়াচ্ছিল। বিস্কুটের কৌটোর মত বাসটা এগোচ্ছিল। আচমকা ব্রেক কষল। তারপর আবার এগতে শুরু করল।

রুকসানা রাস্তায় নেমে বুঝতে পারে না কোনদিকের গলিটা ধরবে। সামনে একটা পাগলা খালি টিন নিয়ে বসে আছে। সে খানিকটা এগিয়ে লাইটপোস্টের নিচে এসে দাঁড়ায়। চুয়িংগামের প্যাকেট থেকে একটা চুয়িংগাম মুখে পুরে চিবোয়। নিজের মনে হিসেব কষে। রাস্তা পেরিয়ে অন্য ফুটে উঠে বাম দিকে টার্ন নেয়। এখানে রাস্তাটা সরু। স্ট্রীটলাইটের আলোয় তা কমলা হয়ে গেছে। দূর থেকে বুঝি একটা বাইক আসছে। সে পেছনে তাকায়। পেছনে কেউ নেই। তার ভয় করে। অমনি একটা সাইকেল বেল বাজিয়ে চলে গেল।

চায়ের দোকানটা পেরলে এবার সে ম্যাপটা ধরতে পারে। আবার ফুটপাথ চেঞ্জ করে, কিছু দূর গিয়ে, চশমার দকানের পাশের রাস্তায় বাঁক নেয়। ৩টে বিল্ডিং পেরলে ঠিক ভাঙা পাঁচিলটার সামনে সে থামে।

সে পাঁচিলের ফোকর দিয়ে ভেতরে ঢুকে যায়। ঝোপঝাড় সরিয়ে কাঁচা রাস্তায় ওঠে। রাস্তাটির শেষে সে দরজাটির সন্ধান পায়।

পাশে কলিংবেলের সুইচ রয়েছে। সে সুইচ টেপে। খানিকক্ষণ ওয়েট করে। ভেতর থেকে কোন সাড়াশব্দ আসে না। আবার বেল বাজায়। এবারও ভেতরটা নিশ্চুপ। সে চারদিকে নজর রাখে। দেখে কেউ তাকে ফলো করছে কিনা। নিশ্চিত হলে দরজায় ধাক্কা দেয়। শিস দিয়ে মানুষটিকে ডাকে। কোন জবাব আসে না। সে ব্যাগ হাতড়ে চুইংগামের প্যাকেটটা বের করে। তারপর আধখাওয়া প্যাকেটটা দরজার নিচ দিয়ে ঠেলে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়।


সেদিন সন্ধেবেলা স্কুলমাঠে বসে এগরোল খাচ্ছিল রুকসানা। স্টোরিটেলার সিগ্রেট ধরাল। বলল, বোতলটা দেখছ?

- হু।

- কি দেখছ?

- ভাবছি।

- কি ভাবছ?

- বোতলটা এখানে কেন?

- এই রকম অনেক বোতল, হাজার হাজার বোতল আমাদের চারপাশে রয়েছে। এই বোতলটা সেইসব বোতলের ক্যাপ্টেন। কিন্তু এই বোতলটা দিয়ে আমরা কি শুধু ঐসব বোতলগুলোকেই বুঝি? তাও তো নয়। এই বোতলটা আর শুধু কোকাকোলা নয়। এই এতদিন ধরে আমরা কোকাকোলাকে কিভাবে দেখছি, সেইটাও। এই বোতলটা তুমিও। আমিও।

রুকসানা এগরোল শেষ করে কামিজে সস্ মুছে নেয়। স্টোরিটেলারের কাছ থেকে সিগ্রেট নিয়ে তাতে টান দেয়। হুস হুস করে ধোঁয়া ছাড়ে। কিছু বলতে গেলে, এমনিই, উদাস হয়ে যায়। আবার নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, তুমি আমাদের নিয়ে কিছু লিখবে না?

- কি লিখব?

- আমাদের গল্প।

- কোনটা তোমাদের গল্প?

- এই, আমরা কিভাবে থাকি, খাই, কিভাবে মরে যাই...এইসব। আমরা যেরম বেঁচে আছি, সেইটা।

স্টোরিটেলা হাসে। তবে কথা দিতে পারে না। ওঠবার সময় কানে কানে বলে, যদি তোকে লিখি?


ফ্লাইওভারের জন্য প্ল্যানমাফিক জমি নেওয়া হয়ে গেছিল আগেই। এবার রাস্তাঘাট খোঁড়া শুরু হল। এখন বাজারে যেতে গেলে লাফিয়ে লাফিয়ে রাস্তা পেরতে হয়। বাজারের ভেতর, তাই, সারাক্ষণ খিচ লেগে থাকে। এরমধ্যে একটা অটো হোঁচট খেয়ে মুখ ঢুকিয়ে দিল বাসের পেটে। অটো থেকে ভ্যানিটি ব্যাগ সমেত বৌদি নেমে এলে দেখা গেল ওনার ঠোঁট দিয়ে ব্লাড বেরচ্ছে। বাসের ড্রাইভারটাকে নামানো হলে, দেখা গেল, সে বিহারি। চারদিকে ক্যাচাল বেঁধে গেল। বিহারিদের সেলুন ভাঙা হল। পান-বিড়ি-সিগ্রেটের দোকান ভাঙা হল। মাতমের দিন, তারা কশাইদের সাপোর্ট নিয়ে ফাইটব্যাক করলে, জানা গেল, রেলগেটের উপর মহরমের কাজিয়া ফেলা হয়েছে। র‍্যাফ নামল। সেই সুযোগে একজন দর্জি মিস ছিনালির মাই টিপে পালাল।

এতসবে, কমরেড সেরী আর পুরনো তারিখের ভেতর আঁটকে থাকতে পারেন না। তিনি খালি হাঁসফাঁস করেন। মাকু আর জস্যিকে গোপন চিরকুটে খবর পাঠান। কিন্তু তারা ধুদিকে আর তারা সিং-এর সঙ্গে COMPOSA-র গোপন মিটিঙে ব্যস্ত থাকায় সহজে উত্তর আসে না। কমরেড সেরী মুষড়ে পড়েন। তার চোখ দিয়ে পানি নেমে এলে, দেখা যায়, ক্যালেন্ডারের পৃষ্ঠা ভিজে গিয়ে সপসপ করছে। একদিন তিনি দেয়ালে ঘুষি মারলেন। ঘুষিতে দেয়ালে চীড় ধরল। ঘরের চাল থেকে একটা টালি সরে গেল।

মাসখানেক হল, ঠিক সন্ধ্যের পর, রুকসানার বাপের জ্বর আসছে। জ্বর বেশি ওঠে না। তবে তাতেই সে কাহিল হয়ে গেছে। পেটে খিদে নেই। খলি খুকখুক কাশি হয়। চোখটা নাকের থেকে হাফ আঙুল নিচে ঢুকে গেছে। হকারি শেষে, ঘরে ফিরে, মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে পারে না। ছেঁড়া কাঁথাটায় মুণ্ডু ঢুকিয়ে পাশ ফিরে ঘুমোয়। মনে হয়, সোনাচাঁদি চ্যবনপ্রাশের অভাবে সে দ্রুত কেলিয়ে যাচ্ছে।

রুকসানা আরও ২টো টিউশনি নিয়ে ছিল। এখন সোম, বুধ, শুক্রু – এই তিনদিন তার ফিরতে ৯টা বেজে যায়। সে প্রায়দিন পালসারটিকে পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। একদিন, মনে হল, কে যেন তার পিছু নিয়েছে।

সে ঘরে ফিরে বিস্কুট খায়। রাতে ২পিস কলা খায়। তারপর বাপ ঘুমিয়ে গেছে কিনা চেক করে নিয়ে খাটের নিচে বিছানা পেতে শোয়। তবে অত সহজে তার ঘুম আসে না। গরুর শিংটাকে যথাস্থানে স্থাপন করে অন্য হাতে চেতন ভগত ধরে পড়তে থাকে। একবার, এইভাবে সে ঘুমিয়ে পড়ল। ভোরের দিকে তার বাপের ঘুম ভেঙে গেলে দেখে, মেয়েটা ঐভাবে শুয়ে আছে আর একটা হুলো সেইদিকে তাকিয়ে গতরাতের এঁটো খাবে বলে জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটছে। সে ইচ্ছে করে কেশে মেয়ের ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিতে চায়। কাশতে গেলেই, আচমকা, খানিকটা রক্ত থুতুর সাথে ছিটকে বেরয়।

যে শুশুকটা উঠে এসেছিল, সেইটাকে বাঁশ দিয়ে টাঙানো হয়েছে। তার গা দিয়ে, চামড়া দিয়ে তেল ঝরছে। এই তেল নাকি ব্যথা-বেদনা-সর্দিকাশিতে আরাম আনে। স্টোরিটেলার এইসব দেখে বলে, সরি।

- কেন?

- আমি আর গল্প লিখব না।

- কেন?

- ফর্মটাকে চেঞ্জ করে ফেলেছি।

- এবার আঁকবে?

- না।

- সিনেমা বানাবে?

- তাও না।

- তবে?

- কাল আবার Crime and Punishment পড়ছিলাম। পড়েছ?

- লাইব্রেরিতে নেই।

- আছে। খোঁজ নাওনি। তোমাকে দোব।

- কি আছে বইটাতে?

- এই বইটার নায়কের নাম রাসকলনিকভ। সে একটা সুদখোর বুড়িকে খুন করে ছিল। আগেও পড়েছি নভেলটা । তখন ধরতে পারিনি। কালকে পড়তে গিয়ে খেয়াল হল, আরও যতবার আমি নভেলটা পড়ব, ততবারই সেই একই নাম্বারের পৃষ্টাটায় এসে রাসকলনিকভ বুড়িটাকে খুন করবে। সে খুন করতেই থাকবে। রিপিট, রিপিট, রিপিট। যেন সে মানুষ না। তার ক্লান্তি আসে না। সে ভূত, আত্মা, শাঁকচুন্নি – যা কিছু হতে পারে – মানুষ না। এই রিপিটেশন একধরনের পলিটিকাল স্টান্ট। আর আমি এর বিরোধী।

- যা বাবা। এখন?

- ফর্মটাকে পুরো চেঞ্জ করে ফেলেছি।

- কিরকম?

সে রুকসানাকে একটা সেলুনের সামনে এনে দাঁড় করায়। রুকসানা অনেকবার এই রাস্তা দিয়ে গেছে। তবে এর আগে এইখানটাতে কোনো সেলুন দেখেনি।

স্টোরিটেলার বলে, কালকেই বন্দোবস্ত করেছি।

- মানে?

- যে সব দোকানপাট ভাঙা হয়েছিল, সেই সব ভাঙা জিনিসপত্তর দিয়ে দোকানটা বানিয়েছি। ঐ যে দেখছ, নাপিতটা চুল কাটছে, ওর নাম আফজল। আফজলের হাতে যে কাঁচিটা রয়েছে সেটাও কুড়িয়ে নেওয়া। আয়নাটাও। আফজল বিহারের গয়া ডিসট্রিক্টের বারিচাড্ডি গ্রামের ছেলে। ওদের গ্রামে কারেন্ট ছিল না। এতদিন ওরা হুকিং করে লাইট জ্বালাত। এবার সরকারি মিটার বসেছে। ওর চার ছেলে। বড় দুজন প্রিন্টিং এর কাজ করে। সপ্তায় হাজার টাকা মত পায়। বাকি দুজন আমলিতলার প্রাইমারি স্কুলে। ওর নিজেরও ইঙ্কাম চার হাজার টাকার মত। এতে ওদের সংসার ঠিকঠাক চলে। তবে ঈদের সময় কেস খেয়ে যায়। এখানে ষোলবিঘাতে একটা ঘর ভাড়া নিয়েছে।

- তো?

- এইটাই তো। এই ভেঙে যাওয়া বিহারিদের দোকানপত্তরের মাঝখানে সে আর একখানা দোকান খুলেছে। তুমি যতবার এই সেলুনটার সামনে দিয়ে যাবে ততবার তাকে নতুন নতুন কাজ করতে দেখবে। কোনো রিপিটেশন নেই। আমি তাকে একটা ইনফাইনাইট ফ্রেমের মধ্যে প্লেস করেছি। ওর মধ্যে সবসময় সম্ভাবনা রয়েছে।

- অ।

রুকসানা আর কথা বাড়ায় না। মুখ নিচু করে চলে যায়। কিছু দূর এগোলে স্টোরিটেলার ছুটে এসে তার হাত ঝাপটে ধরে। কানে কানে বলে, সরি।


বাজারে কমলালেবু এসে গেছে বেশ কিছুদিন আগে। কোল্ড ক্রিমের অ্যাড সেই কবে থেকে শুরু হয়ে গেছিল। তবে এখনও ঠিকঠাক শীত পড়েনি। আকাশে মেঘ জমছে। এই মেঘ থেকে বৃষ্টি নামলে শীতটা জাঁকিয়ে পড়বে।

মাঝখানে, ১০তলার টাওয়ার ঠেকে মিস ছিনালি ঝাপ দিল। রোজ রোজ গুজব শোনা যাচ্ছিল, অবশেষে, ঈশ্বরকণার ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে কশাইখানার বাছুর বলল, হাম্বা। যোলবিঘার জমিতে আবার আগুন লাগল। এবারেও কেউ মরল না।

রুকসানার বাপের শরীর গামছার মত নেতিয়ে গেছে। সে আর হকারি করতে বেরতে পারে না। কাশলেই রক্ত ওঠে। এখন সে সারাক্ষণই কাশে।

জাহাজি একখানা চাইনিজ ট্যাবলেট নিয়ে এসেছিল। রুকসানার খুব সখ হল সেটা কেনবার। জাহাজি কেনা দামেই দিচ্ছিল। রুকসানার কাছ থেকে সে লাভ নেবে না। কিন্তু সেই টাকাটাও সে ম্যানেজ করতে পারল না।

তারপর মরা শুশুকের গন্ধে পোয়াতিরা বমি করলে, বিকেলের দিকে, বৃষ্টি নামল। রুকসানা তখন টিউশন বাড়িতে। সে যখন ঘরে ফেরে, পাড়াতে ততক্ষণে সিরিয়াল শুরু হয়ে গেছে। সে ফিরে দেখে ঘরের চাল দিয়ে পানি নাবছে। মাঝেতে পানি জমেছে। দেয়ালের ক্যালেন্ডারটা ছিঁড়ে গেছে। বাপ কিন্তু পাশ ফিরে কেলিয়ে পড়ে আছে। কোনদিকে তার খেয়াল নেই।

রুকসানা প্লাস্টিক দিয়ে টালির চালের ফোকরটা বুজতে যায়। ন্যাকড়া দিয়ে মেঝে মোছে। নিজের বই খাতা সরিয়ে রাখে। বাইরে ঝড় বইছে। প্লাস্টিক দিয়ে বৃষ্টির ছাট বন্ধ রাখা যাচ্ছে না।

সে যেন কীসব হিসেব কষে। বিস্কুট খায়। রোজকার মত বিছানা পাতে। দরজা দিয়ে উঁকি মারে। আবার খাটে এসে বসে।

অনেক রাতে ২পিস কলা খেল সে। কান পাতলে শুনতে পেল, কে বুঝি গান গেয়ে সিগন্যাল পাঠাচ্ছে। সে অস্থির হয়ে ওঠে। বাপের গায়ে হাত বুলিয়ে আরও খানিকক্ষণ ওয়েট করে। তারপর ছাতা মাথায় দিয়ে বাইরে থেকে ঘুরে এলে নিশ্চিন্ত হয়।

সে, রুকসানা, ছাতাটা খাটে রেখে, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল।

ততক্ষণে বৃষ্টি থিতু হয়েছে। আকাশে সাদা লাইট খেলে যাচ্ছে। সে পাড়ার মোড়ে এসে খানিক দাঁড়ায়। আবার গানটা শুনবে বলে কান পাতে। গানটা শুনতে পায়। এবার তার কাছে সব কিছু সাফ হয়ে যায়।

সে একবার পেছনে তাকিয়ে সোজা বামদিকে ঘুরে গেলে দেখতে পায় পালসারটিতে পুরুষটি বসে রয়েছে। পুরুষটি গান থামিয়ে তার দিকে ইশারা দিচ্ছে। সে হাসে। কাছে এসে হাত পাতে। পুরুষটি তার হাতে আধখাওয়া চুইংগামের প্যাকেটটা গুজে দেয়।

রুকসানা পেছনের সিটে বসে কি যেন ভাবল। আবার, একটু সামলে নিয়ে, কত অনায়াসে বলতে পারল, প্যাট্রিক চল।

- কোথায়?

- অনেক দূর।


তারপর লিগলিগে ধোঁয়ার মত পোড়া পেট্রলের গন্ধ মিলিয়ে গেলে আবার বৃষ্টি নামল এলাকায়। কমরেড সেরী এবার খাড়া ভাবে দাঁড়াতে পারলেন। তিনি তাকিয়ে দেখেন, যতসব মরে যাওয়া, হেজে যাওয়া, পঙ্গু ও অথর্ব, হিরো ও হারামি, যতসব টিবি রুগী আর ক্যালানে গড়িয়ে গড়িয়ে, হামাগুড়ি দিতে দিতে কোকাকোলার বোতলটার দিকে এগিয়ে আসছে।

তিনি ডায়লগ ঝাড়ার ঢঙে তাদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়েন। হাত নাড়িয়ে সামনের সুতো গুলোকে সরিয়ে দেন। সুতো সরাতে সরাতে, হঠাৎই, সিনেমার নায়কের মত মুঠি পাকিয়ে তোলেন।



স্টোরিটেলারের লেখাটি ফরাসি কবি Roger Giroux এর একটি কবিতার ইংরাজি অনুবাদ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন